ক্যালকাতায় নবকুমার – ১৩

তেরো

মানুষ খেতে পারে না, এমন কোনও খাবার আছে? নবকুমার ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছে গরু, ছাগল থেকে পাখিরা পর্যন্ত তাদের পছন্দের খাবার না পেলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু আজ ঊর্মিলা-র নির্দেশে বেয়ারা যে খাবার এনেছিল, তা সে জীবনে খায়নি। খাওয়ার কথা ভাবেওনি। এক গ্লাস করলার জুস, হাঁসের ডিমের কুসুম ছাড়া সাদা অংশের জলপোচ, একটা আপেলের অর্ধেক টুকরো এবং চিনি-দুধ ছাড়া গ্রিন টি। ঊর্মিলা নিজেও ওই খাবার নিয়েছিল। বলেছিল, ‘করলার জুস নিয়মিত খেলে, শরীর চট করে অসুস্থ হয় না। আর এই যে হাঁসের ডিমের সাদা অংশ, এটার উপকারিতা জানেন? সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, এটা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে এবং শরীরকে ক্যানসারমুক্ত রাখে। আপেল বা শসা আপনার পেট ভরিয়ে রাখবে আর এই চা আপনাকে এনার্জি দেবে।’

‘আপনি দু-বেলা এই খান?’

‘দিনে বা রাতে কখন খাচ্ছি, তারওপর মেনু বদলে যায়। দেখুন, সিনেমার নায়িকা শরীরের ব্যাপারে সতর্ক না হলে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবে। দার্জিলিং-এ আসার আগে তামিল ছবির এক পরিচালক দেখা করতে এসে, আমার ফিগারের যা প্রশংসা করলেন, তা শুনে কান লাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছবিটা করা হবে না।’ ঊর্মিলা বেশ দুঃখিত গলায় কথাগুলো বলল।

‘কেন?’ একঢোক করলার জুস গলায় ঢালতেই জলের গ্লাস টেনে নিতে হল।

‘প্রথমত, আমি তামিল বলতে জানি না। বলছে রোমানে লিখে দেবে, পরে অন্য মেয়েকে দিয়ে ডাব করিয়ে নেবে। সাপ-ব্যাং কী বলছি, তা নিজেই জানব না। দ্বিতীয়ত, আচ্ছা, আপনি তামিল ছবি দ্যাখেন?’ চোখের কোণে তাকাল ঊর্মিলা।

‘না! কোথায় হয়, তা-ই জানি না।’

‘টিভিতে দেখায়, সিনেমা হল-এ তামিল ছবি চলে। আসলে আপনার আগ্রহ নেই।’

কথাটা অস্বীকার করল না নবকুমার। গ্রামে থাকার সময় ইংরেজি ছবি সিনেমা হল-এ বছরে দু-একবার দেখানো হত, তামিলে তো প্রশ্নই ওঠে না। সে মাথা নাড়ল।

‘তামিল ছবির সমস্যা কী জানেন?’—ঊর্মিলা বলল, ‘আগে ওদের নায়িকারা একটু মোটাসোটা হত, হিপ ভারী না হলে নায়িকাদের ডিমান্ড কমে যেত। এখন তার জায়গায় এসেছে—যার শরীর যত সুন্দর হবে, আই মিন ফিগার, তার তত ডিমান্ড। একটা স্নানের দৃশ্য থাকবেই। সেটা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অথবা নদী বা সমুদ্রে। তা না হলে অন্তত বাথরুমে শাওয়ারে নীচে। আমি রাজি হলাম না।’

‘ও। কী বললেন?’

‘বলে দিলাম, আমি অভিনয় করতে চাই, শরীর বিক্রি করতে নয়। কি, ঠিক বলিনি?’ ঊর্মিলা চোখ বড় করে তাকাল।

হ্যাঁ, বলা উচিত বলে মনে হল নবকুমারের। কিন্তু তার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ঊর্মিলা বলল, ‘আপনি মাত্র একবার জুসে চুমুক দিয়েছেন।’

‘খুব তেতো!’ করুণ মুখে বলল নবকুমার।

‘তেতো বলেই তো আপনার শরীরের ভেতরটা পরিষ্কার করবে।’ ঊর্মিলা হাসল—’আপনি যদি নায়ক হিসেবে সাফল্য পেতে চান, তা হলে খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এই যে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান—এঁদের খাবারের মেনু যদি দ্যাখেন, তা হলে বুঝতে পারবেন, ওঁরা কতখানি ত্যাগ করে চলেছেন ভালো কাজ করার জন্য। নবকুমার, গীতিময়দা বলছিলেন, আপনার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। বাংলা ছবিতে ভালো নায়কের খুব অভাব। আপনার সামনে তাই সুযোগ রয়েছে। নিন, খেয়ে নিন। দেখুন, আমিও খাচ্ছি।’

ঊর্মিলা করলার জুস ভর্তি গ্লাস তুলে দুই চুমুকে অনেকটা কমিয়ে ফেলল—’আজ আপনার মনে হচ্ছে খুব তেতো। কালও তাই মনে হবে। যদি প্রতিদিন খেয়ে যান, তা হলে সাতদিন পরে এতটা তেতো মনে হবে না। মাসখানেক পরে আপনি করলার জুস না আপেলের জুস খাচ্ছেন, তা বুঝতে পারবেন না। নিন।’

কোনও খাবার বা পানীয় খেতে এত কষ্ট নবকুমার কখনও করেনি। কুসুম ছাড়া ডিম সে এই প্রথমবার খেল। মনে হল, সে ওষুধ খাচ্ছে। আপেলের টুকরো ভালো, কিন্তু ঊর্মিলা-র অর্ডার দেওয়া গ্রিন টি তো প্রায় করলার জুসের কাছাকাছি। এই খেয়ে কেউ বাঁচতে পারবে? ক’দিন বাঁচবে?

খাওয়া শেষ করে ঊর্মিলা বলল, ‘পকেটে হাত দেবেন না। আমি পে করব।’

কিন্তু বিল যা এল, তাতে দিব্যি ভাত-মাছ-তরকারি খাওয়া যেত! সেকথা বলতে শব্দ করে হেসে উঠল ঊর্মিলা—’সপ্তাহে একদিন। ছোট বাটির আধবাটি ভাত বা দুটো হাতে গড়া রুটি আর ডাল। হ্যাঁ, মাসে আটবার চিকেন খেতে পারেন স্ট্যু করে। কিন্তু জিমে যেতে হবে প্রতিদিন। তা হলেই দেখবেন, আপনার ফিগার দেখে অন্য অভিনেতাদের চোখ টাটাচ্ছে। নবকুমার, কষ্ট করলে তবেই কেষ্ট পাবেন। আপনার ওপর আমার আস্থা আছে।’

‘আমার ওপরে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তা হলে আমি আপনার ওপর ভরসা করতে পারি?’ সোজা হল নবকুমার।

‘অফকোর্স!’

‘জানেন, আমার বাবা আত্মহত্যা করতে পারেন।’ নবকুমার নিজেই বুঝতে পারল না, তার মুখে অসহায় অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে।

‘সে কী! কেন?’ অবাক হল ঊর্মিলা।

‘ওই যে তখন বললাম।’ চোখ বন্ধ করল নবকুমার।

‘আমি বুঝতে পারছি না।’ ঊর্মিলা ধন্দে পড়ল।

‘ওই যে বিদিশা-র সঙ্গে…’

‘আর যোগাযোগ না রাখলেই হয়। ও চাইলে আপনি এড়িয়ে যাবেন।’

‘না, না, যোগাযোগের ব্যাপার নয়।’

‘তা হলে?’

‘ওই যে, ও যেভাবে চুমু খেল, তা সিনেমায় দেখলে বাবা সহ্য করতে পারবে না। নির্ঘাত আত্মহত্যা করবে। উঃ।’ ঠোঁট কামড়ল নবকুমার। এখন ঊর্মিলার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, তার বলার ধরনে কাজ হয়েছে।

‘তাই?’

‘হ্যাঁ। আপনি পিতৃহত্যার পাপ থেকে আমাকে রক্ষা করুন।’

‘কী করে করব?’

‘আপনি নামকরা নায়িকা। আপনার কথা গীতিময়দা তো বটেই, বড়বাবুও ফেলতে পারবেন না। আপনি ওঁদের বলুন দৃশ্যটা সিনেমা থেকে বাদ দিতে।’

‘ওহ। কিন্তু ওঁরা যদি বলেন দৃশ্যটা প্রয়োজনীয়। বাদ দিলে ব্যবসা মার খাবে!’

‘তা হলে বলবেন, মেয়ে ভিলেনের সঙ্গে ওই দৃশ্য দেখলে দর্শকরা নায়ককেই খারাপ ভাববে। নায়ক-নায়িকার মধ্যে যা হলে স্বাভাবিক হত, তা কি মেয়ে ভিলেনের সঙ্গে দর্শক মেনে নেবে? প্লিজ, আপনি বোঝালে ওঁরা বুঝবেন।’

‘ঠিক আছে। আপনি যখন এত করে বলছেন, তখন আমি বলে দেখব।’ ঊর্মিলা এবার হাসল—’সত্যিই তো, এই ছবিতে নায়ক-নায়িকার কোনও ইন্টিমেট দৃশ্য থাকছে না!’

খুশি হল নবকুমার। ঊর্মিলা ‘এক্সকিউজ মি’ বলে টয়লেটে চলে গেলে তার মনে হল, ঊর্মিলা উদ্যোগী হলে, দৃশ্যটা বাদ যাবেই। তা হলে তার কোনও সমস্যা থাকবে না। কিন্তু আজ যেভাবে সে ঊর্মিলাকে অনুরোধ করল, তা করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলছে। সাধারণত সে ওই ভঙ্গিতে কারও সঙ্গে কখনও কথা বলে না, বলেনি। প্রাণকৃষ্ণদা বলেন, ‘যখন তুমি সংলাপ বলবে, তখন চরিত্রটার যেভাবে কথা বলা উচিত, সেইভাবে বলবে। তখন নবকুমারের নিজস্ব বাচনভঙ্গির ব্যাপারটা একদম ভুলে যাবে।’ এখন মনে হচ্ছে, ঊর্মিলা-র মন পাওয়ার জন্য সে একজন করুণাপ্রার্থীর ভূমিকায় অভিনয় করেছে। তখন নবকুমারের মধ্যে সে ছিল না।

গাড়ির ড্রাইভার বলল যে, সে শুনেছে পাঙ্খাবাড়ির রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ায় গাড়ি চলাচল আপাতত বন্ধ রয়েছে। ঊর্মিলা তাকে আগের রাস্তা ধরতে বলল। তারপর নবকুমারের দিকে তাকাল—’একটু বেশি সময় লাগবে, কিন্তু এই রাস্তায় যাওয়া অনেক নিরাপদ। দার্জিলিং-এ যাতায়াতের এটাই একমাত্র রাস্তা ছিল।’

‘পৌঁছোতে আমাদের দেরি হয়ে যাবে না তো?’

‘হলে হবে।’ হাসল ঊর্মিলা।

অবাক হয়ে তাকাল নবকুমার। কী বলছে ঊর্মিলা!

‘ধরুন, আমাদের পৌঁছোতে দেরি হয়ে গেল, রাতটা এখানকার কোনও হোটেল বা বাংলোয় কাটাতে হল। আমি আর আপনি। আপত্তি আছে?’

হঠাৎ নবকুমারের মনে হল, তাকে স্মার্ট হতেই হবে। গ্রামের ছেলের মতো নার্ভাস হলে চলবে না। সে হেসে বলল, ‘স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।’

চোখ ছোট হয়ে গেল ঊর্মিলা-র—’মানে?’

‘আমি ভাবতেই পারছি না, এমন কথা শুনতে পাব!’

‘তাই?’ হাসল ঊর্মিলা—’স্বপ্ন কেন? বাস্তব হলে দোষ কী? কিন্তু জানেন নবকুমার, এই কথাটা আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি। আপনাকে বললাম কারণ, আমি ভেবেছিলাম আপনি খুব ঘাবড়ে যাবেন। নার্ভাস হয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি সেরকম হলেন না। উলটে স্মার্ট হয়ে ফিল্মের অভিনেতার মতো ডায়ালগ বললেন। আমি ভুল ভেবেছিলাম।’ ঘড়ি দেখল ঊর্মিলা—’নাহ। আমরা ঠিক সময় পৌঁছে যাব।’

কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না নবকুমার। প্রাণকৃষ্ণদা বলেন, ‘সবাইকে সব চরিত্রে মানায় না। উত্তমকুমার অনেক বড় অভিনেতা, কিন্তু ”সাড়ে চুয়াত্তর”-এর তুলসী চক্রবর্তী-র চরিত্রে দর্শক কখনওই মেনে নিতে পারত না। এই ধরো ”খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন”-এর ”রাইচরণ”-এ যত ভালো কাজ করে থাকুন, দর্শক বলেছে, মানায়নি। আবার ”নায়ক” ছবিতে ওঁকে ছাড়া ভাবাই যাবে না। তোমার ভাগ্য ভালো, প্রথম ছবিতে একটি সরল গ্রাম্য যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করছ। তোমাকে যদি কলকাতার কোনও চালু ছেলের চরিত্র দেওয়া হত, তা হলে…’ হেসেছিলেন প্রাণকৃষ্ণদা—’ওটা ধীরে ধীরে রপ্ত করে নিতে পারবে। অবশ্য যদি চেষ্টা থাকে।’

নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির গেট পেরিয়ে গেল। কিন্তু নবকুমার সেসব দেখছিল না। তার মনে হচ্ছি, সে ধরা পড়ে গিয়েছে। ঊর্মিলা বুঝতে পেরেছে, সে অভিনয় করেছে। মুখ নীচু করে বসে রইল নবকুমার। ঊর্মিলা তখন বাঁদিকের জানলার বাইরের পৃথিবী দেখছে।

আউটডোর থেকে ফেরার পর, দিনসাতেক শুটিং ছিল না। এই ক’দিন শুয়ে-বসে কাটিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনও কাজ নেই। ঊর্মিলা তার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি, বিদিশাও নয়। নবুকমার বুঝল, এটাই নিয়ম। শুটিং-এর সময়, বিশেষ করে আউটডোরে গিয়ে যতই ঘনিষ্ঠতা হোক, ফিরে আসার পর যে যার গুহায় ঢুকে পড়ে। আউটডোরের ঘনিষ্ঠতার কথা মনে না-রাখাই বোধ হয় নিয়ম।

বড়বাবুকে ফোন করল নবকুমার—’আমি কি কয়েকদিনের জন্য গ্রামে যেতে পারি? শুনলাম সাতদিন কোনও কাজ নেই?’

‘তোমার সঙ্গে কথা বলব ভাবছিলাম, ভালোই হল, ফোন করেছ।’ বড়বাবু বললেন, ‘তুমি দুপুর আড়াইটে নাগাদ এনটিওয়ান-এ চলে এসো।’ ফোন রেখে দিলেন বড়বাবু।

ফাঁপড়ে পড়ল নবকুমার। বড়বাবু গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে কোনও কথাই বললেন না। উলটে তিনি কিছু বলার কথা ভেবেছেন বললেন। আবার কী সমস্যা হল? কলকাতার মানুষদের মতিগতি সে এখনও বুঝতে পারল না।

সে ফিরে আসায় মুক্তো খুব খুশি। এই ক’দিনে কী কী ঘটেছে, তা সবিস্তারে বলে গিয়েছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই ফ্ল্যাটে মন্দাক্রান্তা এসেছিলেন। অনেকক্ষণ গল্প করেছেন। মন্দাক্রান্তা মুক্তোকে জানিয়েছেন, শেফালি মা আগের থেকে এখন অনেক ভালো আছেন। চিকিৎসায় তাঁর মানসিক উন্নতি হয়েছে। এভাবে চললে মাস দুয়েকের মধ্যে আদালতে মামলা শুরু হতে পারে। মুক্তো মন্দাক্রান্তাকে অনুরোধ করেছিল, শেফালি মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করিয়ে দিতে। মন্দাক্রান্তা কথা দেননি। মুক্তো নবকুমারকে বলল, ‘তুমি যদি ওঁকে বলো, তা হলে ভালো হয়।’

খুব ইচ্ছে হচ্ছিল নবকুমারের। দার্জিলিং-এ যাওয়ার আগে মন্দাক্রান্তা তাকে দামি গরম জ্যাকেট কিনে দিয়ে খুব উপকার করেছিলেন। একদিন মনস্থির করতে সময় নিয়েছিল সে। আজ যখন ঠিক করল মন্দাক্রান্তাকে ফোন করবে, ঠিক তখনই বড়বাবু তাকে দেখা করতে নির্দেশ দিলেন। বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলার আগে মন্দাক্রান্তাকে ফোন করা ঠিক হবে না। বড়বাবু যদি জিজ্ঞাসা করেন, তা হলে সে চট করে মিথ্যে বলতে পারবে না।

ঠিক সোয়া দুটোর সময় স্টুডিওতে পৌঁছে গেল সে। ভিতরে ঢুকতেই কমলের সঙ্গে দেখা। কমল এগিয়ে এল—’শুনেছেন?’

‘কী?’

‘কাকা হাসপাতালে আছেন। আমরা যখন আউটডোরে ছিলাম, তখনই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। কন্ডিশন খুব খারাপ।’ কমল বিমর্ষ।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল খানিকটা সময়। তারপর জিজ্ঞাসা করল—’নিবারণদার জ্ঞান আছে তো?’

‘আসছে-যাচ্ছে।’ কমল বলল।

‘কোথায় আছেন?’

‘বাঙ্গুরে। আইসিইউ-তে রেখেছে। দূর থেকে দেখতে দিচ্ছে।’

কমল চলে গেল। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। নবকুমার ঠিক করল, আজ বিকেলে হাসপাতালে যাবে।

অফিসঘরে বসে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন বড়বাবু। তাকে দেখে ভদ্রলোককে চলে যেতে বললেন। নবকুমার ভেতরে এল।

বড়বাবু তাকালেন—’তোমার পেটে কর্পোরেশনের জল দেখছি চমৎকার কাজ করছে। আমার সঙ্গেও চালাকি করতে সাহস পাচ্ছ তাই।’

‘আপনি কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’

‘বসো।’ বড়বাবু ইশারা করলেন বসতে—’এখানে লোকে মই ধরে ওপরে ওঠার জন্য। এতদিন জানতাম, মন্দাক্রান্তাকে ধরে সেই কাজটা করছিলে। এখন দেখছি, মই পালটে ফেলেছ। আচ্ছা, তোমার কী করে মনে হল, ঊর্মিলা অনুরোধ করলেই আমি গদগদ হয়ে তোমার আর বিদিশা-র কিসিং সিনটা ছবি থেকে বাদ দেব? তুমি আমাকে কী ভাবো?’ বেশ চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন বড়বাবু।

নবকুমার গুটিয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল, তার মধ্যে মাস্টারদার সঙ্গে কলকাতায় প্রথম আসা গ্রামের ছেলেটা ফিরে এসেছে।

‘যেতে দাও।’ শ্বাস ফেললেন বড়বাবু—’তুমি কি নিবারণের অসুখের খবর শুনেছ? খুব গুণী মানুষ।’

‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।

ড্রয়ার থেকে একটা প্যাকেট বের করে গলার স্বর খাদে নামালেন বড়বাবু—’আমি চাই না পৃথিবীর কেউ জানুক। এই খামে কুড়ি হাজার টাকা আছে। নিবারণের চিকিৎসার খরচ হিসেবে ওর বাড়িতে দিয়ে আসবে। আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি। এই টাকার ব্যাপারটা আর কাউকে বলবে না। ওদেরও বলবে না যে, আমি দিচ্ছি।’

‘তা হলে কী বলব?’

‘বলবে তুমি দিচ্ছ। তুমি তো রোজগার করছ। তাড়াতাড়ি পকেটে ঢোকাও।’ বড়বাবু প্যাকেট এগিয়ে ধরলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *