1 of 4

২০. যোগেনের প্রিপজিশন

২০. যোগেনের প্রিপজিশন

মেঝে থেকে যোগেন একটু চমকে টুনির দিকে তাকায়। যোগেনের মুখটা চওড়া, তাই সে মনোভাব গোপন করতে পারে। তবু সে যে একটুও না হেসে টুনিকে দেখতে থাকে ও টুনিও নড়ে না, তাতে একটা পরিস্থিতি তৈরি হল। সে-পরিস্থিতি যোগেনের মুখমণ্ডল বা স্বভাবের গড়ন দিয়ে ঢাকা গেল না। যোগেন দেখে—একটি নমশূদ্র মেয়ে, যোগেনের চাইতে অনেক ছোট, কত হবে, বিশ-পঁচিশ, বিয়ে হয়েছে, শ্বশুরবাড়ি কাছেরই একটা গ্রামে, নিশ্চয়ই ছেলেমেয়েও আছে, রায়বাহাদুরের বাড়ি কাজ করে। এসব কাজের কোনো নিয়ম নেই, যাঁদের বাড়িতে থাকে—তারা বলেও না কাজের লোক, বলে—আমাগ বাড়ির ছোট বা বড় বামুন-কায়েত বাবুদের বাড়ির সঙ্গে এমন দু-এক-ঘর নমশূদ্র জুটে যায়। যে-কোনো বাবুবাড়িতে গেলেই দেখা যায় এদের—জামা পরে না, এক পাল্লা কাপড়, দৌড়ে-দৌড়ে বাড়ির কাজ সারে। টুনি চায়—যোগেন সমানে-সমানে বসুক। যোগেন ধুতি-পাঞ্জাবি-জুতো পরে এই তিনচারটি গ্রামের একজন রায়বাহাদুরের সঙ্গে কথা বললে হয়ত টুনির আরো গর্ব হত। যোগেন মেঝে থেকে উঠে চেয়ারে বসল—কোঁচড়টা কোলের ওপর রেখে।

‘বসো’, টুনি যেন যোগেনের চেয়ারে বসাটায় খুশি হয়ে বলে, ‘বসো, কত্তারে ডাকি।’ টুনি যেতে-না-যেতেই রায়বাহাদুর ঢুকলেন। রায়বাহাদুর যে রায়বাহাদুর ও শাহেব—তার প্রমাণ, গ্রামে এক তার বাড়িতেই দরজা বন্ধ থাকে, কেউ ডাকলে খোলা হয়। অনেক বাড়িতেই কাছারিঘর বা বারবাড়ি আছে—ঐ শতরঞ্চি পাতা, এক রায়বাহাদুরের বাড়িতেই আছে বৈঠকখানা—চেয়ার-টেবিল দিয়ে সাজানো অফিসঘরের মত, দেয়ালে ফটো ও ক্যালেন্ডার ঝোলানো—ফটো মহারানি ভিক্টোরিয়া ও পঞ্চম জর্জের, ক্যালেন্ডার গ্ল্যাক্সো কোম্পানির। রায়বাহাদুর বেশ বড় জমিদার—গৌরনদীতে তো আছেই, তবে ওঁর আসল জমিদারি যশোরে, ফরিদপুরেও কিছু। রায়বাহাদুর উকিল—প্র্যাকটিশ করেন যশোর কোর্টে, কিন্তু ওঁদের বংশের আদিনিবাস মৈস্তারকান্দি সে ছাড়েননি, নিজের পানসি আছে, যখন-তখন আসেন, এখানকার বাড়িতেই অনেকেই থাকেন, রায়বাহাদুরের জমিদারির নামও মৈস্তারকান্দি এস্টেট, রায়বাহাদুর যে রায়বাহাদুর কেন, সেটা কারো জানা নেই কিন্তু রায়বাহাদুর যে রায়বাহাদুর সেটা সকলেই জানে ও মানে। রায়বাহাদুর প্লেয়ার্স সিগারেট খান—টিনের ওপর দেশলাই, বুড়ো আঙুলে চাপা থাকে। মৈস্তারকান্দিতে সিগারেট খাওয়ার মত দ্বিতীয় লোক কেউ নেই—এক পুজোপার্বণে দেশের বাড়িতে কেউ-কেউ না এলে। রোজ দাড়ি কামানো লোকও আর-কেউ নেই।

‘কেডা আইছে?’ বলে রায়বাহাদুর ঢোকেন। তার পরনে ধবধবে ধুতি আর গায়ে সবুজ জমিতে খয়েরি পাড় দেয়া বালাপোশ।

‘ও। আশু স্যার? ইউ আর লেট বাই ওয়ান ডে। আমি তো কাইল আসছি।’

‘এরে তো চিনেন?

‘মানে, তুমি কি আমার পয়েন্ট অব প্রাইডে পকেটমার কইরব্যার চাও আশু? মৈস্তারকান্দির কাউরে আমি চিনি না, তার নাম ও বাপঠাকুরদার নাম জানি না—এডা তো অ্যাহনো ঘটে নাই। অ্যান্ড মোরওভার মিস্টার মণ্ডল ইজ এ রাইজিং ল-ইয়ার ইন বরিশাল বার। দি মোস্ট অব অল হি ইজ দি ফার্স্ট ইলেকটেড এমএলএ ফ্রম আওয়ার কনস্টিটুয়েন্সি। ওয়েল, মিস্টার মণ্ডল, ভেরি গুড অব ইউ টু ভিজিট মি’, রায়বাহাদুর যোগেনের মুখের ওপর কথা শেষ করেন। যোগেন আশুবাবুর দিকে তাকায়—সে কী করবে।

আশুবাবু উত্তেজিত ভঙ্গিতে যোগেনকে বলে, ‘স্পিক টু হিম ইন ইংলিশ। হি উইল লাইক টু হিয়ার ইউ স্পিকিং ইংলিশ।’

‘উই বিলং টু দি সেম প্রফেশন আশুস্যার অ্যান্ড ইন দি অ্যাসেমব্লি হি উইল হ্যাভ নো আদার ল্যাংগুয়েজ দ্যান দি কিংস।’

‘মিস্টার রায়বাহাদুর, ইফ ইউ থিঙ্ক সো ইউ শুড হ্যাভ টেকন এ পজিশন এগেইনস্ট দি ইনট্রোডাকশন অব বেঙ্গলি অ্যাজ দি মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন ইন দি ম্যাট্রিক স্ট্যান্ডার্ড’–আশুবাবু বলে।

‘হাউ কুড আই এগেইনস্ট দি স্ট্রং অ্যালায়েন্স অব লর্ড অ্যান্ডারসন, মিস্টার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। অ্যান্ড হাসান সারওয়ারদি? নিদার ডু আই হ্যাভ এনি লোকাল স্ট্যান্ডিং। হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক অ্যাবাউট ইট, মিস্টার মণ্ডল?’

যোগেন নিজেও টের পায়নি ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত বাংলায় পড়া ও পরীক্ষা-দেয়া যাবে—এই প্রশ্নটি ওঠামাত্র সে তার হাঁটু পর্যন্ত কোঁড়া ধুতি, ছোট শার্ট, খালি পা ও কোঁচড়ের কথা ভুলে গিয়েছে। এই পোশাক-আশাকের পেছনে নিশ্চয়ই তার আত্মসচেতনতা ছিল। আবার, শিক্ষার মাধ্যমঘটিত এই কথায় তার সেই আত্মসচেতনতার একটা অপসরণও ঘটল বটে কিন্তু সেই অপসরণের ফলে উজ্জ্বল ও স্পন্দিত এক আত্মসচেতনতা—যা তার অর্জন, ফুঁড়ে উঠল। যোগেনের গলা গম্ভীর ও চাপা।

‘হোয়াইল অবজারভিং দি ডিবেট, আই অ্যাম এ লিটল কনফিউজড ওভার দি ইউজ অব দি টার্মস, প্যাট্রিয়টিক অ্যান্ড নন-প্যাট্রিয়টিক।’

‘হোয়াট ইজ দি কনফিউশন অ্যাবাউট? টু গো ফর বেঙ্গলি ইজ এ ন্যাশনালিস্ট প্রোগ্রাম, মিস্টার মণ্ডল।’

‘আই হ্যাভ দি ফার্দার কনফিউশন রিগারডিং হু দি ন্যাশনালিস্ট ইজ?’

‘দোজ হু ক্লেইম দেমশেলভস টু বি ন্যাশন্যালিস্ট। দ্যাটস কংগ্রেস।’

‘ইজ ইট নট এ ব্যাড জাজমেন্ট টু অ্যাকসেপ্ট ওয়ানস ক্লেইম অ্যাবাউট হিমসেলফ? দ্যাট লিড্স নো গ্যাপ ফর ক্রিমিন্যাল-ল টু অ্যাক্ট টু ডিটারমিন দি ট্রুথ’, যোগেন বোঝে যে তার কথাটা সে ঠিক বলতে পারল না, রায়বাহাদুরের মুখচোখেও সেটা বোঝা গেল। আশুবাবু বলে উঠলেন, ‘ইউ আর টকিং অ্যাবাউট দি মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইউ আর রেইজিং কোয়েশ্চেনস অ্যাবাউট ল। আই ফেইল টু ফলো।’

‘নো, নো, হি হ্যাজ এ পয়েন্ট দেয়ার। হি সেস দ্যাট ওয়ান শুড নট বি টেকন টু বি এ ন্যাশন্যালিস্ট অনলি অন হিজ ওন ক্লেইম। দেয়ার হি ইজ মিটিং মাই পয়েন্ট দ্যাট কংগ্রেস ইজ ন্যাশন্যালিস্ট ওনলি বিকজ অব ইটস ওন ক্লেইম। ইয়েস, মিস্টার মণ্ডল, ইউ আর কারেক্ট? বাট হ্যাভ আই ফলোড ইউ কারেক্টলি?’

‘ইয়েস স্যার, আপটু দ্যাট ইউ হ্যাভ পুট ডাউন মাই আর্গুমেন্ট ফার বেটার দ্যান মি।’

‘বাট দি আর্গুমেন্ট ইজ ইয়োর্স। লেট মি গো ফারদার। উইল ইউ এগ্রি টু ডেসক্রাইব দোজ পার্টিজ লাইক, সে, মুসলিম লিগ অর সে কৃষক-প্রজা পার্টি, অ্যাজ ন্যাশনালিস্ট ইভন দো দে হ্যাভ নো সাচ ক্লেইম?’

‘বাট স্যার, দে হ্যাভ আদার ক্লেইমস ফর রেকগনিশন। অ্যান্ড বাই দোজ ক্লেইমস দে মে বি রেকগনাইজড অ্যাজ ন্যাশন্যালিস্ট।’ ঠিক এই জায়গায় টুনি একটা চিনে মাটির ডিশে ফোলা ফোলা লুচি নিয়ে ঢোকে। সারা ঘরে ঘিয়ের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। টুনি যোগেনের দিকে এমন করে তাকায় যেন সে তার নিজের কানকে বিশ্বাস করছে না। যোগাদাদা রায়বাহাদুরের সঙ্গে সমানে-সমানে ইংরেজিতে কথা বলছে? যোগাদাদা কি এতটাই সমান-সমান? যোগা যদি খুব শুদ্ধ বাংলাতেও কথা বলত, তাও টুনি বুঝতে পারত না ও সে একইরকম অবাক হত। সেটাকেও সে ইংরেজিই ভাবত–কারণ, যা কিছু সে জানে না, তাকেই সে ইংরেজি ভাবে। কাকে আগে দেবে—সেটা ভুলে যায় টুনি, সে রায়বাহাদুরকেই এগিয়ে দেয়। রায়বাহাদুর বলে ওঠেন, ‘করিস কী মা, অগরে আগে দে’। টুনি আশুস্যারকে দেয়। রায়বাহাদুর ততক্ষণে যোগেনকে বলছেন, ‘উইল ইউ প্লিজ এক্সপ্লিকেট দি লাস্ট পয়েন্ট?’

‘প্লিজ একসকিউজ মাই ইগনোরেন্স অব ইংলিশ ল্যাংগোয়েজ। দিজ পয়েন্টস আর সো ভাইট্যাল ফর আস দ্যাট আই লাইক টু স্পিক ইন বেঙ্গলি।’

‘বাট মিস্টার মণ্ডল, ইউ আর টু এক্সপ্রেস ইয়োর ফিলিংস অব দি হার্ট অনলি ইন ইংলিশ ইন দি অ্যাসেমব্লি। অ্যান্ড ইউ স্পিক ভেরি ওয়েল। ইট ইজ সো ফরচুনেট দ্যাট দি গ্রেট ব্রিটিশ নেশন ইজ টিচিং আস দিজ পার্লামেন্টারি প্রসেসেস। ইফ-সান অব দি সয়েল লাইক ইউ বিকামস ইউজড টু দিজ প্রসেসেস, আনলাইক দি ইল্লিটারেট জমিনদার্স হু অয়্যার সুটস মেড বাই র‍্যানকিং অ্যান্ড ইভন র‍্যানকিং ক্যানট ম্যানেজ দেয়ার অড শেপ্‌স,’ রায়বাহাদুর হাসলেন বলে আশুস্যার আর যোগেনও হাসল কিন্তু তারা কথাটা বুঝতে পারলেন না। টুনি দুই হাতে দুটো ডিশ নিয়ে এসে ডান হাতেরটা রায়বাহাদুরকে আর বাঁহাতেরটা যোগেনকে যখন দেয়, রায়বাহাদুর বলে, ‘টুনি মা, আমারে মাত্তর দুইখান দে। ভাত খাব তো? নাইলে তো দুপুরের ঘুম আইসব না। মিস্টার মণ্ডল পারহ্যাপস ইউ নো দ্যাট আই অ্যাম এ ডাইহার্ড সাপোর্টার অব দি এমপায়্যার। দি ব্রিটিশ হ্যাজ মেড আস সিভিলাইজড। আই প্রে টু গড দ্যাট দি ব্রিটিশ নেভার লিভস আস টু এনি কাইন্ড অব ন্যাশন্যালিস্টস। বাট আই উড লাইক টু নো ইয়োর পয়েন্টস। দি ডিপ্রেসড ক্লাশেস উইল বি কিলড ইফ দি ব্রিটিশ লিস।’

টুনি রায়বাহাদুরের ডিশ নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে, যোগেনের ইংরেজি গলার স্বরটা শুনতে।

‘মাই প্রোপোজিশন ইজ টু সিম্পল। হোয়েন দি মুসলিম লিগ পিল সে, আনলাইক কংগ্রেস, দ্যাট দে আর দি অনলি পার্টি টু রিপ্রেজেন্ট দি মুসলিমস–দে ওয়ান্ট টু অ্যাসার্ট দি মুসলিমস রাইট অ্যাজ এ পার্ট অব দি ইনডিয়ান নেশন, ইফ দেয়ার বি এনিথিং লাইক দ্যাট। সিমিলারলি কৃষক-প্রজা পার্টি অ্যাসার্টস্ দি পেজান্টস রাইট অ্যাজ এ পার্ট অব দি সো কলড নেশন। সে, দি ডিপ্রেসড ক্লাশেস অ্যাসার্ট দেয়ার রাইট অ্যাজ এ পার্ট অব দি সেম নেশন। দি কমপ্লিমেন্ট ডিপ্রেসড–’

‘ইট ইজ অ্যান অ্যাডজেকটিভ যোগা, নট এ কমপ্লিমেন্ট’–আশুবাবু যোগেনকে বাধা দেন। যোগেন একটু হেসে বলে, ‘স্যার, ইয়োর কারেকশন হেল্পস মি মোর। ইফ ডিপ্রেসড ইজ অ্যান অ্যাডজেকটিভ, দেন ইট মাস্ট বি রিলেটিভ টু অ্যানাদার অ্যাডজেকটিভ, ইমপ্রেসড। ইফ দেয়ার বি এনি লো কাস্ট, দেয়ায় মাস্ট বি সাম হাইকাস্ট। দে হাইড দিস বাই কলিং দেমসেলভস্‌ ন্যাশন্যালিস্ট।’

‘বাট হোয়াট অ্যাবাউট দি মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন?’ আশুবাবু যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন।

‘সেই কথাডা কইতেই তো এতডা কথা। স্যার, আমি বুঝি বাংলায় পড়াশুনা হইলে আমাগ জাতের মানুষের বড় সুবিধা হয়, অন্তত বাংলাডা তো শিখতে পারব। কিন্তু আপনাগ তো স্যার ধনুর্ভাঙা পণ। শিখব তো ইংরাজিতেই শিখতে হইব। না হইলে শিক্ষা নাই।’

‘তুমি ঠিক কইছ যোগেন। শিক্ষা যদি বেবাকরে দিবার হয়—তাহালি সবারগা ভাষাতেই দিবার লাগব। আমাগ তো শিক্ষায় দুর্ভিক্ষকালীন ব্যবস্থা। লঙ্গরখানা যদি খুইলব্যার লাগে তাইলে ভাল কইর‍্যা পাতলা-খিচুড়িই দিব্যার লাইগব। আমি তোমার পক্ষে যোগেন।’

‘আরে, আমি একডা দরকারি কথা তুইলল্যাম শিক্ষার ব্যাপারে, আর যোগা নিয়্যা গেল ন্যাশনালিজমের ব্যাপারে। এইডা কী হইল?’

ওঁরা উঠে পড়েছিল। যোগেন তার কোঁচড়টা সামনেই ধরে থাকল, কোনো সংকোচ হল না, ‘স্যার, ঐ কথাডার মীমাংসা নাই। শুইদ্ধ্যা শুইদ্ধ্যা আপনার মটকা গরম হইব।’

‘ক্যান? নাই ক্যান?’

‘আপনার লগে শিক্ষা কইতেই তো ইংরাজি।’

‘তার বাইরে শিক্ষার আর আছে ডা কী?’

রায়বাহাদুর নিজেই দরজা খুলে দিয়েছিল।

বেরতে-বেরতে যোগেন বলে, ‘বাংলা পইড়তে পাইরলে, অঙ্ক কইষব্যার পাইরলে আর বাংলাতেই লিখব্যার পাইরলে এড্ডু, সেইডা ক্যান শিক্ষা হয় না, স্যার?’

ওঁরা বাইরে এসে দাঁড়ালেন। রায়বাহাদুর যোগেনের কাঁধে বেশ জোরে তার বাঁ-হাতটা রেখে বলে উঠলেন, ‘এডা কী হইল? যোগেনরে তো আমি রামদয়ালের বেটার বেশি ভাবি নাই। অ জিইতছে শুইন্যা ভাইবল্যাম, ঐ নমশূদ্রগুলানও অ্যাহন ন্যাশন্যালিস্ট হব নে। অ্যাহন তো দেইখতেছি, যোগেন আর আমি সব বিষয়েই একমত!

‘বিষয়গুল্যা কি সব ঠিক হইয়া গেল নি?’ আশুবাবু বলে।

‘অন্তত দুই-চাইরডা তো হইল। অও ন্যাশনালিস্টগুলারে পছন্দ করে না, আমিও করি না। অও কয়—কমপক্ষে যতটুকু শিক্ষা দরকার তা বাংলাতে হইলেই বেশি হইব। অও কয়—কংগ্রেস যদি ন্যাশনালিস্ট হয় তো মুসলিম লিগ হইব না ক্যান? যোগেন, এই কংগ্রেসিগুলাকে ঠ্যাহাও। এইগুলা তো যমের অরুচি। আর কী এক নেতা খুঁইজ্যা আইনছে। গান্ধী! আমাগ কি সাহা-শুড়ি কিছু কম ছিল?’

‘তাইলে তো বিষয় একখান বাইড়া গেল—গান্ধী।’ আশুবাবু একটু হাসি মিশিয়ে বলে। ‘না। শুধু গান্ধী না। বাদ থাইকল, ধরো জমিদারি। বাদ থাইকল, ধরো, রিজার্ভেশন, বাদ থাইকল ধরো মহাজনি। যোগেন, তুমি যহনই পারবা আইসো, যশোরে পারো যশোরেই আইসো। না-হয় আমার পানসি কইরা সারাদিন ভাইস্যা সবগুল্যা কথা শ্যাষ কইর‍্যা নদী থিক্যা ফিরব।’

‘যোগাদাদা, আইসো কিন্তু আবার, পেছনে দরজার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আঙুলে ভর রেখে খাড়া হয়ে টুনিও তার মুখ তুলে চিলের মত চেঁচায়।

‘আইসবনে। লুচি ভাইজ্যা থুস।’

রাস্তায় উঠে যোগেন বলে, ‘স্যার, অ্যাডডা কথা কই। এতখান যহন আইয়্যা পড়লাম, আমি আগৈলঝরাডা সাইর‍্যা বাড়ি ফিরি। আপনি এহান থিক্যা বারথির পথ ধরেন। আমি সদর যাওয়ার আগে আর-একবার আপনার লগে দেখা কইর‍্যা যাবু নে।’

‘তুই কি আগৈলঝরাত্ আমারে লগে নিব্যার চাইস না?’

‘সে কী কথা? কী যে কন স্যার?’

‘আমি তো তাহাইলে তোর লগে আগৈলঝরা গিয়্যা ফিরার বাদে বারথির পথ ধইরব্যার পারি আর তুইও মইস্যারকান্দির পথ ধইরবার পারস। আমারে অ্যাহনই খেদাবার চাইস ক্যা?’ আপনে স্যার আসলে নারদমুনি। খটখটি না বাধাইয়্যা পারেন না। আগৈলঝরা গিয়্যা ফিরতে তো বেলা শ্যাষ। শীতের বেলা আর কতক্ষণ? তাই কইল্যাম। কাম নাই আমার, আপনার খাটনি বাঁচাইয়্যা। চলেন, আগৈলঝরা। আমি আগৈলঝরা থিক্যা বারথি গিয়্যা আপনারে বাড়িতে গস্ত কইরা মৈস্তারকান্দি ফিরব।’

‘সে তো তোর অনেক রাইত হইয়্যা যাবে নে।’

‘সে যা হয় বুঝা যাবে। না-হয় তো আন্ধারে কুন খানায় কুন গর্তে পা ভাইঙ্গ্যা পইড়্যা থাকবে আর দুনিয়ার মানুষ কবে নে–ম্যাম্বার হওয়ার পরে যোগেনের পেরথম কাজ—মাস্টারের পা-ভাঙা।’

‘তো চল্ বাবা, তাই চ-ল্। আমি আগৈলঝরা থিক্যা বারথি যাইব্যার পারব।’

ওঁরা হাঁটতে-হাঁটতেই কথা বলছিল। আশুবাবু বলে, ‘টুনি তো লুচি দিয়্যা ঠাইস্যাই দিছে।’ যোগেন তার কোঁচড় দেখিয়ে বলে, ‘আর বন্নমামি?’

‘কী দিছে?’

‘আপনি কি আর দেইখব্যার দিলেন? যে-রাগ রাইগলেন।’

‘তুই এইডা বুইঝবি না। বামুনের অপমান।’

‘এইডা একখান জবর কথা কইছেন স্যার। বামুনের অপমান আমরা বুইঝব না। দিনরাত, ধরিস না, ছুঁইস না, সইরা খাড়া শুনতে-শুনতে এমন হইছে যে ঘুমের মধ্যেও কাইত হব্যার পারি না। ভাবি, ঐখানে আবার কোন বামুন না-ঝ্যান খাড়াইয়্যা আছে। বামুনের অপমান আর আমরা বুইঝব ক্যামনে?

‘আরে, সে-কথা কই নাই। বামুন এহানে কজেটিভ নাউন না, যেমন তোগ বেলায়। এইডা এইহানে অবজেকটিভ নাউন। অপমান কার? না, বামুনের। বাংলার এই একখান বিপদ। এইগুল্যা ঠিক না কইর‍্যা বাংলারে শিক্ষার বাহন কইরলেই হয়? কইব্যার চাই, টু ডিসগ্রেস এ বামুন। আর বাংলায় কথাখান বললে অর্থ হইব, ‘দি ডিসগ্রেস বাই এ বামুন। আমি কইছিলাম—রায়মশায় আমারে ব্রাহ্মণ বইল্যাই অপমান দিছেন।’

‘সে তো তহনি বুইঝছি। একডা তিলকাঠি খাবেন নাহি স্যার? প্যাট-জিভা-গলা এক্কেরে পাতলা হইয়্যা যাবে নে, এমন মিষ্ট তিতা।’

‘দে দেহি একখান।’

যোগেন কোঁচড় খুলতে গিয়ে প্রায় উলটে ফেলে। তাড়াতাড়ি গিয়ে রাস্তার পাশে ঘাসে বসে কোঁচড় খুলে তিলকাঠি খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে বলে, ‘ওটাও তো কজেটিভ হইব্যার পারে স্যার। বামুন তো বামুন বইল্যাই অপমান হইল আর-এক বামুন কর্তৃক।’

‘তোরে আর নেসফিল্ড শেখান হইল না আমার। সে তো যা কইলি হবারই পারে—কজেটিভ আর ইনস্ট্রুমেন্টাল অ্যাডভার্বিয়্যাল ক্লজ। ঐ তো তিলকাঠি। দুইখান দে। আমি তো এহানে ক্লজের কথা কই নাই—নাউনের কথা কইছি। ওহানেও তো একখান ভুল কইরলি প্রিপজিশনে। হইব ‘অ্যাবাউট’, কইলি ‘রিগারডিং’। আর রায়বাহাদুর তো একজায়গায় ‘অ্যাবাউট’, কইলিলেনই না।’

‘অ, উকিলদের ইংরাজি আর মাস্টারগ ইংরাজি আলাদা।’

যোগেন এবার কোঁচড়টা কোমরে বেঁধে নিয়েছিল। সেও একটা নিমকি খেতে-খেতে চলেছে।

‘স্যার খুনের মামলায় মক্কেলরে ধইরছে, তারে জামিন নিতে হইব, জজশাহেবরে যদি বুঝাইবার না পারেন যে আপনি এক্কেরে পাগল হইয়া গিছেন আসামি আপনার এতখান আপন, তাহালি জজশাহেব জামিন দিবে না। প্রিপোজিশন ঠিক রাইখ্যা কি পাগল হওয়া যায়?’

ওঁরা যাচ্ছিলেন মৈস্তারকান্দির রাস্তা ধরে পশ্চিমমুখো। একটু পরেই রাস্তাটা শেষ হয়ে যায়। একটু উত্তর কোণের একটা পায়ে চলা রাস্তা ধরে বাকল-গৌরনদী আড়াআড়ি সড়কে ওঁরা উঠবেন। সেই সড়ক সোজা পশ্চিমে গিয়ে মিশেছে বাকলের বাঁধে। বাকলের বাঁধ বড় বাঁধ, চাকার মত ঘিরে রেখেছে আগৈলঝরাকে। আগৈলঝরাতে তো যোগেনকে যেতেই হত। তবে, যোগেন ভেবেছিল–এটা একটা আয়োজন করে করতে হবে। চারদিক থেকে সবাই আগৈলঝরাতে জড়ো হবে। মিটিং হবে, বক্তৃতা হবে। তার জন্য তো তৈরি হতে হবে—ভেবেচিন্তে করতে হবে। আজ না হয় সে একাই যাচ্ছে।

আগৈলঝরার মহাত্মা ভেগাই হালদার মাত্র বছর চার হল, সেই কারণে ও ভেগাই হালদারের জীবনের বৈচিত্র্যের কারণেও হয়ত, তিনিই হয়ে উঠছেন নমশূদ্র জাগরণের প্রতীকপুরুষ—যোগেন ও তার মত তরুণ নেতাদের কাছে। ভেগাই হালদার প্রায় নিরক্ষরই ছিল। ভারতের সমস্ত তীর্থ ঘুরে এসে, নিজের বাড়িঘর পরিবার থাকা সত্ত্বেও আগৈলঝরার হাটের ওপরে একটা খড়ের ঘর বানিয়ে থাকতেন। ছিল অশ্বিনীকুমার দত্তের একান্ত সহচর। অশ্বিনীকুমারের নেতৃত্বে ভেগাই হালদার বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে বরিশালের নমশূদ্রদের জড়ো করে—একটা উদাহরণ তৈরি করেন। ১৯০৬-এ বরিশালের প্রাদেশিক সম্মিলনে সে ছিল প্রধানতম কর্মী। ১৯২৬-এ আগৈলঝরাতে প্রজা সম্মিলনের সে ছিল প্রধান সংগঠক—মদনমোহন মালব্য, সরলা দেবী এঁরা এই সম্মিলনে এসেছিল। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতা ছিল বাইশ বছরের তরুণ যোগেন, সবেমাত্র আইএ পাস করেছে। এই সম্মিলনে যোগেন একটা বক্তৃতা করে—সেই বক্তৃতায় নমশূদ্র ও অন্যান্য শূদ্রশ্রেণির মানুষজনের উন্নতি সম্পর্কে তার ধারণার পার্থক্য ধরা পড়ে। যোগেন যে খুব ভেবেচিন্তে কিছু বলেছিল, তা নয়। কিন্তু সেটা ছিল সম্মিলনের দ্বিতীয় দিনের বিকেল। বাইরে থেকে যে-নেতারা এসেছিল—তারা সকলেই হিন্দুত্ব নিয়েই কথা বলছিল। তারা কেউই অস্পৃশ্যতার পক্ষে বলেনি—কেউ-কেউ বলে অস্পৃশ্যতাই সবচেয়ে বড় শত্রু হিন্দুদের, আর কেউ-কেউ ও-বিষয়ে কিছু বলে না। কিন্তু কেউ-কেউ বর্ণভেদ প্রথার এমন ব্যাখ্যা দেন যে একটা প্রথার অপব্যবহার দিয়ে প্রথার গুণাগুণ বিচার করা উচিত নয়। বিশেষ করে যে-প্রথা হাজার-হাজার বছর ধরে কোটি-কোটি মানুষ মেনে আসছে, যে-প্ৰথা শাস্ত্রানুমোদিত। বক্তানেতারা নানারকম মজার মজার উদাহরণও দেন—পুতনারাক্ষসী তার স্তনে বিষ মাখিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে মারতে গিয়েছিল, তাতে কি প্রমাণ হয় মাতৃস্তন্যে বিষ আছে? শুনতে-শুনতে যোগেনের মনে হয়—এঁরা কেউ জানেনই না নমশূদ্র বলতে কী বোঝায়, প্ৰজা বলতে বরিশালে কাদের কথা বলা হয়। আর, কীরকম তার মনে গোল পাকিয়ে যায় হিন্দুধর্ম, জাতিভেদ, কংগ্রেস, স্বরাজ, গান্ধী, ইংরেজ, স্বদেশী। এই গোলপাকানোর ভিতর যে-কোনো একটি যুক্তি তৈরির চেষ্টা ছিল তাও নয়। নেতারা এক-একজন এক-একরকম বলছিল। কিন্তু কেউ যদি চায়, তাহলে একটা যুক্তির আভাস পেতেও পারে—একদিকে হিন্দু-কংগ্রেস-গান্ধী আর-একদিকে ইংরেজ। মুসলমানদের সম্পর্কে কেউ-কেউ বলেছেন–বিদেশির হাত থেকে দেশকে স্বতন্ত্র করতে কি অন্য কোনো বিদেশি-বিধর্মীর সঙ্গে হাত মেলানো যায়?

সেটা ছিল সম্মিলনের শেষ দিন-লঞ্চ ঠিক করা আছে, সন্ধ্যার আগেই নেতারা রওনা হয়ে খুলনা চলে যাবেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিশেবে যোগেনকে ডাকা হয়েছে অতিথিদের বিদায় জানাতে। যোগেন বলে ফেলল—কারো কাছে দয়া চেয়ে নমশূদ্র বা মুসলমান চাষিদের কোনো উন্নতি বা পরিবর্তন হবে না। যাদের দুঃখ-কষ্ট একরকম, তাদের নিজেদের দুঃখকষ্ট নিজেদেরই দূর করতে হবে। আমরা তো রোজই বুঝতে পারি-নমশূদ্র আর মুসলমান চাষিদের সব দুঃখকষ্ট একইরকম। সেটা বদলানোর জন্য আমাদের এখানকারই নেতা ভেগাই হালদার, নিজে এই হাটের মধ্যে খড়ের ঘরে থাকেন, নিজের বলতে একটা পয়সা নেই। কিন্তু বিয়েবাড়িতে বা শ্রাদ্ধবাড়িতে সে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরেন। সে নিজে লেখাপড়া জানেন না কিন্তু সে চান তার স্বজাতীয়রা ও সহজাতীয়রা লেখাপড়া শিখুক। এইখানে একটা প্রাইমারি আর-একটা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ অশ্বিনীকুমারের সে বন্ধু, দেশবন্ধুর বাড়িতে সে থাকতেন, কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ তাকে বক্তৃতা করতে ডাকেন। আমাদের সকলকে তার আদর্শে চলতে হবে—নিজেদের উন্নতি নিজেদের করতে হবে।

খুব যে পরিষ্কার করতে পেরেছিল নিজের কথাটা, তা নয়। সে নিজেই তো জানত না কথাটা কী। তাছাড়া তখন সম্মিলন শেষ, নেতাদের লঞ্চঘাটে নিয়ে যাওয়ার তাড়া, মানুষজনেরও বাড়ি ফেরার তাগাদা। কিন্তু যোগেন এখন বুঝে ফেলেছে—মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় না, মানুষ ইশারার কথা চট করে বোঝে। কেউ-কেউ তাকে বলে গেল, ‘যোগেন, বাপের ব্যাটার মত একখান কথা কইছ।’ কেউ-কেউ বলে গেল, ‘আরে যোগা কইব না তো কইব কেডা। ওর পালাগান শুনইছ।’ কলেজের বন্ধুরা বলে গেল, ‘রাইটলি সার্ভড।’ আর ভেগাই হালদার নেতাদের পাঠিয়ে দিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে যোগেনের গালে মারলেন এক বিরাশি সিক্কার চড়। সে-চড়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার কথা—যোগেনের শক্ত শরীর, গায়ের জোরও বিখ্যাত। সে শুধু তার গালে হাত রাখল। ততক্ষণে ভেগাই হালদার চেঁচাচ্ছেন, ‘হালা, সম্বন্ধীর পুত, তোরে কি আমি ঢাকির বায়না দিছি? এতগুলা মান্যগণ্যের মুখের ওপর ভেগাই ভেগাই। এতখান লেখাপড়া শিখলি ক্যান? ভেগাই ভেগাই কহনের লাইগ্যা তো ইশকুল-কলেজ লাগে না। হ্যায় তো হাটের কুকুরও ভোখায়—ভেগাই। উনি আইছেন, নমোর পুরুত সাইজ্যা পঞ্চামৃত দিবার? যা, দূর হইয়া যা সামনে থিক্যা। তোর ভেগাইয়ের লগে যা।’

ঘণ্টা দুয়েক পরে যোগেনের ডাক পড়ল রাতের খাওয়ার জন্য। ভেগাই হালদারের পাশের জায়গাটা খালি। যোগেনকে ভেগাই ডাকলেন, ‘আয় বাবা, বইস্যা খা, খাইয়্যা আমারে হারা দেহি—দেহি তোর জোর ঠোটে না প্যাটে।’

যোগেন বসে বলে, ‘আপনারে খাওয়ায় হারাইতে তো মহিষাসুররে লাগব।’

ভেগাই হালদারকে এখানকার মানুষজন বাইট্যা-দৈত্য বলে ডাকত। তার খাওয়া সম্পর্কে রটনা ছিল—আধমণ ভাত, একটা বড় সাইজের পাঁঠা, আটাশিটা রসগোল্লা খেতে পারেন। একবার মহাপ্রস্থানে যাবেন বলে বাটাজোড়ের নদীতে চিৎ হয়ে স্রোতে ভাসতে ভাসতে যান। শুনে অশ্বিনীকুমার এসে নৌকো নিয়ে ধাওয়া করে তাকে তুলে বলে, ‘তুই ভেগাই, আমি তোর চেগাই। আরে, আহাম্মক, নদীর জল তো সমুদ্রে যায়, মহাপ্রস্থান তো পাহাড়ে।’ অশ্বিনীকুমার তাকে নিজের বাড়িতে আটকে রাখেন। যোগেন তার পাশে বসতে-বসতে বলে, ‘পাঁঠা আমার এমনিতে চার সের হইলেই চইলত। কিন্তু ঐ চড়খান খাওয়ার পর তো আরো সের দুয়েক লাগব, পছন্দ হয়। কয়ডা কাইটছে?’

.

আশুস্যারকে বারথির মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ডানহাতি রাস্তা ধরে মইস্যারকান্দিতে ফিরে আসতে বেলা পড়ে গেল যোগেনের।

মাঘ মাসের বেলা তো উঠতে-না-উঠতেই ফুরয়। এতটা খোলা জায়গায় সূর্যাস্তের পরও কিছু আলো থেকে যায়—আকাশের এমন উঁচু ও ছড়ানো গোলকে, মাঠের ফসলকাটা প্রসারে, নদীনালার স্রোতে। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময়টা যোগেন পাঁজি দেখে জেনে রাখে—সেটাই তার ঘড়ি। স্যার, যে কী করেন, নিজের রিস্টওয়াচটা দিয়ে দিলেন। অভ্যেস করতে ক-দিন যায়, কে জানে! যোগেনের একটু ঠান্ডাও করছিল। এই খাটো ধুতি-শার্টে খালি পায়ে প্রান্তরের এই ঠান্ডা সামলানো যায় না। শেষ বিকেলেই সবাই বাড়ি ফিরে গা-হাত ধুয়ে আগুনের কাছে বসে যায়। মানুষ মরলেও কেউ এই ঠান্ডায় বেরবে না, মরা আগলে সকালের জন্য অপেক্ষা করবে। বেরনো মানেই সর্বনাশা কোনো দুর্ঘটনা–হয় ডাকাত পড়েছে, না-হয় নৌকো ডুবেছে। নিজের মনে মুচকি হেসে যোগেন ভেবেছিল, নয় তো ডাকাতি করতে। ডাকাতের বৌ-ও টের পায় না, পাশ থেকে উঠে স্বামী কখন ডাকাতিতে বেরিয়ে গেল, ডাকাতি সেরে ফিরে এসে বৌয়ের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কথায় বলে, ‘ডাকাইতের পা-ও আর বিলাইয়ের পা-ও।’ গাছের পাতাতে রাতের পাখি বসলে যেটুকু আওয়াজ ওঠে—ডাকাতের পা-ফেলায় সেটুকু আওয়াজও ওঠে না।

টের কি আর পায় না বৌ? নিশ্চয়ই টের পায়। কিন্তু টের পাওয়া-পাওয়ি নিয়ে কারো মধ্যে কোনো কথা হওয়া নিষেধ। যদি কোনো বৌ ইশারাতেও জানান দেয়, তাহলে তার পরের সকালে বৌয়ের নলীকাটা শব খালের স্রোতে ভেসে বয়ে যাবে। যোগেনের উকিলি বুদ্ধিতে মনে হয়—বাড়িরও কেউ টের পায় না, বৌ-ও না, এই কথা এত পুরনো কাল থেকে রটিয়ে রাখা হয়েছে যাতে ডাকাতির পর দারোগা-পুলিশ বাড়ির লোকজনের ওপর কোনো জবরদস্তি না করে।

কিন্তু এই টের পেতে না-দেয়া আর টের না পাওয়া বরিশালের নমশূদ্রদের, বা, সব জিলার নমশূদ্রদেরই জীবনের ধর্মীয় আচরণ হয়ে গেছে। ডাকাতি যাওয়ার সন্ধ্যায় স্বামী হয়ত একটু আলগোছে ঘুমোয়—বৌয়ের সঙ্গে শোয় না বা অন্য কারো বাড়িতে গিয়ে শোয়। বা, বৌকেই হয়ত ঘর থেকে বের হয়ে অন্য ঘরে শুতে বলে—’যাও গা, দিদির লগে শোও গিয়া। সারা রাইত তোমার মাইয়্যা মুতব আর কাইন্দব। মেয়েমানুষের এমন আলগা-মুত হয় নাহি? ‘ যে-মেয়েমানুষের কথা বলা হয়—তেমন সাত-আট মাসের শিশু আর কোন্ ঘরে না থাকে?

যোগেন রাস্তা থেকেই দেখে, তার বাড়ির ভিটেয় লোকজনের ভিড়। একটা লণ্ঠনও দেখা যায়। তার বাড়িতে লণ্ঠন নেই। এত লোক এমন অসময়ে শুধু তার কাছে আসতে পারে না। দু-একটি গলা শুনতে পায় বটে যোগেন, কানও খাড়া করে, কিন্তু গলা শুনে লোক চেনা যায় না। যোগেন তো এখন গ্রামে থাকে না—গলা তার চেনা হবে কী করে। তিন ধাপ বেয়ে দুয়ারে উঠে দেখে—আরো লোকজন বসে আছে, তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলছে আর প্রদীপের নীচে কলাপাতার ওপর বাতাসার স্তূপ। ও, লুট হবে।

যোগেন দুয়ারের আবছায়া থেকে গলা সপ্তমে চড়িয়ে গেয়ে ওঠে, ‘অরে, লাইগছে লুটের বাহার, তোরা লুইট্যা নিবি আয়’—। গলা শুনে সবাই খোঁজে কার গলা। আলো এত কম যে সবাইকেই এক-একটা ভঙ্গি করতে হয়—দেখতে। কেউ চোখের ওপর হাতের আড়াল দেয়—অন্ধকারও যেন চড়া রোদের মত চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। কোনো-কোনো বৌ মাথার কাপড় একটু টেনে এনে ভুরু পাকায়—যেন অসময়ে বৃষ্টি এসে গেল। কমবয়েসি কোনো-কোনো জোয়ান গলা বাড়িয়ে খুঁজতে খুঁজতে তাদের ধুতির কাছায় হাত দেয়—যেন এখনই তাদের মালকোঁচা সেঁটে নিয়ে ঝাপাতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *