৯৬. হকের খপ্পরে মণ্ডল
দশদশটি কাট মোশনের একটিও পাশ না-হওয়ায় বিরোধী পক্ষের তো মানহানি হওয়ার কথা। তা তো হলই না উলটে সরকারপক্ষ বা মন্ত্রিসভা বা হকশাহেব ও তাঁর মন্ত্রীরা কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না। মন্ত্রিসভা টিকে গেছে, শুধু ইয়োরোপিয়ানদের ভোটে—এ লজ্জা আর ঢাকা যাবে কী সে, যদিও মাস পাঁচেক আগে, ৩৮ সালের মার্চেই স্বাস্থ্যমন্ত্রকের বাজেট বরাদ্দের ওপর এক কাট মোশনে মন্ত্রিসভা পেয়েছিল ১১২ ভোট, তার ২৩ জন ছিল শাহেব আর দুজন ছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। এই ২৫ জনকে বাদ দিলে সরকার পক্ষে থাকে ৮৭ জন মেম্বার। আর, বিরোধী পক্ষে ছিল ৯৬ জন। সেই মার্চ থেকেই হকশাহেবের সরকার, সংখ্যালঘু সরকার বলে খাটো হয়ে গিয়েছিল। ৮ আগস্ট থেকে যে ১০টি কাট মোশন পর-পর উঠতেই লাগল তখন ভোটের ভাগাভাগি প্রায় স্থায়ী হয়ে গেল—সরকারের পক্ষে ১৩০ আর বিপক্ষে ১১১। সরকার পক্ষীয়দের থেকে ২৫ শাহেবকে বাদ দিলে থাকে ১০৫।
এটা একটা ঘটনা হলে, না-হয় লোকজন একটু ভুলে যেতে বা ভুলে থাকতে পারত। কিন্তু সতের মাসে যদি একটা সরকারকে ১৭ বার শাহেবদের সমর্থন নিয়ে বাঁচতে হয়, তাহলে বাঁচার প্রমাণ আর কী করে দেয়া যাবে?
অথচ এই সরকারের সমর্থনে তো এমন সমাবেশ হয়েছে যেমন এর আগে কখনো ঘটানো যায়নি। তারা প্রায় সবাই-ই শ্রমিক। কৃষক-প্রজা পার্টির লিগ বিরোধীরা সমাবেশের ভয়ে আইনসভার বাড়ি থেকে বেরতে পারেনি। রাতে তাদের খাওয়ার বন্দবস্ত হয়েছিল বিরিয়ানি বা ভাতের সঙ্গে দু-রকমের মাছ বা বড় বাজার থেকে আনা কেশর মোহনভোগ আর গাওয়া ঘিয়ে ভাজা চপচপে পরোটা। কম পড়ে গেল নিরামিষাশীদের খাবার। বিরিয়ানির খদ্দেররা বা মৎসসুখীরা, সহজেই হাত বাড়াতে পারে পরটা আর কেশর ভোগের দিকে। মাথাগনতিতে আইনসভায় নিরামিষাশীর সংখ্যা খুবই কম। চাহিদার অপ্রত্যাশিত চাপে তাদেরই বরান্দে টান পড়ে।
সরকারের পক্ষে সমাবেশ আর বিপক্ষে বিরিয়ানি সত্ত্বেও যে সরকার পড়ে গেল না, তার আরো কারণ আছে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতন শ্রদ্ধেয় মনীষী সায়েন্স কলেজে তাঁর রবিবারের আড্ডায় সবাইকে শুনিয়ে দরজা গলায় বলেছেন—বহুদিন পরে বাংলায় একটা ভাল সরকার হয়েছে, হকশাহেবের সেই সরকারকে ফেলে দেয়া অনুচিত কাজ।
ব্যাপারটা এমনই গিঁঠ পাকাল যে এই আইনসভার আড়াইশ সদস্যের মধ্যে হেরো-সরকার, আইনসভার বাইরে রাস্তায় অগুনতি মানুষের মধ্যে জেতা সরকার—এমন একটা থিয়েটারি ভাগাভাগি যেন খুব অস্পষ্ট থাকছিল না। মুসলিম লিগের যারা প্রধান নেতা, বিশেষ করে নাজিমুদ্দিন ও সারওয়ারদি এমন একটা চাল নিলেন যে এটাও তাঁদের পরিকল্পনা মাফিক জিত। তাদের বকলমে একটা এমন কথাও চালু হয়ে গেল—যে-আইনে আমরা মেম্বার সেই আইনেই শাহেবরা মেম্বার। তাদের ভোটে জেতায় দোষ কীসের?
মুসলিম লিগের কোনো নেতারই এটাতে কিছু মনে হয়নি, অন্তত শীর্ষ নেতাদের। নবাব হবিবুল্লাহ বা সারওয়ারদি তো নিজেদের শাহেব ঘেঁষা মনে করতে আনন্দ পায়, বিশ্বাসও পায়। বাইরের সমাবেশটা মাত্রই একটা কৌশল। সারওয়ারদি মনে করে, তার নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির পক্ষে এই সমাবেশের ক্ষমতা তাকে সার্ভিস দেয়। নাজিমুদ্দিন মনে করে সে যে সর্বপ্রধান নয় এটাই তো সবচেয়ে অন্যায়। শাহেবদের দৌলতে বেঁচে আছে, মন্ত্রী থাকতেই-বা লজ্জা কী? মুয়াজ্জামুদিন হোসেন তো আইনসভায় বক্তৃতাই করল—’যদি দরকার হয়, তাহলে ভারতের বাইরে থেকে, ইজিপ্ট থেকে, বাংলার বাইরে থেকেও মুসলমানদের এনে চাকরি দিলে বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে ভাল হয়।’ এমন কী হকশাহেবও তো চাকরিতে মুসলমান কোটা ভরার দরকারে হোসেনের ঐ মন্তব্য ব্যাখ্যা করেন সমর্থনের সুর দিয়ে, ‘যদি চাকরিতে বাংলা থেকে যোগ্য লোক পাওয়া না যায়, তাহলেই এক এমন বিকল্প ভাবা যেতে পারে’।
অথচ হকশাহেবের ভাবগতিকে কোনো বদল নেই। এমন কী, এটুকু আভাসও কেউ বানিয়ে দেখতে পায় না যে হকশাহেব ভিতরে-ভিতরে নাড়া খেয়েও বাইরে ভাব দেখাচ্ছেন যেন তাঁর কিছুই আসে যায় না, এমন কী মন্ত্রিসভা যদি পড়েও যেত তাহলেও যেন তাঁর কিছু আসত-যেত না। যেন, তাঁর একটা আশাও ছিল যে মন্ত্রিসভাটা ভেঙে যাক। সেটা বলেও ফেলে ছিলেন একদিন লবিতে, সিদ্দিকিশাহেবের এক কথার জবাবে, ‘আচ্ছা হকশাহেব, আমার বড় জানতে ইচ্ছে করে আপনি কী করে এতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন? কোনো কিছুতেই কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। এদিকে সকলের তো ধারণা ফজলুল হকশাহেব মাথা-ঘাড়ে চলেন না, দিল, হৃদয় নিয়ে চলেন’।
এমন করে হকশাহেবকে এক সিদ্দিকি শাহেবই বলতে পারেন। বিলেতে পড়াশুনো, অভিজাত বাড়ির ছেলে, মতামতে একেবারেই সাম্প্রদায়িক নন, সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের কার্যকরী সমিতির সভ্য, পার্লামেন্টারি রীতি পদ্ধতিতে এমন ওয়াকেবহাল যে পয়েন্ট অব অর্ডার তুললেই স্পিকারের মুখ কাল, জিন্নার সঙ্গে মত পার্থক্য গোপন রাখেন না। সিদ্দিকি শাহেব এমন কথা, লবিতে, সকলের সামনে বলার মধ্যে তাঁর নিজের অস্বস্তিটাই ধরা পড়ল। ইংরেজের উচ্ছিষ্ট একটা সরকারকে তিনিও তো সমর্থন দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
হকশাহেব ঠোঁটটা গোল করে সিদ্দিকি শাহেবের কথা শুনলেন, তারপর না হেসে, খুবই গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, ‘মন্ত্রিসভা-ভাঙনের কথা কন সিদ্দিকি ভাই?’
‘তা ছাড়া আর কী বলব? মন্ত্রিসভাটা তো আপনার। পড়লে তো পড়ত হক-মন্ত্রিসভা—‘অপজিশন তো মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানানোর সাহস পায় নাই। এক-একজন মন্ত্রীর বাজেট বরাদ্দের উপর আলাদা কাট মোশন আনছে।’
‘ফাইন্যান্স বিলে মন্ত্রী কাত হলে কি ক্যাপ্টেন বাঁচত?’
‘না, না, তা হব ক্যামনে? জয়েন্ট রেসপনসিবিলিটি না? কার্টসি টু দি পার্লামেন্টারি কাস্টম মন্ত্রিসভাই তো রিজাইন কইরত্যাম।’
‘তফাৎটা কী হল? যাই হোক না কেন, শাহেবদের ভোটের কারণেই তো অপজিশন হারল—’
‘তাহলে আমার হৃদয়ের কী হইল?’
‘তা হলে আমাদের কী হল?’
‘কী হইল?’
‘লজ্জা। লজ্জা। উথলে নয়নবারি।’
‘আমার তো তেমন লজ্জার কোনো কারণ দেখি না, সিদ্দিক শাহেব। অ্যাহন, একডা ফজলুল হক ছাড়া কেউ সরকার খাড়া কইরতে পারব না। আইন সভায় তো ঐ নামের দ্বিতীয় কোনো মেম্বার নাই। রিজাইন কইরলে পরদিন আবার আমারেই ডাইকতে হইত লাটশাহেবরে নতুন মন্ত্রিসভা বানানোর লগে। আমি ছাড়া তো কারো মেজরিটি নাই। মন্ত্রিসভারে ফেইল্যা দিলে আমারেই যদি ফিইর্যা ডাইকবার লাগে, তাইলে তো আমারই গ্ল্যামার আর-এক পৌঁছ বাইড়ত। শাহেবরা সেইডা বুইঝ্যাই আমারে গ্ল্যামারডা পাইতে দিল না।’
সিদ্দিকি শাহেবের সঙ্গে হকশাহেবের কথা হচ্ছে—আরো সব মেম্বাররা এসে ভিড় করবে না—তা কি হয়? লবির যাতায়াতই বন্ধ হয়ে যায়। যাতায়াত ঘটছিলও না, কে আর এই আসর ছেড়ে যাবে?
সিদ্দিকি শাহেব একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘এটা তো অস্বীকার করাও যায় না। এ যুক্তিটা। কিন্তু স্যার, একটা কথা বলুন—এই যুক্তিটা কি নো-কনফিডেন্সের আগেই আপনার মনে এসেছে। নাকী শাহেবদের ভোটে রক্ষা পাওয়ার পর মনে এসেছে?’
হকশাহেব হো হো রবে তাঁর স্বাভাবিক হাসিতে লবি ভরিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘আপনে তো বব্বের পোলা। আপনে জানবেন ক্যামনে পদ্মা-মেঘনা-কীর্তনখোলায় মাঝগাঙে যদি ঝড় আইস্যা ঝাঁপায়, তাইলে, হাঙরের নাগাল ঢেউগুল্যার কোনো আগে-পরে গোনা যায় না। যেইডা ভাঙলেন, সেইডাই ভাঙলেন। হয় পাড়ে পৌঁছান নাও নিয়্যা আর গল্প নিয়্যা, নয় গাঙে ডোবেন নিজেও আপনার গল্প নিয়্যা’।
‘হকশাহেবের কথা শুনে মনে হয়, উনি নিজেই আস্থা ভোটে জিতলেন,’ ভিড়ের পেছন থেকে নলিনাক্ষ সান্যাল টিপ্পনী কাটেন, ‘দশদিন ধরে যেন ওঁর শান্তি-স্বস্ত্যয়ন হল—না?’
‘নলিনাক্ষ, দ্যাহো, তোমরা তো প্রমাণ দিয়্যা ছাইড়ল্যা যে অনাস্থা প্রস্তাব তোলার লাইগ্যা আবশ্যক আশি-বিরাশিডা সইও তোমরা জুটাইতে না-পাইর্যা এক-এক মন্ত্রীরে কাটমোশনে কাইটব্যার ধইরল্যা। কার্টসি টু পার্লিয়ামেন্টারি কাস্টম, তাতেই তো প্রমান হইয়্যা গেল, ফজলুল হকরে নিয়্যা কুনো আপও নাই, কিন্তু তার মন্ত্রীগ কারো কারো নিয়্যা ‘আপত্ত আছে। এমন প্রশংসাবাক্য শুইনলে তো আমার অসন্তোষের কোনো কারণ দেহি না।’
সেই ভিড়ে যোগেনও ছিল আর তার দিকে হকশাহেবেরও নজর পড়েছিল। যোগেন কিছু বলেও নি, কারণ সে তো ছিল অনাস্থা জানানোর বড় আসামি। হকশাহেবই বলে উঠলেন, ‘এই মণ্ডল, আইসো, নিয়ডে আইসো।’ যোগেন ভিড়ের পেছন থেকে একটু লাজুক মুখে এগিয়ে আসে। হকশাহেব বলতে থাকেন, ‘আরে, আইনল্যাম একডা নেয়াপাতি নারকেইল সেই গৌর নদী থিক্যা। কইলকাতায় পা দিয়্যাই হইয়্যা গেল স্বাধীন। সব্বাই মিল্যা ওর মাথা চিব্যাইয়া লিডার কইর্যা তুলছে। চলো দেহি, আজ আমার লগে—তোমারে কড়া আর বাঁচা যায়?’
যোগের কাঁধে ডান হাত রেখে হকশাহেব তাঁর চেম্বারের দিকে চললেন। যোগেন হকশাহেবের খপ্পর থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের ভিড়কে দেখলও না একবার!
আইনসভা থেকে যোগেনকে নিয়েই হকশাহেব রাইটার্সে চলে এলেন। গাড়িতে ওঠার সময় যোগেন বলে ওঠে, ‘দ্যাহেন, শেখ শাহেব, সব কিছুর একটা আদবরীতি থাকে। আপনার পাশে আমারে বইসতে আপনে ডাকতি পারেন। কিন্তু সেই ডাকার জবাবে, আমি আপনার পাশে গিয়্যা বইসব্যার পারি না।’
‘দ্যাহ, মণ্ডল, তুমি হিন্দুগ ছোঁয়াছুয়ি অ্যাসেম্বলিতে ঢুকাইও না। আমার সঙ্গে এক-সিটে বইসলে তোমার জাইত যায় ক্যামনে?’ ততক্ষণে যোগেন সামনের দরজা খুলে বসে গেছে।
