১০
2 of 4

৫১. যোগেন এল বরিশালে

৫১. যোগেন এল বরিশালে

সন্ধ্যা পার করে বরিশাল পৌঁছল যোগেন।

সদর রোড থেকে একটা টমটমে যোগেন তার নিবাসে পৌঁছে যায়। বাড়ির দরজাটা যেন খোলাবন্ধের জন্য বসানো না, লোকে কোথা দিয়ে ঢুকবে—তার ফাঁক। কলকাতার লোকদের বিশ্বাস করানো যায় না যে দরজাটা কপাট দেয়ার জন্য না।

যোগেন তার কাগজভরা ব্যাগটা সেরেস্তা ঘরের চৌকিটার ওপর ছুড়ে দেয়। আর-একটা ব্যাগ, মানুষের রোজকার জিনিশের, যোগেন টেবিলের পায়ার কাছে নামিয়ে রেখে ভিতর-বারান্দায় সিঁড়ির গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু উঁচু স্বরেই বলে—’ধর্মশালাটালাতেও তো বানর-হনুমান থাহে, এ তো দেহি জনশূন্য অযোধ্যা, সবাই গিছে রামেরে আগাইতে।’

প্রহ্লাদ দত্তের বাড়ির পুবদিকে একটা চেগার থাকারই কথা, কিন্তু কোনোদিনই ছিল না। একটা তুলসীতলা আছে—সেটাকে সীমানা ধরলেও চলে, ভদ্রাসনের কেন্দ্র ধরলেও চলে। সেই একটু আবছা থেকে প্রহ্লাদ দত্ত বেরিয়ে বলতে-বলতে এগয়, ‘তোমারে ছাইড়া দিল? খালাস না জামিন? সিপাই-চোকিদাররে বসাইল্যা কোথায়?’

‘আইলে তো বসাব! আমরা তো সিপির আন্ডারে, ক্যালকাটা পুলিশ। আর তোমরা তো বিপির আন্ডারে। বেঙ্গল পুলিশ।’

‘আইনসভায় তোমার লেকচার শুইন্যা নাহি মেমশাহেবরা চক্ষুভাসান?’

‘এতগুলা মেয়েছেলে গুইনল্যা কোথায়। আমি তো চক্ষু মুইদ্যাও পৌনে তিনখানার বেশি মেয়ে মানুষ দেখি নাই। তার উপর একজনের মাথামুণ্ডু ঢাকা বোরখা, আর-একজনের পাও পিছন শেমিজে ঢাকা। গুইনলে তো ছয়ডার বেশি চক্ষু হয় না, ছয় চোক্ষে আর কত জল ধইরবে।’

‘কাগজে লিখছে যে ছাপার-তিহারবাজার লুট নিয়া অ্যাত কথা, তোমার কথা—’

‘কথার আর দোষ কী—যত ভিজাবা ততই ফুলব। কুথাকার এক চ্যাংড়া বামুন, পনিদার মিয়ারে চেয়ার থিক্যা তুইলা চেয়ার ধুইছে। ঐ পত্নদারের দেয়া ধানে সে-বাড়ির দুই বেলা খাওয়া জোটে। নাজিমুদ্দিন কথাডা হাউসে ফেইল্যা হিন্দু—জমিদারগ বাপান্ত করার ধইরল। তাঁতে আমার আর আপত্তি কী সেই ফাঁকে কয়্যা দিল্যাম—কাছারিবাড়িতে বসার ব্যবস্থা চাই। আমি ভাবছি এডডু কথাবার্তা চেঁচামেচি হইয়া থাইম্যা যাবে। মীরাদিদি খাড়াইয়া সমর্থন বলায় ঘটনাডা এমন ফুইল্যা-ফাঁইপ্যা উইঠছে।’

‘তুমি যে বরিশালে আইসতেছ, সে সংবাদ কেউ জানে না। এমন একা-একা?’

‘অন্তত তুমি যে জানো না তা বুঝছি। তুমি যদি না-জানো লোকজন জাইনবো কোয়থিক্যা?’

‘জানাও নাই ক্যান? কারণ আছে কুনো?’

‘নিজে মনস্থির কইরলে তো জানাব তোমারে? সেশন নাই। মাসখানেক ছুটি। দ্যাশে আইসব না?’

‘চোরের মত আইসব্যা? অমাবস্যার রাইতে?’

‘শোনো। আগৈলঝরার ইশকুলে একডা মিটিং ডাকা আছে, কাইল বাদে পরশু। মনে করছিল্যাম, বরিশালে না-নাইম্যা সিধা যাই মৈস্তারকান্দি। দুইদিন থাইক্যা গোপালগঞ্জ যাব একদিনের লগে। তারপর মিটিং সাইর‍্যা, সদরে আইস্যা বসব। তালে যদিন হয় বরিশাল থাকা হবে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলা স্টিমার ঘাটা থিক্যা গৌরনদীর লঞ্চ ধইরতে আর মন সইরল না। তহন ভাইবল্যাম—বরিশাল হইয়্যা না-হয় বাড়ি যাই। অ্যাহন তোমার কাম হইল আগৈলঝরা খবর করা যে আসামি আইস্যা গিছে।’

‘যাউক গিয়া, সেইসব হবে নে। আমি তো ভাইব্যার ধরছি—ভালমানুষডাকে কইলকাত্তায় পাঠানটা কি গুখোরি কাম হইল। অ্যাহন তুমি যদি বরিশাল সদরে হাজির রেকর্ড না-কইর‍্যা গৌরনদীতে যাইত্যা, তালি সন্দটা সইত্য হইত—মানুষড়ার বুদ্ধিনাশ হইছে।’

‘তুমি তো কইলক্যাতায় যাও নাই। তালি তোমার এমন বুদ্ধিনাশের কারণডা কী?’

‘ক্যা? নাশ হইব ক্যা? আমার বুদ্ধি আমারই আছে।’

‘দেইখ্যাশুইন্যা মনে নেয় না। অসময়ে অতিথ। আদর নাই, আপ্যায়ন নাই। আগে জবানবন্দি। আরো, দুনিয়ার সব মানুষরে মক্কেল ভাব কেন। দুইডা-একডা তো ভদ্দরলোকও আইসব্যার পারে।’

‘তুমিই তো কপাট আগলাইয়্যা খাড়া থাহো, তালি আপ্যায়নও এমন। চলো, ঘরে গিয়া বসি। প্রহ্লাদ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে।’

চেয়ারটা প্রহ্লাদকে ছেড়ে দিয়ে যোগেন চৌকিটাতে বসে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কি মাতৃদায়, না তালাক খাইছ?’

‘মায়ে তো ঐ ঘরে ঝিমায় আর তালাক তো গিছে বাপের বাড়ি—’

‘সম্ভাবনা শুভ?’

যোগেনের জিজ্ঞাসায় প্রহ্লাদ কেমন হাঁ হয়ে যায়, চোখটাও স্থির, সে যেন হঠাৎ কিছু মনে করতে পারে, যা তার দুদিন আগে মনে পড়া উচিত ছিল। সে বলে ওঠে, ‘দ্যাহো কাণ্ড! এ-কথাডা মাথায় আইল না একবার? আমারে কইল, বাখরগঞ্জ ঘুইরা আসি দুই রাত্তির। আমি আবার কইল্যাম—যে নৌকায় যাও সেই নৌকায় ফির। রংসিঁড়িতে নৌকা বাইন্ধ্যা রাইখো। নৌকাও তো ঠিক কইর‍্যা দিল্যাম—বড় নিমাই। তুইল্যাও তো দিল্যাম-ছাওয়ালরে সঙ্গে নিয়্যা গেল। তহনো তো বুঝি নাই—’

‘তো অ্যাহন শ্বশুরবাড়ি যাও, রংসিঁড়ি। আমি থাহি। কেষ্টা আর আমি। তুমি বৌদিদিরে জিগ্যাইয়াই ফিরত আইসো।’

‘খাইছে! যা করছি তার তো অকরণ নাই। অ্যাহন তোমার কথা শুইন্যা পাঁচ কান কইর‍্যা দুই কান কাটা হই।’

‘খাড়াও, মায় য্যান ডাকে,’ প্রহ্লাদ উঠে গিয়ে আলো উশকে দিয়ে ডাকে, ‘মা কি ডাহ?’

‘ডাহি তো—’

‘কও। কী কইব্যা?’

‘তোগো শরীরে কোনো দয়ামায়া নাই—’

‘সেডা তো নতুন সংবাদ কিছু না। নতুনডা কী?’

‘আমার তো ঘুম নাই, শুধু ঝিম আছে। সেই ঝিমের মইদ্যে, পেল্লাদ, য্যান যোগেনের গলা শুইনল্যাম। আবার ঝিম ধইরল। আবার শুনি। আবার ঝিম ধইরল। আবার শুনি। তিন-তিনবার রে পেল্লাদ, তিন-তিন বার। শাস্ত্রে কয়ত-দূরের মানুষের গলা যদি তিন-তিনবার শুনো, তয় বুইজব্যা স্যায় দূরের মানুষ তোমারে বিস্মরণ দিছে। যোগার অ্যাড্‌ডা খবর নে।’

‘তা তুমি নিজে নিলেই পার। আমারে ডাকো ক্যা?’

‘তা তো কবিই রে পেল্লাদ অ্যাহন। এককালে পাইরত্যাম রে।’

‘অ্যাহন তুমি আর তোমার মাসকলাই ঢাইল্যা ডাকাইত ধরার গল্প বাধায়ো না। তোমার যোগারে যা জিগ্যাবার জিগ্যাও। স্যায় সশরীরেই আইছে। জ্যান্ত মানুষের গলাই শুইনছ। যোগা তোমারে বিস্মরণ দেয় নাই। এই যোগেন, মায়ে ডাকে।

যোগেন এই ঘর থেকে উঁচু গলায় গেয়ে ওঠে,

‘অ সই, যমুনায়
কে বাঁশি বাজায়
স্যায় কি রাই না রায়-

গাইতে-গাইতে যোগেন রাইয়ের ঘরের দিকে এগয়। রাই, তখন বিছানায় খাড়া হয়ে বসে একমুখ হাসিতে বলে ওঠে, ‘তুই কহন আইলি, সোনা–।’

যোগেনের মনে হয় বুড়ি যেন তাকে ঠাহর করতে পারছে না। সে একটু ভিতরে বলে—’কহ আইস্যা এঘর, ওঘর করি, ভরা সন্ধ্যায় এমন শূন্য বাড়ি দেইখলে গা ছমছম করে। আর তুমি নারী জীবন্ত জগৎসিংহকে নয়ন সম্মুখে দেখিয়াও বিশ্বাস করিতে পারো না—সত্যিই কি এ জগৎ সিংহ?’

কথাগুলি বুড়ি শুনে যে খুশি হয়, তা তার চোখে আসে না। ‘আয়, এডডু কাছে আয় ‘ যোগেন এগিয়ে তার কোলের ওপর মাথা রাখে। বুড়ি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার কোলের ভিতর থেকে যোগেন বলে ওঠে, ‘মাথা হাতাচ্ছ হাতাও, চক্ষুতে য্যান জল না গড়ায়।’

‘কী যে কস রাই! চক্ষুতে যদি জলই না গড়াইল তাইলে আনন্দডা পূর্ণ হয় নাকী, বোকা।’

‘আচ্ছা, অ্যাহন এডডু কম উছাও। শুইয়্যা থাহো। প্রহ্লাদদার সঙ্গে জরুরি সব কথা আছে। সাইর‍্যা নেই।

‘তুই কিন্তু আমার কাছে শুবি রাই—’

‘শুব। অ্যাহন ঘুমাও।’

বাইরে এসে যোগেন প্রহ্লাদকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বুড়ির কি দৃষ্টির গোলমাল হইছে?’

