৩৬. কংগ্রেস-হক আলোচনা
কোনো এক সময় হকশাহেবের হাসি নিশ্চয় থেমেছিল ও যা নিয়ে মিটিং তা নিয়েই কথাবার্তা শুরু হয়।
‘কী, করতে হবেটা কী?’ বিধান রায় একটু চড়া সুরেই বললেন।
‘যা করতে হবে, সেটা ডক্টর রায় থাকতে আমরা বলব কী করে? আপনি তো চোখ না-খুলেই দেখতে পাচ্ছেন কার শ্বাস উঠেছে আর কে জোয়ান হয়ে উঠেছে। এখন প্রেসক্রিপশনটা দিয়ে দিন, আমরা সেই অনুযায়ী রোগীর দেখাশুনো করি। যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই ভাল’, বলে বসলেন নৌসের আলি।
বিধান রায় রেগে গেলে লম্বা ঘাড়টা নামিয়ে কথা বলতেন। এমনিতেই ওঁর কথাবলার বাঁধুনি নেই, ইংরেজিতে নয়, বাংলাতেও নয়। তার ওপর বাংলাকে উনি চেনেনও না ঠিকঠাক–কে কোথাকার কেমন লিডার সে খবরও গোলমাল করে ফেলেন। তার ওপর তাঁর বিরোধী যাঁরা কংগ্রেসে, তাঁরাই এখন প্রদেশ কংগ্রেসের সর্বেসর্বা—শরৎ বোস, কিরণশঙ্কর রায়, প্রফুল্লঘোষেরা। প্রদেশ কংগ্রেসের রাজনীতির ওপর সুভাষ বোসের নিয়ন্ত্রণই প্রধান। তার ওপর বিধান রায় নিখিল ভারত কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির মুখপাত্র বলেই বাংলার রাজনীতিতে পরিচিত।
বিধানবাবু তাঁর ঘাড়টা নামিয়ে কী একটা কথা বললেন, যার মানে কেউই বুঝল না, ‘পেশেন্ট কে আউটডোরে না ইনডোরে সেসব তাহলে বলা হোক।’
অস্বস্তি কাটাতে শরৎ বোস একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নেন, বিধান রায়ের হেনস্তটা ততক্ষণে সবার কাছেই পরিষ্কার, শরৎ বোস বললেন, ‘ডক্টর রায় জানতে চেয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেসের কাছে আপনারা কী চাইছেন? কী করতে হবে আমাদের?’
‘এইডা একডা জবর কথা কইলেন বোসশাহেব। এক বিয়াতি মাইয়্যা পোয়াতি হইয়্যা বাপের বাড়ি আইসছে। তার যহন অ্যাহন-তহন, তার পাইল ঘুম। স্যায় তার মায়েরে ডাইক্যা কয়, মা রে, আমার বড় ঘুম পায়, আমি ঘুমাই, আমার প্রসববেদনা উইঠলে আমারে ডাইক্যা দিও।’
কথাটাতে বেশ বড় হাসির একটা রোল উঠে থেমে গেল। বলেছিলেন মুক্তাগাছার মেম্বার আবদুল করিম। তাঁকে বিধান রায় চেনেন না অথচ তিনি এত উঁচু গলায় বিধান রায়কে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন যে তাঁকে না-চেনা যায় না। বিধান রায় তাঁর দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করলেন।
নৌসের আলি বলে দেন, ‘মুক্তাগাছার মেম্বার, আমাদের, আবদুল করিম।’
তুলসী গোঁসাই ইংরেজিতে কিছু একটা বললেন, চাপা স্বরে। কিরণশঙ্কর হেসে উঠে ডক্টর আমেদকে বললেন, ‘এই-যে ডক্টর আমেদ, মিস্টার গোস্বামী বলছেন কী, ক্যাপস আর মোর দ্যান ফ্ল্যাগস—টুপিতেই নাকী চেনা যায় কে কোন পার্টির। নামাজিয়া টুপিতে প্রজা পার্টি আর গান্ধী টুপিতে কংগ্রেস যোগেন বলে বসে, ‘হোয়াট হ্যাপেনস টু দি বিয়ার হেডেড লাইক আস?’ যোগেন যে খুব ভেবেচিন্তে কথাটা বলেছে, তা নয়-মুখে এসে গেল, বলে দিল। ইংরেজিতে এসে গেল। ইংরেজিতেই বলল, তাই। এগুলো হচ্ছে ওকালতির অভ্যাস।
যোগেনকে যে সবাই খুব চেনে তা নয়, তবে চিনে ফেলল তার তৎপরতায়। শরৎ বোস বলে ওঠেন, ‘আপনাদের তো কোনো সমস্যাই নেই। দুই পকেটে দুটো টুপি রাখবেন—গান্ধী আর নামাজিয়া। যখন যেটা দরকার পরে নেবেন।’
হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘আরে, রাখছিলই তো দুইখান টুপি দুই পকেটে। আরো একখান থুইছিল বুকপকেটে—লিগের চাঁদতারা। পিরানের যেইডা লুকানা পকেট—তাওতেও তো ছিল ন্যাশনালিস্ট। ন্যাশনালিস্ট হিন্দু হইলে হিন্দু, মুসলমান হইলে মুসলমান।’
‘পকেট তো বেড়েই যাচ্ছে। অসুবিধে কোথায়?’ বিধান রায় অপ্রাসঙ্গিক বলেন, সম্ভবত এই আলোচনায় তাঁর একটা ভূমিকার সাক্ষ্য তিনি রাখতে চাইছিলেন।
‘ডাক্তার, পকেট তো বাড়েই। পকেটের মাল তো তাতে বাড়ে না। খুচরা পয়সায় হাজার টাকা দিলে কি আর পিরানের পকেট সামলাইব্যার পারে? দ্যান, এড়া হাজার টাকার একখান নোট, এক পকেটের কোণায় পইড়্যা থাকব—গেল রাত্তিরের খুলনা এক্সপ্রেসের টিকিটের লাগান। নলিনী সরকার বলে ওঠেন, ‘তোমাদের কথা চালাচালি তো কোনোদিনই শেষ হবে না। কথায় কখন আসবে?’
হকশাহেব হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘কথাই তো গড়াব্যার ধইরছে নলিনীদা। রাগেন না!’
‘কী কথা গড়াচ্ছে। কংগ্রেস আর কেপিপি-র মন্ত্রিসভা হবে কোন্ কাজের ভিত্তিতে। তোমরা তো কথা বলেই যাচ্ছো। কেউই তো কারো কোনো কথাই বুঝছ না।’
‘ক্যা নলিনীদা। কে কী বুইঝব্যার চাইল কিন্তু পাইরল না? কোন্ কথা কেডা বোঝে নাই, কন।’
‘এই তো তোমার মেম্বার, ডক্টর রায়কে কী বললেন, ডক্টর রায় কি তার কিছু বুঝলেন?’ আবদুল করিম বলে ওঠেন, ‘আমি তো না-বোঝনের কিছু কই নাই। জন্মকাল থিক্যা শুইন্যা আসছি, আম্মাজান কয়—চল্, তোরে বিধান রায়রে দেখ্যায়্যা আসি। কবরাজের উপর রাগ হইলে আব্বা কয়—আইলেন আমার বিধান রায়। আমি তো জাইনত্যাম, বিধান রায় একখান লাল সিগন্যালের নাম—রেলগাড়ির ইস্টেশনের। খাড়া থাহে না।’ আর এহানে আইস্যা দেহি—বিধান রায় নাকী একখান মানুষ? সিগন্যালরে মানুষ হবার দেইখলে আটাশ কইরা হাঁ হয়্যা খাড়াব না?’
‘অ্যাহন তো তোমার হাঁ হওয়া শ্যাষ হওয়ার কথা। অ্যাহন মুখখান বন্ধ করো, চক্ষু দুইডা খোলা রাখো।’
‘হ্যাঁ, হকশাহেব তাহলে বলুন। মানে, আপনাকে প্রাইম মিনিস্টার রেখে আমরা দুই পার্টি ও নিশ্চয়ই স্বতন্ত্র মেম্বাররাও অনেকে আসবেন, একটা সরকার তৈরি করতে পারি। তার জন্য তো একটা যুক্ত প্রোগ্রাম চাই। তাহলে প্রোগ্রাম নিয়েই কথা শুরু হোক,’ শরৎ বোস মিটিংটাকে বিধান রায় থেকে তাঁর দিকে ঘুরিয়ে নিলেন।’
‘যদি আপনারা মেম্বারের সংখ্যায় ঠিক করতে চান, তাহাইলে কংগ্রেস নিশ্চয়ই প্রাইম মিনিস্টারের পোস্ট চাইতে পারে। তেমন কিছু হইলে আমরা কংগ্রেসকে সাপোর্ট দিব কিন্তু সরকারে যাব না’—হকশাহেব বলেন।
‘এ-প্রস্তাবটা আপনি না দিলেই পারতেন, হকশাহেব। আপনি তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ। ধরুন, আপনি যদি আজ কংগ্রেসের হয়ে এই বৈঠক করতেন, হতেও তো পারত, আপনি তো আর বাঙালির স্বার্থ অবাঙালি লিগের কাছে বিকিয়ে দেননি, তাহলে আপনি কি এমন একটা সরকার তৈরি করতে রাজি হতেন, যে-সরকারকে টিকে থাকার জন্য সব সময় সমর্থক পার্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। সেই সমর্থক পার্টির কোনো দায়দায়িত্ব নেই কিন্তু ভেটো ক্ষমতা থাকল?’ শরৎ বোস বেশ ঠান্ডা গলায় বললেন।
কিরণশঙ্কর বলে উঠলেন, ‘মানে আমরা কংগ্রেসে ৯৩ ধারায় গভর্নরের আইনসভা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতার বিরোধিতা করছি। আপনাদের প্রস্তাব মেনে যদি আমরা একটা সরকার করি আর আপনারা বাইরে থাকেন তাহলে আপনারাই তো ইচ্ছে মত ৯৩ ধারা করে সরকার, ফেলে দেবেন।
‘হোয়াট ডু ইউ মিন কিরণ? ইজ দি কংগ্রেস ইনটারেসটেড ইন ফর্মিং দি গবমেন্ট?’ শরৎ বসু কথাটা শুরু করেন কিরণশঙ্করের দিকে তাকিয়ে কিন্তু শেষ করেন বিধান রায়ের দিকে তাকিয়ে, দুই ভুরুর মাঝখানে গভীর দাগ ফেলে।
প্রদেশ কংগ্রেসের তো বার রাজপুত তের হাঁড়ি। এমনিতেই তো–নির্মল চন্দ্ৰ, তুলসী গোঁসাই, কিরণশঙ্কর রায়, নলিনী সরকার আর সুভাষ-শরৎ। সুভাষ এখন ইয়োরোপে। শরৎ বোস বছর খানেক হল জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি শরৎ বোসের ঘাড়ে চড়ে আইনসভার এই প্রথম ভোট পার হতে চেয়ে তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেসের সর্বময় কর্তা করে দিয়েছে। এদিকে অস্থায়ী সভাপতি, অন্যদিকে পার্লামেন্টারি বোর্ডেরও বেশ মাতব্বর মেম্বার। অথচ বিধান রায় বরাবরই হাইকম্যান্ডের লোক। প্রদেশ কংগ্রেস আর ওয়ার্কিং কমিটির ঝগড়া কাগজের নিত্য খবর। শরৎ বোস টের পেয়েছিলেন, যে বাংলায় কংগ্রেসকে যদি ভোট পেতে হয়, তাহলে কংগ্রেসকে হিন্দু ভোটের ওপরই সবটা নির্ভর করতে হবে। কিন্তু কংগ্রেসের হিন্দুভোটেই ফাটল ধরে গেছে। যে-আইনের জোরে ভোট হচ্ছে তাতে মুসলমানদের জন্য রিজার্ভ সিট আছে। হিন্দুদের মধ্যে শিডিউল্ড কাস্টের জন্যও রিজার্ভ সিট আছে—সেও গেছে হিন্দুদের কোটা থেকেই। ফলে ‘সাধারণ’–আসন নামে ৭৮ হলেও, তার ৩০টিই শিডিউল্ড কাস্টের জন্য রিজার্ভ। তাহলে খোলা-আসন, মানে, যার ইচ্ছে সে-ই দাঁড়াতে পারে, হয়ে গেল ৪৮। এই ৪৮টি আসনই মাত্র খোলা থাকল—বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকদের জন্য। এঁরাই ছিলেন সারা বাংলায় কংগ্রেসের ভিত। এঁদের ঘর থেকেই ছেলেরা সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ফাঁসি গেছে, দ্বীপান্তরে গেছে, জেল খাটছে দেউলি আর বক্সার বিশেষ বন্দী শিবিরে। যারা কংগ্রেস বানাল, কংগ্রেস করল, যারা বন্দেমাতরম্ শেখাল, খদ্দর পরল, যারা বুকে সাহস বেঁধে সাত বছর ধরে নিজেদের বাড়ির বাইরের আঙিনায় জাতীয় পতাকা তুলে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করেছে ২৬ জানুয়ারি, জিলায় জিলায় মহকুমায় মহকুমায় যারা কংগ্রেস ভবন তৈরি করল, অনেকেই খদ্দর পরল, ছেলেমেয়ের বিয়েতে অচ্ছুৎদেরও নেমন্তন্ন করল—তাদের জন্য বরাদ্দ ২৫০-র মধ্যে মাত্র ৫০টি আসন। আর, যারা কিছুই করল না-লুঙি পরে নামাজ পড়া ছাড়া, দশ গাঁ ঘুরলে যে-মুসলমানদের মধ্যে একটা ম্যাট্রিকুলেট পাওয়া যাবে না, যারা খেতে না পেলেও অন্তত চার-পাঁচটি বিয়ে করে, দেশের নাম বললে যারা মক্কা শরিফ বলে, যারা সূর্যোদয় না দেখে সূর্যাস্তের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে—সেই মুসলমানদের জন্য ১১৭টা আসন সংরক্ষণ? বাকি নয়টা দিলেই তো ওরা একা-একাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারত। হবেও তা। চাঁড়াল-শুদ্দুরদেরও তো ৩০টা আসন। দশটা টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেই তো ওরা মুসলমানদের পক্ষে চলে যাবে। কোথায় রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ—কোথায় আজ তোমাদের বাংলা?
এইই ছিল হিন্দু-ভদ্রলোকদের মত। তাঁদের মধ্যে যাঁরা জনসংখ্যার অনুপাতে আসনসংখ্যার নিয়ম জানতেন—তাঁরাও বিশ্বাস করতেন ও বলতেন ভেড়া থাকে পাল বেঁধে আর বাঘ থাকে একা—বাংলার হিন্দুপ্রতিভার সঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা দিয়ে কোনো তুলনা করা যায়?
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ঘোষণার পর সরকারের কাছে এক স্মারকপত্রে আরো অনেকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, এশিয়াটিক সোসাইটি-কলকাতার সভামুখ্য, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, প্রফুল্লচন্দ্র রায় সই দেন। তাতে বলা হয়—মননে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে বৃত্তিতে, ব্যবসায়ে এই প্রদেশের হিন্দুরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে। তারা সংখ্যায় কম হতে পারে কিন্তু শিক্ষিত জনসাধারণের ৬৪ শতাংশ।
