১০
2 of 4

৬৪. পদ্মবিল্যা কাইজ্যা : শেখদের প্রতিশোধ

৬৪. পদ্মবিল্যা কাইজ্যা : শেখদের প্রতিশোধ

পরের দিন সকালেও মুসলমানরা পদ্মবিলের পাড়ে জমা হতে শুরু করে বটে কিন্তু জমা হতে পারেনি। আগের রাতেই গোপালগঞ্জের এসডিও নতুন পুলিশ নিয়ে পদ্মবিলায় পৌঁছেছেন। সরকারের সাব-ইনস্পেক্টার ভয় পেতে পারে, সে তো একটা মানুষ। সরকার ভয় পেতে পারে না। সে তো মানুষ নয়।

দু-তিনদিন পরেই ফরিদপুরের জিলা-ম্যাজিস্ট্রেট ও এসপি মার্চ করতে-করতে পদ্মবিলার দিকে রওনা দেন। ঐরকম পুলিশ ও শাহেব দেখে গ্রামের লোকজন, বিশেষ করে মেয়েরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এর আগে তারা কোনোদিন এত কাছ থেকে কোনো বাহিনীও দেখেনি। তাদের ভয় পাওয়ারই কথা কিন্তু সাতদিন সাতরাত ধরে কী হয়, কী হয় ভেবে অস্থিরতার পর পুলিশ আর শাহেব দেখে আনন্দে মেয়েরা এদের ঘিরে হুলাহুলি দিতে লাগল, ঘর থেকে মুড়ি-মুড়কি এনে তাদের খাওয়াতে লাগল। এরা নমশূদ্র মেয়ে। রোজা চলছিল বলে মুসলমান মেয়েরা আনন্দ করতে পারেনি বা মুড়ি-মুড়কি খাওয়াতে পারেনি। কিন্তু তারা নমশূদ্র মেয়েদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। শাহেব আসছে শুনেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা বন্ধ। শাহেবরা সব বাড়িঘর সার্চ করে, খবর নিয়ে, জানলেন—দাঙ্গায় তিনজন মুসলমান মারা গেছে, অনেকে জখম হয়েছে। নমশূদ্রদের একজনও মারা যায়নি। খুব বেশি জখমও হয়নি। এই ঠান্ডা ভাবটা গেঁড়ে বসতে-না-বসতেই হঠাৎ শুকনো কাশবনে আগুন লাগার মত রটে গেল যে পদ্মবিলা থেকে মাইল দুই পশ্চিমে পাশাপাশি সদরবন্দর থেকে হাজারে-হাজারে মুসলমান জমা হয়েছে। তারা সমস্ত নমশূদ্র-গ্রাম পুড়িয়ে ছাই ওড়াবে। এসব খবর কেউ যাচাই করে না। এ তো বাঁচাবাঁচানোর ব্যাপার। ‘আইছে, আইছে’ শুনলেই ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়াও। পেছনে মধুমতী বান হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ধেয়ে আসতে পারে, বাঘ বেরিয়ে এসে থাকতে পারে গরানজঙ্গল থেকে, জঙ্গলের দক্ষিণের সমুদ্র থেকে সমুদ্রের ঘুরনা এসে থাকতে পারে, জমিদার ডাকাইত পাঠাতে পারে। এ জমিতে যারা থাকে সকলেই তো তাদের শত্রু, দেখতে-দেখতে মেয়েরা বাচ্চা কোলে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করে—কোথায় যাচ্ছে তা না-জেনেই। নমশূদ্র পুরুষরা শোনামাত্ৰ যে যা হাতে পেল নিয়ে পদ্মবিলার পাড়ে জমা হল—জমা হওয়ার অভ্যাসে। পদ্মবিলার পাড় দিয়েই মেয়েরা-বাচ্চারা ছুটছিল গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে। ফলে পদ্মবিলার পাড়ে যেন, যে-যুদ্ধ হয়নি সেই যুদ্ধশেষ ঘটছিল। বাচ্চারা মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছে, মেয়েরা মাথায় পোটলা ও বুকে বাচ্চা নিয়ে চিৎকার তুলে পালাচ্ছে। দুই-একজন বুড়ি পাড়ে পড়ে আছে—দুই পা ছড়িয়ে, দুই হাতে বুক থাবড়ে কাঁদছে—তাদের বাড়ির লোকজন তাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। লাঠিসোঁটা বর্শা-শড়কি হাতে ছুটন্ত পুরুষরা মুখেও হুলাহুলির মত আওয়াজ তুলছিল পরস্পরকে ডাকতে। তাদের পদ্মবিলার পাড়েই আসতে হয়েছে। সেখানে তারা সত্যি-সত্যি গোলমালে পড়ে যায়—কোন্ কাজটা আগে করবে ঠিক করতে পারে না। মেয়েদের ও বাচ্চাদের নিরাপদ কোনো জায়গায় নিয়ে রাখবে আগে, নাকী, দু-মাইল পশ্চিম থেকে যে-শেখ-সৈন্য ছুটে আসছে তাদের ঠেকাবে? এমনকী আচমকা যা মনে আসে তাই বলে চিৎকার করার মত সূদনের লুলা ল্যাংটা আধপাগলা বাপটাও ছিল না। থাকলে তার সেই বলদের মত চিৎকারটায় কত অর্থ বসিয়ে একটা হুকুম কল্পনা করে পালন করা যেত। পুরুষদের কেউ একজন হয়ত বলে থাকবে, বা বলেছে বলে কেউ শুনে থাকবে—আরে, আগে তো ঠ্যাকাবা, নইলে কী বাঁচাবা। এরকম কথা কেউ-কেউ শুনেছে ভেবে নিয়ে হাতের লাঠিসোঁটা নিয়ে মাইল দুই পশ্চিমের দিকে ছুটল। ছুটতে ছুটতেই দেখে তাদের মুখোমুখি বন্দুক উঁচিয়ে সার দিয়ে পুলিশ আর সেই পুলিশের সারের সামনে দুই শাহেব, তাদের হাতেও বাইট্যা বন্দুক, অন্যরকম দেখতে। শাহেব, তার সঙ্গে পুলিশ, তাদেরই সঙ্গে বন্দুক—এই তিনটি একজায়গায় দেখলে লাফানো বাঘও বাতাসে পালটি খায়। এ তো আর কাশিয়ানি থানার সাব-ইনস্পেক্টরের বর্শা কাড়া না। চার পুলিশের আকাশে ফাঁকা আওয়াজ করাও না। বন্দুক এখন শাহেবদের হাতে, বন্দুকের নল এখন নমশূদ্রদের বুকের দিকে তোলা। বন্দুকের গুলি চালানোর মতই মানুষের একটা গলা শোনা গেল। সামনে যারা ছিল, তারা বসে পড়ল। তাদের দেখাদেখি, পেছনে যারা ছিল তারাও। তাদের দেখাদেখি তখনো যারা ছুটে আসছিল, তারাও। ‘শাহেব অর্ডার দিছে, বইস্যা পড়। শাহেব অর্ডার দিছে, বইস্যা পড়। বইস্যা পড়। এইহানে।’ এমন একটা কথা ছড়িয়ে পড়ছিল। পরে, অবিশ্যি সবই জানা গেল।

এক-বাহিনী পুলিশ নিয়ে দুই শাহেব গেছে দুই মাইল পশ্চিমে শেখদের ঠেকাতে আর, এক শাহেব আর-এক-বাহিনী নিয়ে পদ্মবিলায় থাকল শুদ্দুরগ আটকাতে।

সন্ধ্যা-নাগাদই খবর আসে। জানা গেল—শেখরা সত্যিই এসেছিল, নৌকো করে, এমনকী যশোর থেকেও শাহেবরা গিয়ে তাদের বুঝিয়েসুঝিয়ে ভয় দেখিয়ে যার-যার দেশে ফেরত পাঠায়। নমশূদ্ররাও তো পদ্মবিলায় এসেছিল, মধুমতী পেরিয়ে, এমন কী মুকসুদপুর থানা থেকেও, এমনকী ভাঙা থেকেও। থানা, জিলা, সদর, নদী, বিল পার হয়ে নিজের জাত ধর্মের জন্য তাহলে জড়ো হয়ে যেতে পারে শেখরাও, শূদ্ররাও। তা তো পেরেই এসেছে এত কাল, একসঙ্গে। ডাকাত ঠেকাতে বা জমিদারের পাঠানো লেঠেল ঠেকাতে। কিন্তু এ ওকে মারতেও যে আলাদা করে শেখরা ও শুদ্দুররা অ্যালায় জোট বাঁধতে পারে, পদ্মবিলায় সেটাই দেখা গেল। ফলে, আঁচ লাগল যশোর-খুলনাতেও।

এরই মধ্যে কে বা কারা রটিয়ে দিল—ভাদ্রসংক্রান্তির দিন মুসলমানরা ওড়াকান্দির গুরুচাঁদ-আশ্রম আক্রমণ করবে। কেন করবে সেটা কারো মাথায় এল না। পদ্মবিলার দাঙ্গাতেও তো মুসলমানরা নমশূদ্রদের জাতধর্ম নিয়ে কিছু বলেনি। নমশূদ্ররাও বলেনি। ওড়াকান্দি তো নমশূদ্রদের কেন্দ্র। সেখানে উৎসবে-পুজোয় শেখেরাও আসে। দূর-দূর থেকে নৌকো করে নিয়ে আসে বাড়ির রোগীকে, বিশেষ করে পুরনো ঘায়ের চিকিৎসায়। শেখরা ওড়াকান্দি আক্রমণ করবে কেন তার মাথামুন্ডু বোঝা না গেলেও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তো রাখতেই হয়। এই পুরো চার বছরের দাঙ্গায় এই কিন্তু প্রথম আত্মরক্ষা—প্রতিরক্ষার জন্য সংগঠন করতে হল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *