৩৪. যোগেনের বোঝাবুঝি
যহন এই বাড়িতে থেকে ল পড়ত যোগেন, তখনো এই ঘরের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে একটা বালিশে মাথা রেখে ঘুমোত। বাড়ির ছেলেমেয়েরা ঘুমোত চৌকিতে। যোগেনের এটাই পছন্দ–‘কইলকাতার আরাম কী কী? মশা নাই। টিপি দিলেই আলো। গঙ্গাজলের কল। আর যেহানে ইচ্ছা শয়ন।’
সেই মেঝের ওপর মাদুরে হেম নস্করের কাছ থেকে আনা কাগজপত্র থেকে যোগেন এই ভোটটাকে তার মত করে বুঝে নিতে চায়—যেমন করে নীহারেন্দুবাবু আর কবির শাহেব বুঝে নিয়েছেন। ওঁদের বোঝাবুঝিটা যে হিশেবের বোঝাবুঝি তার একটা কারণ এই ভোট থেকে ওঁদের নিজেদের কোনো লাভ নেই। লাভ কি আর নেই? কবির শাহেব তো বলেই দিলেন—শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কথা। বলে দিলেন বটে কিন্তু বুঝতে দিলেন না—ওটা কি তাঁর কথার উদাহরণ মাত্র? তিনি কি ওঁকে প্রধানমন্ত্রী চান? নাকী শুধু মন্ত্রিসভায় চান। এই হচ্ছে কবির-শাহেবের ওস্তাদি। যা বলার বলে দিলেন কিন্তু ধরাছোঁয়া যাবে না। ওঁরা তো আর মন্ত্রী হতে পারবেন না। কংগ্রেসও ওঁদের পাঠাবে না, প্রজা পার্টিও পাঠাবে না। যোগেন তার মত করে একটা খাঁটি হিশেব বুঝে নিতে চায়। সেই খাঁটি হিশেবের হয়তো হেডটেল আছে। অন্যদের মত যোগেনও চায় তার নিজের দর বাড়াতে। নমশূদ্রদের বা ডিপ্রেসড কাস্ট-এর তার মত আনকোরা নেতা আর-কেউ নেই। জমিদার-জোতদার না, বড়লোক না, ভদ্রলোকের মত শিক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য। তার বাপঠাকুরদারও কোনো পরিচয় নেই—গুরু বা নেতা হিশেবে। নমশূদ্রদের ভদ্রলোক—যোগেনের এই পরিচয়টা বের করতে পেরে যোগেন খুশি হয়। শিডিউলদের পক্ষে যে-নীতি ভালো নয়, যোগেনের পক্ষেও সে-নীতি ভালো হবে না। এটা একটা বড় হিশাব— সবাইকে এটা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
কিন্তু ভদ্রলোকদের আর নতুন ভদ্রলোক দরকার নেই যদিও, যারা আছে তারাই নিজেদের কাছা সামলাতে পারছে না, কিন্তু এই আইনে ভদ্রলোকদেরও তো নমশূদ্র দরকার হবে। তাহলে যোগেন ভদ্রলোকদের মধ্যে নমশূদ্রও হতে পারে। এটাও একটা বড় হিশাব—এটাও সবাইকে পরিষ্কার করে দিতে হবে।
কিন্তু যোগেন নিজে যদি না বোঝে—হলটা কী, তাহলে সে কী করে ধরতে পারবে হবেটা কী।
যে পার্টি যতই জিতুক—শাহেবরা যাকে বা যে-পার্টিকে চায় না, সে সরকার দু-দিনও টিকবে না। ৯৩ ধারায় গভর্নর সরকার বাতিল করে দিতে পারে—কেবল এই আইনের জোরই শাহেবদের একমাত্র জোর নয়। কংগ্রেস একটা ছুতো করে রেখেছে ৯৩-ধারাকে। আসন বরাদ্দের ব্যবস্থা যা তাতে কোনো ৯৩ ছাড়াই আইন সভার মধ্যেই তো হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে সরকার নিজেই নিজের কীচকবধ ঘটাতে পারে। ২৫০ জনের আইনসভায় সরকারের নিজের শাহেব আর ফিরিঙ্গি মেম্বার ৩০-জন। মুসলিম লিগ থেকে ঢাকার নবাব শাহাবুদ্দিনের আত্মীয়স্বজন জিতেছে নয়জন। কমার্স আর ইনডাসট্রি থেকে কোনো ভোট ছাড়াই জিতে এসেছে ১৯ জন। হিন্দু জমিদাররা পাঁচজন। কলকাতা আর মিউনিসিপ্যালিটিগুলো থেকে, ঢাকার নবাবকে বাদ ধরলেও, যারা প্রায় বিনা ভোটে জিতে এসেছে—সারওয়ার্দি, ইস্পাহানি, নুরুদ্দিন, সুলেমান মৌলবি—এই চারজনের কেউই বাঙালি না ও এদের কেউ গভর্নরের বিরুদ্ধে যাবে না। এমন একটা আলগা হিশেবেও তো পরিষ্কার যে মোট মেম্বারের ছ-আনা গভর্নরের নিজের মেম্বার। ছ-আনা মেম্বার একজোট থাকলে তারাই হয় সরকারের মালিক। এটা তো সেই পাগলও বুঝবে—হাটের চালা ছাড়া মাথায় যার চালা নেই—যদি কেউ স্বরাজ বা স্বাধীনতা চায় আর শাহেবদের এ-দেশ থেকে তাড়াতে চায়, তবে সে এই আইন সভাকে মানতে পারে না। আবার, সেই পাগল এটাও বোঝে—শাহেব-রাজত্ব রক্ষার জন্যই হিন্দুদের আসন এতটা কম করে দেয়া হয়েছে। যাতে আরো কম হয় হিন্দুদের আসন—তাই ডিপ্রেসড কাস্টকে লিস্টি করে তাদের জন্য রাখা ৩০টি আসনও হিন্দু কোটা থেকে নেয়া—এ্যকে ভগৎ সিং, তারপর চিটাগঙ, তারপর অসহযোগ, আইন-অমান্য—যোগেন অন্য সব প্রদেশের খবর খুব একটা ভালো জানে না—এই সবের পর কোনো হিন্দু-ভদ্রলোক ভাবতেও পারে না—ইংরেজ-রাজত্ব অক্ষয় হোক।
ওকালতিতে এখন এইটুকুমাত্র শিখেছে যোগেন সে একটা কেসের মেরিট-ডিমেরিট আন্দাজ করতে পারে। সেই অনুমানবোধ থেকেই সেই রাতে শুধু তারই চোখের সম্মুখে শাদা কাগজ আর কাল শ্লেটে লেখা সংখ্যাগুলির ভিতরকার সম্পর্ক সে দেখতে পাচ্ছিল। হ্যাঁ, কেপিপি গ্রামের সিটগুলোতে লিগের চাইতে ছটা সিট বেশি পেয়েছে—কেপিপি ৩৩ আর লিগ ২৭। এটাও সত্যি যে লিগ শহর বলে দাগ দেয়া ছটি সিটের ছটিই জিতেছে। শুধু তাই নয়। গ্রামীণ আসন বলে দাগ দেয়া আধা-শহুরে আসনও লিগই বেশি জিতেছে—চব্বিশ পরগনা, ঢাকা ও রংপুরে, এটাও তো দেখা যাচ্ছে,–মোট মুসলমান ভোটের প্রায় ৩২ শতাংশ পেয়েছে কৃষক-প্রজা অথচ সিট পেয়েছে ৩৬টি আর এই ভোটের প্রায় ২৭ শতাংশ পেয়ে লিগ জিতেছে। মুসলমানদের বাকি ৩৯টি আসনে জিতেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা— তাদের নিজেদের জায়গায় তাদের নিজেদের জোরে।
এই অঙ্কটা যোগেন মেলাতে পারে না। সারাটা দিন ঘোরাঘুরির মধ্যে এই অঙ্কের কথাটা তো একবারও সে শোনেনি। যেন, এই স্বতন্ত্র মুসলমান জয়ীরা হিশেবে আসে না। যেন, তারা যেন স্বতন্ত্র বলেই তাদের পাওয়া ভোট, মুসলমান-ভোট না। যেন, তারা সকলেই অপেক্ষা করে আছে যে-দল বেশি দর দেবে, তার দলে যাবে। অথচ তার এই নৈশগণিতে যোগেন তো দেখতে পাচ্ছে, মুসলমান-আসনের মোট ভোটের ৪০ শতাংশই এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ত্রিপুরার কৃষক সমিতির পাওয়া ভোট বাদ দিলেও তো স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটের ভাগ—লিগ বা কেপিপির নীচে নামবে না। ত্রিপুরায় কেন্দ্রীয় আসনে ত্রিপুরা কৃষকসভার নেতা ওয়াসামুদ্দিন আমেদ সেখানকার নবাব, জমিদার, মন্ত্রী, স্যার ফারুকি-কে হারিয়ে দিয়েছে। সে-হারানো পটুয়াখালিতে হকশাহেব যে নাজিমুদ্দিনকে হারিয়েছেন, তার চাইতে অনেক বড় ব্যাপার। কোথায় হকশাহেব আর কোথায় ওয়াসামুদ্দিন? স্যার ফারুকি তো স্যার নাজিমুদ্দিনের চাইতে কিছু ছোট না। কিন্তু এ-কথাটায় পৌঁছুতে যোগেনকে এই মাঝরাতে জোড়াসনে বসে শববাহীদের চিৎকার শুনতে হয়—বলো হরি হরিবোল?
ভোটের অঙ্ক থেকে যোগেন যে-ফল পাচ্ছে বলে মনে করে, ভোটের অঙ্কের প্রকাশ্য ফলের সঙ্গে তা মেলে না। যোগেন সে-কথা কারো কাছে জানতে চাইবে না। শুধু অঙ্ক হিশেবেও জানতে চাইবে না, কবিরশাহেব বা দত্তমজুমদারের কাছে। ভোটে মুসলমান ভোট তিন ভাগ হয়েছে—লিগ, প্রজা ও স্বতন্ত্র। আর, এটাতেই যোগেনের আশ্চর্য ঠেকে যে মোট মুসলমান- ভোটের প্রত্যেক ভাগের ভোটই সমান। ঐ ৩০ শতাংশের এদিক-ওদিক। তিনের এক ভাগ—হিন্দুবিরোধী, তিনের একভাগ—জমিদারবিরোধী, আর তিনের একভাগ হিন্দুবিরোধী নয়, জমিদারবিরোধীও নয়—বরং বোধ হয় তাদের কেউ-কেউ নিজেরাই জমিদার বা কেউ-কেউ চায়, জমিদারদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভাগ আর আদায় কমিয়ে তাদের জমিদার রেখে দিতে। যোগেন যেন বুঝে নিতে চায়—এই ভোটের ফল নিয়ে মুসলিম লিগ যতই লাফাক, মুসলিম লিগের হিন্দুবিরোধী মত ও ‘ইসলাম বিপন্ন’ আওয়াজে ভবী ভোলেনি। লিগ পাঞ্জাবে বা সিন্ধুপ্রদেশে যে গোহারান হেরেছে, সে-তুলনায় বাংলায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হওয়ায় তাদের অন্তত মুখ-রক্ষা হয়েছে। তার মানে তো অবাঙালি মুসলমানরা বাংলার রাজনীতিতে জায়গা পাবে?
তপশিলি জাতির জন্য আলাদা আসন না-থাকলে তেরজন নমশূদ্র প্রার্থীকে তো নমশূদ্র বলে আলাদা করা যেত না, ভোটে জিতলেও লোকে তো তাকে নমশূদ্র বলেই জানত না। যোগেন যদি নিজেকে বাদ দেয় আর এক কংগ্রেসিকে বাদ দেয়, তাহলেও তো ১১ জন জিতেছে নমশূদ্র জাতিপরিচয়েই। এটা কি কম কথা?
খুব কি বড় কথাও?
যোগেনের হাই ওঠে। সে হাইও তোলে আবার একটু না-হেসেও পারে না, ঠোঁটের কোণে। চোখটাও বন্ধ করে। নমশূদ্রদের ভোটের হিশেবে এসে যেন যোগেন একটু গা ছেড়ে দেয়। রসিকলাল বিশ্বাস আর মুকুন্দবিহারী মল্লিকের মত জাতের প্রধানরা এ ওকে হারায়। একজন তাঁদের কংগ্রেসি, আর-একজন ডিপ্রেসড ক্লাশ ফেডারেশন। পি আর ঠাকুরের ভাই মন্মথ রঞ্জন ঠাকুর হেরে গেল যার কাছে সে নমশূদ্র নয়। মুকুন্দ মল্লিকের ভাই পুলিন জিতল হাওড়া থেকে আর ঢাকার মোহিনী ডাক্তার, দেশবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, হেরে গেলেন কে-এক ধনঞ্জয় রায়-এর কাছে। পি আর ঠাকুর আর বিরাট মণ্ডল এসেছেন, ললিত জ্যাঠা হেরে গেলেন-একবার এর কাছে।
যোগেন ঠিক বুঝেই উঠতে পারে না—ললিত জ্যাঠা জিতলে কি সে খুশি হত? বা, সে কী সে খুশি হত? বা, সে কি চায়নি, একবার জিতলে ভালোই। নতুন নেতা, কম বয়স, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা বেশি। কিন্তু এমন রাতে নিজের কাছেও মানতে পারা তার পক্ষে অসম্ভব যে ললিত জ্যাঠা হেরে যাওয়ায় তার দুঃখ হচ্ছে না।
নমশূদ্রদের পুরনো নেতারা যে তাদের ভাই-বেরাদরদের ভোটে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেটা যোগেন পছন্দ করেনি। কিন্তু সে-কথা জানাবার তো কোনো জায়গা ছিল না। জায়গা থাকলেও জানানো যেত না। সব জাতেরই তো একটা রীত্নী আছে, মানীজন-গুণীজন আছে। নমশূদ্রদের মধ্যে যারা জিতেছে, তাদের বেশিরভাগই মুকুন্দ মল্লিকের লোক। নমশূদ্ররা শূদ্র না বামুন সে-সব বিচারের চাইতে অনেক বড় বিষয়-নমশূদ্ররাও দুই পেয়ে মানুষ। তাহলে, ক্ষমতার ভাগ তারা পাবে না কেন? ক্ষমতার সেই ভাগ জুটল বটে কিন্তু মুকুন্দ মল্লিকের হাত দিয়ে? হ্যাঁ, তারা খুব মান্যগণ্য বাড়ি, নমশূদ্রদের গৌরব, কিন্তু নমশূদ্ররা কি তাদের পরিবারের গৌরব? যোগেন নমশূদ্র হয়েও সাধারণ আসনে দাঁড়ানোতে তো তার বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রচার করেছিল—যোগেন নাকী নমশূদ্র পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। কথাটা ভোটারদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেও যায়—কে আর শুদ্দুর থাকতে চায়। হ্যাঁ। কিন্তু বামুন-কায়েতরাও তো চাঁড়ালদের সঙ্গে এক আসনে দাঁড়াতে চায় না—এমনও হতে পারে। যোগেন তার জাতভাইদের সম্মান বাড়িয়েছে। তাতে তার ভালোই লাগে। হ্যাঁ—আ। নমশূদ্র মানে দুটো-তিনটে মুকুন্দ মল্লিক না।
সে না-হয় হল—নমশূদ্র মানে যোগেন মণ্ডলই হল। কিন্তু এই নতুন আইনে যদি ‘শিডিউল্ড ক্লাশ’ বলে একটা জাত্ তৈরি না হয়, তাহলে কি মৎস্য-অবতার জল থেকে ডাঙায় উঠে বরাহ-অবতার হতে পারত। সেই বরাহ-অবতার কি তৈরি করতে পারত ইংরেজরা, যদি মৈনাক পর্বতের ডানা কেটে ও হাঁটু ভেঙে দিয়ে সমুদ্রের জলে তাকে কবর দেয়া না হত। অন্তত এই শেষ রাতে ভোটের সব সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে দরজা-সাইজের জানলা দিয়ে বাইরের আলোধোয়া কলকাতার দিকে চোখ ফেলে রেখে যোগেন কী করে অস্বীকার করবে যে একমাত্র স্বাধীনতাকামী পার্টি হিশেবে কংগ্রেসই সারা দেশের স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছে। ৩৫ সালের আইন-অনুযায়ী এই প্রথম ভোটের পর জওহরলাল বলেছিলেন, এটা পরিষ্কার যে দেশের রাজনীতিতে দুটি মাত্র পক্ষ আছে—কংগ্রেস আর ইংরেজ। ঘটনাও তাই, ইংরেজরাও মনে করে তাই। আবার, এই কংগ্রেস তো হিন্দু পার্টি নিশ্চয়। তাহলে কংগ্রেসকে ডোবাতে হলে হিন্দুদের কাটা ছাড়া ইংরেজদের উপায়ান্তর ছিল না। এক-ডানা কাটা হল, জনসংখ্যার অনুপাতে আসনসংখ্যা কমিয়ে—হিন্দুদেরও, মুসলমানদেরও। আর-এক ডানা কাটা হল—শিডিউল তৈরি করে নতুন হিন্দু বানিয়ে।
যোগেন এটা নিজের কাছে না-মেনে পারে না যে বাংলার কংগ্রেসের বা হিন্দু ভদ্রলোকদের ঠেকাতে এই অচ্ছুৎ হিন্দুদের আর মুসলমানদের ইংরেজরাই কিছু ক্ষমতার ভাগ দিয়েছে। তাহলে তো সে ইংরেজদের কাছে ঋণী। হ্যাঁ, ঋণীই। ইংরেজ না-থাকলে কি এ-ক্ষমতা তাদের জুটত? কিন্তু এটা তো কোনো নতুন প্রশ্ন নয়। ইংরেজরা না থাকলে চাকরি আর জমিদারির জোরে হিন্দুরা ভদ্দরলোক হতে পারত?
ইংরেজদের কাছে এই ঋণ তো যোগেন বা ফজলুল হক কেউই প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারবে না। কারণ, সেই স্বীকারের মধ্যে আরো কিছু স্বীকৃতিটুকুও লেগে থাকে। ইংরেজরা কংগ্রেস-ভাঙার কাজে ও কংগ্রেসকে পুরো ভারতের একমাত্র প্রতিনিধিত্ব থেকে সরানোর কাজে শিডিউলদের ও মুসলমানদের ঘুঁটি সাজিয়েছে। যোগেন একটা হাই তুলে নিজের মন থেকে অবস্থার এই গ্লানিকর সত্য সরিয়ে রাখতে চায়। ঘুঁটি যখন বোঝে সে ঘুঁটি, তখন তার ঘুঁটি হওয়ার দাম-আদায় আর কোনোদিনই শেষ হয় না। যোগেন তেতো হাসে। শুধু সংখ্যার জোরে হিন্দুরা এই সত্য কায়েম করেছে যে শাহেবরা আমাদের সভ্য বানিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহকে বলেছে ডাকাতি। আবার, এই সত্যও কায়েম করেছে যে হিন্দুরাই স্বাধীনতার জন্য দাম দিয়েছে। এটা শুধুই সংখ্যার গুণে ইতিহাস।
যোগেন ঠিক করে উঠতে পারে না—নমশূদ্র হিশেবে পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে তোলা ও সেই পরিচয়ের জোরেই ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার কাজে তার জায়গার হদিশ করে নেয়া কী করে সম্ভব? সম্ভব হত–কংগ্রেস যদি শুধুই বাবুহিন্দুদের পার্টি না হত। সম্ভব হত—শিডিউলদের যদি হিন্দু-পরিচয় থেকে একেবারে বাদ দেয়া হত। কিন্তু কংগ্রেসের পৈতে যত ছেঁড়াই হোক—কংগ্রেস সে-পৈতে খুলে ছুঁড়ে ফেলতে পারবে না। সারা বাংলায় কংগ্রেসে মাঝারি মাপের কোনো মুসলমান নেতা আছে বা কোনো নিচুজাতের নেতা আছে? সারা বাংলায়? কোনো মুসলমান-আসনে কংগ্রেস কোনো প্রার্থী দেয়নি। যতই বলুক—মুসলমান ভোট কাটতে চায়নি বলে দেয়নি, প্রজাপার্টি যাতে জেতে সেই উদ্দেশ্যে দেয়নি, মুসলিম লিগ যাতে এত আসন না পায় যে তারা নিজেদের ‘অদ্বিতীয়’ ও মুসলমানদের ‘একমাত্র’-মোক্তার হিশেবে পরিচয় দিতে পারে। আসল কথা হল, কোনো মুসলমান কংগ্রেসের প্রার্থী হতে রাজি হয়নি। তবুও কংগ্রেস সবচেয়ে বেশি সিট পেয়েছে তার কারণ, সারা রাত ধরে অঙ্ক কষে কষে যোগেন বের করল—মধ্যবঙ্গে, বর্ধমান-বীরভূম-নদীয়া-যশোরের পশ্চিমভাগটা, হাওড়া-হুগলি-বর্ধমান- মেদিনীপুরে—কংগ্রেসের বহু পুরনো সংগঠন ও নেতা, ইউনিয়ন বোর্ডের ওপর কংগ্রেসের দখল, ভোটার সংখ্যা ও ভোট দেয়ার পরিমাণও বেশি।
চার নম্বর একটা কারণও সে পেয়েছে কিন্তু সেটা বলা যায় না। বাংলার মোট নিচু হিন্দুর সংখ্যার তুলনায় এই জায়গাগুলিতেই নিচুহিন্দু সংখ্যায় কম। এ-কথা জানা গেলেও বলা যায় না—বললে মনের সন্দেহ বেরিয়ে পড়বে -মুসলমান ও নিচুহিন্দুরা কংগ্রেসের বিপক্ষে ভোট করেছে।
মাহিষ্য, নমশূদ্র আর রাজবংশী এই তিন জাত মিলেই তো মোট বাঙালির প্রায় তিনভাগের একভাগ, ঠিকঠাক হিশেবে পাঁচ আনি আর বামুন-কায়েতরা আটভাগের একভাগ, ঠিকঠাক হিশেবে দুই-আনি দুই-পয়সা। যদি দেশবন্ধু মারা না যেতেন তবে তাঁর বেঙ্গল প্যাক্টে ১৬ জিলাতেই তো লোক্যাল বোর্ডগুলি যেত মুসলমানদের দখলে। ৯টা জিলায় থাকত হিন্দু, মানে কংগ্রেস। কিন্তু তখন তো আর শিডিউল কাস্ট তৈরি হয়নি যে সে ৯টা জিলাতেও লোক্যাল বোর্ড বামুন-কায়েতদের হাত থেকে চাঁড়ালদের দখলে আসবে।
যোগেন দাঁড়ায় ও দুই হাত মাথার ওপর তুলে আড়মুড়ি ভাঙে। দরজা সাইজের বড় জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ট্রামের তার আর লাইন কিছু-কিছু জায়গায় চকচক করছে। সামনের গলির ভিতর থেকে একটা কুকুর ছুটে এসে ট্রামলাইনের সামনে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর ঘুরে ছুটে আবার গলির ভিতর ঢুকে যায়। এতটা ফাঁকা দেখে ভয় পেয়েছে, নাকী, ওর রোজকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিল। বহু দূর থেকে একটা যান্ত্রিক ক্রেংকার কানে আসাতে যোগেন অপেক্ষা করে। দেখতে-না-দেখতে শ্যামবাজার ডিপো থেকে প্রথম ট্রাম স্টপে না-দাঁড়িয়ে সোজা চলে যায়। এটাকে বলা হয় গঙ্গাস্নানের ট্রাম। সেকেন্ড ক্লাশে সেই সংকীর্তনের দলটা গান গাইতে-গাইতে যাচ্ছে।
