১০
2 of 4

৮৭. অ্যালবার্ট হলের মিটিং

৮৭. অ্যালবার্ট হলের মিটিং

১৩ মার্চ অ্যালবার্ট হলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিক মিটিঙটা যে এত বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে তা উদ্যোক্তারা কল্পনাও করতে পারেনি। সভাপতি হলেন কংগ্রেস লেজিসলেটিভ পার্টির চিপহুইপ জে সি গুপ্ত। কিন্তু জে সি গুপ্তের পরিচয় তো কংগ্রেস দিয়েও না, পদমর্যদা দিয়েও না। জে সি গুপ্ত মানে জে সি গুপ্ত। আর মিটিং চলার সময়ই এসে ঢুকলেন রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র। তখন বক্তৃতা করছিলেন কর্পোরেশনের নেতা সন্তোষ বোস। সন্তোষ বোস সুভাষের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। তিনি তো বক্তৃতা থামিয়ে বলে উঠলেন, ‘ঠাকুর গুরু চাঁদের স্মরণে এই সভার জাতীয় গুরুত্ব যে কতটা তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল এখন, যখন আমাদের প্রিয় নেতা সুভাষচন্দ্র সারা ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েও এই সভায় এসেছেন। আমি আর বক্তৃতা করতে চাই না, আমি এখন শুনতে চাই।’

সুভাষ গান্ধীটুপি পরে এসেছিলেন। তাঁর মুখে সব সময়ই এমন একটা শীর্ণ কমনীয়তা থাকে যে তাঁকে শুধু দেখতেই ভাল লাগে। সুভাষের রূপ নিয়ে একটু রটনাও আছে। গান্ধীটুপিতে তাঁর বয়স একটু বেশি দেখায় বলে কেউ-কেউ বলেন। কিন্তু টুপি না পরলে তো মাথাভর্তি টাক। গায়ের রং আর টাক—বোস ভাইদের এই দুটো বংশচিহ্ন। মিটিং-টিটিঙে সুভাষ কোনো এমন অতিরিক্ত ভঙ্গি করেন না যাতে তিনি একটু বেশি নজরে পড়ে যেতে পারেন। কেউ যদি মঞ্চে তাঁর সঙ্গে কানে-কানে কথা বলে, সুভাষ যেন একটু এড়িয়েই যান। বাংলার মানুষজন তো প্রায় দশ-বার বছর, জেলখাটা ও নির্বাসনের বছরগুলো বাদ দিয়ে, তাকে নেতা হিশেবে মঞ্চে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কারো কারো কাছে সুভাষ যেন দেশবন্ধুর উত্তরাধিকারী। সুভাষ ও যতীন্দ্রমোহনের প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়ও দেশবন্ধুর মৃত্যুর আঘাত সুভাষকেই বইতে হচ্ছে বেশি—মনে হত। বাংলায় তো কোনোদিন নেতার অভাব নেই কিন্তু অতীতে বা এখনো কেউ ঠিক সুভাষের মত নন, নেতৃত্ব যাকে কোনো নতুন বৈভব দেয়নি, বরং তিনিই নেতৃত্বকে বৈভব দিয়েছেন।

জে সি গুপ্ত সুভাষকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি এখুনি বলবে?’ সুভাষ হাত নেড়ে বলেন, ‘শুনি একটু’। জে সি গুপ্ত পরবর্তী বক্তার নাম ঘোষণা করেন, ‘বঙ্কিম মুখার্জি—’। একটা ছোট হাততালি বাজল। ধুতিপাঞ্জাবিতে দীর্ঘ দেহী বঙ্কিমবাবুকে, বিশেষত তাঁর চুলের বিন্যাসের জন্যই হয়ত, একটু নাটুকে লাগে। তিনি তাঁর জলদমন্দ্রস্বরে যখন কথা বলতে শুরু করেন ও সেই কথার টানেই গলা উঁচু নিচুতে খেলান–তখন নাটকটা আরো জমে যায়। হয়ত এই উপভোগ্যতার জন্যই তাঁর বক্তা হিশেবে জনপ্রিয়তা আছে। বঙ্কিমবাবুর খ্যাতির আর-একটা কারণ তাঁর বক্তৃতার দৈর্ঘ্য। তারসপ্তকে গলা খেলে, সুপুরুষ, গমগমে গলা, এতক্ষণ বলেন—তাঁর তো খ্যাতি হবেই। কিন্তু খ্যাতির প্রধান কারণ—সকলেই জানেন কংগ্রেসের বড় নেতা হলেও আসলে তিনি কমিউনিস্ট।

নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার বললেন বঙ্কিমবাবু পরে। তিনি বলেন—বঙ্কিমবাবুর উলটো ভঙ্গিতে। কোট কেটে। যুক্তিগুলোকে স্পষ্ট করে। যে-কথাটা বঙ্কিমবাবু অনেক ঘুরিয়ে ইঙ্গিতমাত্র করতে পেরেছিলেন এই ভরসায় যে যাঁরা বোঝার ঠিক-কথাটাই বুঝে নেবেন, সেই কথাটাই নীহারেন্দুবাবু স্পষ্ট করে দিলেন যে তাঁরা যে-সামাজিক আদর্শে ও তত্ত্বে বিশ্বাসী তাতে কোনোরকম গুরুবাদ বা ধর্মমতকে স্বীকৃতি দেয়া চলে না, বরং সদাসর্বদা বিরোধিতা করতে হয়। গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রতি সম্মান জানাতে তিনি এসেছেন তাঁর ধর্মমতের কারণে নয়। কারণ একটাই। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যাদের সেই নমশূদ্র জনগণ, সবদিক থেকে অত্যাচারিত, শোষিত, পীড়িত, সুযোগ বঞ্চিত। হাজার বছর ধরে এই নমশূদ্ররা ব্রাহ্মণ্যধর্মের অস্পৃশ্য। সেই অস্পৃশ্যের জীবনে নেই জমির অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, সামাজিক অধিকার। আমাদের কাছে এই নমশূদ্র সমাজ তাই দেশব্যাপী প্রলেতারিয়েত, সর্বহারার, অংশ। তাদের কিছুই হারাবার নেই। তাঁদের যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁকে, ঠাকুর গুরুচাঁদকে, তাই আমরা শ্রদ্ধা করি।

ঠিক মঞ্চ তো নেই–তবু যেখানে প্রধান নেতারা বসেছিলেন, জে সি গুপ্ত, সুভাষ, বিরাট মণ্ডল, রসিকলাল বিশ্বাস, ডাক্তার গঙ্গাচরণ সরকার—তার পেছনে যোগেন, পি আর ঠাকুর, যজ্ঞেশ্বর মণ্ডল এঁরা দাঁড়িয়েও ছিল, এদিকওদিক যাচ্ছিল। নীহারেন্দুবাবু সেই লাইনেই একটা চেয়ারে বসলেন। যোগেন তাঁর পেছনে এসে তাঁর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলে, ‘একে বলে পেরেক ঠোকা কথা, হাতুরির একটা মারও পেরেকের মাথার বাইরে পড়ে নাই। কিন্তু এতটা ক্ল্যারিটি আবার কথাটাকে সোজা কইরা দ্যায় না তো?’

নীহারেন্দুবাবু একটু হাসলেন। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে যোগেনকে ডাকলেন, যোগেন মাথা নিচু করলে বললেন—’আপনার কথার সেকেন্ড পার্টটা কিন্তু ভাবার কথা—ভাবব, কথা হবে, আপনিও ভাববেন।

আরো অনেকে বললেন, বললেন কর্পোরেশনের কাউন্সিলার বেগম শাকিনা মৌজিদদাজা, উর্দুতে। যাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমি এসেছি তাঁকে আমি দেখিনি বা তাঁর কাজকর্মের কথাও আমি জানি না। কিন্তু তিনি যে কত বড় মানুষ ছিলেন, তা তো এই সভা দেখেই বোঝা যাচ্ছে—আপনারা নিজেরাই কত বড়। মির্জা গালিবের একটা শায়ের আছে, মির্জা বলছেন—বড় গাছের তলায় নাকী আর কোনো গাছ জন্মায় না, তাহলে, আল্লা, তোমার ছায়ায় আমরা দুনিয়া জোড়া এত মানুষ আছি কী করে?’

জে সি গুপ্ত বললেন, ‘সুভাষ, এবার তুমি বলো। সবাই অপেক্ষা করে আছেন।’

‘আমি কিন্তু আপনার কথা শুনব বলে অপেক্ষা করব। সাংবিধানিক দিক থেকে,’ সুভাষ উঠে দাঁড়ালেন, সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। সুভাষ নমস্কার করলেন ও হাত জোড়া রেখেই সব দিকে তাকালেন, বোঝাতে যে তিনি সবাইকেই নমস্কার জানাচ্ছেন। শ্রোতাদের অনেকে তাঁকে প্রতিনমস্কার জানাল।

সুভাষ একটু চুপ করে থাকেন।

হলেও এতটা নীরবতা যেন সকলের শ্বাস শোনা যায়।

এ-সভার লোকজন এসেছে নানারকম সম্পর্ক থেকে। গুরুচাঁদ ঠাকুরের ভক্ত নমশূদ্ররা এসেছে। এসেছে কংগ্রেসেরও ভিতরে যারা বামপন্থী, তারা, প্রধানত সুভাষের জন্য। শুধু সুভাষকে দেখতেই একটা ভিড় হয়েছে। কংগ্রেসের ভিতরে অনুশীলন-যুগান্তর দলের যে-জেলখাটা রাজবন্দীরা কংগ্রেসের কর্মসূচির মধ্যে নিজেদের বিপ্লবী কাজকর্মের একটা জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁরাও এসেছেন, তাঁদেরই প্রার্থী হিশেবে সুভাষ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। কর্পোরেশনের নেতা ও কর্মীরা এসেছে। ঠাকুর গুরুচাঁদের স্মৃতিসভার মত নিষ্কণ্টক উপলক্ষ আজকাল সচরাচর মেলে না।

কিন্তু আসেনি, নমশূদ্রদের একটি অংশ, মন্ত্রী মুকুন্দ বিহারী ও তাঁর ভাইদের দলবল। এই মিটিঙের খবর সবাই জানার পর কলকাতায় গুজব রটেছে যে কংগ্রেস শিডিউল কাস্টদের ভাগ করে দিতে পেরেছে, বেশিরভাগই আছে কংগ্রেসের সঙ্গে, তাদের নিয়ে আজকালের মধ্যেই কংগ্রেস হক-মন্ত্রিসভাকে ফেলে দেবে। এই গুজবটা দু-চারদিন পাক খাওয়ার পর পালটা গুজব একটা চলতে লাগল—হকশাহেব আরো একজন শিডিউল কাস্ট মন্ত্রী নেবেন, এই সেসনেই, তাহলে সরকার পড়বে না। ‘বসুমতী’, ‘বঙ্গবাসী’, ‘নায়ক’, ‘আনন্দবাজার’, অমৃতবাজার, অ্যাডভান্স, লিবার্টি ফরোয়ার্ড, সান অব ইন্ডিয়া’–য় সম্পাদকীয় বা মন্তব্য বা চিঠিপত্র বেরতে শুরু করেছে। মন্ত্রিসভা ও আইনসভার ‘ইনডিপেনডেন্ট’ মুসলিম ও সিডিউল মেম্বারদের ভিতর আঁচ করা শুরু হয়ে গেছে—কী হবে ও তারা কী করবে? মুকুন্দবিহারী যেকরেই হোক, মন্ত্রী থাকতে চান, মন্ত্রিসভা যেমনই হোক, মন্ত্রিসভা নাও থাকতে পারে কিন্তু মুকুন্দবিহারী যেন মন্ত্রী থাকেন। যদি রাজা-গজা বাদ দেয়া যায়, তাহলে শিডিউল কাস্টদের মধ্যে মুকুন্দবিহারী ও উপেন বর্মণের দাবির ওজন সবচেয়ে বেশি—তাদের মত এমএ পাশ কি আর-কেউ আছে। ৩৭-এর ভোটের পর অবিশ্যি বিএ-বিএলদেরও প্রতাপ বেড়েছে।

আজকের এই সভা। সরকারবিরোধী সভা—এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। লিগের একজন নেতাও নেই, হিন্দু মিশনেরও নেই। হয়ত ইচ্ছে করেই দুই দলকেই বাদ রাখা হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ইনডিপেনডেন্ট’ কৃষকপ্রজার কেউ নেই, হকশাহেবের কৃষকপ্রজারও কেউ নেই। এই মন্ত্রিসভাকে ভেঙে দিলে বা নতুন মন্ত্রিসভা তৈরি হলে কি তার মত প্রাক্তন অনুগতদের কথা মনে রাখে কেউ—এই ধাঁধার জবাব না পেয়ে মুকুন্দবিহারী, তাঁর ভাইদের নিয়ে, তাঁর ভোটের জায়গা খুলনায় আগামীকাল একটা সভা ডেকেছেন। সে সভাও বড়ই হবে—মল্লিকদের নামে, নলিনী সরকারও যেতে পারেন, সেখানে এই সরকারকে সমর্থন দিয়ে প্রস্তাবও নেয়া হবে। ১৩ মার্চ অ্যালবার্ট হলের সভা। ১৪ মার্চ খুলনার সভা।

সুভাষ খুব নিচু গলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলছিলেন। তাঁর একটা ভঙ্গি আছে—একেবারে এখনকার সমস্যা নিয়ে তাঁর মত ব্যাখ্যা করতে-করতে টুপিশুদ্ধু ঘাড়টা একটু পেছনে হেলে—বিশেষ করে গোপনে যদি গান্ধী-সমালোচনা মেশানো থাকে।

‘ঠাকুর গুরুচাঁদ ও তাঁর পিতা ঠাকুর হরিচাঁদ সর্বজনশ্রদ্ধেয় এমন মানুষ যে তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিদিনই আমরা দিন শুরু করতে পারি। এঁদেরই বলে প্রতাঃস্মরণীয়। মিটিং ডেকে আয়োজন করে একদিন তাঁদের স্মরণ করে, বাকি ৩৬৪ দিন তাঁদের ভুলে থাকার মত মানুষ তাঁরা নন। গুরুস্থানীয়দের এই দুই ভাগ করা যায়—এক দল নিত্যকর্মে স্মরণীয় আর-এক দল জীবনকর্মে স্মরণীয়। কিন্তু এই দুই ভাগের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, যিশু খ্রিস্ট, মোহম্মদ, রামানুজ, এঁরা আমাদের জীবনের নীতি শেখান—যেমন, যতমত তত পথ, বীরবাণী, অহিংসা, শরিয়ত, বৈষ্ণবধর্ম। আর-এক ভাগে যাঁরা তাঁরা আমাদের নিত্যকর্ম মনে করিয়ে দেন—চৈতন্য, নিত্যানন্দ, হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ, বুদ্ধদেব, মহাবীর। এঁরা আমাদের শিক্ষা দেন—হরির্নামৈব কেবলম্, হাতে কাম-মুখে নাম, নির্বাণ, অহিংসা করুণা।

‘আমরা ভারতীয়রা, অবতারে বিশ্বাস করি। পাশ্চাত্য দর্শনে সেই অবতাররূপী মানুষকেই বলা হচ্ছে ‘সুপারম্যান।’ গুরুচাঁদ ঠাকুর ছিলেন একজন অবতার, সুপারম্যান। তিনি বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে নবজীবন সঞ্চার করেছেন। তিনি তপশিলভুক্ত জনগণকে উন্নত করেছিলেন যাতে তারা রাজনীতিতে ও সমাজে বর্ণহিন্দুদের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারে।

‘বর্ণহিন্দু ও তপশিলভুক্ত হিন্দুরা মিলেই অখণ্ড হিন্দুসমাজ তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে বস্তুত কোনো পার্থক্য নেই। ভারতীয়দের ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়। ভারতীয়রা একটা পরাধীন জাত, অনগ্রসর, অত্যাচারিত, আক্রান্ত ও পরাজিত জাত। আপনারা শিডিউল কাস্টদের ‘অনগ্রসর’ জাতি বলবেন না, কারণ আমাদের পুরো জাতিটাই ‘অনগ্রসর’, ‘ডিপ্রেসড’। ব্ৰাহ্মণ ও কায়স্থরাও কোনো ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা পেলে এই সব প্রভেদপার্থক্য লুপ্ত হয়ে যাবে।

‘আমাদের এই সভার সভাপতি শ্রীযুক্ত যোগেশচন্দ্র গুপ্ত। তাঁর আইনজ্ঞানের ওপর ভর করে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেকগুলি ধারা এখনো সক্রিয় থাকতে পারছে। আমি তাঁর কাছ থেকে এই তপশিলভুক্তির আইনি তাৎপর্য একটু জানতে চাই।’

জে সি গুপ্ত ছিলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহনের খুবই ঘনিষ্ট সহকর্মী। ফলে, সুভাষ ও তাঁর মধ্যে একটু আড় থাকা স্বাভাবিক। অনেকদিন যোগাযোগ নেই—সুভাষ হয় জেলে নয় বিদেশে। সুভাষ চান সেই আড়টা কাটাতে।

‘সাধারণত সভাপতিই বলে দেন কী বিষয়ে বলতে হবে। যদিও আমি এ-সভার সভাপতি, তবু, সুভাষই আমাকে বলে দিয়েছে, কী বলতে হবে। আমি তার কথা মেনে নিচ্ছি। কারণ সে এখন আমাদের জাতির সভাপতি, সে দেশের রাষ্ট্রপতি, তার নির্দেশ আমাদের সকলকে কোনো প্রশ্ন না তুলে মানতে হবে।’ এত জোরে হাত তালি ওঠে—জে সি গুপ্ত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন। একবার সুভাষের দিকে তাকিয়ে তাকে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করলে সুভাষ জোড় হাতে দাঁড়ান ও সবাইকে শান্ত হতে বলে দু-হাত তোলেন।

‘কথাটা সুভাষ তুলেছে বলে বলছি বটে কিন্তু কথাটা এই মুহূর্তে আমার কাছে খুব জরুরি মনে হচ্ছে—আইনের দিকে থেকে ও রাজনীতির দিক থেকে।

‘আপনাদের অনেকেরই নিশ্চয় মনে আছে যে দ্বিতীয় রাউন্ডের গোলটেবিল বৈঠক গান্ধীজি উদ্বোধন করেছিলেন ও তিনি বলেছিলেন—আমাদের তো ডাকা হয়েছিল স্বাধীন ভারতের সম্ভাব্য সংবিধান নিয়ে মতবিনিময় করতে। এসে দেখছি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পছন্দ ও সুবিধে মত একটা ভারত সাজিয়ে রেখেছেন। তাঁর এই কথার মধ্যে ইঙ্গিত ছিল আগা খাঁর প্রতি, শিখদের অনেক রকম প্রতিনিধির প্রতি, দক্ষিণ ভারতের জাতপাতের প্রতিনিধিদের প্রতি এবং ডক্টর আম্বেদকরের নেতৃত্বে ভারতের অস্পৃশ্য জাতিগুলির প্রতিনিধিদের প্রতি। তখন যাদের বলা হত, অচ্ছুৎ-জাত, পরে তাদের বলা হতে লাগল, ‘অনুন্নত জাত’, ‘অবনত জাত।’ এসব নামে গান্ধীজির খুব আপত্তি ছিল, উনি বলেছিলেন, ‘এইসব নাম দিয়ে ওদের হিন্দুসমাজ থেকে আলাদা করা হচ্ছে কেন—ওরা তো হিন্দুসমাজেরই ওতপ্রোত অংশ। তিনি এদের নাম দিলেন, ‘হরিজন’ ও একটা ‘হরিজন সেবা সংঘ’ও তৈরি করলেন। গান্ধীজির কথাতে আমরাও কান দেইনি, অনগ্রসর শ্রেণীও কান দেননি। সম্ভবত ব্রিটিশরাই কান দিয়েছিল। তাই ম্যাকডোন্যান্ড কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডে একটা কাগজের শিটে এই জাতগুলির একটি তালিকা জুড়ে দিলেন। এই কাগজের শিটটাকে বলে শিডিউল। কিন্তু শাহেবদের রাজ্য-শাসনের জন্য, আমাদের প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের জন্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য একটাই কোনো নাম তখন দরকার হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা সবাই ঐ জাতের নামের লিস্টিটাকেই তাদের জাতের নাম বলে ধরলাম। আমরা বলতে লাগলাম, শিডিউল কাস্টটাই একটা জাত, ও যাদের নাম ওখানে নেই তাদেরও আমরা শিডিউল বলেই বলতে লাগলাম। বলা যায়, শূদ্র বা চণ্ডাল বা চাঁড়াল থেকে ডিপ্রেসড, সাপ্রেসড, ব্যাকওয়ার্ড, আনডেভালোপড হয়ে আমরা শিডিউল কাস্টে এলাম।

‘সুভাষ আমাকে আইনের দিকটা নিয়ে বলতে বলেছে—’

সুভাষ জে সি গুপ্তের দিকে তাকিয়ে বলেন—’সাংবিধানিক দিকটা।’

‘ঠিকই। আইনের দিকটা পরিষ্কার। সরকার তো বলবে, কয়েকটি জাতকে আমি কতকগুলি সুবিধে দিতে চাই। সেই জাতগুলির নাম আমি জানিয়ে দিয়েছি। যেমন, ইনকাম ট্যাক্স বা এক্সাইজ ট্যাক্স বা এক্সপোর্ট ট্যাক্সে বিভিন্ন স্তর অনুযায়ী ট্যাক্স হয়, এখানেও তেমনি বিভিন্ন জাত-অনুযায়ী ঠিক হয়েছে নির্বাচনের ভিত্তিতে বিভিন্ন বোর্ড বা আইনসভায় জাত-অনুযায়ী প্রার্থীর অনুপাত কী হবে। সরকার বলবে, এটা আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে। কারো এটা ভাল লাগতে পারে, কারো খারাপ লাগতে পারে কিন্তু এটা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাশ করা আইন। গান্ধীজি এই আইনের বিরুদ্ধে অনশন করেছিলেন ৩২ সালে। সেই অনশনে আইন বাতিল হল না কিন্তু পুনা প্যাক্ট সই হল কতকগুলি সংশোধনের প্রস্তাব দিয়ে। সরকারও সেটা মেনে নিলেন, গান্ধীজিও কিন্তু মেনেই নিলেন, আইন অমান্য করলেন না। সাংবিধানিক দিক থেকে ধীরে-ধীরে একটা অসুবিধে পাকিয়ে উঠবে। সরকারই হোক, বা কোনো রাজনৈতিক দলই হোক, বা কোনো ব্যক্তিই হোক এই শিডিউল বা তালিকাকে ধরে একটা জাতীয় গ্রুপ বা পার্টি তৈরি করে না তোলে। আইনটা হচ্ছে রিজার্ভেশন নিয়ে। কিন্তু তালিকাগুলো মানে শিডিউলগুলি তো এক-এক রকম। যেমন ১৯০৯ সালের আগে মুসলমানদের বিশেষ সুবিধে বলে কিছু ছিল না। হিন্দুদেরও ছিল না। তবে এ-কথা স্বীকার না-করলে অত্যন্ত ভুল করা হবে যে নানা ঐতিহাসিক কারণে ইংরেজ সরকারের ব্যবস্থাগুলির সুযোগ হিন্দুরাই নিতে পেরেছিল বেশি। মুসলমানদের বঞ্চিত করে নয়। নিজেদের অধিকারে। তেমনি এটাও স্বীকার না-করা ভয়ংকর ভুল হবে যে সারা ভারতের সমস্ত প্রদেশে সেই একই সুবিধেগুলি মিলে মুসলমানদের নিজেদের একটা জাতীয়তাবাদ ও পার্টি তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এই শিডিউল বা তালিকা থেকেও তেমনি বর্ণহিন্দুদের বাইরে যে-হিন্দুরা ছড়িয়ে আছেন তাঁরা একটা শিডিউল কাস্ট পার্টির দিকে চলে না যান। কথাটা খুব অবাস্তব যে নয় তা বম্বের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব। আম্বেদকারের নেতৃত্বে সেখানকার অবর্ণহিন্দুরা শেষ গোল টেবিলে তাঁদের দাবিপত্র হাজির করেছিলেন। এর প্রতিকার কী? যাতে হিন্দু, মুসলমান, শিখ এই সব ধর্মের বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে যে-আসাম্যগুলিও যুগ-যুগ ধরে জমে উঠেছে, সেসবের প্রতিকারের শর্টকাট হিশেবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ধর্মের ভিত্তিতে নতুন-নতুন জাতীয়তাবাদ তৈরি না-হয়। কিন্তু তাহলে এই যাঁরা হিন্দুধর্মের অন্তর্গত থেকেও বর্ণভেদ, কর্মভেদ, অধিকারভেদ, জলচলভেদের শিকার হয়ে আছেন, তাঁরা তাঁদের দুরবস্থা কী করে জানাবেন?

‘সুভাষ সাংবিধানিক যে-সমস্যার কথা জানতে চাইছে তার উত্তরে এটুকুই মাত্র আমার বলার আছে যে একটি সম্প্রদায় নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত থেকে এই ধর্মীয়-সামাজিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করতে হবে। বর্তমান ভারতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ছাড়া আর-কোনো সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সর্বভারতীয় পার্টি নেই। কংগ্রেসের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্বয়ং এই সভায় এসে গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন ও নিম্নবর্ণ হিন্দুদের কংগ্রেসে আহ্বান করলেন। এটাই সময়োচিত রাজনৈতিক কর্মসূচি।

‘আর-একটা কথা বলে আমি শেষ করব। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের এই সমস্যা মহাত্মাজির মত করে আর-কেউ বুঝে উঠতেই পারেননি। তিনি নিজেকে নিষ্ঠাবান ও বিশ্বাসী হিন্দু বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সবচেয়ে স্পষ্টভাষায় বলেছেন—হিন্দু সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এই সংকট দেখা দিয়েছে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের পাপে ও অপরাধে। গান্ধীজি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি বর্ণভেদে মানেন। কিন্তু সেই বর্ণভেদে বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা অস্পৃশ্যতা, পংক্তি ভোজন, জল-অচলকে মিশিয়ে দিয়েছেন, সেটা তিনি মানেন না। তাই তিনি অন্ত্যজদের নতুন নাম দিয়েছেন। ‘হরিজন’। সেই নামে কাগজ বের করেছেন।’ হরিজন সেবা সঙ্ঘ’ গঠন করছেন। সমস্ত মন্দিরে অন্ত্যজদের প্রবেশাধিকার আছে বলেছেন। বলেছেন যে-মন্দিরে অন্ত্যজদের ঢুকতে দেয়া হয় না, সে মন্দিরে ভগবান নেই।

জে সি গুপ্তের বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে হাততালি যে-উঠল না তার কারণ, তিনি যে শেষ করলেন তা বোঝা গেল তিনি চেয়ারের দিকে ঘোরার পর। সুভাষ দাঁড়িয়ে উঠে দুই হাত উঁচু করে হাততালি দিলেন। তবু সে-হাততালিকে স্বতঃস্ফূর্ত বোধহয় বলা যায় না। সবাই নিজের মত হাততালি হয়ত দিয়েছেন কিন্তু অন্যের সঙ্গে মেলাতে পারেননি।

শ্রোতারা নেমে যাচ্ছিলেন বঙ্কিম চ্যাটুজ্যে স্ট্রিটের দিকের বা সংস্কৃত কলেজের দিকের সিঁড়ি দিয়ে আর নেতারা নেমে যাচ্ছিলেন কলেজ স্ট্রিটের দিকের বা প্রেসিডেন্সি কলেজের দিকের সিঁড়ি দিয়ে। যাঁরা প্রথম দিকে বসেছিলেন, তাঁরাও নামছিলেন নেতাদের পিছু-পিছু

জে সি গুপ্ত ফুটপাথে নেমে, দাঁড়িয়ে সুভাষের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আবার করে ধরবে?’

‘সে তো আপনি জানবেন, নইলে জামিন মুভ করবে কে?’

‘তোমার নিজের বাড়িতে অমন ডাকসাইটে ব্যারিস্টার থাকতে তোমাকে জামিন মুভের কথা ভাবতে হবে? আমি ঠিক বুঝতে পারি না সুভাষ, শাহেবরা তোমাকে অতিরিক্ত ভয় পান বলেই কি তিন নম্বর রেগুলেশন ছাড়া তোমাকে ধরে না?’ জে সি গুপ্তের কথা বলা আর ভাষণ একেবারে আলাদা। কথা বলার সময় একটু তাড়াতাড়ি কথা বলেন, একটু তোতলান, তোতলামিটাকে একটু স্টাইলাইজও করেন আর ভাষণের বা আর্গুমেন্টের সময় কোনো তোতলামি নেই, একেবারে সোজা, টানা, কঠিন কথা। জেরা করার সময় তিনি তোতলালে ও ভেঙে-ভেঙে বললেই বুঝতে হয়—এবার তিনি সাক্ষীকে সাঁড়াশি প্যাঁচ দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের একটা মামলায় চট্টগ্রামের কমিশনার নেলসনকে জেরার শুরুতেই জে সি গুপ্ত নাকী ওরকম তোতলিয়ে জিগগেস করেছিলেন, ‘আপনি কি এ-বিষয়ে নিশ্চিত যে আপনিই মিস্টার নেলশন?’

নেলশন কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিয়েছিল, ‘আপনি কি আমাকে চেনার জন্য আমারই ওপর নির্ভরশীল।’

জে সি গুপ্ত নাকী তখন আরো তোতলিয়ে ও হেসে বলেছিলেন, ‘কী করে বুঝতে পারলেন, বলুন তো’ তাহলে আপনি নিশ্চয়ই নেলশন। কিন্তু চট্টগ্রামের কমিশনার নেলশন নিশ্চয়ই নন। আপনি নিশ্চয়ই বিখ্যাত ডিটেকটিভ লেখক, ও আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক নেলশন। অবিশ্যি যদি আপনি নেলশনই হন।

জে সি গুপ্তের কথায় কোনো নাটক থাকে না, তাঁর কোনো মতলবও ধরা যায় না। এমন কী তাঁকে চালাকচতুরও ঠেকে না। ফলে কমিশনার নেলশন ভেবে বসে সত্যি কিছু গোলমাল হচ্ছে। সে বেশ আন্তরিক ভাবেই বলে, ‘তার প্রথম নামটা বলবেন, আপনার ডিটেকটিভ লেখক নেলশনের?’

জে সি গুপ্তের একটা ভঙ্গি ছিল, বাঁ-হাতের আঙুল দিয়ে কপালেরা শিরা চেপে ধরা—যেন কিছু মনে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানতেন—ওটা তাঁর রিভলবারের ট্রিগার টেপার ভঙ্গি, ‘দুঃখিত। মনে পড়ছে না ঠিক। কিন্তু আমি ওঁর শেষ রহস্য-উপন্যাসের নামটা বলতে পারি। বইয়ের নামটা একটু অদ্ভুত—সেই জন্যই মনে থেকে গেছে-অফিসিয়্যাল রিপোর্ট অব ইনকোয়ারি অব চিটাগাং রায়টস।’

শুনে শাহেব ভড়কেই যায়। জেরায় এমন প্রশ্নের ইতিহাস লম্বা। ঘটনাটা এরকম। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার বিপ্লবীরা লুট করেন ১৮ এপ্রিল, ১৯৩১। চারদিন চট্টগ্রাম স্বাধীন। তার পর যা হওয়ার তাই হয়েছে। বিপ্লবীরাও সেটা জানতেন। সেটা হাওয়ানোর জন্য চার লঞ্চ ভর্তি সেনা আনতে হয়েছিল কলকাতা থেকে। ২২ এপ্রিল সেনাদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল বিপ্লবীদের সঙ্গে।

এমনিতেই ঘটনাটা শাহেবদের পক্ষে লজ্জার। চট্টগ্রামের মত একটা বিভাগীয় সদরে এই ঘটনা ঘটে গেল, অথচ তারা তার বিন্দুবিসর্গ টের পায়নি। সারা দেশের ইয়োরোপীয়রা এতই ভয় পেয়ে যায় একটি কাগজে লেখা হয়—আমরা কি সিপাহি বিদ্রোহের প্রথমাঙ্কের জন্য তৈরি থাকব? কিন্তু চট্টগ্রামের প্রশাসন, বাংলার গভর্নর ও ইংরেজদের পক্ষে আরো লজ্জার ঘটনা ঘটতে থাকল এর পরে। হাজার চেষ্টা করেও পুলিশ কোথাও থেকে কোনো সূত্র জোগাড় করতে পারছে না। হিন্দু-মুসলমান সবাই ঠোটে তালা আটকে আছে। কেউ সামান্য কোনো আঁচও দিচ্ছে না।

অথচ বিপ্লবীদের সশস্ত্র অভিযান চলছে তো চলছে। ১৯১৯ থেকে ২৯ দশবছর ঘটেছে ৪৭টি অ্যাকশন, আর এক ১৯৩০-এই ৫৬টি—রাইটার্স বিল্ডিংস আক্রমণসহ। ঢাকা-কুমিল্লায় শাহেব খুন হয়। ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ভার্গো শাহেব কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে যায়। মেদিনীপুরে ম্যাজিস্ট্রেট এলেই খুন—পেডি, ডগলাস, বার্জ। শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী দুটি স্কুলের মেয়ে কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে। টেগার্টের ওপর বোমা পড়ে কিন্তু টেগার্ট বেঁচে যায়। ঢাকায় পুলিশের বড় শাহেব লোম্যান মারা যায় গুলিতে। সেখানেই হাডসন জখম, জখম। কলকাতায় এক ব্যবসায়ী শাহেব ও ‘স্টেটসম্যান’-এর সম্পাদক, ভিলিয়ার্স আর ওয়াটসন বোমা খেয়েই জাহাজে উঠে দেশে পালায়। বিখ্যাত টেগার্টও প্রাণভয়ে কেটে পড়ল। আলিপুরের জজ গার্লিক গুলিতে মরে। দিনদুপুরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হল গটগটিয়ে গিয়ে বীণা দাস সবার সামনে গুলি মারল লাটশাহেব জ্যাকসনকে। দার্জিলিঙে ছোটলাট অ্যান্ডারসনকে গুলি করে স্কুলের ছাত্র ভবানী ভট্টাচার্য। তার প্রধান সহায়ক ছিলেন আর-এক ছাত্রী—উজ্জ্বলা মজুমদার।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ইয়োরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করলেন প্রীতিলতা।

কোনো-কোনো ঘটনায় বিপ্লবীরা ঘটনাস্থলেই গুলিতে বা সায়ানাইড খেয়ে মারা যান। কোনো-কোনো ঘটনায় বিপ্লবীরা ধরা পড়ে, তাদের বিচার ও ফাঁসি হয়। কিন্তু সেইসব ঘটনায় দেখা গেল বিপ্লবী সংগঠনের শিকড় চলে চলে গেছে স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আর গেরস্থ পরিবারের একেবারে হেঁসেলে। পুঁটে নামে এক বিপ্লবী মেয়ে আর এক বিপ্লবীর মিছিমিছি বৌ সেজে অস্ত্রগার লুণ্ঠনের চার সেনাপতিকে নিয়ে চন্দননগরে বাসাবাড়ি করে সংসার করতে লাগল। পুলিশ একদিন ঘিরে ফেললে গুলির যুদ্ধ শুরু হল। পুঁটেও বন্দুক ধরল। বম্বের গভর্নর হটসন এসেছিলেন ফার্গুশন কলেজ পরিদর্শনে। কলেজের এক ছাত্র তাঁকে গুলি করে দিল। বম্বের কাছে মান্ডোয়া রেল স্টেশনে তিন বিপ্লবী মারাত্মক আক্রমণ করল লেফটেনান্ট হেক্সকে। এইসব ঘটনাই ঘটে চলেছে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের আগে পরে। কিন্তু পুলিশ কোনো একটা ফাঁক পাচ্ছে না—নেতাদের ধরবার।

এদিকে, ১৮ এপ্রিল ১৯৩০-এ যে-বিদ্রোহ হয়েছে ১২ সপ্তাহের মধ্যে তার চার্জশিট না দিলে তো সরকারি মামলা ফেঁসে যাবে। তখনো বেশির ভাগ নেতাই ধরা পড়েননি। ধরাপড়া তো দূরের কথা, কোনো হদিশই করতে পারছে না সর্বোচ্চ ব্রিটিশ শক্তি। অগত্যা অপ্রস্তুত সরকার বাধ্য হল মামলা রুজু করতে ১৯৩০-এরই ২৪ জুলাই। সেই মামলা যখন চলছে, তার মাধ্যই এক ফুটবল খেলার মাঠে স্কুলের এক ছাত্র, হরিপদ ভট্টাচার্য, হেঁটে এসে চট্টগ্রামের পুলিশ-সুপার আহসানউল্লাকে গুলি ছুঁড়ে মেরে ফেলল ৩০ আগস্ট ১৯৩১।

পুলিশ-প্রশাসনের উচ্চতম অফিসাররা সম্পূর্ণ এক নতুন উপায় ব্যবহার করে ফেলল। তারা এই হত্যা থেকে হিন্দুবিরোধী দাঙ্গা শুরু করে দিল। পুলিশরাই লুটপাট, আগুন-লাগানো, হিন্দুদের বাড়িঘর ভেঙে ঢোকা, যে-কোনো বয়সের কাউকে হিন্দু সন্দেহে মারা—এইসব হাঙ্গামা বাধিয়ে তারপর তাদের নির্দেশ মত গুণ্ডারা ও লুঠেরারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। আহসানউল্লাকে হত্যা করা হয় সন্ধে ছটায়, ৩০ আগস্ট। রাত দশটার মধ্যে পুলিশ শহরের দাগিদের জড়ো করে ফেলে। তারা সকলইে মুসলমান নয়। কিন্তু তাদের শুধুই হিন্দুদের ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়। তিনদিন ধরে চলে এই আক্রমণ। প্রশাসন থেকে রটিয়ে দেয়া হয়, তাদের একজন ইমানদার লোককে খুন করায় মুসলমানরা খেপে গেছে। চট্টগ্রাম থেকে ৫০ মাইল দূরের গ্রামে আর মুসলমানদের শিখণ্ডী করার দরকার হয়নি। শাহেবরা তাদের নিজেদের ইউনিফর্মেই ইস্টার্ন রাইফেলসের গোর্খা বাহিনীকে নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম আগুন লাগিয়ে ছাই করতে করতে যাচ্ছিল—হিন্দু-মুসলমান বাছাবাছি না-করে।

ঘটনাটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে যারা কোনোভাবেই কোনোরকম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় ও ইংরেজ শাসনের পক্ষে—তাঁরা পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। সরকার আর পুলিশ যদি প্রকাশ্যে দাঙ্গা করতে পারে, তাহলে বাঁচাবেই-বা কে, শান্তিশৃঙ্খলাই-বা রাখবে কে। যেভাবেই হোক, ঘটনাটার খবর লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস পর্যন্ত পৌঁছুল ও ভারত সচিব অস্বস্তিতে পড়লেন যে পার্লামেন্টে যদি কোনো ভারতবন্ধু এমপি কথাটা তোলেন তিনি কী বলবেন। তিনি ভাইসরয়কে, ভাইসরয় বাংলার লাটশাহেবকে ও লাটশাহেব চট্টগ্রামের কমিশনার নেলশনকে জানালেন—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা অফিসিয়াল এনকোয়্যারি করে তার রিপোর্ট ইন্ডিয়া অফিসে, ভাইসরয়কে ও লাটশাহেবকে পাঠাতে। ভারতসচিব তাঁর চিঠিতে বলেছিলেন—ঘটনার পদ্ধতি ও ধারা অনুসরণ করে আমার সন্দেহ হয়েছে যে কোনো-না-কোনোভাবে প্রশাসন ও পুলিশ এই দাঙ্গার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল, এই বিষয়টা বিশেষ করে জানা দরকার। নেলশনের পুরো রিপোর্টটাই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, প্রশাসন ও পুলিশের সাফাই। সে-সাফাইও এতটা নিলর্জ্জ ছিল যে তার ফাঁক দিয়ে সেই সত্যটা আরো সত্য হয়ে উঠছিল যেটা সে চাপা দিতে চাইছিল—কবর চোররা যেমন সামাল দিতে চায়। লন্ডন, দিল্লি বা কলকাতায় এ-রিপোর্ট এমনকী নিয়ন্ত্রিত ভাবেও প্রকাশ করা হয়নি। তবু একটু-আধটু জানাজানি হয়ে যায় ও একটা আনঅফিসয়্যাল কমিটি অব এনকোয়্যারি তৈরি হয়!

চিটাগাং সংক্রান্ত একটি মামলায় নেলসনকে জেরা করতে গিয়ে সেই অফিসিয়্যাল রিপোর্টটাকে ইঙ্গিত করেই নেলসনকে বলেছিলেন—রাইটার অব ক্রাইম অ্যান্ড ডিটেকটিভ ফিকশনস।

যেমন মুখে-মুখে গল্প ছড়ায়, জে সি গুপ্তকে নিয়ে এই গল্পটা তেমনি চলেই আসছে।

এতটা ইতিহাস উড়িয়ে সুভাষ জে সি গুপ্তকে বলেন, ‘আমার তো উলটোটা মনে হয়। পাছে আপনার বা মেজদার জেরায় পড়তে হয় সেই ভয়ে তিন আইন ছাড়া আমাকে ধরে না—যমের মত ছিঁড়ে নেয়।’

‘তুমি তো নচিকেতা সুভাষ, যম তোমার কী করবে? ঠিক আছে। চলি। তুমি?’ জে. সি. গুপ্ত হঠাৎ করে কথাটা বলে ফেলে লজ্জা পেয়ে যান। সুভাষও একটু অপ্রস্তুত।

‘আমার গাড়ি আছে। আপনি এগন’, বলে এগিয়ে সুভাষ জে সি গুপ্তের গাড়ির দরজা খুলে ধরেন ও জে সি গুপ্ত ‘থ্যাঙ্কস’ বলে ভিতরে ঢুকে গেলে সুভাষও দরজাটা ঠেলে দেন, জে সি গুপ্তও টেনে নেন। ড্রইভার হ্যান্ডেল নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিল স্টার্ট দিতে।

অনেকেই দাঁড়িয়েছিল, যোগেনও। সুভাষ তাদের কাছে যেতেই সুভাষের বয়সী এক ভদ্রলোক, ফতুয়া গায়ে, পাট করে চুল আঁচড়ানো, নামস্কার করে বললেন, ‘মা পাঠালেন। আমাদের বাড়িতে একটু যেতে হবে। আমাকে কি চিনতে পারলেন?’

‘সে কী কথা! আপনি তো অভয়দা, মেজবৌদির দাদা। হ্যাঁ, এখানে এসে মাঐমাকে একটা প্রণাম না করে চলে যাওয়াটা ঠিক না। চলুন,’ বলে সুভাষ দু-পা গিয়ে পেছন ফিরে অপেক্ষমাণদের বললেন, ‘আমি চলে যাব, একটু মেজবৌদির পিত্রালয়ে দেখা করে যাই। এই দু-পা গেলেই। শ্যামাচরণ দে মশায়ের বাড়ি। আপনারা আর মিছিমিছি অপেক্ষা করবেন কেন? সুভাষ তাঁর অভয়দার সঙ্গে এগিয়ে যান

যাঁরা দাঁড়িয়েছিল, তার মধ্যে যোগেন তো ছিলই, রসিককৃষ্ণ বিশ্বাসও ছিলেন। আর ছিল অ্যালবার্ট হলের লাইব্রেরিয়ান প্রসন্ন দাস। কংগ্রেসের নেতা, উত্তর কলকাতা কমিটির প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি, সুরেশ মজুমদার ও হেমন্ত বোসও ছিলেন। সুরেশবাবুই বললেন, ‘তাহলে, আমরা আর দাঁড়িয়ে থাকি কেন? চলু—ন।’ বলেই তিনি রাস্তা পার হয়ে ট্রামস্টপে দাঁড়ালেন। তাঁর সঙ্গে হেমন্তবাবুও।

রসিক কৃষ্ণ বললেন, ‘তোরা দুইজন কি জোড়ায় ধরে-লক্ষ্মণ হইয়্যা খাড়ায়্যা থাকবি।’

‘আপনার কি তাড়া আছে কাকা। তিন পা ফেললেই তো বাড়ি। না কী বুড়া বয়সের দোষ ধইরছে?’

‘তুই তো বুড়া হস নাই যোগেন, বুড়া হওয়ার রস তুই বুঝবি ক্যামনে? তাগো বয়সে আবার রসারসি কীসের রে? সব তো তোগো খড়ি—ঢোকানোর কাম। আখার তাপ বাড়াও আর কড়াই নামাও। ওডা তো মহোচ্ছবের খাওয়া রে। বুড়া না হইলে কি কম আঁচে রান্নার স্বাদ মেলে রে?’

‘প্রসন্ন আর যোগেন জোরে হেসে ওঠে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জায়গাটা একটু অন্ধকার ও নির্জন হয়ে গেছে। উলটোদিকের ট্রামবাস স্টপে তবু লোকজন আছে—শ্যামবাজারের দিকে যাওয়ার। ওয়েলিংটন, ওয়েলেসলি, পার্ক সার্কাসের ট্রামবাসের স্টপ, হ্যারিসন রোড পেরিয়ে।

‘তোরা কি সুভাষবাবুর লগে খাড়াইয়্যা আছিস, বিদায় দিওয়ার লগে? তাইলে, ঐ দিকের রাস্তায় চল্, শরৎ বোসের শ্বশুর বাড়ির রাস্তায়’ বলে রসিক হাঁটা শুরু করে দেন।

‘কাকা, আমাগো সমাজের কারো কওয়া উচিত ছিল না?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে।

‘তা কইলেই পারতি। না কইরল কেডায়? প্রথম তো কইল –’

‘আরে ওনার ঠাকুর্দাকে নিয়্যা মিটিং। সেডা তো কইবেনই। সেডা তো আমাগোর কথা কওয়া না। আপনার বা বিরাট কাকার কওয়া দরকার ছিল। বিরাট কাকা তো ব্যস্ত—’  

‘দ্বিতীয় বিয়্যা বসতেও কি ব্যস্ত হওয়ার লাগে। তাইলে আমি ওর মইধ্যে নাই।’

‘আপনারে তো কেউ ডাকে নাই, কাকা, ব্যস্ত হওয়ার লগে দুই-নম্বর বিয়্যার লগ্ন আইস্যা পইড়ল। আপনার ঘরে তো বাইন্ধ্যা রাইখছেন দক্ষের মাইয়ারে আর হিমালয়ের মাইয়ারে, এক অঙ্গে। আর নিজে হইয়া আছেন রসিক নটবর। দুই নম্বর বৌ পাইতে তো আপনার বিয়া লাগে না।

রসিক বেশ জোরে হেসে উঠে বলেন, ‘এইডা জবর কইছিস। একই বৌরে দুইবার বিয়্যা করা-ভাবনাডা ক্যামন ভাইবছিল, ক? কী প্রসন্ন। ডিফারেন্সডা দ্যাহো—প্রথম বিয়্যার আগে গৌরীর লজ্জা য্যান আর কাটে না রে, লীলা-কমল পত্রাণি গণয়ামাস পার্বতী। আর দ্বিতীয়বার বিয়্যার সময় তো এক্সপিরিয়েন্সড। শুভদৃষ্টি হইল কি হইল না, শিবের সিদ্ধি ঘোঁটা দেইখ্যা আর শিবের পরন নাই দেইখ্যা কোমরে আঁচল বাইন্ধ্যা দিল এক চিক্কুর, সিদ্ধি তো ঘুটাইল্যা, ছাঁকতা কী সে, পাছায় তো বস্ত্র নাই।’

ওদের হাসি শুনেই উলটো ফুটের বড় দরজা থেকে সুভাষবাবু বলেন, ‘এত হাসি, আমরা একটু পাই না?’ ওরা গাড়ির দিকে এগয়। ওদিক থেকে সুভাষবাবুকে এগিয়ে দিচ্ছেন, আত্মীয়জনেরা।

সুভাষ গাড়িতে উঠে বসলে, দরজা বন্ধের আওয়াজ হলে ও ড্রাইভারের প্রথম হ্যান্ডেল মারার পরপরই এদিকের জানলায় মুখ রেখে প্রসন্ন বলে, ‘এক আপনি আসতেই সভাটা কেমন সুন্দর হয়ে গেল। আমাদের কথা একটু মনে রাখবেন।’ সুভাষ প্রতি নমস্কার করতেই প্রসন্ন সরে যায়। যোগেন জানলায় এসে বলে, ‘এই একটা তেল আপনাকে দিচ্ছি। রাইতের স্নানের আগে অনেকক্ষণ ধইর্যা মাথার মইধ্যখানে বসাইয়া নিবেন, অনেকক্ষণ ধইর্যা। ঘুম হইব্যার পারে, এডডু সর্দিও হবার পারে—’

সুভাষ বলে ওঠেন, ‘আপনি তো কাছেই থাকেন? গাড়িতে উঠে আসুন-না।’ সুভাষ নিজেই দরজা খুলে দেন। যোগেন ভিতরে ঢুকে বন্ধ করতেই গাড়ির চাকা ঘোরে। সুভাষ বাইরে একঝলক তাকিয়েই বলে ওঠেন, ‘এই দাঁড়াও, দাঁড়াও, ওখানে কি রসিকবাবু দাঁড়িয়ে?’

‘হ্যাঁ। ডাকব?’ জিজ্ঞাসা করে যোগেন জানলায় গলা বাড়িয়ে ডাকে, ‘কা–হা—’ রসিকলাল এসে জানলায় নমস্কার করে দাঁড়াতেই সুভাষবাবু প্রতিনমস্কার করে বলেন, ‘আপনি দেখা দিচ্ছিলেন না-যে!’

‘না, ছিলাম তো মিটিঙে। আলাদা আর দেখা করিনি। চিনতে পারবেন কী পারবেন না—’

‘সে কথা ভাবলেন? পলিটিকস বাদ দিন—আপনি তো আমার কলেজের অ্যালামনি। সেই থার্টির ডিসেম্বরে কলেজের সেনটিনারিতে দেখা হল না? আপনি তো আমাদের এক্স-স্টুডন্টস অ্যাডড্রেসে নতুন পয়েন্ট দিয়েছিলেন। আপনি এখন থাকেন কোথায়?’

‘বৈঠকখানায়—উত্তর দেয় যোগেন।

‘আপনি উঠুন। আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাই।’ রসিকলালকে গাড়িতে ওঠালে যোগেনকে সুভাষের দিকে আরো সরে বসতে হয়। তেমন বসতে তার বাধো বাধো ঠেকে। সে বলে ওঠে, ‘কাহা, আপনি এখানে বসেন, আমি সামনে যাচ্ছি—’। ততক্ষণে রসিকলাল ড্রাইভারের খুলে দেয়া সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতে-ঢুকতে বলছেন, ‘আপনার যে এতটা মনে আছে, এ আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। এখন মনে হচ্ছে— আমার উচিত ছিল আপনার কাছে যাওয়া। মার্জনা চাই।’

‘সেটা করবেন না। মনে থাকা, মনে না-থাকা তো পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। যোগেনবাবু, এই তেলটা রাতে মাখতে হবে?’

‘হ্যাঁ। মাথায় বসিয়ে দিতে হবে। তারপর স্নান বা দুই ঘটি জলে মাথা ধুইয়্যা নিবেন।’

‘কী দিলি রে যোগেন, কী হইছে ওনার।’

‘হইছে তো অনেক কিছু। ওষুধ দিয়া-দিয়্যা বুইঝবার লাগব। স্নেহ তৈল দিলাম। শরীর-মনডা যদি স্থির হয়।’

‘এটা খুব ভাল তেল সুভাষবাবু আর যোগেন তো অন্য চাঁদসীদের মত মূর্খ না। ও বিচার-বিবেচনা করতে পারে। দেখেন, যদি উপকার হয়। আমরা এইখানেই নামি।

যোগেনেই গাড়িটা বাঁ-ফুট ঘেষে ধীরে-ধীরে দাঁড়ায়। রসিক দরজাটা খুলতে পারছিলেন না। ড্রাইভার ঝুঁকে এসে খুলে দেয়। ‘ঐ কোণাকুনি কাকার বাড়ি, আর এই কোণাকুনি আমাদের অফিস ১৫ হ্যারিসন রোড।’

সুভাষবাবুর গাড়ি চলে গেলে যোগেন বলে, ‘কাহা, এডডু অফিসে বসা যায় না?’

‘চ—ল্। আমার আর আপেত্ত কী?’

‘তয় চলেন, এডডু কথা কয়্যা বুঝতে চাই—’  

‘কী বুঝবি? কাগো লগে কথা?’

‘কারো পক্ষেও না, কারো বিপক্ষেও না। আমার নিজের ভাবনা ঠিক কি বেঠিক মাইপ্যা নিতে—’

পনের নম্বরে উঠে দেখে পি. আর. ঠাকুর, আর মনোরঞ্জন বড়াল বসে আছেন। একটা বেঞ্চের ওপর বসেই যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘মিটিং কেমন লাগছে, আপনাগো?’ –’এর চেয়ে আরো ভাল কিছু কি আপনি আশা করেছিলেন?’ পি আর ঠাকুর-এর এ-কথায় যোগেন হেসে বলে, ‘সেডা কইলে তো আত্মপ্রশংসা হইয়া যায়, আত্মহত্যার সমান। কিন্তু আমরা পাইল্যাম কী?’

বড়াল একটু শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন, ‘আপনার প্রত্যাশা কী ছিল?’

‘সে তো আপনারাও কইতে পারেন, আপনাগো কোন আশা পুরছে?’

‘ধরুন, যোগেনবাবু, অ্যালবার্ট হলে গুরুচাঁদের প্রতি সুভাষচন্দ্র, জে সি গুপ্ত এই সব মানুষ শ্রদ্ধা জানালেন সেটাই তো নমশূদ্রদের একটা সামাজিক স্বীকৃতি।’

সে-স্বীকৃতি তো আমাগো জোরেই আদায় হইছে। এক জাইতেরই তের এমএলএ। স্বীকার না কইর‍্যা যাইব কোথায়। কিন্তু সুভাষবাবু আর গুপ্তশাহেব যে বারবার কইতেছিলেন— শূদ্ররা হিন্দুসমাজেরই অংশ, সেইডা আমার পছন্দ হয় নাই। গুরুচাঁদ ঠাকুর, ঠাকুর হইলেন কোন সুবাদে। তিনি এতদূর পর্যন্ত কইছিলেন যে বর্ণহিন্দুরা যে-স্বাধীনতা আন্দোলন করে, আমরা তাতে যাব না। আর আইজ সুভাষ বাবু কইলেন—তোমরা কিন্তু হিন্দু, এইডা ভুইলো না। আর গুপ্তশাহেব কইলেন—কয়ডা রিজার্ভ সিট জিত্যা আবার নতুন পার্টি খুইল্যা বসব্যান না। দুইডা মিল্যায়া খাড়ায়—শুদ্দুররা শুদ্দুর হইলেও হিন্দু আর কংগ্রেসই শুদ্দুরগো পার্টি। এটার কোনো-কোনোটাই কি সন্দেহ না রাইখ্যা মানা যায়?’

‘তোক তো মাইনব্যার কয় নাই। তাগো মত তারা দিছে। তুই তর মত তাগো মানাইতে চাস ক্যা?’ রসিক বলে।

বড়াল একটু বোঝানোর জন্য আঙুল নাড়ান— ‘আমাদের সমাজকে একটা সময়ে একতাবদ্ধ করার প্রয়োজনে ঠাকুর গুরুচাঁদ এই বিধান ও সংগঠন দিয়েছিলেন ও করেছিলেন। এখন তো পরিবর্তিত অবস্থায়, আমাদেরও নতুন করে ভাবতে হবে।’

‘আপনাগো নতুন ভাবনা কি বামুন-কায়েত ভাই বইল্যা ডাইকলেই নিত্যানন্দ হওয়া? আর কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেয়া? তো দ্যান।’

‘যোগেন, কংগ্রেসের বদনাম কইরব্যা না, আমি যে কংগ্রেস তা ভুইলো না, বাপ।’

‘যোগেনবাবু, আপনার এটা ঠিক কথা যে সুভাষ বোস ও জে সি গুপ্ত শিডিউল কাস্টদের হিন্দু ক্যাটিগরির মধ্যেই টেনেছেন, সঙ্গে কংগ্রেসকেই শিডিউল কাস্টদের ন্যাচারাল চয়েস বলেছেন। তেমনি নীহারেন্দুবাবু, বঙ্কিমবাবু, নৌসের আলি শাহেব—এঁরাও তো এঁদের নিজেদের মতই বলেছেন। আমাদের দিক থেকে লাভ এটাই যে আমরা ন্যাশন্যাল এজেন্ডার পার্ট হয়েছি। আমাদেরও তো এই কোয়ালিটি—শিষ্টটা নজরে রাখতে হবে—আমরা কীভাবে ভাবব সেটা স্থির করতে।

‘এই ‘আমরা’টা কি ‘আমরাই আছে পি-আর? আমাগো তো এই পরীক্ষাডা কহনো দিবার হয় নাই। কারণ, ‘আমরা’ ছাড়া আমাগো আর-কেউ ছিল না। অ্যাহন যে-মন্ত্রিসভাই হোক দুইডা-তিনডা মন্ত্রী তো আমরাই হব। তাই আমাগো বসুধৈব কুটুম্বকমের ভ্যাক ধইরবার সাধ হবার পারে। মিটিং কইর‍্যা কি এ বিবাদ মিটব পি. আর?’

এডা তো কারো ব্যক্তিগত বিবাদ না। নীতি নির্ধারণের বিষয়। খোলাখুলি কথা বলার লাগব। জষ্টি মাসের তের না চৌদ্দ তমলুকে বেঙ্গল নমশূদ্র অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলন ডাকা আছে। সেইহানে এইডা নিয়্যা কবির লড়াইডা হোক। সাবজেক্ট কমিটিরে জানাইয়্যা দ্যাও অ্যাহনই। আর অন্য তপশিলগোও ডাকা লাগে— বিশেষ কইর‍্যা উপেন বর্মন রে। চল্ যোগেন, আরে একডা মিটিং নিয়্যা বেগুনপোড়া মুখ কইর‍্যা থাকে না কী?’ রসিকলাল যোগেনকে নিয়ে উঠে পড়েন।

কিন্তু যোগেনের কেন মনে হয়ে যাচ্ছে—সে ঠকে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *