1 of 4

২৩. হকশাহেবের বাড়ি

২৩. হকশাহেবের বাড়ি

পটুয়াখালির স্টিমারঘাটা থেকে যোগেন লোকজন এড়িয়ে টুক করে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে হাঁটতে শুরু করল হকশাহেবের বাড়ির দিকে, যদিও হকশাহেবের বাড়ি সে চেনে তো নাইই, সে-বাড়ির কোনো হদিশও জানে না।

ঘাটে স্টিমার লাগতে-না-লাগতেই যোগেন নিচে এসে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ায় যাতে খুলতে-না-খুলতেই নেমে রাস্তায় উঠে যেতে পারে। মৈস্তারকান্দি থেকে নৌকোয় মুলাদি পৌঁছে আড়িয়াল খাঁ দিয়ে পটুয়াখালিরদিকে ডাউন-লঞ্চ যোগেন পেয়েছিল বটে, তবে সেটা ধরতে হলে আরো ঘণ্টা তিনেক মুলাদিতে বসে থাকতে হত, তাহলে আবার তার বরিশাল ফিরতে-ফিরতে রাত হয়ে যেত, ফেরা নাও হতে পারে। যোগেন তাই লতানদী ধরে যে-লঞ্চ ছাড়ব ছাড়ব করছিল, সেটাতেই গিয়ে উঠল।

লঞ্চ ছাড়ার পর যোগেন বোঝে, লঞ্চসুদ্ধু লোক যেন তাকে চেনে কিন্তু সে একজনকেও চেনে না। তেমনই তো হওয়ার কথা—এই পুরো রুটটার অনেকটাই তো তার কনস্টিটুয়েন্সি গৌরনদী উত্তরপূর্ব গ্রামীণ সাধারণ। ভোটটা যে সে জিতল, সে তো ভোটারদের ভোটেই। তাহলে লঞ্চের মানুষজন তাকে দেখে সেলাম দিয়ে গেলে যোগেন মুখ লুকতে চায় কেন আর ঘাটে সিঁড়ি পড়তে-না-পড়তেই সবাইকে এড়িয়ে রাস্তায় উঠে পড়ে কেন আরো হাঁটতে শুরু করে দেয় কেন?

সেটা একটা খুব পাকখাওয়া ব্যাপার—বরিশালের খোলানদীর মাঘমাসের সকালে গায়ে রোদের তাপ মাখতে মাখতে তেমন ব্যাপারে ঢোকার কথা না, বরং জ্যৈষ্ঠের সকালে, ঘন হয়ে আসা কালো মেঘগুলির, নানা কোণ থেকে নানা কোণে ছুটে-যাওয়া আঁধার, নদীর জলের ওপর গর্ত খুঁড়ে জলের অতলের অভিমুখে পাকখাওয়া হতেও পারে। যোগেন লঞ্চে সেই বেটাইমি প্যাচের ঘেরে পড়ে গিয়েছিল, অপ্রস্তুত।

যোগেনের নিজের কাছে নিজেকে মনে হত—ভোটের আগে সে ছিল সিকিনেতা। না-হলে তার ভোটে দাঁড়ানো হত না। আর, ভোটে জিতে সে বড়জোর আধুলিনেতা হয়ে উঠেছে। বড়জোর আধুলি নেতা। কিন্তু এই লতানদীর ওপর দিয়ে লঞ্চে রোদে পিঠ দিয়ে পটুয়াখালির দিকে ভাসতে-ভাসতে যোগেনের ঐ আধুলি নেতাগিরির ধারণাতেই যেন ফাটল ধরে। ভোটে জেতা নিয়ে বরিশাল শহরে যা হয়েছে আর মৈস্তারকান্দিতে যা সব হল যোগেনের যেন প্রায় জানা হয়ে গিয়েছিল—সে যে ষোল-আনি নেতা হচ্ছে না, তাতেই তার নেতাগিরির আট-আনি, নির্ভুল ধার্য হয়ে যাচ্ছে। বরিশাল শহরে আর মৈস্তারকান্দিতে তাকে যোগেন আর যোগা, দাদা আর ভাই, বলে ডাকার লোক এত যে তার আট-আনি নেতা হয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। কিন্তু মুলাদি থেকে লতানদীর ডাউন-স্টিমারে উঠতেই তাকে পায়ে-পায়ে আদাব গুনতে হয়, আর কারো দিকে না-তাকিয়ে নিচু চোখে বলে যেতে হয় ‘আদাব আদাব’। স্টিমারের বাটলার তাড়াহুড়োয় ভাঁজিলুঙ্গি আর গেঞ্জির ওপর জরি সাঁটা পাগড়ি পরে এসে বলতে শুরু করে, —‘ছার, ছার, চলেন আপনি স্পেশ্যাল ক্যাবিনে ছার, কোনো অসুবিধার বন্দবস্ত নাই ছার, ফাউলকারি মাটনকারি হিলসা-শর্য্যাবাটা—যা খাবার চান ছ্যার, হগগই দিব ছ্যার, এমনকী কৈমাছ খাওয়ার চান যদি পরের স্টপেই তুলি ছ্যার—।’ যোগেনকে না-শোনার ভান করতে হয়। বা, একটু প্রশ্রয়ে বলতে হয়, ‘আমি একা অত খাব নাকী মিঞা’? এমন সচেতন আত্মরক্ষা যোগেনকে করে যেতে হয়। এতই তার আশপাশের এই মানুষজনের মত যোগেনকেও ভাবতে হয়—নেতাগিরির কোনো সিকি-আধুলি নেই, হয় ষোল-আনি, না-হয় তো ফুটোপয়সা। জনসাধারণ চায় এমন এক নেতা যে ষোল আনা পেলে আঠার আনা ফেরত দেয়। নেতাও চায় এমন জনসাধারণ যারা ষোল আনার হিশেব রাখতে আঠার আনা দক্ষিণা দেয়।

সকলে যত জানতে চায়—যোগেন এদিকে কোথায় এসেছিল, কোথায় যাচ্ছে—এই সাতসকালে, যোগেন ততই নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়। সে যদি এখন বলে দেয়, হকশাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন, তাই সে যাচ্ছে, তাহলে সঙ্গে-সঙ্গে লতানদীর মাঝগাঙ থেকে কথাটা দুই পাড়ে তো ছুটে যাবেই, ঘাটে-ঘাটে স্টিমার লাগলে—কথাটা কলকাতার দিকে ও রংপুরের দিকে ছুটবেই। হকশাহের হলেন প্রজা পার্টির নেতা আর যোগেন হল সাধারণ আসনে সংরক্ষিত নেতা। এই দুই নেতা যদি জোট বাঁধে, তাহলে কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ ছাড়াই বাংলায় সরকার তৈরি হয়ে যাবে। এই সব কথা যারা আকাশের তারা গুনে নিশ্চিত বলে দিতে পারে, তেমন দু-একজন মাঝারি কর্তা আর খোকাবাবুকে স্টিমারে দেখেছে যোগেন।

সে তাই পটুয়াখালির ঘাটে স্টিমার লাগতে-না-লাগতেই সকলের চোখ এড়িয়ে রাস্তায় উঠে একদিকে হাঁটতে থাকে। হকশাহেবের বাড়ি কোন্‌দিকে তা না-জেনেই।

যোগেন মাঝারি-নেতার সুবিধেগুলি ছাড়তে চাইছিল না। সে যে সব কাজ করে দিতে পারে না—সবাইকে একটা টের পাইয়ে রাখতে চায় যোগেন। যদিও সে নিজেই জানে না, কী কাজ সে করে দিতে পারে। আর, মানুষজন তার কাছে কোন্ কাজ চায়, তার কোনো আন্দাজই তার নেই। মানুষজনেরও নেই। চাঁড়াল যোগেন চাঁড়াল বলেই তার অনুভবে বুঝে ফেলেছে যে মানুষজনের তেমন কোনো চাওয়াই নেই। চাইতে গেলে তো নিজের অভাবটা চিনতে হয়। চেনে নাকী, তার বাবা বা বড়কাকা বা যোগামা? পুলিশের সেপাই, থানার দারোগা, জমিদারের নায়েব, ঠাকুরমশায়—এরা কোথায়, কোন্দিকে আছে তা না জেনেই তো যোগেনের মানুষজন হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু চাইতে না। তারা যে আছে সেই অপরাধের স্বীকারোক্তিতে। যোগেনের সমাজের বেশ কিছু মানুষ তো ঐ ষোল-আনা মান্যিগণ্যির মধ্যে চলে গেছে। তারাও যেতে চেয়েছে, তাদের সমাজও তাদেরদিকেও তাদের করজোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে—তারা যে আছে সেই অপরাধের স্বীকারোক্তিতে।

হকশাহেব পটুয়াখালিতে কোথায় বাসা গেড়েছেন—যোগেন জানে না। ভোটের মুখে শুনেছিল, হকশাহেব মুসলিম লিগের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জবাবে স্যার খাজা নাজিমুদ্দিনের খাশ জমিদারি দক্ষিণ পটুয়াখালিতে ঢুকতেই পারছেন না। খাজা ঐ আসন থেকেই দু-দুবার কাউন্সিলের মেম্বার হয়েছেন। ডাকসাইটে জমিদার তো বটেই, গভর্নর অ্যানডারসনের বন্ধু ও সারা ভারত মুসলিম লিগের নেতা। পটুয়াখালির সরকারি ব্যবস্থা তাঁর হুকুমে চলে, তাঁর নিজের জমিদারির কর্মচারীর সংখ্যা–লেঠেলসহ—অনেক ও সারা পটুয়াখালিতে ছড়ানো।

বাঙালি মুসলমানদের ওপর লিগের নেতৃত্বের প্রতিপক্ষ হিশেবেই ফজলুল হক ১৯৩৬-এ ‘নিখিলবঙ্গ কৃষক-প্রজা পার্টি’র পক্ষে ইস্তাহার বের করে, জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ আর চাষিদের ঋণ মকুবের কথা তোলেন। কৃষক-প্রজা পার্টির নেতা ভারতের বিখ্যাত দন্ত-চিকিৎসক, আর. আমেদ মুসলিম লিগের নেতা শহিদ সোহরাবর্দিকে ভোটযুদ্ধে ডাক দিয়েছিলেন, ‘হকশাহেব কোন্ কেন্দ্রে দাঁড়াবেন, তা মুসলিম লিগই ঠিক করে দিক। যে-কোনো কেন্দ্রে হকশাহেব লিগের যে-কোনো নেতাকে হারিয়ে দেবেন।’ তার উত্তরেই মুসলিম লিগ জানায়—সাহস যদি থাকে তাহলে হকশাহেব দক্ষিণ পটুয়াখালিতে স্যার নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে লড়ে যান—নাজিমুদ্দিনকে হারানো এতই অসম্ভব। হকশাহেব পটুয়াখালিতে এসে দেখেন কেউ তাঁকে বাসা ভাড়া দেয়ার সাহসটুকুও পাচ্ছে না। শেষে স্থানীয় উকিল ললিত সেনের বাড়িতে ঠাঁই গাড়তে পারলেন। প্রথম জনসভাতেই হকশাহেব এক ধাঁধা ছাড়লেন—’পয়লা লড়াই হয় র-এ আর র-এ রাম-রাবণ, দোসরা লড়াই হয় ক-এ আর ক-এ, তেসরা লড়াই হয় গ-এ আর গ-এ কৃষ্ণ-কংস গান্ধী-গরমেন্ট, আর এই চৌঠা লড়াই হচ্ছে লাঙল লিগে ল-এ আর ল-এ’।

এসব উড়ো কথা নৌকোয়-নৌকোয় ভেসে যোগেনের কানে গেছে, কিন্তু কোনো খবর সে রাখেনি। এখন যোগেন পটুয়াখালির রাস্তা দিয়ে একা হনহনিয়ে হাঁটছে এমন যেন তার দুই বেলা যাতায়াত, হকশাহেবের বাড়িতে।

কিন্তু যোগেন জিগগেস করলেই তো পারে কাউকে। স্টিমারে তো সেই সাহসটাই খুইয়ে নামল যোগেন। তাকে যে কবে এত লোক চিনে ফেলেছে, যোগেন টেরই পায়নি। বাটলার থেকে শুরু করে বোরখা-ঢাকা মেয়েরাও। এমনও হতে পারে—মুলাদিতে লঞ্চ ধরার সময় কেউ-কেউ তাকে দেখে স্টিমারে কানাকানি করে জানান দিয়ে নিজের নিজের ঘাটে নেমে গেছে। লঞ্চে-স্টিমারে তো রটানো সবচেয়ে সহজ, না-শুনে তো আর উপায় নেই।

এখন যদি যোগেন কাউকে জিজ্ঞাসা করে আর সে যোগেনকে চিনে ফেলে তাহলে হকশাহেবের বাড়ির হদিশ যোগেন পাওয়ার আগেই তো ঐ খবর শীতকালের গভীর রাতে লাগা আগুনের মত বেড় লাগিয়ে ছুটবে—শুইনছ নি বাপ, বরিশালের যোগেন মণ্ডল, হকশাহেবের বাড়ির তালাশে পটুয়াখালির বাজারে পা ঝুলাইয়্যা বইস্যা আছে—এ!

সেই চেনা-পাবলিক ও যোগেনের একটা লুকোচুরি তৈরি হতে থাকে যোগেনের একলা হাঁটার তালে। একটা কথা তার মাথায় আসে, একটা টমটম নিলে হয়, ঘোড়ার গাড়ি যদি নাই নেয়। যা হোক, টমটম নিল, উঠল, তারপর কী বলবে? হকশাহেব? টমটমওয়ালা যদি জিগগেস করে বসে কোন্ হকশাহেব—তাহলেও না-হয় একটা পালটা কথা বলা যায়। তাতে একটা খুব বড় অনিশ্চয়তা—পটুয়াখালির লোকজন এখন হয়তো হকশাহেবকে অন্য কোনো নামে ডাকে। এ-পাবলিককে বিশ্বাস আছে? কখন যে নাম বদলে দেয় কারো, এমনকী নিজের বাপেরও। কোনোটাই মিথ্যে নয়, কোনোটাই বানানো নয়, নাম’ কোটা বলবে নির্ভর করে—একটু অন্যরকম আদর জানাতে বা আত্মরক্ষা করতে। আধঘণ্টা আগে যে-বৌকে ডেকেছে, ‘চোখঠুকরা’, মানে পুরুষ দেখলেই চোখ দিয়ে ঠুকরয়, তাকেই অন্ধকারে শুয়ে ডাকে ‘আন্ধার মানিক’। যোগেন হয়তো টমটমওয়ালাকে বলল, ‘হকশাহেব বাড়ি’, টমটমওয়ালা হয়তো বলল, ‘কামডা কার লগে? তারে পাইলেই তো হইল। নাকী! নাকী হকশাহেবেরই দর্শন চান?’ মানে, সে কার সঙ্গে দেখা করবে সেটা টমটমওয়ালাই তার চাইতে ভালো জানবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *