1 of 4

২৪. সরষের তেল ও বেগুনের কাঁটা

২৪. সরষের তেল ও বেগুনের কাঁটা

যোগেন হাঁটতে থাকে। তার দু-হাতে, দেয়ালে দরজায় ও মাথার ওপরে হকশাহেবেরই প্রতীক, ‘লাঙ্গল’। এই পোস্টার ধরে শহরে ঘুরতে থাকলে সে একরকম পৌঁছে যাবে। আর-একটা উপায় হল—কোথাও কারো সঙ্গে কথাটা তুলে ফেলা, তারপর জেনে নিয়ে চলে যাওয়া। ব্যাপারটা যদি এত সহজ হত, তাহলে কী আর যোগেনকে স্টিমার থেকে নেমে এমন হাঁটতে হয়। ঠিক যখন একটা টমটমকে থামাবে বলে দাঁড়িয়েছে, তখনই টমটমটা দাঁড়িয়ে পড়ল—

‘বাবু, যাবেন নি, এইদিকে?’ টমটমওয়ালাই জিজ্ঞাসা করে।

যোগেন তাকিয়ে দেখে, পেছনের একটা সিট খালি। টমটমে বসে চারজনই, বাচ্চা থাকলে এঁটে যায়। যে এঁটে যাচ্ছে সে সত্যি-সত্যি বাচ্চা কীনা অনেক সময়ই এ নিয়ে প্যাসেঞ্জার আর ঘোড়াওয়ালার ঝগড়া বাধে। ওজনের একটা নিয়ম মানতে হয়, সামনে বেশি ওজন হয়ে গেলে ঘোড়ার কাঁধে চাপ পড়ে। মাঝরাস্তায় কেউ উঠলেও, সে ভারী হলে, নেমে-উঠে প্যাসেঞ্জারদের ওজন বেঁটে নিতে হয়, নতুন করে। টমটমের পেছনেই একটা জায়গা খালি। নিজের ওজন নিয়ে যোগেনের তাই দ্বিধা হয় না। সে উঠে বসে পড়ে। যোগেনের মুখ টমটমের পেছন দিকে আর ঘোড়াওয়ালার মুখ টমটমের সম্মুখ দিকে।

যোগেন তার চোখের সামনে রাস্তার লম্বা হয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়েই বলে, ‘পটুয়াখালিত কি নাম-ঠিকানার বালাই উইঠ্যা গিছে। ঘোড়া যেহানে নিয়্যা যায় সেইডাই কি যাওনের জায়গা হয়?’

‘ঘোড়ায় কি এডডু খবর রাখে না? যাবেন তো হকশাহেবের বাড়ি আর ফেরার ইস্টিমার তো সন্ধ্যায়। আপ না ডাউন—সেইডা ঘোড়া অ্যাহনো জানে নাই’—টমটমওয়ালা তার মুখের সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে।

যোগেনের মুখভরা হাসিটায় ধরা পড়ে যাওয়ার মুগ্ধতা ছিল। গাড়োয়ান আর সে তো উলটো মুখে। যোগেন যখন হেসেই ফেলেছে তখন তো কারো দিকে তাকিয়ে তাকে হাসতে হয়। তার পাশে বসা শাদা নুর, গেঞ্জি আর লুঙিপরা মানুষটি যেন জানেই—এবার যোগেন তার দিকে ঘাড় ঘোরাবে। সে-ই আগে ঘাড় ঘুরিয়ে ও হেসে যোগেনের হাসিটা নিয়ে নেয়।

যোগেন আবার গড়ানো রাস্তার লম্বা হয়ে যাওয়ার দিকে মুখ করে বলে, ‘হকশাহেবের বাড়ি কি সব ঘোড়ারই সমান দূরে? ভাড়ার কমব্যাশ নাই?’

গাড়োয়ান যেন তার ঘোড়ার সঙ্গে কথা বলছে, এমন নিচু স্বরে বলে, ‘জীবনে আর টাহাপয়সা দিয়্যা হয়ডা কী বাবু?’

যোগেন এ দার্শনিকতা চেনে। অন্য কোনো কথায় যেতে চাইছে।

‘না। হইবড়া কী? হেই সর্য্যার ত্যাল কিনব্যার লাগে। না অইলে ভাতে আর বেগুনপোড়ায় মাখামাখি হয় না।’

‘এইডা একডা দশকথার এককথা কইছেন, বাবু। পয়সা লাগে তো ঐ বেগুনপোড়াড়া মাখার লগে। ধান আছে খ্যাতে, বেগুন আছে মাঠে—ফিরি, ফিরি। শুধু ত্যালের পয়সাডা হইয়্যা গেলে, যারে, বোয়াল, তোরে ছাইড়্যা দিব।’

‘ঘোড়ার নাম থুইছেন বোয়াল?’

‘না, বাবু, রাঘববোয়াল।

‘অ। নামের মতলবড়া শুনা যায়?’

‘মতলবড়া কওয়ার জন্যই তো নাম থুছি। ভোটের আগে তো ওর নামানামি ছিল না। অরে আর ডাইকব কেডা?’

‘অ্যাহন ডাকে কেডা?’

‘ডাকেই না যহন, নামখান বড়ই থাকুক। অ্যাহে নবাব, তায় ছার, তায় খাজা, স্যায় নাজিমুদ্দিন যদি পটুখালির মজা জলে এই শীতকালে খাবি খাইল যহন, তহন আমার ঘোড়ার নাম রাঘববোয়াল রাইখব না ক্যান? সব্বাইয়ের ফূর্তি কি একরকমের হয়?’

‘অ। ঘোড়ায় জানে তো তোমার ফূর্তি?’

‘ফিরি। ফিরি। আপনারা আইসছেন হকশাহেবরে ভক্তি দিতে। আপনাগ কাছে পইসা নিয়্যা সইরষার ত্যাল কিনলে বেগুনের কাঁটা গলায় বিধব। ফিরি ফিরি।’ এত বড় একখান জয় আর নারান মিয়া টমটমে এক অতিথ মানুষকে ফিরি টিরিপ দিবার পারব না, বাবু?’

‘কইলডা কে যে পাইরবা না?’

‘না। কবে আর কেডা? আমিই কই? নারান রে, এই-যে ল আর ল-এর লড়াইডা গেল তাতে তুই কী করলি রে নারান? কথাডা যহন মনের ভিতর খাবলা মাইরব্যার ধইরছে, হাঁড়িতে জিয়ান্ মাগুর মাছের নাগাল, তহন বুদ্ধিডাও খ্যাল্ল–মাথায়—ঢাকার নবাবশাহেব যদি ফিরিতে আমাগ নবাবি খানা খাওয়াইতে পারে, তাহালি, নারান, তুই ক্যান হকশাহেবের অতিথদের ফিরিটিরিপ দিব্যার পারবি না? যার যাতে নবাবি—আমার নবাবি এই টমটমডা আর আমার ঘোড়াড়া। তাহাইলে এইডা কেন ফিরি দিব না? জানেন তো নবাবিখানার পেরস্তাবড়া?’

‘কইলেন কনে যে খানা শুইন্যাই আশ মিটাব?’

‘ক্যা? আপনি যে দ্যাশ থিক্যা আলেন, সেহানে এই পেরস্তাবড়া পৌঁছায় নাই? ‘ ‘কই? শুনছি বইল্যা তো পছন্দ হয় না।’

‘আরে বাবু, এইডা না শুইন্যাই পটুয়াখালি আইছেন? শুনেন। শুইন্যাও সুখ, কইয়্যাও সুখ। এই-যে আমাগো লবাব খাজা, স্যায় তো ঢাকার লবারের বোনাই না খালা। স্যায় ঢাকার লবাব যহন খবর পাইল তার বোনাই-না-খালা লবাবের গাঁড় দিয়্যা লাঙ্গলের ফাল ঢুকতাছে, তহন, বজরা কইর‍্যা আইস্য্যা রোজ-রোজ মহোচ্ছব খাবার ডাইকল আমাগ। নবাবিখানার মহোচ্ছব। তা ঢাহার লবাব খাওয়ার শ্যাষে কইল, ‘ভোটটা খাজারে দিয়ো বাপরা।’ আর আমাগ থিক্যা জব হইল—তাই কি হয়। লাঙ্গল হক খাড়াইছে বইল্যাই তো খানা দিলেন হুজুর। এই খানা কি ছাড়া যায়? লাঙ্গল জিতলে বড়খানা দিবেন।’

এক মোড়ে, ‘হে-ই খাড়া’ বলে ঘোড়াটিকে দাঁড় করিয়ে ঘাড় না ঘুরিয়ে টমটমওয়ালা বলে, ডানহাতের রাস্তাটা দেখিয়ে, ‘যান গা—সিধা, দুই পা। ফেরার টাইমে দেইখবেন এইহানে খাড়ায়্যা আছি। চক্ষু দুইখান যদি বোজা দ্যাহেন, এডডু ডাক কইরবেন, বাবু। লাগব না অবিশ্যি ডাইকব্যার, আমি একচক্ষু খুল্যাই ঘুমাই। ভাইববেন না। ফেরার সময়, পাবেন আমারে।’

হকশাহেবের বাড়ির রাস্তাটা ধরতেই যোগেন একই সঙ্গে হঠাৎ নিজের ওপর আর টমটমওয়ালার ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। যেই বুঝেছে, বাইরের লোক, অমনি তাজ্জব বানানোতে মেতেছে! আর, যোগেনের কাল হয়েছে—এই ধুতিপাঞ্জাবি। হিন্দুবাবু ছাড়া কেউ ধুতিপাঞ্জাবি পরে? যদি শুধুই হিন্দু হয়, বামুনও হয়, কিন্তু বাবু না হয়, তাহলে সে খালি গায়ে থাকতে পারে, একখান নিমা কাঁধে ফেলে রাখতে পারে, একখান শাদা উতরি কাঁধে ফেলে রাখতে পারে কিন্তু গামছা নয়, গামছাও থাকতে পারে, ভেজা রোদে মাথায় দিতে। কিন্তু পাঞ্জাবি পরে এক বাবু ও হিন্দু। সেই ধুতিপাঞ্জাবি দেখেই টমটমওয়ালা তাকে বাতচিতের খেলা দেখায়, ধরে নেয় হদ্দ বোকা। আর যোগেনের কাণ্ডটা কী? ধুতিপাঞ্জাবি পরে আর হকশাহেবের বাড়ি খুঁজে পায় না? কিন্তু যোগেন পরবেটা কী? কোন্ পোশাকে সে বোঝাতে পারে—সে হিন্দু বটে কিন্তু ভদ্দরলোক না। বার লাইব্রেরিতে তো শাদা প্যান্ট-কালো কোট—এই একটাই পোশাক। গ্রামেও, যা হোক একটা কিছু, পরে নিলেই চলে। শহরেবন্দরে ঘোরার মত তার কোনো ঠিকঠাক পোশাক হয় না। কলকাতায় তো আরো হবে না। যোগেন ধুতির সঙ্গে একটা হাফ বা ফুলশার্ট পরে না কেন—তাহলে তো লোকে তাকে হিন্দু ভাববে, বাবু ভাববে না। কিন্তু সে পাঞ্জাবি না পরলে তার সমাজের লোকদের মনে মান বাড়বে কী করে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *