দুই
গীতিময় দুপাশে মাথা নাড়লেন—’অসম্ভব। আর হয় না, আমি কথা দিয়ে ফেলেছি। সেটা বড়বাবুকে জানিয়ে দিয়েছি।’
নিবারণ গুপ্ত টেবিলের এপাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কথা হচ্ছিল ‘এন. টি. ওয়ান’ স্টুডিওতে গীতিময়ের অফিসঘরে। নিবারণ জিজ্ঞাসা করলেন—’এর মধ্যেই কাউকে কথা দিয়ে দিলেন?’
‘কাউকে মানে? সুবীর চ্যাটার্জি-র ডিমান্ড নিশ্চয়ই জানেন। অল্পবয়সি হিরোদের মধ্যে ওর বাজার সবচেয়ে ভালো। আরে, ওকে নিয়েই তো আমি ছবিটা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই গ্রামের ভূতটাকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’ গীতিময় বললেন, ‘আর কথাটা কী বললেন? এর মধ্যেই। আপনি কি জানেন না, এই টালিগঞ্জে মানুষের মতিগতি কী দ্রুত পালটে যায়। ছবিটা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে আমি কোথায় দাঁড়াব বলুন তো? কেরিয়ারে কালো দাগ লেগে যাবে। অন্য প্রযোজকরা ভাববে আমি অপয়া ডিরেক্টর। তাই কোনও চান্স নিইনি। প্রোডাকশন কন্ট্রোলারকে বলেছি, আজকের মধ্যে হিরো চেঞ্জ করলে যে লস হবে, তার হিসেব দিতে। ম্যাডাম টাকাটা বড়বাবুকে দিয়ে দিলেই শুটিং শুরু করে দেব।’
‘সুবীর ডেট দিয়েছে?’
‘না! চেষ্টা করছে ডেট বের করার। তবে একটা ছবির সব সিনে তো হিরো থাকে না! যেগুলোতে থাকবে না, সেই সিনগুলো এখন টেক করব!’ গীতিময় খুশি খুশি গলায় বললেন।
‘বড়বাবু সম্মতি দিয়েছেন?’ নিবারণ জিগ্যেস করলেন।
‘বোধহয় টাকাটার জন্যে অপেক্ষা করছেন, পেলেই দিয়ে দেবেন।’
‘কিন্তু ছেলেটা যখন অভিনয় করতে রাজি হয়েছে, তখন একটু ভেবে দেখবেন না?’
গীতিময় চেয়ারের পিছনে শরীর হেলিয়ে কিছুক্ষণ নিবারণের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘এক্সপেরিয়েন্স মানুষকে অনেক শিক্ষা দেয়, মনে হচ্ছে সেই শিক্ষা আপনি নেননি। এতদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন, উত্তমকুমার, অনিল চ্যাটার্জিদের সঙ্গে কাজ করেছেন, আপনি জানেন না, দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো? যে ছেলেটা অভিনয়ের অ জানে না, যাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হচ্ছে, সে একটা বেশ্যামাগি মারা গিয়েছে বলে আমাকে মুখের ওপর বলে দিল অভিনয় করবে না। কত টাকা ক্ষতি হবে, পরিচালক হিসেবে আমার কী হবে, তা একবারও ভাবল না! নৌকো তীর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মন পালটালে জীবনের নৌকো ফিরে এসে নিয়ে যায় না। আচ্ছা, আপনি ওর হয়ে ওকালতি করছেন কেন বলুন তো?’
‘ওকালতি করছি না। ছেলেটা ভুল করেছিল, সংশোধন করতে চায়, সেই কথাই আপনাকে বলতে এসেছিলাম।’ নিবারণ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। গীতিময়ের অফিসঘর থেকে তাঁর মেক-আপ রুম-এ পৌঁছতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে। ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতে-না-বসতেই মোবাইল জানান দিল। বড়বাবুর নাম্বার। সাড়া দিতেই বড়বাবু জিগ্যেস করলেন—’শুনলাম তুমি গেস্ট হাউজে গিয়ে ওই ছোকরার সঙ্গে দেখা করেছিলে। হঠাৎ সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে হল কেন?’
‘আমার মনে হয়েছিল ছেলেটা যে ভুল করছে, সেটা বোঝানো দরকার।’
‘তুমি কি এরকম গায়ে পড়ে উপকার করে বেড়াও?’
‘না! কিন্তু এই ছেলেটার সঙ্গে কয়েকদিন কাজ করে ওকে ভালো লেগে গিয়েছিল।’
‘হুম! ডিরেক্টর পারেনি, আমি পারিনি, এমনকী ম্যাডামও পারেননি ওকে বোঝাতে। তোমার কেন মনে হল, তুমি বোঝালে সে বুঝবে?’
নিবারণ হাসলেন—’আপনারা বুঝিয়েছিলেন বলে ওর মন কিছুটা নরম হয়েছিল নিশ্চয়ই, আমি বলার পর ও ভুল বুঝতে পারল।’
‘অ্যাঁ? ও অভিনয় করতে রাজি হয়েছে?’ বড়বাবুর গলা উঠল।
‘হ্যাঁ!’
‘কথাটা আমাকে বলোনি কেন?’
‘ডিরেক্টর সাহেবকে বলেছি, কিন্তু উনি আর রাজি হচ্ছেন না।’
‘কীরকম?’
‘আপনি যদি ওঁর মুখে শুনে নেন, তা হলে ভালো হয়।’
‘হুম! রাখো!’ বড়বাবু লাইন কেটে দিলেন।
শেফালি মায়ের জামিন হল না। কিন্তু আদালত তাঁর চিকিৎসার জন্যে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। কোনও উকিলকে দায়িত্ব দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা ওঁর নেই, গ্রেপ্তার হওয়ার পরে কেউ ওঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেনি, তাই সরকারি উকিল এই মামলা নিয়ে আদৌ চিন্তিত ছিলেন না। কিন্তু অভাবিতভাবে এই কোর্টের একজন জাঁদরেল উকিল এসে শেফালি মায়ের পক্ষে দাঁড়ালেন। তিনি আদালতকে বললেন, ‘শেফালিদেবী তাঁর আশ্রিতা একটি মেয়েকে রক্ষা করতে একটা বঁটি দিয়ে ধর্ষককে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। সেই ধর্ষক শেষ মুহূর্তে সরে যাওয়ায় বঁটির আঘাত মেয়েটির গলায় পড়ে। ব্যাপারটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। নিজের এই কাজের জন্যে তিনি এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যে, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। ওঁর ভালো চিকিৎসার দরকার। আদালত জামিন দিলে সেই ব্যবস্থা করা হবে।’
কিন্তু আদালত রায় দিলেন—এটা খুন কি খুন নয়, তা প্রমাণিত হওয়ার আগে জামিন দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য আসামিকে অবিলম্বে মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি উকিল প্রতিবাদ করেননি। বাইরে এসে তিনি শেফালি মায়ের পক্ষে বলা উকিলকে জিগ্যেস করলেন—’এই মামলায় আপনি কী করে এলেন?’
ভদ্রলোক হাসলেন—’আসতে হল, না এসে উপায় ছিল না।’
আগের ফ্ল্যাটে চলে এল নবকুমার। এখন তার শরীর অনেকটাই সুস্থ। আঘাতগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। ব্যথা নেই। মুক্তো দরজা খুলে তাকে দেখতে পেয়ে কেঁদে উঠল। তারপর সবিস্তারে বলতে লাগল, সেদিন শেফালি মায়ের বাড়িতে কী কী হয়েছিল। চুপচাপ সব শোনার পর নবকুমার বলল, ‘তুমি যদি কিছু রান্না করে থাকো, তা হলে আমায় খেতে দাও!’
‘রান্না করব কী! লোকটা যে টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে খাবার দিয়ে গেল। তারপরে আর রান্না করার কী দরকার!’ মুক্তোর কান্না আচমকাই উধাও।
‘কে দিয়ে গেল?’ নবকুমার অবাক হল।
‘তা তো জানি না!’ মুক্তো জিভ বের করল—’নাম জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গিয়েছি।’ তারপরেই মাথা নাড়ল—’দাঁড়াও, সঙ্গে একটা খামও দিয়ে গিয়েছে।’ বলে খাওয়ার ঘরে চলে গিয়েই ফিরে এল একটা খাম হাতে—’দ্যাখো তো।’
খাম থেকে ছোট্ট চিরকুট বের করে হেসে ফেলল। মন্দাক্রান্তার হাতের লেখা মুক্তোর মতো। মন্দাক্রান্তা লিখেছেন—’এই খাবার বাড়ির নয়, দোকানের। শেষ পর্যন্ত মত পালটানোর জন্য। মন্দাক্রান্তা।’ খামটা ফেলে দিতে গিয়ে মনে হল, ওর ভেতরে আরও কিছু আছে। ভালো করে দেখতে গিয়ে একটা ভাঁজ করা কাগজ পেল নবকুমার। তাতে লেখা—’এইমাত্র খবর পেলাম শেফালি মাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ভালো খবর।’
এই খবরটা পড়ামাত্র চোখ বন্ধ হয়ে গেল নবকুমারের। শেফালি মায়ের চিকিৎস হবে। চিকিৎসা হলে নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবেন! এই ক’দিন ধরে মাথার ভিতরে যে ঝড় চলছিল, বুকের গভীরে যে ভার জমছিল, তা খবরটা পড়ার পর একটু একটু করে হালকা হয়ে যাচ্ছিল। নিজের অজান্তেই সে নিঃশব্দে শূন্যে হাত ছুড়ল। মুক্তো তাকে দেখছিল। অবাক হয়ে বলল, ‘এ কী! তোমার আবার কী হল?’
‘আমার এখন একটু ভালো লাগছে মুক্তো।’ নবকুমার বলল।
গীতিময় মেনে নিতে পারছিলেন না। একটা গ্রাম্য ছেলে তাঁর মুখের ওপর বলে দিয়েছিল—সে আর অভিনয় করবে না। এরকম কথা জীবনে শোনেননি তিনি। সবসময় শুনেছেন—’আমাকে একটা চান্স দিন, যা বলবেন তাই করব।’ কম তো হল না, এই পনেরো বছরে দশ-দশটা ছবির পরিচালক হিসেবে পাবলিক তাঁর নাম দেখেছে। এই দশটার মধ্যে চারটে হিট, পাঁচটা টাকা ফেরত দিয়েছে, একটাই ফ্লপ। সেটায় তাঁর হাতও ছিল না। প্রযোজকের স্ত্রীকে নায়িকার চরিত্র দিতে হয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন, স্বামী সেট-এ থাকলে নায়ক যেন তাঁকে জড়িয়ে না ধরেন। আর স্ত্রীর শুটিং থাকলেই প্রযোজক স্বামী চেয়ার নিয়ে ক্যামেরার পাশে বসে থাকতেন। ওটা একটা ব্ল্যাক স্পট।
কিন্তু টালিগঞ্জে তাঁর যথেষ্ট সুনাম আছে। এখন ছবির বিষয়, ছবি করার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তিনি চেষ্টা করছেন তালে তাল মেলাতে। এইসময় আরেকটা অনিচ্ছুক ঘোড়ার পিঠে উঠে রেসে হারতে তিনি চান না। টালিগঞ্জে কোনও খবর চাপা থাকে না। লোকে ঠিক জেনে যাবে। সুপারহিরো কেউ নয়, একটা গাঁইয়া ছেলে প্রথম অভিনয় করতে এসেই তাঁকে নাচিয়েছে। এখন তাঁকে ফোন করে সুবীর চ্যাটার্জিকে সরি বলতে হবে। এরপরে সুবীর আর তাঁকে কোনও ছবির জন্যে ডেট দেবে? ফোনটা করার আগে শেষ চেষ্টা করলেন গীতিময়।
ফোন বাজছিল। তারপর মন্দাক্রান্তা-র গলা শুনতে পেলেন—’বলুন।’
‘আমি খবরটা পেয়েছেন নিশ্চয়ই। এরকমভাবে কি কাজ করা যায় ম্যাডাম?’
‘বুঝতে পারছি না আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন!’ মন্দাক্রান্তা বললেন।
‘নবকুমারের কথা বলছি। আমাদের ছবির নায়ক পুলিশের হাতে মার খেয়েছে, খারাপ পাড়ায় গিয়েছে, মুখের ওপর ছবিতে অভিনয় করবে না বলেছে, প্রেস যদি জানতে পারে, পারবেই, কী হবে, ভাবতে পারছেন?’ গীতিময় উত্তেজিত।
‘একটু বুঝিয়ে বলুন।’ মন্দাক্রান্তা বললেন।
‘ওঃ, ছবি ফ্লপ করবে। পাবলিক মুখ ফিরিয়ে নেবে।’
‘এটা আপনি ভাবছেন। লোকে তো ওসব শুনে উৎসাহিত হতে পারে!’
‘নেগেটিভ পাবলিসিটি?’
‘সেটা আপনারা বুঝবেন।’
‘আবার যদি ক’দিন পরে সে বলে অভিনয় করব না, তখন কী হবে?’
‘যত তাড়াতাড়ি পারেন ওর শুটিং শেষ করে ফেলুন।’
‘উঃ, আমি যে সুবীর চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা বলে ফেলেছি!’ গীতিময় বললেন, ‘বড়বাবুকে আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন।’
মন্দাক্রান্তা হেসে ফেললেন—’সুবীরকে নিয়ে ছবি কতদিনে শেষ করবেন?’
‘না, মানে আমাকে ও ঝোলাবে না।’
‘তা হলে বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলুন। আরও লাস্যময়ী নায়িকাকে কাস্ট করুন। তিন-চারটে সুন্দরী নারীচরিত্র গল্পে ঢোকান। সুবীর আপনাকে ডেট দেবে।’ মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘গীতিময়বাবু, আপনি এটাকে ইগো ইস্যু করবেন না। কাজ শুরু করে দিন, নবকুমার এবার মন দিয়ে কাজ করবে। আপনি বড়বাবুকে কতখানি জানেন, তা জানি না, কিন্তু বিরক্ত হলে উনি আপনার সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করতে পারেন। আচ্ছা, রাখছি।’ মন্দাক্রান্তা ফোন রেখে দিলেন।
গীতিময় ঢোক গিললেন। তাঁর মনে পড়ল, অতনু সেনের কথা। ছয়ের দশকের বিখ্যাত পরিচালক। তৃতীয় সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ তাঁকে দিয়েছিলেন অতনু সেন। তাঁর ছবি মানেই একইসঙ্গে কাগজে প্রশংসা আর পাবলিকের লাইন। সেই অতনু সেন একদিন বলেছিলেন, ‘শুটিং ফ্লোরের ক্যাপ্টেন হলেন ছবির পরিচালক, সেখানে তিনিই শেষ কথা। ফ্লোরের বাইরে সর্বময় কর্তা হলেন প্রযোজক, যিনি টাকা দিচ্ছেন। সেখানে পরিচালক তাঁকে মানতে বাধ্য। গাড়ির ব্রেক পিছনের চাকায় থাকে। সামনের চাকায় থাকলে অ্যাক্সিডেন্ট হতে বাধ্য।’ গীতিময়ের মনে হল, বড়বাবু বা মন্দাক্রান্তার সঙ্গে সংঘর্ষে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। তিনি তখনই নিজের ইচ্ছেমতো ছবি করতে পারবেন, যখন নিজের টাকায় ছবি করতে পারবেন। শ্বাস ফেললেন গীতিময়, সেইদিন কি এই জীবনে আসবে?
ভবানীপুরের বাড়িতে স্টুডিওর গাড়ি এল। ভাড়ার গাড়ি। যে লোকটি চালাচ্ছে, তার বয়স হয়েছে। নবকুমার গাড়িতে ওঠার পর লোকটি হেসে বলল, ‘নমস্কার দাদা, আমি প্রমথেশ।’ নবকুমার বলল, ‘বাঃ, নামটা সুন্দর।’
‘হ্যাঁ! তবে পুরোনো। কোনও এককালে একজন হিরো ছিল, তার নামে নাম রেখেছিল ঠাকুরদা। আপনিও তো হিরো, দেখবেন, আপনার নামে অনেকে বাচ্চার নাম রাখবে।’
নবকুমার বুঝল, লোকটি বেশি কথা বলে। সে চুপ করে থাকল।
লোকটি বলে চলল—’আগেকার হিরোদের দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত। উত্তমকুমারের কথা ছেড়ে দিন। এই মিঠুনদা, বুম্বাদাকে দেখলে হিরো ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না। এখন তো রাস্তা থেকে ধরে এনে ডিরেক্টররা হিরো বানিয়ে দেয়। কইমাছের মতো চেহারা একটা ছোকরার, তাকেও হিরো বানানো হয়েছে। দাদা, আপনার চেহারায় কিন্তু হিরো হিরো ভাব আছে। একটু ঘষামাজা করলে…আপনি রাগ করছেন না তো দাদা?’
নবকুমার এবারও জবাব দিল না। এই কয়েক মাসে সে শিখেছে, কথা না বললে ঝামেলা বাড়ে না।
গীতিময়ের ব্যবহার আজ এত ভালো হবে, ভাবতে পারেনি নবকুমার। কেমন বাবা-বাছা করে কথা বললেন ভদ্রলোক। প্রধান সহকারী পরিচালককে বললেন, ‘মেক-আপটা ধীরে-সুস্থে করতে বল নিবারণবাবুকে। নবকুমার, মন দিয়ে কাজটা করো।’
‘আমি চেষ্টা করব।’ নবকুমার বলল।
মেক-আপ রুম-এ যেতেই নিবারণ গুপ্ত তাকে জড়িয়ে ধরলেন—’আমি খুব খুশি হয়েছি ভাই। অন্যের ওপর রাগ করে বা অভিমানের জন্যে যারা কাজের জায়গা থেকে পালিয়ে যায়, তারা কখনওই জেতে না। এবার জমিয়ে অভিনয় করো।’
‘আপনি আমার উপকার করেছেন।’ নবকুমার বলল।
‘দুর! আমি কিছুই করিনি। একটু বসো!’ নিবারণ গুপ্ত বললেন।
সন্ধ্যের মুখে প্যাক-আপ হল। মেক-আপ রুম-এ গিয়ে মেক-আপ তুলে পোশাক পালটে নিবারণ গুপ্তকে নমস্কার জানিয়ে বাইরে বের হতেই প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে বলল, ‘বড়বাবু আপনাকে দেখা করতে বললেন।’
বড়বাবু যে আজ স্টুডিওতে এসেছেন, তা জানত না নবকুমার। জিগ্যেস করল—’উনি অফিসঘরে আছেন?’
‘না। ওঁর গাড়িতে বসে আছেন। পার্কিং-এ গাড়ি রয়েছে।’
অফিসে না বসে গাড়িতে কেন বুঝতে পারল না নবকুমার। পার্কিং লটে গোটা সাতেক গাড়ি রয়েছে। সেদিকে এগিয়ে যেতে একজন হাত তুলল। লোকটা বড়বাবুর ড্রাইভার। সে গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতে লোকটা ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজা খুলে দিল। ভিতরে বসে নবকুমার পিছনে তাকাল। বড়বাবু চোখ বন্ধ করে বসে আছেন পিছনের সিটে। সে বলল, ‘নমস্কার, আমায় ডেকেছেন?’
চোখ খুলে নীরবে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বললেন বড়বাবু। ততক্ষণে ড্রাইভার তার সিটে এসে বসেছে। বড়বাবু জিগ্যেস করলেন—’তোমার কি এখন কোথাও যাওয়ার আছে?’
‘না। ভবানীপুরের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম।’
‘গুড! ড্রাইভার পার্ক স্ট্রিটে চলো।’ বড়বাবু বললেন।
গাড়ি ‘এন. টি. ওয়ান’ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল। সন্ধে হয়ে যাওয়ায় দুপাশের দোকানে আলো জ্বলছে। ট্রামডিপোর দিকে যাচ্ছিল গাড়ি। নবকুমার
বেশ ধন্দে পড়ল। তাকে নিয়ে কোথায় চললেন বড়বাবু! পার্ক স্ট্রিটে কী জন্যে যাচ্ছেন?
নবকুমার কোনও প্রশ্ন করল না। কথা বললেই তো ঝামেলা বাড়ে।
পার্ক স্ট্রিটের পার্ক হোটেলের ভিতরে গাড়ি থেকে নামলেন বড়বাবু। নেমে বললেন, ‘তুমি আজ আবার কাজ শুরু করেছ, তাই তোমাকে নিয়ে একটু কফি খেতে এখানে এলাম। তুমি নিশ্চয়ই মদ্যপান করো না!’
‘না, না।’
কফি খেতে খেতে বড়বাবু বললেন, ‘শুনলাম আজ সবাই তোমার অভিনয়ের প্রশংসা করেছে। শুনে ভালো লাগল। যদি এই ছবি চলে, তা হলে তোমাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে না। আচ্ছা, ঊর্মিলা-র সঙ্গে তোমার ভাব হয়েছে?’
‘ভাব?’
‘ভাব মানে, বন্ধুত্ব!’
‘না, না। আলাপ হয়েছে!’
‘বন্ধুত্ব করে ফ্যালো। তা হলে দেখবে অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করতে সুবিধে হচ্ছে। মেয়েটি খারাপ নয়।’ কফি শেষ করে বড়বাবু বললেন, ‘তোমাকে আমি আর একটি কারণে এখানে নিয়ে এসেছি।’
‘বলুন।’
‘তুমি মান্দাক্রান্তা-র সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না।’ খুব ধীরে, কিন্তু শক্ত গলায় কথাগুলো বললেন বড়বাবু।