‘রাত্তিরে তো বরাবরই কম দ্যাহে। অ্যাহন বোধহয় রাইতকানাই হইছে। মায়ের তো রাইতে

চক্ষুর কোনো কামও নাই। দিনেরবেলায় তো নজর পরিষ্কারই।’

‘শোনো, প্রহ্লাদ দাদা। কাইল অ্যাডডা মিটিং ডাকো।’

‘কাইল? আইজ না রাইত!’

‘আইজ রাইত কাইল সকাল। বিকালে মিটিং। কয়ডা মানুষরে খবর দিতে অইব? তুমি বারাও অ্যাহনি সাইকেল নিয়্যা—’

‘আমি অ্যাহন বাইর হইলে তোমার নৈশ স্যাবার কী হইব?’

‘নিশিপালন। না-হয় তো আমারে চাইল-তরকারি বাইর কইরা দ্যাও। আমি আখা জ্বালাইয়্যা নিত্যানন্দভোগ চড়াইয়া দেই।’

‘এইডা তো ভাল ওকালতি প্যাঁচ দিছ—বারাইতে আমার হইব—মূল্য হিশাবে হয় নিশিপালন না-হয় নিত্যানন্দ ভোগ। তো কও গিয়্যা শমনডা কী ঝাইরতে হব? কারে-কারে বলাইরতে হইব। শমন তো তোমার নামে হইব—শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এমএল এ ওয়ান্টস টু মিট ইউ…’

‘খাইছে। এই শমনখান লইয়্যা তুমি সেনমশাই, দাশগুপ্ত স্যার, বিপিন গুপ্ত, ছোটবাড়ির মাইঝ্যান কর্তা, পণ্ডিতমশায় এইসব মান্যিগন্যি মানুষরে তলব দিবা?’

‘পাঠাও তো তলব দিবার। আবার কও যে তলব দিলে অমান্যি। তোমার তো পার্টি নাই। নাকী হইছে?’

‘মাইনষের কুদৃষ্টি টানো কেন? কইব্যার ধইরবে পাঠাইল্যাম মেম্বার কইরা, লগে আইলাম এক পার্টি। ডঙ্কা বাজাইয়া সেন কর্তারে গিয়্যা কই ক্যামনে—কাইল যোগেন মণ্ডলের মিটিংয়ে আসেন। পার্টি হইলে নায় কওয়া যাইত—। অ্যাহন যদি জিগান যোগেন নিজে আইল না ক্যা? তহন জব দিব কী?’

‘পহ্লাদদা তোমার এই মুকতারি-জন্মখান বৃথা গেল। কইব্যা—কইলকাত্তা থিক্যা খবর দিছে ফোনে, কাইল আইসব আর আপনাগ সঙ্গে কথা কইবার দরকার খুব। তাই আপনারে এডডু কাইল সার্কিট হাউসে পায়ের ধুলা দিতে হয়—হেই আনুমানিক তিনডা বেলায়—আরে কইব্যা তো সেনকর্তারে, আর আমার দুই সিনিয়াররে, মাইঝ্যান বাবুরে, পণ্ডিতমশায়রে আর মকলেশ্বর শাহেবরে।

যোগেন, এতগুলা মান্যিগণ্যি মানুষগো এতগুলা মিথ্যা কওয়া যায়?

মিথ্যা তো একডা—যোগেন কাইল আইসব। তাও পুরা মিথ্যা না—অ্যাহনো তো কেষ্টা ছাড়া কেউ সাক্ষী নাই যে আমার আগমন ঘইটছে। আর তুমি তো কইল্যা, কেষ্টার অ্যাহন রাতকানা ধইরছে। তাই সেই সাক্ষীও খাড়াবে না। একডা মিথ্যা পাঁচ জায়গায় কইলে তো মিথ্যা একডাই থাহে। থাহে না?’

‘সেডা খুব বড় কথা না, যোগেন। তুমি সার্কিট হাউসে মিটিং ডাইকল্যা—সেডা সরকারি পিয়ন নোটিশ দিলেই তো ভাল হইত।’

‘তা হইত! অ্যাহন সরকাররে পাই কই?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *