৭০. গভর্নর ভয় পেলেন
শাহেব যে তাঁর ভাষণ শেষ করে দিলেন, তা যোগেন তো বুঝতে পারেইনি, আর-কেউ পেরেছে বলেও যোগেনের মনে হল না। তারা যেভাবে বক্তৃতা করে তাতে গলার ওঠানামা থাকে, কিছু-কিছু মজাও থাকে, ঠাট্টাও থাকে। আন্দাজ পাওয়া যায়—এবার শেষ হবে। কিন্তু এ-বক্তৃতায় তো তেমন আন্দাজের কোনো জায়গায় নেই। শাহেব ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলার পর সবাই হাততালি দিতে থাকল। শাহেব সোজা হয়েই দাঁড়িয়েছিলেন। আবার, স্পিকারের চেয়ারের ওপরে ব্যালকনি জ্বলে উঠল ও শাদা পোশাকের বালক-বালিকা পরীদের গলায় বেজে উঠল, ‘লং লিভ দি কিং।’ গান শেষ হওয়ার পর সবাই নিজ-নিজ আসনে বসে পড়ল। এবার লাটশাহেব আবার সেই মিছিল করে বেরিয়ে যাবেন। লাটশাহেবের দুই অ্যাডিকং সেরকম একটা ভঙ্গিতে যেন নিচ্ছিল। হঠাৎ একটা গলা চিৎকার করে উঠল, হাতও তুলল যে তার একটি পয়েন্ট অব অর্ডার আছে। স্পিকার ও আইন পরিষদের চেয়ারম্যান পাশাপাশি বসেছিলেন। চেয়ারম্যান যখন প্রশ্ন—উত্থাপককে তাঁর বক্তব্য বলতে বললেন, তখন বোঝা গেল, তিনিই সভা চালাচ্ছেন। সেই মেম্বার তখন দাঁড়িয়ে উঠে ভালভাবেই বলেন—’যেহেতু নতুন বিধান মতে এটাই প্রথম আইনসভা ও পরিষদের মিলিত সভা যেখানে হিজ এক্সেলেন্সি ভাষণ দিলেন ও যেহেতু এখানে আমরা যে আদবকায়দা তৈরি করব, তাই ভবিষ্যতে অনুসরণ করা হবে, তাই আমি প্রস্তাব করছি হিজ এক্সেলেন্সির ভাষণের একটি প্রতিভাষণ গৃহীত হোক।’ মেম্বার বসে পড়ল। কংগ্রেস বেঞ্চ থেকে লম্বা হাততালি শুরু হল ও কংগ্রেসের চিফ হুইপকে আঙুল নাচিয়ে কিছু বলতেও দেখা গেল।
কংগ্রেস থেকেই যে কিছু বলা হল, সেটা তো পরিষ্কারই বোঝা গেল কিন্তু কী বলা হল সেটি বোঝা গেল না। এতক্ষণ যে বাঁধা গতে পুরো অনুষ্ঠান চলছিল, তাতে লাটশাহেবের প্রতিটি পা ফেলা ও ঘাড় ঝাঁকানোর পূর্ব নির্দিষ্টতাই কৌতূহল ছড়িয়েছিল। তাতে নিশ্চয়ই এমন আচমকা এমন এক মেম্বারের এমন এক প্রস্তাবে লাটশাহেবের অঙ্গভঙ্গিও মুখভঙ্গি সম্পর্কে নির্দেশ ছিল না ও থাকার কথাও নয়। সেটা সমস্ত মেম্বারের কাছে ধরা পড়ে গেল তাঁর দাঁড়াবার জায়গায় লাটশাহেব হঠাৎ যেন টাল খেয়ে কংগ্রেস বেঞ্চের দিকে তাকালেন, তাতে তাঁর বিরক্তি তো বোঝা গেলই, এটাও বোঝা গেল যে তিনি কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন তাঁর পেছনে লাগার এই মতলবের জন্য। এই-যে একটু, একটুকুনি, সময়ের ফাঁক ঘটল, তাতেই চেয়ারম্যান বলে উঠলেন, ‘প্রস্তাব গৃহীত। পরিষদে খাড়া পেশ করবেন।’ লাটশাহেব চেয়ারম্যানের ওপরও চটে উঠলেন, আরে, উনি কংগ্রেসের মতলবটাই ধরতে পারেননি, উলটে লাটশাহেবকেও প্যাঁচে ফেললেন ও নিজেকেও প্যাঁচে ফেললেন। এতক্ষণ সংবিধানের নানা ক্ষমতা ও নানা প্রতিষ্ঠানের ভিতরকার অন্তসম্পর্ক নিয়ে যত সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা তিনি দিলেন, সেইসব কিছু মাড়িয়ে অ্যান্ডারসন পুরো সভার দিকে পেছন ফিরে চেয়ারম্যানকে আঙুল দেখিয়ে ধমকে উঠলেন, ‘আই ওভার রুল’।
দুই অ্যাডিকং অত্যন্ত দ্রুত পাশাপাশি সামরিক পদ্ধতিতে দাঁড়িয়ে একটা পা এগিয়ে দিল ও দ্বিতীয় পাটাও তুলে পরিষ্কার করে দিল—তাদের প্রস্থান সময় এসে গেছে। অ্যান্ডারসন তাঁর নিজের অ্যাডিকংদের অনুসরণ করলেন।
লাটশাহেব নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বেশ উঁচু গলায় ঘোষণা করলেন, ‘আহুত বিশেষ যুক্ত অধিবেশন শেষ হল। এক ঘণ্টা বিরতির পর আজ বিকেলে যথাসময়ে আইনপরিষদ ও আইনসভার অধিবেশন নিজ-নিজ সভাগৃহে, আবার বলছি, এক ঘণ্টা বিরতির পর কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলি তাদের নিজেদের হলে স্বতন্ত্র বৈঠকে বসবে। বিরতির সময় এক ঘণ্টা।’
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াচ্ছে কেউ-কেউ, কেউ-কেউ এগচ্ছে, কেউ-কেউ আবার বসেই আছে। যোগেন দাঁড়িয়ে উঠলে বোঝে, কাদায় জলে তার ধুতি তার পেছনে একেবারে সেঁটে গেছে। সেটা আলগা করতে-করতে যোগেনের এখন সন্দেহ হয়—সে কি ভুল দেখল? বা, তার কি ভুলই মনে হল? লাটশাহেব কী রকম চটে উঠলেন না? একজন মেম্বার কী রকম বলেছে—জয়েন্ট সেসনে—তাতে লাটশাহেববের খড় বেরিয়ে গেল। যোগেনের ধুতিটা তার পেছনে এত লেপ্টে গেছে যে হাঁটতে তার অসুবিধেই হচ্ছে।
না। না। তারই কোনো ভুল হয়েছে। ঐ মেম্বার হয়ত লাটশাহেবকে জড়িয়েটড়িয়ে কিছু বলেছে। কিন্তু মেম্বারের গলাটাও তেমন ছিল না, বলাটাও তেমন ছিল না। আর, তাহলে কি চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে পরের সভায় তার খাড়া পেশ করতে বলতেন? এটা তো পরিষ্কার যে লাটশাহেব সভার নিয়মকানুন গঙ্গায় দিয়ে মিটিংয়ের দিকে পেছন ফিরে আঙুল তুলে, আঙুল কি তুলেছিলেন, বেশ, যদি নাই তুলে থাকেন, গলা তো তুলেছিলেন, ‘আই ওভাররুল’ বলে? ওভাররুল উনি নিশ্চয়ই করতে পারেন, সেটা তো কাগজকলমের ব্যাপার। এভাবে কি ওভাররুল করা যায়? পুরুতঠাকুরের ফুল ছোঁড়ার মত? ওঁ স্বাহায়, ওঁ শিবায়।
তারই যে-কোনো ভুল হয়েছে এটা নিশ্চিত করতে যোগেন তার অভ্যস্ত আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে ঢুকে পড়তে চায়। আমি চোদ্দ পুরুষের চাঁড়াল, জীবনে কোনোদিন লাটশাহেব দেখেছি যে তার মান-অভিমান রাগবিরাগ পর্যন্ত চোখের নিমেষে বুঝতে পারব? নিজের বার-তের বছরের বৌ, তার নিজের সন্তানের গর্ভধারিণী সেই বৌ, তার মুখচোখেই কিছু বোঝে না, আর, এ তো লাটশাহেব। যদি লাটশাহেব, ঐ চেয়ারম্যানকে ধমকেই থাকে, তাহলে লাটশাহেব বেরিয়ে যাওয়ার পর চেয়ারম্যানেরা চোখমুখ দেখে বোঝা যেত না। সে তো দিব্যি খোশাছাড়ানো সেদ্ধ আলুর মত মুখ নিয়ে দু-বার না তিনবার বোঝাতে লাগল—এরপর আজই অ্যাসেম্বলি ও কাউন্সিলের আলাদা-আলাদা সেসন বসবে এক ঘণ্টা পর? নিজের নিজের হলে। এ কি স্কুলের ড্রিলস্যার না কী—স্পোর্টসের সময় বারবার বলে-না, ক্লাস সিক্স, বাঁ-দিকের টেন্টে যাও—।
যোগেন দরজার প্রায় কাছে এসে আবার তার আত্মলাঞ্চনার ছলনায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে—আরে, ভদ্রলোকদের মধ্যে ওরকম সেদ্ধ আলু মার্কা মুখ অনেকের থাকে, মাথায় যদি টাক থাকে আর দাড়িগোঁফও যদি না থাকে, তাহলে সেদ্ধ আলুর মত দেখাবে না তো কী? এসব লোকই বিধাবা ভ্রাতৃবধুর সম্পত্তি গ্রাস করে দলিল জাল করে বা জমিদারির কোনো অবাধ্য তালুকের সমস্ত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে রাতারাতি ঘাস গজিয়ে দিয়ে সেখানে মনুষ্যবসতির সব চিহ্ন ধুয়ে মুছে দেয়।
যোগেন প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বোঝে চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়ার সাক্ষ্যটাকে সে একেবারে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য করে তুলছে। চেয়ারম্যান তো এক শাদামাঠা লোকও হতে পারে যার আক্কেল আছে। যদি লাটশাহেব তাঁকে ধমক দিয়ে থাকেন আর তা নিয়ে কথা তোলার ও বলার জন্য যখন অনন্তকাল পড়ে আছে, তখন চেয়ারম্যান আজকের ভাঙা হাটে সেসব নিয়ে কথা তুলবেন কেন?
যোগেন দরজার হ্যান্ডেলটা জোর দিয়ে আঁকড়ে টেনে খোলে ও দরজার সেই ফাঁকটুকু দিয়ে গলে যেতে-যেতে সামান্য একটু হাসে।
যতই এপাশ-ওপাশ করুক যোগেন সে যা দেখে ফেলেছে, তা আর না-দেখবে কী করে? রাস্তার যে-কুকুরটাকে এত লড়াই করে রাস্তার ঐ টুকরো জায়গাটিতে থেকেযাওয়ার হক আদায় করতে হয়েছে—সবচেয়ে কঠিন ও আক্রমণী লড়াই তো ছিল তারই জাতিভাইদের সঙ্গে সে কি কখনো বোঝায় ভুল করতে কোনো নতুন আক্রমণের ইন্দ্রিয়াতীত ধ্বনির সংকেত বোঝায়?
চাঁড়ালের চোখ যদি এত ভুল দেখত, তাহলে কি চাঁড়াল বাঁচত? লাটশাহেডা ভয় পাইছিল ক্যান?
