২৬. ফজলুল হকের মাথা ও যোগেনের সন্দেহ
‘এই আপনার গোপন পলিটিক্যাল মিটিং? শিডিউলগো জিতার দাম নাই। তাই, তারা গান বান্ধুক।’
‘কথা ঘুরাইও না মণ্ডল। কইছি—ইন্ডিয়ায় তুমি ফার্স্ট হইল্যা যে শিডিউল হইয়্যাও জেনারেল সিটে জিতত্যা, তেমন জিতাডাও কাজে লাগে না।
‘কোন্ কাজের কথা কন?’
‘তোমরা তো শিডিউলই জিতছ, আইন সভার ৩০-৩২ জন তো জিতছ তোমরা শিডিউল। ঐ কংগ্রেসের জনা সাত ধইর্যা। কিন্তু তোমরা তো কেউ কারো মুখও চেনো না। সগলে শিডিউল—এই-যা মিল। ৩০-৩২-ডা এমএলএ মানেডা বুঝো? রাজা বানাইব্যার পারো। রাজা ফেইলব্যারও পারো। পারো কিন্তু পারো না। তোমরা ৩০-৩২ জনই তো স্বতন্ত্র, ইনডিপেনডেন্ট। তোমাগো কোনো পার্টি নাই, ব্লক নাই, নেতা নাই। যদি থাইকত, তালি আমারে কি আর প্রাইম মিনিস্টার হওয়ার লগে কংগ্রেসের কাছে ভোট চাইব্যার লাগে?’
‘সব ফলাফল বাইরিয়্যা গিছে?’
‘বায়রায় নাই। খবর যা পাইছি। মন্ত্রী হইব্যার উমেদারগো ভিড় লাইগব্যার ধইরছে।’
‘আপনি-যে প্রাইম মিনিস্টার হইবেন, সেইডা ঠিক হইয়া আছে?’
‘সেইডা তো ঠিকই আছে। কিন্তু কোন্ দলের থিক্যা হইব, তারা অ্যাহনো ঠিক করে নাই।’
‘তালি তো আপনার এই এমন জিতারও কুনো দাম নাই। প্রাইম মিনিস্টার ঠিক হইয়্যা গেল, কিন্তু তার চেয়ারডার চাইর পাও ঠিক নাই। পার্টি নাই, ব্লক নাই, নেতা নাই—’
‘আরে ছ্যামড়াডা কয় কী? এতগুলো এমএলএ জিতল, ২৫০ডা, তাগো মন্ত্রী কইরব কেডা, আমি ছাড়া?’
‘আপনারে প্রাইম মিনিস্টার কইরব কারা?’
‘যারা মন্ত্রী হইব্যার চায়—’
‘তাগ তো নিজেগ পার্টি আছে, ব্লক আছে। আপনি তো আইজ মুসলিম লিগ, কাইল ইউনাইটেড, পরশু কৃষক-প্রজা। ওরাও তো কইব্যার পারে—এর মাথার ঠিক নাই।’
‘কইব্যার পারে কও ক্যা? কয় তো। মাথার ঠিক নাই তো ন্যায্য কথা। কিন্তু মাথাখান তো আবার ফজলুল হকের। তয়? নাকী সেডাও তোমার সন্দেহ?’
‘আমার সন্দতে আপনার কী আসে-যায়? আপনে তো আপনেই।’
‘আরো কও। কও যে আমার তুল্য আর-কেউ নাই, ভুভারতে নাই। কও। নাকী তোমার সন্দেহ আছে।’
‘সন্দেহ নাই। কিন্তু থাইকলেও স্বীকার যাওয়ার সাহস নাই।’
‘আরো কও। অ্যাহন যারা পলিটিক্স্ করে, তাগো সগ্গলের চায়্যা সিনিয়ার আমি। কও। ‘জিন্নার থিক্যাও?’
‘জিন্না? তিন-না-চাইর বছরের ছোড?’
‘নেহেরু?’
‘বাপ না ব্যাটা?’
‘বুইঝছি। গান্ধী?’
‘বয়সে দুই-তিন বছরের বড় হইব্যার পারে। কিন্তু স্যায় যহন পলিটিক্স কইরব্যার আইল ইনডিয়ায় তহন তো নাইনটিন সিক্সটিনের লখনৌ প্যাক্ট কইর্যা সারছি। আমি তহন কংগ্রেসেরও প্রেসিডেন্ট, মুসলিম লিগেরও প্রেসিডেন্ট। আর-কেউরে দেইখছ অ্যামন? আমারে কয়—মুসলমানের শত্রু। ক্যান? না, লিগের শত্রু মানেই মুসলমানের শত্রু। আরে, তোরা তো মুসলমান হইলি লাল পরশুদিন আর লিগ করলি সামনের পরশুদিন। আমি তো লিগের প্রতিষ্ঠাতা—১৯০৬-এ।’
‘গাল পাড়েন কারে? আমারে কি পড়া জিগানোর ধইরছেন?’
‘তোমারে কি জিগাইব রে মণ্ডল? তুমি তো দুগ্ধপোষ্য। কই আমার জাতভাইগো—সুরাবর্দি, নিজামুদ্দিনগ। যত্ত সব নবাবের পাছাচাটা। এই নবাব-জমিদারগ উচ্ছেদ না কইরলে বাংলার মুক্তি নাই। আমারে লুক্যাইয়া কইরল—ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি। জিন্নায় ভাইবছিল, আমার মাথায় পা রাইখ্যা মুসলমান কৃষকের ভোট গুনব। আর মাথাখান তো ফজলুল হকের। ঢাকার নবাব সলিমুল্লা, তেগো বাপের বাপ, কইছিল, ফজলুল রে, তোর মাথাডা আমারে দে আর আমার গদিখান তুই নে। নাকী তোমার সন্দেহ আছে?’
‘কী সন্দেহ কইরব, এই মামলায়? নবাবের সম্পত্তি কি আমার সন্দেহের সীমায় আসে?’
‘ও। আর আমার মাথাডা তোমার সন্দেহের সীমার মইধ্যে পড়ে?’
‘সে হয় নাকী? নবাবশাহেবই তো এক্সচেঞ্জ ভ্যালু বইল্যা দিছেন। তাঁর সম্পত্তিতে যদি বিশ্বাস কইরতে হয়, তালে, আপনার মাথারেও বিশ্বাস কইরতে হয়। দুইডার ভ্যালুই সমান।’
‘দ্যাহো মণ্ডল, আমারে আইন শিখাইয়ো না। আমি আশু মুখার্জির জুনিয়ার ছিল্যাম।’
‘আমি আবার আইন কইল্যাম কহন?’
‘কইল্যা না—বাই ডেরিভেশন আমার মাথার দাম মাইনতে পারো? তাতেই তো বুঝা যায় এই মাথার ইনট্রিনশিক দর লইয়্যা তোমার সন্দেহ আছে। এইগুল্যা হইল জিন্নার ব্যারিস্টারি। বড় ব্যারিস্টার, মণ্ডল, খুব বড়। ও এই ডেরিভেশনের খেলায় এক্কেরে যারে কয়, মাস্টার। এক আমি বইল্যাই পার পায় নাই, গান্ধী রে তো সকাল-সন্ধ্যায় চুবায়।’
‘আপনারে চুবানো আর গান্ধীরে চুবানো কি এক হইল? দুইজনের সাইজ মাপছেন? আপনারে চুবানোর লগে তো পদ্মা-মেঘনার নাগাল বড় নদী চাই, নেহাৎ যদি একখান সমুদ্দুর হাতের বগলে পাওয়া নাই যায়। আর, গান্ধীরে তো ধাক্কা মাইরলেই গড়াইয়্যা পিছনের খাল কী ডোবায় গিয়া পড়বে নে।’
‘গান্ধী রে চিনো না মণ্ডল, চিনব্যার যাইয়ো না। তুমি তো পিছনের ডোবার জলে গান্ধী রে ফ্যালাইয়া আগাইয়্যা গেলা, ভাইব্ল্যা ঝামেলা চুইকছে। তারপর, এক অমাবস্যার রাইতে দেইখলা সামনে য্যান কে আসে–দ্যাখতে তো গান্ধীর নাগালই নাগে। তহন তো তুমি বুদ্ধি-মন্তর সব ভুইল্যা যাবা মণ্ডল, জিনের কলমা পইড়বা, না, ফজরের নামাজ পইড়বা। আমার তো সে-খ্যামতা নাই। আমার তো আছে এক সম্মুখসমর। বুদ্ধি কইরছিল কি, জিন্না, ভোটের আগে, ভাবো। আমারে দিব পিছন থিক্যা কাঁচি চালাইয়া। কাঁচি খাইলে আর সম্মুখসমরে আগান্ যায়? কাঁচি বুঝো নি? ফুটবলের? হিলচার্জ। আমি তো কইলকাতার মাঠে ব্যাকে খেলত্যাম। আমারে হিলচার্জ কইরতে তো নৌকা-সাইজের পাও দরকার। জিন্না, সুরাবর্দি, নাজিমুদ্দিনের পাও তো লেডিজ পা—তাও কত ঢাকা-ঢাকনি, মোজা-জুতা-ফিতা। আরে, তোরা পারস আমার বরিশালি আল-খাল পরানো পায়ের লগে? দিল্যাম একখান লাথি, ঘাড় না-ঘুরাইয়্যা, পিছনে, কতডা জোর আর সিয়োর হওয়া লাগে কও, ফুটবলে তো তোমার ভাবনাচিন্তার টাইম নাই। ভাবার আগে কাম। দ্যাহো…’
হকশাহেব উঠে মেঝেতে লুঙিটা একটু তুলে যোগেনকে ফুটবল দেখাতে শুরু করেন। যোগেন বলে, ‘কী দেহান, এহানে, হকশাহেব? আপনার তো ফুট আছে, বল নাই।’ হকশাহেব ধমকে ওঠেন, ‘আরে, শিখাইলে শিখে না? এইডারে কী কয়?’ বলে তিনি ডান পা সামনের দিকে ছোঁড়েন।
‘কী আবার কয়। কিক।’
‘গুড। তুমি জানো মনে হয়। খেলো নাকী’ তালে এডারে কী কইব্যা? বলে হকশাহেব তাঁর ডানপাটাকে বেশ জোরে পেছন দিকে ছোঁড়েন। ছোঁড়া হয় ভালোই কিন্তু টাল খেয়ে যান, ‘বয়স হইছে তো! ব্যালান্স রাইখবার পারি না।’
‘আর, আপনারে ব্যালান্স রাইখব্যার হব না। বসেন।’
‘কইল্যা না, এডারে কী কয়?’
‘কী আবার কইব—ব্যাককিক। বসেন তো।’
‘অ রে মণ্ডল। তুমি তো দেহি সবই জানো। তালে এডা কী কও?’
হকশাহেব লুঙিটা আরো তুলে নিয়ে বাঁ পায়ের ওপর পুরো ভর দিয়ে লম্বা, শক্ত, ডান পা-টাকে সামনে ছড়িয়ে বাঁয়ে ঘোরালেন। দেখতে ভালো লাগে। যোগেনের চোখে সেই মুগ্ধতা এসে যায়।
‘জানো না, এডারে কী কয়?’
‘জানি-কী-না-জানি, আপনি বসেন। শ্যাষে বুড়া মাইরা খুনের দায়ে পড়ি!’
‘ওরা তো সেই বুদ্ধিই করছিল। বুড়াকে মাইর্যা খুনের দায়ও বুড়ার ঘাড়ে চাপাইব,’ হকশাহেব নিজের জায়গায় বসে বলেন, ‘এই হইল জিন্নার ডেরিভেটিভ কৌশল। ইস্পাহানিরে লাগাইয়া ভোটের মুখে, মাস আটেক আগে, ঢাহার নবাবরে দিয়্যা এক দল খাড়া কইরল। নবাবগো বুদ্ধি তো আর নবাবগোর চায়্যা বেশি হবার পারে না। নবাব হবিবুল্লাহ খুইল্যা বইসলেন—ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি। সুরাবর্দি মজলিশ আর লিগ তো ছিলই। বাকি রইল্যাম এক আমি। জিন্নারি কইলকাত্তায় আইসলেন মুসলমান পার্টিগুলারে একখান ছাতার তলায় আইনতে। হইল সইসাবুদ। তারিখখান দেখো, গত বছরের আগস্টের ১৮ই। পরের দিন জিন্নারে নাকী সংবর্ধনা দেয়ার মিটিং ডাকা ছিল। আমি জাইনত্যামই না। আমারে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসাইয়্যা চইল্ল জিন্নার প্রশস্তি। তারিখটা খেয়াল রাখো—১৮ আগস্ট চুক্তি, ১৯ আগস্ট জিন্নার অভ্যর্থনা। এই দুইডা যদি মিলাও, তালে, তো অ্যাড্ডাই ডেরিভেটিভ কনক্লুশন হইব। জিন্নাই এডা করাইছে, জিন্নাই আমাগ নেতা। সেই সুবাদে পরদিনই সকালে এই আমাগ ডেরিভেটিভ নেতা মহম্মদ আলি জিন্না গিয়্যা ছোটলাটকে সেলাম বাজাইয়্যা বইল্যা অ্যালো, ‘স্যার, সব ঠিক কইর্যা দিয়া গ্যালাম।’ মানে, ফজলুল হকফক কেউ না। আ রে, এ তো হিলচার্জ করব্যার লাগছে। আমিও ছুইড়ল্যাম ব্যাককিক। ঐ ২০ তারিখ সন্ধ্যাবেলায়। কার বিচিতে লাইগল আর কার বিচি মাথায় উঠল—জানি না। ঐ ডেরিভেটিভ আরগুমেন্ট আর মাথায় খেলে না—বিচি মাথায় উঠলে। বিচিতে যে পুরা লাইগছে বোঝা গেল, পরের দিনই ২১ তারিখ। জিন্না আর তার লবাবজাদারা মিল্যা কইয়্যা দিল আমরা ফজলুল হকরে মানি না আর ফজলুল হক ইসলামের শত্রু। অ্যাহন তো ভোটের রেজাল্ট বারাচ্ছে—নিজেগ বিচি নামা আর ভোট গোন।
‘হকশাহেব, এডা তো খানিক-খানিক জানা। শিক্ষাডা কী দিলেন? কার বিচি দেখাদেখি নাই, সিধা ব্যাককিক।’
‘হ্যাঁ। অ্যাকশনের পার্টে তাই। যদি তাগদ থাকে। যদি ঐ ডেরিভেটিভরে, ঠেক্যাইব্যার চাও, তালে সিধা বিচিতে কিক। সি-ধা। দৈয়ের হাঁড়িডাই যদি ভাইঙ্গ্যা দ্যাও, ন্যাপায় আর খাইবড়া কী? যাইব্যা কবে, কইলকাত্তায়? আমার লগে চলো, ফেব্রুয়ারির সাত। আমি যাইয়্যা মন্ত্ৰী খুঁজি আর তুমি যাইয়্যা শিডিউল এমএলএ-গোর সঙ্গে দেখাশুনা করো, মনের মিল খুঁজো আর এডডা কিছু ছাতা বানাও। শিডিউলড ক্লাশ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, কী অ্যাসোসিয়েশন, কী, ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল কাস্ট ব্লক, এইসব এড্ডা বানাও। তো যাইবা তো সাতুই?’
‘না। আপনি যান। আমি পরে যাই।
‘ক্যা?’
‘না। আপনারে বিশ্বাস নাই। দশজনের সামনে ক্যাবিন থিক্যা ডাক পাইড়বেন। আর আমি ডেকের টিকিট নিয়্যা ক্যাবিনে যাই ক্যামনে?’
‘এই কামও কইরো না, মণ্ডল। এই টাকাডা তো তোমারে গবর্নমেন্ট দিব। সে-কথা ছাড়ান দাও। ফজলুল হক যদি ডেকে যায়, তালে লোকে দ্যাখে। দ্যাহো, ক্যামন মানুষ! আর, যোগেন মণ্ডল যদি ডেকে যায় তাহাইলেও মানুষ দ্যাখে। দ্যাহো, ক্যামন মানুষ, কোনো মানমর্যাদা জ্ঞান নাই, চাঁড়াল তো, ক্যাবিনে যাওয়ার সাহস নাই।’
‘এই কথাডা ভাবি নাই। ভাইবলেই-বা কী হইত! টাহা পাব ক্যামনে?’
‘আমি দিব। তুমি শোধ দিও। এই রাম—না, সাত তারিখে দুইখান ক্যাবিন টিকিট কাটবি। সিঙ্গল ক্যাবিন। জে এন মণ্ডল, এমএলএ। থাইকব্যা কনে?’
‘দেহি, ভাবি নাই, প্যারী ডাক্তারের বাড়ি তো…’
‘তোমারে তো আমার লগেই উঠানো কাম ছিল। কিন্তু তুমি নতুন মানুষ। তোমারে হাঙ্গরের মুখে ফেলি ক্যামনে?’
‘হাঙ্গর কেডা?’
‘আমার সঙ্গে বরিশাল থিক্যা তুমি কইলকাতায় নামলা। আমারে যত মালা দিব শিয়ালদায়, কইয়্যা দিলে তারা তোমারেও না-হয় দুই-একখান দিবে। তারপর, আমারই লগে তুমি আমারই বাড়ি গিয়্যা উইঠল্যা। তালে আর বাকিডা থাকে কী। ‘আজাদ’-এ হেডলাইন হইব—’ফজলুল হক কর্তৃক স্বতন্ত্র সিডিউল মেম্বার আটক—প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে।’ নাঃ, সে তো তোমার একডা এমব্যারাসমেন্ট। চলো, আমার লগে চলো আর উঠো প্যারী ডাক্তারের বাড়িতেই।’
