1 of 4

১৩. দুর্গা সেনের কাছে

১৩. দুর্গা সেনের কাছে

২৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার যোগেন শ্বাস নেয়ারও সময় পায় না। তার কেন্দ্রের নানা জায়গা থেকে লোকজন এসে পড়বে, এটা তো তার জানাই ছিল। তবে, আন্দাজ ছিল না সূর্য উঠতে- না-উঠতেই শাহারাণপুর নদীর পাড়ের মেদুয়া থেকে একনৌকো লোক এসে পড়বে। যোগেন ওখানে যায়নি, যাওয়ার কথা ভাবেওনি, ওখানকার কোনো খবরও সে রাখেনি। ভোলা-দৌলতখানে কেউ-কেউ হয়ত ভোট করছে—মেদুয়া তো বোধহয় দৌলতখান থানারই উত্তরে। এই একখান থানা, দৌলতখান, যে-থানায় মানুষের মাটি থেকে নদীর জল বেশি। ওদিকে সব থানারই ঐরকম। মেদুয়ার আর কটা ভোটার—বড়জোর হাজার-বারশ। তার জন্য এত দূর যাওয়া যাবে কী করে? ‘আ রে তোমরা আইল্যা ক্যামনে? সারা রাইত কি নাও বাইলা?’

শাদা নুরে শাদা টুপিতে মোড়লমত এক মুসলমান বলে ওঠেন, ‘ক্যা? নাও লাইগব ক্যা? আল্লা তো দেহ দিছে, সাঁতার কাইট্যা আসছি।’

যোগেন একে চেনে না। তবে এরা যেরকম করে বসেছে, তাতে সাঁতার কেটে আসাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না—বরিশালিয়াদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। আর-একজন জোয়ান ছেলে বলে ওঠে, ‘আপনে তো জিতার আগে আর পৌঁছব্যার পাইরলেন না, তাই আমরা ভাইবল্যাম, জিতা যখন হইয়্যাই গেল, চলো, যারে জিত্যাইল্যাম সেডা কী বস্তু, পাথর না গাছ না মানুষ একবার দেইখ্যা আসি।’

‘সেই কেডা না কইছিল—মরণঘোষের মেলা দেইখতে আইলাম, মরণরে তো দেইখলাম না।’

‘আরে মৈনুদ্দি কাকা, এইডাই তো আমাগো জিতা মানুষডা? সদর বরিশালে তো জিতা-মেম্বারের অভাব নাই। ভুল জায়গায় আইলেন না তো?’

কথাটাতে যেন তেমন করে হাসি উঠল না। এটাও তো ঠিক যোগেনও এঁদের দেখেনি, যোগেনকেও এঁরা দেখেনি। এমন হওয়া তো একেবারে অসম্ভব না যে ওড়াকান্দির পি-আর ঠাকুরের কাছে যাওয়ার জন্যই এঁরা বেরিয়ে ভুল করে যোগেনের কাছে চলে এসেছে।

‘থো দেহি। এ কি মাইয়্যা বদলাইয়া শাদি দেয়া? দেখাইল এক মাইয়াক আর বহাইল আর-এক মাইয়াক?’

‘যে দেখাইল্যা-মাইয়াটাক দেইখছে আর যে বহাইল্যা মাইয়াটাক দেইখছে সেই চারিখান চক্ষু কি একডা মাইনষের নাকের দুইপাশে, না কী দুইডা মাইনষের নাকের দুইপাশে?

যারা এসেছিল, তারা খুব নিশ্চিন্তমনে ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল। তাদের সেই ছড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতেই যোগেন বুঝে যায়, না, ওদের কোনো ভুল হয়নি, ওরা পি-আর ঠাকুরের ভোটার না, তারই ভোটার।

ইতিমধ্যে আশপাশের জায়গাগুলো থেকেও লোকজন এসে জুটেছে। মাঝেমধ্যে আওয়াজ উঠছে—’যোগেনো মণ্ডলো’, ‘জয় জয়’। লোক বেশি হওয়ার সুবিধে এইটাই যে লোকজন নিজের-নিজের লোক খুঁজে যায় ও খুঁজে পায়। যোগেনের কিছু করার থাকে না। মাঝেমধ্যে তাকে বারান্দায় দেখলেই লোকজন ‘জয় জয়’ শুরু করে। ২৫ তারিখের সন্ধ্যা রাতে যোগেন তো সবার সঙ্গেই ছিল। তখন তো তার এমন কোনো সমস্যা হয়নি—এই মানুষ-সমাবেশের সঙ্গে তার কীরকম ব্যবহার করা উচিত? সবার সব ইচ্ছা তো আর পূরণ করা যায় না। কেউ তো তার কাছে কোনো ইচ্ছা জানায়নি। কিন্তু ভিড়ের দিকে তাকালেই তার চোখে পড়ে যায়, তার সমবয়েসি বা প্রবীণতর কেউ দাঁড়িয়ে। যিনি দাঁড়িয়ে, তিনিও শুধু যোগেনকেই দেখছেন। বেলা একটু বাড়লে যোগেন ভিড়ের দিকে চোখ রাখা ছেড়ে দিল। বিকেলের মধ্যেই একবার ও মুখ না ফিরিয়ে সেই ভিড়ের দিকে বাঁ-হাতটা নাচান। এই দুই বেলার মাঝখানে এক সময় যোগেন, তার সাইকেলটা নিয়ে বেরয়—’বরিশাল হিতৈষী’র সেই অফিসে পৌঁছুতে। সব কাজের একটা হিশেব থাকে। সেই হিশেবমত কাজ না হওয়ার দোষ পরে আর কিছুতেই কাটানো যায় না। কাল রাতেও দুর্গা সেন মশায়েরা হয়ত ভাবছিল, যোগেন আজ আর কী আসবে! কিন্তু আজ সকালের মধ্যে না গেলে ওঁরা নিজের মনে-মনে জেনে যাবেন—যোগেন তাহলে সত্যিই এল না। এই কথাটা একবার মনে এসে গেলে আর দূর হয় না—সে মণ্ডল যতবারই যাক। বাড়ির এই ভিড়টা হয়ত দুপুরে কমে বিকেলে বাড়বে। এখনই দুর্গা সেনদের প্রণাম করে আসার ঠিক সময়—দেখা হয়ে যাবে অথচ বেশিক্ষণ থাকতেও হবে না।

যোগেন একটু ঘুরপথ নিল। সোজা পথে গেলে বাজারের ভিড়ে পড়তে হবে আর বারবার থামতে হবে।

সেই ঘুরপথে যেতে-যেতে যোগেনের মনে এসে যায়—আচ্ছা, এঁরা সবাই মিলেই তো তাকে জিতিয়েছে, তাহলে যোগেন এমন চোর-পুলিশ খেলছে কেন। সে কি ভোটে জিততে- না-জিততেই, এখনো তো গেজেট হয়নি, ভোটের নেতা হয়ে গেল নাকী? নিজেকে যোগেনের ভাল লাগল না।

দুর্গা সেন মশায় একা ছিল। সাইকেল বাইরে রেখে যোগেন ভিতরে ঢুকল। পাশ থেকে ঘাড় ঝুলিয়ে দুর্গা সেনের পা খোঁজে যখন যোগেন, তার মাথাটা দুর্গা সেনের পেটের ওপর নেমে আসে। দুর্গা সেন যোগেনের মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরেন। তার মত মানুষের এতটা আবেগতাড়না প্রকাশের জন্য এতটা একাকীত্ব দরকার ছিল। সেনমশায় হাত সরানোর পর যোগেন সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এত বড় যে একটা ঘটনা এইমাত্র ঘটল, হয়ত এই ঘরে আর-কেউ নেই বলেই ঘটল, দুজনের কেউই সেটা নিয়ে কিছু বলে না তো বটেই, নিজেদের ভিতরের আলোড়ন সামান্যও দেখায় না।

‘গ্রাম থেকে মানুষজন আসত্যাছে। তাগো মাতবরগও চিনি না। তারাও নাকী আমাক দেখে নাই কুনোদিন। এদিকে আপনার সঙ্গেই দেখা করা হয় নাই। তহন আমি প্রহ্লাদদারে কইল্যাম—প্রহ্লাদদা, তুমি এডডু যোগেন মণ্ডল হইয়্যা খাড়াও, আমি এই গ্যালাম আর আইল্যাম।’

যোগেনের কথা-বলার ধরনে দুর্গা সেনও হেসে ফেলেন। যোগেন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, দুর্গা সেনের ঠোঁটের ভঙ্গিতে তার মনে হল তিনি কিছু বলতে চাইছেন। কথা বলার সেই বাধাটুকু পেরিয়ে দুর্গা সেন বললেন, ‘কিন্তু গ্রামের ঐ মানুষজন, যারা তোমারে দেখেন নাই, তুমিও যাদের চেনো না, তারাই তো এই জয়ডা ঘটাইল।’

‘সে তো ঠিকই স্যার। মাইনষে অবিশ্যি অন্য এড্‌ডা কথা কওয়াও ধইরছে—’  

দুর্গা সেন তাকিয়ে থাকেন।

যোগেন বলে, ‘কওয়া ধইরছে স্যার, যোগেন মণ্ডল কেডা, জিতছে তো দুর্গা সেন।’ দুর্গা সেন ডান হাতটা তুলে যোগেনকে থামান। তারপর বলে, ‘তুমি কি এমন কথায় সন্তুষ্ট হইব্যার কারণ পাইছ।’

‘সন্তুষ্ট অসন্তুষ্টের তো কথা না স্যার। কথাডা হচ্ছে মানুষ সত্যি কথা কইলে আমি কী করব, স্যার।’

‘না, তোমারে কিছু কইরব্যার কই না। জিগাই। কথাডা তোমার ভালই লাগছে শুনতি?’

যোগেন তার সেই খোলা হাসি হাসেন।

‘যো—গেন, মানে, কই কী, এই কথাডা যদি দুই-একজন বইল্যা দ্যায়, তাহাইলে তোমারে আর কৃতজ্ঞতার ছালা ঘাড়ে কইরতে হয় না। না-হইলে তোমার নিজেরেই তো আগ বাড়াইয়্যা কইতে হইত!’

‘সে তো স্যার এখনো কইব্যার লাইগবই। সত্যি কথা কি একজন কইয়্যা দিলেই আর-একজনের কওয়া নিষিদ্ধ হয় স্যার?’

‘শুনো যো—গেন, এক নম্বর—কথাডা ষোল আনা ঠিক না, খুব বেশি দর ধইরলেও কথাডার দাম বড়জোর চাইর পাই। তোমারে জিত্যাইছে এড্‌ডা জাগরণ। সেই জাগরণে তোমাগ জাইতের মনুষ্যরা, মুসলমানরা আর আমাগো মত ভদ্র হিন্দুদের কেউ-কেউ—মিল্যা গিছে। এই মিলন স্থায়ী কিছু না। খড়ের আগুনের নাগাল জ্বইল্যা উইঠছে।’

‘হ্যাঁ স্যার। ভোটের তফাতটাও তো কিছু বেশি না। হাজার দেড়েকেরও কম। দত্তবাবুমশায় আর সাড়ে-সাতশ-আটশ ভোট পাইলেই তো মণ্ডল কাইত।’

‘ভোটের শতকরা হিশাবড়া পাইছনি?’

‘পাই নাই স্যার, কিছু-কিছু শুইনছি।’

‘কও দিনি।’

‘ভোট দিছে স্যার পাঁচ-আনির কম।

‘সেও তো হওয়ারই পারে। চোদ্দ আনিই তো এই পরথম্ ভোট দিছে। তাও আবার মাইয়ালোগ আছে কত। তবু যদি ছয় আনি ছুঁইত যোগেন—বুঝা যাইত ঐ জাগরণডা স্থায়ী হবারও পারে। খড়ের আগুন না হইয়্যা বনের আগুনও হইব্যার পারত।’

‘তাহাইলে স্যার, আমার গণেশও তো কাইত হবার পাইরত, স্যার!’

হ্যাঁ। অঙ্ক-অনুযায়ী পাইরত। কিন্তু এই হিশাবড়া মহা ভুল হইব যে ভোট কম পইড়ছে বইল্যা তুমি জিতছ। প্রদত্ত ভোট এক আনি বাইড়লে ধরো হাজার দেড়েক। এই পুরাডা তোমার বিরুদ্ধে যাইব্যার কারণডা কী? তার উপর তুমি তো, যোগেন, ভোট পাইছ নয়-আনির উপর। এইডাই তো মোস্ট সিগনিফিকান্ট। তুমি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জিইতছ।’

‘জিতা তো হইল, করবডা কী?’

‘যোগে—ন, ঐখান পর্যন্ত দুর্গা সেনের দৃষ্টি নাই। করাডা সবড়া তোমাগো হাতেও থাকে না। একডা কথা তো ভোলা চলে না। আমি তো আছি বরিশালে। তুমি যাবা কইলকাতায়। কিন্তু তোমারে তো কাজ কইরতে লাইগবে পুরা ভারতবর্ষের হিশাবে।’

‘ভারতবর্ষ? তার তো কিসুই দেখি নাই, স্যার।’

‘এইবার দেইখব্যা। এক্কেরে তলার থিক্যা?’

‘আপনি তো স্যার কইয়্যাই খালাশ। আমার কি দেখার সেই চক্ষু আছে? নাকী, কোন দেখাড়া ঠিক আর কোন দেখাড়া বেঠিক, তার হদিশ জানা আছে? শ্যাষে আলো দ্যাখ্যাইয়া পথ ভুল্যাইয়া পেত্নী না কাদায় ডুবাইয়্যা মারে?’

‘শুনো যোগে—ন। খালি নিজেরে নিয়্যা ভাইবো না। ভাইবো—ঘাটে একখান মাত্র নাও আছে আর সামনে নদীতে আইসছে বন্যা—দুই দিক থিক্যাই। উপুর থিক্যা নদীগুলার জল আর তলা থিক্যা সমুদ্রের কোটাল। তোমার আর কুনো ফিরান নাই। তোমারে পার দিবার লাইগবই তুমি কী কইরব্যা। নাও তো ঐ একখান। তুমি কি অ্যাহন নৌকাডার ফাটল আর ফুটা গুইন্যা ঠিক করবা ভাসবা কী ভাসবা না? নাকী পাড়ে খাড়াইয়্যা থাইকলে মরণং ধ্রুব বুইঝ্যা ঐ নৌকাডা ভাসাইব্যা? যদি ফাটা কী ফুটা থাকে তাও তো জল সেঁইচ্যা নৌকাডারে আর নিজেগেরো বাঁচান্ যায়। ভালমন্দ বিচার কইরো না যোগেন।

‘স্যার, আপনার কথায় তো ডরে সুষুম্নাকাণ্ড থিক্যা কুলকুণ্ডলিনী পা আর পাছা দিয়া মাটিত্ গড়াগড়ি খাইব্যার ধরসে।’

‘আরে, কুলকুণ্ডলিনী তো মাটিতই পড়ব। গামছা হোক আর ধুতির কোঁচা হোক, শুইষ্যা নিবা বেবাক।’

‘স্যার, আর ভয় খাওয়াইবেন না। আমি যাই। অ্যাহনো তো বাড়ি যাইব্যার পারি নাই। দেখাসাক্ষাৎ না হইলে ক্ষমা দিবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *