৩১. তপশিলিদের মিটিং
পয়সা না-থাকার সুবিধে কত! পয়সা ছিল না বলেই তো হেঁটে-হেঁটে এই শহরটাকে যোগেন এমন চিনে নিতে পেরেছে যে যার জন্মকম্ম সবই এই শহরে, তারপক্ষেও অতটা চেনা সম্ভব নয়। হেম নস্কর মশায়ের বাড়িতে এই আট তারিখে সকাল এগারটায় হাজির হতে হবে খবর পাওয়ার পর তাঁর বাড়ি কোথায় এটা কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হয়নি। তার একটা টিউশনি ছিল পামর বাজার রোডে। ক্লাশ এইটের ছেলে, মাইনে আর পাম বাজার বলেই জুটেছিল। ওখানে মাস্টার পাওয়া যাচ্ছিল না। যোগেন দশ টাকা শুনে যতটা খুশি হয়েছিল, পড়াতে গিয়ে চুপসে গেল। বেলেঘাটায় তো আর ট্রাম নেই, সুতরাং সেকেন্ড ক্লাশও নেই, একমাত্র ভরসা ধাপার বাস–সতের নম্বর। তার ভাড়া শেয়ালদা বি আর সিং থেকে দেড় আনা—মানে একটা এক-আনি, আর আরেকটা ডবল পয়সা। তার মানে প্রতিদিন যাতায়াতে তিন আনা, সপ্তাহে ছ-দিনে আঠার আনা, মাসে প্রায় পাঁচ টাকা। তাহলে তো তার মাইনে দাঁড়ায়, মাসে পাঁচ টাকা। যোগেন বাসে যেত না। শেয়ালদা সাউথ দিয়ে শর্টকাট করে বেরিয়ে হেঁটে মেরে দিত। হাঁটতে-হাঁটতেই তার জানা হয়ে গেল দুই নম্বর রেলব্রিজ পার হয়ে সে যদি বেলেঘাটা মেন ছেড়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে, তাহলে বাসের চাইতে আগেই পৌঁছে যেতে পারে।
সেই সুবাদে বেলেঘাটা মেন রোডের পুব সীমায় জোড়ামন্দিরে হেম নস্কর মশায়ের বাড়ি সে চেনেনি। এদিক থেকে জোড়ামন্দির ছাড়িয়ে চিংড়িঘাটা বলে একটি জায়গায় রাস্তা শেষ, তারপর বাঁধ। ঐ চিংড়িঘাটাতেই নমশুদ্র জমিদার দাসচৌধুরীদের বিখ্যাত প্রাসাদ ও বিখ্যাততর রাধাশ্যাম মন্দির। দাসচৌধুরীদের একটা আলাদা টানা ঘরই আছে-নমশূদ্র ছাত্রদের জন্য। ছাত্ররা তো থাকতই আর কাজেকর্মে কলকাতায় এলেও কেউ-কেউ ওখানে থেকে যায়, লোকের মুখে তাই ধর্মশালা কথাটাই চালু। প্রতিদিনই রাধেশ্যামের ভোগ খায় অনেকেই। যোগেনের পক্ষে এত দূর থেকে যাতায়াত কঠিন হয় বলেই সে দাসচৌধুরীদের ধর্মশালায় থাকেনি। কিন্তু রাসে কী ঝুলনে কী দোলে দাসচৌধুরীদের মন্দিরে গিয়ে গান গেয়েছে আর গব্যঘৃতে রান্না ভোগ খেয়েছে। তখনই জোড়ামন্দিরে নস্করদের বাড়ি তার দেখা, মন্দিরটাও দেখা—না দেখে উপায় নেই।
পাঁচ মাথার মোড় থেকে যোগেন কপালগুণে শেয়ালদারই ট্রাম পেয়ে গেল। নেমে সেই শর্টকাটে বি-আর সিঙে পৌঁছে টাইমঘরে খোঁজ করে শোনে, সোজা কোনো বাস চিংড়িঘাটা যাবে না, এখান থেকে রথতলা দিয়ে নারকেলডাঙা যাবে। রথতলায় নেমে আর-একটা বাস নিতে হবে। দুটো বাস? তার মানে তো অন্তত দু আনা। বাসে তো আর ডবল পয়সার টিকিট হয় না। তবে, রথতলা থেকে জোড়ামন্দির তো হাঁটা পথ! ওটুকু হেঁটে যাবে ভেবে যোগেন বাসে ওঠে।
সিটে বসে যোগেন নিজের মনে একটু মুচকি হাসে। কাল স্টিমারে কেবিনে, তারপর ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাসে শেয়ালদায় পৌঁছে সে এখন বাসের ভাড়া বাঁচিয়ে এমএলএ-দের মিটিঙে যাচ্ছে। কলকাতা বলেই সম্ভব। কে কাকে চেনে? তাছাড়া, যাতায়াতে পয়সা দিতে হলে যোগেনের খুব গায়ে লাগে। যেন, ঐ পয়সাটা তাকে ঠকিয়ে নেয়া হচ্ছে।
নস্করমশায় তাঁর বিখ্যাত পাকানো গোঁফ নিয়ে আদ্দির একটা ফতুয়া আর কোঁচা-উলটো ধুতি পরে বারান্দায় থামের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। যোগেনকে দেখেই নমস্কার করে, ‘আসুন, আসুন’ বলে অভ্যর্থনা করেন। যোগেনের গৌরব বোধ হয়—তাকে নস্করমশায় অভ্যর্থনা করছেন বলে নয়, নস্করমশায় কুলীন সব বামুন জমিদারদের মতই নিজের আভিজাত্য অনুযায়ী ব্যবহার জানেন। যেন, নস্করমশায় অনুন্নত শ্রেণির লোক হয়ে যোগেনের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছেন। যোগেন গিয়ে প্রণাম করে—তার সঙ্গে নস্করমশায়ের কোনো পরিচয় নেই। যোগেন সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তিনি যোগেনের দুই বাহু ধরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভাই?’
‘যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।’
‘আরে ভাই, আপনি তো চ্যাম্পিয়ান, কী জেতা জিতে এসেছেন, আমাদের গৌরব।’
‘সে-পরীক্ষা তো এখন শুরু, জিতার পর। তবে পরীক্ষা একা দিতে হবে না—এই যা রক্ষা।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেজন্যই তো আপনাদের ডাকলাম। নিজেদের মধ্যে পরিচয়ও হওয়া দরকার আর আমরা, মানে, ডিপ্রেসড ক্লাশের যারা তারা একজোট হতে পারি কীনা, ভিতরে গিয়ে বসুন, কথাবার্তা শুরু করুন।
‘সবাই এসে গেছেন?’
‘অনেকেই এসে গেছেন, এসে পড়বেন সবাই।’ হেম নস্কর নতুন কাউকে আসতে দেখে নমস্কার করে ‘আসুন, আসুন’ বলে উঠলেন।
যোগেন ভিতরে ঢুকে দেখে—একটা হলঘরের মত বড় ঘর। বড়-বড় জানলা। উলটো দেয়ালে একটা চৌকির ওপর শতরঞ্চি পাতা। তার পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা লম্বা হেলানবেঞ্চ। তার উলটো দেয়ালে কাঠের চেয়ার আছে কয়েকটা। আর যে-দরজা দিয়ে যোগেন ঢুকল তার পাশে একটা গদিওয়ালা নিচু কৌচ, পাশে ছোট একটা টেবিলে গড়গড়া আর খানিকটা ফাঁক দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে একই রকম গদির একটা সোফা, সেটায় চারজন বসতে পারে, দু-একজন যদি রোগা হয় কিন্তু যোগেনের নিজের সাইজের তিনজনের বেশি ধরবে না।
‘যোগেন—এসো এখানে’, শুনে যোগেন দেখে পুলিন মল্লিক ডাকছে। মল্লিকভাইদের একজন—এদিকে কোথাও থেকে জিতেছে। চেয়ারে বসে আছে।
‘যোগেন—যশোর ছেড়ে হাওড়ায় যায়ো না’, রসিককাকা ডাকছেন—সেই হেলানবেঞ্চের হাতলে কনুই রেখে। পুলিন যদি চেয়ারে না বসে, তাহলে চেয়ার আছে কেন? আর, কোণাকানছিতে যদি এলিয়ে বসা না যায় তাহলে রসিককাকা বসবেন কোথায়, দুই পা তুলে, হাত-পা-ঘাড় কনুই যথাস্থানে রেখে। পুলিন তাকে ডেকেছে। ভদ্রতার খাতিরে তাকে হাত তুলে ‘খাড়ান, আসি’ বলে যোগেন যায় রসিককাকার দিকে। রসিককাকা তাঁর কোনো ভঙ্গিরই কোনো বদল না করে চোখ বুজেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী? তোমার ডিসিশন নেয়া হয়্যা গেছে?’
‘ডিসিশন কীসের? কথাই তো শুরু হয় নাই।’
‘আরে, সে-কথা কই না। তুমি কোথায় বইসব্যা সেই ডিসিশন—চেয়ারে না বেঞ্চিতে না শতরঞ্চিতে।’
‘ঐখানে তো পুলিন বইসছে। পুলিনের লগে বসা যায়?’
‘ক্যা? তোর যে পুলিনের সঙ্গে এমন ভাব তা তো জাইনত্যাম না রে?’
‘ও চেয়ারে বইসেছে ক্যান্? দেখছে তো আপনি এইহানে।’
‘ও নিজেকে চেয়ারের মানুষ ভাবে, তাই চেয়ারে বইসছে। তোরেও ডাক দিছে।’
‘ও আমারে ‘তুমি’ কইয়্যা ডাকে ক্যান্, এড্ডেরে তো সমান বয়স।’
‘তুই ওডারে কী ডাকিস?’
‘আপনে। আমার অত ‘তুমি’ আসে না।
‘বয়। এইহানে বয়। চেয়ারও না। শতরঞ্চিও না।’
যোগেন বসে বলে, ‘য্যান্ আপনি চেয়ার চিনেন না! অ্যাহনই তো ডাক পড়বরসিকবাবু আসেন, মিটিং শুরু করি।’
‘তহন যাব নে। দ্যাখ ছ্যামড়া, শতরঞ্চি থিক্যা কাউরে ডাইক্যা বেঞ্চিতে তোলা যায়, বেঞ্চি থিক্যা ডাইক্যা চেয়ারে তোলা যায়। কিন্তু চেয়ার থিক্যা শতরঞ্চিতে ডাকা যায় না।’
‘তত্ত্বখান কি এড্ডু খুইল্যা বলার নিষেধ আছে?’
‘এর আবার খুলা ঢাকা কী? আমাগ শুদ্দুরগ একসময় দাবি ছিল—বাবুরা আমাগ চেয়ারে বইসব্যার দ্যায় না।’
‘দাবিডার ভিতরে অন্যায্যডা কী?’
‘ন্যায্য কথাডা তো উলট্যায়াও কওয়া যায়? যায় না?’
‘কথাডাও ন্যায্য আর উলট্যাডাও ন্যায্য?’
‘হ্যাঁ। উকিলগ মত। আসামির উকিল হইলে বাদী অন্যায্য আর বাদী উকিল হইলে আসামি অন্যায্য।’
‘ভাগ্যিস ওকালতিডা করেন নাই। আশু মুখার্জির ভাত জুইটত না।’ যে-বছর যোগেন ল-কলেজ ঢোকে, সেই বছর রসিক বিশ্বাস ওকালতি পাশ করে বেরন। কিছুদিন ওকালতি করার পর ভালো লাগেনি বলে ছেড়ে দিয়ে কর্পোরেশন স্কুলে মাস্টারি নেন।
‘ক্যা? আমার ওকালতির ত্রুটি হইল কনে। কথাডা উলট্যায়া ভাবছস যোগেন? আমরা বাবুদের কাছে গেলে আমাগ বসার চেয়ার দিব্যার লাগব—এই তো দাবি। উলট্যাইয়া দ্যাখ আরো কত সত্যি শুনায়—আমরা বাবুগ কাছে গিয়্যা খাড়াইলে বাবুগ চেয়ার ছাইড়া খাড়াইবার লাগব।’
যোগেন হো হো হেসে ফেলে। রসিক বিশ্বাস চাপা গলায় বলেন, ‘থো। এমন কংসের মতন হাসস্ ক্যা। দশে ভাই—আমরা রসের কথা কানাকানি করি। কেউ নি বুইজবে আমরা অট্টহাস্যসহ পলিটিকস আলোচনা কইরতেছি।’
যোগেন আরো জোরে হেসে ওঠে।
‘তুই উঠ তো এইহান থিক্যা। শ্যাষে লোকজন আমারে দুশ্চরিত্তির ভাইব।’
‘বিরাটকাহা আইছে। সেবা দিয়া আসি।’
‘এই বয়সে স্ত্রী বিয়োগ হইল দাদার। তার মইধ্যে ভোটাভুটি। ক্যামন শুকাইয়্যা পড়ছে মানুষড়া।’
যোগেন উঠে বিরাট মণ্ডলের কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, ‘কাহা, শরীরের কুশল তো?’
‘বেয়াল্লিশ বছরে কী কুশল চাও?’
‘ক্যা? বয়সে কি কুশল কমে কাহা? তবে আপনার তো ব্যাবসাবাণিজ্যি আর শ্রমিক ইউনিয়ন—উদ্বেগের পক্ষে তো যথেষ্ট।’
রেল শ্রমিক ইউনিয়ন বোধয় কমিনিস্ট বা লেবার পার্টি কাইড়্যা নিবে। জুটের ইউনিয়নের মত নতুন দাবিদাওয়া নাই রেলে, কিন্তু মজুরও তো বিস্তর। তুমি কী কইরব্যা? শুদু এমএলএ-তে কি সংসার চলবে?
এর মধ্যে ঘরের সকলেই একটু চুপ করে যায়। মুকুন্দ মল্লিক আর পি-আর ঠাকুর এলেন। নমশূদ্র সমাজের তো বটেই, ডিপ্রেসড ক্লাশের, সবচেয়ে নাম করা নেতা। মুকুন্দ মল্লিক নমশূদ্রদের মধ্যে প্রথম এমএ-বিএল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি-র প্রফেসর আর পি-আর ঠাকুর নমশূদ্রদের মধ্যে প্রথম বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার, তার ওপর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের বংশ, গুরুচাঁদ এখনো বেঁচে, মতুয়া ধর্মের গুরু, সমস্ত নমশূদ্রের গুরু বংশ। এইবার মিটিং শুরু হবে বুঝে যোগেন গিয়ে মুকুন্দ মল্লিকের সামনে দাঁড়ায়, ‘স্যা-র’।
‘যোগেন, তুমি তো ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট। তোমার মত যদি আমরা সবাই পারতাম—সেটাই হত ঠিক কাজ। রিজার্ভেশন লাগবে না। আমরা জেনারেল সিটেই কংগ্রেসকে হারাতে পারি। কিন্তু আমাদের তো আর তোমার মত মাসকনট্যাক্ট নেই।’ যোগেন প্রণাম করে।
পি-আর ঠাকুর বলেন, ‘যোগেনবাবু, আপনি সত্যি আমাদের জোর বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভালো খবরের তো সময়-অসময় নেই। কনগ্র্যাচুলেশনস।’ তাদের সমাজে বাবু বা আপনি সম্বোধন খুব চালু নয়। পি-আর ঠাকুর যোগেনকে বরাবরই বাবু বলেন ও আপনি বলেন। একটা কারণ যে ওঁদের পরিচয় হয়েছে পরে।
হেম নস্কর মশায় কথা বলতে শুরু করেছেন উঁচু গলায়। যোগেন তাড়াতাড়ি শতরঞ্চিতেই বসে পড়ে। হেম নস্কর তখন বলছেন, ‘ভ্রাতৃগণ! আমার গৃহে আপনারা পদার্পণ করায় আমি ধন্যবোধ করিতেছি। কিন্তু ইহা আমার ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠান নয়। পরিবারের কোনো অনুষ্ঠান হইলে সমাজের রীতি অনুযায়ী অভ্যর্থনা করিতে হয়। কিন্তু তেমন অভ্যর্থনা করা কতটা উচিত তাহা বুঝিতে না পারায় নিশ্চয়ই কিছু ত্রুটি ঘটিবেই। তাহার জন্য আপনারা আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমার কয়েকজন বিশিষ্ট বন্ধু জানাইয়াছেন যে আইনসভায় আমরা যদি একটি কোনো পার্টির প্রতিনিধি রূপে নিজেদের পরিচয় না দিতে পারি, তাহা হইলে আমরা প্রত্যেকেই পৃথক স্বতন্ত্র মেম্বার হইয়া যাইব। ইহা আর কে না বুঝে যে একটা লাঠি হইতে দশ-লাঠি জোট হইলে ভালো। তেমন শক্তিবৃদ্ধি সম্ভব কী না ও কতদূর সম্ভব তাহা আলোচনা করিবার জন্য আমরা মিলিত হইয়াছি। নীহারেন্দু দত্তমজুমদার মহাশয় এই সব ভোটাভুটি ও আইনসভার ভিতরবাহির সম্পর্কে বিদ্বান ব্যক্তি। আমি তাঁহাকে ও হুমায়ুন কবির শাহেবকে এই বিষয়টি বুঝাইয়া দেয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়াছি। আজিকার সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য আমি শ্রীমুকুন্দবিহারী মল্লিক মহাশয়ের নাম প্রস্তাব করি।’
পি-আর উঠে বলেন, ‘আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করি।’
মুকুন্দবিহারীকে সভাপতির নির্দিষ্ট চেয়ারে বসতে হয়। তিনি বসেছিলেন বড় সোফার এক কোণে। মুকুন্দবিহারীর হাতে একজন একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়। তিনি সে-কাগজটি সম্পূর্ণ পড়েন। তারপর ঘাড় একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘নীহারেন্দুবাবু, আপনি আসুন।’ তারপর সভার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘নীহারেন্দুবাবু কিন্তু ডিপ্রেসড ক্লাশের মেম্বার নন। তিনি আজকের সভায় নিমন্ত্রণকর্তা কর্তৃক নিমন্ত্রিত হয়েছেন বিশেষজ্ঞ হিশেবে। এই ধরণের নির্বাচন ও মন্ত্রী নিয়োগ ও মন্ত্রিসভা গঠন আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন। ইতিপূর্বে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল বা আইন পরিষদ ছিল। তাতে নির্বাচন হত খুব কম-সংখ্যক ভোটারের মধ্যে। আবার, তাতে অনেকে মনোনীত সদস্যও থাকিতেন। আইন পরিষদও একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করত। এই সভাতে দু-একজন আছেন, যাঁরা এখনো আইন পরিষদের মন্ত্রী। আইন পরিষদের সঙ্গে বর্তমান আইনসভা বা লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির প্রধান তফাত হচ্ছে—সভা তৈরি হয়েছে নতুন আইন-অনুযায়ী ভোটার লিস্ট তৈরি করে। তাতে ভোটার সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। দ্বিতীয় প্রধান তফাত হচ্ছে—পরিষদের মন্ত্রিসভা ছিল গভর্নর বা লাটশাহেবকে পরামর্শ দেয়ার জন্য। আর সভায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা সভার অনুগত থাকবে। অনেকে মনে করেন গভর্নরকে আলংকারিক পদাধিকারী করে আইনসভাকে ক্ষমতা দেয়া ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করা, বস্তুত আমাদের স্বাধীন সরকার গঠনের দিকে কার্যকর প্রধান পদক্ষেপ। আইনসভার বিষয়টি নীহারেন্দু দত্তমজুমদার মহাশয় বুঝিয়ে দেবেন। তিনি লেবার পার্টির নেতা ও সেই পার্টি থেকে জিতে এবার মেম্বার হয়েছেন। তিনি বিশেষ রকম শিক্ষিত ব্যক্তি। বিশেষ করে এই সব ব্যাপারে। তিনি আমাদের সাহায্য করতে এসেছেন। তিনি কোনো নির্দেশ দেবেন না ও ঔতিচ ব্যাখ্যা করবেন না। আমাদের এই সভা ডিপ্রেসড ক্লাশ থেকে নির্বাচিত মেম্বারদের সভা। এই সভায় আপনারা যে-সিদ্ধান্ত নেবেন তার কোনো দায় নীহারেন্দুবাবুর ওপর বর্তাবে না। তেমনি নীহারেন্দুবাবুর বক্তব্যের কোনো দায়ও এই সভার ওপর বর্তাবে না। নীহারেন্দুবাবুর বক্তৃতার পর তাঁকে প্রশ্ন করে আপনারা জিজ্ঞাসিত বিষয় জেনে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতার মাঝখানে কেউ কোনো বাধা দেবেন না। আসুন, নীহারেন্দুবাবু।’
সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে নীহারেন্দু দত্তমজুমদার বলতে শুরু করেন। ‘অধ্যাপক মুকুন্দবিহারী মল্লিক মহাশয় যেরকম করে ব্যাখ্যা করে দিলেন আইনপরিষদ ও আইনসভার পার্থক্য কোথায়, তারপর আমার আর কিছু বলা উচিত নয়। আসলে, তাঁর আগে যদি আমাকে বলতে হত তাহলে আমি পুরনো আইনের আইনপরিষদ ও নতুন-আইনের আইনসভার পার্থক্য ও নতুনত্বের কথা জটিল করে ফেলতাম। অধ্যাপক কেমন সোজা করে দিলেন—লাটশাহেবের আইন-পরিষদ ও প্রধানমন্ত্রীর আইনসভা। কিন্তু এই সোজা কথার মধ্যে একটু-আধটু খটকা ও বাঁক আছে। যেমন, আইনসভার ভোটে যে-দল বা পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ, লাটশাহেব তার নেতাকে, মানে, সেই দল বা পার্টির নেতা কে তা শুধু সেই দলের এমএলএরা মিটিং করে লাটশাহেবকে জানানোর পর লাটশাহেব তাঁকে ডেকে বলবেন, আপনি আপনার মন্ত্রিসভা গঠন করুন। লাটশাহেব প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সুপারিশ-করা মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করিয়ে সরকার তৈরি করবেন। লাটশাহেবের যদি মনে হয়, কোনো কারণে এই সরকার আর চলছে না, তাহলে তিনি সরকার ভেঙে দিয়ে নিজের হাতে ক্ষমতা নিতে পারেন।’
একজন উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ—,’ সভাপতি হাত তুলে তাঁকে বসার ইঙ্গিত করে বলেন, ওঁর বক্তৃতার পর বলবেন।’
না-বসে সেই সদস্য বলেন, ‘না, স্যার, আমার কুনো প্রশ্ন নাই। আমার অনুরোধ—এই বিষয়ডা আমি ভোটের আগেও বুঝি নাই, পরেও বুঝি নাই। এইডা যদি নীহারবাবু এডডু কন বিস্তারিতে যে আইনসভা প্রধানমন্ত্রী বানাবার পারে, লাটশাহেব পারেন না। আর, লাটশাহেব প্রধানমন্ত্রীকে খেদাইব্যার পারেন কিন্তু আইনসভা তার নিজের প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষা করতে পারেন না। এই দুইডা উল্ডা ব্যবস্থা চলে কোন আইনে?’ প্রশ্নকর্তা বসে পড়েন।
সভায় একটু গুঞ্জন ওঠে, ‘কে? মেম্বারটা কে?’ সভাপতি ও নীহারেন্দুবাবুও চেনেন না—তাঁরা একটু অপ্রস্তুত হাসেন। নীহারেন্দুবাবু অবস্থা সামলাতে সবে হাঁ করেছেন, একজন পেছন থেকে সভাপতির কানে-কানে কিছু বলে দেন। সভাপতি ডানহাত তুলে বলেন, ‘যিনি প্রশ্ন করলেন তিনি অনেকের চেনা নন। উনি মৈমনসিং পশ্চিম থেকে মেম্বার হয়েছেন। ওঁর নাম অনন্তলাল মণ্ডল।’
সভায় আবার একটা গোলমাল ওঠে। একজন দাঁড়িয়ে উঠে খুব উঁচুগলায় বলেন, ‘অনন্তলাল না। উঁয়ার নাম অমৃতলাল মণ্ডল। মৈমনসিং জিলা বোর্ডের অনেক দিনের মেম্বার।’
নীহারেন্দুবাবু গলা তুলে বলেন, ‘অমৃতলাল মণ্ডল মশায় খুব সাহায্য করলেন। আমরা সবাই যদি স্পষ্ট করে আমাদের অসুবিধেগুলি জানাই, তাহলে আমরা এই নতুন আইনটা ভালো করে বুঝতে পারব। সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে ডিপ্রেসড কাস্ট বা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী মানেই অশিক্ষিত। সেই কারণে, তাঁরা সব কথা তাঁদের জানাতে চান না যে অশিক্ষিতরা ওসব কথা বুঝবে না। কথা যদি পরিষ্কার না হয় তাহলে মহাশিক্ষিতরাও বোঝেন না। আর কথা যদি শাদা হয়, তাহলে যিনি নিজের নাম সই করতে পারেন না তিনিও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় সেটা বুঝে নেন। এই সভায় একটু চোখ বোলালেই এমন অনেক মানুষকে দেখা যাবে যাঁরা উঁচুজাতের মানুষের চাইতে বহুগুণ শিক্ষিত। এই-যে নিকুঞ্জবিহারী মাইতি মশায় মেদিনীপুরের, হাওড়ার রাধানাথ দাস, দিনাজপুরের শ্যামাপ্রসাদ বর্মন, জলপাইগুড়ির উপেন্দ্রনাথ বর্মন, রংপুরের পুষ্পজিৎ বর্মন, বরিশালের যোগেন মণ্ডল—এঁরা কেউ এমএ-বিএল, কেউ বিএ-বিএল। এঁরা এসব আইন গুলে খেয়েছেন। আমি শুধু তরুণ নেতাদের কথা বললাম—যাঁদের আমি চিনি। এই সভার সভাপতি মুকুন্দবিহারী মল্লিক ও তাঁর ভাইরা, রসিকলাল বিশ্বাস, বিরাট মণ্ডল মশায়, পি-আর ঠাকুরের কথা সারা বাংলায় কে না জানে? আমার তো মনে হচ্ছে—ধরুন, এই ৩২ জন পিছিয়েথাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মেম্বারদের মধ্যে যোগ্যতার বিচারে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেম্বার আছেন। কংগ্রেস, কেপিপি বা লিগের মধ্যে এর চাইতে যোগ্য মানুষ এত সংখ্যায় নেই।
সভার অনেকেই হাততালি দিয়ে ওঠে।
নীহারেন্দুবাবু বলেন—’আমি প্রথমেই বলছি, অমৃতলালবাবু যা বোঝেননি, তা বোঝা যায় না বলেই বোঝেননি। শাসন করার অধিকার, সর্বোচ্চ অধিকার তো আর ভাগাভাগি হয় না। একজনকে যদি ফাঁসির হুকুম দেয়া হয়, সেটা তো সমান ক্ষমতার দুটো কোর্ট দিতে পারে না। একটা কোর্টকেই দিতে হয়। আইনসভা তার মন্ত্রিসভার তৈরি করার একমাত্র অধিকারী। আবার, এই মন্ত্রিসভাকে খারিজ করার একমাত্র অধিকারী লাটশাহেব। এই ৯৩-ধারার বিরুদ্ধে আমরা, কংগ্রেসের বামপন্থীরা, ভোটে যোগ দেয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম। কিন্তু আইনে এই ব্যবস্থা বহাল আছে। আপনারা যদি এই আইন অনুযায়ী ভোটে জিতে মেম্বার হয়ে থাকেন, তাহলে এই আইন অনুযায়ী সরকার করতে হবে ও চালাতে হবে। কংগ্রেস থেকে এই ধারার বিরুদ্ধে আপত্তি করে কেউ-কেউ চেয়েছিলেন ভোটে না-যেতে। শেষ পর্যন্ত অবিশ্যি কংগ্রেস ভোটে এসেছে।’
‘আমরা তো এহানে যারা জড়ো তারা সবাই একই শ্রেণির লোক, অনগ্রসর শ্রেণি। এখন বলা হচ্ছে শিডিউল্ড কাস্ট, আরো আগে কওয়া হত শূদ্র বা অস্পৃশ্য, গান্ধীজি ডাহেন হরিজন। সবাইই নতুন-নতুন নাম দিছেন। কিন্তু সরকার চালানোর মত এত উঁচু কাজে আমাদের জাতের ৩২ জনকে কেউ আগে ডাকছে?’ রসিকলাল বিশ্বাস বেশ ধমকে জিজ্ঞাসা করেন।
