৮১. লাট-বেলাটের দরবার ও বিপ্লবীদের বোমা-গুলি
৩৭ সালের নভেম্বরের শেষে ছোটলাট, বাংলার গভর্নর, স্যার জন অ্যানডারসন এই চাকরির শেষে বম্বে থেকে দেশে ফেরার জাহাজ ধরলেন। বম্বে জাহাজঘাটায় যাঁরা তাঁকে বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে গান্ধী বা জিন্নার মত খ্যাতিদীপ্ত কোনো-কোনো নেতাও যেন হাজির ছিলেন। তার চাইতে খাটো নেতারা তো ছিলেনই।
তাঁর চাকরিতে স্যার জনকে, পনের দিনে একটা গোপন চিঠি হিজ এক্সেলেন্সি ভাইসরয়কে লিখে খবরের পেছনের বা ভিতরের মারপ্যাঁচগুলি জানাতে হত। সব প্রাদেশিক গভর্নরকেই লিখতে হত। ১৯৩৬-এ ভাইসরয় হয়েই লিনলিথগো এটা চালু করেছিলেন। সেসব গোপন চিঠি ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী ৫০ বছরের পুরনো দলিল হিশেবে যখন ১৯৮৬ থেকে বেরতে শুরু করল, তখন পড়াও শুরু হল নানারকম মজা তৈরি করে-করে। একসময়ের সবচেয়ে দামী ও গোপন খবর, মাত্র ৫০ বছরেই কেমন পুরনো, সরেস, উদ্ভট ও বেস্টসেলার হয়ে যায়, মজাটা ছিল ও আছে সেখানেই। মমি-টুটেনখামেন-এর মত। যেমন বেঁচে ছিল মহার্ঘ, হাজার-হাজার বছর আগে, তেমন মহার্ঘই ছিল তার মরে থাকা, হাজার-হাজার বছর ধরে। শুধু বুকটুকু ধুকপুক করে না, আর চোখের পলক পড়ে না। এটুকু মজাও না-থাকলে ৫০ বছরের বাসি এসব দলিল পড়তে যাবে কেন লোকজন? তাদের তো আর কোনো সত্য জানার ব্যাকুলতায় অনিদ্রা ধরেনি। বা তেমন কোনো সত্য তাদের জানবারই নেই হয়ত। কিন্তু ভাল লাগে তো, এতসব মজাও যে সাম্রাজ্য তৈরি ও রক্ষা করতে ও সেই সাম্রাজ্য ভাঙতে—ঘটে থাকে। ভারতে একজন ব্রিটিশ সম্রাটই একবার এসেছিলেন, ও এসেছিলেন সস্ত্রীক। সম্রাট পঞ্চম জর্জ। এর পরে প্রিন্স অব ওয়েলস বা সম্রাটের ভাইপো বা ভাগ্নেরা কেউ-কেউ এসেছে কিন্তু সম্রাট একবার, ১৯১১-তে। হ্যাঁ, সেই সম্রাট, যাঁর অমরত্ব প্রার্থনা ব্রিটিশদের ও তাদের দুনিয়াজোড়া প্রজাদের জাতীয় সংগীত ও যার প্রতি আনুগত্য, ঈশ্বরের প্রতি অনুগত্যের চাইতেও, অপরিহার্য। ভগবান বড়জোর পরলোকে শাস্তি দেবেন কিন্তু সম্রাটের মুখ খোদা না থাকলে তো একটা পেন্সও খরচা করা যাবে না। ঈশ্বর যেমন বাধ্যতা, আনুগত্য, অনতিক্রম্যতার একটা ধারণা মাত্র অথচ লোহার আকারের মতই বাস্তব-সম্রাটও তেমনি একটি ধারণা মাত্ৰ।
এমন শক্তির এমন আধারের একটা ধারণাকে যদি হাগামোতা করতে দেখা যায়, কথা বলতে গিয়ে তোলাতে দেখা যায়—তাহলেও ধারণাটা টিকে যেতে পারে—এসব আর কতক্ষণ দেখা যাবে বা বোঝা যাবে। মুশকিলটা হয় তখন, যখন ধারণাটি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করে বসে।
সম্রাট হলেও পঞ্চম জর্জ একটু ভ্যাবলা গোছের মানুষ ছিলেন, তোতলাতেন, ফলে থুতু ছিটত, ফলে যাঁরা কথা বলছে তারা একটা জায়গা ও ভঙ্গি বাছত যাতে সম্রাটের মুখোখুখি পড়ে যেতে না-হয়, বোধহয় আমাদের ঐতিহাসিক নাটকের সেনাপতিদের স্টাইলে।
দিল্লির দরবার দেখে সম্রাট নিজেই আরো ভ্যাবলা হয়ে যান। মুঘলাই দরবারের কায়দায় সব সাজানো হয়েছে। দেশীয় রাজা আর নবাবরা তাদের কেতা আর চাল দেখাতে উট, ঘোড়া, হাতির পাল নামিয়ে দিয়েছে। এত মণিমুক্তো-হিরেপান্না পরেছে যে সেগুলোকে মেকি মনে হতে পারে। পাগড়িরই কত বাহার। ব্রিটেনের রাজা তো বিলাস-বৈভবে বড়জোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার। এমন মুঘলাই সমারোহ তার কল্পনারও বাইরে। সম্রাট পঞ্চম জর্জ এত ভেবলে গেছেন যে এইসব, এ–ই সব, এ–ই–স–ব যে তাঁরই এতেই তাঁর মুখ থেকে হাসি আর সরছিল না, লালাও তো একটু পড়ত। সত্যিই মনে হচ্ছিল—লোকজনের মুখের কথার গল্পে রাস্তা থেকে একটা বোকা লোককে ধরে এনে রাজা সাজিয়ে বসিয়ে দিলে, বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে সে যেমন চোখ পিটপিট করে, হাসিতে ঠোঁট বন্ধ করতে পারে না—সম্রাট পঞ্চম জর্জের সেই অবস্থা। ভঙ্গিটা খুব অচেনা নয়—এখনো ভক্তি বোঝাতে এমনই মুগ্ধতা সিনেমাতেও দেখানো হয়। তবে, ভক্তির মুগ্ধতার তো কোনো ইষ্ট থাকেন। সম্রাট পঞ্চম জর্জের আবার ইষ্ট হবে কোত্থেকে—তিনি তো সকলের ইষ্ট। কিন্তু এত সমারোহ, এত ঐশ্বর্য, এত আয়োজন, এত বৈভব, এসবের একটা ইষ্ট থাকবে না? কৃতজ্ঞ ও অভিভূত সম্রাট এই সমগ্রতাকে ইষ্ট বলে মাথা নিচু করলেন।
সম্রাট পঞ্চম জর্জ তাঁর দরবারে দুটো ঘোষণা করলেন। নিজেই করলেন। আর, এমন যে একটা ঘোষণা হতে পারে তা লন্ডন ও দিল্লির জনা পনের লোক জানত—প্রধানমন্ত্রী, ভারতসচিব, ভাইসরয় হার্ডিঞ্জ সহ মাত্র জনা-পনের লোক। সম্রাটকেও নিষেধ করা ছিল—তিনি যেন কাউকে কিছু না-জানান। সম্রাট পঞ্চম জর্জ এমনিতেই অনুগত, তদুপরি একটু মজা হলে তাঁর ভালই লাগত। ১৯০৫-এ বঙ্গবিভাগের আগে তিনি একবার প্রিস অব ওয়েলস হিশেবে ভারতে এসেছিলেন ও ভারতে যে-ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল—ভাইসরয়, প্রদেশের গভর্নররা, আইসিএসের অফিসাররা, বাহিনীর অফিসাররা—তাঁদের তাঁর ভাল লাগেনি। উনি ওঁর ডায়রিতে তখন লিখেছিলেন, ‘শাহেবরা যেন হাতে মাথা কাটে। আরে, পরাধীন হয়েছে বলে কি ইন্ডিয়ানদের কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছে থাকবে না?’
একে তাঁকে ‘না’ করে দেয়া হয়েছে, তার ওপর তিনি আমোদগেঁড়ে, সুতরাং তিনি তাঁর স্ত্রী, মেরি-কেও বলেননি। তিনিও দরবারেই প্রথম শুনলেন।
দরবার শেষ হলে, সম্রাট তাঁর স্ত্রীসহ সবে মাত্র সেই স্বর্ণছত্র থেকে বেরিয়ে তাঁদের থাকার প্রাসাদের দিকে রওনা হয়েছেন আর দরবার-ফেরত হাজার-হাজার মানুষ হঠাৎ ছুটতে শুরু করে সেই সিংহাসনমঞ্চের দিকে। ছুটতে ছুটতে তারা এসে দাঁড়ায় মঞ্চের সামনে। তখনো তারা হাঁফাচ্ছে, ডিসেম্বরের শীতেও ঘামছে। তারা ভারতীয় রীতিতে তাদের আট অঙ্গ দিয়ে সেই মঞ্চকে দণ্ডবৎ করে। একজনও মঞ্চের ওপর ওঠে না। হাজার-হাজার লোক উপুড় হয়ে শুয়ে—তাদের কপাল মাটিতে ঠেকানো তাদের দুই হাত তাদের দুই কানের পাশ দিয়ে গিয়ে করজোড় হয়ে গেছে। তারা কোনোদিন সম্রাট দেখেনি। কিন্তু তারা শুনে এসেছে তীর্থদেবতার সামনে ও সম্রাটের সম্মুখে কী ভঙ্গিতে প্রণিপাত করতে হয়। কোলের বাচ্চাদের কপালে ঐ ধুলো লাগিয়ে, তারা ফিরে যায় শ্লথ পায়ে তাদের মুলুকের দিকে; সম্রাট ও তাঁর স্ত্রী ষোল ঘোড়ায় টানা এক শকটে ফিরছিলেন তাঁদের আবাসে। সারথি আগে বুঝতে পারে–হাজার-হাজার মানুষ ছুটছে দরবারের সিংহাসন মঞ্চের দিকে। সে শকট থামিয়ে দেয়— সেই মানুষজনকে তাদের ইষ্টের দিকে ছুটবার সময় দিতে। সম্রাটের শকট ছিল সেই ছুটন্ত ভিড়ের পেছনে। সেই ভিড় ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছিল নিজেদের পা-ফেলায় উত্থিত ধুলোতে আড়াল হতে-হতে। সম্রাট তাদের পেছন থেকে তাদের দেখছেন—এ তারা জানতেও পারল না। যদি পারতও, তাহলেও তারা সম্রাটকে চিনতে পারত না। বরং তারা ষোল ঘোড়ায় টানা শকটটাকে মুগ্ধ হয়ে দেখত। তারা সম্রাটকে চাইছিল না, চাইছিল গর্ভগৃহের ধুলো, যেমন মন্দিরে চায়, দরগায় চায়, গুরুদ্বারে চায় যে গর্ভগৃহে ক্ষমতার বাস ও অন্তরাল।
কিন্তু সম্রাট যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন। যতই অনুগত, ভ্যাবলা ও আমোদগেঁড়ে হন না কেন, সম্রাট এটা জানতেন, হাড়েমজ্জায় জানতেন—সাম্রাজ্যটা একটা ব্যবস্থা আর সম্রাট কোনো মানুষ নয়।
ঈশ্বরের বিগ্রহ জানেনও না, ভোলেনও না। সম্রাটও তো কিছু জানেন না, ভোলেনও না। অথচ একটা মানুষ তো! একটা মানুষকে একটা ধারণা করে তোলা হয়েছে। সে ধারণার তো মানুষেরই মত হাগামোতা পায়, ঘুমও পায়, যৌনসঙ্গমের ইচ্ছেও পায়। নইলে তো সম্রাটদের ছেলেপুলে হত না। ছেলেপুলে না-হলে তো সম্রাটবংশ লোপ পেয়ে যেত। সেই ধাবমান হাজার-হাজার মানুষকে তাঁর সিংহাসন মঞ্চের দিকে ধেয়ে যেতে দেখে সম্রাটের চোখ ভিজে উঠেছিল। তিনি তাঁর স্ত্রীর হাতটার ওপর নিজের ডানহাতটা রাখলেন। শকট চলতে শুরু করতেই এক শারীরিক প্রতিবর্তক্রিয়ায় তাঁর বোধে এসে যায়—যেমন হঠাৎ শরীরের কোনো একটা জায়গা চুলকোয়, বা ব্যথা করে, বা যেমন হঠাৎ হেঁচে বা কেশে ফেলতে হয়—তেমনি তাঁর বোধে এসে যায় : তাঁকে যদি ব্যবস্থা মানতে হয়, তাহলে ব্যবস্থাও তো তাকে মানবে? কখনো-কখনো বা ক্বচিৎ।
এটাকে চিন্তা বা ভাবনা বলা ভুল। একেবারে ভুল।
আবার, এর ভিতরে ব্যবস্থাকে জব্দ করার দুষ্টুমিটা আন্দাজে না-আনলে, সম্রাট এমন ভাবতে যাবেন কেন—এমন একটা র্যাশনালিস্ট তর্ক উঠে পড়বে।
ভ্যাবলা, অনুগত, আমোদগেঁড়ে, মজারুদের বোধ এমন বাঁকা পথ নেয়। আর নিলে সে-বোধ আর সোজা হয় না। ঐ বাঁকা পথেই চলে। যুক্তি দিয়ে না, ঝোঁক দিয়ে। যদিও ভিতরে-ভিতরে একটা যুক্তি এমন জোরালো ও ধারালো হতে থাকে যে অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকরা তার ভার ও ধার টের পান। দুষ্টুমি-র যে-ঢং বা মুখোশটা সম্রাট ব্যবহার করে থাকেন চমকাতে বা চমকে উঠতে, সেটা অর্থহীনতা ঝেড়ে ফেলে প্রতিহিংস মুদ্রা হয়ে ওঠে যেন। আর, এই প্রক্রিয়ায় এই সব ভ্যাবলা, তোতলা, বাধ্য, আমোদগেঁড়ে, অনিশ্চিত ব্যবহারের লোকগুলোর ভিতরে একটা যুক্তিবিদ্যাও উলটো দিক থেকে সংগঠিত হতে থাকে। তখন, এ সব লোককে শয়তানও মনে হয়।
হ্যাঁ—প্রফেশন্যাল হ্যাজার্ড তো সব প্রফেশনেই থাকে। কোনো বেকারের হাতের আঙুল ঝলসে যেতে পারে। কোনো কশাইয়ের আঙুল কেটে যেতে পারে। যারা স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্ট বাজায়, তাদের আঙুলে কড়া পড়তে পারে। সার্জেনদের, মানে শল্যবিদদের কোমরে ফিক ব্যথা হতে পারে। যারা জাহাজে কাজ করে তাদের শরীরের খোলা জায়গাগুলোতে নোনা ধরতে পারে। হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে ডিউটি করতে-করতে অনিদ্রার অসুখ করতে পারে। এসব যে এইসব বৃত্তির সব লোকদেরই হবে, তা নয়। কিন্তু হতে পারে।
তেমনি—সমাজকে একটা ব্যবস্থা হিশেবে মেনে নিলে তার হ্যাজার্ড বা দুঃখকষ্ট মেনে নিতে হয়। ঠিক ব্যবস্থাও তো নয়। ব্যবস্থার ধারণা। মেনে না নিলে, ব্যবস্থার ধারণাটা ধসে যাবে। তাহলে—যে-লোকটাকে ও তার পরিবার-পরিজনদের কোনো ধারণার বিগ্রহ করা হয়, তাদের খেয়ালখুশিও তো ব্যবস্থার পক্ষে হ্যাজার্ড হতেইপারে।
সম্রাট তাঁর আবাসে ফিরে রাতের খাওয়ার টেবিলে পাশে বসা কাউকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি ঠিক করে ফেলেছেন, তিনি ভারতবর্ষেরও সম্রাট হবেন ও তার জন্য এখানেই অভিষেক বা করোনেশন হবে।
পরে জিজ্ঞসা করলে সম্রাট মনে করতে পারেননি, তিনি কাকে বলেছিলেন। তাঁর বাঁদিকে তাঁর স্ত্রী অ্যান বসেছিলেন আর ডানদিকে বসেছিলেন ভাইসরয় হার্ডিঞ্জের স্ত্রী। তাঁদের কাছে এমন রাষ্ট্রীয় বিষয় বলা যদিও দস্তুর নয় তবে, সম্রাট পঞ্চম জর্জ, একটু হেসে, যেসব সম্রাটদের নিয়ে নাটকটাটক লেখা হত, তাদেরই কাউকে ভেংচে বললেন যেন, ‘একজন সম্রাট কি এটুকু আশা করতে পারেন না যে তিনি যা বললেন, তা শুনে নেয়ার লোকের অভাব হবে না, তাঁর সাম্রাজ্যে?’ আর কথাটা তিনি যে-স্বরে বললেন, তাতে কিছুতেই কেউ বুঝতে পারল না, তিনি এটা সত্যি-সত্যি বললেন, নাকী, পুরনো কারো নাটক থেকে মুখস্থ বললেন, নাকী কোনো অভিনেতার নকল করলেন। তাঁর বলার মধ্যে তিনটি সম্ভাবনাই সমপরিমাণে মিশে ছিল।
পরদিন প্রাতরাশের টেবিলে ভাইসরয় হার্ডিঞ্জ সম্রাটের ডানদিকের তৃতীয় চেয়ার থেকে সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করলেন, হিজ মেজেস্টি কি চাইছেন, ভারতসম্রাট হিশেবে তাঁর স্বতন্ত্র কারোনেশনের বিষয়টি সম্পর্কে ক্যাবিনেটের মতামত জানতে চাওয়া হোক। ভাইসরয়, পদাধিকারে উপসম্রাট বা সম্রাটপ্রতিনিধি হতে পারেন কিন্তু সম্রাট স্বয়ং উপস্থিত থাকলে উপ বা প্রতিনিধি পদাধিকারীর আর কী করার থাকে। লর্ড হার্ডিঞ্জের ঠাকুরদাও ছিলেন কোম্পানির আমলের এক গভর্নর জেনারেল। সম্রাটের সম্রাটত্ব যেমন বংশানুক্রমিক, তাঁরও রাজপ্রতিনিধিত্ব তেমনি বংশানুক্রমিক। একই কথা দুবার জিগগেস করা উপসম্রাটের পক্ষে সম্ভব নয়। একই কথা দুবার সম্রাটকে বলা যায় না। সম্রাটের কোনো শুনতে না-পাওয়া নেই, অন্যমনস্কতা ও নেই। হার্ডিঞ্জের প্রথম সমস্যা দাঁড়াল-সম্রাট পঞ্চম জর্জ নিজে সে-কথা জানলেন কী করে? কখনই-বা?
অনেক প্রশ্নই উঠেছিল। কী করে সেসব প্রশ্নোত্তর চলছিল, তা আন্দাজ করাও মুশকিল। ফোন নেই, টেলিগ্রাম নেই, এসএমএস নেই, ই-মেল নেই, চিঠি যাতায়াতে মাসখানেক বা বেশি। অথচ সাম্রাজ্য আছে, সম্রাট আছে, ধারণা আছে, ধারণার বিগ্রহ আছে। তবু বিষয়গুলিকে হয়ত এক রকম সাজানো যায়।
—কোন্ ক্রাউন পরতে চান সম্রাট? আসল ক্রাউন তো দেশের বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ।
—তাহলে নতুন ক্রাউন বানাও।
—রাজমুকুট তৈরি করে আসছে যারা পাঁচশ বছর, লন্ডনের সেই গেরার্ড জুয়েলার্স দর দিয়েছেন, অবিকল আগেরটার মত করতে ৪৬০০০ পাউন্ড।
—করোনেশন একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সেটা দুবার হয় না। বিধর্মীদের দেশেও হয় না।
—পার্লামেন্ট তো একবার করোনেশনের টাকা দিয়েছে। আবার কেন?
—গেরার্ডকে বলুন—একটা মুকুট তৈরি করে ভাড়া দিক। সম্রাট ফিরে এলে ফেরত দেয়া হবে। ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার পাউন্ডের মধ্যে।
—আমরা বিজয়ী উইলিয়ামের সময় থেকে সারা ইয়োরোপের রাজমুকুট বানাই। মুকুট ভাড়া দিতে শুরু করলে আমাদের গুডউইলের বারটা বাজবে। আপনারা বরং অন্য কোথাও দেখুন।—দেশীয় রাজারাজরাড়া তো সম্রাটকে অনেক মণিমুক্তো সোনাদানা দেবে, সেগুলো দিয়ে বানানো হোক।
—একবার ফাঁস হয়ে গেলে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ভেঙে যাবে।
—তাহলে ভারতের সম্রাটের মুকুট ভারতীয় প্রজারা দিক।
তাই হল। সম্রাট পঞ্চম জর্জ সেই মুকুট নিজেই নিজের মাথায় পরে ভারতীয় প্রজাদের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। ভারতীয় প্রজাদের রাজভক্তিকে এই সামান্য স্বীকৃতি তাও সম্রাট দিলেন। সম্রাটের সঙ্গেই সেই ভারতের সম্রাটের মুকুট লন্ডনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। আজও টাওয়ার অব লন্ডনে গেলে সেই দুই নম্বরি রাজমুকুট দেখা যায়।
পরের বছর থেকে করোনেশন ট্যাক্স বসল। কতদিন ধরে সে-ট্যাক্স আদায় হয়েছিল বা কোনোদিন বন্ধ হয়েছিল কীনা জানা যায়নি।
ঠিক একবছর পর, পঞ্চম জর্জের ডুপ্লিকেট রাজমুকুটের দাম তখনো ভারতীয়দের ট্যাক্সে সামান্যই শোধ হয়েছে, ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে নতুন রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রবেশ করছিলেন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ, হাতির মিছিল সাজিয়ে, হাতির ওপর সোনালি হাওদা। লর্ড হার্ডিঞ্জ অত উঁচুতে বসে-বসে দুলে-দুলে চলেছেন। তাঁর ঠিক পেছনে স্বর্ণচ্ছত্র ধরে দাঁড়িয়ে এক ভারতীয় তাকে নগ্ন শরীরেই দাঁড়াকরানো হয়েছে—মালকোঁচা মারা ধুতির সঙ্গে। পুষ্ট তার পেশিগুলো ঢেউয়ের মত ভাঙছিল তার ভারতীয় শরীরে। কত রঙিন ফিতে দিয়ে তার শরীরের সেই ঢেউগুলি সাজানো। রাস্তার দুপাশে সারিদেয়া ভিড়। একবছর আগে দরবারের যেমন তারা এসেছিল সম্রাট দর্শনে, একবছর পরে তেমনি এসেছে রাজধানী দেখতে। লর্ড হার্ডিঞ্জ ডানহাত-বাঁহাত নাড়াচ্ছিলেন জড়োহওয়া দাঁড়িয়ে-থাকা ভারতীয় প্রজাপুঞ্জকে। এত বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য, এত বিশ্বস্ত ও অনুগত দেখাচ্ছিল সেই হাজার-হাজার মানুষের দাঁড়িয়ে-থাকা, তাকিয়ে-থাকা। হার্ডিঞ্জ ইয়োরোপীয় রাজনীতিতে পোড় খাওয়া রাজনীতিজ্ঞ। ভারতের চিরকালের শক্তিকেন্দ্র ও ভারতীয় এপিকগুলির ঘটনাস্থল হিশেবে প্রতিষ্ঠিত এই নতুন এক দিল্লিতে ইংরেজ শক্তির ভারতীয় কেন্দ্রকে সরিয়ে আনার যে ঘটনার তিনি নেতৃত্ব করছেন, তাকে এপিককালের ইতিহাসের সংযুক্ত না-করে দেখা, তাঁর পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে কোনো ভারতবর্ষ তাঁর কাছে সত্য ছিল না। বা, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও তাঁর কাছে সত্য ছিল না। সত্যিই—এটা একটা অনন্ত সম্বন্ধ।
ঢিলের মত একটা কিছু এসে পড়ে হার্ডিঞ্জের হাওদার ওপরে-ঢিলটা প্রথমে ওপরে উঠে তারপর পড়েছে ঐ সোনার ছাতার ওপরে। ভারতীয় কান তখনো বিস্ফোরণের এমন প্রতিধ্বনিময় আওয়াজে অভ্যস্ত হয়নি। মুহূর্তে হাওদা জ্বলে উঠল, সেই স্বর্ণচ্ছত্র জ্বলে কাত হয়ে পড়ল, ছত্রধারীর একটা হাত ছিটকে পড়ল মাটিতে, দাউদাউ আগুনের মাঝখানে লর্ড হার্ডিঞ্জকে দেখা গেল দুই হাত তুলে চিৎকার করতে, বিস্ফোরণে আঁতকে উঠে সেই প্রায় নয় ফুটি হাতি শুঁড় মাথার ওপর তুলে, বৃংহন দীর্ঘতর ও উচ্চতর করতে-করতে, পিঠে দাউদাউ আগুনে ছাই হতে থাকা সোনার ছাতা ও ইউনিয়ন জ্যাক ও জ্বলন্ত রাজপ্রতিনিধিকে নিয়ে অন্ধকারের দিকে ছুটল, অন্ধকারকেই আগুনের প্রতিকার বলে তার শরীর জেনে এসেছে অথচ সে-অন্ধকার সেই হস্তী-আরুঢ় বহ্নিকে আকাশের শূন্যতায় হারিয়ে যাওয়ার মত বেগবান করে তুলছিল। ভারতের বিপ্লবীদের সবচেয়ে উদ্ধত আক্রমণ—ভাইসরয়।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে আসায় খেপে গিয়েছিল বেসরকারি সব হৌসের শাহেবরা। প্রায় পৌনে দুশ বছর হল এই হৌসগুলিই তো কলকাতাকে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় মহানগর করে তুলেছে। অন্যান্য ইয়োরোপীয়রা কি পেরেছে ব্যান্ডেল, হুগলি, চন্দননগরকে মেট্রপলিস করে তুলতে? পৌনে দুশ বছর ধরে এই হৌসগুলিই তো ভারতের ব্যবসায়ী ইংরেজদের একটা জাত দিয়েছে। এই হৌসগুলি তো চাকরি দিয়ে গ্রামের হিন্দু-মুসলমান পরিবারগুলির সঙ্গে বংশানুক্রমিক বাঁধন তৈরি করেছে। এই হৌসগুলিই তো ব্যাবসাবাণিজ্যের সব গলি খুঁজি পর্যন্ত শাসন করে। দিল্লিতে কী আছে? সাম্রাজ্য মানে তো ব্যাবসা। সাম্রাজ্য মানে তো লাটশাহেবি করা নয়। তারা একটা দরখাস্তও পাঠাল লন্ডনে, ভারত সচিবের কাছে। রাজধানী কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হোক।
কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে সরানোয় খুব খুশি হয়েছিল গবর্মেন্টের চাকুরে শাহেবরা। সিভিল সার্ভিসের শাহেবরা, ওকালতি ইত্যাদি পেশাভুক্ত লোকজন। কলকাতার প্রাইভেট শাহেবগুলো বার মাস চব্বিশ ঘণ্টা ঘোঁট পাকায়। তাদের ভাবসাব এমন যে তারাই তো গভমেন্ট, তারাই তো দেশ চালায়। দিল্লিতে কোনো প্রাইভেট শাহেব নেই, শুধুই অফিসাররা আছে। আর দিনে-দিনে সময়টা দুর্বোধ্য হয়ে উঠছিল। অফিসে বসে থাকলে প্রাইভেট শায়েবদের উদ্ভট সব প্রস্তাব শুনতে হয়। আর, বেরলে, বাইরে রিভলবার হাতে টেররিস্টরা। দৌড়ে পালানো বা পালটা আক্রমণ চলবে না। তাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অপমান। দিল্লিতে যেমন প্রাইভেটশাহেব নেই, তেমনি টেররিস্টও নেই।
