৫০. যোগেন আইনসভায় রপ্ত হচ্ছে
অ্যাসেমব্লির সেশন-এর এই চার-পাঁচ মাস জুড়ে যোগেনের কাজকর্ম যে খুব একটা বদলে দিয়েছে, তা নয়। বেশিরভাগ দিনই তো আফটার লাঞ্চ, তার ওপর শনি, রবি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন অ্যাসেমব্লি বসে না। তাছাড়াও, হিন্দুদের পুজোপরবে আগে সরকারি ৫০ যত ছুটি ছিল, মুসলমানদের পুজোপরবে তত ছুটি ছিল না। এখন আইনসভা হিন্দুপরবের সমানসংখ্যক দিন মুসলমানি পরবের জন্যও ছুটির সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এটা সরকারি ছুটিতে এখনো পরিণত হয়নি; লাটশাহেবের আপত্তিতে। কিন্তু আইনসভা এই ছুটি নিতে শুরু করেছে।
হিশেব কষলে তো দেখা যাবে, যোগেন এত আরামে এত কম কাজ করেনি কোনোদিন। ছাত্রজীবনের কথা না-ধরলেও প্র্যাকটিশের জীবনেও তো রাত জেগে নথি দেখা আর আইনের বই পড়া আর দশটা বাজতে-না-বাজতেই দুটো মুখে দিয়েই কোর্টে হাজিরা দেয়—কী কলকাতায়, কী বরিশালে। যোগেন হাড়ে মজ্জায় জানত, উকিল বলে যদি জজকোর্টে বা স্মল কজেস কোর্টে খাতির না পায়, তাহলে কোনো খাতিরই আর খাতির থাকবে না। অ্যাসেমব্লির মেম্বার হলেই তো আর ওকালতির খাতির হয় না! হিন্দু উচ্চবর্ণের মেম্বারকে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে হয় না—তাদের বাপঠাকুরদার নাম আর জমিদারির হদিশই তাদের ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। মুসলমানদের বেলাতেও আশরফ বা জমিদারকে বা ব্যবসায়ীকে তার ক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয় না। নাকী ঠিকানা, কোন্ বংশে জন্ম, ব্যাবসা কী তা থেকেই তাদের ক্ষমতা পূর্ব-প্রমাণিত। আর, কিছু মানুষ তো আছেনই, যাঁরা জ্ঞানীগুণী বলেই পরিচিত।
ঝামেলা যত মুসলিম লিগ আর কৃষক-প্রজার নতুন সব মেম্বারদের নিয়ে আর তাদের মত শিডিউল কাস্ট মেম্বারদের নিয়ে। তাঁদের মধ্যেও বিরাট বাধা, রসিক কাকার মত নামডাকের মানুষ আছেন, হাশিমশাহেব-হাসানআলির মত মান্যগণ্য মানুষও আছেন। কিন্তু এই মাস পাঁচ-ছয়েই যোগেন টের পেয়ে গেছে—মুসলমান আর শিডিউল কাস্ট মেম্বারদের সম্পর্কে সবাই মনে করে যে এদের একমাত্র উদ্দেশ্য কোটায় চাকরি পাওয়া আর চাকরির কোটা বাড়ানো
স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারকাছ দিয়েও নেই। সবাই মনে করে, মানে, হিন্দুরাই বটে কিন্তু বড়লোক মুসলমানরাও ওরকম ভাবে। বাংলার রাজনীতিতে বিধান রায়ের সঙ্গে স্যার আবদুর রহিমের এক বাদানুবাদ লোককথা হয়ে গেছে। এক বৈঠকে বিধান রায় বলেছিলেন, ‘মুসলমানদের তো ঐ এক কথা—দেশের জন্য কিছু করব না কিন্তু চাকরির ভাগ দাও।’ স্যার আবদুর রহিম সঙ্গে-সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘তাহলে হিন্দুদেরও তো এককথা—চাকরির ভাগ দেব না কিন্তু দেশোদ্ধারে এসো। হিন্দুদের লড়াই তো একটা ফ্রন্টে—ব্রিটিশরাজের সঙ্গে। আর মুসলমানদের লড়াই তিন ফ্রন্টে—সামনে ব্রিটিশ, ডাইনে হিন্দুরা আর বাঁয়ে মোল্লারা।’ এই ক-মাসে এই গল্পটা যোগেনের মনে ফিরে ফিরে এসেছে—তাইলে আমাগ, চাঁড়ালগ, শিডিউল, কয়ডা লড়াই? সামনে শাহেব। ডাইনে হিন্দু। আর বাঁয়ে মোল্লা? তাইলে মুসলমান আর চাঁড়াল লড়াই তো একডাই দাঁড়ায়।
কিন্তু কথাটা সে কোথাও বলে না। এমন কথা বলার দিনক্ষণ আছে, স্যার আবদুর রহিমের মত নেতা না-হলে এ-কথা বলা যায় না। নেতাহলেও বলা যায় না, যদি কথাটা বলার মত আসন না পাওয়া যায়। আসন পেলেও বলা যায় না, যদি এ-কথা বলার সময়টায় পৌঁছুনো না-যায়। যোগেন তো নেহাতই এক ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল কাস্ট অ্যাসেমব্লি পার্টির সেক্রেটারি। সেটা তো আইনসভার ভিতরে একটা ভোটের পার্টি। ধরে নেয়া হয় যে বাইরেও পার্টিটা আছে, না-হলে ভিতরে ঢুকল কী করে? কিন্তু সেটা তো সত্যি না। নমশূদ্রদের অত বড় নেতা বিরাট মণ্ডল তো প্রজাপার্টির হুইপ। মুকুন্দ মল্লিক তো মন্ত্রী। এই মন্ত্রিসভার মন্ত্রী—যাকে মুসলিম লিগের সরকারই বলা হয়। অথচ সে তো মুসলমানদের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের আন্দোলনেরও নেতাগিরি করে। রসিক কাকা তো কংগ্রেসে। পিআর ঠাকুর জিতল কিন্তু তার ভাই তো হারল কংগ্রেসের কাছে। যে জিতল সে নমশূদ্র না। মোহিনীমোহন দাশের মত বড় নমশূদ্র নেতা কংগ্রেসে। যজ্ঞেশ্বর মণ্ডলও কংগ্রেসে। আবার এরা যে নমশূদ্রদের জাতি-আন্দোলনে থাকে না, তাও না। এরা হিন্দু নমশূদ্র—শুধু নমশূদ্র না। শুধু নমশূদ্রটা কী? যোগেন জানে?
এই পাঁচ-ছ মাসে যোগেনের কলকাতার কাজ ঠিকঠাক হওয়ার সুবাদে প্যারী সরকারের বাড়ির ধরণ-ধারণ বদলে গেছে। বদলটা যে কেউ ইচ্ছে করে ঘটিয়েছে তা নয় বা কারো নজরে পড়েছে তাও নয়। ডাক্তারের বাড়ির লোক বলতে তো তারা স্বামী-স্ত্রী আর দুই ছেলে। কিন্তু তারা তো কলকাতায় এই বাড়িকরার সঙ্গে-সঙ্গে তাদের গ্রামের সমাজের জীবন থেকে নিজেদের আলাদা করতে চায়নি। তাদের সমাজে মানুষের বাড়িঘর যেন পুষ্করনির মত—শুকনো ডোবা এক রাতের বৃষ্টিতে বা বরিশালের একটা বড় জোয়ারের ধাক্কায় কচুরিপানা, গাছগাছড়া, ছোট-ছোট মাছ নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায় তেরাত্তিরের কুটুমের মত, তারপর, কুটুমের মতই ঘরেও ঢুকতে চায়। তাদের সমাজে বাড়ির মানুষের মাথা গনা হয় না। ডাক্তারের বাড়িতেও তাই। ইটকাঠের দোতলা বাড়ি হলেও, মানুষের কাজে সে-বাড়ির ওসার-বহর বাড়তেই থাকে।
সকালে এখন যোগেনের কাছে একটা ভিড় হয় আর ডাক্তারের রোগীর ভিড় তো আছেই। যোগেন এ-পাড়ার চেনা মুখ। সেই চেনা মুখের মানুষটা এমএলএ হয়েছে, তাতে পাড়ার লোকের বুক ফুলবে না? যে-লোকটাকে রাতেদিনে কলেজে পড়তে আর নানারকম কামাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখেছে, সেই লোকটার নাম ও কথা যদি মাঝে-মাঝে খবরের কাগজে পড়তে হয়, তাহলে, তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ও তো বাড়াতে হয়। কারো কারো একটু-আধটু কাজও থাকে—বাজারের কোনো একটা জলের কল ভেঙে আছে, বা গলিতে একটা গ্যাসের আলো দরকার, বা, কলাবাগানের পুব বস্তিতে কারা আইন জারি করেছে যে মুসলমানের ছাড়া ঘরের দখল মুসলমান ছাড়া পাবে না। যোগেন স্থানীয় কাউন্সিলারকে জানিয়ে দেয়।
এই ভিড়টা ওপরে এসেই কথা বলে যোগেনের সঙ্গে কিন্তু মাঝেমধ্যে বিশিষ্ট লোকজনও এসে পড়ে। তখন তারা প্রথমে বসে ডাক্তারের ভগন্দরের রোগীদের সঙ্গে। ওপরে ডেকে নিয়ে গেলেও সেখানে একটা ভাঙা চেয়ারও নেই।
রাত নটা-সাড়ে নটা নাগাদ শুরু হয় উদ্দুর-খুদ্দুরের ছোটাছুটি। ট্রামের আওয়াজ হল কী না-হল অমনি ছুটে জানলায় গিয়ে দেখবে যোগেন ফিরল কী না। আর, মাঝেমধ্যেই কাল ফোনটা ধরে কানে না-লাগিয়েই ‘হ্যালো’ বলে রেখে দেয়া।
এমএলএ-র সম্পত্তি এই ফোন। যদি একবার ক্রি-ই-ই-ই-ং বাজতে শুরু করে, যেখানেই থাক, উদ্দুর-খুদ্দুর ঝাঁপিয়ে এসে ধরেই ‘হ্যা লো।’ যোগেন বলেছিল প্যারী সরকারকে, ‘তোমার রোগীদের কারো কারোকে তো দিবার পার ডাক্তার, ফোনের নম্বরডা, তাহাইলে একডা কথা জিগ্যাইবার লগে তাগো দশডা মাইল ঠেঙাবার লাগে না।’ প্যারী সরকার বলে ওঠে, ‘রাহো তো, নিজের মাগ্গ দেইখব্যার পারে না তো ফোনের মাগ্ চিনব?’
উদ্দুর-খুদ্দুরের আর-এক সম্পত্তি যোগেনের চামড়ার ব্যাগটা—হ্যানডেল-দেয়া, বরিশাল থেকে নিয়ে এসেছে ওকালতির ব্যাগটা। বাড়ি থেকে যখন বেরয় তখনই তো ভর্তি। যখন ফেরে তখন এত ভর্তি যে বকলেশ খুলে যায়। যোগেন এলেই সিঁড়ির মাঝখান থেকে উদ্দুর-খুদ্দুর ব্যাগটা টেনে নিয়ে মাথায় করে ওপরে আনে। তার পর ব্যাগের ভিতর থেকে খবরের কাগজগুলো বের করে মেঝেতে ছড়িয়ে বসে চিৎকার করে পড়তে শুরু করে। এটা যোগেনই ওদের অভ্যাস করিয়েছে। ‘উদ্দুর-খুদ্দুর চিল্লায়্যা পড়ুক।’
আর খবরের কাগজের কথা বাদ দিলেও, আইনসভার কাগজের চাপেই তো শ্বাস কষ্ট হওয়ার কথা। এত কাগজ পড়ে কে? আর যদি পড়তে পারতও তাহলেও-বা বুঝবে ক-জন? যা ওকালতির প্যাঁচ। একটা পাতাজোড়া সেনটেন্সই শেষ হয় না।
সারাদিনের সব খবরের কাগজ নিয়ে যোগেন বাড়ি ফেরে। সব তার পড়া। কোনো-কোনো লেখা বা খবরের ওপর মোটা লাল পেন্সিলের লম্বা টিক দেয়া। উদদুর লেখাগুলি কাটে আর একটা লম্বা খাতায় সাঁটে। খুদ্দুরের তো সব কিছুতে দাদার সঙ্গে হিংসে। সে বলেছিল, ‘দাদাই যদি কাটে আর দাদাই যদি সাঁটে, তাহলে সে কী করবে?’ যোগেন তখন এই সমাধান করেছিল—দাগাবে যোগেন, কাটবে উদ্দুর আর সাঁটবে খুদ্দুর। সাঁটবে আর উদ্দুর তার নীচে কাগজের নাম-তারিখ-বার লিখে রাখবে।’ খুদ্দুর তাও খুশি হয়নি—’দাদার একটা কাজ বেশি কেন?’ যোগে তখন তাকে নিরস্ত করতে বলেছিল, ‘আমার কথা শ্যাষ হওয়ার আগেই যদি তোমার কাজ গনা শ্যাষ হয়, তাইলে তোমার একডা কাজ কম থাকাই ভাল। শোনো, দাদা ঐ নাম-তারিখ লেখার পর তোমাকে ঐ তাড়া-তাড়া কাগজ গুইছ্যা রাইখতে হবে। আমি যখন কব—ঐ তারিখের ঐ লেখাটা দে, তোমারেই তহন খুঁইজ্যা দিবার লাগব। আর যদি তারিখ না মনে থাকে আমার, তাইলে বিষয়ড্যা কইল্যাম আর তুমি সেই বিষয়ডা নিয়্যা যত কাগজে যত লেখা বারাইছে সব আমারে দিলে। হইল তো তোমার এক গণ্ডা কাজ?
রাত্রির এই সময়টা ওদের বাড়ির একেবারে নিজস্ব। উদ্দুর-খুদদুর্ চেঁচিয়ে কাগজ পড়ে, কখনো যোগেন কিছু বলে, কখনো ডাক্তার কিছু মন্তব্য করে। কখনো উদ্দুর-খুদ্দুরের মা কোনো খবর শুনে কোনো গল্প বলে। এই রাতের আড্ডাই ডাক্তারবাড়িতে যোগেনের অবদান।
জুলাইয়ে আইনসভার শেষ অধিবেশনের পর সেদিন রাতে যোগেন কাগজপত্র গোছাচ্ছিল। কাল সে বরিশাল যাবে। কিছু কাগজ সঙ্গে নিতে চায়—বরিশালে এই খবর বা মতামত তো রোজ পৌঁছয় না।
উদ্দুর জোরে জোরে পড়ছিল, ‘আইনসভাতে এমন এক প্রস্তাব উঠিয়াছে যাহার কোনো অর্থোদ্ধার করা আমাদিগের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই প্রস্তাবে বলা হইয়াছে, বিভিন্ন স্থান ও সূত্র হইতে এমন সংবাদ আসায় আইনসভা নিরুদ্বেগ থাকিতে পারিতেছে না ‘নিরুদ্বেগ মানে কী মামা?’
‘যার দুশ্চিন্তা নাই।’
‘তাহলে আইনসভার দুশ্চিন্তা নাই?’
‘না। উলটা। তাহলে আইনসভার দুশ্চিন্তা না হয়ে কি পারে?’
খুদদুর বলে ওঠে, ‘তুই কোনো মানে বুঝিস না কেন রে দাদা? সকাল দশটা বাজলে কি তুই স্কুলে না গিয়ে পারিস?’
খুদ্দুরের মা, মামা, বাবা—সকলে হাততালি দিয়ে ওঠে, খুদ্দুরের মা আহ্লাদ করে বলে ওঠে, ‘ওরে আমার তর্কপঞ্চানন—।’
‘যে জমিদারের কাছারিতে খাজনা জমা করা ও অন্যান্য বিবিধকর্মে প্রজাগণকে প্রতিদিনই যাইতে হয় কিন্তু কাছারিতে নিম্নবর্ণের জল-অচল হিন্দু ও মুসলমান প্রজাগণকে বসিতে দেয়া হয় না, এমনকী তাহারা যদি দাওয়ায় বা মাটিতে বসিতে যায়, তাহাতেও নিষেধ করা হয়। এমন সন্দেহ করিবার উপযুক্ত কারণ আছে যে উচ্চবর্ণের হিন্দু-জমিদারগণ বর্ণভেদ প্রথা অনুসরণ করিতেছেন। কারণ, বর্ণহিন্দু প্রজাগণকে এই নিষেধ করা হয় না, বরং সেরেস্তার শতরঞ্চে অতিশয় দরিদ্র ও অবিশিষ্ট ব্রাহ্মণগণকে বসিতে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। সুতরাং আইনসভা কিছু জমিদার মহাশয়দিগকে জানাইতেছে যে এই অব্যবস্থার পরিবর্তন আশু প্রয়োজন। প্রধান প্রজাদিগের বসিবার জন্য একটি বাঁশের মাচা কাছারিতে রাখিতে হইবে। তাহা হইতে নিম্নোচ্চ আর-একটি মাচা অপ্রধান প্রজাদিগের জন্য রাখিতে হইবে।
‘আইনসভার এই প্রস্তাব সম্পর্কে আমাদের অভিমত এই যে জমিদারের কাছারি কোনো সওদাগরি বা সরকারি কর্মশালার সঙ্গে আদৌ তুলনীয় নয়। ঐতিহাসিকভাবে জমিদার কাছারি জমিদারভবনের অংশ ও সেই ভবন যে-গ্রামে অবস্থিত তাহার সামাজিক কেন্দ্র। অনেক ব্যক্তি কোনো কাজ ছাড়াই জমিদারের কাছারিতে যায়। অনেক সময় সারাদিনই সেইখানে বসিয়া থাকে। যেহেতু বর্ণভাগ হিন্দুশাস্ত্র নির্ধারিত ও ইংরাজের আইনেও নিষিদ্ধ নয় সুতরাং হিন্দু নিম্নবর্ণের সহিত শাস্ত্রীয় ব্যবহারই করা হইয়া থাকে। সাম্প্রদায়িক বিধান প্রয়োগ করিয়া হিন্দুসমাজের উপসম্প্রদায়গুলিকে নতুন একটি সম্প্রদায়, যাহা তপশিলি জাতি বলিয়া কথিত, বলিয়া বিধিবদ্ধ করিয়া এখন বর্ণহিন্দু সমাজের শাস্ত্রীয় রীতিবিধি ধ্বংস করিবার ব্যবস্থা হইতেছে।
‘এই প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছিলেন স্বতন্ত্র নমশূদ্র এমএলএ শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও সমর্থন করিয়াছিলেন কলিকাতার নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সদস্য শ্রীমতী মীরা দত্তগুপ্ত।
‘মুসলিম লিগ কর্তৃক পরিচালিত একটি আইন সভায় নমশূদ্র সদস্য কর্তৃক উত্থাপিত এই প্রস্তাব বঙ্গপ্রদেশে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গৃহীত হইয়াছে। আমাদের দুঃখ কংগ্রেসের এক নেত্রী এই প্রস্তাব সমর্থন করিয়াছেন। ইহা অপেক্ষা অধিকতর দুঃখ এই যে আইনসভা সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছে। ইহা অপেক্ষাও অধিকতম শোকের কারণ এই যে আইনসভায় ১৪/১৫ জন ব্রাহ্মণ থাকা সত্ত্বেও এই প্রস্তাবের কোনো বিরোধিতা তাঁহারা করেন নাই।’
‘এইডা কী করছ ভাই? যারে বসাইব্যার লগে মাচা বাইন্ধাছ স্যায়রা বইসবে ঐ মাচায়?’ ডাক্তারের স্ত্রী বলে, ‘এইগুলা হইছে তোমাগ পায়ে পা দিয়া ঝগড়া—’
‘বসব না ক্যা? প্রথমে লজ্জা হইব, তারপরে বইসব। বইসব’, ডাক্তার বলে।
‘বসার কি সত্যি নিষেধ আছে ভাই?’
‘সিদ্ধ না নিষিদ্ধ সেডা জাইনব্যা কী কইর্যা বুন। নোয়াখালির অফিসার এক রিপোর্ট দিছেন। সেইডা হোম মিনিস্টার নাজিমুদ্দিন হাউসে প্লেস কইরল। ইচ্ছা কইরাই করছে। নোয়াখালিতে তো হিন্দু জমিদার কম, যা আছে তাও কাঁচকলাখাওয়া। সে-জমিদারের কাছারি বইল্যা কিছু আছে কী না তাও জানা নাই। আইন-মোতাবেক মধ্যস্বত্বভোগী। পত্নিদারের কাছে জমির বন্দবস্ত পতনি দিয়া অন্নে সংসার চালায়। জমিদার হইলেও তো বামুন। আর বামুনের তো ভিক্ষার অন্নে আপত্তি নাই। তেমনি কোনো-এক জমিদারের সেরেস্তায় বইস্যা ছিল—বামুন— জমিদারের বৌয়ের এক ভাইয়ের বেটা। জমিদারনি পিসির জমিদারি দেইখতে। একদিন সকালে এক বড় মুসলমান পানিদার কাছারি ঘরে ঢুইক্যা এক টিনের চেয়ারে বইস্যা কইছে, ‘আছে কেডা, ঠাকুরবেটা? ডাহো এডডু’। সেই ভাইয়ের-বেটা পনিদারকে ধমকাইয়া উঠে—তুমি চেয়ারে বইল্যা কেন? উঠো। পনিদার আসলে ঐ জমিদারের যারে কয় অন্নদাতা, তার এমন অনেক জমিদারি-অংশ পনি নেয়া আছে। অর টাহাতেই ঐ বামুন জমিদারের ভাত জোটে। তাও, সভায় হয়তো চেয়ারে বইসত না। ঘর খালি দেইখ্যা বইসছে। সেই ভাইয়ের-বেটা ঐ টিনের চেহারডা নিয়া বাইরে যায়। পনিদারও যায়। সেই ভায়ের বেটা সামনের পুকুরে চেয়ারডা ফেইল্যা নিজেও জলে নাইম্যা তিন ডুব দিয়্যা, চেয়ারডারেও তিন ডুব খাওয়াইয়া উইঠ্যা আসে। পনিদার হাইস্যা খুন——দেহো, ঠাকুর বেটার কাম!’ তারপর সে চইল্যাও যায়। এর পরে কী ঘটেছিল তা রিপোর্টে নাই। হবার পারে ঐ পত্নদারের মনের অপমান কাঠগুঁড়ার আগুনের নাগাল দগ্ধাইছে। হবার পারে পনিদার মজা কইর্যা কাউরে কইছে। সে যাই হোক, সন্ধ্যার আগে মুসলমান কৃষকদের এক বিরাট দল মশাল জ্বালাইয়া, হাতে বর্শা নিয়্যা, কাছের এক গঞ্জে চড়াও হইয়্যা বাইছ্যা বাইছ্যা হিন্দু মহাজনগো দুকান আর গুদাম পুড়াইয়্যা ছাই কইর্যা দ্যায় কিন্তু কারো গায়ে হাত দেয় নাই। এই রিপোর্ট হাউসে প্লেস কইর্যা একডা লাইনে মিনিস্টার্ কইল—এডাতেই পরিষ্কার হিন্দুরা কত তুচ্ছ কারণে মুসলমানদের অপমান করে একটা দাঙ্গা পরিস্থিতি পাকাইয়্যা তুলে। নাজিমুদ্দিন হয়তো ঐডুকই চাইছিল। আমি খাড়াইয়্যা এই প্রস্তাব কইল্যাম—থাউক রেকর্ড। মীরাদিদি উইঠ্যা সমর্থন দিলেন। এড্ডা কথাও আর-কেউ তোলে নাই।’
‘ভাই, এইডা তোমার যোগ্য কাম হয় নাই।’
‘কী যে কও উদ্দুরের মা, অযোগ্য কাম হইলে ঐ সভার অতগুলো মেম্বার চুপ কইর্যা মণ্ডলের প্রস্তাব মাইন্যা নিল?’
‘শোনো, কথাডা উইঠলে না মাইন্যা কী উপায়? কিন্তু কথাডা তো লজ্জার। লজ্জার কথা দুই কান হইলেও লজ্জা বাড়ে। কমে না।’
‘বুন, এই সব মিটিঙে কিছু কথা কইব্যার লাগে—প্রমাণ রাইখতে। তাই কওয়া। দেখ, না-কইলে মীরাদিদির মতন বিদ্বান পণ্ডিত তো খাড়াইতেন না। না কইলে তো পুরা মিটিং চুপ মাইর্যা যাইত না?
খুদ্দুর তখন দাদার মত করে একটি কাগজ চোখের সামনে মেলে কচি গলায় তারস্বরে পড়তে শুরু করেছে—
‘এত ঢক্কা—’
‘মামা, ঢক্কা কী?’
‘তারপরে কী আছে?’
‘নিনাদ। নিনাদ কী?’
‘দুইডা মিল্যা ঢাকের বাজনা।’
‘এত ঢক্কানিনাদের পর বাংলার মাননীয় গভর্নরশাহেব ফজজুল হককে নৈবেদ্যের কাঁচা কলা
করিয়া যে-মন্ত্রিসভা বাঙালিকে উপহার দিলেন, তাহা এক প্রকারের গজকচ্ছপ—’
‘মামা, গজকচ্ছপ কী?’
‘খানিকটা হাতি আর খানিকটা কাউঠা মিশাইয়া যে-জন্তু বানানো হয়—’
‘সানানো? না, সত্যিকারের?’
‘বানানো—’
‘মাটির? যেমন গণেশের ইঁদুর?’
‘ইঁদুরডা যে বানায় সেডা তো সত্যিকারেরই। তফাত সত্যিকারের ইঁদুর কিন্তু জ্যান্ত, আর বানানো ইঁদুর ইঁদুরেরই মত বটে কিন্তু জ্যান্ত হয় না।’
‘তাহলে গজকচ্ছপ সত্যিকারের কার মত?’
‘কারো মতই না। হাতি আর কচ্ছপের কি মিল হয়—ভাইব্যা দেখো।’
খুদ্দুরের মনে পড়ে সে হাতি দেখেছে, দুইবার—একবার চিড়িয়াখানায়, আর-একরার সিংহিবাগানের সার্কাসে। কচ্ছপও একবার দেখেছে বটে কিন্তু মনে করতে পারছে না সেটা জ্যান্ত না ছবি।
যোগেন বলে, ‘গজকচ্ছপ তো পুরানা খবর। পুরানা খবর পড়নে কাম কী? নতুন খবরের কি অভাব পইড়ছে?’
‘আমি তো তোমার খাতা থেকে পড়ছি।’
‘তোমারে পইড়তে কই নাই সোনা। খাতাডা দ্যাশে নিয়্যা যাব, কাইল, তাই নামাইতে কইছি।’
‘নিয়ে যাবে, আবার ফেরত আনবে তো?’
এরা তিনজন একসঙ্গে হেসে ওঠে। ডাক্তার বলে, ‘বুদ্ধিডা তো পাইকতেছে সুদখোর মহাজনের নাগাল—
‘ভাই, তুই মেম্বার হইছ বইল্যা বুকডা দশ হাত ফুলছিল। অ্যাহন তোমার কথাবার্তা শুইন্যা তো ডরে বুকের মইধ্যে ঢেঁকির পাড় পড়ে। কেউ ক্যান সবুর ধরে না?’
‘আরে, সবুর কইরলে যদি প্যায়রা পাইকত, তালি কি আর সবাই নাবাতি প্যায়রা কামড়াইয়া দাঁত ভাঙত?’ প্যারী সরকার নিজেই একটা তালি বাজায়।
‘এইডা তো ডাক্তার ঠিকই কইছে। সবাই ভাইব্যার ধইরছে—এই মহোচ্ছবই শ্যাষ মহোচ্ছব। হিন্দু আর মুসলমান দুইই ভাবে—স্যায় যদি মন্ত্রী না হয় তো শাহেবরাই থাউক, দেশ স্বাধীনের দরকার নাই।’
‘বামুনগো সতিনের যুদ্ধের নাগাল। সোয়ামিরে আমি যদি না পাই, তো পাইল্যাম না। ভাইবব, বিধ্বা হইছি। কিন্তু সতিন য্যান না পায়। দরকার হইলে সোয়ামির আর ঘরে নটী ঢুকাইব, কিন্তু সতিনে য্যান না পায়। দরকার হইলে সোয়ামির আর–একডা বিয়া দিব, কিন্তু সতিনে য্যান সোয়ামিক না পায়।’
‘ভালই কইছ বুন তবে কথাডা ন্যায্য না। বড় সতিনের তো আর বেশি খ্যামতা নাই। স্যায় শুধু পারে এক সতিনের জায়গায় দুই সতিন বানাইতে। বামনির যদি আমাগো সমাজের মাইয়াগোর নাগাল খ্যামতা থাইকত, তাইলে সোয়ামি সতিন আইনলে বৌ—একখান সোয়ামি আনত।’
‘এইডা কী কুকথা কও ভাই? এডা কি এড়া ভদ্দর সমাজের কথা?’
‘বু-ন, আমরা তো ভদ্দরসমাজ না, আমরা তো শুদ্দুর! আইনসভার দলাদলি সতিনের ঝগড়া না। ক্ষমতার লড়াই। এডডা আড়াই গণ্ডার জমিদারের যদি নজরে পড়ে কোনো শুদ্দুরের মাইয়্যা—তাইলে সেই মাইয়্যাডারে, বাঁচাইব্যার লগে তারে নিয়্যা পুরা একখান বাড়িভরা মানুষ রাতারাতি মেঘনার চরে নিরুদ্দেশ হইয়্যা যায় সারা জীবনের মতন। দ্যাহো নাই বুন?
বাইরে ট্র্যামের আওয়াজে এ-ঘরটা যে হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে—বোঝা যায়।
উদদুর-খুদদুরের মায়ের গলার ভিতর থেকে স্মৃতিময় ও আশঙ্কাময় এক হাহাকার বেরিয়ে আসছিল। সে সেটা গিলে ফেলে রুদ্ধ গলায় ডেকে ওঠে, ‘বন্ধু হে, বন্ধু।’
‘যোগেনও যেন ঘুমের ঘোরে বলে যায়—’স্যার ফারুকিরে মন্ত্রী কইরব্যা না, আর ফারুকি স্যার বুড়া আঙ্গুলখান চুইষ্যা চুইষ্যা কইড়্যা আঙ্গুল বানাইব?’
‘ফারুকি না হাইরল?’
‘হাইরল তো আইনসভার ভোটে। কাউন্সিল নাই? কাউন্সিলে তো পার্মানেন্ট মেম্বার? অগ হার নাই। তোমার শ্যামাপ্রসাদ ছাইড়া দিবে—তারে মন্ত্রী কর নাই—বাংলার বাঘের সুপুত্তুর? দেইখল্যাম-না সেইদিন? মন্ত্রী হওয়ার দরখাস্ত নিয়্যা নবাব আর মহারাজারা বামুনের শ্রাদ্ধের কাকের মতন সারি দিয়া বইস্যা আছে। নিজের কাছেও তো নিজের একডা মান থাহে। মন্ত্রী হইবার লগে এরা চুরি-ডাকাইতি জালাসাক্ষী সব কইরব্যার পারে বিশ্বাস কইরব্যা, আমার নিজের চক্ষুতে দেখা না হইলে আমি কইত্যাম না। তোমাগোই প্রথম আর শ্যাষ বলা। আমি তো ঐ শাহেব—লাটশাহেবের ভিড়ের মইধ্যে চিড়াচ্যাপটা। নড়নচড়নের উপায় নাই। লাটশাহেব এক-এক মন্ত্রীর নাম ডাকে আর হাততালি। আমার য্যান সন্দ হইল, লাটশাহেব য্যান একখান নাম বাদ দিলেন। এক মিনিট আগে-না ঠিক হইল সামসুদ্দিন মন্ত্রী হইব। আমারই মাথার উপর দিয়্যা রাজশাহি ডিভিশনের কমিশনারশাহেব লম্বা হাত বাড়াইয়্যা লাটশাহেবরে একডা কাগজ ধরাইল আর লাটশাহেব সেই কাগজ দেইখ্যা গড়গড়ায়্যা পইড়্যা দিলেন—নবাব মুশারফ হোসেন এর নাম তো একবারও শুনি নাই লাটশাহেবের ঘরে। হইলডা কী? মিনিটে-মিনিটে মন্ত্ৰীবদল?’
‘তুমি কি ভাইব্ল্যা, তোমারই কানের দোষ!’
‘ভাইবল্যাম তো. কিন্তু শুইনল্যাম যে
‘তুমি তো লাটশাহেবের আওয়াজ শুইনল্যা। কইল্যা যে, তোমার মাথার উপুর দিয়্যা লাটশাহেবরে এক কাগজ বাড়াইয়া দিল কুন শাহেব? সেই কাগজে কী লিখা ছিল স্যাড্যা তো তুমি দেহ নাই?’
‘দ্যাখব ক্যামনে? স্যায় তো রাজশাই ডিভিশনের কমিশনার। তার হাত তো প্রমাণসাইজের তিনগুণ লম্বা—’
‘অ তো একই কথা। কিংবা তুমিই প্রমাণ সাইজের তিনভাগ বাঁইটা—বাঁইট্যা হইলে তো তোমার দুইডা কানই শাহেব গ ঠোঁটের অনেক খান নীচে। মানে, তোমার আর সত্য ঘটনাডা জানার কুনো উপায় নাই। সাইজের দোষ। চোখডাও নীচে। কানডাও নীচে।’
‘আমার সাইজ দিয়্যা কি কথাডার কুনো আন্দাজ পাইল্যা ডাক্তার? ঘটনাডা কী হইছিল।’
‘ক্যা? এই যে এতগুলা মাস গ্যাল, শোনো নাই কিছু?’
‘আরে সেই কথাডাই তো রোজ একটা কইরা ফেবড়ি বাড়াইব্যার ধইরছে। শুনি— সামসুদ্দিনরে যে মন্ত্রী করা যাবে না সেডা হকশাহেবের জানাতে ছিল। শুনি—কথাডা নাকী হকশায়েবেরই, বুদ্ধিডাও তার। স্যায় নাকি লাটশাহেবরে কইছে—সামসুদ্দিনের মাথা ঠিক নাই, অ আমার পার্টির লোক হইয়্যাও আমারে ফ্যালাইয়া দিবে। শুনি—শাহেব গ—মানে, চেম্বারের শাহেব গ থিক্যাই নাকী কথাটা এতখান। সরকারি-ব্যাসরকারি সব শাহেব নাকী লাটশাহেবকে বলে, নো মুশরফ–নো গবমেন্ট। নতুন একডা মন্ত্রিসভা হইল। কিন্তু শাসকজাত বইল্যা শাহেবরা তো কিছুই পায় নাই। মুশারফও না থাইকলে, আমাগো নর্থ বেঙ্গল টি গার্ডেনস, টাইগার হানটিং, আদার প্লেজার্স-এসবের কী হব? তখন লাটশাহেবই নাকী এই কৌশল করেন।’ শাহেব অফিসাররা নাকী লাটশাহেবরে আলটিমেটাম দিছে—তারা হোমে ফিরে যাবে আর হোম থিকে কোনো সার্ভিসে নতুন কেউ আসব না। মুশারফও নাই, ফারুকিও নেই—এ-মন্ত্রিসভা দিয়া হবেটা কী? ‘অফিসারদের বিদ্রোহ।’
উদ্দুর-খুদ্দুর জোরে-জোরে পড়েই যাচ্ছিল। এদের কানে কিছু আসছিল, কিছু আসছিল না। ওদের একজন যখন থেমে যাচ্ছিল, তখন বরং এদের খেয়াল হচ্ছিল। তেমনি এক বিরতি দিয়ে থেমে উদ্দুর জিজ্ঞাসা করে, ‘মামা, চৌদ্দ দফা কী?’
‘এডার মানে তো বাবা কোথায় কে বলছে, তাই দিয়্যা ঠিক হয়। পড় এডডু—’
‘চৌদ্দদফার দফারফা। অবশেষে আইনসভার প্রথম দরবার শেষ হইল। মাহিনা দুই শাস্তিতে থাকা যাইবে। সেপ্টেম্বর মাসে আবার তলব হইবে. প্রজালিগ মন্ত্রিসভাকে এখন কোয়ালিশন- ভায়োলেশন মন্ত্রিসভা বলিলে কোনো গুনাহ্ নাই। চিরস্থায়ী বন্দবস্ত বা জমিদারি ব্যবস্থা সর্বপ্রথম তুলিয়া দেয়ার জবান দিয়া হকশাহেব ও প্রজাপার্টি কৃষক ও প্রজার যে-ভোট হাত করিয়াছিলেন, সেই কথা নিয়া কোনো সাড়াশব্দ হয় নাই। বরং বৈঠক শেষ হইবার আগে সদস্যদের জানানো হইয়াছে যে আগামী বৈঠকে ১৯২৮ সালে কাউন্সিলে ভূমিস্বত্ত্ব আইনের যে-সংশোধনগুলি হিন্দু জমিদার ও কংগ্রেসের ভোটে হারিয়া গিয়াছিল, সেইগুলি নতুন বিল হইয়া আসিবে। এ বঙ্গদেশে আবওয়াব সেলামি, আদায় ও ভূমিদরের চতুর্থ ভাগের উপর নির্ভর করিয়া যুগযুগান্ত হইতে সমস্ত পৃথিবীর কাছে হিন্দুদের যে-গৌরব প্রচারিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে সে-গৌরব চিরকালের জন্য অস্তমিত হইবে।’
‘এইডা আবার কেডা কয়? প্রথমে তো ঠেকছিল কংগ্রেস—’
‘ডাক্তার, গলা শুইন্যা মানুষ বা পার্টি চেনা, শিয়ালের রাও শুইন্যা শিয়াল বাছার থিক্যা ও কঠিন হইয়া গিছে। বলো—কুন পার্টি বুক ঠুইক্যা না বলে যে জমিদারি উচ্ছেদ হোক, কৃষকের দুঃখ দূর হোক, বেবাক মানুষ ডাইল ভাতড়া খাক। দ্যাহো ডাক্তার, সব পার্টির এক কথা কিন্তু কুনো পার্টি এক না। কংগ্রেসের তো যত মাথা তত দল। লিগের ইস্পাহানি, নাজিমুদ্দিন, সোরাবর্দি তিন দল—এ ওর দিকে পিছন ফিরা নমাজ পড়ে। প্রজাপার্টি যে কয় টুকরা তা গণনের বাইর। অ্যাডডা ইনডিপেনডেন্ট, অ্যাডডা ডিসিডেন্ট, অ্যাডডা মিনিস্ট্রিয়্যাল। আর শিডিউলগর মোট মেম্বার আমারে ধইর্যা ৩২ কিন্তু এডডাও পার্টি নাই। মন্ত্রী আছে তিনডা।’
‘দেখছ নি কাণ্ড। ভাই, তাইলে আমাগো হকশাহেবেরও কি কুনো পার্টি নাই, তোমাগ যদি তিনমন্ত্রী থাইক্যাও এড্ডা পার্টি না থাকে।’
‘বুন, তুমি কোন্ দেশের কইন্যা?’
‘বরিশালের।’
‘ডাক্তার কোন্ দেশের মানুষ?’
‘বরিশালের।’
‘হকশাহেব কোন্ দেশের মানুষ?’
‘বরিশালের।’
‘কইতে ক্যামন বুকডা ফুইল্যা উঠে না বুন?’
‘উইঠব না ভাই। বরিশাল ছাড়া দেশ হয়।
‘আছে কী বরিশালের—?’
‘মানুষ আছে, সাগর আছে, পোষা বাঘ আছে, এত খাল যা গুইন্যা শেষ করা যায় না–ভাই, বরিশালের মানুষের অসাধ্য কোনো কাজ আছে দুনিয়ায়?’
‘হয়। হকশাহেব অ্যাহন সেই খেলাই দ্যাখাইয়্যা বেবাক মানুষরে আটাশ খাওয়াইছে। চিরডা কাল সব মানুষ শুইন্যা আইসছে দুই নৌকায় পা রাইখতে নাই। হকশাহেব অ্যাহন শিক্ষা দিছেন—মানুষের তো পা দুইডা, দুইডা নৌকা নাইলে দুইপা যুবে কোথায়? তাই হকশাহেব লিগেরও প্রেসিডেন্ট, প্রজাপার্টিরও প্রেসিডেন্ট। দুইডার সিলই হকশাহেবের দুই পকেটে। যহন যেটা দরকার তহন সেই সিল লাগান। গোলমাল পাকাইতে হইলে সিলগুলা অদলবদল কইর্যা লাগান। কেউ যদি কয় একডা পার্টি ছাড়েন, সাফ জবাব লিগকে আমি খাজাগজার পার্টি কইরতে দিতে পারি না। একডা, আলাদা পার্টি ছাড়া বাংলার কৃষক-প্রজারে বাঁচাইব ক্যামনে?’
