৯৯. হক-মণ্ডল যাত্ৰা
রাইটার্স থেকে গাড়িতে ওঠার সময় পেছনের দরজাটা খুলে ধরেছিল দারোয়ান আর সেই ফাঁকে যোগেন সামনের দরজা নিজেই খুলে ঢুকে বসে পড়েছে।
হকশাহেব দারোয়ানের হাত সরিয়ে নিজেই হ্যানডেলটা ধরে যোগেনকে ডাকেন, ‘উঠো, তুমি আগে না উইঠলে আমি উইঠব না।’ এক পুলিশ সার্জেন্ট তার মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। পি. এম. যাচ্ছেন বলে অনিবার্য ভিড় তো আছেই, কিছু ইউনিফর্মের, কিছু সাদা পোশাকের। একজনই ছিল স্যুট-পরা। হকশাহেবের কাণ্ডে এরা সকলেই মজা পেয়ে হাসছিল। তবে, সেই হাসিতে হকশাহেবের পক্ষে সবই সম্ভব, এমন একটা সমাদরও ছিল। সেই স্যুট-পরা ভদ্রলোক এগিয়ে এসে যোগেনের দরজাটা খুলে দিয়ে বলে ওঠেন, ‘উনি যখন চাইছেন, আসুন স্যার।’ এতটা অপরিচিত ভিড়ের দর্শনীয় হয়ে ওঠার অনভ্যাসে যোগেন নিরুপায় বোধ করে, সামনের আসন থেকে নেমে হকশাহেবের পেছনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘নেন, চলেন।’ হকশাহেব তাঁর হাত না সরিয়েই বলেন, ‘আপ আগারি যাইয়ে’। প্রচলিত এই রসিকতায় সকলেই আমোদ পায়—যোগেন আরো নিরুপায়তা থেকে হকশাহেবের ডান পাশ দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে স্বস্তি পায়।
হকশাহেব দরজার হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে যান, দরজাটা বন্ধ করেন না। দারোয়ান এগিয়ে এসে আটকে দেয় দরজাটা। এ-গাড়িটা চলা শুরু করতেই, সামনের সেই বাইক-আরোহী সার্জেন্টও চলতে শুরু করে।
সার্জেন্ট সামান্য আওয়াজে হুটারটায় একটু বড় হর্নের ধ্বনি তুলে বৌবাজার স্ট্রিটে ঢুকে যায়, পেছনে গাড়িটাও। যোগেন গাড়িতে তো ওঠে না, তার ওপর পি-এম-এর গাড়ি। সে আরাম পেয়ে যায় আর এই গাড়িটা রাস্তা দিয়ে যেমন বাধাহীন এগিয়ে যায়, তাতে যোগেন মজাও পায়। ড্রাইভারও ডাইনে-বাঁয়ে তাকায় না। সে-কাজটা করে ঐ সার্জেন্ট। ফলে, গাড়ি-বাস দাঁড়িয়ে পড়ে, বাসট্রাকও রাস্তা ছেড়ে দেয়, ট্রামগুলোও হেঁচকি তুলে থামে।
যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনাগ চাখারের বাড়িতে পোষা বিল্যাই কী কুত্তা ছিল কী ধরেন মুরগি-হাঁস?’
‘এ সব গুল্যাই তো ছিল। একডাও তো পোষা ছিল বইল্যা মনে নাই। পুষব ক্যা? ওরা তো বাড়ির মানুষজনের মতই থাইকত! বাড়িতেই তো আছে। তাইলে আবার পুষার ঝামলা কইরব ক্যা?’
‘আমি ভাবছিল্যাম বাল্যকালেই আপনি আপনার পোষা জীবদের শারীরিক যন্ত্রণা দিতেন—’
‘ক্যা? যন্ত্রণা দিব ক্যা?’
‘আপনার ভাল্ লাইগব বইল্যা?’
‘আরে, আমার লগে বাড়ির গাইবলদের, মোরগা-মুরগির, বিল্যাই-কুত্তার সম্বন্ধটা কী। ইচ্ছা হইল তো কইল্যাম। দেইখলাম একটা বেশ নধর বাছুররে জবাই দিয়া মাংস হইল খাওয়ার সময়। আমি কি দেইখব্যার গিছি কোন বাছুরডারে জবাই দিল। আমার কাম তো ছিল রান্না মাংসডা খাওয়া।’
‘তাইলে আপনের স্বভাবড়া এমন হইল ক্যামনে? নিজের নিকট মানুষজনরে কষ্ট দ্যান ক্যান?’
‘ক্যা? কারে কষ্ট দিচ্ছি? আবার কও আপনজন?’
‘আপনে তো এই প্রদেশের প্রাইম মিনিস্টার। আপনারে একা ঘরের মইধ্যে যাই কই, প্রকাশ্যে তো তা কওয়া যায় না। কিন্তু আপনার তো সেই সব বালাই নাই। সব হাঁড়িই হাটে ভাইঙ্গবেন?
‘ক্যা?’ তোমার কী হাঁড়ি ভাইংছি?’
‘আমি একডা সাধারণ মেম্বার। আপনি ডাইকছেন বইল্যা আমি আপনার লগে যাইতে বাইধ্য। তাই বল্যা, আপনার সঙ্গে এক সিটে আমার বসা চলে? দশজন ভাইবলডা কী আমারে?’
‘ভাই আবার কী? ভাইব্ল, দ্যাহো, মানুষ কয় কারে। সবাই তো পি-এমের সঙ্গে গা ঘইসব্যার চায়। আর, মণ্ডল মেম্বাররে সাইধলেও যায় না। তোমার এমন সুখ্যাত রটাইল্যাম আর তুমি কও আমি পোষা জীবরে জবাই করি। এই—না দুই দিন আগে অ্যাসেম্বলিতে আমারে জবাই কইরল্যা। কে তোমারে আমার পোষ্য ভাবে? তুমি ভাবো?’
‘কথাডা তো আমার ভাবা দিয়্যা না।’
‘অন্যের ভাবার বিষয়ে তোমার না-ভাইবলেও চলে’।
বাইরে তাকিয়ে যোগেন দেখে, কলেজ স্ট্রিটের মোড় পার হয়ে গাড়ি কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ধরে চলছে।
‘এই দিকে আপনে যান কই? এ তো আমার বাড়ি-
‘তাইলে চলো, তোমার বাড়িতেই যাই।’
‘আপনে গেলে তো প্যারী সরকার স্বর্গের সিঁড়ি পাবে কিন্তু আমারে তো হাইড্রান্টে নামবার লাগব।’
‘ক্যা? কী হইব আমি গেলে? চলো।’
‘আরে আমি তো এই জায়গায় সকলের চেনা। এইহান থিক্যাই তো ল করছি। গরিবের পোলা বইল্যা বেবাক মানুষ দয়াধর্ম করে। আপনে গেলে তো আমার সব গুডউইল হোগায় গেল।’ গাড়ি হেদো পার হচ্ছিল। যোগেন বলে ওঠে, ‘আরে সত্যি তো আইস্যা গেলেন। ঠিকানা জানেন না তো?’
‘মণ্ডল, তুমি এড্ডু বেতমিজ আছো। আমি ভাইবত্যাম, ঐডা তোমার চালাকি। অ্যাহন বুঝি, না, ওডা খাঁটি বেতমিজই। আমি একডা প্রাইম মিনিস্টার। আমার রাস্তা ক্লিয়ার করার লগে সাড়ে দশ হাত আগে-আগে সার্জেন্টের মোটর বাইক যায়। ঠিকানা কি আমার জেবে রাইখব? আর মায়না পাইব ঐ সার্জেন্ট? তালি ওর জামা-প্যান্টে এতগুলা পকেট ক্যা?’
যোগেন দেখতে পায়, সার্জেন্ট ১৭৩/১ বাড়ির সামনে দাঁড়াল না। গেলে অবিশ্যি ভালই হত। ততক্ষণে গাড়ি এগিয়ে গেছে। হকশাহেব যদি এই রাস্তা দিয়েই ফেরেন, তা হলে না হয়, বলা যাবে। বললে তো হকশাহেব এখনই নামতেন।
‘তুমি যে এই রকম একডা প্রাচীন বিখ্যাত জায়গায় থাকো, এহানের সব দ্রষ্টব্য তুমি দ্যাখছ?’
‘খুঁইজ্যা খুঁইজ্যা দেহার টাইম পাই নাই। চোখে যা পইড়ছে দেখছি।’
‘উমিচাঁদের দালান দেইখছ?’
‘কে উমিচাঁদ?’
‘পলাশির যুদ্ধডা ফাইন্যান্স কইরছিল।’
‘ও। সেই মিরজাফরের ষড়যন্ত্র।’
‘আচ্ছা মণ্ডল, তোমার তো পড়াশুনার অভ্যাস আছে—অন্তত আমার থিক্যা বেশি। যহন প্র্যাকটিস কইরত্যাম তহন তো বাধ্য হইয়্যা পড়ব্যার লাইগত—মক্কেল যদি টাহা না দেয়। কিন্তু মিনিস্টার হওয়ার পর ক-অক্ষর হারাম। যাক্ গিয়্যা, যা কইতেছিলাম—পলাশির যুদ্ধের ষড়যন্ত্র কইরল পাঁচ-পাঁচড়া হিন্দু, রানী ভবানী, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, আর-একডা য্যান কেডা? মনে তোমার নাগাল হিন্দু না, সৎহিন্দু, আর নামডা হইল মির জাফরের। তুমি গিরিশ-নকুড়ের সন্দেশ খাইছ?’
‘সিমলার সব মিষ্টিই ভাল। খায়্যা থাইকতে পারি’।
হকশাহেবের হাসিতে যেন গাড়িটা দুলে ওঠে, ‘এইডা যা কইছ মণ্ডল, বরিশাইল্যা ছাড়া কেউ কব্যার পাইরব না। গিরিশ-নকুড়ের সন্দেশ, খায়্যা থাইকবার পারি? আরে, একবার যদি ঐ সন্দেশ তোমার বরিশাইল্যা জিভে ঠ্যাকত, তাইলে তোমার জিভডা ব্যাঙের জিভের নাগাল উল্টাইয়্যা টাকরায় বিধ্যা থাইকত। মল্লিকগ মার্বেল প্যালেস দেইখছ? নাকি হ্যায়ও তোমার, দেইখ্যা থাইকতে পার? শিশির ভাদুড়ীরে দেইখছ? থিয়েটার করে। নাকি হ্যায়ও তোমার কত থিয়েটারই তো দেহি?’
হাতিবাগানের মোড়টাতে ভিড় তো একটু থাকেই, এতগুলো সিনেমা থিয়েটার হল। সার্জেন্টকে তার বাইক থামিয়ে ঘন ঘন ভেঁপু বাজাতে হয় রাস্তা করে দিতে। একে সার্জেন্ট, তাতে ভেঁপু। লোকজন হাঁ হয়ে দেখে। বোঝেই নি, সার্জেন্ট নেহাতই খবরদার ওয়ান। তফাত এই যে খবরদারোয়ান থাকে ঘোড়ার গাড়ির পেছনে, আর সার্জেন্ট থাকে গাড়ির সামনে। লোকে খেয়াল করল তখন, সার্জেন্ট যখন ডাইনে শ্রীরঙ্গমের বাইরের মাঠটুকুতে ঢুকল আর তার পিছু-পিছু একটা বড় গাড়ি।
গাড়ি থামা মাত্র একটু ছুটোছুটি পড়ে গেল।
হকশাহেব বললেন, ‘এবার নামো। আজ থিক্যা তোমার কইলকাতা দর্শন শুরু হোক। শিশির ভাদুড়ীর থিয়েটার দিয়্যা বোধন। খারাপ হইব না—’
যোগেন শুধু বলতে পেরেছিল, ‘এহন আপনে থিয়েটার দেইখবেন?’ হকশাহেবও শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘তুমিও দেইখব্যা’, হলের ম্যানেজার-ট্যানেজার এসে ততক্ষণে ‘আসুন, আসুন’ শুরু করেছে।
এমনিতেই থিয়েটারের ভিড়, তার ওপর আঙিনায় দুটো ঘোড়ার গাড়ি ও এই একটি মোটর গাড়ি। দেখতে-দেখতে হকশাহেবকে ঘিরে ভিড়টা জমে গেল। ম্যানেজার-গোছের কেউ হাতজোড় করে বলে, ‘স্যার, আপনি কি গ্রিনরুমে আসবেন, স্যার। বড়বাবু মেক-আপ নিচ্ছেন। উনি বারবার বলে দিয়েছেন, আজ আপনি, আসবেন। কিন্তু এখানে আপনি দাঁড়িয়ে তো কষ্ট পাবেন, স্যার?’
হকশাহেব একটু হেসে বলেন, ‘নাটকটা শুরু হবে কখন? আমার কষ্টের কথা ভাবেন কেন? এত মানুষ থিয়েটার দেখতে এসেছেন।’
‘আমরা তো আপনার আসার জন্য অপেক্ষা করছি, স্যার। আপনি বসলেই শুরু হয়ে যাবে।’
‘বললেন, যে বড়বাবুর মেক-আপ চইলছে।’
‘স্যার, ওটা তো কথার কথা। যতক্ষণ স্টেজে নেই, ততক্ষণই তো মেক-আপ চলে। বলেছেন, আপনাকে বসিয়ে দিয়ে থার্ড বেল দিতে। দুটো বেল তো দিয়ে দিয়েছি, স্যার। আপনাকে বসিয়ে স্যার, বড়বাবুকে গিয়ে বলব আপনি বসেছেন, তারপর তিনি বললে থার্ড বেল দেব, স্যার।’
হকশাহেব বুঝে নিলেন—এটাই ব্যবস্থা, এখন, এখন আর গ্রিনরুমে গিয়ে শিশির বাবুর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করা হবে না—থিয়েটার আরম্ভ হতে তা হলে দেরি হয়ে যাবে। ইন্টারভ্যালে বা শেষে দেখা হবে। এখন, তিনি বসলেই ড্রপ উঠবে।
‘তা হলে চলেন, কোথায় বইসব? আমার সঙ্গে একজন আছেন, এম. এল. এ।’ তারপর গলাতুলে ডাকেন, ‘মণ্ডল।’
যোগেন একটু আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। সে সেখান থেকেই সাড়া দিল, ‘হ্যাঁ, এই তো।’
‘আইসো। বইসব্যার লাইগব তো।’ প্রায় জনা পাঁচেক বাবু, ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। দুটো সারির মাঝখানে বেশ খানিকটা খোলা জায়গায় দুটো কাঠের চেয়ার পাশাপাশি রাখা। হক শাহেব মণ্ডলকে বলেন, ‘বোসো’। যোগেন বসে পড়ল। হক শাহেব বলেন, ‘আমি বইসলে তো পিছনের লোকের বাধা হবে।’ ম্যানেজার আশ্বস্ত করে, ‘সে স্যার যার হবে সে সরে বসবে’।
