৪০. হকশাহেব-সামসুদ্দিন-নাজিমুদ্দিন-সারওয়ারদিদের নৈশভোজ
নলিনীরঞ্জন সবাইকেই সময় দিয়েছিলেন, সন্ধে আটটা। শীতের কলকাতার পক্ষে একটু হয়ত বেশি রাত। উপায় ছিল না। কথাটা আজই শুরু হওয়া দরকার, বিশেষ করে নবাবশাহেবের সম্মতির পর। শেষদিকে নবাবশাহেব বোধহয় একটু সামলে নিলেন। তা তো হতেই পারে। মন্ত্রী না-হওয়ার দুঃখে যে-নবাব দুপুরে ঘুমচ্ছিলেন, তাঁকে যদি ফোনে ডেকে বলা হয়, ‘আসুন, মন্ত্রী হবেন,’ তাহলে তিনি তো বেশামাল হতেই পারেন। তারপর, সামলেও নিতে হবে। নলিনী সরকার ভাবেনইনি—এতটা এগবে।
নলিনীরঞ্জন অফিসেই একটা স্লিপ লিখতে গিয়ে গুটি পাকিয়ে ফেলে দিলেন। সেক্রেটারিকে বললেন, ‘আমাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাও। হকশাহেব, সামসুদ্দিন, সারওয়ারদি, নাজিমুদ্দিন, ইস্পাহানির কাছে গিয়ে বলো—তাঁরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন কথা বলেন, আমার সঙ্গে, ফোনে। আবুল হাসিম আর আমেদকেও বলো। আমি ফোনের পাশেই থাকব।’
নলিনীরঞ্জন যে নামগুলো নিয়ে খুব ভেবেছেন, তা নয়। বাংলার মুসলিম রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে হলে এদের সঙ্গেই বলতে হয়। প্রজাপার্টির ভিতর মিলমিশ বেশি। সকলেই হকশাহেবকে নেতা মানে। হক একা থাকলেই হত। কিন্তু সামসুদ্দিন একটু বেশি রোখা, তার ওপর প্রজাপার্টির সেক্রেটারি। আর, আবুল হাসিম লিগের এখনকার সম্পাদক। ওর বাবাও ছিলেন বর্ধমানের বড় নেতা। ওকালতি ছেড়ে দিয়ে ছেলেটা লিগে এসেছে। ওর বাবা মারা যাওয়ার ফলেই ওকে বর্ধমানের নেতা হতে হল। আমেদ প্রজাপার্টির নতুন নেতা। ঐ তো তুলল প্রায়োরিটির কথা—জমিদারি উচ্ছেদ আগে না রাজবন্দীদের মুক্তি আগে।
মাঘের সন্ধ্যা। নলিনী সরকার একটা বালাপোশ জড়িয়ে তাঁর বৈঠকখানাতেই বসেছিলেন। তবে, এটি নীচের তলার খোলা বৈঠকখানা নয়—দোতলায় প্রাইভেট বৈঠকখানা। পুবদিকে একটা ভাঁজ-করা বড় দরজা আছে—খুলে দিলে অনেকটা দেখা যায়, পার্কের। শীতকাল বলে বন্ধ করা।
রাত আটটা হলে তো এদের রাতের খাওয়া খেতে বলতে হয়। মুসলিম সমাজে এ-সব আদবকায়দার মূল্য আছে। বিশেষ করে শাহেব-মুসলমানদের।
নলিনীরঞ্জন কাউকে ডাকার মত একটা আওয়াজ করলেন, সশব্দ ঢেকুর তোলার মত। ধুতি-ফুলশার্ট পরা র্যাপার জড়ানো একজন এসে দাঁড়ায়। নলিনীরঞ্জন বলেন, ‘কয়েকজন আসবেন, জনা ছ-সাত, রাতে খেয়ে যাবেন।’
এই লোকটি নায়েব-গোমস্তার মত। তবে নলিনীরঞ্জনের জমিদারি নেই, তিনি উকিল-ব্যারিস্টারও নন। তিনি আধুনিক ব্যবসায়ী। এই লোকটিকে তাই ম্যানেজারবাবু বলেই ডাকে। বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব এরই ওপর।
ম্যানেজারবাবু জিজ্ঞাসা করে, ‘সবাই নিরামিষ?’
ব্যাবসার যোগাযোগে অনেক সময়ই অনেক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তো আসেন—নলিনীরঞ্জন দুটো চেম্বারেরই প্রেসিডেন্ট।
‘না, না, মাংস করতে বলো।’
একমাত্র সামসুদ্দিন আর আমেদ ফোন করেনি। ওদের পায়নি। এখনো খুঁজছে খুঁজছে। হকশাহেবকে নলিনীরঞ্জন বলে দিয়েছেন—ওদের দু-জনকে খবর দিতে। সামসুদ্দিনের থাকাটা দরকার। ওর পলিটিকসটাও র্যাডিক্যাল। এক হকশাহেবকেই নলিনীরঞ্জন এটুকু বলেছেন যে নবাবশাহেবের সঙ্গে তাঁর আজ কথা হয়েছে, তিনি বলেছেন লিগ লিডারদের সঙ্গে কথা বলতে। সারওয়ারদি, ইস্পাহানি, নাজিমুদ্দিন আসবেন। হকশাহেব যেন সামসুদ্দিন আর আমেদকে নিয়ে চলে আসেন। হকশাহেব একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেসা করেন। তিনি একটু আগে আসবেন কী না। নলিনী সরকার বলেন, না একসঙ্গেই আসা ভাল।
এদের মধ্যে হক ইস্পাহানিই ব্যবসায়ী। ফোনে সে কিছু আন্দাজেরও চেষ্টা করেনি। প্রথমেই বলেছে, ‘স্যার, কীয়া ফরমান?’ তারপর আটটার সময় সরকারের ওখানে আসতে হবে শুনে বলে ‘তব তো জরুর বড়া দাওয়াত? জরুর টাইমে পৌঁছ যাবে। লেকিন সোচতা হ্যায় হাম এত্না প্লাটন হ্যায় কি টাইমসে পহেলা পৌঁছ যায় গা’, হো হো হেসে ফোন রেখে দিল। নলিনীরঞ্জনহ বরং সন্দেহ করলেন, নবাবশাহেবের সঙ্গে, ও জিন্নার সঙ্গেও, ফোনে ওর কথা হয়ে থাকবে। তিনিই-বা আন্দাজ করতে চাইছেন কেন, আনাড়ির মত। এটা ধরে নেয়াই তো উচিত যে লিগের লিডাররা বিষয়টা জেনেই আসছেন। সবচেয়ে কম জেনে আসছেন হকশাহেব নিজে।
কিন্তু হকশাহেব এদের মধ্যে সবচেয়ে ওস্তাদ খেলোয়াড়। তিনি ঢুকলেন সবার শেষে একা। আমেদ শহরে নেই। সামসুদ্দিন নিজের মত চলে এসেছে। হকশাহেবের ঐ দৈর্ঘ্যপ্রস্থ আর গলার স্বর তাঁকে সব জায়গাতেই একটা প্রাধান্য দেয়। তিনিও সেটা জানেন। তাই মজার মজার কথা বলে ও নিজেকে ঠাট্টা করে পরিবেশটা হালকা করে দেন। কিন্তু এখানে তিনি ঢুকলেন, চোখটা একটু নামিয়ে, দরজার মুখোমুখি ছিলেন সারওয়ারদি। তাঁকে ও পর পর আরো যাঁরা ছিলেন, তাঁদের আদাব জানিয়ে একটা ফাঁকা সোফায় বসলেন। সোফাটাতে খুব বেশি হেলিয়ে পড়ার জায়গা ছিল না। ফলে হকশাহেবকে একটু খাড়াই বসতে হয়। নলিনী সরকার যখন কথা শুরু করেন, তখনো হকশাহেব তাঁর দিকে তাকাননি। নলিনী সরকারেরও অভ্যেস চোখ নামিয়ে বিড়বিড়িয়ে কথা বলা। আর সকলেই ভাবলেন–হকশাহেব সবই জানেন।
‘আপনারা হয়ত ইতিমধ্যে জেনে গেছেন যে কৃষক-প্রজা পার্টি’ আর প্রদেশ কংগ্রেসের মধ্যে সরকার তৈরি করা নিয়ে যে কথাবার্তা চলছিল, তা আজ সকালে ভেঙে গেছে।
সারওয়ারদি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইজ ইট টোট্যালি ব্রোকেন? অর ওনলি অ্যাডজোনড?’
ইস্পাহানিও বললেন, ‘দেয়ার’স নো ইস্যু অব এনি নিউজপেপার, নো টেলিগ্রাফ এডিশন, ইজ ইট ফরম্যালি ব্রোকেন? আই থিঙ্ক, নো।’
‘আই ডু নট নো হাউ ডু সাচ টস্ কোল্যাপ্স ফরম্যালি। টু পার্টিজ ওয়্যার ইন ইররিট্রিভেবল কাউন্টারপোসল।’ নলিনী সরকার বলেন ‘ডিড দে অ্যাগরিড টু ডিজঅ্যাগ্রি’, সারওয়ারদি আসলে জানতে চান প্রজা পার্টি কি এখন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে ও লিগের সমর্থন চাইছে। নাকী কংগ্রেসের সঙ্গে কথাবার্তায় তাদের ওজন বাড়াবার জন্য লিগের নেতাদের সঙ্গে বসেছে। এখন সন্ধ্যা আটটা পেরিয়ে গেছে। যদি কোনো খবর থাকে—কাগজ সেটা ছাপতে পারবে না। এই মিটিংয়ের খবরও ছাপতে পারবে না। সারওয়ারদি আন্দাজ করেন—কাগজকে এড়ানোর জন্যই কেউ মুখ খুলছে না—না, কংগ্রেস, না-প্রজাপার্টি। যে-প্রথম বলবে-কথাবার্তা ভেঙে গেছে, সে-ই অসুবিধেয় পড়বে। অপরপক্ষ বলবে—আমরা তো জানি কথাবার্তা চলছে, ওঁরাই তাহলে ভেঙে দিলেন।
ইস্পাহানি বলে উঠলেন, ‘দেন দিস মাচ অব অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাট লিস্ট হ্যাজ বিন রিচড দ্যাট দো এ গবমেন্ট ইজ নট ইন দি অফিং, এ পাবলিক ইজ অলরেডি দেয়ার। অ্যান্ড অ্যাপরিহেডিং দিস পাবলিকস রিয়্যাকশন বোথ পার্টিজ আর উইথ হোলডিং দি কনক্লুজন। দেন লেট আস ডিসকাস ফার্স্ট, ইজ দেয়ার এনি অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যামং আস, হু আর প্রেজেন্ট হিয়ার অ্যাবাউট দি কমপোজিশন অব দিজ পাবলিক র্যাদার দ্যান হানটিং ফর এ গবমেন্ট!’
নলিনীরঞ্জন ও হকশাহেব দু-জনই বুঝে ফেলেন—ইস্পাহানি জিন্নার সঙ্গে কথা বলেছেন। যুক্তির এ প্যাঁচ জিন্না ছাড়া কারো মাথা থেকে বেরতে পারে না।
কিছু বলার জন্যই কী না বোঝা যায় না, হকশাহেব একটা ভুরু তুলে চোখটা উঁচু করেন কিন্তু নলিনী সরকার কথা বলতে শুরু করেছেন দেখে হকশাহেব ভুরু ও চোখ দুটোই নামিয়ে নেন। এ একেবারে অন্য ফজলুল হক। কঠিন মামলায় ল-পয়েন্ট খুঁজছেন—আশু মুখার্জির জুনিয়ার। ফজলুল হকের নীরবতা। তাঁর সরবতার চাইতে অনেক বেশি ভয় ছড়িয়ে দিতে পারে।
‘দেখুন, আজ দুপুরবেলায় কংগ্রেসের সঙ্গে মিটিং শেষ হয়েছে। সকলেই এই এতগুলো মিটিংয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢেকে চলছিল। হঠাৎ আজ, সই-সাবুদ হওয়ার ঠিক আগে ওরা কী সব কথা তুলল–রাজবন্দী-জমিদার কোটা আগে, কোন্টা পরে, এই নিয়ে। বুঝতেই তো পারিনি যে এটা ওদের আলটিমেটাম ছিল। ওরা প্রত্যেকেই জানত যে হকশাহেবকে সরকার তৈরি করতে দেয়া হবে না। তারপরই নবাবশাহেবের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। উনিই বলেন, আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। আপনারাও তো অল ইনডিয়া পার্টি। সুতরাং আপনারা শুরুতেই এই কথাটা পরিষ্কার করে দিন বা যদি একদিন সময় নিতে হয়, তাই নিন। আপনারা হকশাহেবকে সরকার গড়তে সমর্থন দেবেন কী না। দুই নম্বর—কারো ব্যাপারে আপনাদের কি এমন শর্ত আছে যে তাকে মন্ত্রী করতেই হবে, বা, তাকে কিছুতেই মন্ত্রী করা যাবে না। এই দুটো প্রশ্নে একমত হলে বাকি কোনো কথায় আটকাবে না—কার পাবলিক, কার ভোট, কী প্রোগ্রাম—এগুলো তো কাগজের জন্য বানানো কথা। সেসব তো ঠিকই আছে। লিখতে আর কতক্ষণ লাগবে।’
ইস্পাহানির যুক্তিটাকেই মারলেন নলিনী সরকার—খুব খোলাখুলি সত্যি কথাটা বলে দিয়ে। ইস্পাহানিও তো বড় ব্যবসায়ী, তিনি নলিনী সরকারের কৌশলটা বুঝলেন ও চুপ করে থাকলেন।
সারওয়ারদিই বললেন, ‘হকশাহেব আমাদের কাছে কী সমর্থন চান, সেটা তো জানতে হবে।’
হকশাহেব তাঁর সেই ভঙ্গিতে ফিরে গেলেন, একটা চোখের ভুরু ও দুটো চোখের দৃষ্টি তুলে। তারপর চাপা স্বরে স্পষ্ট করে বললেন, ‘প্রজা পার্টি ও লিগ একত্রে সরকার করুক।’
লিগের কেউই এটা ভাবতে পারেনি, এমনকী নলিনী সরকারও নয়। তাঁর সঙ্গে হকশাহেবের এ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। তিনিও তৈরি ছিলেন, লিগের সমর্থনটুকুর জন্য। হকশাহেব যে এই কথা ভেবেছেন, তা কেউ জানত না।
সামসুদ্দিন বলে উঠলেন, ‘কোয়ালিশন?’
‘হ্যাঁ। আমরা তো কংগ্রেসকেও কোয়ালিশনের কথাই বইলছি। আমরা এডাও বইলছি কংগ্রেস যদি চায় কংগ্রেস সরকার তৈরি করুক। আমরা সাপোর্ট দিব। আর সাপোর্ট দেয়ার লগে ফ্রন্টও করব। আমরা এই সেকেন্ড অফারডা লিগকে দিচ্ছি না। কিন্তু লিগকে ফার্স্ট অফারডা কেন দিব না?’
সামসুদ্দিনই বলে উঠলেন, ‘এই কথাডা ভোটের আগে ঠিক হইলে ভাল হইত না? যারা এডা চায় না, তাদের প্রজাপার্টি কইরবার লাইগত না।’
‘কথাডা জন্মাইল ভোটের পরে, ভোটের আগে সেটা কওয়া যাবে ক্যামনে?’ হকশাহেব বললেন। তাঁর পার্টির ভিতরে নানা মতের লোক আছে—তা গোপন কিছু না। কংগ্রেসের ভিতরে ভাগাভাগি ছাড়া আর কিছু নেই। লিগের মধ্যেই সবচেয়ে কম যেহেতু তাদের প্রধান কথা—ইসলাম বাঁচাও। সামসুদ্দিনের কথার উত্তর দিয়ে ও উত্তরটা বিস্তারিত না করে, হকশাহেব একই সঙ্গে লিগের নেতাদের জানিয়ে দিলেন যে তাঁর পার্টিতে লিগবিরোধীরা কতটাই শক্তিশালী আর সামসুদ্দিনকেও জানালেন—তিনি নিজের নেতৃত্ব রাখতে কতটাই ছাড়তে পারেন।
লিগের নেতারা এতটা ভড়কে গেছেন যে তাঁরা কেউই এমন কোনো কথা মনে আনতে পারছে না, যেটা বলে একটু হাঁফ ছাড়া যায়।
শেষ পর্যন্ত ইস্পাহানিই কথা বলে উঠতে পারলেন, ‘থ্যাঙ্কস মিস্টার হক। বাট ইয়োর অফার অব মেকিং এ কোয়ালিশন গবমেন্ট শুড বি সিন অ্যাজ পার্ট অব দি অল ইনডিয়া ক্যানভ্যাস। বাট, দিস ইভনিং উই আর প্লেজিং আওয়ার আনকনডিশন্যাল সাপোর্ট টু দি মেকিং অব এ গবর্নমেন্ট আন্ডার ইউ।’
‘এটাই তো যথেষ্ট। এটা কি আজই আমরা কোনো স্টেটমেন্টে জানিয়ে দিতে পারি?’ নলিনী সরকার জিজ্ঞেসা করেন। তিনি সবার মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে বলেন।
‘তা হয়ত করা যায়,’ নাজিমুদ্দিন এই প্রথম মুখ খুললেন, কলকাতায় খবরের কাগজের ব্যাবসা তিনি বদলে দিয়েছেন—শাহেব সম্পাদক দিয়ে বের করেছেন ইংরেজি ‘স্টার অব ইনডিয়া।’ তাছাড়া আকরাম খাঁর ‘আজাদ’ তো আছেই। এটা প্রায় ঠিকই ছিল যে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু পটুয়াখালিতে তিনি এমন হার হারবেন, কল্পনাও করতে পারেননি। পটুয়াখালির হারটা ভুলতে বারবারই একটা সান্ত্বনাই তাঁর মনে আসছে—জিতলেও তো প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না, মুসলিম লিগ যা সিট পেয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায় না। এই মাত্র যা ঘটল, তাতে মন্ত্রী তো হওয়া সম্ভব। নাজিমুদ্দিন ভোটে হেরে এমন ভয় পেয়েছেন—যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই দ্বিধা আসছে।
নাজিমুদ্দিন দ্বিধা নিয়েই বলেন—’দেখুন আপনারা, ঠিক যেটুকু কথা হল, সে-টুকুকে, ইস্পাহানি যে-ভাষায় বললেন সেই ভাষাতেই স্টেটমেন্ট করে দেয়া যায়। কিন্তু সেটা আবার অসুবিধে হয়ে যাবে না তো?’
নলিনী সরকার ঠোঁট থেকে বালাপোশের আড়াল সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার অসুবিধের কথা বলছেন।’
নাজিমুদ্দিন কিছু বললেন না। বাকিরা তাঁকে ভাবার সময় দিলেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে। নাজিমুদ্দিন বললেন, ‘সবাই সব জানে অথচ এটা এখনো কেন নিউজ হল না যে কংগ্রেস- প্রজাপার্টি সরকার হচ্ছে না। হকশাহেব যদি একই সঙ্গে খবরটা ভাঙেন ও বলেন, লিগ তাঁর মন্ত্রিসভাকে সমর্থন দেবে—সঙ্গে-সঙ্গে তো কংগ্রেসের হিন্দুনেতারা বলে বসবেন—আগে থাকতেই সব ঠিক ছিল। লোকে চায় সবচেয়ে সহজ কথাটা বিশ্বাস করতে আর তার বুদ্ধির বাইরে কিছু হচ্ছে—এটা না-মানতে।’
‘এটা কি আপনার পটুয়াখালিতে শেখা? সামসুদ্দিন বলে বসে। এখানে যে-স্বরে ও যে-ভাষায় কথাবার্তা চলছিল তাতে সকলেই এটা মনে-মনে মেনে নিয়েছিলেন যে কেউ কাউকে আক্রমণ করবেন না, মতে না মিললে অন্য গল্প করবেন। সামসুদ্দিন সেই অনুচ্চারিত কিন্তু স্বীকৃত আদব ভেঙে দিলেন, অসাবধানতায় নয়, হয়ত ইচ্ছে করেই।’
কিন্তু নাজিমুদ্দিন আঘাতটা নিলেনও না, ফিরিয়েও দিলেন না, একই গলায় বললেন, ‘বোধ, হয় আপনি ঠিকই বলেছেন, সামসুদ্দিন ভাই। বা, পটুয়াখালি দিয়ে কথাটা বলার সুবিধে আছে। পটুয়াখালিতে তো আমার হারার কোনো কারণ নেই। আমি ওখানকার জমিদার, নবাবশাহেবের জায়গির, গভর্নর গিয়ে আমাকে ভোট দেয়ার কথা বলেছেন, মানুষ তো বড় গাছেই নৌকো বাঁধতে চায়। কৃষক তো কৃষকই। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। হিন্দু কৃষক যদি তার হিন্দু জমিদারকে ভোট দিতে পারে, তাহলে মুসলমান কৃষক তার মুসলমান জমিদারকে ভোট দেবে না কেন?’
‘মুসলমান জমিদার ইজ নট ভেরি কমন ইন ইস্টবেঙ্গল। দি মুসলিম পেজ্যান্টস হ্যাভ নট ফমর্ড এনি হ্যাবিচুয়্যাল সাপোর্ট ফর মুসলিম জমিনদারস’, ইস্পাহানি জিজ্ঞাসুর ভঙ্গিতেই বললেন তাঁর দুই ঊরুর ওপর দুই হাত আকনুই রেখে।
‘হ্যাঁ হতে পারে। তবে আমার মনে হয়, হকশাহেব যে সহজ করে দিলেন, বিষয়টা, ডালভাতের ব্যবস্থা আর জমিদারি উচ্ছেদ—কৃষক তার অভিজ্ঞতায় এটাকে সাজিয়ে নিতে পারল—সত্যি তো তাই, জমিদারি যদি উচ্ছেদই হয়ে যায় তাহলে ডালভাত তো নিজেরাই বাড়িতে করতে পারব। কৃষক তার অভিজ্ঞতার ভিতরে সমস্যাটা এনে ফেলতে পারল-জমিদারি উচ্ছেদের জন্য একজন বড় নেতা দরকার—হকশাহেব। আর ডালভাত ফলানোর জন্য আমাদের দরকার—কৃষক।’
‘তাহলে আজকের বোঝাপড়া জানানোর দরকার নেই, তাই তো?’ সারওয়ারদি জিজ্ঞাসা করেন।
‘যদি লিগ করে, তাহলে যা বলার বলবেন, কিন্তু হকশাহেবকে একদিন অন্তত টাইম দিন। যে-ফ্রেম অব রেফারেন্সে উনি কংগ্রেসের সঙ্গে কথা বলেছেন, আমাদের সঙ্গে তো আর তা বলছেন না, আজ ১০ তারিখ। আমরা কালকে আবার বসি। দরকারে ১২ তারিখ সকালেও বসি। সন্ধ্যায় না-হয় একটা স্টেটমেন্ট দেয়া যাবে।’
‘ঠিক আছে। সেটাই ভাল। দুই পার্টিই দুই পার্টির নামে এত খারাপ কথা বলেছে যে সেগুলো ভোলা ও ভোলানোর জন্য অন্তত একটা রাত্রি তো দরকার। আজকের কথাবার্তা থেকে এটুকু কি আমরা নিজেরা ধরে নিতে পারি যে ডিলটা ফাইন্যাল হয়ে গেল। নাকী এখনো কিছু অনিশ্চয়তা থাকল। আপনাদের সবাইকেই জিজ্ঞাসা করছি। কিন্তু মিস্টার সারওয়ারদি যদি লিগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সেক্রেটারি হিশেবে বলেন, তাহলে খানিকটা ফর্ম্যাল হয়।
‘দি ডিল ইজ ডান। উই উইল টেক এ নাইট টু সিল ইট। এটা আমাদের কাছে গডসেন্ড।’
