১২. কাটা জিভের ভাষা
এমন একটা ধারণা ছিল সবার যে কীর্তিপাশা বাবুদের বাড়ি থেকে প্রহ্লাদ দত্তের বাড়ি এসে আবার জয়োৎসব করা হবে। তখন ভিড়ের ভিতর অনেকেই আছে যারা বাইরে থেকে এসেছে, রাতে আর ফিরবে না। দলবল আসার আগেই প্রহ্লাদ দত্তের বারান্দায় বাঁশের সরু বাতার তিন-চারটি বড়-বড় ঝুড়িতে নিমকি, লুচি, আলুর দম আলাদা-আলাদা রাখা। পাশেই কেরোসিনের টিনের মত একটা বড় টিন ভর্তি রসগোল্লা। কে যে ভাবল, কে যে আনল—সেটা কেউই জানে না। ছোটকাঠি-র কবির বারান্দায় উঠে এক-একটা ঢাকনা খুলে চিৎকার করতে লাগল, ‘কারো কি মিষ্টির ক্ষুধা আছে? রসগোল্লা খাবা?
‘আরে ঐ টিনডা ধইর্যা রাইখ্যা দে। কাইল সকালে খাব।’
কবির দ্বিতীয় ঝুড়িটার ঢাকনা খুলে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘নিমকি আছে রে, নিমকি, গরম এহনো।’
‘দে, দে কবির, নিমকি খাইয়্যা মুখ নোন্তা কইর্যা রসগোল্লা খাব।’
কবির পুরো ঝুড়িটা দু-হাতে মাথার ওপর নিয়ে নেমে গিয়ে রাস্তার ওপর উবু হয়ে বসে বলে, ‘নে, আমার মাথাডারে মিষ্টির দোকানের কড়াই ভাইব্যা নে।’
ধাক্কাধাক্কির কোনো দরকার ছিল না। কীর্তিপাশার বাড়িতে এমন চুপচাপ খেতে হয়েছে আর এত ভাল-ভাল মিষ্টি, যে এখন একটু ধাক্কাধাক্কি করে নিজেদের চেনা নিমকি কাড়াকাড়ি করে না খেলে যেন বিজয়োৎসব সম্পূর্ণ হবে না।
শীতের রাতে ভারী বাতাস ঘিয়ের গন্ধমাখা হয়ে যায়।
নিমকির হৈ-হৈ চোকার পর কেউ হেঁকে ওঠে, ‘এই কবিরদা, বাকি ঝুড়ি দুইখান দ্যাখ।’ কবির আবার বারান্দায় উঠে ঝুড়ির ঢাকনা খুলে হাত দিয়ে তাপ বুঝে চিৎকার করে, ‘আরে লুচি রে লুচি, গরম
‘ঐডাতে কী, দ্যাখ!’
প্রহ্লাদ দত্ত আর যোগেন ভিড়ের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছিল। প্রহ্লাদ দত্ত যোগেনের কাছে বলে, ‘আমি আছি। তুমি যাইয়্যা এড্ডু হাত-পা ছড়াইয়্যা ন্যাও। রাইত পোহাইলেই তো মানুষের ঢল নামব। স্যানবাড়িতে তো খাইল্যা য্যান কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের খাওন।’
যোগেন বুক ফাটিয়ে হেসে ওঠে, এত আচমকা, ভিড়ের দু-একজন তাকায়। ‘খাওয়া পাইলে খাব না? তুমি কি ডর খাইছিল্যা প্রহ্লাদদা?’
‘না, ঠিক ডর খাই নাই। একবার মনে উঠল—পারব তো, অ্যাহন তো শরীর খারাপের টাইম নাই। লোকে আবার ভাইব্যা না বসে, এ আবার কেমন মেম্বার? কথা কইতে কইতে হাইগতে ছোটে?’
‘শের আফগান আত্মরক্ষায় অক্ষম নহেন। আরে, ধইরছেনি কেউ কুনোদিন এত মিষ্টি মুখের কাছে? ঐ মিষ্টি দেইখ্যা আর ঠাকর্যানগ দেইখ্যা জিভ সংবরণ করে কার সাধ্য?’
বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, কোথাও শোয়ার মত একফালি জায়গা নেই। চৌকিতে, মেঝেতে, ভিতরের বারান্দায় যে যেখানে পারে, গা এলিয়ে দিয়েছে। হাঁটাই মুশকিল।
‘দেখো কাণ্ড! তোমার-আমার কথা কারো মাথায়ই নাই’, প্রহ্লাদ দত্ত যেন একটু বিরক্তই।
‘কার মাথায় থাইকব? এইখানে কি তোমার শাশুড়ি আছে?’ যোগেন হাসি শুরু করতেই প্রহ্লাদ বলে ওঠে, ‘তোমার ঐ কংসবধের হাসিখান আর তুইলো না যোগেন। ঘুমের মধ্যে মানুষজনের বোবা ধইরব?’
সেই হাসিতেই প্রহ্লাদের মা, যোগেনের কেষ্টার, গলা এল, ‘কেডা রে?’ আর যোগেন প্রহ্লাদকে চোখ টিপে বলে উঠল, ‘আমি কেষ্টার পাশে পা গুটাইয়া শুইয়া পড়ি, তুমি ঐ দিক সামলাও।’ যোগেন কেষ্টার ঘরের দিকে পা বাড়াতেই প্রহ্লাদ লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরে।
‘কেডা রে?’
‘তোমার রাই, কেষ্টা। তোমার লগে শুব। আইজ আমাগ কুঞ্জবিলাস।’
‘আয়। আমি তো সারারাত বকবক করি। তোর তো ঘুম হইব না।’
যোগেন তখন পাঞ্জাবিটা খুলছিল, বলল, ‘হইব। হইব। তোমার ঘরে কেউ ঢুকে নাই?’
‘ঢুকব্যার নিছিল। বড়বৌমা খেদ্যায়্যা দিছে—রাইতে ঘুম না হইলে কাইল সকাল থিক্যা বুড়ির যে ব্যায়াল উঠব, সেইডা সামলাইবো কোন মেম্বার?’
যোগেন বুড়ির পাশে শুতে-শুতে প্রহ্লাদকে বলে, ‘প্রহ্লাদদা যাও গিয়্যা। লুচি খাও’। প্রহ্লাদ লন্ঠন নিয়ে চলে যায়। বুড়ি যোগেনের মাথা বুকে টেনে নিয়ে কান্না ভেজা গলায় বলে ওঠে, ‘তোর মায়ে যদি আইজ বাঁইচ্যা থাইকত—’
যোগেন একটু ধমকের স্বরে বলে, ‘তুমি তো কইল্যা ঘুমের মইধ্যে বকবক কইরব্যা। কাঁইদব্যা তো কও নাই কেষ্টা?’
‘না। তাই কই। তুই এতবড় একখান মানুষ হইলি, তোর মাও তো দেইখ্যা যাইতে পারত, আর এড্ডু বাঁইচলে? আমি যহন বাঁইচ্যা আছি, সে-ও তো বাঁইচব্যার পারত রে রাই। তাই কই। তোর মনে হয় নাই?’
‘ছাড়ান দ্যাও তো! চোখের জল না ফেইললে তোমাগো কুনো সুখই সুখ হয় না।’
‘সুখের সময়ই তো তাগো মনে পড়ে, যারা নাই।’
যোগেন পা দুটো একটু ভাঁজ করতে গিয়ে বুড়ির শরীরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে, ‘এই সাইরছে, কেষ্টা, তোমার কি দুঃখ লাইগল আমার হাঁটুতে?’
‘না। আমি সইরা শুই। তুই জায়গা নিয়্যা শো।’
‘আরে, আমার শরীরখান তো হইছে অ্যাখন গন্ধমাদন। নাওয়ে উইঠলে নাও কাইত। তোমার আর সইর্যা কাম নাই। শ্যাষে পইড়্যা গিয়্যা কোমরের হাড় ভাইঙব্যা। খায়্যায়ও ফেললাম বেশি, লোভে, ঐ বাড়িতে—’ যোগেন তার ধুতির কষি একটু আলগা করে দেয়।
বুড়ি তার বাঁ হাতটা যোগেনের পেটে বোলাতে বোলাতে বলে, ‘নিজের শরীর খোঁটাস না। নজর লাগে। প্যাটে দিল্যাম বাঁও হাত, হজম হইল প্যাটের ভাত। প্যাটে দিল্যাম বাঁও হাত, হজম হইল প্যাটের ভাত। প্যাটে দিল্যাম বাঁও হাত, হজম হইল প্যাটের ভাত। প্যাটে দিলাম… খাওয়াইলোডা কী, স্যানরা? খিচুড়ি না ভাত? কত পুরানা বাড়ি—পুরানা বংশ। এক বাড়িতে এক বংশে তের বছর পুরব্যার আগেই দুই-দুইখ্যান সতী—নবকেষ্টর বৌ আর তাগো বৌমাও।’
যোগেন চোখ বুজে ফেলেছিল, ‘বৌমার আর করনের কী ছিল? শাশুড়ি যখন সতী গিছেন, বৌমার তো যাব্যার লাইগবই।’
বুড়ি বলে না, কিন্তু ভাবে, সে তো ঠিকই। বংশে একটা ধারা হয়্যা গেলে তা তো রাইখতেই হয়। শাশুড়ি সতী গেলে বৌ-রেও যাইতে হয়।
যেন বুড়ির ভাবনার জবাবেই যোগেন ঘুমেল গলায় বলে, ‘তোমাগ এই হিন্দুধর্মখান বড় নিষ্ঠুর গ কেষ্টা। মানুষরে বড় দুঃখ দেয়। নিজের ভাইবৌ-ব্যাটারবৌ গ পিটাইয়্যা পুড়াইয়া মারে। ধুত, এরে আবার ধর্ম কয়? কেষ্টা, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি অন্য কোনো ধর্ম নেই। আমার আর হিন্দুধর্মে থাকার বাসনা নাই।’
‘রাই, এই কথা আর কইয়ো না বাপ। অ্যাককেরে কইয়ো না। একবারও কইও না। তুমি অ্যাহন কলকাত্তার মেম্বার। মানুষ ভুল বুইঝবে। যোগেন মণ্ডল আমাগ ক্রিশ্চান বানাইছে, মুসলমান বানাইছে। এমন কথায় বান্দরের ল্যাজে আগুন লাগাইব।’
কথার শেষ দিকে যোগেনের নাকের ডাক অল্প একটু শোনা গিয়েছিল। কথা শেষ করার পরও যোগেনের কাছ থেকে সাড়াশব্দ না আসায় বোঝাই গেল সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারও একটু পরে পাশ ফিরতে-ফিরতে যোগেন বলে ওঠে, ‘একশ বছরের মধ্যে তিন-তিনডা বৌ পুড়ায় আর নিজেরগ একখান পদবী রাইখব্যার পারে না?’
‘ক্যা? পদবীর আবার হইলডা কী? সব্বাইই তো রায়চৌধুরি বাড়ি-ই কয়।’
‘তুমি না অ্যাহনই স্যানবাড়ি কইল্যা?’
‘সে তো পুরানা অব্যাসে কই। অগ তো অনেক পদবী।’
‘ক্যা? পদবী অনেক হইব কিয়ের লাইগ্যা? তয় যে শুনি হিন্দুরা এক-এক দেবতা না ঋষিরুশির টানা বংশ?’
‘বংশ টানাই। পদবীগুলান যার যেমন’
‘পাহিদাস নামের এক শুদ্দুর অগ ঘরে বোনের বিয়্যা দিয়্যা, অগ না বিক্রমপুর থিক্যা ঘরজামাই আইনছিল?’
‘তুই দেইখব্যার গিছিস? আইনছিল কি বাঁধছিল?’
‘না। আমি কই, শুদ্দুরের ঘরজামাই তো শুদ্দুরই হয়। ওরা ‘স্যান’ হইয়া কি সেইডা ঢাকা দিল?’
‘ক্যান? অগ আদিপুরুষ তো স্যান। দুর্গাদাস।’
‘আরে কেষ্টা, পোলায় যদি বাপের নাম বদল্যায়া থোয়, বাপ কি তখন পরলোক থিক্যা জামিনে খালাশ ছুটি নিয়া আইস্যা কোর্টে আফিডেবিট কইরবে গো কেষ্টা? ঐ দুর্গাদাসের দাসখানাই অগ টায়টেল। দ্যাহ, মিল দ্যাহ। পাহি দাস। দুর্গা দাস। তারপর থিক্যা অরা নাম নিব্যার ধইরল—রাম দিয়া। রামজীবন, কেষ্টরাম, বলরাম। আর রটাইল, নবাব সরকার অগ মজুন্দার কইর্যা দিছে। মজুন্দারের দ্বার নাই। কুলীন বামুনও হয়, চাঁড়ালও হয়, মুসলমানও হয়—।’
‘অরা তো আর শুধু মজুন্দার আছিল না। রায় ছিল, স্যান ছিল, চৌধুরি ছিল, মিল্যাইয়া মিশ্যাইয়া রায়চৌধুরি হইছিল, স্যানচৌধুরিও হইছে। যার যেমন সাধ—’
‘যার যেমন সাধ তেমন পদবী-নেওনের কুনো বাধা নাই হিন্দুগরে। এক নমশূদ্র যদি একখান পদবীও বলে তাহাইলে তার জিভখ্যান টাইন্যা কাইট্যা দিতে হয়। চাঁড়ালের আবার নাম! নামের আবার পদবী!’
যোগেনের গলার স্বর ঘুমের ভিতরে তলিয়ে যাচ্ছিল। এ-সব কথা বলার স্বরলিপি যেন তৈরি হয়েই আছে—এমন রেওয়াজে। ঐ শেষ কথাগুলি গিঁটকিরি-সহ বেরিয়ে আসে। যোগেনের গলা আরো ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। মাঝরাতে নদীর অতল থেকে ভেসে ওঠা বুদ্বুদ যেমন বিস্ফারিত হয়, তেমনি এক নৈঃশব্দ্য বিস্ফারিত হয় যোগেনের গলায়, সে-কথা প্রায় শোনা যায় না—’দ্যায় নাই? কাইট্যা? জিভ? আমাগ?’
বুড়ি কোনো জবাব দেয় না। যেন তার নীরবতায় জিজ্ঞাসা চাপা পড়ে যাবে। জিজ্ঞাসা না-হয় চাপা পড়ে, কিন্তু ঘটনা? পাছে ঘটনা থেকে আবার জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে, বেড়াজালে যেমন জেগে ওঠে নদীর ভিতরে আওরে থাকা খাণ্ডববন আর মৈনাক পর্বত, বিশেষ করে আজই, এই বাংলা ১৩৪৩ সালের ১০ই মাঘের রাতে, উত্তর বরিশালের সাধারণ গ্রামীণ আসনে এক নমশূদ্র জিতে এসে যখন ঘুমিয়ে পড়ছে—তাই কেষ্টা চুপ করে থাকে। চুপ করে থাকতে পারে অভ্যাসে।
যে-ঘটনাটি যোগেনের গলা থেকে বেরিয়ে এল, সেই ঘটনার গায়ে বছর বা তারিখ আর পড়া যায় না। কারো তেমন দরকার হয় না পড়া। হয়ত ঘটনাটি এতই পুরনো হয়ে গেছে যে রামায়ণ-মহাভারতের গল্পগুলির সঙ্গে মিশে আছে। হয়ত ঘটনাটি ঘটা এখনো শেষ হয়নি। বা হয়ত ঘটনাটি এখনই ঘটছে—জানা যাচ্ছে না। হয়ত যাকে বলে প্রমাণ—তা আরো নানা সূত্র থেকে আসছে এখনো। প্রমাণের অভাবে মামলা ঠেকে থাকতে পারে কিন্তু ইতিহাসের তো কোনো প্রমাণ দরকার হয় না। যদি-না ইতিহাস নিয়ে মামলা হয়। এটা এমনই একটি ঘটনা—মায়ের পেট থেকে পড়ার আগে এক নমশূদ্রকে ঘটনাটি জেনে বেরতে হয় ও যে প্রক্রিয়াতেই তার সৎকার হোক না কেন, একজন নমশূদ্রকে তার শরীরের ছাইয়ের সঙ্গে সেই ঘটনাটিকে জলে-স্থলে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে যেতে হয়।
এক চাঁড়ালকে এক শাহেব ডাকিয়ে এনেছেন।
কেন, সেটা নির্ভর করে কখন ডাকিয়েছেন তার ওপর। ১৭২৪-২৬ হতে পারে—ব্রোক নামের এক শাহেব তখন বাখরগঞ্জের ম্যাপ আঁকছিল ও লোকজন ডেকে জায়গার নাম, লোকের নাম, নদীর নাম, খালের নাম জেনে লিখে নিচ্ছিল। ১৭৯০ হলে টেইলারশাহেব হতে পারে—সে তখন ঘুরে ঘুরে সাপের ওঝাদের ‘বিষ নামানো’ দেখছিল ও তাদের নামঠিকানা লিখে নিচ্ছিল। ১৮৪০ হলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রেলি হতে পারে—সে তখন সতীদাহের খবর পেলে লোক ডাকিয়ে আসল খবর জানতে চাইত। ১৮৯৮ হলে বেলশাহেব হতে পারে—সে তখন প্লেগ-আক্রান্ত শূদ্রগ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ১৯০৮ হলে পুলিশসুপার কেম্প হতে পারে—সে তখন কারা ‘বন্দেমাতরম’ বলে তাদের সম্পর্কে খবর জোগাড় করছে। ১৯২৭ হলে পুলিশসুপার সুডেন হতে পারে—সে তখন সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ডাকা হরতালের খবর নিতে লোকজনকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করছিল।
তবে এ সমস্ত গবেষণার কোনো মানে নেই। একজন নমশূদ্রকে, বা যে-কোনো নমশূদ্রকে, ডেকে তার নাম ও হালহকিকত জানতে চাইলে, কে জানতে চাইছে—সেটা কোনো প্রশ্ন?
এক চাঁড়ালকে এক শাহেব ডেকে তার নাম জিজ্ঞেসা করে।
সম্ভবত কোনো দোভাষী ছিল, বামুন কিংবা কায়েত। বা সম্ভবত কোনো অজলচল হিন্দু অচ্ছুৎ। শাহেবের দোভাষী বা মুনশি হয়ে সে টাকা কামাচ্ছিল ও অজলচল থেকে জলচল হচ্ছিল ও হিন্দু-অচ্ছুৎ থেকে ছুঁতহিন্দু হচ্ছিল—মালো থেকে মল্লিক।
লোকটি যা হোক একটা নাম বলেছিল ও দোভাষীও শাহেবকে একটা নাম বলতে পেরেছিল। কিন্তু শাহেব বলল, এটা তো অসম্পূর্ণ নাম। পদবী কোথায়?
তাতে ওরা দুজনেই হেসেছিল, বোঝার পর, যে শাহেব কী চাইছে, সেই দোভাষী ও সেই নমশূদ্র। দোভাষী হাতদুটো ও ঘাড় নাড়িয়ে-নাড়িয়ে শাহেবকে বোঝাতে চাইছিল, এদের সেসব হয় না, এরা তো মানুষ নয়, নো ম্যান, চণ্ডাল ইজ চণ্ডাল। লোকটি শাহেবের দিকে তাকিয়ে হেসে-হেসে ঘাড় নেড়ে দোভাষীর কথাটাই যে ঠিক, তা বোঝাতে চাইছিল। সে হয়ত শাহেবকে দেখে একটু মজাও পাচ্ছিল—শাহেবও কত কী জানে না। যে-কারণেই হোক, শাহেব গেল রেগে। সে দোভাষীকে যা মুখে এল, তাই বলল। অনুমান করা যেতে পারে যে শাহেব পৌত্তলিকতা সম্পর্কেই রাগ করে থাকবে, ‘টায়টল মানে কী? টায়টল মানে এই সমাজ তোমার কোনো কোনো অধিকার মেনে নিয়েছে। টায়টল ছাড়া তোমাদের দেশে এক গ্লাস জলও পাবে না। একজন লোকের পরিচয়ের পূর্ণতা-অপূর্ণতা নেই?’
সেই দোভাষী তখন ডাকা-লোকটিকে বলে, ‘বাবা, দে না একটা নাম বলে, এ তো মেরে ফেলবে।’
ডাকা-লোকটি তার কোনো জবাব দেয়নি। দোভাষী কী সব বলে শাহেবকে ঠান্ডা করল আর ডাকা-লোকটিও চলে গেল।
পরদিন সকালে গ্রামের বামুন-জমিদার ঐ ডাকা-লোকটিকে আবার ডাকা করল—মহারাজা ডেকেছেন।
মহারাজ তাকে দেখেই বলল, ‘দাঁড়া দেখি ঐ খানে, সোজা হয়ে, জিভ বের করে।’ লোকটি একবার জিভটা বের করেই হেসে ফেলল। তারপর হাতের পাতা দিয়ে হাসিটা মুছে নিয়ে আবার জিভ বের করল।
মহারাজ গলা তুলে কাউকে ডাকল। সেই ডাকে একজন নমশূদ্র এল। মহারাজ, জমিদার হলেও ব্রাহ্মণ। সে তার লোকটিকে বলল, ‘যা, একটা ছুরি নিয়ে আয়। আর ও যে দাঁত বের করে হাসছে, ওর জিভের আগাটুকু কেটে দে। যা—আ-যা।’
যাদের সামনে ঘটনাটা ঘটছে, তাদের শরীরে তো মানুষেরই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সেগুলোর ওপর তো সব সময় নিয়ন্ত্রণ থাকে না—চোখের পাতা পড়া, রোম খাড়া হয়ে ওঠা, হঠাৎ বড় শ্বাস পড়া। মহারাজ বলল, ‘বেটা চাঁড়ালের নামও থাকে, নামের আবার পদবীও থাকে!
ততক্ষণে মহারাজের ভৃত্য শূদ্রটি এসে সেই দোষী শূদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে, বাঁ হাতে তার মাথার খুলিটা চেপে ধরে, ডান হাতে সেই ছুরিটা জিভের পাশে চালিয়ে দিল। দু-এক পোঁচ দিতেই জিভের কাটা টুকরোটা মাটিতে পড়ে গেল।
পড়ে গিয়ে লাফাতে লাগল, ঐ জিভের কাটা টুকরোটা, মাটির ওপর, লাফাতে লাগল, পাক খেতে লাগল, সোজা হয়ে গেল, উলটে গেল—যেন একটা জোঁক।
এমন যে হতে পারে, এটা কারো জানা ছিল না। মহারাজেরও না। কী করে থাকবে। কেউ কি কোনোদিন জিভের কাটা টুকরো দেখেছে? জিভ কেটে দিলে কাটা-টুকরোটার কি প্ৰাণ আসে? সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল—মহারাজা, তার ভৃত্য শূদ্র ও সেই দোষী শূদ্র। সেই দোষীর মুখ থেকে গলগলিয়ে রক্ত উপছে পড়ছিল। নিজেরই কাটা জিভের টুকরোর নড়াচড়া, পাকিয়ে ওঠা দেখতে দেখতে তার শরীরের সব রক্ত এই রকম বেরিয়ে গেলে সে দড়াম করে পড়ে, মরে গেল। বা, সে মরে, দড়াম করে পড়ে গেল, মাটিতে।
তার কাটা জিভের টুকরোটা তখনো বেঁচেছিল কীনা, জোঁকের মতনই হোক—তবু, বেঁচে ছিল কীনা সেটা কারো জানা ছিল না মানে, জানা হয়ে ওঠেনি তার। তেমনি আর জানা হয়নি কারো—ঐ যে লোকটি, দোভাষী, সে কেন মহারাজকে আজ সকালে শাহেব-শূদ্র ঘটনাটি এমন বিশদে জানিয়ে গেল। জানা হয়নি, কারণ, এরকমই তো হয়। হয়ে আসছে। যা হয়ে আসে, তা তো হয়েই আসে, তেমন হয়ে-আসতে কি প্রতিবারই নতুন কারণ দরকার? দোভাষীটি হয়ত কেবল এইটুকুই চায় যে বেশ কিছুদিন পরে, যখন তার চেহারাটা কারো মনে থাকবে না অথচ শাহেব চড়িয়ে চড়িয়ে তার টাকা হবে বিস্তর, তখন কি সে সরিকেল, কলকিনি, রামজানপুর, হেমামদ্দি, মুরুদিয়া, কুকুরকাঠি—এই সব চরের দিকে একটা নিলামি জমিদারির আনা-দুয়েক কিনে জমিদার হতে পারবে না আর রেজিস্ট্রেশনের সময় বিশ্বাস বা হালদার বা চৌধুরি পদবী লিখে জলচল হয়ে যেতে পারবে না? ঐটুকু আশাতে সে কারণে-অকারণে মহারাজা-জমিদারদের কোনো-না-কোনো সেবা দিতে চায়—এমনই সব তুচ্ছ সেবা যে শুদ্দুররা আজকাল পদবীও বলে!
বুড়ি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি—এই রাতে, জন্ম-সময়ে বা জন্মান্তর-সময়ে ভেসে যেতে কথাটার যতক্ষণ সময় দরকার। কিন্তু আইজই রাইয়ের এই কথাডা মনে হইল? এই এমন জিতন জিইত্যা? কথাডা তাহাইলে কুনো সময়ই ওর মন থিক্যা সরে না, ইষ্টমন্ত্রের মতন? তয় তো রাইয়ের আমার বড় কষ্টের জীবন শুরু হইল। বড় কষ্টের আর একার।
একটা গুনগুন ওঠে, ‘সোঁতো বিথারজলে এ তনু ভাসাইয়াছি, কী করিবে কুলের কুকুরে?’
বুড়িও গুনগুনিয়ে থাকতে পারে, যোগেনও পারে।
দু-জনের ঘুমের অভ্যেস একেবারে উলটো।
কেষ্টা রাতে যতক্ষণ ঘুমোয়, ততক্ষণ কথা বলে। শুনলে মনে হয়, কারো সঙ্গে গল্প করছে। কোনো কোনো সময় কেষ্টা থেমে তার কথাসঙ্গীকে যেন কথা বলার সময় দেয়। কখনো নিজে কথা শোনার সময় নেয়। কখনো কথাবার্তার ভিতর নৈঃশব্দ্য চারিয়ে দেয়। তার এই ঘুমের কথাগুলির ভিতর সুতোছাড়া গাঁথনি থাকে, কোথাও কোনো কথা ঝড়ে ছেঁড়ে না বা উড়ে এসে জুড়ে বসে না।
যোগেন দিনে রাতে, সেখানেই ঘুমোয়, মুহূর্তে একেবারে গভীরে চলে যায়—ঘুমের বা জাগরণের। সে ঘুমের ভিতর কথা বলে না। সে ষোল আনা জেগে না থাকলে তার কথা তৈরি হয় না। কিন্তু সে যখন ঘুমিয়ে, তখন তার সঙ্গে কথা বলার বিপদ হচ্ছে, বোঝা যায় না সে জেগে না ঘুমিয়ে। তার স্বরে শুধু ঘুম লেগে থাকে। তার ফলে অবিশ্যি সে যা বলতে চায়, শুধু তাই বলে। কোথাও কিছু বাদ পড়ে না।
১০ মাঘ বাকি রাতটুকু আরো অনেক কথা বলা হয়েছিল। সব কথাই এত স্পষ্ট যে কেষ্টা বা রাই যে-কারোরই হতে পারে। সব কথাই ঘুমের কুয়াশা মাখা—কেষ্টার বা রাইয়ের। তফাত এইটুকু যে কেষ্টা না-ঘুমিয়ে কথা বলে না আর যোগেন না জেগে বলে না। শুধু সেটুকু দিয়ে কি আর চিনে নেয়া যায়, কোন কথাটা কার?
সেটা চিনে নিতে না পারলেও, কথা বয়ে যায়—শেষরাত জুড়ে, ভোররাত জুড়ে, পরের দিনগুলোর দিকে ও সেই দিনগুলোরও পরের দিনগুলোর দিকেই। বিজয়রজনীতে কেষ্টা আর রাই তাদের উদ্ভট প্রণয়ের ভাষায় যেন একটা পরনকথা বুনে যাচ্ছিল, অন্ধকারে।
