৮৪. সুভাষ ও শরৎ বোসের সঙ্গে যোগেনের দেখাশোনা
শরৎ বোস একদিন লবিতে যোগেনকে বললেন, ‘মিস্টার মণ্ডল, সুভাষ আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। আপনি যদি আসেন তো ভাল হয়।’
‘কী বলেন স্যার! সারা ভারতের রাষ্ট্রপতি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, এডা তো আমার সৌভাগ্য।’
‘তাহলে সৌভাগ্য করুন তাড়াতাড়ি। কালই আসুন-না, সকালে, নটা-সাড়ে নটায়—’
‘হ্যাঁ, স্যার, আমার কোনো অসুবিধা নাই।’
‘একটাই ছাড়া যে আপনি আমার বাড়ি চেনেন না। আপনি তো আসেননি কোনোদিন। ৩৮/১ উডবার্ন পার্ক। ঐ এলগিন রোড থেকেই বেরিয়েছে। কয়েক পা।’
‘আপনার বাড়ি চিনতে পারব না? সুভাষবাবু কি ওখানেই থাকবেন?’
‘বলব, থাকতে, ঐ সকাল নটা-সাড়ে নটা। আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমিও একটু বসতে পারি আপনাদের সঙ্গে—জাস্ট শুনতে—
‘আমাকে স্যার, এত লজ্জা দিচ্ছেন কেন?’
‘বাঃ, একজন হচ্ছেন আমার পার্টির প্রেসিডেন্ট, যুক্ত প্রদেশের কংগ্রেসিরা, কেন জানি না, ডিকটেটার কথাটা বেশি পছন্দ করে, আর-একজন আমার কলিগ ইন দি অ্যাসেম্বলি। আপনাদের কথায় আমার তো কোনো জায়গা নেই, যদি আপনারা সেই জায়গা তৈরি করে না-দেন। আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা থাকলে তো এখানে আমার ঘরেই বসতে পারতাম।’
‘তাইলে স্যার আমি আপনারে অনুমতি দেয়ার কে? আপনি আমারে একটা মিটিঙের খবর দিলেন, ঠিকানা দিলেন। এহন আপনি আমার কাছে চান পারমিশন, থাকার। সেডা আমি কে দেয়ার? মিটিং ডাকা একজনের। মিটিঙের জায়গা আর-একজনের। আর গোবধে খুড়া কর্তা হইল্যাম কী না আমি।’
শরৎ বোস একেবারে হো হো হেসে উঠলেন, ‘এই রিপার্টি সত্যিই খুব জব্বর। মুখের মত জবাব! তাহলে কাল দেখা হবে, ঐ সকাল নটা-সাড়ে নটায়।’
পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যোগেন শরৎ বোসের বাড়িতে সকাল পৌনে নটায় হাজির। হাইকোর্টে যেমন চাপা পায়জামা আর গলাবন্ধ পরা বেয়ারারা থাকে জজশাহেবদের পেছন-পেছন, তেমনি একজন, পাগড়ি ছাড়া, দরজা খুলে দিল আর নাম বলতেই যোগেন কে ভিতরে আসতে বলল। একটা ফাঁকা, বেশ বড় হলঘর পেরিয়ে লোকটি যে-দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, যোগেন সেই চৌকাঠ পেরিয়ে দেখে একটা গোল টেবিলের দুটো চেয়ারে দুই ভাই—শরৎ বোস ও সুভাষ বোস বসে আছেন। সুভাষ বোসের পরনে ধুতি আর শাদা পাঞ্জাবি, শরৎ বোসের পরনে একটা লম্বা কোট মত, সেটাকে যোগেন ‘ড্রেসিং গাউন’ বলে জানত।
দুই ভাইই দাঁড়িয়ে যোগেনকে নমস্কার করে আর শরৎ বোস একাই বলে ওঠেন, ‘আসুন, আসুন’। যোগেন নমস্কারের যুক্তকর না ভেঙে টেবিলের দিকে এগতে-এগতে বলে, ‘আপনারা দয়া করে আমাকে বেশি পাংচুয়্যাল বলে প্রশংসা কইরবেন না। বাড়ি খোঁজার জন্য ১৫ মিনিট রাখছিল্যাম। ট্রাম থিক্যা এলগিন ডোডের মোড়ে নাইম্যা কয়েক পা হাঁটতে-না-হাঁটতেই দেহি বাড়িডাই আমারে খুঁইজ্যা নিল। একবার ভাইবল্যা রাস্তায় হাঁইট্যা সময়ডা কাটাই। কিন্তু কনফিডেন্স পাইল্যাম না, যদি আবার বাড়িডা হারাই।’
নিজের কথায় যোগেনই বেশি হাসল, শরৎ বোসও বেশ হো হো করলেন, সুভাষ সবসময়ই যেমন হেসে থাকেন, তেমনি ছিলেন।
‘কিন্তু আমরা দেখুন, আপনি যে ওভার-পাংচুয়্যাল হতে পারেন সেটা বুঝে আগে থেকেই রেডি হয়ে বসে আছি, পাছে আবার লাটশাহেবের টেলিগ্রাম আসে।’
‘সেটা আবার কী। লাটশাহেবের টেলিগ্রাম?’ সুভাষ জিজ্ঞাসা করলে শরৎ বোস বলে ওঠেন, ‘সেটা তুমি শোননি? কী করে শুনবে? হয় জেলখানায় থাকো, না-হয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হও,’ সুভাষ এবার একটু আওয়াজ করে হাসেন, শরৎ বোস বলেই চলেন, ‘না যাও হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে, না যাও অ্যাসেম্বলিতে-গসিপ শুনবে আর কোথায়? যোগেনবাবুকে অনুরোধ করে গবমেন্ট সিলেটে পাঠায় ওখানে একটা কাস্ট দাঙ্গা নুইস্যান্স চলছিল বছর খানেক সেটা যদি থামানো যায়। উনি তো গেছেন। কনসিলিয়েশন মিটিঙে ঝামেলা সব মিটিয়েছেন বেশ চড়া মেজাজে, পুরকাইত? সিলেটের? ফোনে বলছে—সে গিয়েছিল যোগেনবাবুর আর্গুমেন্ট শুনতে। সে তো ফোনেই আমাকে বকতে লাগল—এই সব ব্রিলিয়্যান্ট লিগ্যাল মাইন্ডকে তোমরা ঐ ডার্টি পার্টি পলিটিকসে ঢুকিয়ে করাপ্ট করে দিচ্ছ! যা হোক, মিটমাট করে, দাঙ্গা থামিয়ে, যোগেনবাবু সবে বেরিয়েছেন, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি এরা সব গাড়ি করে এসে হাজির। কী? না, আমাদের গভর্নর অ্যানডারসন টেলিগ্রাম করেছেন ডিএমকে, তাঁর হয়ে মিস্টার মণ্ডলকে কাল রাতে একটি পুত্রসন্তান লাভের জন্য আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাও ও তিনি যাতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে নবজাতককে ও তার মাকে ইন দ্যা নিয়ারেস্ট টাইম দেখে আসতে পারেন, তার ব্যবস্থা করো। তুমি ডিএম বেচারার কথা ভাবো। হিজ এক্সেলেন্সির অর্ডারে সিলেট তো আর বরিশালের পাশে যেতে পারে না আবার হিজ অনারেবল মেম্বারকেও তো তিনি সিলটে আটকে রাখতে পারেন না।’ সুভাষ এবার ঠোঁট খুলে, গলা খুলে হাসতেই থাকেন। শরৎ বোসও সে হাসি বাড়িয়ে দেন। দুই ভাইয়ের হাসি একটু থামতেই যোগেন বলে ওঠে, ‘এটা স্যার কী হল। আপনি তাহলে পুরাডা বলেন।’
‘আমি তো আপনার চাইতে সিনিয়ার উকিল! হোয়াই শুড আই টেল দি আদার পার্ট দ্যাটস নট এ পার্ট অব মাই কেস।’
সুভাষ যোগেনের দিকে তাকান।
যোগেন তখন হেসে বলে, ‘ঘটনা হিশেবে স্যার সবই ঠিক বলেছেন। কিন্তু লাটশাহেব কী করে জানলেন? আমি তো বরিশালের উত্তরের থানা গৌরনদীরও উত্তরের লোক। আমাদের জাইতের লোক ওখানে বেশি। তাদের ভিতর ঢেড়া সইয়ের লোক নাই, সব টিপসই। বার্থি স্কুলের এক মাস্টারমশায় আশু চ্যাটার্জি এক শুদ্দুরের ছেলেকে ক্লাশ এইটে পাইয়্যা তারে পিট্যাইয়া ঘোড়া বানাইবেনই। আশুবাবু স্যার ছাড়া আমার কিছু হইত না। এমএলএ জেতার পর নিজের স্টুডেন্ট লাইফে কেনা এই পেন আর নিজের রিয়্যায় পাওয়া এই ঘড়ি আমাকে পরয়্যা দিলেন। আমার স্ত্রী ছিলেন তাঁর বাবার কাছে। সন্তান হওয়ার পর আমার শ্বশুরমশায় আশুবাবু স্যারের কাছে ছুট্যা য্যান—এই খবরটা আমাকে জানানো যায় কী ভাবে। আশুবাবু শুইন্যাই বললেন—টেলিগ্রাম করো। মুশকিল হইল—আমাদের দ্যাশে কোনো কারণ পোস্টকার্ড আইসলে যে-পিয়ন নৌকা কইর্যা বিলি কইরব্যার আসে, তাকে বলে, তুমি কী কইর্যা জাইনল্যা এডা আমার চিঠি। সে কয়—ঠিকানা থিক্যা। তখন তাকে বলা হয়—তাইলে তো তুমি পড়ব্যার পারো, চিঠিটা পইড়্যা দ্যাও।
যোগেন জানে এখানে একটা হাসি ওঠে। সেই বিরতিটুকু দিয়ে সে বলে, ‘পিয়নও তো বরিশালের পিয়ন। সে কম যায় কীসে।’ সে জবাবে কয়, ‘আমি তো গবর্মেন্টের লোক। আমাগ ইংরাজিতে সব কাজ হয়। ঠিকানাডা ইংরাজিতে লেখা তাই পড়ছি। চিঠিডা বাংলায় লেখা তাই পড়তে পারি না।’ সেই দেশে আশুবাবু কন টেলিগ্রাম কইরতে। আমার শ্বশুরমশায় চোদ্দ পুরুষে কোনোদিন টেলিগ্রাম দেখেন নাই। কিন্তু সম্পন্ন মানুষ তো, হাটেবন্দরে লোকে চেনেজানে। এটুক্ বোধহয় শুইন্যা থাইকবেন যে মরার খবর টেলিগ্রামে আসে। স্যায় আর কথা না বাড়াইয়্যা, নিজের নৌকায় আশুবাবু স্যারকে বরিশাল সদরে রওনা কইর্যা দিলেন, বরিশাল ছাড়া টেলিগ্রাম হয় না। কাপড়ের খুঁটে যে-কয়ডা টাকা ছিল আশুবাবুকে দিয়্যা, আর-এক নৌকা ধইরা বাড়ি ফিরলেন—কান্দার জইন্য। বাড়ির লোক যত জিজ্ঞাসা করে উনি কান্দেন আর কন—খবর শুইন্যা আশুবাবু সদরে গেলেন টেলিগ্রাম কইরতে। তহন বাড়ির সবাইও কান্দায় যোগ দ্যান। এদিকে নৌকায় একবেলার পথ পারায়্যা আশুবাবু টেলিগ্রাম অফিসে গিয়্যা যাতে সেটা গোলমাল না হয় সেই কারণে ‘হিজ এক্সেলেন্সি জন অ্যানডারসন, গভর্নর অব বেঙ্গল’ বলে তাঁকে অনুরোধ করেন এই সংবাদ তোমার লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির মেম্বার অমুককে জানাইও যে তাহার একটি ছেলে হইয়াছে।’
এই গল্পটার পর খুব হাসি উঠল না। একটু চুপ থাকার পর সুভাষ বললেন, ‘আপনার স্যারকে আমার কিন্তু খুব ভাল লাগল।
‘ঐডাই তো স্যারকে নিয়া মুশকিল। স্যারকে ভাল না লাগাবার কোনো উপায় তিনি খোলা রাখেন না। টেলিগ্রামটা তো লাটশাহেবকে না কইর্যা আর-কাউকে করলে আমার এই লজ্জাটা হত না—’
‘সেটা তো আমার কাছে কোনো বিষয় নয়। উনি মনে করেছেন এটা টেলিগ্রাম করে জানানো উচিত। এই ভাবনায় তো কোনো ভুল নেই। সেই টেলিগ্রাম করার যে-হাঙ্গামা, নৌকো করে বরিশালে আসা, সেটাও তিনিই পুইয়েছেন। আর, তিনি যে রাজনৈতিক অধিকারবোধ দেখিয়েছেন, তাতে তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। কোন দূর গ্রামের স্কুলের এক মাস্টারমশায়। তিনি তো এটা তাঁর অধিকারের মধ্যে ভাবছেন যে আমার প্রতিনিধি, ভোটে জেতা প্রতিনিধি, তাই এই খবরটা তাকে পৌঁছে দাও। খুব আদর্শ একজন মানুষের কথা শোনালেন। আমাদের দেশের যিনি মহত্তম নেতা তিনি তো এটাই আমাদের দিয়েছেন, এই অধিকারবোধ। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে—ভাইসরয় আরুইন মহাত্মাজির সঙ্গে কথা বলতে রাজি হওয়ায় চার্চিল কী বলেছিলেন—ভাবতে আমার…
সুভাষকে থামিয়ে শরৎ বোস বলেন, ‘ওটা চার্চিলের নিজের ভাষায় বলো সুভাষ, বাংলায় ঐ অহংকার কি আসে?’
‘সে তো উনি পড়েছেন, মেজদা।’
‘না। আমি এটা জানি না।’
শরৎ বোস একটু নাটুকে ঢঙে বলে ওঠেন।
যোগেন বলে, একটু হেসে, ‘এ তো আমাদের দেশের বামুন জমিদারদের মত গর্জন। একটা গল্প আছে এ নিয়ে—বেশ মানানসই। এক জমিদার কী জোতদার কী চুকানিদার–না, এটা বোধহয় ঠিক বলা হইল না।’ যোগেন বলতে-বলতে আবার নিজের শব্দ আর সমাজের ভিতরের সম্পর্কের টানে, সংশোধনও করছিল। ‘বামুন হলে জমিদার বলতেই হবে, বামুনের থিক্যা নিচু উঁচা-হিন্দু—মানে বৈদ্য-কায়স্থ হইলে জোতদার-চুকানিদার হইতেও পারে। যাক গিয়া—গল্পটা তো বাউল জমিদারের আপগও বড় ছেলেকে নিয়া। সে নিজের বৌ থাকতে—যা করে আর কী? আমাদের সমাজেরই এক মেয়ের সঙ্গে। ঐ আর কী। কিন্তু সবটাই তো গ্রামের মধ্যে। এটা তো উচ্চবর্ণের অধিকার—পৈতের মতনই—নমশূদ্র কোনো মেয়েকে চোখে লাগলে…। জমিদার বা শাহেবদের অত্যাচার বলতে যেমন মেয়েলুটের কথা বলা হয়, আমি যে-সম্পর্কের কথা বলছি, মেয়েলুটের মত নয় সেটা। এটা একটা সম্পর্কই। দুজনই সে-সম্পর্কে জড়ায় মেয়েটির সম্মতিও থাকে। সেই সম্মতির পিছনে যে জোরই থাকে সব সময়, তাও না। মেয়েটার সম্মানও যেন বাড়ে একটু নিজের কাছে। কিন্তু শেষ বিচারে তো জোরটাই প্রধান। আমাদের সমাজের কোনো মেয়ের দিক থেকে কি কোনো বামুন বা বৈদ্য ভদ্দরলোককে পছন্দ করা সম্ভব? তবু এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে দুই পক্ষেরই সম্পতির ঘটনা একটা ঘটে—কোনো একটা স্তরে। ফলে, এই মেয়েটি হয়ত বাবুর বাড়ির কাজই করে, এই সম্পর্ক হওয়ার পর কখনো বা সেই কাজের ধরণ বদলায়। ধরণ আর বদলাতে কী? বাবুর বাড়ির বড় গিন্নিকেও যে-কাজ করতে হয়, কাজের মেয়েদেরও সেই খাটনি খাটতে হয়। যাকে নিয়ে গল্প তার বেলা উলটো। ঐ বাবুর বড়ছেলেবাবু নিজেই ঐ মেয়েটির বাড়িতে বসবাস শুরু করলেন। গ্রামে তো আর কিছু কারো চোখের আড়ালে হয় না। সবাই দেখতেই পেত ধবধবে লম্বা পৈতায়, খালি গায়ে, খালি পায়ে, একটা আধাকাচা ধুতি কাছা দিয়ে পরা, ঐ বাড়ির বেড়া, পাটকাঠির বেড়া নতুন করে লাগাচ্ছে। কয়েকটা বাড়ি পরেই তার বাপের বিশাল জমিদারবাড়ি—সম্পত্তি, স্ত্রী, বংশগৌরব সহ। কিন্তু সে সেই শুদ্দূরনির ঘরের পাটকাঠির বেড়া সারাচ্ছে নিজের হাতে। আপনাদের হিন্দু শাস্ত্র-পুরাণে এসব সম্পর্ককে গয়নাগাটি পরিয়ে ঝলমলে করা হয়। রাধা-কৃষ্ণ, বিল্বমঙ্গল, নলদময়ন্তী। কিন্তু আমাদের গ্রামে অত গয়না পাওয়া যায় না তো। তাই যাতায়াতের পথে হয়ত ঐ ছেলেবাবুর বাবাও যাকে দাদা ডাকেন তেমন এক ঠাকুর মশায় দাঁড়িয়ে দেখলেন। তাঁর টাকে ভেজা গামছা ভাঁজকরা আর মাথার ওপরের ছাতাটার কাল রং ধুয়ে গেছে, রোদ্দুরেই বেশি। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখে ডাকলেন, ‘অ ঘুতু, ঘুতু’। ছেলেবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে বললেন, ‘তুমি কি তোমার বিরজারে এক্কেরে অসূর্যমপশ্যা বানাও? ছেলেবাবু এ-কথার অর্থই বুঝলেন না। তিনি বেশ হাসিমুখেই বললেন, ‘না-না, আপনার কোনোরকম অসুবিদা নাই। যহন ইচ্ছা, আঙুল দিয়্যা পাটকাঠিগুল্যারে আলুইয়া নিবেন।’ ছেলেবাবু বোকা না চালাক, তা নিয়ে কোনো মতৈক্য নেই আবার কেউ হয়ত বললেন ‘–ও ঘুতু, তোমার বেড়ার দড়ি ঘুরায় কেডা?’ ঘাড় না ঘুরিয়েই ছেলেবাবু সুর ধরেন-
‘ওমা, তুই নিজে হাতে ঘুরিয়ে দড়ি
আমার কপালে মারলি বাড়ি—’
শরৎ বোস বলে ওঠেন, ‘আরে, আপনি গান জানেন?’
সুভাষ মৃদু হাসেন, শুধু ঠোঁটে।
‘এখন গ্রামে কেউ যদি পাগল, অপয়া রটে যায়, তাহলে সকলেই তাকে পাগল বা অপয়া বলে খেপায়। তেমনি ঐ ছেলেবাবুকে নিয়েও একটা ঠাট্টা চালু ছিল। বয়স্ক মহলে গোপনে ছেলেছোকরা মহল তো আর গোপনতা মানত না। এরকম লোক তো ভদ্রলোকদের মধ্যে ছিলই। আছেনও। আমাদের এই ছেলেবাবু সেই মেয়েটির বাড়ি থিক্যা বার হলেই সব বাচ্চাকাচ্চারা পেছন-পেছন তাকে খেপাতে-খেপাতে যেত। যে-ছড়া বলে খেপাত সেটা এতই খারাপ কথা যে আমি আপনাদের সম্মুখে মুখে আনতে পারব না। আর, ছেলেবাবু হঠাৎ রেগে উঠে চোখমুখ লাল করে সেই ছাওয়াল-পাওয়ালকে মারতে যেত, চিৎকার করতে-করতে—সেটাও ঠিক বলার মত না, যা হোক এই চিৎকারটা করানোই ছিল ছাওয়ালপাওয়ালের খেলা। ছেলেবাবু পৈতাডা বুড়া আঙুলে আঁকশি বাঁধাইয়্যা টানটান কইর্যা চিৎকার করত বা তাড়াও করত বা রাস্তা থিক্যা ঢিল তুইল্যা ছুঁড়ত। আর কাউকে যেন হুকুম দিত—
‘মার চাঁড়ালগো জুতার বাড়ি। টাকা যত লাগে আমি দিব।’
এই হুকুমটা ছেলেবাবুর মুখ থিকে বাইর হইলেই ছাওয়ালপাওয়ালরা হাততালি দিয়া চেঁচাত—
জুতা মারবেন কুথা—
বামুনের পায়ে নাই জুতা
এইসব কথা যে এইসব কথাই, তা ঘটনার সময় বোঝা যাইতো না। কিন্তু ছেলেবাবুকে খেপানো যখন আরম্ভ, তখন এই কথাগুল্যাই শোনা তো, তাই চিৎকার হলেই বোঝা যাইত কী বলা হচ্ছে।
গান্ধীজি ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন শুনে চার্চিলশাহেব তো সেই ছেলেবাবুর মতই চেঁচাচ্ছেন—’মার জুতার বাড়ি, টাকা যত লাগে আমি দিব।’
গল্প বলাটা শেষ করতে-করতেই যোগেন বোঝে গল্পটা এঁদের ভাল লাগবে না, তাছাড়া এত গ্রাম্যতা ওদের পক্ষে সওয়াই তো মুশকিল। যখন বুঝেছে যোগেন, তখন গল্পটা থামিয়ে দেয়া যায় না। দ্বিধার ফলে শেষটা আরো অর্থহীন হয়ে গেল। তারও পারে, খড়কুটো ধরে বাঁচার মত করে চার্চিলের কথাটায় ফিরে আসায় যোগেন ভরাডুবি থেকে আর নিজেকে বাঁচাতে পারে না।
শরৎ বোস হয়ত আঁচ করতে পেরেছিলেন, যোগেন অপ্রস্তুত বোধ করছে। অ্যাসেমব্লিতে তো তিনি দেখছেন যোগেনকে—ভেরি কুইকউইট। শরৎ বোস বললেন, ‘কিন্তু আপনার সেই বামুনবাবুর সঙ্গে চার্চিলের একটা তো বড় অমিল থেকে গেল—’ যোগেন আর কী জিগগেস করেনি—’চার্চিলের তো পৈতে নেই, তাহলে ব্রহ্মশাপটা তো হচ্ছে না। সেটা তো গল্পটার মেজর পয়েন্ট—
‘কেন? শাহেবরা কি কার্স করে না?’ সুভাষ বলে ওঠেন?
‘আরে, তা করবে না কেন, কিন্তু বামুন পৈতে ছিঁড়ে ব্রহ্মশাপ দিচ্ছে চাঁড়াল বলে, তাদেরই একটি মেয়ের সঙ্গে অসামাজিক সম্বন্ধ ডিফাই করতে—এটার ভিতরে চার্চিলের সঙ্গে তুলনাটায় একটা ড্রামাটিক ইফেক্ট আছে না? সেই ইফেক্টটা আনতে না পারলে তো হবে না—, হকশাহেবের বাংলা বক্তৃতার এটাই তো ম্যাজিক, সুভাষ। ইংরেজি তো বলবেনই ভাল। কিন্তু ওঁর বাংলা বক্তৃতা ‘ভাল’ বলা যায় না, শুধু। বলা যায় পারফরমেন্স। এরকম সব গল্প অহবহ, লাগাচ্ছেন? ‘তুমি কি এই গল্প বলা প্র্যাকটিস করছ, বক্তৃতায়?’ সুভাষ প্রশ্ন করে। যোগেন বুঝে উঠতে পারে না, শরৎ বোস কি সান্ত্বনাটা একটু বেশি দিয়ে ফেলছেন না?
ঐ সেই হাইকোর্টের জজশাহেবদের বেয়ারাদের মত একজন বড় একটা ট্রে নিয়ে ঢোকে। সে ট্রেটা গোলটেবিলটার ওপর রেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর মাঝবয়েসি এক মহিলা তাঁর গায়ের রঙে বৈধব্যের শাদা আলো ছড়িয়ে ঘরে ঢোকে। সুভাষ বললেনও মেজবৌদি। যোগেন উঠে তাঁকে নমস্কার করে।
উনি বললেন, বসুন, বসুন ভাবছিলাম কাজের বেলা তো হয়েছে, আপনাকে ভাত খাইয়ে দিলেই হয়। দেখি লুচি ভাজা হয়ে গেছে তখন।’
এতক্ষণে শরৎ বোস তাঁর দিকে মুখ না তুলেই বলেন, ‘যোগেন মণ্ডল, বরিশালের, আমার কলিগ—হাইকোর্টেও, অ্যাসেমব্লিতেও—’
‘তুমি তো বললে কাল রাতে। বসুন যোগেনবাবু, আমারই ভুলে আপনার ভাত-খাওয়া হল না—’
‘লুচির যা পরিমাণ, তাতে তো ভাতের অভাব কিছু দেখা যাচ্ছে না-
‘ও আবার কী কথা? লুচি খেয়ে কারো পেট ভরে নাকী? সুভাষ তুমি কি কিছু খাবে?’
‘সুভাষ তার দিকে পুরো তাকিয়ে বললেন, ‘চা দেবে তো? আমি ও-বাড়ি থেকে কিছু মুখে দিয়ে এসেছি। ভাল বিস্কুট থাকলে দুটো দিয়ো–’
‘তুমি তো বেরবে কোর্টে?’
‘হ্যাঁ, আমি উঠছি। একেবারে তৈরি হয়ে নেমে মিস্টার মণ্ডলকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যাব।’ উনি বেরতে-বেরতে ঘাড় ঘুরিয়ে জিগগেস করলেন ‘সুভাষ, তুমি কি আলিগড়ি বিস্কুট খাচ্ছ এখন দুটো-একটা?’
‘থাক বৌদি। বিস্কুটগুলো ভারী বেশি, মাখন বেশি, ডাক্তারবাবুর কাছে জেনে নিয়ো। লোভে পড়ে খাওয়া কি ঠিক?’
‘আরে একটা ছোট বিস্কুট নো-বাটার, ড্রাই, পাউডারিস, দিয়ে গেছে, একটু সল্টি, ঐটা খাও, ভাল লাগবে,’ শরৎ বোসের কথা শুনে সুভাষ বৌদির দিকে তাকিয়ে মাথা হেলায়। সুভাষের দিকে তাকিয়ে তখন যোগেনের মনে হয়—মানুষটা শীর্ণ, চোখও যেন ক্লান্ত, ভিতরের কোনো অসুখে বাঁধা।
শরৎ বোস বলেন, ‘মিস্টার মণ্ডল, আপনি শুরু না করলে তো আমি উঠতে পারব না। আপনি খেতে-খেতে সুভাষের সঙ্গে কথা সেরে নিন। সুভাষ, তোমার বক্তব্য আর লুচির পরিমাণে কি কোনো ডিফারেনসিয়্যাল ক্যালকুলাস হবে?’
‘সেটা কেন হবে। কথা শেষ না হলে লুচি ভরে দিলেই হবে। আর উনি কি আজই শেষ আসছেন নাকী? তুমি ধীরেসুস্থে তৈরি হয়ে এসো—’
শরৎ বোস ‘ওয়েল’ বলে বেরিয়ে যান। যোগেন একটা লুচি টুকরা করে ছোট টুকরোটা নারকেল ও কিসমিস দেয়া ছোলার ডালে ডুবিয়ে তোলে। এত স্বাদে তার চোখ নিবিড় হতে চায়, অভ্যাসে। যোগেন খেতে এত ভালবাসে ও এতই খেতে পারে যে খাওয়ার সময় সে অন্য কিছুতে মন দিতে পারে না। কিন্তু এখানে সুভাষ বাবুকে বসিয়ে রেখে তেমন অনন্যমনস্ক হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়াও সে জানে, ঠেকেই জেনেছে, কলকাতায় তার খাওয়ার পরিমাণ ও তার জাতের মধ্যে কখনো-কখনো সমীকরণ করা হয়। শরৎ বোস সুভাষ বোসকে সে কী এমন চেনে যে তাদের এমন অভ্যাস আঁচ করতে পারবে? লোকাচারের জন্য যোগেন চেষ্টা করবে তার সমার্থ্য অনুযায়ী না-খেতে, দুটো-একটা ফেলতেও। কিন্তু এই লুচি, টুকরো করে খেলে সে সুখ পাবে না, মুখের ভিতরে কোথায় হারিয়ে যায়। সে এবার লুচিটা পুরোই ডালে ডুবিয়ে মুখে দেয়, চোখ বোঁজে না, সুভাষবাবুর দিকে তাকায়। সুভাষ বলেন, ‘আপনার কথা তো ইলেকশনের সময়ই জানা, এখন মেজদার কাছে খুব শুনছি।’
যোগেন লুচিঠাসা মুখের ভিতরে জিভ দিয়ে একটা মাড়িকে ফাঁকা করে নিয়ে বলে, ‘আপনে কী শুইনছেন না জাইন্যাই বলতে পারি—কথাগুলা সত্য না!
‘এর মধ্যে অসত্য ঢোকার ফাঁক কোথায়? আপনি শিডিউল হয়েও শিডিউল সিটে দাঁড়াননি। এটা তো সত্যি?’
লুচি মুখে ঠোটে হাসি যোগেন ঘাড় হেলায়।
‘আপনি জেনারেল সিটে দাঁড়িয়েছেন, এটাও সত্যি?’
যোগেন আবার ঘাড় হেলায়। ‘আপনি শিডিউল কাস্ট হয়েও জেনারেল সিটে জিতেছেন?’
‘যোগেন ঘাড় হেলায়।’
‘তাহলে মিথ্যেটা কী?’ যোগেনবাবু?
যোগেন ঢোক গিলে মুখের ভিতরটা ও গলাটা খালি করে বলল, ‘আপনি তো এখন বলবেন, আর কেউ সারা ভারতে শিডিউল কাস্ট হয়ে জেনারেল সিটে জেতে নাই। আমি অদ্বিতীয়। ঐটা সত্যি না।’
যোগেন আবার একটা গোটা লুচি ডালে চুবিয়ে মুখে তোলার যে-ভঙ্গি করে, তাতে সুভাষের মনে হতে পারত, বোধহয় হয়েওছিল, যে যোগেন এখন এসব কথায় যেতে চায় না, কিন্তু সুভাষের তখন বলা হয়ে গেছে, ‘এটা তো মতামতের ব্যাপার না, এটা তো কোনটা ফ্যাক্ট সেটা দেখে নেয়া।’
যোগেন এবার তাড়াতাড়ি গিলে ফেলে, কথাটা বলা যেন খুব জরুরি ‘দেখেন সুভাষবাবু, আমাকে এই সম্মানটা দেয়া হয় ও আমি সেটা পছন্দও করি, আমার একটা স্ট্যাটাস বাড়ে। নমশূদ্র সমাজে এমন বড়-বড় নেতা আছেন যাঁদের নাম বললেই সবাই চেনে। কিন্তু আমাকে চিনবে কেন? আমার তো কোনো ফ্যামিলি স্ট্যাটাস নাই। সেখানে এই পরিচয়টা হেলপফুল। কী? না, ইনডিয়ার মধ্যে ফার্স্ট। কিন্ত আপনি তো রাষ্ট্রপতি, আমাদের দেশের সর্বোচ্চ নেতা। আপনার মত বড় নেতার সঙ্গে আমি আগে কখনো কথা বলি নাই।’
‘অ্যাসেমব্লিতে তো রোজই দেখছেন।’
‘থাকতে পারেন। তাঁদের সঙ্গে অ্যাসেম্বলির বাইরে তো কোথাও দেখাশোনা কথাবার্তা হয় না। শুধু অ্যাসেমব্লির ভিতরে। যাকে সমাজ, দেশ এসব কথা আসে, সেখানে অ্যাসেম্বলি একটা জায়গা হল?’ এই কথার তোড়ে যোগেন আবার একটা লুচি ভিজিয়ে মুখে ঠেসে দেয়।
‘আমাকে তাঁদের চাইতে আলাদা কী দেখলেন?’
সুভাষ যেন দ্বিধা কাটিয়ে কথাটা বলে ফেলেন। কথাটা তাই শোনায় যেন দোষ কবুলের মত। যোগেন হাত তুলে থামতে বলে, তারপর গিলে বলে, ‘আমি তো আর-কাউকে এমন দেখি নাই সুভাষবাবু, পুলিশ অর্ডিন্যান্সে যাকে ধরে কাছাকাছি রাখতে সাহস পায় না। শিওনি, মান্দালয় এই সব দূর-দূর জায়গায় পাঁচ-সাত বছর আটকে রাখে, তারপর তার যক্ষ্মারোগের চিকিৎস্যার জন্য ছাড়তে বাধ্য হয়। নিজের শরীরের চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হয় নিজেরই খরচে। যখন সে ফেরে তখন বম্বে ডকে জাহাজ ভিড়বার আগেই তাকে আবার অ্যারেস্ট করে। যার নামে ১০ মে তে সারা ভারত সুভাষ-দিবস পালনের আহ্বান দেয়া হয়। ও তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে পরের বছরের জন্য কংগ্রেস রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। আমার প্রসঙ্গে কোনো ভুল ধারণা বা খবর আপনার কাছে থাকা অনুচিত। এই সব তথ্যই তো আপনারা সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির বিষয় করে তুলবেন। তাই বললাম—আমাকে শিডিউল কাস্টদের সারা ভারতের সবচেয়ে বড় নেতা ভাবলে ভয়ানক ভুল হবে,’ যোগেন একেবারে এতটা বলে এবার লুচিটা তুলে আলুর দমের বাটিতে ডোবায়।
‘মানে আপনি বলতে চাইছেন, আপনার এমন জেতার ভোটের মধ্যে অনেক অ্যান্টি-কংগ্রেস ভোট মিশে আছে। মানে ওখানকার স্থানীয় দল-উপদলের ভোট মিশে আছে। মনে ওখানকার স্থানীয় দল-উপদলের, কংগ্রেসেরই, ঝগড়াঝাঁটি আছে?’
‘না-হলে এই রেজাল্ট হতে পারে?’ যোগেন তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। আর মাত্র দুটো লুচি পড়ে আছে। যোগেন ভেবেছিল, নতুন করে তো নেবেই না বরং দুটো লুচি ফেলে রাখবে। কিন্তু একটা আলু তো পড়ে আছে। সে একটা লুচি তুলে নেয়।
সুভাষ বলেন, ‘অন্তত আমার নিজের প্রদেশের ভিতরে কংগ্রেসের নিজের মারামারি, কাটাকুটিটা তো বুঝতে হবে। নইলে অন্যান্য প্রদেশের ব্যাপার বুঝব কী করে? আমি জেলাগুলেতে ঘুরব একটু—’
‘সেটা হয়ত ভাল হবে। আমি তো কংগ্রেসে নাই কিন্তু কংগ্রেস ভাবে, কংগ্রেসের বাইরে আবার কেউ থাকে নাকী? তারা ধরেই নেয় আমি কংগ্রেসি। ফলে—এই নেতার সঙ্গে ঐ নেতার ক্যাচাল, ফেউকানি
‘ফেউকানি কী?’
‘পিছনে লাগা। এই সবে আমাদের সব ভরসা উড়া গিছে। কংগ্রেস করতে হলি নেতা ধইরতে হব। তাছাড়াও, কংগ্রেস একটু কাস্ট হিন্দু প্রধান।’
‘এই পুরো সময়টাই তো আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে আলিপুর, প্রেসিডেন্সি, সেন্ট্রাল প্রভিন্স, গুজরাট, মান্দালয় এইসব জেলে ঘুরিয়েছে। এর মধ্যে গোলটেবিল, কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড, গান্ধীজির অনশন, পুণা প্যাক্ট, ১৯৩৫-এর শাসন-সংস্কার আইন তিন-না-চার বার পালটাল আইনসভার প্রথম ভোট হল। আমি এই কোনো কিছুরই প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করতেই পারিনি। এবার আমাকে সভাপতি না করলেই পারত। জানতে-জানতেই তো একবছর চলে যাবে। কাজ করব কখন?’
‘কংগ্রেসকে জানাবোঝাটা একটু কঠিনই হয়্যা গেছে। বিশেষ কইর্যা এই প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাটভা হওয়ার পর আরো কঠিন।’
‘যা হোক, শুরু তো করতে হবে, কোথাও। সেই কারণেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ঠাকুর গুরুচাঁদের মৃত্যুর একবছর পূর্ণ হচ্ছে। সেই জন্য অ্যালবার্ট হলে একটা বড় সভা ডাকার আয়োজন করা হয়েছে ১৬ মার্চ—’
‘কারা করছে? কংগ্রেস?’
‘কংগ্রেস না। সবাইকেই বলছে। অ্যালবার্ট হলের লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক আমার কাছে এসেছিলেন, বলতে, যেন আমি যাই। আরো সবার নাম করলেন। বোধহয়, এই কারণেই কোনো কমিটি-টমিটি হয়েছে। আমি যাব। আমার ইচ্ছে—আপনি এই ব্যাপারটায় জড়িয়ে থাকুন। আপনি মানে আপনাদের সবাই’
যোগেন একটু চুপ থেকে বুঝতে চাইল, সুভাষবাবু ‘সবাই’ বলতে কাদের কথা বলছেন—১৩ নমশূদ্র এমএলএর কথা, নাকী ৩০+১ জন তপশিলি এমএলএর কথা? এটা ওঁকে জিগগেস করা যায় না। বুঝে নিতে হবে। কিন্তু গুরুচাঁদ ঠাকুরের সভা ঠিক করল, তার সঙ্গে কথা না বলে? কেমন অসম্ভব ঠেকল—মিটিংই তো, বড় হলে তো সবারই ভাল লাগবে। না, তপশিলিদের মধ্যে এখনো কংগ্রেসের মত দলাদলি শুরু হয়নি। যোগেন জিগগেস করে, ঠাকুর এসেছিল আপনার কাছে?’
‘প্রথম ঠাকুর কে?’
‘উনি তো গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাতি। উনিই এখন প্রধান, আমাদের সমাজের প্রথম ব্যারিস্টার। এম-এল-এ হয়েছেন।’
‘না তো। ঐ লাইব্রেরিয়ানই এসেছিলেন।’
যোগেন আশ্বস্ত হয়। তাহলে কারো মাথায় খেলেছে। এখনো মাথায় গামছা বাঁধা হয়নি।
না, যোগেনকে বাদ দিয়ে কলকাতায় এত বড় একটা সভার কথা ভারার মত কেউ নমশূদ্রদের মধ্যে নেই।
যোগেন বলে, ‘হ্যাঁ। আমি আজই যাচ্ছি। মানে, আপনি তো চাইছেন সবাই যাতে আসেন, নেতৃস্থানীয় যাঁরা, নইলে আপনি একা গেলে আপনার বিরোধীপক্ষ আবার রটাবে কংগ্রেসকে আজেবাজে ব্যাপারে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।’
‘এমন একটা অনুষ্ঠান তো সবাই মিলেই করা ভাল’ একটা বেশ ভারী জুতো সিঁড়ি ভেঙে নামছে ও বাড়ছে। নিশ্চয়ই শরৎবাবুই নামছেন। তাদেরও তো কথা শেষ। যোগেন চেয়ার ছেড়ে উঠতে বসে থেকেই সোজা হল, জুতোর আওয়াজটা এই ঘরের দিকে আসছে, যোগেন বলে ফেলল, ‘আমি যদি আর মিনিট পনের বসি আপনার কোনো অসুবিধে হবে?’
শরৎ বোস হাইকোর্ট যাওয়ার পোশাকে ঘরে ঢুকে বললেন, ‘কী? আপনাদের কথাবার্তা হল?’
‘না মেজদা। উনি আর-একটু বসবেন। তোমার জজ শাহেব আছেন তো। তুমি বরং চলেই যাও।’
শরৎ বোস সুপুরি বা মৌরি চিবুচ্ছিলেন। তিনি হাত তুলে ‘ঠিক আছে’ বলে বেরিয়ে গেলেন।
৮৫. সুভাষ বোসের চাঁদসী চিকিৎসা করে যোগেন
যোগেন একটু সময় দেয়, এই ঘরের হাওয়াটা যাতে একটু বদলায়। তারপর সে বলে, ‘আপনি বোধহয় জানেন, আমাদের সমাজে, মানে নমশূদ্রদের মধ্যে একটা বিশিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি আছে—সাধারণ ভাবে চাঁদসী চিকিৎসা বলে থাকে।’
‘হ্যাঁ। আমি শুনেছি তো। যাতায়াতে সাইনবোর্ডও দেখেছি, কলকাতায়–’
‘হ্যাঁ, অনেকেই এই চিকিৎসা করেন নানা জায়গায়। তাঁরা খ্যাতি-প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। বরিশালের যে-গ্রামে আমার বাড়ি তার নাম মৈস্তারকান্দি। এটা একেবারেই গণ্ডগ্রাম। কেউ নামও জানে না। তাই আমরা বলি চাঁদসী। চাঁদসী আমাদের বাড়ি বা গ্রাম থিকে খুবই নিকটে।’
‘তাই? আচ্ছা—’
‘এটা বলার কারণ—চাঁদসী চিকিৎসায় যেহেতু উপকার হয়, তাই এটার বিকারও ঘটছে। চাঁদসী গ্রামে যাঁদের বাড়ি থেকে এই চিকিৎসার উদ্ভব তাঁদের প্রথম পুরুষ এই চিকিৎসাকে স্বপ্নাদ্য বলতেন। আমাদের সমাজ ও মুসলমান সমাজ গরিব, তাছাড়া শিক্ষাদীক্ষার দিক থেকে তাদের মনোভাব এমন যে এই ধরণের টোটকা, স্বপ্নাদ্য, জলপড়া, ধুলাপড়া, পীরখান, পুকুরের জল, কোনো বিশেষ ফল—এই ধরনের চিকিৎসায় বিশ্বাস বেশি। ঠাকুর গুরুচাঁদের প্রতি সবারই তো ভক্তিশ্রদ্ধা। তাঁর ওপর বিশ্বাসের একটা প্রধান কারণ ছিল—তাঁর টোটকা চিকিৎসা।’
‘তাই? আমি তো এসব জানি না। কিন্তু টোটকা তো অভিজ্ঞতা থেকে জানা প্রতিকার। দ্রব্যের বস্তুগুণও তো সত্য। আমার শরীরে যে কত ব্যাধি, তা বলে শেষ করা যাবে না। একজন সন্ন্যাসী-মত মানুষ, জেলখানায় আমাকে এই আংটিটা দিয়ে বলেছিলেন—এটা আঙুল থেকে খুলবেন না, কখনো। আর, আংটিটার রং যখন একটু কালচে, মরা-মরা দেখাবে, বুঝবেন, আপনার শরীর খারাপ হতে শুরু করেছে। আমি বললাম—আমাকে তো কিছু করতে হচ্ছে না, তাহলে পরব না কেন, মাঝে-মাঝে শুধু তাকাতে হবে। উনি বললেন, তাকাতেও হবে না, আংটিটাই তাকাবে। এট তো চিকিৎসা না। আগে নোটিশ পাওয়ার যেটুকু সুবিধে। আর আপনাদের যেরকম কাজ তাতে অনিয়ম হবেই।’
‘তিনিও কি ডেটিনিউ ছিলেন?’
‘না। কয়েদি। জেলখানায় চুল দাড়ি কাটা খুব ঝামেলা। তাই অনেকেই চুলদাড়ি কাটে না। ডেটিনিউদেরও অনেকে। উনি আবার একটা তিলক পরতেন। আবার অনেকে জেলখানাতে দাড়ি কাটবেনই। তাও তো একটা কাজ। মান্দালয়ে আমি এত ঘন-ঘন এতরকম অসুখে কাহিল হয়ে পড়তাম যে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নিতে হত। মাঝে-মাঝেই। ছোট জেল তো। সে একটা হুলুস্থুল ব্যাপার। কয়েদিরাও সবাই জানত। উনিও নিশ্চয়ই সেভাবে জানতেন-কোনো দিন গলা দিয়ে রক্ত, কখনো ঘুম-না-ভাঙা, কখনো পেটের যন্ত্রণা, কখনো বমি। উনি তাই আমাকে এটা পরিয়ে দিলেন। আমিও খুলিনি। এবং এটার ওপর একটা বিশ্বাসও জন্মে গেছে। লোকটিকে আমি সন্ন্যাসী ভেবেছিলাম, পরে জানলাম ও লাইফার। লখনৌ-এর দিকে কোথাও রেলে কিছু চাকরি করত। সকলের চোখের সামনে ওর গ্যাংলিডারকে খুন করেছিল। তাহলে দ্রব্যগুণ না-মেনে উপায় আছে? আপনি কী বলছিলেন, আমি বাধা দিলাম। বলুন।’
‘যা বলছিলাম, তা আর বলার প্রয়োজন নাই আপনাকে। আমি এই চাঁদসী বিদ্যা একেবারে চাঁদসীর খোদ গুরুর কাছে শিক্ষা করছি, প্র্যাকটিসও করছি প্রধানত সহকারী হিশাবে। আপনার এই এতরকম অনিশ্চিত অসুখের মধ্যে যদি কোনো একটা জায়গায় স্থায়ী বা ফিক ব্যথার কষ্ট থাকে, কোথাও থিকে নিয়মিত বা অনিয়মিত রক্তপাত ঘটে—একই জায়গা থিকে বা হজমের একটা কষ্টই বারবার হয়, বা কোথাও একটা পুরাতন ঘা থাকে—বাড়েও না, কমেও না, সারেও না তাইলে অনুমতি দিলে আপনাকে আমি চাঁদসীর চিকিৎসা দিতে চাই।’
‘বলেন কী, যোগেনবাবু। শরীর নিয়ে তো একেবারে নাজেহাল হয়ে আছি এই বয়সে। ইয়োরোপে তো সেই কারণেই যাওয়া। একটা লক্ষণ কমে তো আর-একটা বাড়ে। শেষে, ভিয়েনায় সাইকো অ্যানলিসিসও করিয়েছি। ওদের কথাটাই ঠিক মনে হল। ওরা কথা বলে যেতে বলে। আমি কী বলেছি তা পরে আর মনে করতে পারিনি। কিন্তু ওরা যখন বলল—বাইরে থেকে তোমার শরীরের ওপর এমন প্রচণ্ড আঘাত পড়েছে, আচমকা, যে তোমার সিস্টেম চেপটে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছে, একটা পয়সার ওপর দিয়ে ট্রাম চলে গেলে পয়সাটা যেমন অদ্ভুত সব শেপে বদলে যায়, কিন্তু গুঁড়িয়ে যায় না, তোমার সিস্টেমের কোনো কোনো জয়েন্টে সেরকম হয়েছে, এরপর সিস্টেম আর নিতে পারত না, তোমার সিস্টেম কোল্যাপ্স করত, যাকে লোকে মৃত্যু বলে—তখন আমার মনে হল আমি নিজে না বললে ওরা কী করে জানবে কার্জন পার্কে ২৬শে জানুয়ারির মিছিল নিয়ে ঢুকতেই পুলিশরা যেভাবে আমাকে লাঠিপেটা করছিল, তাতে তো মরে যাওয়ারই কথা, পরে শুনেছি আমার সহপাঠী বন্ধু, কর্পোরেশনের এডুকেশন অফিসার ক্ষিতীশ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে বাঁচায়, আর-একবার আলিপুর জেলে নীচের ওয়ার্ডে পুলিশ বন্দীদের বেধড়ক মারছে দেখে আমি দোতলায় সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছি, যে ইন্সপেক্টারটি এটা করছিল সে আমাকে দেখে ছুটে এসে বন্দুকের বাঁট দিয়ে মাথায় মারল, কানের ওপরে, আমি তো এক মারেই অজ্ঞান কিন্তু ওরা তাতে খুশি হবে কেন আর অন্য পুলিশরাই-বা বন্দুক দিয়ে পেটানোর শখ মেটাবে না কেন। সেবার বাঁচিয়েছিল সত্য বক্সী, ধাক্কা দিয়ে পুলিশদের সরিয়ে কোলে করে আমাকে দোতলায় নিয়ে যায়, তাহলে শরীরের যন্ত্রপাতির চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার দোষ কী? ওরাই কিন্তু বলেছিল তোমার যে-নানারকম শরীর খারাপ হয়, সেটা নানারকম অসুখের কারণে নয়। একটাই ‘ট্রমা’র ফল এগুলো। তবে তুমি তো ভারতবর্ষে থাকো, এখান থেকে তোমার চিকিৎসা করা যাবে না। ওরা বারবার কিন্তু সিস্টেমকে ইরিটেট করতে না করেছিল। সেটা কী করে সম্ভব সেটা আমি বুঝিনি—চিকিৎসা নেই যার, তার আর সব বুঝে কাজ কী?’
যোগেন একেবারে ভুরু কুঁচকে চোখ নিচু করে চোয়াল শক্ত করে সমস্ত কথা শুনল, একবার ও বাধা দিল না। তারপর বলল, ‘আমাকে এইটুক বলেন–স্থায়ী কোনো ফিক ব্যথা আছে কি? ‘একটা কেন? তিনটে। কোমরে, তলপেটে আর মাথায়। স্থায়ী ব্যথা বলতে এই তিনটেই বলা উচিত।’
‘নিয়মিত রক্ত পড়ে কোথাও থেকে? অর্শ বা মাড়ি থেকে বা নাক থেকে বা গলা থেকে?’
‘নিয়মিত বলতে কী বলছেন, জানি না, রক্ত যখন পড়ে একটা জায়গা থেকেই পড়ে—গলা।’
‘হজমের কষ্টটা কী রকম? তীব্র ব্যথা। নাকি বদহজম?’
‘ডিসপেপসিয়া বলতে যা বোঝায়—’
‘আর পুরনো ঘা কোথাও? ঠিক ঘাও না। শুকনোও হতে পারে। বাড়েও না, কমেও না, সারেও না? সাধারণত ঘাড়ে, পিঠের কোণে বা হাঁটুর নীচে—’
‘আপনি বলাতে মনে হচ্ছে পায়ের দিকে একটা ওরকম আছে।’
‘আপনাকে একটু দেখব, পাঞ্জাবিটা খুলবেন?’
‘এ-ঘরে তো শোয়ার কোনো জায়গা নেই—’
‘না, শুতে হবে না। খালি গা করেন তাতেই হবে।’
সুভাষ পাঞ্জাবিটা খুললেন। নীচে ধবধবে হাফহাতা বেনিয়ান, পাতলা সুতোর যোগেন একটু হেসে বলে, ‘আপনাদের এই একটা অসুবিধে—খদ্দরের তো আর গেঞ্জি হয় না?’
সুভাষ গেঞ্জির ভিতর থেকে বলেন, ‘এটা তো ভাল বলেছেন। ৬ তারিখে, মহাত্মাজি তো আসবেন, ওঁকে বলব কথাটা।’
যোগেন সুভাষের হলদেটে ফরসা পিঠটা দেখে। এতটা ফরসা সে কখনো দেখেনি মেমশাহেবদের ফরসাটা তো একঝলক দেখা—একঝলকে বোঝা যায় না। আর এ এমন ফরসা, পিঠটা তো অনেকটা জায়গা, তাতে গায়ের রঙের একটু হেরফেরও হয়, সুভাষবাবুর পিঠ দেখলে তেমন হেরফেরকে মনে হয় সোনার গয়নার ওপর আলোছায়া বয়ে যাওয়া। যোগেন হাত না লাগিয়ে ঘাড় নামিয়ে কানের পেছন আর ঘাড়টা দেখে।
‘ধুতিটা একটু নামাবেন? কোমরটা-
সুভাষ নামিয়ে দেন, যোগেন একটু ভাল করে দেখে সামনে গিয়ে তলপেটটাও দেখে। সেদিন যোগেন ফেরার সময় অনেকটা পথ হাঁটল। এক বাদামওয়ালার কাছ থেকে এক আনার বাদাম কিনেছিল। বাদামওয়ালার তাড়া ছিল, সে মাথায় তার ফেরি নিয়ে দৌড়ছিল। যোগেনকে পেরিয়ে যাওয়ার পর যোগেন বুঝতে পেরে তাকে চেঁচিয়ে ডাকে। যোগেন এক আনার বাদাম চাইলে লোকটা মাথার ওপরের ফেরি থেকে হাতড়ে একটা ঠোঙা নামিয়ে যোগেনকে দেয়। লম্বাটে ঠোঙায় ভরাই থাকে বাদাম। কিন্তু যোগেন সেটা নেবে না—’এটার মধ্যে অর্ধেক পচা আর অর্ধেক ফাঁপা। খোলা বাদাম দাও—ওজন করে।’ লোকটি খুব বিরক্ত মুখে তার এক কাঁধে ঝোলানো বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি স্ট্যান্ডটা নামিয়ে, তার ওপর ফেরিটা নামায় আর আপন মনে বলতে থাকে–এমনিতেই তার দেরি হয়ে গেছে, বাবু আরো দেরি করে দিচ্ছেন।
বাদামগুলো নিতে-নিতে যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার তাড়া কীসের? বিক্রি করতেই তো বারাইছ। বিক্রি হইলে আবার গোসা কর।’ যোগেনের কাছ থেকে আনিটা নিয়ে পকেটে রেখে, ফেরিটা মাথায় তুলে, স্ট্যান্ডটা কাঁধে ঝোলাতে-ঝোলাতে লোকটি বলে—ময়দানে বড় ফুটবল খেলা আছে, তাড়াতাড়ি না-গেলে সে দাঁড়াবার জায়গা পাবে না।
শুনে যোগেনের একবারের জন্য মনে হয়—যাবে নাকী ময়দানে, খেলা দেখতে? যেন তার হাতে অঢেল সময়। কিন্তু না গিয়ে সে বাদামের খোশা ভেঙে ভিতর থেকে বাদাম বের করে মুখে ফেলতে-ফেলতে হাঁটতে লাগল। অত সকালে বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে বেরয়নি। দরকার নেই। লুচি নেহাৎ কম ছিল না।
যোগেন হাঁটে আর হাঁয়ে বাদাম ছোঁড়ে।
সে মনে করতে চাইছে—বাড়ি থেকে বেরনোর সময় সে কি ভেবেছিল, এত দেরি হবে। দেরি আর হল কোথায়, যোগেনই তো এত গল্প ফেঁদে বসল, তার ওপর চাঁদসী। নইলে কাজের কথা তো দশ মিনিটেই শেষ।
শরৎবাবু আশুস্যারের টেলিগ্রামের কথা উসকে না দিলে যোগেন কি অত গল্পে ঢুকত? না। টেলিগ্রামের কথা না উঠলে সে আর টেলিগ্রামের গল্প বলতে যাবে কেন?
বেশ। টেলিগ্রামের কথা না-হয় উঠেছে। চার্চিলের কথায়, ঘুতু রায়ের গল্প তুলতে গেল কেন যোগেন।
শরৎবাবু যখন জানালেন যে সুভাষবাবু তাকে ডেকেছেন তখন কি যোগেনের খুব আশ্চর্য ঠেকেছিল? বা, ভিতরে আনন্দও হয়েছিল? আশ্চর্যও হয়নি, আনন্দও হয়নি। অ্যাসেমব্লিতে রাজা গজা, মন্ত্রী-সেক্রেটারি, জমিদার-ব্যারিস্টারদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেষি করতে-করতে, নামজাদা বড় মানুষদের সম্পর্কে তেমন বিস্ময় নেই। সত্যি তো—আইনসভা না-হলে কি সে স্যার বিজয়, নলিনী সরকার বা নবাব হবিবুল্লার সঙ্গে একই মর্যদায় বসতে পারত। এদের একজনের বাড়িতেও তো তাকে ঢুকতে দেবে না, দারোয়ান। এর মধ্যে যোগেন নিশ্চয়ই পার্লামেন্টিরয়ান হিশেবে তার জোর বোঝাতে পেরেছে। সেটা বোঝা যায়, তার কথা যে ভঙ্গিতে স্পিকার বা শরৎ বা নৌসের আলি বা নীহারন্দুেবাবু বা বঙ্কিমবাবু শোনেন, তা থেকে। বঙ্কিমবাবু বলেছেন, একদিন ডকমজদুর ইউনিয়নে নিয়ে যাবেন। নীহারেন্দুবাবু লবিতে অনেকদিনই তাঁর সঙ্গে অনেকটা সময় কথা বলেন। তিনি এমন কথাও বলেন যার জবাব যোগেন ঠিকমত দিতে পারে না। কথাগুলো যে ঠিকমত বুঝতে পারে তাও নয়। যোগেন ভাবত, বুঝতে না-পারাটা তারই জানার অভাব। পরে অনেকবার কথা বলায় বুঝেছে যে সে যদি বরিশালে বলে, তাহলে যেমন কলকাতার লোক বুঝবে না, নীহারোন্দুবাবুদের সেইরকম বরিশালি আছে। উনি জানতে চাইছিলেন, অ্যাসেম্বলিতে যোগেন কোন স্বার্থের প্রতিনিধি বলে নিজেকে মনে করেন। ব্যাখ্যাও করেছিলেন—প্রত্যেকেরই তো স্বার্থ থাকে, হয়ত স্বার্থটা তার পার্টিতে বোঝা যায়, কে হিন্দুস্বার্থের পক্ষে, কে মুসলিম স্বার্থের পক্ষে, কে ব্যবসায়ীদের পক্ষে, কে জমিদারদের পক্ষে, কে রায়ত বা কৃষকদের পক্ষে। আপনি নিজেকে কোন্ স্বার্থের মানুষ বলে ভাবেন। তখন যোগেন প্রশ্নটা বুঝে নিতে একটু আবছা করে বলে, ‘শাস্ত্রে বলে স্বার্থ ত্যাগ করো, আর আপনি বলেন স্বার্থটা কী? য্যান, জাইনতে চান মতলবটা কী? আমার তো মতলব কিছু নাই। বেবাক মেম্বারের মত আমিও ভোটে জিত্যা আসছি। নীহারেন্দু বাবু তখন পালটা জিগগেস করেন, যদি না জিততেন? যোগেন তার পালটা জবাব দিয়ে হেসে ফেলেছিল—তাইলে মেম্বার হইত্যাম না। তাহলে করতেনটা কী? এমনি সামাজিক কাজের কথা বলছি না। রাজনীতির কাজ। যোগেন তখন নীহারেন্দুবাবুকে বলার মত কথাটা পেয়ে গেছে। নীহারেন্দুবাবুদের জীবনযাপন থেকে কি যোগেনের রাজনীতি বা স্বার্থটা আন্দাজ করা সম্ভব। দুটো তো সম্পূর্ণ আলাদা জীবন। আপনি শহরের শিক্ষিত ধনীবাড়ির ছেলে। পড়াশোনা যতটা করতে চান ও যা করতে চান সেটা আপনারই ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বিদেশ থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে এসেও আপনি নিজের স্বার্থ বা বিশ্বাস অনুযায়ী রাজনীতি করতে পারেন। আপনি কিন্তু ভাববেন না যে আপনাদের জীবনাটাকে আমি হিংসে করছি বা ছোট করছি। আপনার জন্মটা তো আপনার হাতে না। বড়বাড়িতে জন্মেও বড়বাড়ির চালুজীবন থেকে আপনারা বেরিয়ে এসেছেন। এটা আপনার বা আপনাদের পক্ষে আত্মত্যাগ। কিন্তু আমার বেলায় বা আমার মত আরো অনেকের বেলায় তো এটা ত্যাগ নয়, বরং একটা ভোগ, বড়রকমের লাভই বলতে পারেন। আমি নমশূদ্র, এমএলএ ভোটে জেতাটা আমার নিজের পক্ষে তো বটেই, আমার জাতের পক্ষেও লাভ, মানে, কত বড় লাভ, সেটা বোধহয় আন্দাজ করা যায় না, নিজে না বুঝলে। বা, হয়ত যায়ও। আমি যদি আন্দাজ করতে পারি, আপনাদের আত্মত্যাগটা কোথায়, তাহলে আপনিও নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারতে পারেন আমাদের, নমশূদ্র বা সমজাতীয়দের ভোগটা বা লাভটা কোথায়। বেশির ভাগ মুসলমানেরাও তাই। অহংকার বা লাভ, যাই বলুন। কার্যকারণে, যেখান থেকে সর্ব অর্থে আমরা, মানে শূদ্ররা আর মুসলমানরা অচ্ছুৎ, সেই ক্ষমতার জায়গায় পৌঁছানোটাই তো আমাদের স্বার্থ। তাও কি পৌঁছান যায়? কত যে বাধা! সব পথ আটকান। আপনি মুসলমান হয়্যা ক্ষমতার ভাগ নিবেন। দুই পা গিয়া দ্যাহেন, ঢাকার নবাব পথ আটকাইয়া, কয় যে মুসলমান তো আমি, তুই তো নেড়া। আপনি ছোট জাত বইল্যা ক্ষমতার ভাগ নিবেন। দুই পা আগাইয়া দেখেন। আমাদের মত দাগি শূদ্র বলতে রাজা প্রসন্নদের রায়কত। তাহলে, যাকে বলে সাম্প্রদায়িক কোটা, তার ব্যবহারটা কোথায়? তবু এটাই আমাদের স্বার্থ। ক্ষমতা চাই। ক্ষমতার প্রমাণ দিতে চাই।
