1 of 4

২৫. হকশাহেবের গান-তোলানো

২৫. হকশাহেবের গান-তোলানো

সত্যি, দুই পা। নারান মিয়া ভুল বলেনি। রাস্তায় লোকজনের চলাফেরা দেখেই যোগেন বোঝে, এটাই ললিত সেনের বাড়ি। আর, সেই লোকজনকে ভিতরে ঢুকে বাঁয়ের পোর্টিকোতে দাঁড়াতে বা সেই পোর্টিকো থেকে বেরতে দেখেই, যোগেন ঢুকে পড়ে।

পোর্টিকোতে দু-একজন যোগেনের দিকে তাকায়। যোগেন সামনের ঘরটাতে ঢুকে পড়ে। হকশাহেব একটা চৌকির ওপর পা ছড়িয়ে বসে, গায়ে একটা বুকখোলা ফতুয়া আর পরনে একটা চেককাটা লুঙি। যোগেন চৌকির কাছে গিয়ে বলে, ‘এই-যে দারার ছিন্নমুণ্ডুখান আপনার কাঁধে বসাইয়্যা চইল্যা আইসল্যাম। অ্যাহন আদেশ দ্যান—ছিন্নমুণ্ডুখান আপনার কাছে রাইখ্যা শূন্যমুণ্ডু হইয়্যা ফিইর্যা যাই।’

হকশাহেব তাড়াতাড়ি দুই পা গুটিয়ে বলে ওঠেন, ‘কেডা? কেডা?’

যোগেন যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার পেছনে একটা বিরাট জানলা। দরজা আর সেই জানলা গলা রোদের ঝিলিকে হকশাহেবের চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। যোগেনকে চিনতে পারেননি। চেনার অবিশ্যি কথাও নয়। কিন্তু যোগেনের কথা শুনে আর ধুতিপাঞ্জাবি দেখে বুঝে ফেলেছেন, রোজকার ভিড়ের বাইরের কেউ। যোগেন জবাব দেয়, ‘বান্দার নাম যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। আপনি এক মাঝির হাতে পত্র লিইখ্যা তলব পাঠাইছেন। সে-মাঝির তো লুঙির ট্যাক ছাড়া পত্র রাখার জায়গা নাই। ফলে, জলে সে-পত্রের বেবাক ধুইয়্যা সাফ। শুধু ছাপার হরফে এ. কে. ফজলুল হক নামখান ধোয় নাই। সেই নামখান দেইখ্যাই তলব বুইঝছি। যদি ভুল বুইঝ্যা থাহি, কইয়্যা দ্যান, একজিট নেই।’

হকশাহেব যেন একটু থতমত খেয়েছিলেন। যে-কোনো পরিস্থিতিতে তিনিই সব সময় প্রধান। যোগেন ‘ছিন্নমুন্ডু’, ‘একজিট’ এই সব বলে নিজেকে এমন জাহির করে ফেলে যে হো হো হাসিতে ঘর ভরিয়ে দিতে হকশাহেবের পলকখানেক দেরি হয়।

‘হা হা হা হা। আরে মণ্ডল, আরে তুমি অ্যাকটিং করো নি? হা হা হা হা। দারার ছিন্নমুন্ডু—ও জব্বর কইছ! আবার একজিটও কও। তুমি তো অ্যাসেমব্লিতে সকলরে জববন্ধ কইর‍্যা দিবা আরে, দেখছ নি, আবার কয় একজিট? তোমার এনট্রান্সটা হইল কহন। ভোটে জিইত্যা পাশের বাড়ির ফজলুল হকরে মলাম দ্যাও নাই। তোমারে লোক পাঠাইয়্যা চিঠি দিয়্যা শমন জারি কইর‍্যা আইনবার লাগে! তোমার এনট্রান্স হয় নাই, তাই তোমার একজিটের ক্ল্যাপসও নাই।’

‘তাহাইলে সেবাডা ন্যান আর একখান সিট দ্যান, যোগেন হকশাহেবের দুই হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করে, হকশাহেব তাকে জড়িয়ে ধরে পাশে বসান, ‘আয়ো, আয়ো, বাপজান আয়ো।’

বসে যোগেন বলে, ‘আপনি তো দিগ্বিজয়ী থিয়েটারের নাদির শাহ। শিশিরবাবু তো আর-কাউরে স্টেজে খাড়া থাইকব্যার দ্যান না! সব দিল্লি ম্যাসাকার। কোতল। কোতল।’

হকশাহেব আবার বুক ফাটিয়ে হাসেন, ‘দেইখছ নি? আমিও দেইখছি। জুতা খুইল্যা বাবু হইয়া বসো। অনেক কথা আছে তোমার লগে। কও, খাইব্যা কী? বড় গোস্ত খাও? আনাই?’

‘কন কী, কন কী। এই কথাডা আপনি আমারে কইছেন শুইনলেই তো আমার জাতধর্ম যাওনের বিধান দিব বামুনরা।’

‘য্যান বামুনরা তাগো খাওয়ার মত জাতধর্ম তোমার অবশেষ রাইখছে। জাইত থাইকলেও তুমি শুদ্দুর আর আমি ন্যাড়া। জাইত খাইলেও তুমি শুদ্দুর আমি ন্যাড়া। আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি খাশিই খাও। অ্যাই, রামনা, মণ্ডল খাইব আমার লগে, খাশির মাংস আন। আর তোমরা অ্যাহন যাও, মণ্ডলের লগে আমার পোলিটিক্যাল ডিসকাশন আছে। কেউ থাইকব্যা না। অ্যাই, রামনা, দেহিস, কেউ য্যান শাশুড়ির নাগাল জানলায় কান না পাতে, খাশি আইনছস?’

হকশাহেব যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আরে, মণ্ডল, সে-মাঝিরে তো আমি দিন তিন আগে পাঠাইছি আর তুমি আইল্যা দিন তিন পর। তোমার কি ফাঁসির আসামির কেমন আছিল?’

‘না শাহেব। যে কয়ডা ছিল ফাঁসির মক্কেল আমার, আমার উপর ভরসা না রাইখ্যা তারা নিজেরা নিজেরাই ঝুইল্যা পইড়ছে। আপনার মাঝি বরিশালে আমারে পায় নাই। আমি গিছিল্যাম দ্যাশের বাড়ি মৈস্তারকান্দিতে। আপনার মাঝি তো যমদূতের সম্বন্ধী। বরিশাল থিইক্যা সারারাত বৈঠা মাইর্যা আমারে ঘুম থিক্যা ডাইক্যা তুইল্যা কয় হকশাহেব ডাইকছে।’

‘মৈস্তারকান্দি? বাড়িত আছে কেডা?’

‘সগগলে, যারা বাড়িত থাকে। মা নাই।’

‘কতদিন নাই?’

‘বছর সাত-আড।’

‘তা হাইলে তো সইয়্যা গিছে।’

‘কী?’

‘মাতৃশোক। সারাজীবনে সয় না। তবু তো সওয়াবার লাগে, বাপ! বাবা-জ্যাঠা-খুড়া?’

‘হ্যাঁ। সগলেই আছে—।’

‘চলে কীসে? সংসার? কামাইয়্যা কেডা? জমি আছে নি?’

‘অরে জমি কয় না। ছটাকখানেক। সগগলের যা, আমাগোও তাই। সংসার চলার কথা না। তবু তো চলে, দেহি।’

‘তুমি তো অ্যাহন দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত। এক-পয়সার আয় নাই, বার গণ্ডা ব্যয় আছে। তুমি আর বাড়িতে দিবা কী? বাড়ির থাইকলে সেইডায় ভাগ বসাইবা। দ্যাশের নেতার কি একা সংসার চলে? পোলাপান কয়ডা?’

যোগেন বুড়ো আঙুল তুলে লবডঙ্কা দেখায়।

হকশাহেব চিৎকার করে ওঠেন, ‘আরে, আরে কয় কী? শাদি কয়ডা?’

‘এডডাই যথেষ্ট।’

‘এই তোমাগো হিন্দুগো বদভ্যাস। আরে, শাদির কহনো যথেষ্ট আছে নি? কয় বছর হইল শাদি।’

‘হ্যায় তো মনে থাকে না, এতই তামাদি। কলেজে পড়ার লগে—’

‘অ। পড়ার হাউশ ছিল, পয়সা ছিল না?’

‘তা নাইলে বিয়া বসে কেডা?’

‘হ্যায় তো তহন শিশু, তোমার বৌ?’

‘শিশু হইবার বয়সে শিশু থাইকব না কি পিট্যাইয়া কাঁঠাল পাকাইব?’

‘পিট্যাও নাই আর পাকাও নাই যে তার তো সাক্ষী রাইখছ নিজের শরীলে, আটকুড়া থাইক্যা? অ্যাহন কি কুনো গন্ধ পাও ক্যাঠাল নিজের থিক্যা পাইকল কী না।’

‘আপনার পাঠানো মাঝি যে-ঘুম থিক্যা আমারে তুইল্যা শমন জারি কইরল, সেই ঘুমডার ভিতর কাইল রাতে য্যান গন্ধ-একখান নাকে লাইগল্‌—’

‘আরে, কও কী, মণ্ডলের পোলা। ফজলুলের ডাক আর সন্তানের ডাক একডা টাইমেই শুইনল্যা?’

‘তা, সেরকম কওয়া যায়।’

‘তাহইলে পোলা হইলে নাম হইব ফজলুল, আর মায়্যা হইলে নাম হইব ফজলি।’

‘স্যায় যহন হইব, তহন রাইখবেন। অ্যাহন আমারে ডাকলেন ক্যান, সেই কথাডা কন।’

‘আরে, সে তো কইবই। তোমারে এড্‌ডা চান্স দিলাম। ভাইবল্যাম, বয়স কম, আইতে লজ্জা পায়, ডাইকলে লজ্জাডা হয়তো কাটানোর সুবিদা হইব। তাই সমন। তুমি তো যাদু, ভূমিকম্ফ দিছ, ভূমিকম্ফ। যুক্ত আসনে অশ্বিনী দত্তের ভাইয়ের বেটাকে চিৎ ফেইল্যা দিল্যা। জানো তো, সারা দ্যাশে তোমার লাগান জিতা আর-কেউ জিতে নাই। এইডা কি তুমি জানো, না জানো-না।’

‘দ্যাশ? মানে—বাখরগঞ্জে?’

‘আরে আরো একদুইখান দ্যাশ তো আছে তোমার? নাকী? ইলেকশন-টিলেকশন কি বাখরগঞ্জের লাইগ্যা কইরল্যা মণ্ডল?’

‘না, না, স্যায় সব ক্লিয়ার আছে। আপনি কইলেন না—কী, সারা দ্যাশে ফার্স্ট—’

‘হইছ তো তুমি। অ্যাহন পর্যন্ত যতখান খবর পাইছি তাতে যে-এগারডা প্রভিন্সে এই ইলেকশন হইছে, তার মইধ্যে ঐ অ্যাহন যাগো শিডিউল্ড কাস্ট কব্যার ধরছে, সেই শিডিউল্ড কাস্টের কোনো ক্যানডিডেট জেনারেল সিট থিক্যা, মানে, জয়েন্ট ইলেকটরেট থিক্যা জিতব্যার পারে নাই। দি অনলি এক্সসেপশন ইজ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল অব বাখরগঞ্জ। বুইঝল্যানি সোনা, তোমার জিতার অর্থখান? কিন্তু ফার্স্টই হও আর যাই হও–তোমার জিতার তো কোনো মূল্য নাই।’

‘কন কী হকশাহেব। দরাদরি কইরতে হইলে তো বাজারহাটে একডা ছালা পাইত্যা এক মুঠা কাঁচা মরিচ বেইচব্যার রাইট লাগে। সেই রাইডডাই তো হইল এই নতুন আইনে, কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডে।’

হকশাহেব যেন যোগেনের কথাটা ধরতে পারলেন না। তিনি ‘অ্যাঁ’ বলে যোগেনের দিকে তাকিয়েই থাকেন। যেন কানে শুনে যে-প্রশ্নটির প্রশ্ন বুঝতে পারেননি, চোখে দেখে সে-প্রশ্নটা জেনে নিতে চান। যোগেনও ভেবে বসে, তার কথার ভিতর হকশাহেব আবার অন্য কোনো ইঙ্গিত পেলেন নাকী? যোগেনও হকশাহেবের চোখে চোখ মিলিয়ে বলে ফেলে, ‘অ্যা…।’

একটু নিচু স্বরে ও ভুরু পাকিয়ে হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘কাঁচামরিচের কথাটা উঠে কোথন?

‘মরিচে ঝাল লাইলে ওটারে কলা কইর‍্যা লন—!’

‘কাঁচা কলা?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কাঁচা না হইয়্যা কলা যদি পাকা হয়, তাও আপত্তি নাই।’

‘আপত্তি যে নাই তা তো চোখের সম্মুখেই দেইখলাম। স্বকর্ণে শুইনল্যাম। অন্যের মুখে শুইনলে অবিশ্বাস হইত।’

‘কওয়া কথার তো ফেরত হয় না। আমার মায়ে যহন আমারে প্যাটে ধরছিল, আপনি তো তারও আগে পড়াশুনা, চাকরিবাকরি, উকিল-মোক্তারি সাইরা ফেলছেন!’

‘তুমি তো উকিল, ভালো—এই কথাডা তো আমার লগে আইছে। কিন্তু এইডা তো উকিল-মোক্তারির কথা না। এইডা তো পলিটিক্যাল পারপাজের কথা। তুমি কি তোমার পলিটিকসডা কী, তা কইব্যার পার?’

‘কইব্যার হয়তো পারি একডা কিছু বানাউটি কইর‍্যা। সেটা তো সত্যি না। আবার পুরাডা মিথ্যাও না। আমার সইত্যডা বুঝি আমার থিক্যা আপনিই বুঝবেন ভালো। আমারে কইয়্যা দ্যান। আমারে তো এডডু ভাইবার লাইগব, আপনার কথাডা আমার বেলায় ষোল আনা গিনি, না ব্রোঞ্জের, মিশাল।’

‘অ। অ্যাহনো তুমি ষোল-আনা গিনি আর ষোল আনা ব্রোঞ্জের বিশ্বাসী। কাঁচামরিচ আর কাঁচাকলা তো স্বচক্ষে দেইখল্যাম, স্বকর্ণে শুইনলাম। এরপর তুমি আমার কাছ থিক্যা তোমার নিজের পোলিটিক্যাল পারপাজ শিখব্যার চাও? এরপর তোমার মামলা আর টেঁকে ক্যামনে? না, মণ্ডল। তোমার এক্কেরে ঢাকিসহ বিসর্জন।’

‘একখান কথার কথা কইছি, মরিচ আর কলা, আর সেই নিয়্যা গলায় এক্কেরে পাঁড়া দিয়া ধইরছেন। আপনি কইলেন, শিডিউলগো জিতার কোনো মূল্য নাই। তার জবাবে কইছি—সবে তো এই ভোটে প্রথম মরিচকলা নিয়্যা ছালা পাতছি। সেই কথাডারে এত কচলান ক্যান?’

‘তুমি তো হাটঘাট চিনো? দেইখছ তো?’

‘সেডাও সন্দ হয়?’

‘কোনো হাটে দেইখছ কাঁচা মরিচ আর কাঁচা কলা ছালা পাইত্যা বিক্কিরি হয়? দেইখছ?’

‘ছালায় দেখি নাই, পাহাড় কইর‍্যা দেইখছি।’

‘সে তো দেইখব্যাই, চালান যায়, বরিশাল থিক্যা। কিন্তু ছালা পাইত্যা একমুঠ কাঁচা মরিচ নিয়া বইসছে হাটে—দেখছ নি?’

‘মনে হয় না, দেইখছি।’

‘আরে, দেইখলে তো মনে হব? চাষির যদি কাঁচা মরিচ কিন্যা খাওয়ার পয়সা হয়, তাহলি তো কওয়া লাগে—রামরাজত্ব তো হইয়্যাই আছে, শুধু একখান রামচন্দ্রের অপেক্ষা’

‘এইডা বড় ঠিক ধইরছেন। কৃষকের খরচার পয়সা—আমার এইডা মাথায় আসে নাই’–বলে যোগেন হেসে ফেলে, আত্মোপলব্ধির হাসি।

—’আবার, তো, দেহি হাসো! চক্ষু তো আল্লা দুইডাই দিছে তোমারেও। মুণ্ডুও দিছে একখান। বঙ্গপ্রদেশের প্রথম নির্বাচিত আইসভায় গিয়া ছালা পাইত্যা বলবা—এই যে বাবুরা, আমরা গরিব শিডিউল, আমাগো কলামরিচও কিছু নিবেন? এর লগে ভোট? আবার হাস?’

‘না, হকশাহেব, হাসি দুঃখে। চাষি গরিবের খরচার কথাডা মাথায় খেলে নাই কেন—সেই কারণডা বুইঝ্যা—।’

‘বুইঝল্যাডা কী?’

‘আমাগো নিজের বাড়িতেও তো খরচা নাই। ক্যান? না, পয়সা নাই। তয়? খরচা-ছাড়া যেইটুক্ বাঁচা যায়, আমাগো সেইটুক্ বাঁচা। যার মরণশ্বাস উঠছে, সে তো আর ভাইবব্যার পারে না তার শ্বাসটানা আর শ্যাষ হব না। আপনাগো নাগাল যারা তারে ঘিইর্যা বাঁইচ্যা খাড়াইয়্যা থাহে, তারা বুঝে ঐডা মরণশ্বাস। আমাগো তো এই অভাবের বোধই নাই হকশাহেব। কামনে বুঝি?’

‘কও কী মণ্ডল? ল্যাংটার নাই বাটপাড়ের ডর?’

যোগেন তার হাসিটা নিয়ে চুপ করে থাকে। বোঝা যায় সে কথাটা ভাবছে। হকশাহেব ও চুপ করে থেকে তাকে ভাবতে দেন। কথাটা কি তিনি জানতে চান, না, কথাটা তিনি জানাতে চান। এটা তো একটা রাজনীতির বিনিময়ের বিষয়, এমন বিষয় যা হকশাহেব বা মণ্ডলের ক্ষমতায় সমলানো যাওয়া নিয়ে সংশয় আছে।

যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘কথাখান উলটা না তো হকশাহেব?’

‘উলটাও, উলটাইয়্যা দ্যাহো, কথাডার কোন্ দিকে প্যাট আর কোন্ দিকে পিঠ, দ্যাহো।’

‘বাটপাড় কি আর ল্যাংটারে ডরে?’

হকশাহেবের ভুরু কুঁচকে যায়। যোগেনের ঠোটের হাসিটা তার ঠোঁট থেকে মোছে না। সে যেন আরো ঠিকঠাক কথাটা ভাবতে চায় আর আরো ঠিকঠাক কথায় সেটা বলতে চায়। হকসাহেব আইনের সূক্ষ্ম একটা বিচার মনে-মনে সারার জন্য নিজের মনে বলেন, ‘ক্যা? বাটবাড়ের কী কারণ থাইকব্যার পারে ল্যাংটারে ডরানোর?’ তারপর যোগেনকে বলেন, ‘কথা সাফ করো। তুমি কি বাটপাড় না ল্যাংটা?’

যোগেন হাসিটা ছড়িয়ে দিয়ে বলে, প্রশ্নের সুরে, ‘আমি যে ল্যাংটা সেডা তো সগলেই দেখতিছে। আমি যদি কইও, না, আমি ল্যাংটা না, সে কথা কেউ মানব নি? সগলেই তো দেইখছে—আমার চ্যাটটা খোলা, সেইটুক্‌ ঢাকার ত্যানাও নাই আমার। তহন যদি আমি কই—আমি বাটপাড় হইয়া তোর পাছার কাপড় টাইন্যা নিয়্যা আমার চ্যাট ঢাগব—তহন যার পরনে কাপড় হ্যায় ডর খাইব না? যোগেনের স্বরে কোনো মীমাংসা ফোটে না, প্রশ্নই ফোটে, ‘যার পরনে কাপড়, হ্যায় ডর খাইব না?’

হকশাহেবের কপালের ভাঁজ সোজা হয় না। একবার তিনি ‘অ্যাঁ’ বলেন কী না, বোঝা যায় না, হয়ত ছোট একটা কাশি।

যোগেন বলতে থাকে, ‘প্রথমে খাইব না ডর। যাঃ, যাঃ, কইর‍্যা খ্যাদাইব। যাঃ, যাঃ, চাঁড়ালের চ্যাট দ্যাহে কেডা। চাঁড়াল তো তিনজন্মের ল্যাংটা।’

‘তিন জন্ম ক্যা?’

‘আগের জন্ম আর পরের জন্ম মিলাইয়্যা।’

‘অ।’

‘খ্যাদাইলেও ল্যাংটা যদি না সরে আর কয়— ত্যানা একখানা নিবই—’

হকশায়েব অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে কেশে ফেলেন, কাশি থামলে আবার হেসে আবার কাশেন। কোন্‌টা তিনি থামাতে চান—কাশি না হাসি–বোঝা যায় না।

শেষে লুঙিতে নাক ঝেড়ে চোখ মুছে বলেন, ‘জর্ কইছ রে মণ্ডল। পোলিটিক্যাল মোটিভেশন এর চ্যায়্যা ক্লিয়ার করার সাইধ্য নাই কারো। তুমি নি এই কথাডাই কইছ ইলেকশনে—ত্যানার ভাগ দাও, চ্যাট ঢাকব।’

‘না। কই নাই। আমার তাতে বিপদ হইত।’

‘বিপদড়া কী?’

‘বাবুরা কইব্যার ধইরত, তোগো তো ত্যানা আলাদা কইর‍্যা দিছে, রিজার্ভ সিট। সেহানে না বইয়্যা হিন্দুগো সিট কংগ্রেসিগো সিটে আসিস ক্যান? আমার সিট তো জেনারেল—’

‘অ। তালি তো ডর খাওয়ানোর বুদ্ধি খাটে না। তো কইল্যাডা কী, এই কথায়?’

‘এই কথায় আমি এদিকওদিক করি নাই। সিধা বর্শা চালাইছি বাবুগো কণ্ঠা লক্ষ কইর‍্যা।’

‘ব্রহ্ম হত্যা হইত না?’

‘দেহি নাই। কইছি—একখান ভোটের লগে এতডা মিথ্যা কথা কওয়া ধর্মে সবে না। বামুন-কায়েত-বদ্যিগো আমরা পণ্ডিত বইল্যা দিনে দশবার সেবা দেই, মুসলমানগো পাঁচ-ওকতো নমাজের ডবল আর তাইনরা এমন একখান মিথ্যা রট্যাব্যার ধইরছেন? হ্যাঁ। কয়েকডা আসন রিজার্ভ রাখা হইছে হিন্দুগো ভিতর যে-সব জাইত সৎশুদ্দুর আর শুদ্দুর তার লাগে। বাকি সব সিট তো খুলা—যার ইচ্ছা সে-ই খাড়াবার পারে। বিদ্যাসাগর পণ্ডিত যহন বিধবাগো বিয়্যার আইন পাশ কইরলেন তহন কি তিনি কইছিলেন—শুধু বিধবাগোরই বিয়া করা চইলবে, আর কারো বিহা করা চইলবে না? তিনি তো খুঁইজা পাইয়্যা এর উলটা কথাডাই বাইর করছিলেন—শাস্ত্রে সগলে বিহা কইরতে পারব, বিধবারাও ইচ্ছা কইরলে পারবো। আমি তাই খোলাসিটে খাড়াইছি।’

‘জব্বর কইছ তো মণ্ডল। বিদ্যাসাগরের কথাডা। তোমার ভোটার তো সব শুদ্দুর আর মোছলা। অগ তো আর বিধবা বিয়ার আপত্ত নাই। তালে অরা কোন্ পাকে বুইঝল?’

‘চিরডা কাল একসঙ্গে বসবাস। অরা বুঝে না—বামুন কায়েতের বিধ্বারা আলাদা?’

‘আপন বুঝ পাগলেও বুঝে হে মণ্ডল। আর, বুইঝবে না শুধু মোসলা আর নমশুদ্দুর চাষি, নাকী? কয়, রিজার্ভ সিট নিয়্যা যাবি কনে। বর্ণ এ মোসলা অ্যান্ড শুদ্দুর ইজ অলওয়েজ এ মোসলা অ্যান্ড শুদ্দুর। ভোটের পর তো অ্যাহন আবার ডর খাওয়াইব্যা, বাটপাড়গো? এই ঠাকুরমশায়, তোর নামাবলির আদ্ধেকখান ছিইড়া দে, চ্যাট ঢাহি। যাউক গা, ডর খাওয়াও। আমার তো নামাবলিও নাই, ধুতিও পরি না, বামুনও না। আমার ডরের কিছু নাই।’

‘তয় যে শুনি ললিত স্যান মশায়ের বাড়ির দুয়ারে প্রথম মিটিঙে নাহি ধুতি পরছিলেন? আর কী এক ধাঁধা ছাইড়ছিলেন। লয়ে লয়ে যুদ্ধ। শুইনছি। কিন্তু বুঝি নাই। বোকা ভাইবব বইল্যা কাউরেও জিগ্যাবারেই পারি না। অ্যাহে তো মনে-মনে জানি, আমি হদ্দবোকা। সে কথাডা যদি দশের কানে যায়—তালে তো ভোটও দিব না, মামলাও দিব না। বৈশাখ মাসের ব্যাঙের নাগাল শুখাইয়্যা মইরব্যার লাইগব। এডডু কয়্যা দ্যান হক শাহেব।’

‘ঐডা তো বানান ধাঁধা। রাম-রাবণে, কৃষ্ণ-কংসে, গান্ধী-গভর্নমেন্টে আর এইবার লবাবে-লাঙলে। শুইনছ নি লাঙ্গল নিয়্যা কাজির গান, আব্বাসের গলায়?

চল্ বাজান, চল্ মাঠে, লাঙ্গল বাইতে

বৌ দিয়েছে গলায় দড়ি, তার ব্যথা সইতে।

তুমি নাহি ভালো গান গাইব্যার পারো, মণ্ডল। এই গানডা গলায় তুইল্যা নিয়ো।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *