১০
2 of 4

৫২. যোগেনের ডাকা মিটিঙের দূত মুহুরি শিবু

৫২. যোগেনের ডাকা মিটিঙের দূত মুহুরি শিবু

সকালে মুহুরি শিবু হালদার আসতেই যোগেন একটা চিঠি লিখে তার হাতে দিয়ে বলে, ‘এহানে তো খাম খোঁজা নিরর্থক। আপনি এডডা কিন্যা চিঠিখান ভইর‍্যা নিবেন। আইজ তিনডার সময় সার্কিট হাউসে আমি এখানকার কয়েকজন গণমান্য মানুষের সঙ্গে মিটিং করব। তার খবর তো তাগো আগে জানান্ হয় নাই—’ বিস্ময় গোপন করার অভ্যেস থেকেই শিবু হালদার পারল তার গোল হয়ে যাওয়া চোখের মণিটাকে ঠিকরনো থেকে বাঁচাতে ও তার ঠোঁটটা কিছুতেই ফাঁক না-করতে। মক্কেলকে তার এমন অহর্নিশি বোঝাতে হয়—কত বড় বিপদ মক্কেলের সামনে। তবু তার মুখ থেকে ‘সা র কি ট হাউস’ কথাটা সে ঠেকাতে পারে না। পরমুহূর্তেই সে সচেতন হয়ে যায় ‘এসডিওকে তো?’

‘হ্যাঁ, তাই দ্যান, উনি যারে জানানোর জানান। সার্কিট হাউস বোধহয় পিডবলুডি-র আন্ডারে। সে আপনে যা ভাল বুঝেন। মোট কথা তিনডার সময় কেও য্যান আইস্যা ফিরা না যান। তাইলে আমার মাথাকাটা যাবে।’

ঠোঁটের এক প্রান্তে, সামান্যতম মুচকি হেসে শিবু হালদার চলে যায়—যেন ম্যাজিস্ট্রেট, কমিশনার ইনজিনিয়ার তার ডালভাত।

বড় রাস্তায় পড়তে যেটুকু গলি পেরতে হয় তারমধ্যেই হালদার আর তার বিস্ময় নিজের কাছেও গোপন রাখতে পারে না। যোগেন মণ্ডলকে ভোটে দাঁড় করানোর প্রায় সব কৃতিত্বই তার। দশজন তাবলে বটে আর যোগেনের জেতায় তার মানমর্যাদা সে একটু বাড়িয়েও নিয়েছে বটে কিন্তু তার মানে যে যোগেন এখন সার্কিট হাউসেও মিটিং ডাকার হকদার—এটা তো সে ভাবতেও পারে না, দু-এক পাত্র রস খাওয়ার ফলে পেট গরমের দুঃস্বপ্নেও পারে না। সার্কিট হাউসের ওপর যোগেনের দখল কায়েম হওয়ার মানে শিবু হালদারের দখলও কায়েম হওয়া—ষোল আনা নয় নিশ্চয়ই কিন্তু লালপয়সা অন্তত। লালপয়সা হলেই শিবুর যথেষ্ট। তাতেই সে মুহুরি গিরির রেট ডবল করে দিতে পারবে। আর, লোকজনের চিঠি মুশাবিদার রেটও ডবল করে নিতে পারে। এমএলএ-র কাছে সরাসরি চিঠির মুশাবিদার জন্য আলাদা একটা রেটও তৈরি করতে পারে। এমএলএ-র কাছে সুপারিশের জন্যও…। শিবু যেন জোর করেই এই সুযোগ-তৈরির কথা পুরো ভাবা থামিয়ে দেয়। সেই ব্যক্তিগত সুপারিশ, ন্যায্য হবে কী না—এ-সংশয় তার ঘোচে না। সেই সংশয়ের কারণে শিবু হঠাৎ এই দায়িত্ব পালনের তাগাদা বোধ করে আর একটা টমটম ডেকে বসে। কাছারি যেতে টমটম—শিবু হালদার সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ভাবতে পারে না।

কিছুটা দূর যেতে-না-যেতেই শিবুর আক্কেল ফিরে আসে—সার্কিট হাউসের বন্দবস্তের জন্য সে তো যাচ্ছে কাছারিতে—এসডি ও শাহেবের কাছে? মেম্বারের চিঠি নিয়ে? মেম্বার তো চিঠি লিখতেও পারেন, পাঠাতেও পারেন—হাতচিঠি বা ডাকচিঠি! তাই বলে কি শিবু সরাসরি এসডিও শাহেবের সামনে গিয়ে নিজের হাতে সে চিঠি দিতে পারে? হাকিম যখন উকিলবাবুর কাছে কোনো দলিল বা নথি চান, সেই দলিল বা নথি কি শিবু নিজে দিতে পারে হাকিমকে? হাকিমশাহেব দেখতেই পাবেন না তাকে। শিবু দেবে প্লিডারের হাতে, প্লিডার দেবেন হাকিমের চাপরাশিকে, চাপরাশি রাখবে হুজুরের টেবিলে। শিবু হঠাৎ কোচয়ানকে ডাকে, ‘এই, খাড়ারে ভাই, খাড়া। শিবু দুটো ডবল পয়সা কোচয়ানের হাতে দেয়। শ্রীরাধা না চন্দ্রাবলী—ঠিক হয় নাই? হইলডা কী? কোচয়ান ঘোড়ার দড়ি টেনে এগুনোর ইশারা দেয় আর দুটো ডবল-পয়সাই কানের ফুটোয় গুঁজে রাখে। ভাগ্যিস, শিবুর আক্কেল টাইম মত ফিরল, এসডিও অফিসের বড়বাবুর চাপরাশি ফরজ আলি থাকে এই রাস্তার চাপাডালির মোড়ের বৌয়ের রাস্তায়। ওর কাছে অফিসের বড়বাবুর চাপরাশি থাকে। তার কাছে চিঠিটা দিয়ে, তার সঙ্গেই শিবু কোর্টে যাবে। একেবারে পাঁঠা নিয়্যা কশাইখানায়।

.

পেছনের ক্যারিয়ারে প্রহ্লাদকে বসিয়ে সাইকেলে যোগেন এসে পৌঁছয় তিনটে বাজার দু-চার মিনিট আগে। প্রহ্লাদ আগেই ক্যারিয়ার থেকে নেমে যায় আর যোগেন সার্কিট হাউসের সিঁড়িতে একটি পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। চওড়া বারান্দা এতই চওড়া যে বারান্দার পেছন দেয়ালটায় মেঝের ছায়া পড়ে।

যোগেন আবার পেল্লাদের সাইকেলের গাড়োয়ানি নিল কব্ থিক্যা।

যোগেন গলাটা চিনতে পারে না, সে একটা এমন জবাব দিল যা সব জায়গাতেই খাটে, ‘আইজক্যাল কি কেউ এড্‌ডা পেশা নিয়্যা জীবন নির্বাহ কইরতে পারে, সব চাকরিই এডডু-আধডু অবভ্যাস রাখা ভাল স্যার।’

আবার সেই আবছায়া থেকে গলা এল, ‘শুইনব্যার পাই এই বছরই নাকী লাটশাহেব-বদলি। সেই লাটগিরিও অভ্যাস কইরো এড্‌ডু’।

যোগেন সাইকেলের হ্যানডেল ধরে কথা বলছিল, সিট থেকে নেমেও সাইকেলটা সে ধরেই রেখেছিল। বেয়ারা-চাপরাশি-পিয়নটিয়ন কেউ এসে সাইকেলটা নিয়ে স্ট্যান্ডে রেখে দেওয়ার কথা। ভিতর থেকে ঐ গলার স্বর আর বাইরে তার সাইকেল ধরা-রাখা নিয়ে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তায় যোগেন সেই আবছায়া থেকে উঁচু স্বরে ভেজা বিদ্রূপের জবাবে তীব্র হেসে উঠে বলে, ‘আরে স্যার, তার লগেই তো আমারে আপনার লগে পাঠাইল। কইল যে আপনার মত একখান রিট্যায়ার লাটশাহেব ভূভারতে নাই। চিঠি পান নাইই স্যার—’

বলতে-বলতে যোগেন এদিকওদিক তাকাচ্ছিল, তার চেনা কেউ আছে কী না—সাইকেলটা ধরার মত। ইতিমধ্যেই এক কনস্টেবল এসে সাইকেলটা নিয়ে চলে যায় আর যোগেন সেই বারান্দায় ঢুকে পড়ে। বারান্দার অন্য প্রান্তে গদি-চেয়ারে বেশ কয়েকজন বসে আছেন। সদর এসডিও. কাছে এসে নমস্কার করে জিজ্ঞাসা করেন, ‘স্যার, গবমেন্ট কি থাকবে আপনার মিটিঙে? কিছু কি মিনিট করতে হবে?’

এর জবাব দিতে যোগেনকে একটু দাঁড়াতে হয়। ‘দ্যাহেন। সেশন শ্যাষ হতেই আমি আসছি। এঁরা আমার কনস্টিটুয়েন্সির মান্য মানুষজন। এঁদের নিকট আমি শুনতে চাই—তাঁরা এই গবমেন্টকে কী ভাবে দেখছেন। আমি এঁদের কাছে বইলতে চাই—আমি এই গবমেন্টকে কী ভাবে দেখছি। আর, আমার কনিস্টস্টুয়েন্সিতে কোন্ কোন্ কাজের ওপর জোর দিতে চাই সেটা বলব। এই লাস্ট পার্টটা মিনিটেড অইলে ভাল হয়। তবে আমি তো আপনাগো প্রেমিসেসে মিটিং ডাকছি। আপনারা যদি চান—পুরা মিটিংটা মিনিট করতে, করেন। আমার কোনো আপত্তি নাই।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *