1 of 4

১১. প্রভু জগবন্ধু জয়, যোগেনো মণ্ডলো জয়

১১. প্রভু জগবন্ধু জয়, যোগেনো মণ্ডলো জয়

যোগেন জামা গায়ে ঢুকিয়ে বোতাম আটকে লণ্ঠনটা হাতে ঝুলিয়ে বাইরে বেরয়। আওয়াজটা সে বুঝতে পেরেছে—তার নামেই জয়কার দিচ্ছে।

রাস্তায় নেমে দেখে—একটা হ্যাজাক কিংবা ডে-লাইটের আলো এগিয়ে আসছে। লোকজন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে লন্ঠনটা উঁচু করে ধরতেই আবার আওয়াজ ওঠে, ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়’ আর আওয়াজটা শেষ না হতেই তার দিকে যে অনেকে ছুটে আসছে সেটা বোঝা গেল অনেকগুলি ছায়া হ্যাজাক বা ডে-লাইটের আলোতে লম্বা হয়ে তাকে ঢেকে ফেলে ছোট হয়ে যাচ্ছে। যোগেনের চশমায় ঐ বড় আলো পড়ায় সে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না—চোখ কুঁচকে তাকিয়ে লন্ঠনটা উঁচু করে ধরেছিল। হঠাৎ কারা তাকে কোমরে আর হাঁটুতে ধরে ওপরে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে জয়কার দিয়ে ওঠে, যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’ এতগুলো লোকের কাঁধের ওপর যোগেনের মাথার পাশে তার হাতের লন্ঠনটা দোলে। যোগেন যে কী বলছে, সেদিকে কারো কান নেই। যে-কজন তাকে কাঁধে করেছিল তারা হঠাৎই নাচের একটা ছন্দ বের করে ফেলে।

জয় যোগেনো মণ্ডলো
জিইত্যা হইছে এম-এল-ও
হরির নামের আসরে কোনো বামুন-শূদ্র নাই।
জগবন্ধু প্রভু জয়
যোগেনো মণ্ডলো জয়
ভোটের ব্যালটবাক্সে হিন্দু-শূদ্ৰ নাই।।
জগবন্ধু প্রভু জয়
জয় জয় জয় জয়…

গানটা সবারই জানা—প্রভু জগবন্ধুর নামকীর্তন। প্রভুর তো আর কোনো শত্রু থাকতে পারে না। ঢাকা-ফরিদপুর-বরিশাল আর কলকাতার অস্পৃশ্যজাতের মানুষের সে ছিল ‘বন্ধু’। ‘বন্ধু’ ছিল এমনকী রামবাগানের বেশ্যাদেরও। পরে, বড় হিন্দুরাও প্রভুর ভক্ত হয়ে যায়। এই গানটি পেয়ে যাওয়ায়—সবাইই হাত তুলে নাচতে থাকে—’জগবন্ধু প্রভু জয়’, ‘জয় জয় জয় জয়।’ আর নাচগান দুটোই এমন মিলে যাওয়ায়—যারা যোগেনকে কাঁধে তুলেছিল, তারা একেবারে খেপে উঠে নাচতে থাকে। তাদের কাঁধে যোগেন সেই লন্ঠন হাতে বাঁয়ে একবার ডাইনে একবার, ক্রমেই ঘন ঘন ও জোরে জোরে, মাঝনদীতে ঝড়ে পড়া নৌকোর মত, টালমাটাল করছিল আর লন্ঠনটাও সেরকম দুলেই যাচ্ছিল। জগবন্ধু-বন্দনার গান তো একসময় শেষ হয়। যোগেনের জয়কেও তার সঙ্গে জুড়ে দিলে শেষ হতে একটু বেশি সময় হয়ত লাগবে, কিন্তু শেষ তো একসময় হবেই।

সে-আশায় বালি দিয়ে কোত্থেকে এক ঢাক আর কাঁসি এসে ঐ নাচগানের সঙ্গে জুড়ে গেল। কাঁসি আর ঢোলটা একেবারে পেছনে। নাচগান হচ্ছে একেবারে সামনে। ঢোলওয়ালা বা নাচওয়ালা কেউই পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছে না। ফলে, ঢোল ভাবছে—তার সংগতেই নাচ হচ্ছে আর নাম ভাবছে, তাদেরই তালে ঢোল বাজছে। কেউই কাউকে পথ দেয় না। কারোই থামা হয় না।

জয় প্রভু জগবন্ধু জয়
জয় যোগেনো মগুলো জয়
কারো আর নাহি ভয় যে-কহে যোগেন…

যোগেনের তো ভার আছে। যতজন মিলেই কাঁধে তুলুক, ওজনের ভার তো পড়বেই। কেউ হয়ত কাঁধ বা হাত বদলাতে গিয়েছে, যোগেন সেদিকে একটু হেলে গেছে। ঐটুকু হেলে গেছে বুঝে যোগেন এর চুল ওর কাঁধ ধরে সোজা হওয়ার চেষ্টাই করে না, সে আরো হেলে যায়, তার বাঁ-পাটা মাটির দিকে ঝুলিয়ে দেয় আর নাচের দল বাধ্য হয়েই তাকে মাটিতে নামায়।

‘আরে, হইলডা কী কইব্যা তো? ঢোল বাজে কাঁসর বাজে তো সব পূজাতেই, সরল অঙ্ক না যোগ অঙ্ক?’ যোগেনের কথা কারো শুনতে পাওয়া সম্ভবই নয়। তবু যেন ‘যোগ যোগ যোগ অঙ্ক’ বলে একটা আওয়াজ উঠলে তার ভিতর দিয়ে কীর্তিপাশার রায়চৌধুরি ভাইয়েরা জোড়হাতে যোগেনের হাত ধরে কী বলল যোগেন তার কিছুই শুনতে পেল না। যোগেনের হাত থেকে লণ্ঠনটাও তখনও কেউ নেয়নি। ওরা কী বলছে, উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না, যোগেন হঠাৎ তার সেই বাঘের ডাকের মত গলা তুলে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আরে, হইলডা কী?’

যোগেনকে ঘিরে যারা ছিল, তারা থমকে গেল। দেখাদেখি হ্যাজাকের আলোর মধ্যে যারা ছিল, তারাও থেমে গেল। কিন্তু ঢোল-কাঁসি ছিল সবার পেছনে-সে তো কিছু দেখতেও পাচ্ছে না, শুনতেও পাচ্ছে না। সে বাজিয়েই চলে। সবাই চুপ করে গেছে দেখে সে আবার কুড়-কুড়-কুড়-তাল তুলতে থাকে। আর সে সেই সুরটা ঢাকে বাজাতে-বাজাতে ঘুরতে থাকে একটু নাচের ছন্দে। ‘এই এই থামা থামা’, বলে কেউ কেউ চেঁচিয়ে উঠতেই ঢাকি তার কাঠির আওয়াজটা নরম করে এনে থেমে যায়। থেমে যে গেল, তা বোঝাতে কাঠিদুটো আলগা পেটায় দুবার।

কীর্তিপাশার দুই জমিদার-ভাই অমিয় আর সীতাংশুর হাতে ধরা তার হাতদুটো বের করে এনে যোগেন দুই ভাইয়ের চার হাত তার নিজের দুই হাতে বেঁধে বলে ওঠে, ‘আরে, বড়দাদা-মাইঝ্যান দাদা, করে কী?’

যোগেন তখনো জানে না ওরা কী করছে বা বলছে। যোগেন শুধু নিজের অস্বস্তি কাটাতে কথাটা বলল—দুই ভাই এসে যে তার হাত চেপে ধরেছে, সেই অস্বস্তি কাটাতে। তাতে অবিশ্যি খুব গোপনে নিজেকে নিয়ে আর-এক অস্বস্তিতে পড়ল। সে কি ‘দাদা’ বলে ফেলল রায়চৌধুরিদের? সে বরাবর ‘কর্তা’ বলে না? বড়কর্তা-মাইঝ্যান কৰ্তা?

সীতাংশু রায়চৌধুরি বলে, ‘যোগেন, আমি তো তোমার ক্ষতি করতে কম চেষ্টা করিনি—’

রায়চৌধুরি ও যোগেনের মধ্যে কথা হচ্ছে—সবাই চুপ করে তাদের ঘিরে ধরে। কিন্তু আলো না থাকলে কিছু শোনা যাচ্ছে না। ‘এ–ই হ্যাজাক, এদিকে।’

যোগেন সেই আলোতে স্পষ্ট হতে-হতে বলে, ‘মাইঝ্যান-দাদা, এটা কী কন?

‘শোনো, তুমি তো খাড়াইছিল্যা এই ভরসায় যে সরল দত্ত আর আমার মইধ্যে ভোট ভাগ হইলে তোমার ভোট নিয়্যা তুমি জিত্যা যাইবা। তোমার সে-হিশাবে তো কাঁটা দিল্যাম আমি। উইড্র কইরল্যাম। য্যান্ আমি সরল দত্তর ভোট ভাগ কইরব্যার চাই না। চাইছি কী না-চাইছি সেইডা তো মানুষ দেইখল পরে।’

‘কন কী মাইঝ্যান-কর্তা? আপনি যে বেবারে কইছেন আমারে ভোট দিতে, এডা কে শুনে নাই?’

‘সে কী কইছি, কারে কইছি বাদ দেও। কিন্তু তোমারে যে-কথাডা কইব যোগেন, সেডা তোমার রাইখতে হব।’

‘আরে, কন কী, আপনার কুন কথাডা আমার পক্ষে না-রাখা সম্ভব?’

‘কও কী তুমি। এতবড় ভোটে তুমি এমন জিতা জিতলা’–

‘এই সংবাদডা তো অ্যাহনও কেউ আমারে দেয় নাই’, বলে যোগেন তার স্বাভাবিক উঁচু গলার হাসির শেষে বাকিটুকু বলে, ‘হারছি না জিতছি।’

‘আরে, তোমারে যে কাঁধে তুইল্যা নাইচল—’

‘কাঁধে তুইল্যা তো বিসর্জনের আগেও নাচে–-’  

‘কও কী? এইডা তো বোধনের নাচ। শুনো, কাজের কথা কই। তোমার এই বিজয়ের উৎসব শুরু কইরব্যার লাগব আমাগ বাড়ি থিক্যা। ঐখান থিক্যা তোমরা আইসো এইখানে—প্রহ্লাদের বাড়িতে।’

‘মাইঝ্যান কর্তা, আপনাগ বাড়ি আছে। আপনারা ডাক দিবার পারেন। দিছেন। আর প্রহ্লাদদার বাড়ি আছে—আমারে খাওয়া-পরা থাকন দিয়্যা আমার মতন একখান কালসর্প পুষেন। আমি তো সহজেই পরাধীনা। আমার তো কুনো বাড়ি নাই। প্রহ্লাদদা আর আপনি বুইঝ্যা নেন

‘প্রহ্লাদ তো কইছেই। চলো, চলো তাহাইলে। এই হ্যাজাকখান তোল রে।’

হ্যাজাকওয়ালা তখন হ্যাজাকটা মাটিতে নামিয়ে পাম্প করছে। তার পাশ দিয়েই ভিড়টা এগোয়—এবার সামনে যোগেন, তার দুই পাশে কীর্তিপাশার দুই ভাই। ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’

বরিশাল শহরে ‘কীর্তিপাশা হাউস’টা প্রহ্লাদ দত্তের বাড়ির পশ্চিমের উলটোদিকের পাড়ায়, নিচুখালের সামনে। বলতে গেলে, এই রাস্তাটাই মাঝখানের বড়রাস্তা পেরিয়ে নিচুখালের পাশ দিয়ে গেছে। আসলে, বড়রাস্তায় পড়তেই রাস্তাটা চওড়া হয়ে যায় আর ডাইনে নিচুখালের দিকে ঘুরতেই আরো চওড়াই শুধু হয় না, ঐ রাস্তায় দু-চারটে বাড়ি বেশ দেখার মত, তার ওপর নিচুখালের জলে হ্যাজাকের আলো পড়েছে। ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’ খালের উলটো পাড় থেকেও আওয়াজ ওঠে ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’ তারাও এই জয়োৎসবে ভিড়ে যেতে দৌড়তে-দৌড়তে আসছে। এত মানুষ একসঙ্গে কথা বলতে-বলতে তো রাস্তায় সাধারণত হাঁটে না, তার ওপর—রাত হয়েছে সোয়া নটা। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ারই কথা, ভোটের জয়যাত্রা যে এদিকেই আসছে, তাও তো আগে কারো জানা ছিল না।

পাশের এক বাড়ির বারান্দা থেকে কেউ চেঁচিয়ে বলে, ‘এই, খাড়াও, খাড়াও,’ জজ কোর্টের পুরনো উকিল দীনু চক্রবর্তীর বাড়ি। সে-বাড়ির বাইরের মাঠটাই প্রায় দুই বিঘে, তারপর কাছারি ঘর। দীনু চক্রবর্তী যে দাঁড়াতে বলছেন, সেই ডাক কারো কানে আসেনি বটে, তবে দেখা গেল দুটো-তিনটে লন্ঠন এগিয়ে আসছে। কেউ-কেউ রাস্তার ওপর উবু হয়ে বসে পড়ে, ‘জ্যাঠার তো কাছারি যাইব্যার লগে বাড়ি থিক্যা রাস্তায় পইড়তে দুইসারতে মুত হয়, আর রাস্তা দিয়্যা কোর্টে পৌঁছাইতে থুতু শুকায় না। জিরায়্যা নে।’

দীনু চক্রবর্তী খানিকটা দূর থেকেই জানতে চান, ‘আরে, জিইতলডা কে?’

অমিয় রায়চৌধুরি গলা তুলে দীনু চক্রবর্তীকে বলে, ‘আপনি না-জাইন্যাই আমাগ খাড়াইতে কইলেন জ্যাঠা? যদি আমরা আপনার প্রতিপক্ষ হই?’

দীনু চক্রবর্তী ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন, ‘খবর একখান কি আর আগে জোগাড় করি নাই? তবু যাচ্যায়া নিলাম। যোগেন কই? যোগেন—’

যোগেন ততক্ষণে দীনু চক্রবর্তীর পায়ের ধুলো নেয়ার জন্য নিচু হয়েছে। যোগেনের চওড়া পিঠের ওপর তার রোগা হাতটা রেখে দীনু চক্রবর্তী বলে ওঠেন, ‘নবযুগের সূত্রপাত কইরল্যা যোগেন। বিগিনিং অব এ নিউ এজ। চাড্ডিখানি কথা? সেদিনের ছাওয়াল! চিত কইরা দিল তো আমাগ সব পুরানা চিন্তা আর পুরানা কায়দাকানুন। কৈ, তোমরা কী কইরব্যা বইলল্যা যে—অ বৌমা, তোমার মা কনে?’

দীনু চক্রবর্তীকে হাত ধরে টেনে সরিয়ে অমিয়াবু বলে, ‘মা-রে আগুইব্যার জায়গা দিলে তো মা আইব।’

এর মধ্যে দীনু চক্রবর্তীর পরের বাড়ি ছেড়ে পরের বাড়ি থেকে ছালাউদ্দিন শেখ এত লোকজন আলো দেখে বেরিয়ে আসে, ‘আরে শুইনছ নি সবাই? ঢাকার নবাব তো তেঁতুলিয়াত্ ঝাঁপ দিছে।’ এটা পটুয়াখালির খবর। ফজলুল হক আর ঢাকার নবাববাড়ির নাজিমউদ্দিন দাঁড়িয়েছিল। সকলেরই নজর ছিল পটুয়াখালির ওপর—হক শাহেবের কৃষকপ্রজা পার্টি আর মুসলিম লিগের লড়াই। ভোটের মধ্যেই হকশাহেব দাবি তুলেছিল, ‘জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে।’ হকশাহেব জিতেছেন শুনে ভিড় থেকে ধ্বনি ওঠে, ‘ফজলুল হক জয় জয়।

দীনু চক্রবর্তীর স্ত্রী তার বৌমাদের নিয়ে যোগেনকে ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে। সে বৌ-ই নেহাত বালিকা, তবে দীনু চক্রবর্তীর এক বৌমা গ্র্যাজুয়েট। যোগেন জেঠিমাকে প্রণাম করতে মাথা নামিয়েছে আর তিন বৌমা তার মাথায় ধান-দূর্বা ছড়িয়ে দিল। বৌমাদের যোগেন নমস্কার করল। তখন মেয়েরা নমস্কার পেতে অভ্যস্ত ছিল না। বামুন হলে প্রণাম পাবেন—বয়স সেখানে বাধা হয় না। যোগেন যে নমস্কার করল, তাতে এটাই বোঝা গেল—সে প্রণাম করল না।

দীনু চক্রবর্তীর বৌ ও বৌমাদের এই সব করতে দেখে ছালাউদ্দিনশাহেব তার ছোট ছেলেকে চিৎকার করে ডাকে—’এ–ই নেওয়াজ বাপ রে–এ’।

নেওয়াজ তার পেছনেই দাঁড়িয়েছিল, ‘কী কও বাপজান!’

‘যা যা। নোর পারা তোর মা-রে ক, মিঠাই-শিমুই নিয়্যা আইতে। ভোটে জিতছে-না যুগেন! যা―আ।’

ততক্ষণে হ্যাজাক আবার চলতে শুরু করেছে। দীনু চক্রবর্তীর পাশের বাড়ি আনোয়ারশাহেবের দোতলা, এখন বাড়ি বন্ধ। আনোয়ারশাহেবের দাদা থাকে কলকাতার পার্কসার্কাসের ট্রাম ডিপোর পেছনে। দাদা-ভাবি মিলেই আনোয়ারের বিয়ে দেয় কলকাতার এক বড় বাড়ির মেয়ের সঙ্গে, মনে হয় আপকানট্রি মুসলিম। আনোয়ারশাহেবদের ভূসম্পত্তি ভাল, তার ওপর তার দাদা একটা কারখানাও খুলেছে বজবজে। টিন করোগেট করে আর সলিড-টিনের প্যাকিং বাক্স বানা। ছোট ভাই বরিশালে তালুকদারি তদারকি করে আর বড় তাই কলকাতায় কারখানা করে। তালুকদারি-ফ্যাক্টরির পয়সাতেই তো কলকাতা শহরের ঐরকম জায়গায় এমন বাড়ি—এত বড়, উঁচু, দোতলা, রেলিং, লাল বারান্দ।, লাল সিঁড়ি। তাহলে আর বড় ভাইশাহেব চাইবে না কেন—জাতে উঠতে? সে ঐ পশ্চিমি মুসলমান বাড়ি থেকে মেয়ে পছন্দ করে। সে-ই বিয়ের পর থেকেই, বছর বিশ-পঁচিশ, আনোয়ার শাহেব বদলে গেছে, কেমন অচেনা হয়ে গেছেন। কারো সঙ্গে কথা বলে না, কোথাও যাতায় তও করে না। দরজা-জানলা খোলা দেখলে জানা যায় ওরা ফিরেছে, বন্ধ দেখলে জানা যায় ওরা ফিরে গেছে। আনোয়ারশাহেবের স্ত্রী নাকী শুরু থেকেই কলকাতা ছেড়ে থাকতে চান না। বরিশালে টাউনের সবচেয়ে ভাল জায়গায় এই বাড়িতেই মশা, বদবু, গরিবি। মেলামেশার কোর্ট নেই। বিবিশাহেবের জবানই কেউ বুঝতে পারে না। লোকগুলির গায়ের রং কালো। নিরের পর থেকেই ওরা বছরের বেশ কয়েকমাস, বিশেষ করে বর্ষার সময়, কলকাতায় কাটায় তবে এই শীতের সময়টা এসে কয়েকমাস থেকে আদায়পত্র বুঝে নিতে হয়। চোখের সামনে ঐরকম জ্বলজ্বলে ছেলেটা কেমন হয়ে গেল—ধোয়া পাটের গুছির মত নেতানো। ছেলেপিলে হয়নি। দীনু চক্রবর্তী নাকী একবার বড় ভাই সারোয়ারকে বলেছিল—’আরে, ছাওয়ালডারে তো এক রিয়্যা দিয়া মাইরা ফেইল্যা! নিজেদের ঘর ছাইড়্যা পশ্চিমা হবার গেল্যা ক্যান। তোমাগো তো ‘তালাক’ বললেই তালাক। তাই কওয়াইয়া দ্যাও না একদিন আনোয়ারকে। দিয়্যা, আর-একখান বিয়্যা দাও।’ সারোয়ার জানিয়েছিল, ‘কইছিল্যাম তো। আমি কইছি, ওর ভাবি কইছে, দুইজনে এক লগে কইছি। কিন্তু আনোয়ার রাজি না। স্যায় কয়—ভাই কী বৌড়ায়? হাই সোসাইটির ঘাইয়্যা। উর্দু ছাড়া বুলি নাই। এমনিতেই তো আমাগ ভাবে ছোটলোক—মুসলমান। তালাকের কথা কইলে তো ভাবব-বুন্যা মুসলমান, কোনো নিয়মকানুনও নাই।’ দীনু চক্রবর্তীর মুখ থেকে এ-ই সব শুনে আনোয়ারকে নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন নতুন করে মনে জাগেনি।

এখনও সে-বাড়িটা অন্ধকারেই থেকে যায়। ছালাউদ্দিনশাহেবের বাড়ির সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভিড়টা সরব হয়—’যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’

ছালাউদ্দিনশাহেবের বেগম এ-সব কাজে খুব পাকা না। এক ইদের সময়! সেও তো বাড়ির ভিতরে, ছোটদের দোয়া করা। সে বাটি থেকে চামচে করে এক চামচ শিমুই ঢুকিয়ে দেয় যোগেনের মুখে। তারপর পাশে রাখা আসান-চিরাগে হাতের তেলোটা তাপিয়ে যোগেনের কানের পাশে হাতদুটো ছোঁয়ায়।

নিচু হয়ে তার পায়ের দিকে যোগেন হাত বাড়াতেই বেগমশাহেবা এক লাফে দু-পা পেছিয়ে যান আর তাতে দীনু চক্রবর্তীর পায়ে লাগে ধাক্কা। দীনু চক্রবর্তী ‘কী করো কী করো’ করে উঠতেই বেগমশাহেবা একপাক ঘুরে জ্যাঠাকে গোর করে।

‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়—।’

‘কীর্তিপাশা হাউশটা সাজানো হয়েছিল। ছোট গেট দিয়ে ঢুকে পা-আটদশ গেলেই দালানে ঢোকার প্রধান দরজা—তার ডাইনে-বাঁয়ে দুটো বড় সাইজের হ্যাজাক। ঐ পথটার ডাইনে-বাঁয়ে দু-টুকরো মাঠ বা মাঠের দুই টুকরো। ১৯৩৭-এর জানুয়ারির শেষে বাড়ির সামনের এই মাঠগুলিকে যে ‘লন’ বলা হয়, তা, বরিশালের মানুষজনের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু তখনো এই এমন সংস্কার কাটেনি যে খুব বড় বড় সরকারি অফিসারের, বেশিরভাগই শাহেব, কোয়ার্টারের সামনের মাঠটাকেই শুধু ‘লন’ বলে, নাকী জমিদারবাড়ি বা টাউনের বড়লোকদের বাড়ির সামনের মাঠটাকেও বলা যায়।

‘কীর্তিপাশা হাউশ’-এর ডানহাতি মাঠটাতে একটা বড় চাঁদোয়া টাঙানো আর মাটির ওপর অনেক রঙিন শতরঞ্চি ছড়িয়ে পাতা। কীর্তিপাশার দুই কর্তা, বাড়ির আরো সব বড় ছেলেরা ও ঘোমটা-টানা কয়েকজন বৌ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সকলকে সংবর্ধনা করছিল ও বাঁ হাত এগিয়ে ডানহাতি মাঠটা দেখাচ্ছিলেন, ‘বসুন, বসুন।’ একজনমাত্র মাঝবয়েসি বৌ মাথায় কাপড় দেয়নি। উনি ছোট ভাই সীতাংশুবাবুর স্ত্রী। উনি বড় ভাই অমিয়বাবুর চোখের মণি—ওর কোনো কথায় কেউ ‘না’ করতে পারে না আর ও-ও যেমন ইচ্ছে চলেন।

বরিশাল টাউনের হিন্দুবাড়ির মেয়েদের ভিতর এই সাবলীলতা ও স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে ব্রাহ্মসমাজ থেকে। ব্রাহ্মদের সঙ্গে হিন্দুদের যা মারামারি কাটাকুটি তা কলকাতাতেই শেষ হয়ে গেছে। বরিশালে এসেছে শুধু সেইটুকু—সব মেয়েদের আকাঙ্ক্ষিত সামাজিকতা, ব্রাহ্মকর্তাদের সহনশীলতা, হিন্দু কর্তাদের একটু কম হিন্দুয়ানি ও পরিবারের মহিলা প্রধানদের উদ্যোগ—যেটুকুকে ছেঁকে নিয়েছে। ভোটের মত সরাসরি রাজনৈতিক ঘটনায় মেয়েরা হয়ত কাজে নামতেন না, কিন্তু বাড়িতে একজনের সংবর্ধনা তো সামাজিক কাজ।

ধীরে-ধীরে ভিড়টা শতরঞ্চি পাতা চাঁদোয়া টানানো আসরের দিকে এগয়। অনেকেরই পা খালি, তারা ঘাসে পায়ের ধুলো ঝাড়তে গিয়ে দেখে একটু তফাত করে রাখা দুটো ড্রামে জল আর ওপরে বদনা রাখা আছে।

ড্রাম থেকে বদনায় জল নিয়ে পা আর মুখ ধুয়ে ধুতির কোঁচায় মুছে শতরঞ্চিতে একটু ছাড়া-ছাড়া দল পাকিয়ে বসে সবাই। কেউ-কেউ পা দুটো লম্বা করে, দু-চারজন উবু হয়েও। এই জল ব্যবহার আর বসাবসির মধ্যে খুব সহজ ও অভ্যেসমত ভাগাভাগি ছিল। একটা ড্রামের জল ব্যবহার করছিল নমশূদ্র, ধোপা, যুগি, কৈবর্ত এরা। আর-একটা ড্রাম থেকে জল নিচ্ছিল বামুন-কায়েত-বৈদ্যরা। শতরঞ্চিতে বসার মধ্যেও তেমন একটা ভাগাভাগি ছিল। শীতকাল, বাবুদের বেশির ভাগই জামার ওপর চাদর জড়িয়ে। দু-একজনের গায়ে গরম কাপড়ের জামা যারা বাবু নয়, তাদেরও অনেকের গায়ে গেঞ্জি, কারো কারো গায়ে ছিটের হাফশার্ট, অনেকেরই গলায় বা কাঁধে মোটা মাফলার—গরমই, তবে উলের নয়, পাটের আর সুতির কাপড়ের মিশেল, অথবা গায়ে দেওয়ার চাদর।

যোগেন এতক্ষণে দেখতে পায়—কারা আছে, কারা এসেছে। তার পায়ে ছিল কাবলি স্যান্ডেল, বেল্টটা বাঁধা কিন্তু থাকে পায়ের ওপরে। সেই স্যান্ডেল খুলে রেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায় মনোরঞ্জন বসুর কাছে, সে শতরঞ্চিতে বসেছিল।

‘আরে কামডা দেখছ? এই রাত্তিরে স্যার আইসছেন? আপনি কি আমাগ লগে হাঁইটলেন নাকী স্যার, এতড়া।’

যোগেন তাকে প্রণাম করতে নিচু হতেই সে তার পায়ের পাতা বের করে দিতে দিতে বলল, ‘তুমি ভোট জিতব্যা রাত্তিরে, আমি তাহাইলে সকালে আসি ক্যামনে? জয়োস্তু। না, হাঁটি নাই। শুইনল্যাম এহানেই আসা হবে তাই আগে আইস্যা বইস্যা আছি। উপেনের সঙ্গে দেখা হইছে? দ্যাখো, সেও আইসছে।’

‘দেখি স্যার, খুঁইজ্যা—’ উপেন চ্যাটার্জি মোক্তারকে খুঁজতে যোগেন চোখ ঘুরিয়ে দেখে পাঁজিপুথি পাড়ার পণ্ডিতমশায় দুর্গাচরণ মিস্ত্রি, মাথা-গলা ঢাকা এক টুপি আর বগলে ছাতা যোগেন তাড়াতাড়ি তার কাছে যায়, ‘আমিই তো যাইত্যাম, আপনি আবার এতখান পথ…’, যোগেন প্রণাম করতে নিচু হয় আর পণ্ডিতমশায় বলে ওঠে, ‘তুই গেলে তো তোর যাওয়া হইত, আমার আসা তো হইত না। নে, নে, যতখান পারিস পায়ের ধুলা নে। আমি যাইয়্যা তোরে না-চড়াইলে তো উইড্র করা বসতি!’

কথাটা পুরোপুরি ঠিক। শীতাংশুবাবু ভোট থেকে সরে দাঁড়ালে যোগেন যখন উইড্র করার জেদ ধরেছে তখন পণ্ডিতমশায় গিয়ে তাকে প্রায় বাধ্য করে দাঁড়াতে

যোগেন সোজা হয়ে বলে, ‘গলাখান্ তো আপনার ভাইঙ্গ্যা দশকর্মা হইছে। আর চিল্লাচিল্লির কাম নাই। বগলে ছাতা ক্যান?’

‘মাঘের রাইতে বৃষ্টি, খাড়া মানুষ শোয়া ছিষ্টি।’

একজন এসে প্রথমে যোগেনকে, তারপর পণ্ডিতমশায়কে প্রণাম করে দাঁড়াতেই যোগেন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, ‘তুই আইছিস বাপ? খুড়্যা কই?’

‘আইসে নাই। আমারে পাঠাইয়্যা কইল ভাল-মন্দ যাই হোক, জাইনলেই চইল্যা আসবি।’

‘তয়? তুই তো এইহানে। খুইড়্যা করবডা কী?’

‘জাইন্যা গিছে এতক্ষণ! আমি এই ছাইড়া যাই ক্যামনে?

‘এডারে চিনেন, পণ্ডিতমশায়?

‘না। চিনা তো ঠেকে না।’

‘আরে নরেনকাঠির ললিত রায়ের ভাইয়ের ব্যাটা বিনোদ। কী কইরছে আর কী করে নাই? ঘরের টাকা খরচা কইরছে জলের লাগান আর শরীর খরচা কইরছে অসুরের লাগান।’

‘দেখ যোগেন, ভোটে তো জিত্ব একজনই। বাকি সগলেই তো হারব। তোমার এই ভোটে দাঁড়ানোয় আর জিতায় তার থিক্যা অ্যাড্‌ডা বড় ঘটনা ঘইট্যা গিছে। তুমি-যে খাড়াইল্যা এইডা তো একখান সাহস। তুমি সেই সাহসডা দেখাইল্যা তো—তাই আমাগ ভিতরে, এই ধরো কেন, আমার ভিতরে, ঐ যে নরেনকাঠির ললিত রায়ের ভিতরে, কী, ধরো, এই ছাওয়ালডার ভিতরে যে-সাহস লুকাইয়্যা-ঘুমাইয়্যা ছিল, সেই সাহসগুলা বাহির হয়্যা পইড়ল। এরে জাগরণ কয়। তোমরা তো আমারে পণ্ডিতমশায় ডাকো। তাই এড্‌ডু পণ্ডিতি কইরল্যাম। এই কথাডা তোমারে আইজই কওয়ার কথা। তার লগেই আমি আইসছি। কথাডা তুমি মাথায় জমা রাইখ্যা দ্যাও। অ্যাহন ভাইব্যার যায়ো না। তাহাইলে ভাবনাডা ভুল হইয়া যাইবে বাপ। কইলকাত্তায় তোমার তো একলা ঠেকব। যারা জিতছে, তারা সকলেই শিক্ষিত, সকলেই বড় মানুষ। নিজেরে তোমার ছোট মনে হইব্যারও পারে। সেই সময় কথাডা নিয়্যা ভাইব যে তোমার ভোটে একখান্ জাগরণ ঘইটছে। তুমি য্যান বাবা সেই জাগরণ থিক্যা পৃথক হইয়্যা যাইয়ো না। তহন এই কথাডা ভাইবো। জোর পাইবা।’

‘পণ্ডিতমশায়, আপনি কি ডর পান যে আমি ভুইল্যা যাব এই জাগরণ? জাগরণ কথাডা খুব ভাল কইছেন। আমি তো বেশির ভাগ জায়গাত্ যাব্যারই পারি নাই। যারে জন্মে চিনি না, নাম শুনি নাই—সেই মানুষড়াও পয়সা দিয়্যা, গতর দিয়্যা, কী কইরছে আমারে জিতানোর জইন্যে? হ। বামুন-কায়েতরাও অনেক জায়গায় মত ঠিক করছে। কিন্তু আমি অ্যাহন কই—মুসলমান, আমার জাতভাই, ধোপা, জোলা, যুগি, কৈবর্ত কথা। আমি একখান্ উপলক্ষ, পণ্ডিতমশায়।’

‘দ্যাখো যোগেন, যে-ভুলডা থিক্যা তোমারে বাঁচাইতে চাই, সেই ভুলডাই তুমি কইরল্যা। নিজেরে উপলক্ষ ভাইবো না। ঐ কথাডা বামুনদের বানানো আরো একডা মিছা কথা। যাগ নিজে ছাড়া কোনো লক্ষ নাই, স্যায়ারাই এই মিথ্যাডা কয় যে আমি উপলক্ষ।’

একটু চুপ করে থেকে যোগেন বলল, ‘এই কথাডা মনে-মগজে ঢুইকতে এড্‌ডু টাইম লাগব।’

‘বাঁচাইল্যা বাবা। তুমি যে চট কইর‍্যা বুঝো নাই, তাইতেই রক্ষা। ভাইবো। ভাইব।’

‘আমি আপনার লগে যাইয়্যা নিরিবিলিতে এডডু কথা কয়্যা আসবো একদিন।’

‘যোগেন, যাইয়ো না। আমি তো নমোগো পণ্ডিত। বামুন পণ্ডিতরা ঠাট্টা কইরা আমার থাকনের জায়গার নাম থুইছিল পাঁজিপুথি পাড়া। নামডা কিন্তু টিক্যা গেল। ঠাট্টাডা মানুষ ভুইল্যা গেল। নিরিবিলি বুইঝ্যা উপদেশ দেওনের পণ্ডিত না আমি। ভিড়ের মইধ্যেই কথা কয়ো। অ্যাহন তো ভিড় লাইগ্যাই থাকব।’

‘যোগেন, অ যোগেন, এইহানে আও’, অমিয়বাবু ডাকে।

যোগেন দেখে, গেট থেকে বাঁধানো কয়েক-পা রাস্তার মাঝখানে তিনটি চেয়ার বসানো হয়েছে, হ্যাজাকের আলোতে পালিশ চমকাচ্ছে। অমিয়বাবু মাঝখানের চেয়ারে যোগেনকে বসতে ইঙ্গিত করে। যোগেন বলে ওঠে, ‘ঐডা পারব না বড়কর্তা। এইখানে এত গুরুজনরে ফ্যালায়া আমি চেয়ারে বইসতে পারব না। আমি এইহানেই বইসল্যাম’–যোগেন শতরঞ্চির যে-জায়গায় দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই বসে পড়ল। একটা হইহই উঠল। ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়। বড় ঠাকরান এসে অমিয়বাবুকে কিছু বলল। অমিয়বাবু যোগেনকে বলে, ‘এজলাশে যে গুরুজনদের কাঠগড়ায় খাড়া কইর‍্যা রাইখ্যা তুমি চেয়ারে বসো!’ সকলের হাসির মধ্যে অমিয়বাবু বলে, ‘বসো বসো, ঐখানেই বসো।’

বড় ঠাকরান, মাইজান ঠাকরান, আরো সব মেয়েরা মিষ্টির থালা, ফুল, প্রদীপ নিয়ে আসেন। বড় ঠাকরান আর মাইঝ্যান ঠাকরান পরপর যোগেনের কপালে চন্দনের ফোঁটা দিল, ছোট মেয়েদের মধ্যে কেউ এসে ফুলের মালা পরিয়ে দিল, তারপর বড় ঠাকরান রুপোর থালায় চুড়ো করা মিষ্টির থালাটা রেখে বলল, ‘খাও’। আর মাইঝ্যান ঠাকরান রুপোর বড় গ্লাসে জল রেখে বলল, ‘জল না খেয়ে মিষ্টি খেও।’

সবাই যোগেনকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। যোগেন বলল, ‘অরা সগলে খাইব না?’

‘সবাই খাইব। ঐ তো শুরু কইরছে। তুমি খাও।’

‘আমি কিন্তু সবগুল্যা একাই খাব, বড় ঠাকরান। কাউরে ভাগ দিব না।’

‘ভাগ দিবা ক্যান। তোমার খাওনের লগেই তো দিচ্ছি। সগলে খাবে। তুমি খাও।’

এতক্ষণে যোগেনকে ঘিরেই ভিড়টা গোল হয়ে গেছে।

যোগেন বসে-বসে ঘাড় উঁচু করে সেই মুখগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বোলায় তার ডানদিকে। প্রথম সারির পেছন থেকেও অনেকে উঁকি দিচ্ছে। ডান দিকে চোখ বোলানো শেষ করে যোগেন থামে।

‘তাহাইলে খাইয়্যাই ফেলি! কী কও?’

‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়-

যোগেন এবার তার বাঁদিকে ঘাড় ঘোরায়। সবার মুখের ওপর দিয়ে একটু হাসিমাখা মুখে, মাঝে-মাঝে একটা ভুরু তুলে, দৃষ্টি বিনিময় শেষ করে থামে। যোগেন হাসিটা একটু বাড়ায়।

‘তোমরা দুঃখ কইরো না। আমার খাওয়ার দিকে চোখ দিয়ো না। তোমরাও পাবা। এত না হইলেও, একটু-আধটু পাবা নে। বড় ঠাকরান কইছেন। আর, রাত কইর‍্যা তো বেশি-খাওন স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল না। তাহাইলে খাইয়্যাই ফেলি! কী কও?’

‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়—’  

মিষ্টিগুলো চুড়ো করা ছিল। সবচেয়ে ওপরে একটা গ্যাদাফুলের রঙের গোল মিষ্টি ওলকপির আকারের। সেই মিষ্টিটা তুলে, না ভেঙে গোটাটাই যোগেন মুখে পুরে চোখ বুজে চিবুতে লাগল।

‘এই, তোমরাও বইস্যা পড়ো, যার যেহানে ইচ্ছা’, মাইঝ্যান কর্তা বলে আর বাড়ির বৌ আর মেয়েরা বড়-বড় বারকোশে মিষ্টি নিয়ে পরিবেশন শুরু করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *