৯৪. আন্দামান-ফেরতদের সঙ্গে যোগেন
চারদিনের মাথায় নলিনীদা, ক্ষেত্রবাবু, এমনকি হকশাহেব, আর-এক অচেনা ভদ্রলোক একেবারে মৈস্তারকান্দিতে যোগেনদের ঘাটে এসে নৌকা ভেড়ান। যোগেনের ঘাটে এমন ভারী লোকজনের নৌকা একেবারে যে ভেড়ে না, তা নয়। যোগেনই সঙ্গে থাকে। এমনি দেখাশোনা কাজকর্ম এখানে যা, তা তো আগৈলঝরার হাটেই হয়। তাছাড়া, এতটা লম্বা সময় যোগেন কবে থাকে মৈস্তারকান্দি বা আগৈলঝরায়? সবকিছুই তো বরিশালে। যোগেনের ছোটকাকা এসে বলে, ‘দ্যাখ গিয়া ঘাটে। তর কাছে কারা আইছেন য্যান।’ যে আসে, সে তো বাড়ির ভিতরেই আসে। এমন ঘোষণা দেয়ার মত লোক কে? যোগেন ঘাটে এসে দেখে নৌকা লেগেছে—দুজন নেমেছে, দুজন নামার আয়োজন করছে। যোগেন ঘাটের ধাপগুলো দিয়ে যেন গড়িয়ে জলের কাছে যায়। নামতে-নামতেই সে চিৎকার শুরু করেছিল, নেমে হাতজোড় করে বলে ‘আরে কয় কী? এমন চাইর যাত্রী নিয়্যাও নাও ডোবে নাই? নলিনীদা, ক্ষেত্রবাবু—এই অধমের প্রতি এই দয়া প্রদর্শনের সময় কি একবারও হাঁড়িকাঠস্থ ছাগশিশুর আর্তনাদ আপনাদের কানে প্রবেশ করে নাই? স্বয়ং ব্রিটিশ সম্রাট যাদের এত বড় ভারত সাম্রাজ্যের কোথাও স্থান দিতে পারেন নাই, তাদের বসানোর যোগ্য আসন আমি কোথায় পাই?’
নলিনীদা বাঁ হাত তুলে বলে, ‘থামো তো, তুমি তো দেখছি আইনসভায় গিয়ে খুব যাত্রা-থিয়েটার শিখেছো?’
ক্ষেত্রবাবু তাঁর জুতোজোড়া হাতে করে নেমেছে। এখন ঠিক করতে পারছে না, এখানেই খালের জলে পা ধুয়ে জুতো পরে নেবে, নাকী পাড়ে উঠে পড়বে। কিন্তু পাড়ে তো জল পাওয়া যাবে না। পায়ে যেটুকু কাদা লেগেছে তা অবিশ্যি ফাল্গুনের এই বাতাসে ও রোদে দেখতে না-দেখতে শুকিয়ে যাবে। তখনো ঝেড়ে ফেলা যায়। নিজের সমস্যা লুকোতে ক্ষেত্রবাবু বলে, ‘নলিনীদা কি যোগেন্দ্রবাবুর কেষ্টকীর্তনের খ্যাতি শুনেন নাই?’
‘আমি তো ওর আরো কত খ্যাতিই শুনেছি। কেষ্টযাত্রার কথা আপনারা না-শোনালে কী করে শুনব?’
নলিনীদা আন্দামান থেকে আর ক্ষেত্রবাবু দেউলি থেকে ছাড়া পেয়েছেন। হকশাহেবকে একবার এ-জেল, একবার ও-জেল করিয়ে দিয়ে ক্ষেত্রবাবুই বলয়—’যোগেন্দ্রবাবু, এর সঙ্গে তোমার চেনাজানা হওয়ার সময় হয় নাই। গৌরনদী থানার নতুন লোন সেট্লমেন্ট অফিসার। অ্যাহন এই এলাকাতেই ক্যাম্প গাইড়ছে। কুমিল্ল্যার পোলা—’
‘সবই কইলেন তো ক্ষেত্রবাবু, ডাকব কী বইল্যা, নাম তো একডা কিছু চাই। না-থাইকলে দিবার লাগে—ঠাকুরমশায় বা মৌলবিশাহেব তো শিডিউল-শুদ্দুর’।
‘নাম নিয়্যা যে এত মুশকিল হয় তা তো আগে বুঝি নাই। মুসলমানগো নাম তো হয় তের হাত লম্বা। আমার ইস্কুলকলেজের নাম তো আমারই স্মরণ থাকে না—আবু বকর মালেক জাফরউদ্দিন। আমারে যদি জিগ্যান আমি কব্যার পারব না এই শব্দগুলার মইধ্যে সম্পর্কডা কী? যদি আমার নানার ইচ্ছা হইত বা জানা থাইকত—তাইলে আরো বাড়ানোও যাইত। এসব নিয়্যা তো কোনো কালে দুর্ঘটনা ঘটে নাই, যতদিন স্কুলকলেজে ছিল্যাম। ক্যান য্যান সবাং ‘হাউর্যা’ কইয়্যা ডাইকত। সবাই। স্কুলকলেজের মাস্টারমশাইরাও। কলেজে এক প্রফেসর, তিনি নাকী কইছিলেন, এই নামটার মানে কী। আমি কইল্যাম—এই বইল্যা ডাইকলে আমি জব দেই, নামের আবার মানে কী, ডাকা আর জবাব ছাড়া? তো স্যার বইললেন, বাঙালিরা সব আরবী শব্দের উচ্চারণ—বানান বেবাক বিগড়াইয়া দিছে। তোর নাম নিশ্চয়ই ‘উজাইর্যা’। আমি স্যারকে বলি, স্যার, উজাইর্যাও তো বাংলা। স্যার কইলেন—তোরটা আরবী, যা, উজাইর্যা, মানে হইল তোর কোনো ইনাম মিলব। চাকরি নিব্যার গিয়্যা দেহি—কেউ কয় মিস্টার আর বকর; কেউ ডাকে—জনাব জাফরউদ্দিন। আমি কারো ডাকেই জব দেই না। আপনাগো কাছে এই বিত্তান্ত দেয়ার কারণ এই—আমারে হাউড়াও ডাইকবার পারেন, উজাইর্যাও ডাইকবার পারেন। কিন্তু আসল নামে ঢুইকবেন না। মিস্টার আর বকর শুইনলে মনে হয় হিন্দুগো মতন নাম আর পদবী। জাফরউদ্দিন শুইনলে, কেমন পাতি নেড়া ঠ্যাহে। তার থিকা আরবী ‘উজাইর্যা’ অনেক ভাল আর তার বিকার বাংলা ‘হাউর্যা’ আরো ভাল।’
‘কন কী? আপনে একডা অফিসার মানুষ আর আমরা আপনারে ডাইকব হাউর্যা আর উজাইর্যা বইল্যা? কন কী? বাংলা বইল্যা কি কথার মানইজ্জত নাই?’ যোগেন বলে। ওরা ততক্ষণে ভিতরের দুয়ারে পৌঁছেছে। একটু উত্তরে, যেখানে ওদের নৌকা বানাবার কাজ হয়, সেখানে একটা ছেঁড়া পাটি আর-একটা চাদর কেউ পেতে দিয়েছে। ওরা ঐখানেই বসে।
হকশাহেব বসতে-বসতে বলে, ‘মানুষ যদি একডা থাকে, তার নামও একডা বাইর হইয়্যা যায়। গাছ আছে তার বোল আইসবে না? সবুর দরকার’।
যোগেন বলে, ‘আমার বাড়িতে আপনারা পায়ের ধুল্যা দিছেন। আমি ক্যামনে কই—কেন দিছেন। কিন্তু কোনো কাজ কামের কথা থাইকলে কাকের মুখে এডডা ডাক পাঠাইলেই হইত। বান্দা হাজির হইত।’
‘দেখো যোগেন, কাজ একটা আছে, কথাও তোমার সঙ্গে তাই নিয়ে। সময় বাঁচাতে আমরাই এলাম। কথাটাই বরং বলি। আমরা রাজবন্দীরা কিছু-কিছু তো ছাড়া পাচ্ছি। আমরা সকলেই তো রাষ্ট্রবিরোধী বিপ্লবী কাজের দায়ে জেলে ছিলাম। এতগুলো বছর তো মাথার কাজ বাদ দিয়ে জেলখাটা যায় না। যা হোক, কিছু-কিছু পড়াশোনা, আলাপ-আলোচনা, বাইরের রাজনীতি বিচার, আন্দোলনের আকারপ্রকার দেখে জেলের ভেতরে আমাদের মনে হতে থাকে একটা-দুটো শাহেব মেরে জেল খাটলেই দেশের স্বাধীনতা আসবে না। বিভিন্ন শ্রেণীকে, বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমিকের সচেতন না করলে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শিকড় গজাবে না’।
‘নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার আমাকে দুটো বই পড়তে দিছিলেন। সে কী বই! বইয়ের পাতা থিক্যা য্যান আগুন ঝরে। কিন্তু একটা কোথাও ফাঁক নাই—দেওয়ানি মামলার আরগুমেন্টে। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো আর ক্লাস-স্ট্রাগল ইন ফ্রান্স। মার্ক্সের। তাতেই তো এ-কথাডা প্রথম জানি—শ্রেণী ছাড়া কোনো যুদ্ধ নাই। তারপর থিক্যা এডডা গোলমালের মইধ্যে আছি নলিনীদা—’
‘সেডা কীরকম? যে বই পইড়্যা আমাগো গোলমাল মিটল, সেই বইয়ে তুমি গোলমালে পইড্ল্যা?’ ক্ষেত্রবাবু বলে।
‘তা কেন বলছেন ক্ষেত্রবাবু। শুনেছি তো মার্ক্স আর লেনিনের লেখা সংখ্যায় আর বিষয়ে এত যে সেগুলি দিয়েই একটা লাইব্রেরি তৈরি করা যায়। তার মধ্যে দুটো-একটা লেখা গুপ্তপথে বা কোনো বিলেত ফেরতের সুটকেস থেকে আমাদের কাছে আসে। তাতে কারো নতুন গোলমাল বাঁধতেই পারে। মার্ক্সবাদের দুটো অক্ষর তো এটুকুই শিখিয়েছে গোলমালই পাকাতে হবে নিজের মাথায়—’, নলিনীদা একটু হেসে থামে, সেটা যোগেনের ভাল লাগে, গোলমাল, চিন্তার, চেনাটাই তো কাজ।
‘আমার গোলমালটা অত বড় কিছু না। আমিই পাকাইছি। সে ছাড়েন গিয়া। কাজের কথাডা শুনি’।
‘সে-ও তো ঐ মাথারই গোলমাল। নলিনীবাবুর নেতৃত্বে আমরা একডা ‘বরিশাল কৃষক সমিতি’ খাড়া কইরছি—’ হকশাহেব বলে।
‘খাইছে-এ। কতগুল্যা কৃষকসমিতি হইব? হকশাহেবের প্রজা সমিতি, কংগ্রেসের কৃষক সমিতি, সহজানন্দ স্বামীর কৃষক সমিতি, মুসলিম লিগের কৃষক লিগ। এগুল্যা ছাড়াও তো জিলায়-মহকুমায় আপনাগো যেমন—’
‘এতে কি ক্ষতি না লাভ? আমাদের পনের আনা মানুষ কৃষক। তারা তো আবার হাজার-হাজার উপায়ে কৃষির সঙ্গে বাঁধা। কৃষক বলতে একটা শ্রেণী বোঝায় ঠিকই। কিন্তু সেই শ্রেণীর সকলে তো। একরকম কৃষি করে না। নোনা জলের চাষ কি মিষ্টি জলে চলে? জলে চাষ আর বালিতে চাষ কি এক? তাহলে তো কৃষক সমিতি যত বাড়ে, ততই মঙ্গল—’
‘এডা তো ঠিক কথাই নলিনীদা। কিন্তু এমন কইরা ক্যান ভাবি নাই?’
‘ওটাই তো মাথায় গোলমাল পাকানো। আমরা চাই সবকিছু স্পষ্ট হোক, সিধে হোক গোলমাল এড়ানোটাই যেন জীবনের আসল কথা। আসলে তো গোলমাল না-পাকালে কিছুই এগবে না’। শুনে যোগেন চুপ করে একটু ভাবে। তারপর বলে, ‘এখন মনে হইতেছে, আমি নিজের মাথায় যে-গোলমাল পাকাইছি সেডার কারণও তো ‘ক্লাশ স্ট্রাগ্ল ইন ফ্রান্স’-এ বলা আছে। সেই যেহানে কে কার ঘাড়ে চাপতেছে তাই নিয়ে মজা করা আছে। পেটি বুর্জোয়ারা বুর্জোয়াদের ঘাড়ে, বুর্জোয়ারা কৃষকদের ঘাড়ে, কৃষকরা সৈন্যদের ঘাড়ে আর সৈন্যরা তাগো বন্দুকের সঙ্গে লাগান্ সড়কি দিয়্যা চাষীগো পাছায় ঢুকাইয়্যা তাগো উলটা দিকে ফিকক্যা দিবার লাগছে,’ যোগেনের বর্ণনায় সকলেই হেসে উঠলে যোগেন বলে, ‘আমার তো ঐ সময়কার ফরাসি ইতিহাস পড়া নাই। অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়্যা দেখি—মার্ক্স-এর বইয়ে যেসব ঘটনা আছে, সেগুলা কিছুই য্যান ঘটে নাই। আরে, হইলডা কী? তহন ইমপিরিয়্যাল লাইব্রেরিতে গিয়্যা দুই-তিনখান ম্যাপ আর বই মিল্যাইয়া দেখি—ইতিহাস পড়ার আগেই ঠাহর্ কইরতে লাগব কোন ইতিহাস পইড়ব্যা। এই পর্যন্ত বুইঝ্যা বইগুল্যা বাইছ্যা রাখছি, গিয়া পইড়ব। এর মইধ্যে দ্যাহেন কপালের ফ্যাড়। লোন-অফিসার আইস্যা বলে, তেনার নাম না কী থুইছে, আসল আরবীতে ‘উজাইর্যা’। কেডা থুইছে? এক প্রফেসর। যার নিজের একডা ধর্ম আছে। কী? না, ব্রাহ্ম। কিন্তু যার বংশ বা সমাজের কোনো ধর্ম—হিন্দু, খ্রিস্টান, ইসলাম—তার নিজের নয়। আর আন্দামানে সারা জীবন জেল খাইট্যা আইস্যা আপনি কইলেন, যোগেন, তোর মাথার ভিতরে মারামারি, কাটাকুটি, লেঙ্গিবাজি, ছেঁড়াছেঁড়ি নাই ক্যান রে? মাথাখানরে একখান পাকা বেলের লাগাল চকচইক্যা রাখছিস ক্যামনে? কন, কাজের কথা কন।’
হকশাহেব বলেন, ‘সেডা খুব শান্তিপূর্ণ ও সহজ। আমাগো কৃষক সমিতির প্রথম বার্ষিক সম্মিলন হবে দুই দিন পর, সেইডাতে আপনারে সভাপতি হইতে হইব।’
‘কোথায় হইব? সম্মিলন?’
‘মাহিলাড়া খালের পারে’, ক্ষেত্রবাবু বলে।
‘মাহিলাড়া, মানে আমাগো এই মাহিলাডা?’
‘আরে যোগেন্দ্রবাবু, মাহিলাড়া আবার কয়ডা?’
‘মাহিলাড়ায় আপনারা আরম্ভ দিছেন, বরিশাল কৃষক সমিতি, আর সেডার বিবরণ আমারে শুইনতে হইল আপনাগ মুখ থিক্যা যারা ছিলেন জেলে, দ্বীপান্তরে—’
‘এডা কি অভিযোগ না অনুতাপ?’ ক্ষেত্রবাবু প্রশ্ন করেন।
‘কী যে কন ক্ষেত্রবাবু! আমার কি অভিযোগের অধিকার আছে আপনাগো মতন মানুষগো সামনে? আর অনুতাপের লগে তো টোপ গেলা মাছের বড়শিকাটা দরকার। আমার আর টোপ কই, কেডাই বা গিলব! আপনাগো কাছে শুইন্যা আমি এই সিচুয়েশনে নিজেরে লোকেট কইরব্যার লাগছি।’
‘এটাও কিন্তু কনট্রাডিকশন এড়ানো হল যোগেন। আমাদের জাতীয় আন্দোলনের শ্রেণীচরিত্র নিয়ে কোনো বড় তর্ক না তুলেই বলা যায়—আমাদের আন্দোলন একজন নেতানির্ভর। সুরেন ব্যানার্জি, সি আর দাশ, গান্ধীজি। এটাই অভ্যাস। ফলে জিলাতে বা গ্রামে যদি কোনো আন্দোলন হয় তারও একজনই নেতা থাকে—পটুয়াখালি সত্যাগ্রহ মানে সতীন সেনের সত্যাগ্রহ। ফলে আন্দোলনের কাছে এটাই আমরা চাই। তাই আমাদের ছোট ছোট কাজের জায়গায় আমার অজ্ঞাতে যদি কিছু ঘটে, তাহলেই মনে হয়, সে কী আমি তো জানি না। এ তো সেই গোলমাল এড়ানো। তোমার জানার বাইরে যদি ঘটনা ঘটতে শুরু করে, নিরপেক্ষ, স্বাধীন, সব ঘটনা—সেটা তো ইতিহাসের প্রগতি। আমাদের কাজ তখন, তুমি যা বলেছ, সিচুয়েশনে লোকেট করা। বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলিকে মেলানো। আমাদের কাজের এই আমরাটা কারা? কোনো-না-কোনো কারণে যারা নেতা হয়েছে; জনসাধারণের ওপর যাদের কর্তৃত্ব আছে বা যাদের ওপর জনসাধারণের কর্তৃত্ব আছে। ঘটনাটা ইনটারেসটিং—দেখবে সিচুয়েশনই তোমাকে লোকেট করে রেখেছে। হকশাহেবই বলুন না।’
‘মাপ দিবেন হকশাহেব। মহিলাড়ার ঘটনা না-জানার গোস্তাকি মাপ দিবেন।’
‘মাপ দিতে হইলে তো গোস্তাকি দরকার হয়। এমএলএ হইয়্যাও আপনি তো আমাগো কাজই করেন। নাইলে নলিনীবাবু ক্ষেত্রবাবু—এঁরা ছাড়া পাইতেন?
‘আপনি কি ভোটের আগেই রিলিজ অর্ডার পাইয়্যা গেছিলেন?’ ক্ষেত্রবাবু একটু খোঁচা দেন ‘কী যে কন ক্ষেত্রবাবু? আপনাদের পাঠাইছে আন্দামান-দেউলিতে দ্বীপান্তরে-নির্বাসনে। আর, আমারে তো ঘুরাইছে দেশের মইধ্যে আলিপুর থিক্যা বহরমপুর, সেখানে থিক্যা রাজসাই। কথা হইল—ছাড়া পাওয়ার পর আমাদের রাজনীতি-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের কথা পরে একসময় কওয়া যাবে। বরিশালে কৃষক আন্দোলন তৈরি করা—এইডা স্থির হইছে আমার কারণে। মহিলাডাও আমার কারণে। মাহিলাড়ার পুবের আর পশ্চিমে বিলচাষিদের সঙ্গে আমার মেলামেশা বহুকালের। আপনার তো সমস্যাডা জানাই আছে। একডা মাইল দেড়েকের খাল কাইট্যা বিলের বাড়তি-জল লঞ্চ-স্টিমারের বড় খালে ফেলার ব্যবস্থা হইলে ফলনটা নিশ্চিত থাকে। নায় তো একটু বেশি বৃষ্টিতেই অর্ধেক ক্ষেতের ফসল ভাইস্যা যায়। এডাই আমাগো কর্মসূচি। খালটা কাটা। এই দাবিতে কৃষকদের এক করা সহজ হইল। খাল কাটার প্রধান আপত্তি মাহিলাড়ার হিন্দু ভদ্রলোকদের। বিলের সব চাষিই মুসলমান। ভদ্রলোক হিন্দুদের আপত্তির কারণ—নতুন খাল দিয়্যা বাড়তি জল যখন লাইনের খালে যাবে, তখন তো লাইনের খালও ভর্তি হইয়া থাকব। নতুন খালের জলে মহিলাড়ার প্রধান পল্লী ডুইব্যা থাইকব বছরে ছয়মাস। বিলের যে-পরিমাণ ফসল বাঁচাইবার লগে খাল কাটা হইব, খাল কাটা হইলে তার দ্বিগুণ পরিমাণ ফসল ধ্বংস হইব-এর একডা হিশাবনিকাশ ভদ্রলোকেরা বহু বছর ধইরা সরকারে ও কোর্টে এজাহার কইর্যা থুইছে। আমরা ভাবছি—কৃষক সমিতি দিয়্যাই খাল কাটাব। সরকারের বুড়ি ছুইয়্যা থাইকব। তাই কৃষক সমিতির বার্ষিক সম্মিলন। সভাপতি বঙ্কিম মুখার্জি। বঙ্কিম মুখার্জির নাম শুইন্যা সমিতির কৃষকরা আগুন। কয় যে স্যায় তো হিন্দু আর কংগ্রেসি।’
‘বঙ্কিমদা কংগ্রেসি, তার উপর হিন্দু? শুইনলে তো বঙ্কিমদার সন্ন্যাস রোগে মৃত্যু হইতে পারে’, যোগেনের এই কথায় নলিনীদা বলে, ‘আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করেও কৃষকদের বোঝাতে পারিনি। তাদের একটাই কথা—মুখার্জি তো বড় বামুন। আর তিনি তো প্ৰদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক। জিতছেন কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে। এর কোনোটারই তো কোনো উত্তর হয় না। আর, সবগুলো কথাই তো সত্য। আমাদেরও তো নতুন কোনো যুক্তি নেই। আবার, এতটা সাম্প্রদায়িকতা স্বীকার করতেও বাধছিল। ভাবছিলাম, সম্মিলনটাই বন্ধ করে দেব। তখন কৃষকদের ভিতর থেকেই আপনার কথা উঠল। উনি এখানকার এমএলএ। কংগ্রেসকে হারিয়েছেন। সুতরাং হিন্দু নন। ওঁর হাতের জল হিন্দুরা খায় না, আমাদের হাতের জলও খায় না। উনি আমাদের স্বজাত। আপনাকে অনুরোধ করতে এসেছি যে আপনি সভাপতিত্ব করতে রাজি হয়ে আমাদের সাহায্য করুন। সরকার যাতে স্থানীয় চাপে প্রভাবিত না হন সেই উদ্দেশে। লোন-অফিসার ঐ এলাকার ঋণ সালিশি বোর্ডের মিটিং ডেকেছেন, ঐ দিনই, উনি আমাদের খুবই সাহায্য করছেন।’
‘আপনাগো সমিতি তো আমার লগে কোনো পালানোর পথ খোলা রাখে নাই। আমারে তাগো স্বজাত ভাই কছেন, আমারে হিন্দু বইল্যা স্বীকার যান নাই, আমাগো হাতের জল হিন্দুগো কাছে অচ্ছুৎ বইল্যা আমারে আত্মীয় ভাইবছেন। আমার তো আপত্তি করার কোনো ক্ষেত্র নাই।’
‘দেখেন, যোগেন, আমার নিজের যেটা গোলমেলে লাগছিল সেটা হল—বঙ্কিমবাবু সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ধারণার ভিত্তিতে তৈরি ধারণা থেকে সঠিক আন্দোলন কী করে তৈরি হবে? পরে দেখছি এই প্রক্রিয়াটা অদ্ভুতরকম সঠিক অথচ পুরোটাই ভুল। ভুলটা হয়েছে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপারে। বঙ্কিম মুখার্জি কংগ্রেস হলেও কংগ্রেস নয়, হিন্দু হলেও হিন্দু নয়—এটা আমাদের বড়-রাজনীতির অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো একটা ঘটনায় সেই বড়-রাজনীতি মহিলাড়া পর্যন্ত পৌঁছয়নি। যে-প্রক্রিয়াতে বঙ্কিম মুখার্জি এলে মুসলমানরা দাঙ্গা বাধিয়ে দিতে পারে, সেই প্রক্রিয়াতেই যোগেন মণ্ডলের অহিন্দু অ-কংগ্রেসি চরিত্রটাও কিন্তু উদ্ঘাটিত হয়েছে। এতদিন জেলখানায় শুয়ে বসে থেকে আমাদের চিন্তাশক্তিটাই শুধু বেড়েছে। তাই যে-কোনো ঘটনার দ্বন্দ্বটা বুঝতে চাই। আপনাদেরও বিরক্ত করি। কিন্তু সবসময়ই যে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকি যে আমার কোনো ব্যক্তিগত ধারণা বা ব্যাখ্যা দিয়ে একটা পরিস্থিতিকে বদলে নিচ্ছি কী না। আগে যখন শাহেব মারতাম—তখনো তো নিজের ব্যক্তিগত ধারণাকে চরম বলে জানতাম। পরিস্থিতি নিয়ে কিছু ভাবতামই না। এখন খানিকটা শুনে, কিছুটা পড়ে মার্ক্সবাদ অনুযায়ী সংগঠন করতে যাই, তখন মনে হয়, পরিস্থিতিটাকে বেশি দাম দিচ্ছি না তো?
