চার
দিনের শুটিং শুরু হওয়ার আগে প্রাণকৃষ্ণের সঙ্গে বসতে হয় নবকুমারকে। সারাদিনে যে কাজ হবে, তার সংলাপ কীভাবে বলতে হবে, তার রিহার্সাল দিতে হয়। এ ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে প্রাণকৃষ্ণ। আজই হঠাৎ রেগে গেল প্রাণকৃষ্ণ—’তোমার কি কোনও সমস্যা হচ্ছে?’
‘না, না তো!’ নবকুমার মাথা নাড়ল।
‘তা হলে উচ্চারণটা ওভাবে করলে কেন?’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কীভাবে করলাম!’
‘বোঝাচ্ছি। কোনও বয়স্ক বা শ্রদ্ধেয় মানুষকে আমরা ”আপনি” বলে সম্মান করি। কিন্তু বাচ্চাদের কি আপনি বলি? বলি না। কোনও জীবজন্তুকে কি আপনি বলি?’
‘না। বলা ঠিক নয়।’
‘অথচ তুমি তাই বললে। তোমাদের গ্রামে গরুর বাচ্চা হলে খবরটা কাউকে কীভাবে দাও?’ প্রাণকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করল।
কপালে ভাঁজ পড়ল নবকুমারের। প্রাণকৃষ্ণ হাসল—’গরু বাচ্চা দিয়েছে। তাই তো? এই কয়েকটা দিনে তো এই ভাষায় সংলাপ বলোনি, আজ কী হল?’
লজ্জিত হল নবকুমার—’আর হবে না। ঠিকই বলেছেন, সমস্যায় পড়েছি।’
‘প্রেমে পড়েছ?’
‘না, না।’ নবকুমার বলল, ‘বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু কোথায় থাকব, তা-ই জানি না। বড়বাবুকে অবশ্য বলেছি।’
‘আরে। বড়বাবুকে যখন বলেছ, তখন আর চিন্তা করছ কেন? হয়ে যাবে।’
‘কী করে বুঝলেন?’
‘যে গরু দুধ দেয়, তাকে যত্ন করা হয়। তোমার পিছনে এর মধ্যে বড়বাবুর কিছু ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গিয়েছে। ছবিটা ভালোভাবে না চললে প্রচুর লোকসান হবে। তুমি সমস্যায় কাতরালে ভাট অভিনয় করবে। ছবিও ডুববে। একে নতুন মুখ, তারওপর বাজে অভিনয়—পাবলিক দুয়ো দেবে। তাই বড়বাবু চাইবেন না তুমি সমস্যায় থাকো। যতদিন ছবি মুক্তি না পাবে, ততদিন তোমাকে তিনি খাতির করবেন। যদি ছবি লেগে যায়, তা হলে মাথায় তুলবেন।’ প্রাণকৃষ্ণ একগাল হাসল।
‘যদি না চলে?’ নবকুমার জিগ্যেস করল।
‘নিতম্বে এমন একটা লাথি মারবেন যে, কোনওদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।’ প্রাণকৃষ্ণ বলল, ‘বলো, পরের ডায়লগ বলো।’
ঘণ্টাখানেক পরে রিহার্সাল শেষ করে প্রাণকৃষ্ণ বলল, ‘তুমি দেখছি খুব ইমোশনাল। প্রথমদিকে ধ্যাড়াচ্ছিলে, কিন্তু যেই বললাম বড়বাবুর কথা, অমনি ঠিকঠাক বলা শুরু করলে। বাবা নবকুমার, তোমার ব্যক্তিগত যাবতীয় সমস্যা, মান-অভিমান ইত্যাদি স্টুডিওর গেটের বাইরে রেখে ভেতরে ঢুকবে। ফ্লোরে যখন যাবে, তখন তুমি আর নবকুমার নও, যে চরিত্রে অভিনয় করছ, সেই চরিত্র হয়ে যাবে। এই কথাটা মনে রেখো।’
এটা কী করে সম্ভব জিগ্যেস করতে গিয়েও করল না নবকুমার।
এদিন নবকুমারের প্যাক-আপ হয়ে গেল বিকেল চারটের সময়। প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে জানাল, কাল-পরশু শুটিং নেই, রবিবার আউটডোরে যেতে হবে।
‘আউটডোরে?’ মেক-আপ তুলতে গিয়ে থেমে গেল নবকুমার—’কোথায়?’
‘তোমাকে দাদা কিছু বলেননি?’ ম্যানেজার জিগ্যেস করল।
‘না তো!’
‘যা খেল দেখাচ্ছ ভাই, বলতে ভুলে গিয়েছেন। দার্জিলিং-এ আউটডোর।’
‘সেখানে গিয়ে শুটিং হবে?’
‘না তো কী! পঞ্চাশজন লোক নিয়ে পিকনিক যাওয়া হবে!’
নবকুমার আর কথা বাড়াল না। এই রবিবারে তাকে ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে হবে। সেদিন সে যদি দার্জিলিং-এ চলে যায়, তা হলে মুক্তোকে কোথায় রেখে যাবে! মাথায় আবার ভারী হয়ে বসল দুশ্চিন্তা। প্রাণকৃষ্ণদা যতই বলুন, সব চিন্তা স্টুডিওর বাইরে রেখে ভেতরে ঢুকতে, তা কী করে সম্ভব!
মেক-আপ রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতেও ফিরে এল ম্যানেজার—’ওহো, ভুলেই গিয়েছিলাম। দাদা এটা পাঠিয়েছেন, বলেছেন, আপাতত ব্যবহার করতে। প্রিপেড। এখনও পঞ্চাশ টাকা আছে।’ আয়নার সামনে মোবাইলটা রেখে বেরিয়ে গেল ম্যানেজার।
কমল দাঁড়িয়েছিল পাশে, বলল, ‘বাহ, ভালো হল। কিন্তু শুটিং শেষ হলে তো ওটা ফিরিয়ে দিতে হবে! তারচেয়ে নিজেই কিনে নেওয়া ভালো। তা হলে মোবাইল নাম্বার এক থাকবে।’
নবকুমার যন্ত্রটা দেখল। পিছনে একটা চিলতে কাগজে নাম্বার লিখে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। কমল নাম্বারটা তার মোবাইলে তুলে নিল। মেক-আপ তোলার পর নবকুমার কমলকে বলল—’নিবারণদার ঠিকানাটা পেলে আমি ওঁকে দেখে আসতে পারি।’
কমল একটা কাগজে ঠিকানা লিখে, কীভাবে যেতে হবে বলে দিল।
মেক-আপ রুম-এর বাইরে আসতে গীতিময়ের দেখা পেল নবকুমার। মোবাইলে কথা বলছেন। তাকে দেখে ইশারায় দাঁড়াতে বললেন। নবকুমার দাঁড়াল। কথা শেষ করে গীতিময় কাছে এলেন—’মোবাইল পেয়েছ।’
‘হ্যাঁ।’
‘রবিবারে আউটডোরে যেতে হবে, তা জেনেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কীভাবে যাবে, কখন যাবে, তা ম্যানেজার জানিয়ে দেবে। ওখানে দারুণ রোম্যান্টিক সিন করতে হবে তোমাকে। মুখে বদগন্ধ নেই তো?’
‘মানে?’
‘আহ। এই সরল কথার মানে কেন বোঝো না! তোমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলে কি বদগন্ধ পাওয়া যায়?’
‘না, না!’ দ্রুত মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘গুড।’ খুশি হলেন গীতিময়—’এসব ব্যাপারে মেয়েরা অ্যাডজাস্ট করতে চায় না। তুমি এই ক’দিন সকালে-রাত্রে মাউথওয়াশ করবে। আর হ্যাঁ, টাকা পেয়েছ?’
‘না তো!’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘মানে? তোমাকে সুনীলবাবু টাকা দেননি?’
‘না, দেননি।’
‘আশ্চর্য! তোমার টাকার দরকার হয় কি হয় না?’
‘হয়।’
‘অফিসে গিয়ে সুনীলবাবুর সঙ্গে দেখা করো। এখনই।’ গীতিময় চলে গেলেন।
প্রোডাকশন অফিস স্টুডিওর অন্য প্রান্তে। সেখানে এর আগে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি বলে নবকুমার যায়নি। আজ গিয়ে দরজায় দাঁড়াতেই দেখতে পেল তিনজন মানুষ দুটো টেবিলের পিছনে বসে কাজ করছেন। একজন, যিনি একা বসেছিলেন, তার দিকে তাকালেন—’আসুন ভাই, ভেতরে আসুন। বসুন।’
নবকুমার বসল টেবিলের এপাশের চেয়ারে। বলল, ‘আমি নবকুমার।’
‘জানি। আলাপ হয়নি কিন্তু দেখেছি।’
‘আপনি কি সুনীলবাবু?’
‘হ্যাঁ ভাই। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। আপনাকে কি ডিরেক্টর পাঠাল।’
‘হ্যাঁ।’
‘আমারই উচিত ছিল খবর দেওয়া। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এই চেয়ারে বসে মাঝে মাঝে কিছু ভুলভ্রান্তি করে ফেলছি। কিছু মনে করবেন না। আপনার জন্যে কিছু টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে. আপনি কি চেকে নেবেন?’ সুনীলবাবু জিগ্যেস করলেন।
‘চেক? ক্যাশে দেওয়া যায় না!’
‘এখন দেওয়া যাবে। ভবিষ্যতে বোধ হয় দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু আপনি চেকে নিতে চাইছেন না কেন?’
‘আমার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নেই।’
‘সে কী! আজকাল স্কুলে ভর্তি হতে-না-হতে বাচাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। চটপট খুলে ফেলুন।’ সুনীলবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে পাশের আলমারির তালা খুললেন। তারপর লকার থেকে টাকা বের করে নিয়ে এলেন। টাকা একটা কাগজে মোড়া ছিল। সেই কাগজটা নবকুমারের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললন, ‘আপনার টাকা রেডি ছিল। সই করে দিন এখানে।’
নবকুমার দেখল, পনেরো হাজার টাকা তাকে ছবিতে অভিনয় করার জন্যে অগ্রিম হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। বুকের ভেতরটা যেন নড়ে উঠল। এই প্রথম সে এত টাকা রোজগার করছে। সই করতেই গার্টারে বাঁধা নোটের তাড়া এগিয়ে দিলেন সুনীলবাবু। বললেন, ‘আমার মোবাইল নাম্বার রাখুন। দরকার হলে ফোন করবেন।’ একটা কাগজে নিজের নাম্বার লিখে নবকুমারকে দিলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘টাকাটা গুনে নিন।’
অতগুলো নোট ভদ্রলোকের সামনে বসে গুনতে সংকোচ বোধ করল নবকুমার।
স্টুডিওর গেট থেকে ডানদিকে হাঁটতে লাগল সে। পকেটে পনেরো হাজার টাকা নিয়ে আজ অবধি সে কোথাও যায়নি। সে একটা রিকশাওয়ালাকে ঠিকানাটা বললে লোকটা বলল, ‘উঠুন। পনেরো টাকা দেবেন।’
পনেরো টাকা! সে মাথা নেড়ে বলল, ‘থাক। আমি হেঁটেই যাব।’
‘দশ দেবেন। উঠুন।’
রিকশাওয়ালা তাকে যেখানে পৌঁছে দিল, তার খুব কাছেই খাল। তাকে দশ টাকা দিয়ে বিদায় করে নিবারণদার খোঁজ নিতে তাঁর বাড়ি পেতে অসুবিধে হল না। একতলা বাড়ি। দরজা বন্ধ। নবকুমার বেলের বোতাম টিপল। একটু অপেক্ষা করতেই দরজা খুললেন যিনি, তাঁকে প্রৌঢ়া বলাই উচিত।
নবকুমার বলল, ‘আমি নিবারণদার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’
‘তাঁর শরীর খারাপ, শুয়ে আছেন।’
‘খবরটা পেয়েই আমি দেখতে এসেছি। আমার নাম নবকুমার।’
প্রৌঢ়া দরজা খোলা রেখেই ভেতরে চলে গেলেন। ফিরেও এলেন তাড়াতাড়ি, বললেন, ‘আসুন।’
দুটো ঘরের বাড়ি। ভেতরে বারান্দা, উঠোন, ওপাশে রান্নাঘর ইত্যাদি। এরকম বাড়ি কলকাতায় আছে দেখে অবাক হল নবকুমার। বারান্দা দিয়ে পাশের ঘরে তাকে নিয়ে গেলেন প্রৌঢ়া। নিবারণ শুয়েছিলেন, নবকুমারকে দেখে উঠে বসলেন।
নবকুমার বলল, ‘আপনি শুয়ে থাকুন নিবারণদা। আমি বেশি বিরক্ত করব না।’
‘না, না। বিরক্ত হব কেন? যা কল্পনা করিনি, তা পেলে কেন বিরক্ত হব। তুমি আসবে, আমি ভাবতে পারিনি। বসো ভাই। কমলের কাছে শুনলে?’
‘হ্যাঁ। কী হয়েছে আপনার?’
‘আমার যে একটা হৃদয় আছে, তা অ্যাদ্দিনে জানতে পারলাম।’
‘আমি, মানে বুঝতে পারলাম না।’
‘বুকে ব্যথা হচ্ছিল। ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি ইসিজি করলেন। বললেন হৃদযন্ত্র বিদ্রোহ করছে। ওষুধ দিয়েছেন। কয়েকটা দিন দেখবেন। তাতে না কমলে হাসপাতালে যেতে হবে।’ হাসলেন নিবারণ—’শরীর একটা মেশিনের মতো। চলতে চলতে একটা সময় সেটা অকেজো হবেই। এসব কথা থাক, কেমন শুটিং হল আজ?’
‘ভালো।’
এই সময় প্রৌঢ়া, যিনি নিবারণদার খাটের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, নীচু গলায় বললেন, ‘ডাক্তার তোমাকে যতটা সম্ভব কম কথা বলতে বলেছেন।’
নিবারণদা বললেন, ‘আজ একটু বলি। এমন দিন তো আসবেই, যখন সবাই কথা বলবে আর আমি নিরুত্তর থাকব। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। এই ছেলের নাম নবকুমার। ছবির নায়ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এই ভাগ্য সবার হয় না। গ্রাম থেকে এসে—যাকগে, ইনি আমার রক্ষাকর্ত্রী। আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’ হাসলেন নিবারণদা।
নবকুমার প্রৌঢ়াকে হাতজোড় করে নমস্কার করল। তারপর বলল, ‘আপনি বিশ্রাম নিন। কয়েকদিন পরে আমি আবার আসব।’
হাত বাড়ালেন নিবারণদা। শূন্যেই হাত বুলিয়ে বললেন, ‘কোথাও যাবে না কি?’
‘না, না। আপনার শরীর ভালো নয়।’
‘আরে, ডাক্তারদের কথায় কি সবসময় চলা যায়! এই যে তুমি এলে, অমনি আমার মন ভালো হয়ে গেল। মন ভালো হয়ে গেলে শরীর কী করে খারাপ হবে!’ এবার প্রৌঢ়ার দিকে তাকালেন নিবারণ—’চিন্তা কোরো না। তুমি বরং নবকুমারকে একটু চা খাওয়াও।’
প্রৌঢ়া নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আচমকা নিবারণদা জিজ্ঞাসা করলেন—’নবকুমার, তুমি নিশ্চয়ই মদ্যপান করো না?’
‘না, না!’ নবকুমার অবাক হল—’কেন একথা জিজ্ঞাসা করছেন?’
‘দ্যাখো, কয়েক যুগ তো এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে থাকলাম, দেখলাম অনেক। কত বড় মাপের শিল্পী ওই মদের নেশায় শেষ হয়ে গিয়েছেন। কী জানি কী কারণ, সিনেমার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের অনেকেই এই পথে হাঁটেন। অনিলদার একটা কথা আমার মনে আছে। বলেছিলেন, মদ হল পাগলা ঘোড়ার মতো। পিঠে চড়ে বসা যায়, কিন্তু তাকে কন্ট্রোল না করতে পারলে আছাড় খেতেই হবে। ওই কন্ট্রোলটা সবাই করতে পারে না। তাই মানুষ যখন মদ খেতে শুরু করে, তখন সে জানে না, মদ তাকে কিছুদিনের মধ্যেই খেতে শুরু করবে।’ নিবারণদা বললেন, ‘একদম ঠিক কথা। অনিলদা কোনওদিন মদ স্পর্শ করেননি। নির্মলদাও না। তুমি ভাবতেই পারো, আমি তোমাকে জ্ঞান দিচ্ছি। কিন্তু কথাটা মনে রাখলে তোমার ভালো হবে।’
নবকুমার বলল, ‘আমি এই জীবনেই অনেক মাতাল দেখেছি। গ্রামে কয়েকজন মানুষকে দেখেছি দিশি মদ খেতে। পেট-পিঠ এক হয়ে গিয়েছিল তাদের। বুড়ো হওয়ার আগেই মারা যেত তারা। কলকাতায় এসে আমাকে চিৎপুর-সোনাগাছিতে থাকতে হয়েছিল। সেখানে তো ঘরে ঘরে মদ খাওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ওই ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ হয়নি।’
‘খুব ভালো কথা। কিন্তু চক্রে পড়লে ভগবানও ভূত হন। আজ সকাল থেকে একজন অভিনেত্রীর কথা মনে পড়ছিল। মদ্যপান করতেন। নেশার ঝোঁকে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাই হয়তো তোমাকে সামনে পেয়ে এত কথা বললাম। আচ্ছা নবকুমার, তুমি কি বাড়িতে অনুশীলন করো? বেশির ভাগ অভিনেতা ফ্লোরে এসে সংলাপ শুনে, তা ক্যামেরার সামনে উগরে দেয়। তুমি সেটা কোরো না ভাই। বড় অভিনেতা যদি হতে চাও, তা হলে অনুশীলন করবে, তৈরি হয়ে আসবে।’ নিবারণদা বললেন।
‘কিন্তু কীভাবে অনুশীলন করব?’
‘ভালো প্রশ্ন। প্রাণকৃষ্ণকে ধরো। সে তোমাকে প্রথমে পাত্তা দেবে না। চেপে ধরলেই সাহায্য করবে। তোমার বাড়ি তো গ্রামে। সেখানে কি বাবা-মা থাকেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছ তো?’
‘নিয়মিত হয় না, তবে…’
‘এটা ঠিক নয়। এই লাইনে লোকে যত ওপরে ওঠে, তত মাটির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে ফ্যালে। সৌমিত্রবাবুর কথা ধরো। কত বড় অভিনেতা, কিন্তু অল্পবয়সের বন্ধুদের সঙ্গে কোনওদিন সম্পর্ক ত্যাগ করেননি। কফি হাউসে যেতেন নিয়মিত। জীবন থেকে নিজেকে কখনও সরিয়ে নেননি।’
‘আমি এখন একটা সমস্যায় পড়েছি।’ নবকুমার বলল।
নিবারণদা তাকালেন। বোঝা যাচ্ছিল কথা বলে একটু কাহিল হয়ে পড়েছেন।
‘আমাকে রবিবারের পরে থাকার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে।’
‘রবিবারে তো তোমাদের আউটডোরে যাওয়ার কথা!’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমাকে যিনি রান্না করে দেন, সব কাজ করেন, সেই মুক্তোদিকে তো আউটডোরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ফিরে এসে তো থাকতে হবে।’
‘কাউকে বলেছ?’
‘হ্যাঁ। বড়বাবুকে বলেছি, কিন্তু এখনও তিনি কিছু জানাননি।’
‘তিনি ইচ্ছে করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। ঠিক আছে, আমি আমার রক্ষাকর্ত্রীকে বলছি, যদি এই পাড়ায় তোমার জন্যে দুটো ঘর পাওয়া যায়।’ নিবারণদার কথার মধ্যেই প্রৌঢ়া এক কাপ চা নিয়ে ঘরে এলেন।
নিবারণদা বললেন, ‘বিস্কুট দিলে না?’
নবকুমার মাথা নাড়ল—’না, না। আমি বিস্কুট খাব না।’ হাত বাড়াল সে—’দিন, বউদি।’
প্রৌঢ়া বললেন, ‘আমাকে বউদি বলবেন না ভাই। আমরা স্বামী-স্ত্রী নই। আমাকে দিদি বললেই খুশি হব।’
