১০
2 of 4

৬০. উপকথাময় সেই দেশ

৬০. উপকথাময় সেই দেশ

ওরা এই উপকথাময় দেশের ভিতর দিয়ে হাঁটছিল। এই উপকথাময় দেশ তাদের এত চেনা, এত জানা যে তারা সেই দেশের দিকে চোখও ফেরাচ্ছিল না, পা একটু সরে গেলেই সে-দেশের শ্রাবণের ক্ষেত, তার রোয়াগাড়া ধানে তাদের চুবিয়ে দেবে। তেমন পিছলনোর কোনো ভয়ই ছিল না, পথ ছিল এতই বিশ্বস্ত। যেখানে দুজনও পাশাপাশি পা ফেলা যায় না—পথই সেখানে তাদের আলাদা করে দিচ্ছিল। শিবুর মাথায় ঘট—তাকে একটু খেয়াল রেখে চলতে হচ্ছিল। কোথাও ছোট নালী কেটে বাঁয়ের জমির জল ডাইনে নেয়া হচ্ছে। কোথাও তার চাইতে একটু চওড়া নালী কেটে কোনো চ্যাড়া ডোঙায় জল ঢালছিল এক জমিতে, আর-এক জমি থেকে—রোয়াগাড়ার মত কাদা বানাতে। কোথাও হঠাৎ একটু জমিতে অনেক মানুষ মিলে একই ভঙ্গিতে রোয়া গেড়ে চলছিল। এগুলো তাদের তিনজনের কারো কাছেই কোনো দৃশ্য হয়ে উঠছিল না। শ্রাবণ মাসের শুরুতে যদি রোয়াগাড়া না হয়, তাহলে আমন পাকবে কবে? চাষির চোখের হিশেব আর হাতের হিশেবের মধ্যে কোথাও কোনো গোলমাল নেই। তিন মাস পুরবার আগেই যদি নতুন চালের ভাত মুখে না ঢোকে, তাহলে তিন মাস পরে যাওয়ার পরও অঘ্রাণে, কোনো ক্ষেতের ধানই পাকবে না। কিন্তু এটা তো কৃষি-জমির কাদা-রোয় গাড়ায় ব্যস্ত কোনো পুরুষ বা রমণীর নিজের জানা হিশেব। তার জানার বাইরের বিপদ অনেক বেশি। নদী বান হয়ে উঠে আসতে থাকবে, বা, ক্ষেতের পর ক্ষেত জ্বলে যাবে গাছের না-জানা অসুখে। আবার এমনও হতে পারে—রোয়াগাড়ার আশি দিন কেটে যাওয়ার পর, এই ধান শরীরের ভিতরে বইতে থাকবে। তেমন বওয়ারই তো কথা। উজানে, পশ্চিমে জমিদারের জমিতে ক্ষেত বড়, চাষ বড়, লাভ বড়, ক্ষতিও বড়। গ্রাম থেকে বাইরে নদীর পাড়, লোকে মুখে-মুখে যে জমিকে বলে বিলা-পাড়, যে-জমিতে টাকাপয়সার পুঁজি খাটাতে হয় না, নিজের ও বাড়ির লোকজনের গতরের জোরেই ফলন উঠে আসে, সেই ক্ষেতের জমির আদল এত আলাদা, বা, একই জমির ক্ষেতগুলির আদলের এত তফাত, যে, দুই হালি জমিতে তিন রকমের চাষ না দিলে, কোনো চাষই ঘরে তোলা যায় না। হঠাৎ করে জল ঢুকে একটা চাষ উপড়ে নিয়ে গেল, সেই একই জল, একই হঠাৎ তার-গায়ে-লাগা আর-একটা চাকে জাগিয়ে দিল। এ কোনো গৌরকীর্তন না——যে চক্ষুতে হাসাইল্যা গৌর, সেই চক্ষে নি কাঁদাও। এ একেবারে হিশেবের ব্যাপার। জায়গাটা তো জলের। তুমি তাতে ধান লাগালে জল কি তার স্বত্ব ছেড়ে দেবে? তাই তার পাশে এমন ধান লাগাও যে-ধান জলে আরো বাড়ে। অন্নপূর্ণাকে যদি ধানপিছু আঁচল রাখতে হত তাহলে আঁচলটা কত লম্বা লাগে? যতরকম ধান, ততরকম গুছি? আরে, গুছি তো একটাই থাকে—না-হলে কি মনে পড়ে?

গুছি একটাই। মনে-পড়াও একটাই। কিন্তু গল্প তো দশ গুণ, বিশ গুণ। যদি যোগ হয় গন্ধের কথা, যদি যোগ হয় স্বাদের কথা। যদি যোগ হয় ধানের বাঁচার কথা—জলের সঙ্গে লতিয়ে বেড়ে নিজেকে বাঁচায়। স্রোতের মুখে গা এলিয়ে নিজেকে বাঁচায়। মরণ নিশ্চিত বুঝে নিজেকে তুলো গাছে বদলে নিয়ে নিজেকে বাঁচায়। ধানের বাঁচার কত রহস্য।

যোগেন-প্রহ্লাদ-শিবু এখন সেই রহস্যময় ও উপকথাময় ডাঙাজলে দূরত্ব ভাঙছে। এই জায়গাটা ফরিদপুর জিলার গোপালগঞ্জ মহকুমায়। তেমনি ডাঙাজল থাকতে পারত খুলনা—নড়াইলে বা, নীচা-ভৈরব-মাতলায়। বা, বাখরগঞ্জ-পুরানাকুমারে। বা, বাগের হাট-চাঁদপুরে। সিলেটেও। পাবনা-রাজসাহিতেও আরো কত, আরো কত।

এই-যে দেশের ভিতরে দেশসকল, সেগুলি একটা কোনো দেশ নয়। এই দেশসকলের পরস্পরের মধ্যে কোনো যোগ নেই। চারপাশের সঙ্গেও যোগ নেই। পৃথিবীতে এমন আর দ্বিতীয় নেই। এগুলিকে বিল বলে। এই বিলের ভিতর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে যোগেন-প্রহ্লাদ-শিবু নমশূদ্রদের সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে যে-আলাপ করছে, এটা খুব মানানসই। খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, পাবনার বিলগুলিতে প্রধানত বা একমাত্র নমশূদ্ররাই থাকে। কিন্তু বিল কী? সেখানে নমশূদ্ররাই-বা এল কেন?

যদি শাহেবদের বেঙ্গলের ম্যাপের সাড়ে ২৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ বরাবর লাইন দাগানো যায়, বা, যদি একটু সহজ করে নিতে, কর্কটক্রান্তি রেখাটিকেই ধরা যায় তাহলে তার নীচে সেই বেঙ্গলকে শাহেবদের নির্দেশে নানা ভাগে ভাগ করা যায়। শাহেবরা সামুদ্রিক জাত বলে তারা কাজটা খুব ভাল ও স্পষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু শাহেবদের সমুদ্র আর এই সমুদ্র একেবারে আলাদা রকমের বলে সেসব গাঁই-গোত্র সব সময়ই ভেসে যেত। শাহেবরা আবার নতুন সম্বন্ধনির্ণয় বের করত। এখন মোটামুটি আন্দাজ করা যায়, যদি আন্দাজ করারও ভুল করার সাহস থাকে।

ঐ রেখায় লাগোয়া পূর্ব-পশ্চিম জায়গাটি—নদীসমতল, এখনকার সিলেট, ময়মনসিং, পাবনা, রাজশাহি, মুর্শিদাবাদ। তার নীচে প্রায় সম-আয়তনের মধ্য-সমতল, ‘এখনকার কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর খুলনা। তার নীচে ডানদিকের ভাগটি বদ্বীপ। বাঁদিকের ভাগটি নদী-অববাহিকা। ভূগোল ও জলতল বিষয়ে শাহেবদের কোনো ভুল হয়নি। অববাহিকা অঞ্চলে হাওড়া-হুগলি-মেদিনীপুর-নদীয়া। বদ্বীপ অঞ্চলে বরিশাল, নোয়াখালি, ফেনি। অববাহিকা ও বদ্বীপের মাঝখানে খুলনার সমতলে বদ্বীপ হয়ে যাচ্ছে অববাহিকা, অববাহিকা হয়ে যাচ্ছে জলবিভাজিকা। ঐখানেই একটু গরমিল। বদ্বীপ আর অববাহিকা সব সময় একরকম বা আলাদা থাকে না। তার ওপর বদ্বীপ হওয়া শেষ হয়েছে কী হয়নি—এটাও গোলমেলে।

শাহেবদের এই বিভাজনে ‘অববাহিকা’ বলতে বোঝানো হয় যে-জায়গা দিয়ে নদীগুলি সমুদ্রে যাচ্ছে সেই জায়গাগুলি। আর বদ্বীপ বলতে বোঝানো হয় যে-জায়গা দিয়ে সমুদ্র স্থলদেশে ঢোকে সেই জায়গাগুলি। এগুলো সন্নিহিত।

ভূখণ্ড হিশেবে অদ্বিতীয়তা তৈরি হয়েছে ঐ অববাহিকা আর বদ্বীপ মিলিয়ে মাত্র দেড়শ-দুশ কিলোমিটারের সমতল ভেঙে প্রায় পাঁচশ, কারো মতে হাজার, নদীয়াত দিয়ে ১ কোটি কিউসেক জল গিয়ে পড়ছে সাগরে। শীত-গ্রীষ্মেও তা ৫০ লক্ষ কিউসেক্রের নীচে নামে না। তাহলে বোধহয় উলটো করে বললেই বলাটা সুবিধে। মাত্রই দেড়শ-দুশ কিলোমিটারের দূরত্ব এক কোটি কিউসেক জল যখন ভাঙে, তখন তো ঐ দেড়শ-দুশ কিলোমিটারে কোনো স্থলভাগ থাকাই সম্ভব নয়। জল সবসময় সমান উঁচু বয়ে যায় বলেই এখানে-ওখানে কিছু ডাঙা খাড়া থাকে—সে-ডাঙা কলকাতা শহর হলেও। এই স্রোতস্বী জলময়তাই এই অববাহিকা আর বদ্বীপকে সম্ভব করে তুলেছে। এই দুশ বাই চারশ কিলোমিটার সমতল নয়। বনতল নয়—শুধুই নদীতল, কেবলই নদীতল। এ এক অদ্ভুত ভূখণ্ড—যেখানে গুনে নদী ফুরনো যায় না। গোনা শেষ হওয়ার আগেই নতুন নদী বইতে শুরু করে। এ এক অদ্ভুত নদীময় দেশ, তারাময় আকাশের মত—গোনার বাইরে। এক তারা কোন্-এক নিকট, আর কোন্ এক দূর, তারার সঙ্গে মিলে রাশিমণ্ডল তৈরি করে, এক নদী কোন্ এক পাশের নদী, আর কোন্ এক দিগন্তদূর নদীর, সঙ্গে মিলে নদীমণ্ডল তৈরি করে। এ এক অদ্ভুত নদীময় দেশ, যেখানে নদী-হীন কোনো উপকথা হয় না, মানুষও হয় না। এ এক অদ্ভুত নদীময় দেশ, যেখানে নদী তার নিজের গোত্রের মানুষ গড়ে নেয়।

নদীর আর এই নদীর মানুষদের বেঁচে থাকার উপায় একটিই—শুধু বাঁক নাও, শুধু বাঁক নাও, আর এক-এক বাঁকে দশজন্ম করে বাঁচো।

যেখানে বাঁচা সম্ভব নয়, সেখানেই তো বাঁচছে এই নদীগুলি আর তার শূদ্র মানুষগুলি।

পদ্মাকে যদি একটু ভুলে থাকা যায়—তাহলে পদ্মা থেকে তার দক্ষিণ-পশ্চিমের ভূমিঢাল কী করে ভেসে না যায়, মাত্র দেড়-দুশ কিমি সেই ঢাল, হাজারখানেক নদীর জল বইতে-বইতে?

যমুনা, ইছামতী, করতোয়া, ধলেশ্বরী, পুংলি, বংশী, লৌহজং–এইসব মানচিত্রখ্যাত নদীগুলি পদ্মার উত্তর-পূব আর উত্তর-পশ্চিম থেকে নেমে নারায়ণগঞ্জ আর মানিকগঞ্জের মাঝখানে একটা ঘূর্ণি পাকিয়ে তুলেছে। খাড়াই থেকে এতগুলো নদী যদি ওপরের নদীর ধাক্কায়-ধাক্কায় পাড়কুলো হতে থাকে, তাহলে, ঘূর্ণি পাকিয়ে পাতালে ঢোকা ছাড়া নদীর আর বাঁচার উপায় কোথায়?

কিন্তু সে-ঘূর্ণি স্থায়ী কী অস্থায়ী সেটা ঠিক করত কে—শাহেবদের বেঙ্গলের আগে? শাহেবরা নদীতে ঢুকতে ভয় পেত—ঘূর্ণি চিনত না। আবার, বিভ্রমময় কুহকময় এইসব ঘূর্ণি বাণিজ্যগামী ও বাণিজ্য-ফেরত পুরনো, বিশ্বাসী ও অভিজ্ঞ মাঝিমাল্লাদের চেনা হয়ে যায়। চেনা হয়ে যাওয়া মানে—শুরুতে যেখানে যা দেখেছে, ফিরলেও সেখানে তাই দেখেছে। তাহলে নিজেরা টের পাওয়ার আগেই দাঁতে দাঁতে লেগে বা তালুতে জিভ ঠেকে কিছু আওয়াজ বেরয়। তবে, নিজে না বাঁচলে আর বাপকে ডাকবে কে? ঐ জলপ্রান্তরে বাঁচামরাটা খুব আর আলাদা ব্যাপার থাকে না। যত ভয়ডরের যত ব্যবস্থা বংশানুক্রমে জানা আছে, সব একসঙ্গে মনে পড়ে। মাঝিমাল্লারা সকলেই তো অচ্ছুৎ—সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক। পাছে স্পর্শদোষ ঘটে যায়, বামুনদের কোনো দেবদেবতার নাম তারা ধরে না. এমনকী, তাদের একেবারে ঘরোয়া ঠাকুর শ্রীচৈতন্যকেও ডাকে না। চৈতন্য তো বামুন। ‘গৌর, গৌর’ ডাকে—গৌরের তো পৈতে নেই।

অববাহিকা ও বদ্বীপের অসংখ্য, অগুনতি জলমুখে এত সব অদ্ভুত শব্দ দিয়ে জল চেনা হয় কেন, যে শব্দগুলির কোনো ভাষা নেই। খণ্ডেশ্বর, লাটিকের ঘট, কাঁচনা, বিজুসিজু, খুরপানি, উলডাকালী, গিলাহাটি—এইসব।

সম্ভবত এগুলো কোনো শব্দই নয় কারণ এগুলোর কোনো অর্থ নেই। অর্থ ও ভাষা ছাড়া যদি কোনো শব্দ হতে পারে, তাহলে বলদও বিয়তে পারে। কিছু শব্দচাখা মানুষ এইসব শব্দ নিজেদের জিভের ওপর ফেলে টাকরায় আওয়াজ তোলে, যেন রুপার টাকা বাতাসে ওড়াচ্ছে। তারা কেউ-কেউ বলল—খুরপানি শব্দটা নাকী সংস্কৃত—যে-জল ক্ষুরের মত ধারালো। পরে, যখন আবার নতুন কিছু শব্দচাখা এল, তারা বলল, কথাটা আসলে ‘খুরপাদানি,’ নিম্নবর্গের মানুষরা তো অর্থ বোঝাতে কথা বলে না, একটা পরিস্থিতি বোঝাতে বলে। ‘এমন এড্‌ডা বেকায়দা খুরপ্যাদানি কামে কেউ হাত দেয়।’ ‘উলটা কালী’ নিয়ে গোলমালটা শব্দচাখারা শুরু করেও সামলাতে পারেনি, শেষে চৌকিদার-গোছের একটা লাঠিয়ালের দল দরকার হয়েছিল। এক শব্দচাখা বলেছিল, ‘কালী কী করে নিম্নবর্গের উপমা হয়?’

কথাটা নমশূদ্র-মুসলমানদের বোঝানো হল—’তোমরা নাকী কালী মানো না?’

‘কোন্ চুদির ভাই কইছে? জানে না—সোজা কালী হিদুগ আর উলটা কালী’ শুদ্দুর-মুসলমানগ?’

‘কালীরে উলট্যা, তো তার ল্যাংটা দেখা যাইত। সেটা ত যায় নাই।’

এমন কথায় বজ্রগর্জনে কেউ নাকী ধমকে উঠেছিল, মাকে বিয়্যা করলেই কি আর বাপ হওয়া যায়? কোন্ চুতমারানি কালীমারে উলটায়ে ল্যাংটা খোঁজে? হালার হোগা মারানি পোলা কি রাইতকানা? বিবির বোদার বদলে হোগায় ঢুকায়? আরে, কালীমায়ের খাড়া-উলটা তো একই ল্যাংটা। মা কালীর পরনে কিছু থাকে নি, ছাগলচোদার জামাই?’

নামকরণের শব্দযোগ্যতা নিয়ে এমন বিবাদের ভিতর কিছু শৌখিনতা থাকে। সে-শৌখিনতা চর্চা করা যায় না, মানে সে-শৌখিনতার সময় মেলে না যখন অববাহিকা আর বদ্বীপের পাঁচশ নদী যেন পাতাল থেকে এসে আবার পাতালে ঢুকে যেতে জলের ভিতরের মাটি আর ডাঙার ভিতরের জল—দুটোকেই উপড়ে আনে ওপরে। প্রতিদিনের প্রতি প্রহরের এই মন্থনে নদীই কি নদীর খাত চিনতে পারে?

নদী যে চর ফেলে এটা শাহেবদের বেঙ্গলের মানুষদের অন্তত জানা ছিল।

১৭৬৫ সাল থেকে শাহেবরা যখন বেঙ্গলের রাজস্ব আদায়ের দখল পেল, তারপর থেকেই নদীর ভিতর জেগে থাকা সবুজ চরজমিগুলি তাদের নজরে পড়ল, যারা শাহেবদের এই রাজস্বটা আদায় করে দিত। এই আদায়কারী নিয়োগে শাহেবদের কোনো হিন্দু-মুসলমান ভাগ ছিল না। রেজা খাঁ যেমন ছিল, তেমনি ছিল গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ—পরে দেওয়ান ও রাজা। শাহেবরা নিজেরাই যখন মুর্শিদাবাদ লুটের সব সোনার টাকা জাহাজের খোল ভরে দেশে পাঠাতে পারেনি—সেই আমলে গঙ্গাগোবিন্দদের দু-একবার চাকরি গিয়েছিল ও প্রতিবারই আবার তাকে চাকরিতে ডেকে নেয়া হয়েছিল। সেই প্রথম রাজস্ব-আদায় রাষ্ট্রের প্রায় একমাত্র কাজ হয়ে উঠল। রাষ্ট্র কি আর মুর্শিদাবাদ বা ঢাকা বা দিল্লিতে থাকে? রাষ্ট্রের প্রধান কাজ যে নিজের স্বার্থে বদলে নিতে পারে—সেই রাষ্ট্র। রাজস্ব আদায় আর সেই রাজস্বের ভাগ নেয়া যদি রাষ্ট্রব্যাপারে ক্ষমতার একমাত্র নিয়ামক হয়, তাহলে, ভাগীরথী, পদ্মা, মলঙ্গী, মেঘনা এইসব নদীগুলিতে শুধুই জল নেই, মাটিও আছে ও সে-মাটি থেকে ফলনও ওঠে আর যখন যদি ওঠে, তাহলে খাজনা উঠবে না কেন?

জমিদার থেকে দিনমজুর একই ভূগোলে লেপ্টে যদি আটচল্লিশ ঘণ্টা হত, তাহলে আটচল্লিশ ঘণ্টাই কাটাত, একই রোদেজলে। এই নদীচর কি তাদের চোখের আড়ালে ছিল শাহেবদের বেঙ্গলের আগের বাংলায়? সে কী করে সম্ভব?

পিঁপড়েরা লাইন মেরে গাছে উঠতে থাকলে, লোকজন ঘরের খুঁটিতে নতুন দড়ির বাঁধন লাগায়। বাড়ির আঙিনার কোণে পাখি বসার জন্য যে-চৌকা পাতা থাকে বাঁশের মাথায়, সে-চৌকায় যদি বাসাফেরা পাখিরা না বসে, তাহলে, লোকজন পুবশিয়রের জানলা খুলে শোয়—রাতে আরো গরম পড়বে। ধানকাটার মুখে আলোপোকা বেশি না কম দেখে আন্দাজ হয় শীত কেমন পড়বে। আর এত সব বড়-বড় নদীতে যে শুধু জল নেই, মাটিও আছে আর সে-মাটিতে যে চাষও হয় তা জানবে না সেই সব উচ্চবর্ণ, যারা পরের ঘাড়ে খায়?

চোখ তো পড়েই। ধান কাটা হয়ে গেলে মাঠ থেকে কারা এসে ঝরা ধান কুড়িয়ে নিয়ে যায়—এও যাদের চোখে পড়ে, তারা কী না দেখেনি চরের চাষ, শাহেবদের বেঙ্গলের আগে? এ সম্ভব?

সম্ভব না হলেও দেশধর্ম, কালধর্ম, প্রজাধর্ম তো আছে। চরের জমি যে কতটাই বিপদের, তা তো এরা জানেই। না-গিয়েই জানে বলে বেশিই জানে। সাপখোপ, বাঘ-ভালুক, এসব তো আছেই। তাছাড়াও আছে—চর কি পুরোটা জাগা না আধডোরা—সেটা তো জানা যায় মধ্যরাতে চারটে বাঁশের ওপর তোলা টুঙ্গি, লোকজনসমেত মাটির ভিতর সেঁদিয়ে গেলে। এমন মরণের দাঁত থেকে ধান কেড়ে আনতে হত গরিব নমশূদ্র ও মুসলমানদের। সে যদি দেখাও থাকে, সে দেখা কি স্বীকার করা যায়?

নতুন চাষের জন্য তিনটা গ্রহ দরকার। এক : চাষি বাড়া, দুই : চাষির বেরনো আর তিন : নতুন ফসল।

১৮৮০-৮৫তেই এসে গেল পাট। হাসান মোল্লা তার গানে কৃষিকাজের মধ্যে পাট ধরেনি। পাটে তো কোনো চাষ নেই।

মন রে, কৃষিকাজ কইরো না।
ওমা, আ লো, আমারে দিস না তবিলদারি
তোর জমি ভাসে অঘ্রান মাসে
কত আর কষি খাজনাদারি
ওমা আ লো, আমারে দিস না তবিলদারি।
(মন রে, কৃষিকাজ কইরো না)।।
ওমা, আ লো, আমারে দিস না মা তোর দিনমজুরি।
তোর দিন চলে মা, মুজরি চলে নি,
কত আর করি, দিনগুজারি।
ওমা, আ লো, আমারে দিস না দিনমজুরি।
ওমা, আ লো, আমারে দিস না তালুকদারি।
কত আর করি পুকুরচুরি।
আ লো মা, আমারে দিস না তালুকদারি।
(মন রে কৃষিকাজ কইরো না)।।
ওমা আ লো, আমারে দিস না মা তোর কোর্ফা গিরি।
কত আর ফিরি পিঁপড়াগিরি
ওমা আ লো, আমারে দিস না মা তোর কোর্ফাগিরি।
ওমা আ লো, আমারে দিস না মা তোর চুকানদারি।
দরাদরি চুকানদারি
শেষ নাই মা এই চুকানদারি।
(মন রে, কৃষিকাজ কইরো না)।।
ওমা আ লো আমারে দিস না তোর বর্গাদারি।
কার বগ্‌গা কার মাগ্‌গা মাগো
ওমা এত কী যায় ছাড়ানদারি?
ওমা আ লো, আমারে দিস না মা তোর খাজনাদারি।
সময় ধইরে খাজনা জমা এইডা তো মা কী দিগদারি।
(মন রে, কৃষিকাজ কইরো না )।।
ওমা আমারে মা পতিত্ রাখো। এমন পতিত আবাদ-অতীত
সোনাদানা য্যান ফলে না।
ওমা, আলো মা, মুই কৃষি কাজ জানো না,
মুই তো কেবল চষতে জানি,
সে-চাষে মা কিছু ফলে না।
(মন রে, কৃষিকাজ কইরো না)।।
ওমা, আমারে কৃষি কাজ দিয়ো না-
সেনসাসে মা কওয়া লাগে দখলি না হাউলি চাষী।
তার চে ভাল পতিত চাষী।’

যার ইচ্ছে সে-ই পতিত ক্ষেতে, ক্ষেতের ফেলে রাখা টুকরোয় পাট চাষ করতে লাগল। ফড়ে আর ব্যাপারিরা বাড়ি বয়ে এসে পাট কিনে নেয়। নমশূদ্র ও ফরাজি মুসলমানরা শাহেবদের বেঙ্গলের চাষ বদলে দিল—তখনই তো বেসিনবেঙ্গল না-বলে, বলা হতে লাগল লোয়ারবেঙ্গল। জমিদাররা তাদের জমিদারিতে রাজপ্রাসাদ তুললেন, জিলাসদরে জমিদারির নামে বাড়ি তুললেন।

শেতলাই হাউস, নাটোর পার্ক, নারায়ণ ডহর এস্টেট, উড়ানিয়া মনজিল।

কায়েম চাষের বদলে চরের চাষ, চরের চাষের বদলে বিল চাষ, ধানের বদলে পাট চাষ—এলেও নমশূদ্রদের অবস্থা কিছু বদলাল না— সামাজিক দিক থেকেও নয়, আর্থিক দিক থেকেও নয়. বা, দুদিক থেকেই মাত্র দুই-এক সুত্র বদলাল।

নমশূদ্রদের অবস্থা আবার এমনও ছিল না যে, যে-ভাত খাচ্ছে সেটাই বুঝি এখনকার মত শেষ ভাত। না। শাদামাঠা খাওয়ার অভাব ছিল না।

তবু নমশূদ্র চাষিদের খাওয়ার সিকিভাগ ধান কিনতেই হত। নিজের চাষ থেকে থাকত না। তার কারণ এই নমশূদ্রমুলুকে বা বিলে একজন কৃষক বড় জোর দেড় থেকে তিন বিঘে জমি চষত। তার বেশি চষা যেত না। জমিদারের খাজনার কোনো স্থিরতা ছিল না—প্রত্যেক বছরেই বাড়ছে। ফলে বিল-এলাকার নতুন জায়গা চাষে আনলেও চাষির কিছু লাভ হত না। আবার, পাটচাষ শুরু হতেই কোনো-কোনো জমিদার নগদ খাজনার বদলে ফলন-খাজনা চালু করল। তাতে তো একেবারে শিয়রে সর্পদংশন।

তবু এটা সত্য পাট চাষ শুরু হওয়ার পর ও পাটের বাজার যতদিন চড়া ছিল, ঐ ১৯২৫ পর্যন্ত নমশূদ্ররা সামান্য একটু ভাল ছিল। কোনো-কোনো বাড়িতে পড়াশুনো ঢোকে। কারো কারো একটু সামাজিক সম্মান জোটে। সেও কিছু না এমন। তবু এই চল্লিশ বছরে নমশূদ্রদের ভাবসাব বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও-কোথাও উচ্চবর্ণের লোকদের বয়কটও করা হয়। নতুন তৈরি ‘আসাম ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ’-এর লেফটেনান্ট-গভর্নর নমশূদ্র নেতাদের একটু খাতিরও দেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া ধর্ম আন্দোলন বেশ ছড়ায়-গুছোয়।

তাঁরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, তাঁরা স্বাধীনতার বিপক্ষে ও ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে। এটা যে একটা ঘোষণার বিষয়—সেটা জানাও তো মস্ত জানা।

নমশূদ্রদের পক্ষে এই একটু ভাল চল্লিশ বছরে এই নমমুল্লুকে খ্রিস্টান মিশনারিরা নমশূদ্রদের মধ্যে বহু বছর ধরে কাজ করেছিলেন। বাখরগঞ্জ-ফরিদপুর-যশোর-খুলনায়। তাতে কী কী উপকার হয়েছিল সেসব জানা যায়নি। কিন্তু একজন শাহেব সপরিবার এখানে বসবাস করছেন—তার কি একটা প্রভাব না থেকে পারে? একটা প্রভাব তো বেশ দেখাই যায় চোখে। গুরুচাঁদ ঠাকুররের বাড়িতে বা মন্দিরে শাহেবের যাতায়াতের ফলে নমশূদ্রদের নিজস্ব ধর্ম, মতুয়া ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ও প্রচারিত হয়েছিল ও গুরুচাঁদ একই সঙ্গে সেই ধর্মের প্রধান ও সেই ধর্মীয় নমশূদ্র-সমাজে গুরু ও নেতার পদে মান্যতা পেয়েছিলেন। এ-মান্যতাটা প্রথম দিকে খুব একটা কাজের কিছু ছিল না। পরে, মান্যতাটা তৈরি করা হয়েছিল। এই ৩৭ সালেই গুরুচাঁদ মারা যান। ফাল্গুনে। মরা মানুষ বাঁচানোই তাঁর চিকিৎসার গুণ, এ-রকম বিশ্বাস এত মানুষকে এত বার বাঁচিয়েছে যে তাঁর নিজের মুহূর্তে কাজে লাগল না আর। লাগল না—কথাটি কি এত সহজে ব্যবহার করা উচিত? যদিও ১৯৩২ সাল নাগাদই সামনের ভোট ঘোষিত হল ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী হিশেবে আরো অনেক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নমশূদ্ররা সংরক্ষিত আসন পেল

ঐ চল্লিশ বছর, ১৮৮০ থেকে ১৯২০ বা ১৮৮৫ থেকে ১৯২৫—পাটের সুবাদে নমশূদ্রদের একটু-আধটু ভাল-থাকা থেকেই তাদের সামাজিক মর্যাদার কথা তারা তুলতে লাগল। ‘চণ্ডাল’ নামের বদলে ‘নমশূদ্র’ নাম চাওয়া হল, দেয়া হল, অথচ আজও জানা যায়নি—নমশূদ্র শব্দটিতে কী বোঝানো হল? সৎচাষি, সদ্-গোপ, নবশাখ—হিন্দু সমাজের নিম্নতম স্তরে নতুন নাম-পরিচয় যেমন তৈরি হচ্ছিল, নমশূদ্রও সেরকমই একটা শব্দ। কিন্তু এর পরিচয়টা কী? সেটা জানা গেল না, জানা যাবে কী না সন্দেহ। কেন ‘নমশূদ্র’ নাম—চাওয়া হল, দেয়া হল, অথচ আজও জানা যায়নি—নমশূদ্র শব্দটিতে কী বোঝানো হল? জানা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে না শব্দটির গঠন। কেন নামটা ‘নমশূদ্র’ই হল? ‘শূদ্র’ শব্দটি না-বদলে নিজেদের মনুস্মৃতির অন্তর্গত যেমন করা হয়েছে, তেমনি এই জনগোষ্ঠীর বিপুলতর সাধারণকে আশ্বস্তও করা হয়েছে? এ নামে বর্ণভেদপ্রথার বিরোধিতা নেই, পোষকতা আছে।

আর-একটা দরকারি কথা। বেশ তো, ১৮৮০-৮৫-র পাটের কথার আগে এটাও তো জানার ছিল না এরা এখানেই বসবাস গাড়ল কেন?

‘এখানে’ বলতে যেমন প্রশাসনিক খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল জেলাগুলির যথাক্রমে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিম, পুব ও দক্ষিণকে বোঝায়, তেমনি ‘এখানে’ বলতে এই জায়গাগুলির চেহারা চরিত্রের মিলের দিকেও যেন একটু নজর আসে। এসবই বিল। এত ছোট নামে বোঝানো যায় কী না, সেই সন্দেহ থেকে শিক্ষিত উচ্চবর্ণের কেউ-কেউ ‘বিল’ শব্দটিকে বিশেষণ করে দেন—বিল্যা জায়গা, বিল্যা এলাকা, বিলাঞ্চল, নিচুজমি, ইংরেজিতে ওয়েটল্যান্ড, মার্সিল্যান্ড—এ-রকম। যে-প্রসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, সে-প্রসঙ্গে হয়ত এই বিবরণগুলি সাহায্যই করে কিন্তু ‘বিল’ কথাটির পরিচয় কেন স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, যেমন, নদী, চর, খাল, পুকুর, পাহাড়, ক্ষেত, সুখা? ‘নমশূদ্র’ ও ‘বিল’ এই দুটো কোনো একটিরও গঠন না-জানলে কী করে তৈরি হবে সেই অর্থ যা মানুষ ও প্রকৃতিকে দেয় তার স্থানাঙ্ক। নমশূদ্ররা প্রধানতই বিলবাসী বা বিলচাষি কেন? একটা বিশেষ ধরণের স্থান ও প্রধানত কৃষক এক জনগোষ্ঠী—এই দুইয়ের মধ্যে এমন মিল ঘটল কেন? মিলটা টিঁকলই-বা কেন?

‘বিল’—শব্দটি চতুর্বেদে আছে আর তার অর্থও এখনকার মতই—নিচু জায়গা, গর্ত, খোঁদল, যেন হাতার বা চামচের মাথা ইত্যাদি। এতে প্রমাণ হয় না, যাঁরা বেদ বানিয়েছেন, তাঁরা বিল দেখেছেন। পরে, হয়ত জেনে নিয়ে বৈদিক ভাষায় ঢুকিয়ে নিয়েছেন। সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারে এমন অপহৃত শব্দের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু তার মানে কখনোই এমন সোজা নয় যে এমন যারা নমশূদ্র, আর শূদ্র যেহেতু আর্যবিজয়ের ফল, সুতরাং এই নমশূদ্ররাও বৈদিক ও এই বিলও বৈদিক। কারণ, মাটির বয়স নির্ভুল মাপার অঙ্ক বেশ পুরনো। সেই অঙ্কে বাখরগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর খুলনার মাটির বয়স ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না। ওগুলো এখনো পাকাপাকি মাটি হয়নি। যে-কোনোদিন জলে ফিরে যেতে পারে।

১৭৬৯-৭০ সালে পরপর দু-বছর শ্রাবণ-ভাদ্রের বৃষ্টি না-পাওয়ায়, যাকে শাহেবরা বলে সেন্ট্রাল প্লেইনস অব বেঙ্গল, সেখানে এমন দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, যা দেখতে গিয়ে হান্টারশাহেব একটা বই লিখে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে যান—’অ্যানালস অব রুর‍্যাল বেঙ্গল।’ বাঙালিরা যারা দুর্ভিক্ষে মরেনি তারা একটা প্রবাদই তৈরি করে ফেলল— ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। শাহেবদের হিশেবেই যত লোক ঐ জায়গাগুলিতে—এখনকার বীরভূম, বর্ধমান, নদীয়ার অংশ—থাকত, তাদের পাঁচ আনি গেল মরে, তার বাকি পাঁচ আনি গেল পালিয়ে। তাদের সকলেই চাষি, খাজনা-বন্দবস্তে সাবেকি চাষি। তারা জমিদারের খাজনা ও আবওয়াবের ভয়ে পালিয়েছিল নাকী চালের অভাবে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল—এ-নিয়ে এখন দুনিয়া জোড়া বিশেষজ্ঞদের তর্ক। এসব তর্কের তো মীমাংসা হয় না। সবগুলি মতই সত্য হওয়া ভাল। এবং সম্ভবত।

মানে, শাহেবরা লিখেছেন, এইসব বড়-বড় গ্রাম একেবারে খাঁ খাঁ করছে। মানুষজনের ঘরবাড়ি পড়ে আছে—মানুষজনও নেই, তাদের হাল-বলদও নেই। রাস্তাঘাট, হাটবাজার শুনশান। যে-ছ আনি লোকজন থেকে গেছে তারা গ্রামগুলিতে আধা-পাগলের মত ঘুরে-ঘুরে খুঁজে বেড়াচ্ছে, ‘আমার কিষাণটাকে দেখেছ গো, একটা কিষান জোগাবে গো।’ যে-পথেই হাঁটো, দু-পাশে শুধু খড়ো ধানক্ষেত। ধানও নেই। মানুষও নেই।

পরের বছর, ১৭৭১ সালে মা-লক্ষ্মীর স্নেহ-মাখা বকুনিও শোনা যেত—আর-একটু জমি রাখিসনি হতভাগা, ধান দেব কোথায়।

কথায় বলে—চাষার কাছে খরাও যা, বানাও তাই। এত ধান বাজারে এল যে ধকধকিয়ে ধানের দাম ঠেকল তলায় যেমন গাড়ির এক দিকের বলদ জোয়ালের ভার ও পাঁচনের মার সত্ত্বেও নেমে পড়ে কাদায়। এমন তলায় যে খাওয়ার ধান বেচে দিয়েও জমিদারের খাজনা শোধ হয় না—বকেয়া দু-বছরের আর নগদ হাল সনের। তারও ওপর, শাহেবের শাহেব ওয়ারেন হেস্টিংস নতুন এক খাজনা বসালেন, নজিরা। তোমার জমি বা বাড়ির পাশ থেকে যদি কোনো চাষি পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তোমাদের সেই জমির ন্যায্য পাওনা শোধ করতে হবে। দুই-দুই খরা ও এক অতিফলনের দুর্ভিক্ষের পরের পরের বছর আবার খরা—সন ১৭৭৩-এ। তাহলে দুটো দুর্ভিক্ষে যে-জমিগুলি পতিত্ হয়ে গেল, আবার নতুন দুর্ভিক্ষে আরো যে জমি নতুন পতিত্ হল—এ থেকে বাঁচবে কী করে জমিদার, জাহাঙ্গির বাদশার পাট্টা পাওয়া জমিদার? চাষি না-থাকলে জমি কীসের, জমি না-থাকলে জমিদার কীসের, জমিদার না-থাকলে খাজনা কীসের, খাজনা না-থাকলে শাহেব কীসের।

এরকম গোলকধাঁধার ফেরে যখন সব মানুষ একসঙ্গে পড়ে, তখন কী করে, কী করে যেন ধাঁধাটা কেটেও যায়

ঢাকায় বা শাহেবদের বেঙ্গলে যেটা অববাহিকা অঞ্চল, পরে, যেটার নামই হয়ে যায় পূর্ব বাংলা, সেখানে তিনটি দুর্ভিক্ষের একটিও হয়নি। কিন্তু ১৭৭৮ সালে এমন বন্যা নামল যে কোন্ নদীর জল, কোন্ নদী দিয়ে ভীমবেগে নামছে, তা সে নদীও জানে না, নদীর পাড়ের মানুষও জানে না। গঙ্গার মর্ত্যে আগমনের ঘটনাটা সকলের জানা—পালা গান, কবিগানও হয়েছে। ৭৮-এর ঢাকার বন্যায় অন্তত শ-খানেক গঙ্গা মহাদেবের জটায়ু লাফিয়ে পড়েছে। মহাদেবের মুখ চার-পাঁচটা হয়ত—কিন্তু মুখ মানে কি মাথাও চার-পাঁচটি? যদি হয়ও, তাতেই-বা সামলাত কী? একশ গঙ্গাবতরণের জন্য কতগুলি নদী দরকার?

ফলে, পুবের জমিজমা, বাড়িঘর, বনজঙ্গল, ঘাটপাট, রাজাপ্রজা, জলমাটি সব মিলেমিশে কুরুক্ষেত্র

বন্যার জল নেমে গেলে ও নদীখালগুলি তাদের চেনা তলাকারে ফিরে এলে অববাহিকাকে আবার একটা জায়গা বলে চিনতে মন চাইল। চাইলেও অবিশ্যি চেনাজানা গেল না। কারণ কোনো দিক চেনানো গাছই আর খাড়া নেই। নিজের শিকড়ের গর্ত থেকে উৎপাটিত হয়ে গর্তের পাশে পড়ে আছে। বা, বন্যার স্রোতের মুখে ভেসে চলে গেছে।

কেউ-কেউ অবিশ্যি চেষ্টা করেছিল, নদী বা খাল ধরে ভাটি পথে গাছগুলোকে খুঁজে বের করতে। শোকের প্রথম আঘাতে এমন বুদ্ধিবিভ্রাট ঘটে বটে। কিছু-কিছু সময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *