৪৯. স্পিকার ভোট ঠেকে থাকে : অনাস্থার কাগজে কংগ্রেস সই জোগাড়ে লাগে
অ্যাসেমব্লির ভিতরে যে এমন গোহাটা বসেছে বাইরে থেকে কোনো আওয়াজই পাওয়া যাচ্ছিল না। এক সঙ্গে চার-পাঁচজন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে। আরো চার-পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো কথা বলছে না। তারা বোধ হয়, ভেবেছে সামনে এমন কিছু নাটক হচ্ছে, যা তারা পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে না। কিরণশঙ্কর রায় একটা চেয়ার সরে গিয়ে শরৎ বোসকে জায়গা দেয়। হাশিমশাহেব এক ফালি কার্পেট পাঁড়িয়ে আনুমানিক পেছন দিকে চলে যান ও বাঁয়ের প্রথম যে-চেয়ারটা খালি পান, সেটাতেই বসে পড়েন আর পাশের মেম্বারকে জিজ্ঞেস করেন—’হচ্ছে কী?’
জিজ্ঞাসা করার পর দেখেন, তিনি মেম্বারটিকে চেনেন না। তাড়াতাড়ি ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, ‘সালামআলে কুম। আমি বর্ধমানের আবুল হাসিম।’
ভদ্রলোক হাতজোড় করে প্রতি নমস্কার করে বলেন, ‘আমি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, বাখরগঞ্জ।’ হাসিম একটু হেসে বলেন, ‘আরে, আপনিই তো এবার ইলেকশনের চ্যাম্পিয়ন? জেনারেল সিট থেকে শিডিউল কাস্ট।’
‘চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বাসনা তো আমার না। সরকার আমারে শিডিউল কাস্ট বানাইছে আবার সরকারই আমার সিটটাকে জেনারেল কইর্যা দিছে। আপনার সঙ্গে যদিও সাক্ষাৎ পরিচয় নাই, তবে গোপালগঞ্জের মৌলবি মিরদ্যা-র কাছে দিনরাইত আপনারে নিয়্যা বিলাপ শুইনছি।’
‘বিলাপের কারণ কিছু আছে নিশ্চয়ই—’
‘ঐ মৌলবি তো তহন প্রজা পার্টি খাড়া কইরতে মাথায় গামছা বাইন্ধ্যা ফাল পাইড়তেছে। দেহা হইলেই কয়—ভাইরে, বর্ধমানের আবুল হাসিমরে যদি টাইনতে পাইরত্যাম, তালি দেইখত্যা প্রজার নৌকা উজানেও চলে।’
একটু হেসে হাসিমশাহেব বলেন, ‘এখন হচ্ছেটা কী? ঠিক জায়গায় বসেছি কী না তাও তো বুঝছি না।’
‘অ্যাহনো তো বেঞ্চ অ্যালটমেন্ট হয় নাই। সেডা বোধহয় স্পিকাররে কইরতে হয়—’
‘হ্যাঁ। তবে এখন হচ্ছেটা কী?’
‘যা প্রত্যক্ষ কইরতেছেন, তার অধিক কিছু না। ঐ কেউ-কেউ জিগ্যাব্যার ধইরছে—দুপুরের নমাজের জন্য অ্যাসেমব্লি সময় পিছানো হইল ক্যানো। আর কেউ-কেউ চিল্লাবার ধইরছে—সেডা তো ধর্মের অধিকার। এই আর-কী?’
‘সময় পেছুল কে? সত্যি পিছিয়েছে? আমি অবিশ্যি ফজর নমাজই সারি—কোর্ট হাকিম আর মক্কেলদের সঙ্গ এত বিষয়-আশয়ের কতা বলতে হয় যে খোদাতাল্লার দোয়া চাইতে লজ্জা হয়।’
স্পিকারের জন্য নির্ধারিত সিংহাসনের মত খাড়া চেয়ারের পাশে এক শাহেব দাঁড়িয়েছিল— লম্বা তো বটেই, দশাসই, টাইকোট নিখুঁত। সে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বুকের কাছে জড়ানো দুই হাতের কখনো একটা, কখনো আর-একটা তুলে যেন চোখ মোছে। চিবুকে হাত বোলায় আর কপালে ভাঁজ ফেলে। যারা চেঁচামেচি করছে, তাদের দিকে সে একবারও তাকাচ্ছিল না।
ইয়োরোপিয়ানরা একজায়গাতেই বসেছিল। তাদের মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ো মানুষদের শ্লেষ্মাজড়ানো স্বরে জিজ্ঞেসা করলেন, ইংরেজিতেই, ‘যদি অ্যাসেমব্লির সময় পেছিয়ে দেয়া হয়ে থাকে তবে সেটা তো জানার ব্যাপার। কিন্তু যদি পেছুনো হয়ে থাকে, তাহলে, যতটা পেছুনো হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তার চাইতে অনেক বেশি সময় তো এখানে পেছিয়ে দেয়া হচ্ছে ও কারা সেটা করছে তাও তো দেখতে পাচ্ছি।’
এইবার চেয়ারের পাশে দাঁড়ানো শাহেব জিজ্ঞাসু শাহেবের দিকে তাকিয়ে, দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে ঘাড়টা নামিয়ে বলল,–’আমি এই সভার কেউ নয়। আমি আমার কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এখানে স্পিকার নির্বাচনের ভোট করতে এসেছি। মেম্বাররা যদি ভোট করতে না চান, আমি চলে যাচ্ছি।’
কেউ একজন গম্ভীর অথচ উঁচু গলায় বলে উঠলেন, ‘মনে হয়, লিডার অব দি হাউসের হস্তক্ষেপ করা উচিত।’
এ কথার পরই সারওয়ারদি হকশাহেবের দিকে হাত দেখিয়ে বললেন, ‘মিস্টার হক’। হকশাহেব সারওয়ারদির ইঙ্গিত যেন দেখতেই পেলেন না। তখন কমবয়েসি একজন হকশাহেবের পেছনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এ কিন্তু স্যার সব কংগ্রেসের চক্রান্ত। আপনি কিছু একটা বলুন—’
হকশাহেব তাঁর চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে, ঘুরে, পেছনের ছেলেটিকে একটু ধমকের সুরেই বললেন, কিন্তু হকশাহেব যেন পুরো সভাকেই বলছেন, কারণ—তিনি যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখান থেকে সব মেম্বারেরই তিনি মুখোমুখি। গলাটাও তিনি সবার শোনার মত উঁচু করে নিলেন, ‘যদি আমাকে হাউসের লিডারি করতেই হয়, তাহলে হাউসটাকে তো হাউস হতে হয়। এটা তো কোনো হাউসই নয় এখন। হাউস হতে হলে আগে তো বাড়ির কর্তা কাউকে হতে হবে। হিন্দু উচ্চবর্ণের যেরকম, ছেলের বা মেয়ের বিয়ের সময় একজন নিমন্ত্রণকর্তা দরকার হয়। আগে স্পিকার ঠিক করুন, তিনি আমাদের পার্টি অনুযায়ী বসার জায়গা বলে দিন, আগে হাউস বানান, তারপর তো লিডার! লিডারের অভাব হবে না।’ হকশাহেব ঘুরে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন।
হকশাহেবের বক্তৃতার খ্যাতি এতই ব্যাপক যে তাঁর যে-কোনো কথাতেই হেসে ওঠা বা হাততালি দেয়া অনেকের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। আবার, বক্তা হিশেবে হকশাহেবেরও অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে—যা বলছেন তাতে একটু মোচড় দেয়া। তেমন হাততালি-হাসাহাসি হল। চেয়ারের পাশে দাঁড়ানো শাহেব এবার সরাসরি মেম্বারদের মাথার ওপর দিয়ে তাকালেন, ভাঁজ পড়া কপাল সহই।
মনে হয়েছিল, গোলমালটা বাড়ল। কিন্তু যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের একজন হাত তুলে আঙুল নাড়িয়ে আবার চেঁচাতে লাগল। শাহেব চোখ ঘুরিয়ে নেয়।
হুগলির রাধাকান্ত দাস কংগ্রেসের সবে ধন নমশূদ্র-শিডিউল—দলে তার খাতির বেড়েছে। ডেপুটি হুইপ। এসে যোগেনকে ডাকে, ‘একটু আসবেন?’ আর হাসিমশাহেবকে বলে, ‘বেছে-বেছে বাঙাল সঙ্গ করছেন!’
‘আরে, বাঙাল হওয়ার বিপদ দেহি বড়, সবাইই সঙ্গ চায়। দাদা, মঞ্চে এখন হইছে কী, যোগেন চেয়ার থেকে উঠে রাধাকান্তর সঙ্গে পেছিয়ে যায়।
‘ওটা চলবে এখন। আমাদের পার্টি এখন শেষ মুহূর্তে ভাবছে, স্পিকারে ক্যানডিডেট না দিয়ে ইনডিপেনডেন্ট কেপিপির তমিজউদ্দিন শাহেবকে সাপোর্ট দেবে।’
‘শেষ মুহূর্তে চিন্তার এতটা বদলের হেতু কী?’
‘হাশিমশাহেবের মত গণ্যমান্য লোক শরৎবাবুকে ঢোকার আগে বলেছেন, তিনি চান না কংগ্রেস অ্যান্টিমুসলিম হিন্দুপার্টি বলে নিজেকে জাহির করুক।’
‘হাশিমশাহেব তো ইনডিপেনডেন্ট?’
‘হ্যাঁ। সেই কারণেই বলতে পেরেছেন –’
‘হাশিমশাহেব বলার আগে আপনাগ মাথায় খেলে নাই কথাডা কারো?’
‘বলার পরও তো ঢুকছে না। তাই নিয়ে আমাদের মেম্বরদের মিটিং চলছে। মনে হয় না, একমত হবে। যে-মতই হোক, কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের আগে অ্যাসেমব্লি বসছে না, গোলমালই থামবে না। সিদ্ধান্ত হলেই থেমে যাবে। ফ্রেন্ডলি ম্যাচ চলছে।’
‘আর, হাশিমশাহেব যে আমার পাশে বইস্যা হাসি-হাসি মুখে সব দেখতিছেন? খ্যাড়ে কুটে আগুন জ্বালাইয়া, পেত্নি বইসছেন আলগোছ হইয়্যা-
‘কী যে বলেন! হাশিম শাহেবের পক্ষে কি ঐ চ্যাংড়া পার্টি হওয়া সম্ভব। শুনুন। কংগ্রেসের আর-একটা মুভ হচ্ছে—এ গভমেন্টকে আঁতুড়েই মারবে। সংখ্যালঘু সরকার। অনাস্থা প্রস্তাব ওঠানোর জন্য সই জোগাড় শুরু করেছি। যদি সব সই পাওয়া যায়, তাহলে স্পিকার ভোটের পরই নোটিশ পড়বে।
‘মানে, স্পিকারশাহেব অ্যাসেমব্লিকে যখন নতুন এই সরকারের কথা জানাবেন, তখনই, মৃত্তিকা টানিয়া লইবে কর্ণের রথচক্র?’ দু-জনেই চাপা হাসে, যেন সম্মতিতে।
‘দাদা, বুদ্ধিটা যার মাথা থিক্যাই বারাক সে-মাথার দাম আছে। একে সংখ্যালঘু মন্ত্রিসভা—মন্ত্রিসভায় যে-যে পার্টি আছে তাগো টোট্যাল মেম্বার যত, মন্ত্রিসভার বাইরে পার্টির মেম্বার তার থিক্যা বেশি। তেমন কোনো ভাগাভাগি হইলে মন্ত্রিসভাকে আর রক্ষা করা যাবে না। তার উপর, কোয়ালিশনের প্রধান দুই পার্টি—লিগ আর প্রজা—যদি কোনো একটা বিষয়ে এরা একমত না-হয় তাইলেও কোয়ালিশনের পতন। এমন শ্বাস-ওঠা প্রসূতিকে আর স্বর্ণভস্ম প্রয়োগে আর কয়েকটা শ্বাস বাঁচাইয়া রাইখ্যা উবগার কী? তার চাইতে মৃতবৎস’ কইরা দাও।
‘বুদ্ধিটা যারই হোক, হিশেবটা পাকা। কংগ্রেসের নিজের দলে আছে ৫৪। কংগ্রেস থেকে কিছু ক্রশভোট হবে না তাও কি সম্ভব? ক্রশভোট ধরলেও ৫০টা ভোট পাওয়া যাবে। মন্ত্রী হতে না-পারায় লিগ আর প্রজার ক্ষুব্ধ মেম্বার ঠিক আন্দাজ করা যায় না। ১৭ জন তো নোলা বাড়িয়ে ইনডিপেনডেন্ট প্রজা হয়েছে। ১৭ জনের মধ্যে ১৫ জনও যদি অনাস্থা ভোটে মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে ঠিক থাকে তাহলেও সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৫ বা ৬৭। এই বাকি ১৮-২০টা ভোট নির্ভর করে স্বতন্ত্র মুসলিম আর তপশিলি মেম্বারদের ভোটের ওপর। বিক্ষুব্ধ হলেও ১৮-২০টা ভোট আসতে পারে না—যদি মত পার্থক্য প্রকাশ্য না-হয়ে থাকে। কিন্তু তপশিলি আর বিক্ষুব্ধ-ভোটে কানের পাশ দিয়ে হলেও অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিশ জিতেও যেতে পারে। আরো একটা সুবিধে যে ইনডিপেনডেন্টরা এত ঘন-ঘন দল পালটাচ্ছে যে কারোপক্ষে খেয়ালই রাখা সম্ভব নয়—কে কখন কোন্ দলে আছে।’
কংগ্রেসের বকলমে তপশিলিদের সইয়ের দায়িত্ব ছিল হুগলির রাধাকান্ত দাসের ওপর। ১৩ জন নমশূদ্র এমএসএর মধ্যে কংগ্রেসের এই সবেধন। তাই তার এখন কদর বেড়েছে—কংগ্রেসে। লেজিলশেচার পার্টির ডেপুটি হুইপ।’
যোগেন বলে—’একদিকে ফ্রেন্ডলি ম্যাচে নিজেদের ক্যানডিডেট তুলে নেয়া, আর-একই সঙ্গে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিশ সই করানো। দাদা, আপনারে এই কার্যে বহাল কইরল কেডা?’
রাধাকান্ত হুগলির নেতা, বরিশালের নয়। ওর পক্ষে কংগ্রেস করাটা স্বাভাবিক। সে ভদ্রলোকের ভাষাতেই বলে, ‘কোন্ কাজের কথা হচ্ছে?’
‘এই-যে মড়াসরানোর কাজ?’
‘ওঃ এটা? কংগ্রেস, আমার পার্টি।’
‘কংগ্রেস-না বড়-বড় বিলাইত-ফেরত ব্যারিস্টারের এত ভিড় যে এরা একসঙ্গে স্টিমারে উঠলে স্টিমার ফাঁসবেই, সে জলেই হোক আর চরেই হোক। এই গর্ভপাতের টাইমে তাদের কাউকে পাওয়া গেল না—একমাত্র শুদ্দুর মেম্বারডা ছাড়া? তারা কেউ দিছেন? সই?’
দেবেন। ৮০ বা ৮১টা সই উঠলেই আমাদের নেতারা সই দেবেন। কিন্তু যদি এটা শেষ পর্যন্ত কার্যকর না হয়, তাহলে তো দলের নাম ডুববে।’
‘দাদা, কংগ্রেসের নামের সঙ্গে সোয়াশ মণের উপর একটা বাটখারা বাইন্ধ্যা দিছেন আপনারা আর ডুবানোর দোষ বাইরের লোকের? কংগ্রেসের হয় মতিভ্রম হইছে, না-হয় তো ভীমরতি। সারা ভারতের একডা পার্টি। সেইডা কী না তপশিল নিয়্যা মনস্থির কইরব্যার পারল না? নাইলে হকশাহেবরে এমন ডুবান ডুবায়?’
‘সে তো ঐ মুশারফ হোসেন আর…’
‘ছাড়ান দ্যান দাদা। ঐ গুলা খোশগল্প। কংগ্রেসে তো মুশারফ হোসেনের বাপখুড়া আছে। কয় আমরা জাতীয় দল। তয় একডা মুসলমান নাই ক্যান। কয় যে আমরাই তো হিন্দুগ দল, তপশিলিরা আলাদা থাইকবে ক্যান, তপশিলিরা বরং হিন্দুগো মন্দিরে প্রবেশ করুক। জোর কইর্যা প্রবেশ কইরলে বলব- তোমরা অহিংসা ভায়োলেট করছ। হিন্দুসভায় গ্যালে কইব—আমরা থাইকতে আবার হিন্দুগ আলাদা পার্টি ক্যা?’
‘আপনি যা বলছেন সে সবই তো ঠিক কথা। কংগ্রেসকে যে-ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটা তো সারা দেশের জন্য।
‘অ! আপনি তালি ফ্যাড়ে পইড়্যা গিছেন?’
‘এর মধ্যে ফ্যাড়াফিড়ি কী দেখেন। এ তো আইনসভার মাথাগনা। যে-পার্টির বেশি, সে-পার্টির মন্ত্রী। যদি প্রমাণ হয় তারা বেশি, তাহলে তারাই মন্ত্রী থাকবে। আইনসভার রাজনীতি তো আইনসভার নিয়মেই চলবে।’
‘তা তো বটেই। শাহেবরাও তো সাধ কইর্যা আমাগো আইনসভা দ্যায় নাই। এই-যে তোমাগো ভোট দিল্যাম, তোমাগো আইনসভা দিল্যাম, তোমাগো আইনসভার মেম্বার কইরল্যাম, তোমাগো মন্ত্রী বানাইল্যাম—এইক্ষণ থিক্যা রাজনীতি মাজনীতি সব আইনসভায় হব। আর কংগ্রেস, এত পুরনো বংশ, এত চওড়া—স্যা-র এডডা আন্দাজ হইল না যে লিগ-ছাড়া মুসলমান্গ এড্ডা পার্টি যদি হকশাহেবের মতন নেতা নিয়্যা খাড়ায়, তাহাইলে তাগোও মুসলমান বইল্যা অচ্ছুৎ কইরব? কী? না, কংগ্রেসের বাইরে মুসলমান নাই।’
‘সারা দেশে তো তাই প্রমাণ হল। মুসলমানরা তো কংগ্রেসকেই চায়—এতগুলো প্রদেশে কংগ্রেস সরকার—’
‘অ্যাহনো হয় নাই। কংগ্রেসের সুবুদ্ধি হইলে হব। সেইডাই তো আরো কারণ দাদা, সারা দ্যাশে মুসলমানরা যদি কংগ্রেসরেই চায়, এই বাংলা প্রভিন্সেও তো কংগ্রেসই সবার থিক্যা বেশি জিতল, তাইলে কংগ্রেসের মধ্যে লিগ ছাড়া মুসলমানগর অ্যাড্ডা জায়গা রাখি। সে-জায়গা খালি না রাইখলে তো ফজলুল হক লিগের কাছেই যাবে। তপশিলি শুদ্দুরদের যদি জায়গা খালি না রাখে, বইসব্যার আসন না দ্যাও, তাহাইলে তো তপশিলিরাও লিগের ঘরে যাবে। অ্যাহন, আপনার হাতে কাগজ ঝুল্যাইয়া ঘুরবার কয় কংস রাজার আদেশ যে-সরকার অ্যাহনো রা কাড়ে নাই, তারে নুন চাপা দিয়্যা মার। দাদা, আপনি তো কংগ্রেসে, আপনি কেন অগ বুঝান না?’
‘ওদের বোঝাবার আগে তো নিজেকে বুঝতে হবে। আগে পরিষ্কার জানা ছিল যে হিন্দু সমাজে আমরা ছোট জাত বলে দুঃখকষ্ট পাই, অপমান পাই। সবই সত্যি। কিন্তু হিন্দুর ভিতরেই আমরা আছি। এখন শুনছি—গান্ধীজি একা সেই পুরনো কথাতেই আছেন যে হরিজনদের আলাদা করে ধরলে হিন্দুদের সর্বনাশ, হিন্দুদের অস্পৃশ্যতা, নিষেধ, প্রায়শ্চিত্ত এই সব কু-আচার ছাড়তে হবে। কিন্তু কংগ্রেসের অন্য অনেক নেতা তো সেই আগের মতই ঘৃণা করে বলছেন, শুদ্দুররা কী করে শিডিউল-জাত হয়?’
‘দাদা, অ্যাডডা কথা জিগাই। আমরা শুদ্দুররা কী জাইত, সেডা ঠিক করার মালিক কেমন কইরা শাহেব হয়, বা গান্ধী হয়, বা ফুরফুরার পির হয়। আমরা কী জাইত, তা তো আমরা ঠিক করব। নাকী?
‘সেটা কী করে হবে? জাত মানে তো সমাজ। সমাজ যদি আপনাকে স্বীকার না করে, তাহলে আপনি যা হতে চাইছেন, তা হবে কী করে? পৈতে পড়লেও তো আমাদের বাপঠাকুরদা, বামুন দূরের কথা, কায়েতও হতে পারেনি।’
‘আপনার কথার খানিকডা ঠিক। পুরাটা না। সেনসাসে যে জাত জিগায় স্যায় তো আমারে জিগায় নাকী সমাজের কাছে জিগায় যে যোগেনের জাতডা কী?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু ব্যবহারে তো লোকে সেনসাস দেখে বলবে না—না, ও বলেছে ও বামুন, বসার চেয়ার দে।’
‘আচ্ছা দাদা, মনুসংহিতায় তো চেয়ার থাহার কথা না। বড়জোর আসন থাইকব্যার পারে। তাহাইলে বামুনরা এই বিধান কোথ্রথিক্যা পাইল যে শুদ্দুর গ চেয়ার দিবি না। বড়জোর কইতে পারে—আসন দিবি না। যাই হোক, আমি আপনার ঐ কাগজে সই দিব না।’
‘সে না-হয় না দিলেন যদিও আপনার সই দেখলে আরো কটা সই হয়ত পাওয়া যেত। আপনি কি এর সঙ্গে কংগ্রেস আছে বলেই সই দিলেন না?’
‘অনেকডা তাই—ভোটের আগে থিক্যাই কংগ্রেসের ভাবসাব পরিষ্কার না। হকশাহেবেরও না। নাইলে কংগ্রেসের সঙ্গে ভোট কইর্যা লিগের সঙ্গে সরকার করা যায়? কংগ্রেস সরকার চায় না। ক্যান? এডা কে না বুঝে, সরকার হইলে মুসলমান-তপশিলের সরকার হব। ভোটের পরও হকশাহেবের কাছে দেয়া কথা কংগ্রেস মানে নাই। অ্যাহন আপনারে দরখাস্ত ধরাইয়া দিছে। আমি এই সরকারডা থাউক চাই যদিও আমরা বিরোধীপক্ষেই বসব।’
‘সে, আপনি চাইতেই পারেন। তাহলে তো আপনাকে সরকারিপক্ষে বসতে হয়, আমাদের পক্ষে, মানে বিরোধীপক্ষে বসছেন কেন। বিরোধীপক্ষ মানে তো, আপনি এই সরকার চান না।’
‘এই সরকার কি চাওয়া যায়, দাদা? এই সরকার তো আহশান মঞ্জিলের দরবার। এগো কি লাজলজ্জাও নাই দাদা? যে-হকশাহেবের কাছে তোর মান-ইজ্জত-বংশের নাম খোয়াইলি, সেই হকশাহেবের দয়ায় আবার এমএলএ হইয়্যা তারই আশ্রয়ে মন্ত্রী হলি? পাঁচজন নাকী হিন্দু? তাও আবার আমাগো সমাজের—প্রসন্নদেব রাজা, শ্রীশ নন্দী রাজা আর মল্লিকমশায়। সামসুদ্দিন থাইকলে তাও এন্ড্রু ভরসা থাইক্ত। তারে ফেলাইয়া ঢুইকল মুশারফ নবাব। এমন মন্ত্রিসভা যেহানে প্রধানমন্ত্রীই মাইনরিটি—এই সরকার কি এড্ডা চাওয়ার মতন সরকার, দাদা? ভিক্ষার চালের কাঁড়া-আকাড়া নাই ঠিহই কিন্তু বালি আর চালের তো প্রভেদ আছে—
‘আপনি তাহলে কেনই-বা এই প্রস্তাবে সই করবেন না আর কেনই-বা এই সরকারকে সমর্থন দেবেন। নিজের বোঝার খেলাপ নিজেই করবেন?’
‘তা ক্যান করব। আমরা তো বিরোধীপক্ষে এই সব কথা সভায় তুলব তো বটেই। কিন্তু আপনাগো পার্টির সঙ্গে তো যাওয়া যায় না—এত কথাখেলাপি পার্টি? আপনারা হকশাহেবরে সমর্থন দিলে কাণ্ডডা কী হইত, ভাবছেন কি? আমি চাই একডা সরকার হৌক। আর আপনারা চান—হাটখান ভাইঙ্গ্যা দেমা। লুইট্যাপুইট্যা খাই। আর আমার কেমন সন্দ দাদা—আপনি আপনার পার্টির সব কথা জানেন না।’
‘সে আর কী করে জানব? নেতারা জানালে তো জানব। গান্ধীজির ডাকে আন্দোলন করে জেল খেটেছি মাস-ছয়। আমার পক্ষে কংগ্রেস ছাড়া কি সম্ভব? সম্ভব না। তবে আমি, মণ্ডলমশায়, পথেঘাটে সদরেবাজারে কাজ করতেই ভালবাসি।’
শরৎ বোস তাঁর চেয়ার থেকে বেরিয়ে এসে এদিকওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছিলেন। আবুল হাসিমকে দেখে তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন।
হাসিমশাহেব উঠে দাঁড়ান। যারা চেঁচামেচি করছিল, তাদের ভিতর একটা নতুন গলা শোনা গেল। তার গলা ও বলায় এমন ভাব ছিল যে সবাইই তাকায়, শরৎবাবুও। সে তখন বলছিল, ‘আমাদের হিন্দুভাইদের সাধারণ ভদ্রতাবোধ পর্যন্ত মুসলমানদের বিষয়ে লোপ পেয়েছে। একজন শাহেবকে গির্জা থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে তাঁরা কি তাকে জিজ্ঞাসা করবেন—আপনি এখানে কেন গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা একজন মুসলমানকে বলতে পারেন–তোমার নমাজ পড়ার জন্য আমি কেন তোমাকে ছুটি দেব?’
হাসিমশাহেব জিজ্ঞাসা করেন, ‘এ-সবই কি আজ সারাদিন চলবে নাকী?’
শরৎ বোস বললেন, ‘সরি, মিস্টার হাসিম। আপনার সঙ্গে আমি একমত ছিলাম। কিন্তু আমাদের পার্টি সমবেত আত্মহত্যার শপথ নিয়েছে। তাঁরা রাজি নন’।
‘কারণটা কী? এটা তে কমনসেন্সের ব্যাপার—’
‘কারণটা-ঐ যে ঐ ছেলেটি বলছে! আমাদের নেতারাও ঐ যুক্তিই দিচ্ছেন। বলছেন, এর ফলে আমরা আমাদের হিন্দু ভোটার লুজ করব কিন্তু মুসলিম ভোটাররা আমাদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি দেবে কী না সেটাও জানি না। ওঁরা কেউ-কেউ অবিশ্যি বললেন কোনো শাহেবকে স্পিকার করলে নাকী আমরা সাপোর্ট দিতে পারি। সেটা তো একেবারে নতুন প্রস্তাব। ‘ভোট আর রাজনীতি এক করে দেখছে—কংগ্রেস? আপনাদের বায়ান্ন বছরের পার্টি তো ভোট করছে এই প্রথম।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর এ গুড় সাজেশন’, শরৎ বোস ঘুরে নিজের চেয়ারের দিকে চলে গেলেন।
স্পিকারের চেয়ারের পাশে দাঁড়ানো সেই শাহেব হঠাৎ জোরগলায় বলে উঠলেন, ‘অনারেবল মেম্বারস ইউ আর গোয়িং টু ইলেক্ট এ স্পিকার অ্যান্ড হিজ ডেপুটি। নমিনেশন প্লিইজ।’
