ক্যালকাতায় নবকুমার – ৭

সাত

বাড়িতে ফিরে এসে বেল বাজানো সত্ত্বেও দরজা খুলল না মুক্তো। তিনবার বেল বাজানোর পরে কী করবে, ভেবে পাচ্ছিল না নবকুমার। সে লিফটে চেপে নীচে নামতেই দারোয়ান এগিয়ে এল—’মাসি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে।’

‘মাসি মানে?’

‘আপনার সঙ্গে যে কাজের লোক এসেছে।’

‘ওহ! কী করে বুঝলেন ভয় পেয়েছে?’

‘আমাকে আপনি করে বলবেন না স্যর। কিছুক্ষণ আগে মাসি নীচে নেমে এসে কাঁদছিল। জিগ্যেস করতে বলল, ‘দরজার চাবি নিয়ে বের হয়নি। টেনে দিয়ে বেরিয়েছিল। এখন আর ঢুকতে পারছে না। আপনি এসে কী বলবেন, সেই ভয়ে কাঁদছিল।’ দারোয়ান দাঁত বের করে হাসল।

‘সে কী!’ কী করবে এখন, তা চট করে মাথায় এল না নবকুমারের। চাবি ভিতরে, মুক্তোদি বাইরে, সে ফ্ল্যাটে ঢুকবে কী করে?

দারোয়ান বলল, ‘চিন্তার কিছু নেই। আপনাদের ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার নিরঞ্জনদার মোবাইল নাম্বার আমার কাছে ছিল। ওকে বলেছি, এখনই আসছে।’

‘নিরঞ্জন কী করে দরজা খুলবে?’

‘ওর কাছে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি আছে।’

‘মুক্তোদি কোথায়?’

‘ওই সামনের মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরকে ডাকছে।’ দারোয়ান বলল, ‘ওই তো নিরঞ্জনদা এসে গিয়েছে।’

নিরঞ্জন কাছে এসে বলল, ‘প্রথমদিনেই কাণ্ড ঘটালেন। এটা বড়বাবুর কানে গেলে…’ হেসে কথা শেষ করল না সে।

‘আপনি না বললে তো যাবে না।’

‘তা তো বটেই। কথাটা মনে রাখবেন।’

‘বুঝতে পারলাম না।’

নিরঞ্জন রহস্যময় হাসি হেসে বলল, ‘চলুন, দরজা খুলে দিচ্ছি। এখন থেকে চাবিটা নিজের কাছেই রাখবেন।’ নিরঞ্জন লিফটের দিকে এগোলে দারোয়ান বলল, ‘আপনি যান স্যর, আমি মাসিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

নিরঞ্জন দরজা খুলে আর কথা না বাড়িয়ে চলে যাওয়ার পরে মুক্তোদি দরজায় এসে দাঁড়াল। নবকুমার তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কান্নাকাটি করেছ কেন? তোমার তো কোনও দোষ নেই। অভ্যেস না থাকলে এরকম হয়েই থাকে।’

মাথা নীচু করে ভেতরে চলে গেল মুক্তো।

পাঁচ হাজার পাঁচশো টাকা বের করে মুক্তোকে দরজা বন্ধ করতে বলে বাইরে এল সে। নীচে নেমে দারোয়ানকে জিগ্যেস করল—’এখানে পোস্ট অফিসটা কোথায়?’

‘কাছেই দুটো বাড়ি পরে, ডান হাতে। কিছু দরকার আছে?’ দারোয়ান জিগ্যেস করল।

‘হ্যাঁ। মানি অর্ডার করব।’

‘সে কী স্যর! মানি অর্ডার কেন করবেন? যাকে টাকা পাঠাবেন, তার যে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে, সেই ব্যাঙ্কে গিয়ে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করে দিন। সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবে।’ দারোয়ান উপদেশ দিল।

‘আমি অ্যাকাউন্ট নাম্বার জানি না।’ নবকুমার বলল।

পোস্ট অফিসের কাজ তখন বন্ধ হওয়ার মুখে। অনেক অনুরোধ করে মানি অর্ডার ফর্ম আর টাকা জমা করতে পারল সে। লিখল—’শুটিং-এর জন্য ক’দিন বাইরে থাকব। আমার নতুন ঠিকানাটা রেখে দাও। নব।’ লিখল মাকে উদ্দেশ্য করে। টাকা পাঠাল বাবার নামে।

মানি অর্ডার করে একটু আরাম লাগল নবকুমারের। আরও বেশি টাকা পাঠাতে পারলে বাবার উপকার হত। কিন্তু নিজের জন্যও তো কিছু রেখে দেওয়া দরকার।

সন্ধের পরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে টিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখছিল নবকুমার। এইসময়ে মোবাইল জানান দিল। বড়বাবুর গলা—’শোনো, তিনটে কারণে তোমাকে ফোন করছি। এক, তোমার শেফালি মাকে চিকিৎসার জন্য মানসিক চিকিৎসালয়ে যে পাঠানো হয়েছিল, সেখানকার চিকিৎসকরা আদালতকে জানিয়েছেন, ওঁর সুস্থ হওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। বোধ হয় এই কারণে তিনি আদালতের সহানুভূতি পেতে পারেন। দু-নাম্বার হল, তোমাকে নিয়ে প্রাণকেষ্ট যে ওয়ার্কশপ করেছিল, তার রিপোর্ট তোমার পক্ষেই গিয়েছে। কিন্তু নায়িকা দূরের কথা, ওই খলনায়িকার সঙ্গেও ইনভলভ হতে পারছ না। কিছু বলবে?’

‘আমি খুব চেষ্টা করছি।’ নীচু গলায় বলল নবকুমার।

‘চেষ্টা করছি? তুমি প্রাণকেষ্টকে বলেছ চুমু খেতে পারবে না।’

‘বাড়ির কথা ভেবে, ওঁরা মানতে পারবে না।’

‘তুমি তো মেয়েমানুষেরও অধম। ওদের বলবে চরিত্রের প্রয়োজনে চুমু খেতে হয়েছে। আরে, হলিউডে চরিত্রের প্রয়োজনে অভিনেত্রীরা ন্যুড হচ্ছে, আর এ তো সামান্য চুমু। তুমি একজন পুরুষমানুষ তো?’ জিজ্ঞাসা করলেন বড়বাবু।

নবকুমার উত্তর দিল না।

বড়বাবু বললেন, ‘দর্শকদের কথা ভাবো। ওই সিনে চুমু খেয়ে তোমাকে প্রোভোক করবে বিদিশা, শুধু ওই দৃশ্যের জন্য অনেকে দুবার ছবিটা দেখবে। আমি আর তোমার মুখে উলটোপালটা কথা শুনতে চাই না। আর হ্যাঁ, বিদিশা বলেছে তোমার মুখে যেন দুর্গন্ধ না থাকে। আমি কাল সকালে মুখের ভিতরটা দুর্গন্ধমুক্ত করতে যা যা দরকার, তা পাঠিয়ে দেব। এখন থেকে দিনে তিনবার সেসব ব্যবহার করবে। আর হ্যাঁ, তিন নাম্বার কারণ হল, তোমাকে জানানো যে, আমি খুশি হয়েছি।’

‘বুঝলাম না।’ নবকুমার বলল।

‘মন্দাক্রান্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করোনি তুমি। গুড!’ বড়বাবু মোবাইল বন্ধ করলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকল নবকুমার। নিজেকে এখন একটা পুতুল বলে মনে হচ্ছে। পরিচালক-প্রযোজকের ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে চুমু খেতে হবে। চুমু খাওয়ার সময় অভিনেত্রীর যাতে খারাপ না লাগে, তাই এখন থেকে মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে হবে। এই বাড়ির দারোয়ান তাকে ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করেছে, কিন্তু বলার সময় ওর ঠোঁটে চিলতে হাসি ফুটেছিল। জীবনে কেউ তাকে ‘স্যর’ বলেনি। এই লোকটা যে বলল, তা সম্মান দেখানোর জন্য যে নয়, তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। ওই নিরঞ্জন যেভাবে বলল, ‘কথাটা মনে রাখবেন’—তাতে যে ইঙ্গিত করেছে, সেটা করতে দ্বিধা করেনি। কারণ সে-ও জানে নবকুমার কে!

নবকুমারের খুব ইচ্ছে করছিল এসব কথা মন্দাক্রান্তাকে বলতে। এই শহরে ওই একজন মানুষ আছেন, যাঁর সঙ্গে মনের কথা খুলে বলা যায়। কিন্তু সেটা সম্ভব না। নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল না মারার হুঁশ তার হয়েছে। সে বিছানা থেকে নেমে মুক্তোকে ডাকল। মুক্তো এল চোখ মুছতে মুছতে।

‘এ কী! এখন তুমি কাঁদছ কেন?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

‘নিজের ভাগ্যের কথা ভেবে। কী কপাল করে জন্মেছিলাম।’ গলা থেকে কান্না ছিটকে বেরোল মুক্তোর।

প্রশ্ন করলে অনেক দুঃখের কথা শুনতে হবে। এই মুহূর্তে সেটা একদম ইচ্ছে করছিল না নবকুমারের। সে কথা ঘোরাল—’শেফালি মায়ের খবর পেলাম।’

সঙ্গে-সঙ্গে কান্না থেমে গেল মুক্তোর। চোখ মুছে তাকাল।

‘হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছে। ডাক্তার বলছেন তাড়াতাড়ি সেরে যাবেন।’

‘পুলিশ?’

‘বোধহয় শাস্তি হবে না। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিল।’

সঙ্গে-সঙ্গে কপালে দুটো হাত জোড় করে ঠেকাল মুক্তো। বিড়বিড় করে কিছু বলল চোখ বন্ধ করে। নবকুমার অপেক্ষা করল। মুক্তো চোখ খুললে বলল, ‘শোনো, আমি কাজের জন্য কয়েকদিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। তুমি এখানে সাবধানে থাকবে।’

‘সে কী! কোথায় যাবে?’ মুক্তো বেশ অবাক হল।

‘কাছেই যাব। তোমার কোনও অসুবিধে হবে না। বেশ কয়েকদিনের বাজার করে রেখো। আর যদি কোনও অসুবিধে হয়, তা হলে নীচে নেমে দারোয়ানকে বললে, সে নিশ্চয়ই নিরঞ্জনকে ডেকে দেবে। তাকে অসুবিধের কথা বলবে।’ নবকুমার বুঝিয়ে বলল।

‘ওরা আমাকে এই ঘর থেকে বের করে দেবে না তো?’

মুক্তোর মুখে ভয় দেখে হেসে ফেলল নবকুমার। বলল, ‘না।’

পরের সকালে প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে বলল, ‘আজ রাত আটটার মধ্যে শিয়ালদা স্টেশনে চলে আসবে। কাঞ্চনকন্যা ট্রেন সাড়ে আটটায় ছাড়ে। এই ট্রেনে শিলিগুড়িতে যাওয়া হবে। তোমার টিকিট আমার কাছে আছে। এসি থ্রি টিয়ার। দেখো, ঠিক সময় পৌঁছে যেও।’

‘এখন থেকে শিয়ালদা স্টেশনে কীভাবে যাব?’

সঙ্গে সঙ্গে মাথা দোলাল লোকটা—’বুঝতে পেরেছি। এখন আর নিজের পয়সা খরচ করতে চাও না, ভালো। দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ঠিক আছে, ট্যাক্সি করেই যেও। যা ভাড়া দেবে, তা বিল করে দিও। পেয়ে যাবে।’

‘আমরা কতজন যাচ্ছি?’

‘ট্রেনে তিরিশজন, প্লেনে ছ’জন।’ হাসল প্রোডাকশন ম্যানেজার। ‘যার যা স্টেটাস, সেইমতো ব্যবস্থা। ও হ্যাঁ, শীতের জায়গায় যাচ্ছ, গরমজামা—মানে, কোট, সোয়েটার সব গুছিয়ে নিও।’

লোকটা চলে যাওয়ার পরে ফাঁপড়ে পড়ল নবকুমার। কয়েকটা জামা-প্যান্ট নিয়ে সে গ্রাম থেকে এসেছিল। সেগুলোর চেহারাও এখন ভালো নেই। গরম কাপড়ের তো প্রশ্নই নেই। যে ব্যাগ নিয়ে সে গ্রাম ছেড়েছিল, তা এখন ভদ্রসমাজে বের করা যায় না। এসব আজকের মধ্যে কিনতে হবে। কোথায় গিয়ে কেনা যায় ভাবতেই সাউথ সিটি মল-এর ছবি মনে এল। বাড়ি থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই ওখানে পৌঁছনো যায়।

দুপুরে খাওয়ার পরে নবকুমার বের হল। বাবা-মাকে টাকা পাঠানোর পর হাতে বেশি টাকা নেই। মুক্তোকে যা দিয়েছিল, তারপরেও কিছু দিয়ে যেতে হবে। প্রোডাকশন ম্যানেজারকে টাকার কথা বললে হত। অবশ্য বড়বাবুকে ফোনে তা বলা যায়। কিন্তু সংকোচ হল বলতে। সে ঠিক করল, কলকাতায় ফিরে অফিসে গিয়ে টাকা চাইবে।

চলন্ত সিঁড়িতে দাঁড়াতে একটু অস্বস্তি হলেও ব্যাপারটা বেশ মজাদার। ইচ্ছে করেই কয়েকবার ওঠানামা করে অভ্যস্ত হয়ে গেল সে। দোতলায় প্রচুর দোকান। কোন দোকানে গরমজামা আছে? কাচের দেওয়ালের ভিতরে কোট ঝুলতে দেখে দোকানে ঢুকল নবকুমার। পরপর কোট ঝুলছে। তার মাপসই একটা কোটের দিকে হাত বাড়াতেই একজন সেলসম্যান এগিয়ে এলেন—’ট্রাই করবেন?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু কীরকম দাম দিতে হবে?’ নবকুমার জিগ্যেস করল।

সেলসম্যান কোটের ভিতরে চোখ রেখে বলল, ‘সাড়ে চার হাজার। খুব সস্তায় পাচ্ছেন। আমাদের এখন সেল চলছে তো!’ ঢোক গিলল নবকুমার। সাড়ে চার হাজার টাকার কোট সে কিনবে, তা কোনওদিন ভাবতেও পারেনি। আর ওই টাকা দেওয়ার পর তার হাতে তো কিছুই থাকবে না। সে হাসার চেষ্টা করল—’ঠিক আছে। আমি আরও দেখি, তারপর।’

‘বেশ তো। কী ধরনের জ্যাকেট চান বলুন, আমি দেখাচ্ছি।’

‘জ্যাকেট?’

‘হ্যাঁ, এগুলো।’

ঢোক গিলল নবকুমার। তা হলে এগুলো কোট নয়, জ্যাকেট। তা হলে কোট কী?

‘না, না।’ মাথা নাড়ল নবকুমার—’আমি অন্য দোকানে দেখব।’

‘অন্য কোথাও আমাদের চেয়ে ভালো এবং সস্তায় পাবেন না আপনি।’ বেশ গলা তুলে লোকটা কথা বলল, যা শুনে অনেকেই এদিকে তাকাল।

‘আরে, তুমি এখানে!’

মহিলাকণ্ঠ শুনে মুখ ফিরিয়েই যেন বরফ হয়ে গেল নবকুমার। তার একহাত দূরে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত চোখে মন্দাক্রান্তা তাকে দেখছেন।

‘আমি…’ মুখ থেকে পুরো বাক্য বের হল না নবকুমারের।

সেলসম্যানের দিকে তাকিয়ে হাসলেন মন্দাক্রান্তা—’ওই জ্যাকেট ওর যদি পছন্দ হয়ে থাকে, তা হলে একবার ট্রায়াল দিয়ে দেখুন তো!’

সেলসম্যান জ্যাকেট নামিয়ে নবকুমারকে বলল, ‘আসুন।’

এবার নবকুমার প্রতিবাদের চেষ্টা করলে মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘যাও।’

এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে লাগল। দুটো জ্যাকেট, দুটো ট্রাউজার, দুটো শার্ট কেনার পর নবকুমারকে নিয়ে জুতোর দোকানে এলেন মন্দাক্রান্তা। মাপসই জুতো কেনার পর মোজা ফ্রিতে পাওয়া গেল। একটা মাঝারি মাপের সফট লেদার সুটকেস কেনা হল ওসব ক্যারি করার জন্য। নবকুমার লক্ষ করছিল পুরো কেনাকাটা মন্দাক্রান্তা একটা কার্ড দিয়ে সারলেন। তাঁকে কোনও টাকা বের করতে হল না।

সুটকেস হাতে নিয়ে নবকুমার জিগ্যেস করল—’এসব আপনি কেন করলেন?’

‘ইচ্ছে হল, তাই!’

‘আমার খুব লজ্জা করছে।’

‘সে কী! ওটা তো শুধু মেয়েদের সম্পত্তি বলেই শুনে এসেছি!’

‘বড়বাবু…’

‘চুপ করো। ওঁর কথা তুমি একবারও আমার সামনে বলবে না।’ মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘এভাবেই ঘটনা রং বদলায়। আমি সাউথ সিটিতে আসি, যখন খুব একঘেয়ে লাগে। এখানে ঘুরতে, লোকজন দেখতে দেখতে সেটা কেটে যায়। কে জানত, আজ এখানে এসে তোমার দেখা পাব! যদি জানতাম, তা হলে হয়তো আসতাম না।’

‘তা হলে এসব কিনে দিলেন কেন?’

‘মন। মন কখন কী চায়, তা যদি জানা যেত! দিতে ভালো লাগল, তাই দিলাম। তুমি ছবির হিরো, কাটা সৈনিকের মতো একপাশে পড়ে থাকবে, তা কি তোমাকে মানায়? ওসব পরলে তোমাকে বেশ হিরো হিরো দেখাবে।’ মন্দাক্রান্তা হাসলেন।

নবকুমার নিজেকে অপরাধী ভাবছিল। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মন্দাক্রান্তাকে সব কথা খুলে বলতে। কেন সে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। কিন্তু এসব বললে তো বড়বাবুর কথা বলতে হবে!

মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘খুব ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে বসে একটু কফি খাই। কিন্তু তোমার ক্ষতি করতে আমি চাই না।’

‘আজ আমরা আউটডোরে যাচ্ছি। দার্জিলিং-এ।’

‘জানি। ট্রেনের এসি থ্রি টিয়ারে যাচ্ছ। ছবি মুক্তি পাওয়ার একবছরের মধ্যে ট্রেনে গেলে যেন এসি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট দিতে বাধ্য হয় প্রযোজক—এই যোগ্যতা তোমাকে অর্জন করতে হবে।’ মন্দাক্রান্তা মাথা নাড়লেন—’এগুলো যে আমি কিনে দিয়েছি, তা কাউকে বললে নিজের ক্ষতি করবে। আশা করি, তোমাকে আমার সঙ্গে চেনাজানা কেউ দেখতে পায়নি। এসো।’

মন্দাক্রান্তার গলার স্বরে এমন একটা আদেশ দেওয়ার ভঙ্গি ছিল যে, নবকুমার সুটকেস নিয়ে হাঁটতে লাগল। অনেকটা হেঁটে করিডোরের শেষপ্রান্তে এসে পিছন ফিরে তাকাল সে, কিন্তু মন্দাক্রান্তাকে দেখতে পেল না। ভদ্রমহিলার প্রতি শ্রদ্ধা যত বাড়ছিল, নিজেকে তত ছোট মনে হচ্ছিল তার। সে প্রতিজ্ঞা করল খুব শিগগির সে বড়বাবুকে এর জবাব দেবে।

শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল ঠিক আটটা পাঁচ মিনিটে। কাঞ্চনকন্যা ট্রেনের থ্রি টিয়ার কামরা খুঁজতেই প্রোডাকশন ম্যানেজার এগিয়ে এল—’এসে গিয়েছ! গুড। তোমার সিট নাম্বার ছয়। উঠে পড়ো। সাড়ে আটটায় ট্রেন ছাড়বে, ন’টায় ডিনার।’

ছ’নাম্বার বার্থ খুঁজে সেখানে সুটকেস রাখতে না রাখতেই সহযাত্রীরা চলে এল। এদের সবাইকে নবকুমার স্টুডিওতে দেখেছে। টেকনিক্যাল লোক। হেয়ার ড্রেসার মহিলা ছাড়াও দুজন মহিলা একটু হেসে অন্যদিকে চলে গেলেন। তার সামনে বসে কমল বলল, ‘এসি ফার্স্ট ক্লাসে যাচ্ছেন সিনিয়র অভিনেতারা। বিদিশাদি, ডিরেক্টর, প্রোডিউসার আর হিরোইন যাবে কালকের ফ্লাইটে।’

পাশ থেকে একজন বলল, ‘হিরোকে এসি ফার্স্ট ক্লাসে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। প্রেস্টিজ বলে একটা কথা আছে।’

নবকুমার মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ট্রেন ছাড়ল। কিছুক্ষণ পরে কমল বলল, ‘চলবে না কি?’

নবকুমার দেখল বাকিদের প্রত্যেকের হাতে প্লাস্টিকের জলের বোতল!

‘জল?’ নবকুমার অবাক হল।

অন্যরা হেসে উঠলেও কমল হাসল না। বলল, ‘ভদকা মেশানো জল। ট্রেনে তো হুইস্কি খাওয়া রিস্কি। একটু চার্জ করে ডিনার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো!’

‘না।’ বেশ জোরে আপত্তি জানাল নবকুমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *