৯৮. হক-মণ্ডল ইকুয়েশনের খেলা
‘শাহজাদা, আপনাকে বিশ্বাস করা অকর্তব্য, যোগেন কোনো নাটকের উদ্ধৃতি বলে, ‘ঐহানে দেইখ্যা আমারে ডাইকলেন, না-দেইখলে ডাইকতেনই না, অ্যাহন কন—পরামর্শ আছে। আমার লগে কী পরামর্শ। আমি তো আপনার পার্টির লোক না।’
‘আমার পার্টি কুনডা?’
‘কে-পি-পিরে জন্ম দিলেন, স্তন্য দিলেন, খাড়াইব্যার শিখাইলেন, তারপর তার কান্ধে চাইপ্যা প্রাইম মিনিস্টার হইলেন আর অ্যাহন জিগ্যান আপনার পার্টি কী?’
‘আরে মণ্ডল, আমি তো মুসলিম লিগের অল ইনডিয়ার ভাইস আর বেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট। কও কী তুমি?’
‘অ তো বামুন-কায়েত-বদ্যিগ মাইয়াদের বিয়ার সময় গোত্রবদল।’
খুব একচোট হেসে ওঠেন হকশাহেব। যোগ করেন, ‘মণ্ডল, আমাগ আর তোমাগ একডা বড় ফাঁক হইয়া গিছে এই পার্টি নিয়্যা। আমাগ টাইমে তো পার্টি একডাই—কংগ্রেস। তার মইধ্যেই নরম গরম, নো চেঞ্জার, প্রোচেঞ্জার, টেররিস্টগ নানা গ্রুপ, ভবানী মন্দির, আবার ধরো, সোস্যাল রিফর্মের নানা ছোটখাটো সংগঠন, হিন্দু সৎকার সমিতি, মুসলমান উন্নতি পরিষদ, নিরামিষ খাদ্য সমিতি, অবলা বান্ধব সমিতি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, মুসলিম সাহিত্য পরিষদ—যা ইচ্ছা তাই করো, পার্টি কিন্তু একডাই কংগ্রেস। দেখাদেখি ঐ বঙ্গভঙ্গের টাইমে ইন্ডিয়ান মুসলিম লিগ হইল কিন্তু পাইকল না তেমন। দ্যাহ, মতিলাল নেহরু, সি-আর দাশের মাপের ন্যাশন্যাল লিডাররাও স্বরাজ্য পার্টি বইল্যা আলাদা পার্টি কইরল—তাও কংগ্রেসে থাইক্যা, আর, তোমাগ টাইমে খাড়াইছে পার্টি য্যান বাপের নাম, মরণের পরেও বদলাইব্যার উপায় নাই। এমন পিছনদড়ি নিয়্যা কুনো কাম করা যায়? কাম তো কইরব মানুষ। পার্টি হইল একডা কৌটা। সেই কৌটাডারে শালগ্রাম শিলা বানাইবার কাম কী? তোমার এই কৌটা পছন্দ না হইলে আর-একডা কৌড়া ধরো।’
‘কথাডা আপনার বেবাক ফেলনা না। পার্টিতে তো বাঁধাবাঁধি লাগবই। তাতে আবার বড় মানুষর ইচ্ছায় ব্যাঘাতও ঘগইটব্যার পারে। কিন্তু পার্টি না-থাইকলে পার্টি-লিডার হইব ক্যামনে?’
‘ক্যা? যহন পার্টি ছিল না তহন লিডার বেশি ছিল, না অ্যাহন বেশি? আইসো, ফর্দ বানাই, দেহ। আর সেই সব লিডারগুল্যার সাইজ কী এক-একডা? তিন সেরি খাশি এক-একজনের গলা দিয়্যা নামে য্যান শরবতের লাগাল। আচ্ছা, আমার কথা বাদ দ্যাও। নিজের কথা কও। সইত্য কইর্যা কও। তোমার শিডিউলগ যদি একডা পার্টি থাইকত, তালি তোমার সুবিদা হইত, নাকী, অ্যাহন যেমন, শিডিউলগ পার্টি একডা থাইকব্যার পারে আর শিডিউল বইল্যা একডা আলাদা আড্ডাও থাইকব্যার পারে।’
‘আমাগ বর্তমান অবস্থায় সুবিধা বেশি। পার্টিগুলার শিডিউল দরকার আর শিডিউলগ পার্টি দরকার। কিন্তু তাতে তো অসুবিধাও মেলা। ধরেন, আপনারা সাব্যস্ত কইরলেন দুই বা তিন শিডিউলরে মন্ত্রী বানাইবেন। তহন তো সব পার্টিরই মনে খেইলব—ঐ নন্দী, মল্লিক, রায়কতের কথা। এরাই তো পুরানা লিডার। শিডিউল লিখব কোন শ দিয়া, তাও জানে না। একডা পার্টি হইলে এইডা বন্ধ হইত।’
‘ঘোড়ার আন্ডা হইত। এগ টাকা আছে। পাটি খাড়া কইর্যা নিত।’
‘যাগ টাহা নাই, পার্টিও নাই, সেই লোকগুল্যা তো কথা কইব্যার পাইরত।’
‘পাইরত। তাতে আগাইতডা কী?’
‘পার্টি, লিডার বানাইত। লিডার, পার্টি বানাইত না। আপনার নাগাল হইলে পৃথক কথা। পার্টি বানাইতে-বানাইতে লিডার নিজেরেও লিডার বানায়।
হকশাহেব তাঁর চেয়ার থেকে একটু ঝুঁকে টেবিলে কনুই রেখে চিন্তিত কোনো ব্যক্তির মুখচ্ছবি তৈরি করেন। তিনি কিছু ভাবছেন—বোঝা যায়।
‘একডা কথা মনে আসা-যাওয়া করে। তোমারে কইতে বাধো বাধো ঠ্যাহে। তোমার তো এ-সব পড়া। তুমি তো জানই। তোমারে আর নতুন কইরা কওয়ার কী আছে?’
‘হা আর্যপুত্র, এই বাধা কি তোমাকে মানায়?
‘এত মুখস্ত রাহ ক্যামনে? ভাইবতেছিল্যাম—এই যে অ্যাহন আমাগ এড্ডা অ্যাসেম্বলি হইছে, লেকচার দেয়ার জায়গা হইছে, লেকচার দেয়ার আইন হইছে, আইন পাশের খ্যামতা হইছে, ধরো, তর্কাতর্কির মইধ্যে না গিয়্যা যদি এইডারে হোমরুল কই কব্যার পারি, ডোমিনিয়ন কই কব্যার পারি, স্বরাজ কই কব্যার পারি। ঐ গুল্যার মানে জানি না। যে-সব ব্যবস্থা হইছে সে-সব আমার কামে লাইগলে আছি, নাই তো নাই। মন্ত্রী তো হইয়া আসতিছে, ধরো, বছর কুড়ি। আমিও তো ছিলাম এডুকেশন মিনিস্টার। স্যাও তো লিডার দেইখ্যা নমিনেশন। অ্যাহন আমি প্রাইম মিনিস্টার, আমি শিডিউল বইল্যা রায়কতরে বাছি। আবার তোমাগ ভাবসাব দেইখ্যা পছন্দ হয় প্রসন্নদেবরে আর বেশিদিন বাছা যাইব না। যোগেন মণ্ডল বা পি-আর ঠাকুররে খুঁইজতে হব। তুমি তাইলে আমারে একডা ইকুয়েশন বানাইয়্যা দ্যাও দেহি—অঙ্কের মত কইর্যাই দ্যাও—তুমি তো অঙ্কের ভাল ছাত্র, আমিও তো স্যার পি-সি রায়ের পেয়ারের ছাত্র– আইসো, ইকুয়েশন বানাই।’
‘আমারে ছাইড়্যা দ্যান হকশাহেব। ঘাড় ধইর্যা ঘরে ঢুক্যাইয়া কন, ইকুয়েশনের খেলা খ্যাল। আমার কি আপনার মত আকামাইয়া থাইকলে দিন চলে? এক সঙ্গে দশডা পকেটে কাঁচি না-চাল্যাইব্যার পাইরলে কি আমার চলে?
‘দ্যাহো মণ্ডল, এটুকু খাতির আমারে কইরো যে দুই হাতে চাইরড্যা কাঁচি চালাইলেও তোমার খুব ভাল চলে না—এডা আন্দাজের খ্যামতা আমার আছে। অ্যাহন ইকুয়েশনডা বানাও, পাওয়ার সিরিজে, ধরো পাওয়াররে r-কে ধরো রিপ্রেজেন্টেশন, আর ম্যানিপুলেশনরে ধরো m। তাইলে এইডা তো আসে p-r=m।’
‘তাইলে তো এডাও আসে, − r = m – p ।’
‘আসেই তো। আনার লগেই তো দরজা খোলা। তাইলে তো এইডাও আসে—m-r=-p।’
‘হকশাহেব, উত্তর দেইখ্যা অঙ্ক কষেন? তাইলে তো এইডাও আসে p = m + r?’
‘আসেই তো মণি। আইলে তো আইসব্যার দিব্যার লাগব। দিলে দেখবা—ঐ আমাগ টাইমের লিডারি আর তোমাগ টাইমের ভোট-জিতা, পাওয়ারের একই কো-অর্ডিনেট। সুতরাং ব্রিটিশ এমপ্যায়ার আর ইনডিয়ার সম্পর্কের কোনো বদল নাই যদিও আমরা ৭৫ বছরের অধিক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। মানে, কিছুতেই কিছু আসে যায় না। রায়কতরে যদি বদলাই, তাইলে কী বদলাইব? যদি না বদলাই, তাইলেই-বা কী অবদল থাইকব? তাইলে আমি ক্যা আমার ভাঙা পার্টিরে এড্ডু গুছ্যাইয়্যা আনি-না? তাইলে তোমরা আচমকা কাটমোশন আইনলে ও শাহেবগ ভোটে খাড়া থাকার ঐ কয়েকডা দুর্নাম তো কমবে।’
‘এই নিয়্যা পরামর্শ করার যোগ্য মানুষ আপনে আমারে বাইছলেন?’
‘শুধু এই নিয়্যাই না। একডা কথার লগে তো কত পাতা, ডাল এই সব লাইগ্যা থাকে। সেগুল্যাও হবে কথা।’
‘এইডা কী কইর্যা হয় হকশাহেব। আপনে লিডার আব দি হাউস, আমি অপোজিশনে। আমাগো মইধ্যে কী কথা হবে?’
‘সেডা যদি আমার সঙ্গে তুমি কথা কইতে চাইত্যা তাইলে আমি রিফিউজ কইরতে পাইরত্যাম যে আমাগ মইধ্যে বিনিময়যোগ্য কোনো কথা নাই। কিন্তু আমি ডাইকলে ‘না’-করার রাইট তোমার নাই। ম্যানিপুলেশন থিক্যা পাওয়াররে বাদ দিলে তোমার রিপ্রেজেন্টেশনও তো টেঁকে না। তুমি অ্যাহন আমার সঙ্গে বাইরাব্যা। তারপর আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে এই সব কথাবার্তা কব। অ্যাহ, তুমি আমারে নীরবে অনুসরণ করো।’
হকশাহেব উঠে দাঁড়িয়েছেন।
সেই পেখমখোলা পাগড়ির পিয়ন এসে তাঁর পেছনে দাঁড়ায়। যোগেনের দিকে না তাকিয়ে হকশাহেব দরজার দিকে পা বাড়ালেন। সেই পিয়ন দাঁড়িয়ে থেকেই যোগেনকে হাতের আদেশে হকশাহেবের পেছনে দাঁড় করিয়ে হাঁটিয়ে দিল।
