৪৫. নবাব ফারুকির প্রস্তাব : স্যার রহিমকে মন্ত্রিসভা গড়তে ডাকুন
১ এপ্রিলই তাঁর মন্ত্রিসভা তৈরি করে গভর্নর অ্যানডারসন ঠাট্টাতামাশার পাত্র হতে চাননি। কিন্তু তিনটি ঘটনার ফলে তিনি আর দেরি করতে পারেননি। প্রথম কারণটা হল এপ্রিল থেকে সরকারের আর্থিক বছর শুরু। অন অ্যাকাউন্ট একটা বাজেট বা টাকা বরাদ্দ না করলে নতুন আইনে সরকারের সমস্ত লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। গভর্নর হয়তো বিশেষ ক্ষমতায় একটা বরাদ্দ চালু করতে পারতেন কিন্তু বিশেষ করে বাংলার রাজনীতিতে তাহলে আগুন জ্বলে উঠত। ভোট করে আইনসভা তৈরি হওয়ার পর গভর্নরের প্রথম কাজ বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার? একে এখন কংগ্রেসের ভিতর নানা ধরণের সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্টরা গিয়ে ঢুকেছে। তারাও অনেকে শিক্ষিত ভদ্রলোক, জমিদারদের ছেলে, বিলেতফেরত ও ব্যারিস্টার। বাংলায় কংগ্রেসের যে অষ্টবক্র দশা তাতে কোন্ নেতা কোন্ নেতার বিরুদ্ধে কী ঘোঁট পাকাচ্ছে—সেটা আন্দাজ করাও অসম্ভব। শরৎ বোস এইসব সোস্যালিস্ট—কমিউনিস্টদের তোল্লা দিতে পারে। জুটমিলগুলিতে স্ট্রাইকের কথা উঠেছে। তার ওপর প্রজা পার্টির আবার একটা ভাগ আছে, তারা লিগের সঙ্গে এই কোয়ালিশনে খাপ্পা। প্রজাপার্টির আর কংগ্রেসের নানারকম কৃষক সভা ও কৃষক সমিতি আছে। দুই পার্টিরই কৃষক সভার আঞ্চলিক নেতা আছে। প্রজা পার্টির নেতারা সত্যিই সেখানকার লোক ও জোতদার। মাইনে করা কিছু কর্মীকে কংগ্রেস এক-একটা অঞ্চলে কৃষক সভা তৈরির কাজে বসাচ্ছে। কংগ্রেসের কৃষক বলতে তো জমিদার। তারা তো আর কৃষক সভা করবে না। কংগ্রেস কৃষকদের বলবেই-বা কী। কংগ্রেস কী বলবে সেটা ঠিক করছে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া রাজবন্দীরা—যারা টেররিস্ট হয়ে জেলে ঢুকে কমিউনিস্ট হয়ে জেল থেকে বেরচ্ছে বা নজরবন্দী হয়ে দূরের গ্রামে থানার নজরদারিতে আছে। কোন্ গ্রামে এক স্বদেশী নজরবন্দী হয়ে আছে—রাতে চৌকিদার একবার হাঁক দিয়ে তার ওপর নজর রাখবে? তাঁর না-হয় যাতায়াতে নিষেধ আছে, তাঁর কাছে তো লোক আসায় বাধা নেই। ফজলুল হক তো ‘জমিদারি ব্যবস্থা বেআইনি করো’, আর, ‘লাঙল যার জমি তার’–এই দুই আওয়াজকে আইনি করে দিয়েছেন। তাঁর আরো সাতসতের দাবিদাওয়ার মধ্যে ততটা খেয়াল করা হয়নি যে কংগ্রেসের ভিতরকার কমিউনিস্টরা আওয়াজ দুটো ঠোটে নিয়েছে আর এই আওয়াজদুটো থেকে ভোট ঝরিয়ে দিয়ে যতটা সম্ভব গ্রামের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে—দেশান্তরী টিয়াপাখির ঝাঁক যেমন এক দেশের ফসলের বীজ আর-এক দেশের মাটিতে ফেলে যায়। নোয়াখালি, দিনাজপুর, মেদিনীপুর আর ত্রিপুরায় এসব আওয়াজ ছড়াচ্ছে। মেদিনীপুরে কংগ্রেস-নেতারাই কৃষকদের নিয়ে মিটিং করছেন। বাংলার প্রদেশ-কংগ্রেস থেকে মেদিনীপুর বরাবরই আলাদা। তারাও প্রদেশকে পাত্তা দেয় না আর তাদেরও প্রদেশ পাত্তা দেয় না। টেররিস্ট আন্দোলনও মেদিনীপুরে সবচেয়ে জোরালো হয়েছিল—পরপর ১২ জন এসপিকে তারা মারে। এখন ভোটের পরও যদি গভর্নরকে বিশেষ ক্ষমতায় বাজেট বরাদ্দ করতে হয় তাহলে এই একটা হুকুমেই কলকাতার চটকল থেকে নোয়াখালির কৃষক পর্যন্ত এক করে দেয়া হবে—কংগ্রেসের তাহলে পোয়া বার।
১ এপ্রিল, অল ফুলস ডে হওয়া সত্ত্বেও এই দিনই যে মন্ত্রিসভা তৈরি করা হল তার দ্বিতীয় কারণ—লাটশাহেব তাঁর নিজের লোকজনের কাজ থেকে খবর পাচ্ছিলেন যে মন্ত্রিসভা নিয়ে অনিশ্চয়তাটা দিনেদিনেই পাকিয়ে উঠছে। লেখাপড়া করা, রাজনীতি বোঝা সব লোকই তো হিন্দু। হিন্দু ভদ্রলোক। তারা কেউ মন থেকে মেনে নিতেই পারছে না যে তাদের একটা মুসলিম সরকারের অধীনে থাকতে হবে। হ্যাঁ, আগেও মন্ত্রিটন্ত্রি থাকত কিন্তু সে তো ছিল কাউন্সিল। কারো কাছে কারো কোনো দায়িত্ব নেই। সবার ওপরে ছিলেন লাটশায়েব। তিনি হ্যাঁ না-বললে কোনো হুকুমই হুকুম না, কোনো আইনই আইন না।
লাটশাহেব নিজেও টের পাচ্ছিলেন—ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাটা যাতে না হতে পারে, তার জন্য গোপনে একটা চেষ্টা চলছে—একটা চেষ্টা নয়, একাধিক চেষ্টা—কিন্তু লাটশাহেব বুঝতে পারছিলেন না—যাকে একাধিক চেষ্টা ভাবছেন সেটা আসলে এক চেষ্টারই দুই কায়দা নাকী! তাঁর সঙ্গে একদিন ত্রিপুরার স্যার ফারুকি দেখা করতে এল। ফারুকির সঙ্গে সব লাটশাহেবেরই ভাবসাব থাকে। খুবই কাজের লোক। খেলাধুলোয় ফূর্তিফার্তিতে আছে। কেউ বলতে পারবে না, ফারুকি তার লোক। নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কারো স্বার্থে কোনো কাজ করে না। ফারুকি এসেই মজা করে বলল, ‘স্যার, আপনি চাইলেই কি আর সব মুসলমান মিলে একটা পার্টি করবে? ইলেকশনের আগেই আমি বলেছিলাম—হিন্দুদের একটা কংগ্রেস আছে বলেই কি আর মুসলিমদের একটা পার্টি হতে পারে? ওরা কদিনের পার্টি!’
লাটশাহেবও মজা করেই বললেন, ‘মুসলিম লিগ তো কংগ্রেসের চাইতে মাত্র ২১ বছরের ছোট।’
‘২১ বছর তো একটা জেনারেশন স্যার। ২১-এ তো সাবালক। আমাদের মুসলিমদের তো ২১ বছরে দুটো বাচ্চা পয়দা না করলে ছেলের আবার সুন্নত করতে হবে। তার ওপর দেখুন, কংগ্রেসের বয়স তিরিশ হতে-না-হতেই আফ্রিকা থেকে এক গান্ধী আমদানি করল।’
এ-কথায় কারোপক্ষেই না-হাসা সম্ভব নয়, ‘মিস্টার ফারুকি, আপনার সঙ্গে নিভৃতে দেখা করা খুব বিপদের। এ-কথা কেউ শুনে ফেললে ভাববে আমি আপনার রাজনীতি-ইতিহাসের ব্যাখ্যা শেয়ার করি।’
‘স্যার, আমার তো মন খুলে কথা বলার এই একটিই জায়গা—গবমেন্ট প্লেস। সে-ও আপনাদের গুণে। রসিকতা ভালোবাসেন ও আড্ডাকে আড্ডাই রাখেন।’
‘ইংরেজদের তো আড্ডাবাজ বলে খুব সুনাম নেই। আড্ডা-র কোনো ইংরেজি হয় না। ফরাসিরা খুব আড্ডা মারতে ভালোবাসে। ওদের ভাষাতেও আড্ডার কত নাম।
‘আপনারা স্যার আমাদের দেশের অনেক উপকার করেছেন। মুসলিমদের সবচে ঝারাপ শব্দ নেমকহারাম। নেমকহারামি করতে পারব না। খোলা গলায় বলব—আপনারা আমাদের সভ্য করেছেন। কিন্তু একটা স্যার বড় ক্ষতি করে দিয়েছেন।
‘মাত্র একটা ক্ষতি? তাহলে তো জাতির স্বার্থে সেটা শুনতেই হয়।’
‘আপনাদের আড্ডা নেই। নেই তো নেই। সেই জন্য আড্ডার ইংরেজি করবেন মিটিং? দু-জন কথা বললেও মিটিং। দশ হাজার লোক কথা বললেও মিটিং। কোনো কথা হল না, দেখা হল, তাও মিটিং। প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে গেলেও মিটিং। কর্পোরেশনে গেলেও মিটিং।’
লাটশাহেব হো হো হেসে গড়িয়ে পড়লেন, ‘আপনাদের বুঝি অনেক শব্দ মিটিঙের?’
‘সব শব্দ কি আর আমি জানি স্যার? যা জানি তাই তো ডজনখানেক হবে। আড্ডা, মজলিশ, মোলাকাত, পয়চান, জমায়েত, জলুশ—’
‘এই মিস্টার ফারুকি, আমি জানি না বলে আমাকে ঠকাবেন? উর্দুকে বাংলা বলে চালাবেন? ‘কেন স্যার? এগুলো তো বাঙালি মুসলমানেরও জবান। মেজরিটির ভাষাকে ভাষা মানবেন না?’
‘নিশ্চয়। সত্যি বলতে গেলে আমার একটা ব্যক্তিগত অসুবিধের কথা খোলশা করতে হয়। ঐ, আপনি যে-ভাষা বললেন, সেটা তাও বুঝতে পারি। কিন্তু শিক্ষিত বাবুদের কথা একেবারে বুঝতে পারি না। মনে হয়, ওঁরা সবাই সংস্কৃতে কথা বলেন।’
‘ও! আপনি বাঙালি বাবুদের কথা বলছেন? ঐ যারা কাগজে লেখে, মিটিঙে ভাষণ দেয়? বাবুরা তো স্যার ইংরেজি গড়গড়িয়ে বলতে পারে না, ওরা তাই বাংলাটাকে বদলে নিয়েছে।’
‘সে বদলাবে না কেন? কিন্তু আমাদের কমিশনারদের মধ্যে কত বিদ্বান বাঙালি আছেন। দিশি কাগজের কোনো লেখা পড়ে হয়তো তাঁদের কাছে মানে বুঝতে চাই, তাঁরা বেশ অনেকক্ষণ পড়ে বললেন, বিষয়টা কী ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।’
‘সে জন্যই তো স্যার একটা কথা উঠেছে, হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মেরই শিক্ষিতদের মধ্যে—প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনে যতটা স্বায়ত্ত কায়েম হবে, ততটা শাসন হবে না। তাঁরা চাইছেন—ভোটাভুটি করে না-হয় আইনসভার মেম্বার ঠিক হল কিন্তু মন্ত্রিটন্ত্রি লাটশাহেবের হাতেই থাকা ভালো।’
ওঁ! আপনি তো টানা সাতবছর মন্ত্রী আছেন, তাই বলছেন ঐ ব্যবস্থাই ভালো। তবে আপনার চরম শত্রুও তো বলতে পারবে না- মন্ত্রি হিশেবে আপনার কাজে কোথাও কোনো খুঁত ছিল। আর, আপনার পার্লামেন্টারি দক্ষতা তো ঈর্ষণীয়।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। কিন্তু আমি স্যার এসব বলব বলে আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইনি।’
‘তা চাইলেও কিছু দোষের হত না। আর আপনি তো বলেইছেন—গবমেন্ট প্লেসে আসেন শুধু মন খুলে কথা বলতে। আমার তো ভালো লাগল।’
‘যে-কথা বলতে এসেছিলাম স্যার, আপনার দার্জিলিং যাত্রা কি এবারও ১৫ই এপ্রিলই?’
‘অন্যরকম হবে কী করে? এটা তো সরকারি বিধি যে ১৫ এপ্রিল থেকে প্রাদেশিক গবমেন্ট দার্জিলিংকে সদর করবে।’
‘১৫ই এপ্রিলের মধ্যে স্যার মন্ত্রিসভা, আইনসভা সব হয়ে যাবে স্যার? এখনো তো কিছু দানা বাঁধল না। তবে আপনি যখন, বলছেন স্যার নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।’
‘আমি হয়তো দু-চার দিন পরে মুভ করতে পারি। কিন্তু সেক্রেটারিয়েটকে তো তারিখ মেনেই যেতে হবে।’
‘স্যার, আমি এসেছিলাম আপনাকে একটু অনুরোধ করতে—এবার দার্জিলিংটা একটু শর্টকাটে চলুন। আমাদের নদীর কাশবনগুলো এই বর্ষায় ঘন হয়ে যাচ্ছে। দুটো-একটা লেপার্ড পাবেনই। আর, ডাক, একেবারে তুলতুল করছে ভিতরের তেলের আঁচে।’
এর কয়েকদিনের মধ্যেই হোম সেক্রেটারি নিজে এসে জানতে চায়, নোটে নয়, মুখোমুখি—এমন কোনো মুভ কি নেয়া হচ্ছে, ইন দি হায়েস্ট লেবেল, যে স্যার আবদুর রহিমকে এখানে মন্ত্রিসভা তৈরি করতে ডাকা হবে?
অ্যানডারসন প্রথমে বুঝতেই পারেননি, ‘স্যার, আবদুর রহিম? মানে সেন্ট্রাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট?’
‘আইজি নিজে জানালেন, ইনটেলিজেন্স থেকে নোট দিয়েছে।’
‘তাহলে তো সিরিয়াস কথা। এমনি গুজব নয়। যারা জানে তারা কেউ জড়ানো আছে। না। তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো, আমি যতটা জানি, এখনো, তাতে এমন কোনো কথা লন্ডনে বা দিল্লিতে কেউ ভাবেননি। তুমি সেটা ধরে নিয়ে ইনটেলিজেন্সকে বলো— সোর্সটা ইমেডিয়েটলি জানাতে।
‘আমি স্যার সেই কারণেই নিজে এলাম। পার্টিকুলারলি স্যার আবদুরের নামটা উঠেছে বলে। সকলে সম্মান করে, বিশ্বাস করে, ওঁর যোগ্যতা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এরকম একটা ভ্যাকুয়ামে তো এমন মানুষ কাজে আসতে পারেন।’
‘তুমি কি এমন একটা বিকল্প ভাবছ?’
‘না স্যার। ভাবছি, এমন একটা সমাধান ভেবে বের করা বেশ পাকা মাথার কাজ। ‘ ‘খুব কি পাকা মাথা? আপাতত বলটা কোর্টের বাইরে ঠেলে দেয়া। খেলা যদি চলে, বল তো আর কোর্টের বাইরে থাকবে না। কেবিনেট, প্রাইম মিনিস্টার—এসব তো পোলিটিক্যাল ব্যবস্থা। স্যার আবদুর তো পাবলিক পোলিটিকসে কিছু করতে পারেননি। একটা কাউন্সিল ইলেকশনে তাঁর দল বেঙ্গল মুসলিম পার্টি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে এসেছিল বটে কিন্তু পরের বছর তাঁকে মন্ত্রী করা হলে দু-দিনের মধ্যে তিনি রিজাইন করলেন—কাউন্সিলেও তিনি সমর্থন পেলেন না। পার্লিয়ামেন্টারি পোলিটিকস তো অন্য খেলা।’
‘আপনার কাছে আসার আগে আমিও স্যার ভাবছিলাম, ওঁর নামটাই উঠল কেন।’
‘সেটা এমন কী সমস্যা? যেহেতু দ্বিতীয় কোনো স্যার আবদুর রহিম নেই। হিন্দুদের মধ্যেও না।’
‘আমার অন্য একটা কথা মনে হয়েছিল। যেহেতু উনি প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, তাই তাঁকে এনে হকশাহেবকে পাশে ঠেলে দেয়া।’
‘এখন তো লিগ-হক মিলে গেছে।’
‘সেই মেলা থেকে তো আবার নতুন খেলা শুরু হবে। যাঁরা অল ইনডিয়া পোলিটিকসকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা এই প্রদেশের মুসলমানদের নেতা হিশেবে হকশাহেবকে আর উঠতে দিতে চান না। বাংলা আর পাঞ্জাব চলে গেলে মুসলিম লিগের অল ইনডিয়াটা হবে কোত্থেকে। কংগ্রেস তো সেই অল ইনডিয়ার স্বার্থে প্রদেশ কংগ্রেসকে কেমন ডাম্প করে দিল।’
‘হ্যাঁ, এটা অবিশ্যি হতে পারে। তুমি দেখো-না, কাল সকালের মধ্যে ইনটেলিজেন্স জানাতে পারে কী না, সোর্সটা কোথায়? তাহলে আমরা নিজেদের জায়গা খুঁজে পাব।’
হোম সেক্রেটারি চলে যাবার পর আগের দিন ফারুকি-র কথার ভিতরটা যেন ঝলসে উঠল। অ্যান্ডারসন নিজের কাছে একটু অপ্রস্তুত হলেন। এটা বুঝতে তাঁর স্যার আবদুর রহিমের নাম দরকার হল?
প্রায় দুশ-বছর শাহেবদের শাসনে থাকতে-থাকতে একটা বেশ বড় সংখ্যার ভারতীয় তো এইসব নতুন আইন, নতুন মন্ত্রিসভায় ভয় পেয়ে যেতেই পারে। তারা ভাবতেও পারে—শাহেবদের শাসন না-থাকলে চলে নাকী। তারা চাইতেই পারে—লাটশাহেবের অধীনেই সব হোক। অ্যান্ডারসন ভাবেন, এঁরাই তো প্রোগ্রেসিভ লিবারাল। তাঁর মন্ত্রী আজিজুল হক বা স্যার বি পি সিংহ রায়ের মত। দেশের লোকজন ওঁদের মানে আর ওঁরা মানেন ব্রিটিশ সরকারকে। এঁরা তো রাজনীতির দিক থেকেই এমন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারেন।
লাটশাহেব মন্ত্রিসভা তৈরি করতে যে আর দেরি করলেন না, তার তৃতীয় কারণ হিন্দুদের ভিতর থেকেও একটা চেষ্টা ধীরে-ধীরে পাকিয়ে উঠছে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বা স্যার বি পি সিংহরায়ের মত কোনো হিন্দুনেতা অথচ কংগ্রেসি নয় এমন, কাউকে প্রধান করে মন্ত্রিসভা তৈরি হোক। ভোটের আগেই এমন একটা কথা উঠেছিল। স্যার আবদুল হালিম গজনভি বর্ধমানের মহারাজার কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন—এইসব পার্টিপুর্টির কথা ছেড়ে দিয়ে সিধে চাকরির বেলায় ৫০ : ৫০ অনুপাত আর দশ বছরের চুক্তিতে নমিনেটেড ক্যাবিনেট হোক। হালিম বড় ব্যবসায়ী ও তাঁর সঙ্গে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক খুবই ভাল। তিনি এসব গ্রাম-রাজনীতি ও কৃষি-অর্থনীতিকে একেবারে পাত্তা দেন না। বর্ধমানের মহারাজাও লোক খারাপ নন কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ছাড়া তাঁর কাছে আরো জরুরি কোনো কথা নেই। তিনি নিজের ছেলেকে এমএলএ করবেন বলে স্যার বিপিকে তাঁর পুরনো আসন ছাড়তে বাধ্য করেছেন। জমিদারদের মধ্যে যাঁরা রাজা-মহারাজা তাঁরা কে কার চাইতে বড় এই নিয়ে নানারকম গোলমাল পাকাতে ব্যস্ত থাকেন। এঁদের একটাই গুণ—কেউই কোনো পার্টির অনুগত নন, বরং সব পার্টিই এঁদের অনুগত। ব্রিটিশ ইনডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ছাড়া এঁদের মেলামেশারও জায়গা নেই। এটা ঠিকই এদের নিয়ে একটা মন্ত্রিসভা যদি গজনভি করতে পারতেন তাহলে গবমেন্টের পক্ষে খারাপ হত না। গজনভি সারা ভারতের মুসলিম রাজনীতি থেকে সরে থেকেও, তার সঙ্গে লেগে থাকতে চান। সেইজন্য তিনি আগা খাঁ-কে মুরুব্বি ধরেছেন ও আগা খাঁ-র খোঁজে কলকাতা ছেড়ে দিল্লি-বোম্বাই গেছেন। গজনভি যদি আগা খাঁ-র কাছ থেকে ফিরে এসে আগা খাঁর সমর্থন ঘোষণা করেন, তাহলে অবস্থা খারাপ হবে। গজনভি-র আগা খাঁ সত্যিই হতে পারে, জালিও হতে পারে। বরং গজনভি ফেরত আসার আগেই মন্ত্রিসভা তৈরি করে ফেললে নতুন করে গোলমাল পাকানো যাবে না। গজনভির মন্ত্রিসভা তৈরিও তাড়াতাড়ি হবে না।
