ক্যালকাতায় নবকুমার – ১০

দশ

বিদিশা ঘুরে বসল। নবকুমারের মুখের দিকে তাকাল। তারপর আচমকা দু-হাতে ওর গলা জড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চোখ বন্ধ করল।

জীবনে এই প্রথমবার কোনও যুবতীর ঠোঁটের স্বাদ-গন্ধ পেয়ে শিহরিত হল নবকুমার। কী অপূর্ব অনুভূতি! সে চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলতেই মুখ সরাল বিদিশা। ওপাশের দর্শকদের কেউ লম্বা সিটি বাজাল। নবকুমার যেন ঘোরের মধ্যেই বলল, ‘তুমি কেন মদ খাও?’

চমকে গেল বিদিশা। তার চোখ ছোট হল। নবকুমার এত নীচু স্বরে কথাগুলো বলেছিল যে, সে ছাড়া কেউ শুনতে পায়নি। বিদিশা তার সংলাপ ভুলে গেল।

‘কাট কাট কাট। কী হল বিদিশা? চমৎকার যাচ্ছিল, তুমি এমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলে কেন? সংলাপটা কে বলবে?’ চিৎকার করলেন গীতিময়।

সম্বিত ফিরে পেল বিদিশা। সোজা হয়ে বসে বলল, ‘সরি।’

‘নবকুমারের মুখে কি দুর্গন্ধ ছিল?’ গীতিময় জিজ্ঞাসা করলেন।

‘না।’ গম্ভীর গলায় বলল বিদিশা।

ক্যামেরা থেকে মাথা সরিয়ে বিজন রায় বললেন, ‘নবকুমারের ঠোঁট কিস-এর পরে নড়ছিল। মনে হল, কিছু বলছে!’

‘অ্যাঁ! বিদিশা, নবকুমার কী বলছিল?’ গীতিময় জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আমি শুনতে পাইনি।’ বিদিশা বলল।

‘নবকুমার, যা বলছি, তাই করবে। আর ঠোঁট নাড়বে না। নাউ, রিটেক। তৈরি হও তোমরা। বিদিশা চুমুটা যেন বেশ আবেগের সঙ্গে হয়। আর কেউ সিটি বাজাবে না। ওকে? স্টার্ট, ক্যামেরা, অ্যাকশন।’

একইভাবে বিদিশা নবকুমারের দিকে ফিরল। এবার তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। তারপর ওর গলা জড়িয়ে ধরে যেন আকণ্ঠ চুম্বন করল। নবকুমারের মনে হল, এই চুম্বন আগের থেকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। তারপর ধীরে-ধীরে মুখ খানিকটা সরিয়ে নিল। গলা থেকে হাত না সরিয়ে বলল, ‘হয়েছে তো? খুশি? এবার আমাকে মুক্তি দাও। প্লিজ।’ বুঝেছ?’

গীতিময় সোল্লাসে চিৎকার করলেন,—’গ্র্যান্ড। দারুণ! কাট কাট। বিজন ক্যামেরা উলটো অ্যাঙ্গেলে নিয়ে যাও।’

গীতিময় এগিয়ে এসে হাত বাড়ালে বিদিশা সেই হাতে হাত রাখল। গীতিময় বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ বিদিশা।’

বিদিশা বলল, ‘শুধু আমাকে বলছেন কেন? নবকুমার ওইরকম এক্সপ্রেশন না দিলে আমি সিনটা জাস্টিফাই করতে পারতাম না।’

এবার বড়বাবু এগিয়ে এলেন—’তা হলে হিরোর রোলে আমার সিলেকশন খারাপ হয়নি, বলো? আচ্ছা, আমি এখন যাচ্ছি, তোমরা কাজ শেষ করো।’ বেশ হাসি হাসি মুখ নিয়ে বড়বাবু গাড়িতে উঠলেন।

শুটিং শেষ হল সেদিনের মতো। আলো কমে আসছিল দ্রুত। গাড়িতে ফিরে আসার সময় নবকুমার বলল, ‘দাদা, আমি এখানে নামতে পারি?’

‘ম্যালে? ঠিক আছে। কাল আবার ভোর পাঁচটায়।’

গাড়ি চলে গেলে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল নবকুমার। তার মনে যে ঘোর লেগেছিল, তা এখনও যায়নি। বিদিশা-র প্রথম চুম্বনে যতটা হয়েছিল, দ্বিতীয়বারের পর তা অনেকগুণ অন্যরকম রোমাঞ্চে শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, প্রথমবারে বিদিশা নেহাতই অভিনয় করেছিল, দ্বিতীয়বারে যেন অতিরিক্ত আন্তরিক ছিল। কেন? মদ খাওয়ার ব্যাপারে কথা বলেছিল বলে? আচ্ছা, সে ওইসময় কেন জিজ্ঞাসা করতে গেল? বিদিশা মদ খায় তার ইচ্ছে হয় বলে। সে জিজ্ঞাসা করার কে? নিজেকে কীরকম বোকা বোকা মনে হচ্ছিল তখন।

নবকুমার খানিকটা হেঁটে ম্যালের মুখে পৌঁছে গেল। ট্যুরিস্টদের ভিড় জমেছে চারপাশে। রংবেরঙের গরম পোশাক পরে তারা পুতুলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। নবকুমার দেখল কেউ কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে বটে, কিন্তু কোনও গুরুত্ব দিচ্ছে না। দিতে হবে, একদিন ওরা দেবেই। সে যখন বাংলা ছবির বিখ্যাত নায়ক হবে, তখন এই ম্যালে এসে দাঁড়াবে, তার সামনে ভিড় করবে এই জনতা।

ম্যালে না দাঁড়িয়ে লাডেন লা রোড দিয়ে হেঁটে গেস্ট হাউজের দিকে যেতে একটা ঠান্ডা হাওয়া বইল। তাতে একটু কাঁপুনি ধরল। মন্দাক্রান্তার কিনে দেওয়া প্যান্ট-জ্যাকেট পরার সুযোগ এখনও পাওয়া যায়নি। ওটা একদিন পরতে হবে। এইসময় কালকের সেই রেস্তোরাঁটার সামনে এল সে। গতকাল ওর ছাদে বসে ওরা সন্ধের দার্জিলিং শহর দেখেছিল। এখন এই ঠান্ডায় রেস্তোরাঁর ছাদে ওঠার সাহস হল না নবকুমারের।

ঘরে ঢুকে মনে হল, এবার শুয়ে পড়া যাক। হঠাৎই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ল শরীর। পোশাক পালটে টয়লেট থেকে ঘুরে এসে কম্বলের তলায় শরীর ছড়িয়ে দিতেই বাবা এবং মায়ের মুখ মনে চলে এল। সর্বনাশ। কী হবে এখন?

এই সিনেমাটা নিশ্চয়ই মুক্তি পাবে। তখন তার নাম হোক বা না হোক, বেশ কিছু লোক সিনেমাটা দেখতে যাবে। তাদের গ্রামের কাছাকাছি সিনেমা হল-এ তো সব বাংলা ছবি দেখানো হয়, ওই ছবিও হবে। ছেলে নায়ক জানার পর বাবা নিশ্চয়ই টিকিট কাটবে। নতুন ছবি মুক্তি পেলেই রিকশায় বসে মাইক নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রচার করা হয়। হয়তো এই ছবির প্রচারে মাইকে বলা হবে—’আপনাদের গ্রামের ছেলে নবকুমার এখন উদীয়মান নায়ক। তার অভিনয় দেখতে দলে দলে টিকিট কাটুন।’ শোনামাত্র প্রতিবেশীরা বাবাকে বলবে সিনেমাটা দেখতে। বাবার হাতে যদি টাকা থাকে, তা হলে ছেলের গর্বে সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে। মায়েরাও বাদ যাবে না।

কিন্তু তারপর যা হবে, তা ভাবতেই যেন রক্ত জল হয়ে গেল নবকুমারের। বিদিশার সঙ্গে তার চুমু খাওয়ার দৃশ্যটা যেই পর্দায় আসবে, তখন ওদের কী অবস্থা হবে? বাবা ছিটকে বেরিয়ে যাবে হল থেকে। মা বসে থাকবে না। সঙ্গে সঙ্গে ওরা বাড়ি ফিরে যাবে। বাবা চিৎকার করে বলবে, ‘তোমার ছেলে উচ্ছন্নে গিয়েছে। সিনেমায় নেমে চরিত্রহীন হয়ে গিয়েছে। ওর পাঠানো টাকা এতদিন নিয়েছি বলে নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছে। আহ, এসব দেখব বলে বেঁচেছিলাম?’

মা কোনও কথা বলবে না। পাথরের মতো বসে থাকবে।

কিন্তু প্রতিবেশীরা তো নিশ্চয়ই, গ্রামের মানুষরাও মুখ খুলবে। সিনেমায় নামা মানে, চরিত্রহীন হওয়া—একথা সবাই জানত, কিন্তু গাঁয়ের ছেলে নবকুমারকে কলকাতার অভিনেত্রী পর্দায় যদি ওইভাবে চুমু খেতে পারে, তা হলে আড়ালে-আবডালে যা করছে তা তো ভাবাই যায় না। আর এই কথাগুলো ঠিক পৌঁছে যাবে তাদের বাড়িতে। স্বচক্ষে দেখে আসার পরে এই কথাগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারবে বাবা-মাকে।

দু-হাতে মাথা চেপে ধরল নবকুমার। যেদিন প্রথম শুনেছিল—তার মুখে যদি বদ গন্ধ থাকে, তা হলে সেটা দূর করতে হবে, না হলে বিদিশা তাকে চুমু খাবে না—সেদিন তার প্রতিক্রিয়া কী হবে, কেন মনে আসেনি? কেন বাবা-মা বা গ্রামের মানুষের কথা চিন্তা করেনি? তা হলেই তো সে আপত্তি করতে পারত। সেই আপত্তি শুনে গীতিময় কি তাকে ছবি থেকে বাদ দিতে পারতেন? বাদ দিলে বড়বাবুর অনেক আর্থিক ক্ষতি হত। পারতেন না, কিন্তু ব্যঙ্গ করতেন। তাকে সতীপনা দেখাতে নিষেধ করতেন। কিন্তু আপত্তির কারণেই হয়তো বিদিশাকে প্রায় আলজিভ ভিজিয়ে চুমু খেতে নিষেধ করত। এখন কী করা যায়?

নবকুমার বিছানা থেকে উঠে আয়নায় নিজেকে দেখে ভদ্রস্থ করে ঘরের বাইরে এল। পৃথিবীতে এখন ভালো অন্ধকার। গেস্ট হাউজের করিডোরে আলো জ্বলছে। ঘরের দরজাগুলো ভেতর থেকে বন্ধ। সে সোজা গীতিময়ের ঘরের বন্ধ দরজায় শব্দ করল। একটু পরে বিজন রায় দরজা খুললেন—’আরে! কী ব্যাপার?’

‘গীতিময়দা আছেন?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

দরজা থেকে না-সরে বিজন রায় ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—’নবকুমার এসেছে। কী বলব? কথা বলবেন?’

‘আরে, আসতে দাও! ও তো অ্যাডাল্ট হয়ে গিয়েছে! এসো হে!’ শেষের শব্দ দুটো বেশ জোরে বললেন গীতিময়।

ঘরে ঢুকল নবকুমার। বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন গীতিময়। পাশের টেবিলে মদের বোতল, খাবার এবং দুটো গ্লাসের অর্ধেকটা হুইস্কি।

‘বসো। কী ব্যাপার? তোমার তো এখন এই ঘরে আসার কথা নয়!’ গীতিময় হাসলেন—’তাই না বিজন?’

বিজন রায় বললেন, ‘নো কমন্টেস।’

চেয়ারে বসল নবকুমার। বিজন রায় দাঁড়িয়েই গ্লাস তুলে চুমুক দিলেন।

নবকুমার বলল, ‘আপনি আমাকে সাহায্য করুন গীতিময়দা।’

‘কীরকম?’ গ্লাসে চুমুক দিলেন গীতিময়।

আর এখানেই আটকে গেল নবকুমার। কীভাবে কথাগুলো বলবে, তা বুঝে উঠছিল না। তার মুখ দেখে গীতিময় বললেন, ‘দ্যাখো, আমার আপত্তি নেই যদি তুমি এক পেগ হুইস্কি খাও। তিনজন পুরুষ একসঙ্গে বসে পান করলে ভালো আড্ডা জমতে পারে, কিন্তু তুমি যদি একা কোনও মহিলার সঙ্গে পান করো, তা হলে কোথায় পৌঁছোবে, তা কেউ বলতে পারবে না। খাবে না কি?’

‘না, না।’ দ্রুত মাথা নাড়ল নবকুমার। তারপর বলেই ফেলল—’আমি আজকের চুমু খাওয়ার দৃশ্যটার কথা বলতে এসেছি।’

‘ও। খুব ভালো অভিনয় হয়েছে। পাবলিক খাবে। কি, বিজন?’

‘খাবে মানে? বারংবার খাবে!’ বিজন রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মদ খাচ্ছিলেন।

‘এখানে তোমাকে একটা কথা বলার আছে নবকুমার।’ গ্লাস হাতে নিয়ে তাকালেন গীতিময়—’সংযম। সংযম একটা দারুণ ব্যাপার। ওটা হারালেই মানুষ ভেসে যায়। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কথাটা বুঝতে পারছ?’

‘না!’ মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘তুমি বিদিশাকে আগে চিনতে না। কখনও দ্যাখোনি, তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু বিদিশা দেখতে ভালো, ফিগার দারুণ। তবু ওকে কোনও পরিচালক নায়িকার চরিত্রে কাস্ট করেননি। কারণ কী? বাঙালি পাবলিক নায়িকার মুখ-চোখ-ভঙ্গিতে একটু নরম, মোলায়েম ভাব দেখতে চায়, যা ওর মধ্যে নেই। যে কারণে নাদিরা, হেলেন, বিন্দু নায়িকা হতে পারেননি। বিদিশা যদি মুম্বই যেত, তা হলে ভ্যাম্পের চরিত্র ওর জন্যে বাঁধা থাকত। যাক সেকথা, এই চুমুটুমু খাওয়া নিয়ে একদম মাথা ঘামিও না। ওটা স্রেফ অভিনয়, তার বেশি কিছু নয়!’ গীতিময় গ্লাস শেষ করলেন।

‘আপনি কী বলছেন, আমি বুঝতে পারছি না।’ নবকুমার বলল।

‘ওহ, একে নিয়ে কী করা যায় বিজন?’

চোখ বন্ধ করে বিজন রায় বললেন, ‘ঠিক!’

গীতিময় বললেন, ‘খোলাখুলি বলছি, যদি ভাবো, চুমু খেয়ে ভালো লেগেছে, বিদিশা তোমার প্রেমে পড়েছে। ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে আরও অনেকবার চুমু খেতে এবং পেতে পারবে, তা হলে তোমাকে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হবে। কেন জানো?’

বিজন রায় বললেন, ‘জানে না!’

‘তোমার না আছে টাকাপয়সা, না আছে ক্ষমতা। তোমার কাছ থেকে বিদিশা যখন কিছুই পাবে না, তখন তোমাকে সে পাত্তা দেবে না। তার ফলে তুমি ভেঙে পড়বে। গাঁয়ের ছেলে আফটার অল। আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারো!’ গীতিময় বললেন, ‘অনেক ফালতু কথা বলিয়েছ, এবার আরাম করতে দাও। বিজন, ঢালো।’

‘গীতিময়দা, ওই দৃশ্যটা সিনেমায় না দেখালে কি খুব ক্ষতি হবে?’ বেশ মিনমিনে গলায় প্রশ্ন করল নবকুমার।

‘এ কী বলছে বিজন?’ সোজা হয়ে বসলেন গীতিময়।

‘ভাট বকছে।’ বিজন মদ ঢালছিলেন।

নবকুমার বলল, ‘আমার বাবা-মা খুব কষ্ট পাবে সিনেমাটা দেখলে।’

‘দেখতে নিষেধ করো। না দেখলে তো কষ্ট হবে না। আরে, ছেলে সিনেমার নায়ক হয়েছে, এতে তো তাঁদের মাটিতে পা পড়ার কথা নয়। তোমাকে যদি জেমস বন্ড-এর চরিত্রে অভিনয় করতে হয়, তা হলে শুধু ডজন ডজন চুমু নয়, আরও অনেক কিছু করতে হত। পাগল! যাও।’ শেষ শব্দটা বেশ জোরে বললেন গীতিময়। নবকুমার উঠে দাঁড়াল। তারপর চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় শুনল, বিজন রায় খ্যাঁকখ্যাঁক শব্দে হাসছেন।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার দেখল নবকুমার। সে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গীতিময়ের ঘরে গিয়েছিল, সেটা কোনও কাজেই লাগল না। গীতিময় কী কৌশলে কথা ঘুরিয়ে দিলেন। ঘুরিয়ে দেওয়ার পর তার সবকিছু গুলিয়ে গেল। এই কায়দাটা সবাই জানে না। নবকুমারের মনে হল, গ্রামের কেউ এরকম চালাকি করতে পারবে না। কিন্তু এখন সে কী করবে?

মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। হঠাৎ মনে এল, একটা কাজ সে করতে পারে। ছবি মুক্তি পাওয়ার আগে গ্রামে গিয়ে মা-বাবাকে শুটিং-এর গল্প বললে কেমন হয়! তখন তাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে পরিচালকের নির্দেশে বিদিশা চুমু খেয়েছিল, এই কথাটা সে শুনিয়ে দিতে পারে। সে বলবে, পরিচালক কথা দিয়েছেন দৃশ্যটা ছবিতে থাকবে না। তার কোনও দোষ নেই বোঝাতে পারলে ছবি মুক্তির পর ওরা খেপে যাবে না। এরকম ভেবে একটু স্বস্তি এল। ঠিক তখনই পিছন থেকে মেয়েলি গলা ভেসে এল—’ওমা! আপনি এখানে?’

নবকুমার পিছন ফিরে দেখল, টুনি দাঁড়িয়ে আছে।

টুনি বলল, ‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে, তা কী করে বুঝব? চারদিকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি!’

নবকুমার বলল, ‘কী ব্যাপার?’

‘আর বলবেন না। আমি যে কী করব, ভেবে পাচ্ছি না।’

‘কেন?’

‘দিদির মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, জানেন!’

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ নবকুমার এক পা এগোল।

‘আপনি আসুন আমার সঙ্গে।’ টুনি হাঁটতে লাগল—’আমি দিদির সঙ্গে আজ সাত বছর আছি। তখন ওর বয়স ছিল সতেরো। কত কী দেখলাম, কিন্তু আজ যা দেখছি, তা দেখে আমি বোবা হয়ে গিয়েছি দাদা!’

নবকুমারের ইচ্ছে হচ্ছিল জিজ্ঞাসা করতে—বোবা হলে টুনি এত কথা কী করে বলছে! কিন্তু সে চুপ করে হেঁটে এল টুনি-র পিছনে বিদিশা-র ঘরের দরজায়। দরজা ভেজানো ছিল। সেটা সামান্য খুলে টুনি ইশারা করল ভেতরে ঢুকতে।

মুখ বাড়াল নবকুমার। বিদিশা তার বিছানায় বসে বই পড়ছে। তার সামনে টেবিলে একটি চায়ের কাপ। দরজার শব্দ কানে যেতে বই থেকে মুখ তুলে বিদিশা হাসল—’আরে! আসুন, আসুন।’

নবকুমার পিছন ফিরে টুনি-র দিকে তাকাতে বিদিশা-র কপালে ভাঁজ পড়ল। তারপর বলল, ‘টুনি, নবকুমারবাবুর জন্যে এক কাপ কফি বানিয়ে দে।’

নবকুমার চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনি কফি খাচ্ছেন?’

‘না। চা।’ হাসল বিদিশা—’মনে হচ্ছে অবাক হচ্ছেন!’

‘আমার চেয়ে আপনার টুনি অনেক বেশি ঘাবড়ে গিয়েছে।’

‘ও। তাই আপনাকে ডেকে এনেছে?’ বিদিশা টুনি-র দিকে তাকাল। টুনি তখন ঘরের অন্য কোণে কফি বানাতে ব্যস্ত। সেইভাবেই বলল, ‘কেন ডাকব না?’ গত দেড় বছরে কাজ না থাকলে তুমি কোনও সন্ধের পরে চা-কফি খেয়েছ?’

‘না। খাইনি। খাইনি বলে কখনও খাব না, এরকম প্রতিজ্ঞা তো করিনি।’ বিদিশা বলল, ‘জানেন নবকুমার, আজ মনে হল, দেড় বছর ধরে তো অনেক মদ খেলাম, রোজ চার পেগ করে ধরলে অন্তত পাঁচশো দিনে দু-হাজার পেগ। ভাবা যায়! তাই ভাবলাম, লিভারটাকে একটু স্বস্তি দেওয়া যাক। অ্যালকোহলের রিঅ্যাকশন থেকে না হয় কিছুদিন রক্ষা পাক বেচারা। অন্যায় করেছি বলুন?’ বিদিশা জিজ্ঞাসা করল হাসিমুখে।

‘আপনার যা ভালো মনে হয়েছে, তাই করেছেন। ন্যায়-অন্যায় জানি না।’

‘বাহ! আপনি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলছেন!’

নবকুমার টুনি-র দিকে তাকাল—’কফি কি তৈরি হয়ে গিয়েছে?’

টুনি বেজার মুখে বলল, ‘জলই গরম হয়নি!’

বিদিশার দিকে তাকাল নবকুমার—’তা হলে কফি থাক। ওটা খেতে আমি অভ্যস্ত নই। আপনি কিছু মনে করবেন না।’

‘আপনার যা ভালো মনে হয়, তাই করুন।’ বিদিশার ঠোঁটে চিলতে হাসি।

‘তা হলে এখন উঠি?’

মাথা নাড়ল বিদিশা। তারপর হাসল, ‘এতক্ষণ আমরা ”আপনি আপনি” করলাম। আজ শুটিং-এর সময় কিছু ‘তুমি’ শুনেছিলাম। মনে পড়ছে?’ আচ্ছা, আসুন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *