তিন
নবকুমার অবাক হয়ে জিগ্যেস করল,—’কেন?’
বড়বাবু একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘সামনের সিটে উঠে বসো?’
ড্রাইভার নেমে যাওয়ায় সামনের সিটে কেউ ছিল না। নবকুমার আদেশ মান্য করল।
বড়বাবু বললেন, ‘তুমি গ্রামের ছেলে, ধরে নিচ্ছি, কিছুই বোঝো না। কিন্তু এটা তো বোঝো, মন্দাক্রান্তার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আছে, বোঝো তো?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু…!’ নবকুমার ইতস্তত করল।
‘কিন্তু কী?’
‘এই সম্পর্ক কীরকম, তা বুঝতে পারি না।’
‘তোমাকে বুঝতে হবে না।’ বড়বাবু রাগ সামলাতে পারলেন না—’আমি যা বললাম, তাই করবে!’
নবকুমার মুখ নীচু করল। মন্দাক্রান্তা তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন, সে কী করে ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে!
বড়বাবু বললেন, ‘তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, খুব চিন্তায় পড়েছ!’
‘আপনি আমাকে কেন সম্পর্ক না রাখতে বলছেন, তাই বুঝতে পারছি না।’ নবকুমার অকপটে জানাল।
‘মন্দাক্রান্তার মতিগতি আমার ভালো লাগছে না। ওর সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার পর কোনওদিন অবাধ্য হতে দেখিনি। অন্য কোনও পুরুষকে প্রশ্রয় দেওয়া দূরের কথা, তার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহী সে হয়নি। কিন্তু তুমি আসার পর থেকে ওর মনের পরিবর্তন যে হয়েছে, তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। আমি তাকে লালনপালন যা বলো, সব করছি। তোমার জন্য তার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হোক, তা আমি কোনওমতেই চাইব না। তুমি কি এখন আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’ বড়বাবু গম্ভীর গলায় বললেন।
ততক্ষণে সোজা হয়ে বসেছে নবকুমার—’এ আপনি কী বলছেন?’
‘তার মানে?’
‘উনি আমার চেয়ে বয়সে কত বড়, দিদির মতো, আপনি এসব কথা কী করে বলছেন!’ নবকুমার এতক্ষণে প্রতিবাদ করতে পারল।
‘তুমি একেবারেই নাবালক। হৃদয় দুর্বল হলে বয়স নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তা ছাড়া স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বয়সে অনেক বড়, এমন দম্পতির কথা আমাদের জানা আছে। মন মজলে জাত, ধর্ম, বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তা ছাড়া তোমার বয়স কম, দেখতে-শুনতে মন্দ নয়, তোমাকে হাতে রাখলে…’ বড়বাবু মাথা নাড়লেন—’বেশি কথা বলে লাভ নেই। তুমি যদি আমার কথা না শোনো, তা হলে তোমাকে টালিগঞ্জ থেকে চলে যেতে হবে।’
‘চলে যেতে হবে! কোথায়?’ হাঁ হয়ে গেল নবকুমার।
‘তোমার মাথায় কি গোবর ভর্তি? কথা বুঝতে পারছ না? তুমি যাতে আর কোনও ছবিতে কাজ না পাও, তার ব্যবস্থা আমি করব। এই ছবি বন্ধ করতে আমার একমিনিটও লাগবে না। আর যদি কথা শোনো, যদি মন্দাক্রান্তার ছায়া না মাড়াও, তা হলে এই ছবি তো শেষ হবেই, আরও যাতে সুযোগ পাও, তার ব্যবস্থা করব। শোনো নবকুমার, বেঁচে থাকতে গেলে আগে নিজের স্বার্থ দেখতে হয়। সেটা দেখতে শেখো।’ বড়বাবু বললেন।
‘যদি উনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেন!’—নবকুমার তাকাল।
‘কথা বলবে না। জানিয়ে দেবে কথা বলতে তুমি ইচ্ছুক নও।’ বড়বাবু বললেন, ‘এসব অভ্যেস করো। আচ্ছা, তোমার কোনও গার্লফ্রেন্ড নেই, তাই না?’
নীরবে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল নবকুমার।
‘করে ফ্যালো। তুমি আমাদের ছবির নায়িকার সঙ্গে একটু মেলামেশা করো। দেখবে, এই কিন্তু কিন্তু ভাবটা কেটে যাবে। কী ঠিক করলে?’ বড়বাবু এবার গলার স্বর পালটালেন।
‘ঠিক আছে।’
‘কী ঠিক আছে?’
‘আপনি যা চাইছেন, তাই করব।’
‘গুড! তোমার আর কোনও চিন্তা নেই। অন্য যে-কোনও সমস্যায় পড়লে আমাকে বলবে। যাও, ড্রাইভার ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে পাঠিয়ে দাও!’
ভবানীপুরের যে ফ্ল্যাটে নবকুমার আছে, তা শেফালি মায়ের মাসতুতো বোনের সম্পত্তি। শেফালি মা তাঁর কাছ থেকে ভাড়ায় চেয়েছিলেন। কিন্তু মাসতুতো বোন ছেলের কাছে থাকবেন বলে দিল্লি চলে যাচ্ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পরে আর কলকাতায় থাকার ইচ্ছে তাঁর ছিল না, তাই ফ্ল্যাট বিক্রি করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। বোনের সঙ্গে শেফালি মায়ের কথা হয়েছিল—মাস তিনেকের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন ফ্ল্যাট কিনে নেবেন কি না। ওই সময়টা তাঁকে থাকতে দিয়েছিলেন মাসতুতো বোন। তার মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিল।
শেফালি মা এখন মানসিক চিকিৎসালয়ে। মাসতুতো বোন দিল্লিতে চলে যাওয়ার আগে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। জেনেছিলেন, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই। আর সুস্থ হলে বিচার হবে। অনিচ্ছাকৃত হত্যার অপরাধেও জেলে থাকতে হবে বেশ কয়েক বছর। এই পরিস্থিতিতে শেফালি মায়ের জন্য অপেক্ষা করার কোনও মানে হয় না ভেবে তিনি ছেলেকে নিয়ে এলেন ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে।
তখন সন্ধে শেষ হব হব। স্টুডিও থেকে ফ্ল্যাটে ফিরে চুপচাপ শুয়েছিল নবকুমার। আজ যেভাবে বড়বাবু তার সঙ্গে কথা বললেন এবং বাধ্য হয়ে সে যে কথা দিয়ে এসেছে, তা মন না মানলেও মানতে হবে তাকে। এই কলকাতায় বাঁচতে হলে তাকে স্বার্থপর হতেই হবে। যারা এখানে সফল হয়, তারা নিজের স্বার্থের জন্যে সবকিছু করে। যারা পারে না, তারা তলিয়ে যায়।
এইসময় মুক্তো এসে জানাল, শেফালি মায়ের মাসতুতো বোন তাঁর ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে এসেছেন। শোনামাত্র ধড়মড়িয়ে উঠে বাইরের ঘরে এল নবকুমার। এই ভদ্রমহিলাকে সে আগে দ্যাখেনি, শেফালি মায়ের কাছে কথা শুনেছে। সে নমস্কার করতেই ভদ্রমহিলা জিগ্যেস করলেন—’আপনিই নবকুমার?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, কিন্তু আমাকে ”তুমি” করে বলবেন।’
‘এ আমার ছেলে শৈবাল। দিল্লিতে চাকরি করে।’
‘হ্যাঁ, শেফালি মায়ের কাছে ওঁর কথাও শুনেছি।’ নবকুমার বলল।
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘তুই যা বলার বল।’
শৈবাল বলল, ‘শুনুন ভাই! মা শেফালিমাসিকে এই ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছিলেন, কারণ, শেফালিমাসি ফ্ল্যাটটা কিনে নেবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন যা যা ঘটে গিয়েছে, তাতে শেফালি মাসির পক্ষে আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। আমরা যখন এই শহর ছেড়ে যাচ্ছি, তখন ফ্ল্যাটটাকে বিক্রি করে দিতে চাই। শেফালি মাসি আপনাকে এখানে থাকতে দিয়েছিলেন। এখন তো সেটা সম্ভব নয়।’
নবকুমার বলল, ‘আপনারা আমাকে কী করতে বলছেন?’
শৈবাল বলল, ‘বুঝতেই পারছেন, আমরা যাঁকে বিক্রি করব, তিনি খালি ফ্ল্যাট চাইবেন। একজনের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে। তিনি সামনের রবিবার দেখতে আসতে চাইছেন। আপনি তার আগে অন্য কোথাও শিফট করে গেলে ভালো হয়।’
‘কোথায় যাব?’ নিজেকেই প্রশ্ন করল নবকুমার। উত্তর পেল না।
শৈবাল বলল, ‘শেফালিমাসি আপনাকে নিশ্চয়ই খুব স্নেহ করতেন, নইলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করতেন না। আচ্ছা, আপনার সঙ্গে ওঁর কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল?’
মাথা নাড়ল নবকুমার। ‘না! আমি গ্রাম থেকে এসে যাত্রাদলে চাকরি পেয়েছিলাম, সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তারপর…’ নবকুমার থেমে গেল।
শৈবাল বলল, ‘আমরা যতদূর জানি, শেফালিমাসির কোনও আত্মীয় তাঁর সঙ্গে থাকতেন না। ওঁর জীবনযাপনের জন্য একমাত্র মা ছাড়া আর কেউ ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইত না। যা হোক, উনি এই ফ্ল্যাট কিনতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চয়ই জানেন?’
‘হ্যাঁ।’
শৈবাল তার মায়ের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘শেফালিমাসির এখন যা মানসিক অবস্থা, তাতে এসব কথা তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা অপেক্ষা করতে চাই না। তা হলে আপনি রবিবারের মধ্যে খালি করে দিন।’
শৈবালের মা বললেন, ‘শুনেছি আপনি সিনেমার নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছেন। দিদির কথা ভেবে আপনাকে না হয় কিছুটা কম দামে এই ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারি। আপনার পক্ষে কি কেনা সম্ভব?’
‘কত টাকা দিতে হবে?’
শৈবাল বলল, ভবানীপুরের এই অঞ্চলে হাজার স্কোয়ার ফিট ফ্ল্যাটের দাম কী হতে পারে, তা কি আপনার ধারণায় আছে?’
‘না।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘খবর নিয়ে দেখুন।’ পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে কিছু লিখে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা আমাদের কলকাতার টেলিফোন নাম্বার। আমি বাড়িতে না থাকলেও মা থাকবে। যদি কিনতে পারেন, তা হলে কাল বিকেলের মধ্যে ফোন করবেন। না পারলে কখন ফ্ল্যাট ছেড়ে যাবেন, তা জানাবেন, আমি সেসময় আসব। চলো মা।’
ওঁরা চলে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ বসে থাকল নবকুমার। এই ফ্ল্যাট কেনার বিন্দুমাত্র সামর্থ্য তার নেই। অতএব একটা জায়গা দরকার, যেখানে থাকা যায়। কলকাতায় নিশ্চয়ই কোনও-না-কোনও মেসে একটা ঘর পেয়ে যেতে পারে। ঠিক তখনই মনে হল, মুক্তোর কথা। মুক্তো কোথায় যাবে? শেফালি মায়ের বাড়ি তো পুলিশ তালা দিয়ে রেখেছে। মুক্তোর কি কোথাও থাকার জায়গা আছে?
নবকুমার বাইরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে এল। মুক্তো তখন কাপে চা ঢালছে। সেটা লক্ষ করে নবকুমার বলল, ‘ওঁরা চলে গিয়েছেন, চায়ের দরকার নেই।’
‘ওমা, চলে গিয়েছেন। ইস, এতটা চা কে খাবে?’ মুক্তো বিব্রত।
‘কেউ খাবে না। ফেলে দাও!’
‘তোমরা চট করে ফেলে দিতে পারো, আমার ফেলতে খুব খারাপ লাগে।’
মুক্তো বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কী ছিল।’
নবকুমার তাকাল। তারপর জিগ্যেস করল,—’আচ্ছা, কলকাতায় তোমার আর কেউ থাকে?’
মানা নাড়ল মুক্তো—’থাকলে কি এই দশা হয় আমার!’
নবকুমার আর কথা বাড়াল না। ঘরে ফিরে এসে সে ভেবে কূল পাচ্ছিল না। কোনও মেসে নিশ্চয়ই মুক্তোকে থাকতে দেবে না। হঠাৎ বড়বাবুর বলা কথাটা মনে পড়ল। বড়বাবু বলেছিলেন, ‘অন্য যে-কোনও সমস্যায় পড়লে আমাকে বলবে!’
পরের দিন স্টুডিওর গাড়ি সকাল আটটায় এল। সাড়ে আটায় কল টাইম। গাড়িতে উঠে নবকুমার ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল—’আপনার মোবাইলটা পেতে পারি!’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’ ড্যাশবোর্ডের ওপর থেকে যন্ত্রটা তুলে ড্রাইভার জিগ্যেস করল—’আপনারটায় চার্জ নেই বুঝি! দিন, গাড়িতেই চার্জের ব্যবস্থা আছে!’
যন্ত্রটা হাতে নিয়ে নবকুমার বলল, ‘আমার কোনও মোবাইল নেই।’
‘যাঃ। এটা হতে পারে না!’ গাড়ি চালাতে চালাতে ড্রাইভার বলল।
‘কেন হতে পারে না?’
‘আমার মতো একটা ড্রাইভারের মোবাইল আছে, আর আপনার মতো হিরোর নেই, একথা কেউ বিশ্বাস করবে? ওই দেখুন, ফুটপাতে যে বাচ্চা মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছে, তার হাতেও মোবাইল আছে।’ ড্রাইভার হাসল।
নবকুমার গম্ভীর হল। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট কাগজটা বের করল। এই কাগজে সে যে-কয়েকটা মানুষের নাম্বার লিখে রেখেছে, তার মধ্যে বড়বাবুর নাম্বারও আছে। সে নাম্বারটা দেখে দেখে বোতাম টিপল।
ওপাশে ফোন বাজছে। যন্ত্রটা কানে চেপে নবকুমার যখন বড়বাবুর গলা শুনতে উন্মুখ, ঠিক তখনই বাজনা থামল এবং একজন মহিলা প্রশ্ন করলেন—’কে বলছেন?’
সে কি ভুল নামবার টিপেছে! স্ক্রিনে নাম্বার দেখার চেষ্টা করল সে। মহিলা বিরক্ত হয়ে গলা তুললেন—’হ্যালো! কে কথা বলছেন?’
‘আজ্ঞে, আমি…’
‘আজ্ঞে?’ খিলখিলিয়ে হাসলেন মহিলা। তারপর জিগ্যেস করলেন—’আজ্ঞে, আপনি কে?’
‘আমি নবকুমার। এটা কি বড়বাবুর ফোন?’
‘নবকুমার?’ মাই গড। আপনি কি বাবার ছবির নতুন নায়ক?’ চাপা গলায় জিজ্ঞাসা।
গলা শুকিয়ে গিয়েছিল নবকুমারের। বলল, ‘হ্যাঁ, ওঁকে ফোনটা দেবেন!’
‘নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু আপনি ”আজ্ঞে” বলছেন কেন? এককালে বাংলা সিনেমার কাজের লোকরা ”আজ্ঞে” বলত। আমি কে বুঝতে পারছেন?’
‘না।’
‘আপনার মাথায় কি ওই ”আজ্ঞে” ছাড়া কিছু নেই? একটু আগে তো বললাম, বাবার ছবি। তার মানে, আমি আপনাদের বড়বাবুর মেয়ে। আপনি দেখছি একটা আস্ত টিউবলাইট। বাবা, এখন স্নান করতে গিয়েছেন। আধ ঘণ্টা। তারপর ঠাকুরঘরে টাইম পাস করবেন। সেটাও আধ ঘণ্টা। অতএব জরুরি কথা থাকলে আমাকে বলতে পারেন, আমি উগরে দেব!’ বড়বাবুর মেয়ে বললেন।
‘না, থাক। ওঁকে শুধু বলবেন আমি ফোন করেছিলাম।’
‘তা বলব। আচ্ছা, আপনার মাথায় কি ভাইরাস ঢুকেছে?’
‘তার মানে?’
‘এতক্ষণ কথা বললাম অথচ নাম জানতে চাইলেন না?’
‘আমার কাছে আপনি বড়বাবুর মেয়ে। নমস্কার।’ যন্ত্রটা বন্ধ করে যেন বেঁচে গেল সে।
আজ নিবারণ গুপ্ত আসেননি। ওঁর সহকারী কমল মেক-আপ করছিল। বলল, ‘দাদার শরীর ভালো নেই। ভাবতে পারেন, এতটা বয়স হয়েছে, অথচ উনি হোমিওপ্যাথি ওষুধই খাবেন। অ্যালোপ্যাথি কখনও খাননি। আচ্ছা বলুন তো, সব অসুখ কি হোমিওপ্যাথিতে সারে?’
‘আমি ঠিক জানি না। কিন্তু আজ কী হয়েছে ওঁর?’
‘কী হয়েছে, তা বললেন না। শুয়ে আছেন। বললেন শরীর ভালো নেই, তুমি চালিয়ে নাও।’ কমল বলল।
‘উনি কোথায় থাকেন?’
‘এই তো কাছেই, কুঁদঘাটে?’
মেক-আপ শেষ হতেই গীতিময়ের ঘরে ডাক পড়ল তার। সেখানে যেতেই গীতিময় বিরক্ত গলায় বললেন, ‘এতদিন কলকাতায় আছ, একটা মোবাইল কিনতে পারোনি? প্রোডাকশন ম্যানেজারকে বলছি কিনে দিতে।’
‘কী হয়েছে?’
‘বড়বাবু ফোন করেছিলেন। দাঁড়াও।’ মোবাইলের নাম্বার টিপে কানে চেপে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘রিং হচ্ছে, ধরো।’
যন্ত্রটা কানে চাপতেই বড়বাবুর গলা শুনল নবকুমার—’এসেছে সে?’
‘হ্যাঁ। আমি নবকুমার।’
‘কেন ফোন করেছিলে?’
নবকুমার গীতিময়ের দিকে তাকাল। গীতিময় ততক্ষণে স্ক্রিপ্টে নজর বোলাচ্ছেন।
‘খুব সমস্যায় পড়েছি।’ নবকুমার গলার স্বর করুণ করার চেষ্টা করল।
‘আবার কী হল? মন্দাক্রান্তা যোগাযোগ করেছিল?’
‘না, না। ভবানীপুরের যে ফ্ল্যাটে শেফালি মা আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন, তার মালিক ওঁর মাসতুতো বোন। ওঁরা কাল এসে বলেছেন, সামনের রবিবারের মধ্যে উঠে যেতে। ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেবেন।’ নবকুমার বলল।
‘অ। ওটা শেফালির ফ্ল্যাট নয়?’
‘না।’
‘কত দাম চাইছে?’
‘মানে?’
‘কত দাম পেলে বিক্রি করবে?’
‘আজ্ঞে, সেসব কথা হয়নি। আমার তো কেনার ক্ষমতা নেই।’
‘তা হলে মেসেটেসে গিয়ে থাকো!’
‘তাই যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু মুক্তো কোথায় যাবে? ওর তো যাওয়ার জায়গা নেই!’
‘গুড! আমি ভেবে বলব। শনিবারের মধ্যেই জানতে পারবে।’ বড়বাবু বললেন, ‘আর একটা কথা, সকাল দশটার আগে আমাকে ফোন করবে না। আর বাই চান্স অন্য কেউ যদি ফোন ধরে, তা হলে কথা না বলে লাইন কেটে দেবে। মনে রেখো।’
