1 of 4

২২ : ফজলুল হকের বার্তা

২২. ফজলুল হকের বার্তা

রাত আরো একটু হতেই বিয়ের গানের কলরোল শেষ হয়ে যায় আর যোগামা চোখের জল মুছে তার নিভৃত গান শেষ করে দেন। মা নিশ্ছয়ই তার প্রাচিত্তির স্বীকার দিছেন। নিশ্ছয়ই দিছেন। এতক্ষণ যারা এই বাড়ি ভরে রেখেছিল তারা অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্য বাড়াতে-বাড়াতে কখন একসময় দুয়ার খালি করে চলে যায়। আর আওয়াজের গতি বেড়ে যায়—কত ছোট-ছোট, আরো ছোট-ছোট, আরো চাপা, আরো-আরো চাপা আওয়াজ শুনতে পায় যোগেন।

সে যে-ঘরে শোবে, সে-ঘরে ঢুকতেই অন্ধকারের পাটভাঙা গন্ধও পায় যোগেন। তার বৌ তাহলে ঘরে, মাচার ওপরে। ঘরের ভিতর কিছু দেখা যায় না। পায়ের আন্দাজে যোগেন মাচায় গিয়ে ঠেকে হেসে ফেলে—বৌ আবার ঘুমের মইধ্যে চাপা খাইব না তো। একটু জানান দিতেই যোগেন বলে, ‘এড্ডু সইরা শুইয়ো নে—’

খুব চাপা গলায় যোগেনের বৌ বলে, ‘ছোঁয়া লাগার ডর কইরলেন নি?’

‘ছোঁয়া লাইগব কার? তোমারে চাপা দিয়া ফ্যালার ডর খাই।’

‘আপনি নি কণ্ঠী নিছেন? পিঁপড়া চাপা দিতে ডর খান?’

যোগেন শুয়ে-শুয়ে খুশি হয়। এই অন্ধকারটায় পাটভাঙা গন্ধ আরো নিবিড় হচ্ছে। এই অন্ধকারে তার বৌয়ের চাপা স্বরও গলায় ঘষা খাচ্ছে—শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে যেমন আওয়াজ ওঠে। এ সবের চাইতে অনেক বেশি খুশি এসে যায় যোগেনের মনে—তার বৌয়ের কথার এমন বাহারে। কথা বলে তাহলে সুখ হবে, কথা শুনেও সুখ হবে। বৌকে তো তার দেখাও হয় নাই, শোনাও হয় নাই। ডাগর হল কখন যোগেন জানেই না। শ্বশুরবাড়িতেই থাকত। মাস চার আগে, আশ্বিনের শেষে, মৈস্তাকান্দি থেকে ফেরার সময় খাগবাড়িতে রাত কাটিয়েছিল যোগেন। সেখানেও তো কমলার সঙ্গে ঘুমনোর সময় দেখা, যদি এই অন্ধকারে দেখা বলে কিছু ঘটতে পারে। তখন তো এই গন্ধও পায়নি, এই কথাও শোনেনি।

‘তুমি নি অ্যাহন শ্বশুরবাড়ি থাইকব্যা?’

যোগেনের এই কথাটার কোনো মানে নেই, তাদের সমাজে। একটা পেট তো বাঁচে, যদি স্বামীর এমন দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বৌ বাপের ঘরেই থাকে। তা ছাড়া প্রহ্লাদ বারুই অত গরিব না যে মেয়েকে রাখতে গাঁইগুই করবে।

‘হ। অ্যাহন তো আমার নতুন শ্বশুরবাড়ি।’

‘সেডা ঠিক কথা। বার বছরের বিয়াতী বৌয়ের শ্বশুরবাড়ি নতুন থাহা!’

‘আমি কই কইলকাত্তার কথা—সেইডা তো আমার নতুন শ্বশুর ঘর!’

এতটা যোগেন ভাবতেও পারেনি। সে শুধু বলতে পারে, ‘অ্যাঁ?’

‘আপনি ম্যাম্বার হইলে আমারেও তো ম্যাম্বারনি হব্যার লাগে?’

যোগেনের ঘুমিয়ে পড়ার গতি মশামাছির চাইতেও ক্ষিপ্র। মাথা সম্পূর্ণ নামানোর আগেই তার ঘুমিয়ে পড়া সম্পূর্ণ হয়ে যায়। অন্ধকার, পাটভাঙা গন্ধ, বৌয়ের স্বর ও কথা—এই সব মিলে আজ এই একটু দেরি হল। কিন্তু কমলার শেষ কথায় এমনি চমকে ওঠে যোগেন যে তার মুখে চট করে কথা জোগায় না। তার ওপর তার এই অপ্রস্তুতকে ঠাট্টা করেই তার বৌ চাপা-ঘষা গলায় আবার বলে ওঠে, ‘লাগে না?’

কথায় যোগেন হেরে যেতে পারে নাকী! তাছাড়া, এমন কথার জবাব দিতেও তো সুখ, ‘কোন্ পালা শুইন্যা পাঠ মুখস্থ কইরছ?’

.

সকাল হতে-না-হতেই ডাকাডাকিতে যোগেন জেগে উঠে দেখে বৌ আগেই বেরিয়ে গেছে। মাচা থেকে নেমে ঝাঁপ খুলতেই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়—’হইলডা কী?’

‘আরে, দ্যাখ, এই মাঝি কী কয়?’

‘মাঝি কেডা?’

‘আমারে পটুয়াখালি থিক্যা হকশাহেব কাইল সদরে পাঠাইলেন।’

‘পটুয়াখালি থিক্যা? মানে লিডার ফজলুল হক?’

‘আর কেডা হব? ডাইক্যা হুকুম দিলেন, যা, নোড় পাইড়্যা বরিশালে যাইয়্যা ঐ মণ্ডলরে ধইর‍্যা আন্, অ্যাহনি, সূর্যাস্তের আগে।’

‘আমার কথাই কইছেন?’

‘হ। আর কেডা বরিশাল থিক্যা মৈস্তারকান্দি আইব? শুইন্যা ভাইবল্যাম আর পটুয়াখালি ফিরুম না। আমাগ তো জল থাইকলেই ফল। বরিশালেই খ্যাপ মাইরব। তারপর য্যান চোক্ষের উপর বাঘের চোক্ষু জ্বইল্যা উইঠল–হকশাহেব। উনিই তো কুনো কথাই ভুইলব্যার পারেন না। পটুয়াখালি না ফিইরলে কি সূর্যাস্ত থিক্যা মুক্তি পাব? তো দিল্যাম পাড়ি মৈস্তারকান্দি বইল্যা। এহানে পৌঁছাই, পছন্দ হয়, সূর্য ওঠার ঘড়ি দুই আগে। একডা ছোড ঘুম সাইরা নিল্যাম। কারে জিগাইব—মণ্ডললিডারের বাড়ি কোনডা? তবে শ্যাষ রাইতের ঘুম তো লম্বা হইবারই কথা। তো হইল না। মনে উদ্বেগ। কহন সকাল হয়, কহন মণ্ডল-লিডারের বাড়ি খুঁইজব? তার আগেই যদি আবার সূর্যাস্ত ঘইট্যা যায়? হকশাহেব একখান পত্ৰও দিছেন।’

যোগেন কোনো কথা না বলে তাকিয়ে থাকে—লোকটি তার লুঙির ট্যাক খুলে একটা ভাঁজ করা গোল-পাকানো পুরচি বের করে লুঙির প্রান্ত দিয়ে মুছে দু-হাতে যোগেনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। যোগেন কাগজটার ভাঁজ খুলতে থাকে আর তার বাড়ির লোকজন—যোগেনের বাবা, কাকা, যোগামা, শারদা—সকলেই তাকিয়ে এই অপূর্ব ঘটনাটা দেখে। এই ভিটের কোনো দাওয়াতে দাঁড়িয়ে এর আগে এমন কোনো কাগজের ভাঁজ খোলা হয়নি। এটা যোগেন খুব আলাদা করে হয়ত বুঝতে পারেনি। তার সমস্ত কাজই তো কাগজ নিয়ে, কাগজের ওপর কলম দিয়ে লেখা নিয়ে, কাগজের ওপর ছাপা লেখা নিয়ে। ঐটুকু একটা কাগজ পড়তে যোগেনের একটু বেশিই সময় লাগছে। কাগজটা উলটেও যোগেন দেখে। কাগজটা ভিজে লেখাটুকু ধুয়ে গেছে। শুধু ‘ডিয়্যার মিস্টার মণ্ডল টুকু বোঝা যাচ্ছে আর প্যাডের নীচে ‘এ. কে. ফজলুল হক এমএ-বিএল’ ছাপাটুকু।

যোগেন বলে, ‘ধুইয়্যা গিছে তো?’

‘অ্যাঁ? হায় আল্লা। কাগজ নিয়্যা জলে ভাইসলে কাগজেরও দুষ নাই, জলেরও দুষ নাই।’

‘ছাড়ান দ্যান। যাব ক্যামনে? তোমার লগে?’

‘আমার লাগ ধইরলে তো কয় গণ্ডা সূর্যাস্ত ঘইট্যা যাবে নে। পটুয়াখালিতে না বাঘ হাঁ কইর‍্যা খাড়া আছে? আমি নামব আর আমারে গিলব। চিবাইব্যারও সময় দিবে না।’

‘অ্যাহন যাউম ক্যামনে?’

‘পাখা গজাইয়্যা তো আর যাব্যার পারবি না,’ যোগেনের বাবা বললেন। যোগামা মাঝিটিকে ডাকে, ‘এদিগে আয়ো, মাঝি।’

‘কাহা, এডডা কাম কইরব্যা? ছুড়্যা রায়বাহাদুরের কাছে যাইব্যা?’

‘স্যায় আছে কি নাই?’

‘আছেন। কাইল তো কত কথা হইল। উনারই তো আসা যাওয়া সগলের থিক্যা বেশি। উনি ঠিকঠাক কইয়্যা দিব্যার পারেন।’

যোগেনের বড়খুড়ো একটু ইতস্তত করেন। যোগেন বলে, ‘যাও-না কাহা, তুমি ফিরতে-ফিরতে আমি সাইজ্যা নেই। হকশাহেব ডাক পাঠাইছেন।’

‘তুই তো কইয়্যাই খালাশ। রায়বাহাদুরের ঘুম ভাইঙছে নি? আর রায়বাহাদুরের লগে খাড়াইয়্যা আমি জিগাইবার পারি—আমার ভাইয়ের ব্যাটার পটুয়াখালি যাবার লাগে, তাই, আপনার লগে আইছি পথ জিগ্যাইতে? আমারে চিনেন না, তার আবার ভাইয়ের ব্যাটা? কী যে কস?’

‘কাহা, কাইলই তো আশুস্যারের লগে গিছিলাম, কত কথা হইল। তুমি যাইয়্যাই দেখো।’

‘তোর পটুয়াখালি যাওয়ারও কাম নাই, আমার রায়বাহাদুরের নিয়ড়ে যাওয়ারও কাম নাই।’

‘কাহা, আমি অ্যাড্‌ডা চিঠি লিখা দেই। তুমি সেই চিঠিডা টুনির হাতে দিও।’

‘টুনি কেডা?’

‘কাহা, রায়বাহাদুর তোমারে চিনেন না, তুমি টুনিরে চেনো না, তোমরা কি মৈস্তারকান্দিতে অচিনা মানষের মেলা বসাইছ। জয়বসন্ত কাহার মাইয়্যা, টুনি।

শারদা হঠাৎ করে বলে বসে, ‘টুনি? দে ভাই, চিঠি লেইখ্যা দে। আমি নোড় পাইরা গিয়্যা জব আইনছি। টুনি আছে তো?’

যোগেন গলা তুলে বলে, ‘চিঠি লিখব কনে? অ্যাডডা কাগজ দে।’ যোগামা বাচ্চাদের লেখাপড়ার খাতা থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে দেয়। যোগেন কাগজটা নিয়ে বলে ওঠে, ‘দাওখান আনলা না?’

‘দাও? হাতদাও?’

‘যা দাও পাও—রামদাও, হাতদাও, কাঁচিদাও। ধার থাইকলেই হব।’

‘তুই তো চিঠি লিখবি কলি, দাও দিয়া কী করবি?’

‘আঙ্গুল কাইট্যা কলমো বানাইল্যাম’, যোগেন গুনগুনিয়ে ওঠে। বুঝতে একটু সময় নেয় যোগামা—তারপর হাসতে-হাসতে মুখে আঁচলচাপা দেয়। যোগেনের বুড়ো বাপ দুয়ারের কোণা থেকে দন্তহীন হাসি ছড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘তুই লায়েক হইবি কবে রে, ছ্যামড়া। যেইহানের মেম্বার হইছিস, সেইহানে গিয়্যা খাড়াইয়্যা কি সখী-সংবাদ ধরবি নাহি রে বাপ?’

‘যোগামা—কলম খুঁইজ্যা আর কলম্বাস হইয়ো না। আশুবাবুর কলমখান দ্যাও। আর এড্‌ডা ছোড পিড়্যা দ্যাও’—যোগেন এতক্ষণে বসে পড়ে।

যোগামা আশুবাবুর দেয়া কলম আর আধহাতি এক পিঁড়া এনে দেয়। যোগেন কোলের ওপর পিঁড়াটা রেখে, পেনটা খুলে, ক্যাপটা পেছনে লাগিয়ে রায়বাহাদুরকে চিঠি লিখতে বসে।

বাড়ির সবাই, পাড়ারও অনেকে যোগেনকে গোল করে ঘিরে চিঠিলেখা দেখছে।

তাদেরই এই দুয়ারে বসে তাদেরই যোগেন মণ্ডল ফাউন্টেন পেন দিয়্যা চিঠি লিখত্যাছে এমন এড্ডা মানুষ রে, যারে সবাই দেখেও নাই, যার ঐ একখান নাম সগগার চেনা- ‘রায়বাহাদুর’। কাণ্ড যোগেনের—তারে নি চিঠি লেখা যায়? রাস্তায় কহনো-সহনো দেইখলে যারে রাস্তা দিতে রাস্তার পাশে খাড়া হইয়্যা থাইকব্যার লাগে। না-হয় পাশ দিছে যোগা। না হয় যোগা বরিশালের উকিল। না হয় যোগা মেম্বারের ভোটে জিতছে—তার লগে কি যোগা রায়বাহাদুরও হইছে? এইডা এড্‌ডু বেশি হইয়্যা গেল না। যাওয়ার সময় রায়বাহাদুররে নিজেই না-অয় জিগাইয়া যাতি। শ্যাষে তুই চিঠি লিখব্যার বসলি যোগা? রায়বাহাদুররে?

মাটির ওপর লেপ্টে বসে, কোলে পিঁড়া নিয়ে, পিঁড়ার ওপর কাগজ রেখে, আশুবাবুর পেন নিয়ে যোগেন একটু সমস্যায় পড়ে। রায়বাহাদুরকে কি তার চিঠি লেখা মানাচ্ছে? হ্যাঁ, রায়বাহাদুরই ঠিক বলতে পারবেন—আর-কেউ তার মত যাতায়াত করে না এ লাইনে। বলতে তো পারবেন—কিন্তু যোগেনকে কি সে বলবেন? মানে, যোগেন কি তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারে? রায়বাহাদুরকে যোগেন মণ্ডল জিজ্ঞাসা করছে—তাড়াতাড়ি পটুয়াখালি কোন্ পথে যাওয়া যাবে? কথাটাতো আসলে—লঞ্চ লাইন বা স্টিমার লাইন নিয়ে। হকশাহেবের নাম করে জিজ্ঞাসা করা হয়ত যায়—রায়বাহাদুর তো রায়বাহাদুর, হকশাহেব তো কাউন্সিলের মেম্বার। তার কথা রায়বাহাদুর ফেলতে পারবেন না। কিন্তু রায়বাহাদুরকে কি হকশাহেবের কথা বলতে পারে যোগেন মণ্ডল? সেটা তো হকশাহেব পছন্দ নাও করতে পারেন।

যোগেন এটারও হদিশ চায়, প্রথমেই তার রায়বাহাদুরের কথা মনে পড়ল কেন। রায়বাহাদুর, রায়বাহাদুর হলেও বামুন, বামুন হলেও জমিদার, জমিদার হলেও উকিল, উকিল হলেও রায়বাহাদুর। এ-জীবনে বা পরজীবনে রায়বাহাদুরের সঙ্গে তার কখনো কোনো বিনিময় ঘটা সম্ভবই নয়। ওকালতিতে অনেক-অনেক টাকা করে জমিদারি কিনতে পারে যোগেন, রায়বাহাদুরও পেতে পারে। কিন্তু সে তো কখনো বামুন হতে পারবে না। জন্মজন্মান্তরেও না।

তবু চিরকালের ও পরকালের চণ্ডাল বলেই যোগেনের অনুভবশক্তি পশুর মত আত্মরক্ষাচেতন। সে বুঝতে পারে, তাকে বুঝতেই হয়—তাকে মেনে নেয়ার সীমাটা কোথায় কুলীন হিন্দুদের। কেউ বলার আগেই সে শুনতে পেয়ে যায়, ‘ব্যাটা, চাঁড়ালও চিঠি লেখে। আরে, যে-অক্ষরের নামই বর্ণ, সে-অক্ষরে বর্ণহিন্দু ছাড়া কারো অধিকার থাকে? লেখাপড়ার অত হাউশ থাকলে আরবি-ফারসি পড়, অগ তো বামুন-শূদ্র নাই। আর ক্ষমতা থাকলে ইংরাজি পড়। অগও তো দেবভাষা নাই, সুরাসুর হগ্গলেরই এক বুলি।’

যোগেন স্বস্তি পায়। রায়বাহাদুরের সঙ্গে সে সমতা বোধ করে ফেলেছিল—ইংরেজিতে কথা বলতে পারায়। রায়বাহাদুরই যোগেনকে সমমর্যাদা দিয়েছেন—মিস্টার বলেছেন, কলিগ বলেছেন, তার রাজনৈতিক সমর্থনও জানিয়েছেন। রায়বাহাদুরকে তার এই চিঠি লেখায় বামুন-কায়েতদের প্রচলিত প্রতিক্রিয়া ঐ পশুর অনুভবশক্তিতে আন্দাজ করতেই যোগেনের নিজের কাছেই ধরা পড়ে গেল—রায়বাহাদুর বামুন হলেও শাহেব-বামুন, আর জমিদার হলেও শাহেব-জমিদার। তবে হ্যাঁ, ইংরেজিতে লিখলে, যোগেন নিশ্চয়ই তাকে লিখতে পারে।

কাগজে কলমটা প্রায় ছুঁইয়ে ফেলেছিল যোগেন। সম্বোধন করবে কী বলে? ডিয়ার স্যার—হয় না। শুধু স্যারও–হয় না। মোস্ট রেভার্ড স্যার হয়, তবে একটু বেশি অফিসিয়্যাল শোনায়। ‘শ্রীচরণকমলেষু’ ইংরেজি করে লিখতে পারলে এক ঢিলে অনেকগুলো বক মারা যেত। ‘শ্রীচরণকমলেষু’র ইংরেজি কী হতে পারে। ‘টু’ দিয়ে না হয় সপ্তমীর কাজ হল। ‘শ্রী’ হল ‘বিউটি বা ‘গ্রেস’। একটা ‘ফুল’ লাগাতে হবে। ‘চরণকমল’ তো ‘লোটাসফিট’। তাহলে, ‘টু দি গ্রেসফুল, লোটাসফিট অব রায়বাহাদুর। মোস্ট রেভার্ড স্যার।’ একটু দ্বিধা আসে, লিখে দেখলে হত কেমন দেখায়। কাগজ তো মোটে এই একটা। উলটো পৃষ্ঠায় লেখা যাবে না—একজন উকিল হয়ে সে তা করতে পারে না। অথচ ‘শ্রীচরণকমলেষু’ সে ছাড়তে পারে না—মাথায় যখন একবার এসে গেছে। রায়বাহাদুর তো শাহেব হলেও বামুন। যোগেনের কাছ থেকে সে যথাযথ সম্মান আশা করতেই পারেন। কাল একবার বলেওছেন রামদয়ালের ছাওয়াল।’

যোগেন ফাউন্টেন পেনটা কাগজে ঠেকিয়ে বড় করে একটা ইংরেজি ‘এস’ লিখে, ইংরেজি বানানে ‘শ্রীচরণকমলেষু’ লিখে ফেলে—’চরণ’-এর পর একটা ‘এ’ দিয়ে—সে সংস্কৃতও জানে। তারপরের লাইনে ইংরেজিতে লেখে ‘দি মোস্ট রেভার্ড স্যার রায়বাহাদুর’। ‘স্যার’ পর্যন্ত সে লিখতই, তারপর ‘রায়বাহাদুর টা এসে গেল সেই পশুস্বভাব থেকে—’স্যার রায়বাহাদুর’ কথাটার মধ্যে কি রায়বাহাদুরের আকাঙ্ক্ষা একটু ছোঁয়া হল না? রায়বাহাদুরদের কে না ‘স্যার’ হতে চায়? সে যতই কেন অসম্ভব হোক। আনুপাতিক বিচারে রামদয়ালের ছাওয়াল যদি এমএলএ হয়, তাহলে রায়বাহাদুরের কি ‘স্যার’ না-হলে চলে? বাকিটুকু লিখতে আর দেরি হল না। শেষে ‘ইয়োর্স মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট’ লেখার পর ‘যোগেন’ লিখে তার নীচে ‘এস/ও রামদয়াল মণ্ডল’ লিখে ফেলল।

যত্নে ভাঁজ করেও কাগজের দোষ ঢাকল না! ‘ছোডোদিদি’, শারদা এসে দাঁড়াতেই যোগেন পিঁড়েটা রেখে দাঁড়িয়ে উঠে চিঠিটা তার হাতে দিয়ে বলে—’মুইঠ্যা পাক্যাইয়া নিস লা। আর-ভাঁজ দিস না। টুনিরে দিবি। টুনি আমারে ভোট দিছে।’

শারদা ছুটতেই শুরু করেছিল, ঘাড় ফিরিয়ে ভাইকে একটু বকে নিল, ‘থো তো ভাই—’।

যোগেন ফাউন্টেন পেনটা রাখার জন্য ডাকে, ‘যোগামা—আ।’ তার মাস্টার আশুবাবুর উপহারের পেন দিয়ে যোগেন প্রথম লিখল—এক শাহেব-বামুনকে ইংরেজিতে চিঠি। কেন? না, আর-এক শাহেব-যবন তাকে চিঠি পাঠিয়েছে ‘মিস্টার মণ্ডল’ বলে। জলের মাঝি ছাড়া সে-চিঠি আনবে কে? আর, জল দিয়ে চিঠি পাঠালে সে-চিঠির কথাগুলি তো ধুয়ে যাবেই। এখন, শারদা-টুনিকে ছাড়া যোগেনের চিঠিই-বা ঠোঁটে উড়িয়ে নিয়ে যাবে কে? ঠোঁট থিক্যা পইড়া না যায়।

‘এই পেনটা ধরো। ভুইল্যা না যাই।’

কোর্টে যাওয়ার সময় এক তৈরি হওয়া থাকে—স্নান-খাওয়া, প্যান্টশার্ট, কলার-কালকোট, সু, তার আগে দাড়িকামানো, তারও আগে জুতো পালিশ করা আছে কী না দেখা। মৈস্তারকান্দিতে তো সব সময়ই তৈরি। চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়ে, খাল সেরে, দুটো ডুব দিয়ে উঠে ধুতিটা পরে নিল, গেঞ্জিটা গলাল। পাঞ্জাবিটা পরে বেরিয়ে যাবে। বাড়িতে গেঞ্জি পরতেই লজ্জা করে, তার ওপর পাঞ্জাবি।

‘যোগামা, ছোটদিদি তো আইসে না-

‘আইলো বইল্যা, তুই একদলা ভাত মুখে ফেল্যা।’

‘তোমার মাঝি আছে তো?’

‘থাহারই তো কথা, খাইয়্যা গেল তো।’

‘তারে তো লাইগব্যার পারে। দেহো, কোথায়?’

যে-পিঁড়ের ওপর কাগজ রেখে যোগেন চিঠি লিখেছিল, সেটা তো পড়েই ছিল। তার ওপর বসে যোগেন বলে, ‘দ্যাও, এহানে দ্যাও ভাত।’

বাড়ির সেই একটামাত্র বড়বাটি ভর্তি ভাত, ওপরে কাঁচালঙ্কা আর পেঁয়াজ, তলায় ডালটাল কিছু থাকতেও পারে। যোগেন শাদা ভাত মুখে পুরে পেঁয়াজে একটা কামড় দিয়ে, ভর্তি গলায়, ‘আরে, কনে’ বলে ওঠে, আর শারদা-টুনি দুইজনেই উঠে এসে হাঁফায়। শারদা বলে ওঠে, কথায় মাঝে-মাঝে হাঁফ ফেলে, ‘ভাই, রায়বাহাদুর তোমার চিডির জব লিখ্যা দিছে।’

যোগেন ভাতের গন্ধে বিভোর ছিল, সে বাটি থেকে মুখ তোলে না। বলে, ‘এই বাডিডার উপর হাঁফ ফ্যাল তোরা দুইজন। ভাতড়া ঠান্ডা হইব। টুনিরে ধইর্যা আনলি–যে!’

‘ক—স কী ভাই। রায়বাহাদুর কী সব নাম কব্যার ধইরলেন—আমায় কি মনে থাগে। তহন কত্তাই তো কইলেন, টুনি যা, ও সব জানে, যোগেনরে কইয়্যা আয়।’

যোগেন একটু হাসিমুখে টুনির দিকে চায়।

টুনিটারে দেইখলে চক্ষু জুড়াইয়্যা যায়। বাবলা গাছের তলার খালের জলের মত গায়ের রংডায় য্যান কত শান্তি! কাল। এরেই কয় নমশুদ্দুরের কাল। গায়ের চিকন দেইখলে কত গোরা কর্তা পায়ে পড়ত প্যাটভইর্যা খাওয়া জোটে তো। শাড়ির নীচে পেটিকোট পইরছে গায়ে ব্লাউজ। তার দিদি শারদার মুখখানের ঢকও তো সুন্দর। ঐ-সুন্দর কেডা দেইখব? মাথায় জটা। গায়ে খড়ি। প্যাট খালি। ময়লা একখান কাপড়। একপাল্লা জড়ানো। শরীর ঢাকারও উপায় নাই। দেখলেই বুঝা যায় শুদ্দুরনি।

‘দিদি, এন্ড্রু জল দে।’

মাটির একটা ঘড়া এনে বাটিটা জলে ভরে দেয় শারদা। সেই বাটিভর্তি জল মুখের ওপর তুলে শূন্য থেকে গলায় ঢালে যোগেন আর ঢকঢকিয়ে পান করে। হাতটা ধুয়ে বাড়িয়ে দেয়। ‘দে, দিদি, চিঠি দে।’

তারই চিঠির উলটো পিঠে নিজের হাতে লিখে দিয়েছেন রায়বাহাদুর, ইংরাজিতে, ডিয়ার মণ্ডল, আমি তো যশোর থেকে নড়াইল হয়ে আসাযাওয়া করি, ফলে পটুয়াখালির দিকের লঞ্চ সার্ভিসের ব্যাপারটা জানি না। তার ওপর এখন তো শীতকাল—অনেক রুটই আর নাব্য নয়। মনে হয়, বড় নদী দিয়ে রওনা দিলে কিছু পেয়ে যেতে পার। তোমার যাত্রার জন্য শুভেচ্ছা—নীচে সই।

‘আরে তাই তো। আমি ক্যামনে ভাইবল্যাম রায়বাহাদুর জাইনবেন। উনির তো আসাযাওয়া পচ্চিম থিক্যা। আর আমি তো যাব দক্ষিণে।’

টুনি বলে, ‘কর্তা বল্যা দিছেন তুমি এইখান থিক্যা একখান নৌকা ধইরা মুলাদি চইল্যা যাও। মুলাদি গেলে অনেকগুলান লঞ্চ সার্ভিস পাবা নে। অ্যাহন তো তেমন ফরসা হয় নাই—আড়িয়াল খাঁ দিয়্যা পটুয়াখালির লঞ্চ ধইরতে পারো। যদি না পাও তাহাইলে লতা নদী দিয়্যা যে-লঞ্চ পাও সেইডা ধইরলেও পটুয়াখালি সিধা যাবার পারো। কর্তা কইছে, মৈস্তারকান্দি থিক্যা মুল্যাদি যাওনই আসল। যাইবানে কীসে?’

‘আরে, টুনি তো আমাগো স্টেশন মাস্টার হইয়্যা বইসছে, দেখছ নি? তো কর্তা এই সব লিখ্যা দেয় নাই ক্যান?

‘সে তো তোমরা জানো। যা কওয়া যায় তা কি লেখা যায়।’

‘আমি অ্যাহন মুলাদি যাই ক্যামনে সেডা ক।

‘তুমি আইসো। আমরা বড় ঘাটে গিয়্যা নৌকা বাছি। চল্ শারি’, ওরা দু-জন দুয়ার গড়িয়ে ছুটতে থাকে। যোগেনের মনে কোনো উদ্বেগ নেই। এটুকুই জানার ছিল—কোথা দিয়ে যাবে। মুলাদি পৌঁছাক তো—তার পরের কথা তার পর।

‘যোগামা, জামা কনে?’

‘ঘরে দ্যাখ, খাড়া, আসি।’

যোগেন ঘরে ঢুকে নিজেই পায় পাঞ্জাবি, বেড়ায় ঝোলানো। সে পরে নিতেই যোগামা পেনটা এগিয়ে দেয়। বুক পকেটে লাগিয়ে একবার দেখে হাসে যোগেন। যোগামা ঘড়িটা এগিয়ে দেয়—সেটা হাতে নিয়ে যোগেন বলে, ‘এতড়া পাইরব না একদিনে। পকেডে থাউক।’ সে পাশ পকেটে ঘড়িটা রাখে। যোগামা বলে, ‘টাহা দে’।

‘ন্যা’ নাই? খাড়াও।’ যোগেন গুনে-গুনে দশটা দশটাকার নোট দেয়।

‘কত দিলি?’

‘একশ-–’

‘একশয় কয় কুড়ি?’

‘পাঁচ। না, তুমি চাইর কুড়ি রাখো। আমারে কোন নৌকা ধইরতে হয়!’

যোগামা সবগুলি নোটই যোগেনের হাতে দেয়। যোগেন দুটো নোট তুলে বাকিটা যোগামাকে ফেরত দেয়, ‘চাইর কুড়ি থাইকল।’

‘এই নোটের কড়ায় এক কুড়ি হইব?’

‘দুইডায়।’

যোগেন ঘর থেকে বেরতে গেলে যোগামা বলে, ‘যোগা, তোরে এডডা শুভসংবাদ দেই যাত্রার মুহে। বৌয়ের তো ছাওয়াল হইব।’

‘কার বৌয়ের?’

‘ধুর বোগদা! তোর বৌয়ের প্যাটে তোর ছাড়া আর কার ছাওয়াল হইব?’

‘সে আবার কী? আমার লগে তো ভাল কইর‍্যা কথাই হইল কাইলরাইতেই প্রথম। এক রাত্তিরেই প্যাটে ছাওয়াল? কও কী?’

‘ক্যান? আশ্বিন মাসে যে শ্বশুরবাড়ি গিয়্যা রাইত কাট্যাইলা! বৌয়ের লগে তহন খারাপ কইরাও কি কথা হয় নাই সোনা? তহন থিক্যাই—। তুই আবার আসবি কবে?’

যোগেন এবার ঠোঁট খুলে দাঁত বের করে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে—যোগামার মুখের দিকে। ‘কইয়্যা যা। নতুন পোয়াতি—’  

‘তোমার নাতি যহন আইব, তহন। এইডা একখান শুভসংবাদই হইল যোগামা।

‘ছাওয়ালপাওয়াল হওয়া তো সব কালেই শুভ। যাগো হয় নাই তাগো চিরডা কালই অশুভ’, যোগামা চোখে আঁচল চাপা দিতে যোগেনের মনে পড়ে যে যোগামার পেটের কোনো সন্তান নেই।

‘যোগামা, তোমার এই নাতিডা জব্বর শেয়ান হইব।’

‘ক্যা? শেয়ান দেখলি কীসে?’

‘বাপেরেও টের পাইতে দ্যায় নাই কহন আইয়্যা পইড়ছে। ডাকাতের পা। দ্যাহ-না, বাপের লগে-লগে হাঁইটব্যার ধইরছে। মৈস্তারকান্দি থিক্যা পটুয়াখালি। এ-কে ফজলুল হকের ডাক পটুয়াখালি থিক্যা কইলকাত্তা। অ্যাসেমব্লির ডাক। দেহো। আরো কত ডাক শুনার লাগে।’

‘ডাক শুনা তো শুভই। দশদিক থিক্যা দশজন যহন একজনরেই ডাকে।’

‘হ। ঠিকৈ কইছ। সেই একজন যদি সামলাইতে পারে—কার ডাকের কী জব দিবে। আর ভুল কইর‍্যা মামাকে যদি বাবা ডাইক্যা ফেলে, তয় তো মরণং ধ্রুব।’

.

যোগেন মণ্ডল বিএ, বিএল, এমএলএ তার বাড়ির দুয়ার বেয়ে নেমে খালঘাটার দিকে হাঁটে একা-একা। ছোড়দিদি আর টুনি ঘাটে বসে আছে তার বাহন ঠিক করে। যোগেন মণ্ডলের পরনে ধুতি, একটু আধময়লা; তার পায়ে গোড়ালি পর্যন্ত ধুলো। গায়ে পাঞ্জাবি। তার বুকপকেটে ফাউন্টেন পেন। সাইড-পকেটে রিস্টওয়াচ। আধময়লা হলেও গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা ধুতি আর ধুতির ওপর পাঞ্জাবি তার জাতভাইরা কেউ মৈস্তারকান্দিতে পরে না। তার কোনো-কোনো জাতভাই সুট-টাই পরে বটে কিন্তু তাদের সংখ্যা হাতের আঙুলে গোনা যায়।

যোগেন মণ্ডল এই সাজে খালঘাটের দিকে হাঁটছে।

ইতিহাসের ভিতরে ঢুকে পড়ার ঐ সাজে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *