৭৩. যোগেনের এমএলএগিরি সেক্রেটারির সঙ্গে
হোম-সেক্রেটারির ঘরে ঢোকার আগে যোগেনের কেবলই মনে হতে থাকে—বোধহয় সে আগৈলঝরা স্কুলের ব্যাপার সবটা নলিনীবাবুকে বলতে পারেনি। নিজে নিশ্চিত হওয়ার আগেই সে হোমের ঘরে ঢুকে পড়ে আর ঢুকতেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
এই জায়গাতেই যোগেনের অসুবিধে—সে সেক্রেটারিয়টের এই আদবকায়দাগুলি আয়ত্ত করতে পারছে না। সে তো মোটামুটি জেনে গেছে কী করতে হয়। ‘হাউ ডু ইউ ডু’, ‘মে আই হেল্প ইউ,’
‘থ্যাঙ্ক ইউ এ লট,’
‘আই থিঙ্ক ইটস বেয়ন্ড মি’—এই কথাগুলি উপলক্ষ অনুযায়ী বলতে হয়। দেখা হলেই ‘গুডমর্নিং’, ‘গুড আফটার নুন’, ‘গুড ইভনিং’ করতে হয়। এমন কিছু ব্যাপার না। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে তো শাহেবদের সঙ্গে মিটিং করেছে আর ওকালতিতেও তো এইসব লব্জ লাগে। কোথাও তেমন কোনো অসুবিধে হয়নি। আইনসভায় ও সেক্রেটারিয়েটের পরিবেশটাই শাহেবি। বা, আইনকানুনে ঠাসা। বা, আদবকায়দা দুরস্ত। বা, কেতাটা অচেনা। যেন অনেকটা বামুনবাড়ি ঢোকার মত, কী যে ছুঁয়ে দেবে সেই ভয় মরা পর্যন্ত কাটে না। যোগেন তো বলিয়েকইয়ে চালাকচতুর। সে তো খুব অপ্রস্তুত হয় না।
কোর্টে তার দেশেরই একটা লোক আসামি, দুটো লোক সাক্ষী, আরো একটা লোক উকিল- এটাই পরিবেশ বদলে দেয়। তাকে আশ্বস্ত করে যে সে নিজের জায়গাতেই আছে। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড মিটিঙে কালেক্টারের সঙ্গে দেখা হলে সে রসিকতাও করত, ‘হ্যাভ ইউ বাই দিস টাইম লান্ট’ টু সেপারেট দি বোনস ফ্রম দি ফিশ?’ কালেক্টারও হয়ত বলতেন, ‘বেছছে খাওয়া। ‘ পুরনো আলাপের একটা সুতো থাকে—সে, মাছের কাঁটাবাছা নিয়েই হোক। মাছটা তো বরিশালের।
কিন্তু এই আইনসভায় বা সেক্রেটারিয়েটে যোগেন এখনো কিছু পায়নি যা তাকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে। চেনা মানুষজনের চেনা কথাবার্তা, চেনা জায়গা, চেনাজানা কোনো বিষয়, চেনাজানা ঘর কিছুই নেই। সেখানে যোগেন কী করে ‘হাউ ডু ইউ ডু’ বলে। সে হাসি দিয়ে ম্যানেজ করে।
‘বলুন, মিস্টার মণ্ডল, আমরা কী করতে পারি!’
‘আমাদের ভাষায় বলে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এর ইংরেজি কী হতে পারে? ধরুন, দণ্ড মানে পানিশমেন্ট আর মুণ্ডু মানে হেড। তাহলে তো বোঝানো উচিত ইউ আর দি মাস্টার অব মাই হেড অ্যান্ড মাই ওয়ার্কস।’
শাহেব হাসলেন বটে, বোঝাই গেল বোঝেননি। যোগেন কথাটা ইংরেজিতে ঠিকঠাক বলতে পারেনি, কেন যে গেল বলতে। তাছাড়া, তার উচ্চারণের কারণেও শাহেব না বুঝতে পারে। হঠাৎ যোগেন সংশোধন করে, ‘না। এটা বরং ঠিক হবে—দি লর্ড ওভার মাই হেড অ্যান্ড হার্থ—।’ শাহেব ‘ওভার মাই হেড অ্যান্ড আর্থ’ বলে আরো জোরে হেসে ওঠেন। তারপর বলে, ‘লাভ পোয়েম? লর্ড ওভার মাই হেড অ্যান্ড আর্থ–’
যোগেন আবার শুরু করতে যায় দণ্ডমুণ্ডের কর্তা থেকে কিন্তু এতটা তাকে বোঝাতে হবে আর শাহেবের ভুল হাসি এতবার শুনতে হবে যে, সে ছেড়ে দেয়। যেটুকু বিরতির পর বোঝানো যায় সে এবার কাজের কথাটা বলছে, সেটুকু সময়ের পর যোগেন বলে, ‘টেন্যান্সি অ্যাক্ট তো ইনট্রোডিউসড হয়েছে। বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ল্যান্ডে এর ফলে কী বদল ঘটবে—তার তো কোনো ডাইরেকশন নেই।’
শাহেব একটু চুপ করে থেকে পেন্সিলটা ঠোটের ওপর দু-বার বুলিয়ে গলার স্বর বদলে প্রশ্ন করেন, ‘কেন দরকার হবে, বলুন তো! আমরা তো একটা আইন তৈরি করতে চাই। যে-আইনে রায়তরা উ’ল এনজয় এ শেয়ার অব দি ওনারশিপ, ইরেস পেকটিভ অব দি জামিন্ দার্স। কেন এমন আইন দরকার হচ্ছে আর এই আইনের উদ্দেশ্য কী, ইনট্রোডাকশনে তো সেসবই বলা আছে। আইন যাঁরা বানাচ্ছেন, তাঁরা এই দুটো কথা পর্যন্ত জানিয়ে দিতে পারেন যাতে গবর্নমেন্টের কাছে পরিষ্কার থাকে—কী করতে চাওয়া হচ্ছে। যাতে, একজিকিউশনের সময় কোনো অস্পষ্টতা না থাকে। কিন্তু সোস্যাল ডাইমেনশন, লাভক্ষতি এসব গমেন্টের বিবেচ্য হবে কেন।’
যোগেন শাহেবদের সঙ্গে কাজের কথা বলতে পারে ভাল। তাদের জিলায় তো সেসন, সাবডিভিশন্যাল কোর্ট, এসপি, ডিএসপি, হাসপাতালের সিবিল সার্জেন—এদের সঙ্গে সবাইকেই অনবরত কাজ করতে হয়। তার ওপর আছে লঞ্চ কোম্পানিগুলির শাহেব—বেশির ভাগই অ্যাংলো। শাহেব-অফিসারদের মধ্যে কেউ-কেউ থাকে—নতুন কথা বা প্রস্তাব শোনামাত্রই নাকচ করে। তারপর যদি লেগে থাকা যায় তাহলে একইরকম হঠাৎ রাজি হয়ে যায়। কেউ-কেউ আবার প্রথমদিকে কোনো কথাই বলে না। শুনতে-শুনতে, যে-বলছে, তার বলাই ফুরিয়ে দেয়। তারপর, বলতে শুরু করে প্রস্তাবটা খুব ভাল তবে অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণতার জন্য যা-যা দরকার তা শাহেব বলতে শুরু করে আর বলতে-বলতে, যে-বলতে এসেছে তার বলা ফুরিয়ে দেয়। শাহেবরা সাধারণত ভিতু হয় আর সবকিছুকে সন্দেহ করে। এখন তো যোগেন চেহারা ও ভাবসাব দেখে বুঝতে পারে কে স্কটল্যান্ডের, আর কে আয়ার্ল্যান্ড বা ওয়েলসের। কারাই বা স্যাক্সন ম্যাপট্যাপ এঁকে, আড্ডা মারতে মারতে, নানা মজা করে, একটু-আধটু অ্যাকটিং করে যোগেনকে এসব খুব ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছিল দুই রাত্রির এক লঞ্চ যাত্রায়, বোরিস বলে এক বছর বাইশ-তেইশের শাহেব-আইসিএস-এর প্রোবেশনে এসেছিল। বরিশালের একেবারে দক্ষিণ-পুব মেঘনার একটা চর আছে, মনপুরা। জনবসতি কম। কিন্তু ফলন ভাল বলে জমির দর বেশ চড়া। মুসলমানদের আইন আছে, কেউ ইচ্ছা করলে মৃত্যুর আগে বা মৃত্যুর সময়ও, ‘ইকরারনামা’ তৈরি করতে পারে— তার অন্য সব দলিলদস্তাবেজের বা উত্তরাধিকারের ওপর ইকরারনামা। ফলে, বড়-বড় সব মালিকের ছেলেমেয়েরা বা ভাইরা বা জামাই-বৌরা অন্য সব অনুপস্থিত হকদারের পাওনা ঠকিয়ে জালি ইকরার নামা বানিয়ে সম্পত্তির দখল নিতে থাকে—বিশেষ করে দুর্গম গ্রামে। ইসলামি আইন অনুযায়ী নিকটতম মশজিদের ইমাম এই ইকরারনামা-র একমাত্র প্রয়োজনীয় সাক্ষী। এই ইকরারনামা-র সুযোগ নিতেই মুসলমান মালিক প্রধান দুর্গম সব জায়গায় মশজিদ তৈরি হতে থাকে। শেষে সরকারকে বাধ্য হয়ে ১৮৯৫-এ এই আইন বানাতে হয় যে একজন ওকালতনামা ভুক্ত উকিল ও একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মর্যাদার সরকারি অফিসারের সাক্ষ্য ছাড়া ইকরারনামা গ্রাহ্য হবে না। তখন শুরু হল, দূরদূরান্ত থেকে সময়ে অসময়ে সদরে এসে দল বেঁধে কান্নাকাটি—আমার নানার শ্বাস উঠেছে, এখনো বেঁচে আছে কী না সন্দেহ, উনি ইকরারনামা করবেন। শিগগির চলুন। সরকারি অফিসারদেরও ঘ্রাণশক্তি বাড়ে। বাড়ির মালিক মারা যাচ্ছে আর তোমরা বাড়িশুদ্ধু সদরে এসেছ? কোনো-কোনো থানা অফিসার, সংবাদ যে নিয়ে এসেছে, তাকে পেটাই দিয়ে হাজতে ঢোকানোর হুকুম দিতেন। তখন সত্যি কথা বেরিয়ে পড়ত। ফলে ইকরারনামা ঘটিত জালিয়াতি কমেছে।
মনপুরচরের বায়েত্ মামুদ নাম করা বড় চাষি। তাঁর উকিলই কোর্টকে জানায় যে বায়েশাহেবের শরীর অনেকদিন ধরেই খারাপ চলছে। এখন ওঁর ভয় হচ্ছে—হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হলে সম্পত্তির বিলিব্যবস্থা কী হবে। তিনি যথাযথ একটি ইকরারনামা করে শেষদিনের জন্য তৈরি হতে চান।
বায়েত্ মামুদ শাহেবের ইচ্ছার অসম্মান করা যায় না। আর কাজটা তখনই করতে হবে। সরকারি উকিল এজলাশের এদিকওদিক তাকালেন। এজলাশ ফাঁকা। যোগেন বসেছিল তার সিনিয়ারের পেছনে। তারও পেছনে বেঞ্চের এক কোণে বসে ছিল বোরিস, হাতে একটা বই কিন্তু সেটা খোলা নয়। যোগেন তখনো আর্টিকেল্ড। হঠাৎ তারই সিনিয়ার কোর্টকে বলে বসলেন,
যোগেনরে পাঠাইয়্যা দ্যান। বায়েৎশাহেবের কাজে তো কোনো জালজোচ্চুরির ভয় নাই। গিয়া দেইখব সব রেডিই আছে।’
মনপুরার চর মানে তো তেঁতুলিয়া দিয়ে মেঘনা।
যোগেন শুধু বলেছে, ‘সে তো দুইদিনের লঞ্চযাত্রা—’ আর তার সিনিয়ার খেঁকিয়ে ওঠেন- ‘বরিশালে ওকালতি করতে আইছ, খালনদী ছাড়া পথ নাই; তোমার অসুবিধাটা কীসে, টাইমে না লঞ্চে না নদীতে?’
যোগেন শুধু বলতে পারে, ‘আমি তো যাবই। ডেপুটিডা ঠিক কইরা দ্যান। পাইরলে আইজই রওনা দেই।’
হঠাৎ বোরিস দাঁড়িয়ে বলে, ‘ওঁর সঙ্গে যেতে চাইলে আমাকে কি যেতে দেয়া হবে?’
সরকারি উকিল তাকে জানিয়ে দেয়, ‘অফ কোর্স। ইউ আর অন প্রবেশন। ইউ সুড গো ইফ ইউ ক্যান।’
বোরিস হেসে যোগেনকে ডাকে, ‘চলো, তাহলে আমরা রওনা হই? সারারাত ধরে নদীর জলে?’
বোরিসের সুবাদে সরকারি একটা ডিঙিবোট পাওয়া গিয়েছিল।
সেই-সেই যাত্রায় নদীর ঐ ব্যাপ্তি ও বেগ দেখে বোরিসের উচ্ছ্বাস একটু অন্য খাতে বইল রাত্রির অন্ধকার নদীকে দৃশ্যত ঢেকে দিলে। তখন শোনা যাচ্ছে শুধু জলকল্লোল, শুধুই। আর যেহেতু দেখা যাচ্ছে না, স্রোতের ধ্বনিই দৃশ্য হয়ে উঠছিল। সেই ধ্বনিময় বারিপ্রবাহে বোরিস যেন একাই ভাসছে, তারার আলোগুলিতে জলে ছায়া ফেলে। পরে, যোগেন জেনেছিল, বোরিস কবিতা আওড়াচ্ছিল, কিটসের।
বোরিসের কাছেই যোগেন জেনেছিল—ভারতে সিবিল সার্ভিসে আসা গ্রেট ব্রিটেনে—কতটা সম্মানের। সিবিল সার্ভিস তো আরো কত দেশের আছে—নিউজিল্যান্ড, কানাডা, ইজিপ্ট, রোডেশিয়া, প্রেটোরিয়া কোথায়-না? কিন্তু কোনোটাই ইন্ডিয়ার সমতুল্য নয়। একমাত্র ইন্ডিয়ার বেলাতেই ভাবা হয়—একটা সিভিলাইজেশনে ঢুকছ। ‘ইয়োর গান্ধী হ্যাজ ডান মিরাক্লস উইথ অ্যান্টিকুইটি।’ ভেঙিয়ে-ভেঙিয়ে দেখিয়েছিল, স্কটিশদের সঙ্গে পালটা চেঁচালেই কাজ হয় আর আইরিশদের প্যাঁচে ফেলার উপায় কথা না-বলা, ‘দে ডোন্ট বিলিভ ইন এনি ওয়ার্ক, দ্যাট ডাস নট প্রোডিউস ওয়ার্ডস’, একটু সন্দেহবাতিক সত্ত্বেও ওয়েলসের লোকরা হেল্পফুল, এবং কোনো স্যাক্সনকে কখনো বিশ্বাস করবে না।
বোরিসের শেখানো সব লক্ষণ দিয়ে যোগেন আন্দাজের চেষ্টা করে, হোম-সেক্রেটারি কি তাহলে স্কট, যেমন, প্রথমেই, যোগেন যা বলছে, সেটা নাকচ করে দিল। তাহলে বোরিস-এর সূত্র অনুযায়ী পাল্টা গরম দিতে হয়।
‘আপনারা এত ওভারসিয়োর হন কী করে? গবমেন্ট সোস্যাল ডাইমেনশন, লাভক্ষতি এসব নিয়ে ভাববে না? আপনারা ভাবেন না? তাহলে সারদার অ্যাক্টে কোনো মুসলমানকে কোনোদিন ধরেন না কেন? অগ বা আমাগ সমাজে তো বিয়্যাশাদি বাল্যকাল ছাড়া হওয়াই পাপ। কিন্তু মুসলমানদের কি আপনারা রেয়াৎ করেন না, পাছে রায়ট লাগিয়ে দেয়? আপনারা পাটের দর বাঁধছেন না কেন, নামতে দিচ্ছেন কেন—যাতে মিলগুলা শস্তায় কিনতে পারে বলে নয়?’
হোম-সেক্রেটারি পেন্সিলটা টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে চোখ বড়বড় করে বলেন, ‘আরে বাপ, আপনি তো একেবারে স্পিচ রেডি করে এসেছেন। বলুন, আপনার কী কী ফ্যাক্টস চাই—’। হোম একটা কাগজে পেন্সিল ঠেকান।
স্কটরা কি একটা পালটা-ধমকেই ঢিট হয়ে যায়। না কী হোম, ওয়েলস-এর? সন্দেহবাতিক আছে কিন্তু হেল্পফুল।
‘আপনি ঝগড়া করলে ঝগড়া করতে পারি, তাই বলে কি আমি জানি, কী কী ফ্যাক্টস চাই?’
‘মাই গ—ড’, হোম দুই হাত মাথার ওপর তুলে হো হো হাসতে থাকেন, ‘মিস্টার মণ্ডল, এই একটা জ্যান্ত অ্যাসেম্বলির আপনাদের মত ইগার অ্যান্ড ইউথফুল মেম্বারদের সঙ্গে কাজ করার এক্সপিরিয়েন্সটাই আলাদা—’
‘কেন, মন্ত্রী তো আপনাদের আগেও ছিল।’
‘তা ছিল। কিন্তু তাঁদের তো কোনো অ্যাসেম্বলি ছিল না। রেসপনসিল টু দি অ্যাসেম্বলি, ইলেকটেড অ্যাসেম্বলি,—এটা তো অ্যাজ গুড অ্যাজ পার্লিয়ামেন্টারি ডেমোক্রেসি।’
যোগেন বুঝতে পারে না, হোম, তাকেই পরীক্ষা করছে কী না। সে তর্কে না গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ইংরেজরা ভোট ভালবাসে খুব। আর, বোধহয় কমিটি।’
‘এটা এক্কেবারে ঠিক। বোধহয় আমাদের আত্মবিশ্বাস কম, তাই নিজের ওপর ভরসা না রেখে কালেকটিভের ওপর চাপিয়ে দিই। সমাজের দিক থেকে সেটা অবিশ্যি সেফ’।
‘নিশ্চয়ই। আমাদের দেশে তো নিশ্চয়ই। কিন্তু আমাদের দেশে তো আপনারা একটা লেজুড় রেখেছেন। জনমত ইজ অ্যাকসেপ্টেড অ্যাজ জনমত অনলি হোয়েন হিজ এক্সেলেন্সিজ টেক ইট টু বি জনমত।’
হোম একটু চুপ করে গেলেন, চোখটা নামালেন। যোগেনের এ-কথাটা ওঁর পক্ষে শেয়ারকরা সম্ভব নয়। আর, কথার ঝোঁকে যোগেন ঠাট্টা করে ফেলেছে বেশি। সে একটু নিচু স্বরে বলল, ‘কিন্তু আমাদের দেশে কালেকটিভগুলি অনেক সময়ই এত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও সেকেলে যে অনেক সময়ই ধর্মীয় কারণে আইনকে বা আইনসভাকে কাজে লাগাতে চায়। একটা লাস্ট চেকিং অথরিটি দরকার। যুক্ত প্রদেশে তো কংগ্রেস আইন পাশ করে নিয়েছিল যে গরুকাটা বেআইনি। লাটশাহেব ফিরিয়ে না দিলে আইন পাশ হয়ে যেত।’
একটু চুপ করে থেকে হোম বলে, ‘আপনি কী ফ্যাক্টসের কথা বলছিলেন?’
‘আমার মনে হচ্ছে, টেন্যান্সি অ্যাক্টের এই সংশোধনে শুধুই রায়তি প্রজার কথা ভাবা হয়েছে। স্থায়ী রায়তদের কথা। কিন্তু লিগ্যালি অ্যান্ড মোরালি টেনান্সি শুড মিন দি ল্যান্ড ইউজ প্যাটার্ন যার হেতু নানারকম মালিক তার অধীনস্থ কৃষকের কাছ থেকে নানারকমের খাজনা আদায় করাই চইলছে। এইডা কি বাইর করা যায়—টেনান্সি সংশোধনে সুবিধাপাওয়া রায়তি প্রজার জেলা ওয়ারি সংখ্যা কত। আর নমশুদ্দুর সমাজের কত শতাংশ কৃষিকাজের কোন্ স্তরে যুক্ত।’
‘এত কঠিন হোমটাস্ক আমাদের দিলেন? এটা তো ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের ব্যাপার—’
‘ওদের কাছ থেকে আপনি আনান্যা নেন, আমাদের কাছে, হোম, সুইট হোম।’
যোগেন হাসতে-হাসতে দাঁড়িয়ে উঠেছিল, শাহেব চেয়ারে বসে থেকেই জিগগেস করলেন, ‘আপনি কি খুব ব্যস্ত’?
‘না তো, কিছু বলবেন?’
‘আপনাকে একটা অনুরোধ করব?’
‘নিশ্চয়ই’, যোগেন বসে।
‘আপনি কি হবিগঞ্জের কোনো খবর পেয়েছেন?’
‘হবিগঞ্জের? মানে সিলেটে তো?’
‘সেখানকার ইন্ট্রাহিন্দু রায়টটা তো আবার মাথা চাড়া দিয়েছে। প্রায় বছরখানেক হল আমরা গবমেন্ট থেকে সামলানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু যেই ভাবছি থামল, অমনি একটা নতুন গোলমাল বাধছে। সত্যি দায়িত্ব পুরোটাই উঁচুজাতের হিন্দুদের। আর নমশূদ্ররাও এখন তাদের জিদ ছাড়ছে না। কাল আমি আসামের হোম-এর একটা রেডিয়োগ্রাম পেয়েছি—সঙ্গে সিলেটের ডিএম-এর রেডিয়োগ্রাম। আপনাকে দেখে মনে হল—আপনার মত কেউ একজন, যাঁকে গবমেন্টসহ তিনপক্ষই মানতে পারে ওখানে যদি যান, সবার সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে একটা সমাধান বেরতে পারে—আমরাও, মানে ওখানকার গবমেন্ট, সেই সূত্র ধরে আর-একটু শক্ত হতে পারি।
বাঙালিরা জড়িয়ে আছে বলেই আসাম গবমেন্ট খুব একটা মেজার নিতে সংকোচ করছেন। শেষে একটা ছোট রায়ট ঠেকাতে গিয়ে আসামি-বাঙালি রায়ট বেধে না যায়।’
যোগেন একটু গম্ভীর হয়ে চুপ করে থাকল, কপালে ভাঁজ ফেলে একটু অন্যমনস্ক তাকিয়ে থাকল—এটা যোগেনের ভঙ্গি একটা—যখন সে নাকের ডগার চাইতে বেশি দেখতে পায়।
‘হ্যাঁ। আমি যাব। ব্যবস্থা আপনারা করবেন, না আমিই করে নেব?’
‘না, না, সে কী? আপনি তো গবমেন্টের অনুরোধে যাচ্ছেন। আমরা বাধিত। আপনি কবে যেতে পারবেন, বলুন।
‘আজই। সন্ধেবেলা ঢাকা মেলে। তাহলে কালকের মধ্যে পৌঁছে যাব।’
‘এর চাইতে ভাল আর কী হতে পারে।’ শাহেব বেল টিপে কাউকে ডাকলেন। যে এল, তাকে বললেন, কোনো একজন পালিতবাবুকে ডেকে দিতে। পালিতবাবু শব্দটা যোগেনের কানে এল, শাহেব ‘প্যা’ না বলে ‘পা’ বলার চেষ্টা করায়।
যোগেন মনে-মনে ছকে নিচ্ছিল সিলেটের ও হবিগঞ্জের নকশাটা। ছকে নিচ্ছিল না ঠিক, মনে এসে গিয়েছিল। যোগেন সেটা বরং মুছে দিল— সেই নকশাটার দরকার নেই বলে। হবিগঞ্জে এমন একটা গোলমালের খবর তার কানে এসেছে, সে শুনেছে, কিন্তু খবরটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েনি। জড়িয়ে পড়েনি মানে তার বা অন্য কোনো নেতার কাছে কোনো তেমন দরকারের কথা পৌঁছয়নি।
