১৭. বরিশালে ঝালাই নাই?
খাল থেকে যোগেন একেবারে স্নানটান সেরে ভেজা কাপড়ে ফেরে। কাল রাতে যোগামার কাছ থেকে একটা খাটো ধুতি চেয়ে নিয়েছিল—আটহাতি কোঁড়া ধুতি, তার কোঁড়া রং কোনোদিনই ঘোচে না, লাল পাড়। গ্রামে নমশূদ্রদের এটাই পোশাক। যতই ছিঁড়ে যাক আর হাঁটুর যত ওপরেই উঠুক—ধুতিই পরে নমশূদ্ররা। কেউ-কেউ হয়ত ভূস্বামীর বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে, পুরনো ধুতি-জামা নিয়ে আসে। বাবুরা দশ-বারহাতি ধুতি ছাড়া পরেন না। তাই তাঁদের ধুতির কোনো একটা দিক বেশি ছেঁড়া থাকলেও এদের পরতে অসুবিধে হয় না— ছিঁড়েছুঁড়ে খাটো করে নেয়। তবে সেটা একটা দৃশ্য হয় বটে—ধুলোঘাটা মাথা খাটো ধুতির মধ্যে হঠাৎ একজনের পরনে ইস্তিরি-ভাঙা ফটফটে বাবু ধুতি। তবে, ঐ একদিনই। সে ধুতিও পরদিন ধুলোরঙা হয়ে যায়।
যোগেন দুয়ারে দাঁড়িয়েই যোগামার দেয়া কাপড়টা পরে নেয়—ভেজা ধুতি ছেড়ে। ‘জার লাগে যে যোগামা’–
‘জারের আর দুষ কী? মাঘের শীত বাঘের গায়। তোর জামাডা পইর্যা নে।’
‘ঐডা তো পাঞ্জাবি। পিরান-ফিরান নাই কারো?’
‘পাঞ্জাবির তো তলায় গেঞ্জি লাগে। গেঞ্জিখান পইর্যা নে বাবা।’
‘কইব্যার ধইরছ কী? অ্যাহন আমি গেঞ্জি-জামা পইর্যা নিজের বাড়িতে মোড়া পাইত্যা বইসব নি কাছারির গোমস্তার নাখান।’
‘তুই ক্যান গোমস্তা হইবি বাপ, তুই না উকিল, তোরই না পাঁচখান গোমস্তা লাগে। তার উপর তো ভোটে জিতা মেম্বার হইছে আমাগ ছাওয়াল। ত—য়?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ— বুইঝব্যার পারছি দ্যাশের খুব উন্নতি হইছে। তুমি যহন আমারে পিরান না দিয়া উকিল-গোমস্তা বুঝ্যাবার ধইরছ—’যোগামা তাকে একটা দলা পাকানো পিরান ছুড়ে দেয়। যোগেন সেটা নিয়ে একটা হাত ঢুকিয়ে আর-একটা হাত খুঁজতে দুয়ারে এক পাক ঘোরে। তারপর বোঝে, পিরানটা এত ছোট যে তার আর-এক কাঁধ পর্যন্ত আসেই না।
‘অ যোগা—আ—মা, আমারে ছোড কইরা দ্যাও। না অইলে তোমার পিরানে ঢুইকব্যার পারি না’—হাসির হুল্লোড়ের ভিতর যোগেন তার এক হাত ঢোকানো পিরান নিয়ে দুয়ারে ঘুরপাক খায়। যোগামা এসে একটানে পিরানটা খুলে নেয়। যোগেনের ছোটখুড়োর বড় ছেলে, রাজেশ্বর, ছিটের একটা হাফশার্ট পরে বাইরে, নিশ্চয়ই কিছু দূরে ও ভদ্র জায়গায়, নইলে হাফশার্ট পরতে যাবে কেন, বেরতে যাচ্ছিল, যোগামা তার ওপর হামলে পড়ে, ‘তোর শাটখান্ খুইল্যা দে।’ রাজেশ্বর সদার সমান, যোগার চাইতে এক-দেড় বছরের বড়। সে যোগামাকে বাধা দেয়, ‘জেডি, আমারে বাইর্যাতে হব, অ্যাহনই।’
যোগামা ততক্ষণে তার শার্টটা ওপর দিকে তুলতে শুরু করেছে, ‘তা বারানের আছে তো বারা গিয়া, শাট দিয়্যা কী করবি?’ রাজেশ্বর নিজেই শার্টটা খুলে দিচ্ছিল। জামাটার গলা থেকে নিজের মাথাটা বের করতে-করতে সে বলে ওঠে, ‘অ, যত জার সব যোগা-র গায়। আমাগ জার লাগে না?’
যোগামা শার্টটা নিয়ে যোগার হাতে দিয়ে বলে, ‘পইর্যা নে বাপ, নাইলে কাইড়্যা নিবে।’ যোগেন শার্টটায় গলিয়ে মাথাটা বের করে রাজেশ্বরের দিকে একটা ভুরু খেলিয়ে, তাকিয়ে বলে, ‘শার্ট কি খলিফার নিকড় থে আইনলেই পরা যায়? পরার ভাগ্যি তো আলাদা।’
রাজেশ্বর বলে ওঠে, ‘তুই তো বাড়িছাড়া থাগিস। তাই ছাইড়া দিল্যাম। নে, পর, শার্টখান, এক বেলাই তো?’
যোগামা—’তোগো তো রোজই জার লাগে। ও এড্ডা দিন থাইকব্যার আইসছে। ওর জার তো ঠেকাব্যার লাগব?’
‘ওরে রোইজ থাইকব্যার নিষেধ কেউ দিছে? থাকুগ এইখানে। তাহালি উকিল আর মেম্বার হইব কেডা?’
‘তয়? মেম্বারগ গরম-জার-বর্ষা সবই বেশি, জানো না?’
রাজেশ্বরের বৌ বলে বসে।
‘অ্যাহন, যারা মেম্বার হয় নাই, তাগ জারের লাইগ্যা অ্যাড্ডা দলুই-ধলুই কিছু দ্যাও।’
দুয়ারের উলটোদিকে, ঝাঁকড়া তুলসীমঞ্চের পেছনে, একটা ছোট সাইজের ছিপ নৌকো কাত করা ছিল। উলটোদিকে মানে রাস্তা থেকে ধাপ ভেঙে দুয়ারে দাঁড়ালেই নৌকোটার তলা, কাত-করা, চোখ পড়বে। তৈরি হচ্ছে। যোগাদের বাড়ির সকলেই এর-ওর ক্ষেতে কাজ করে—যোগার বাবা-খুড়ারা-দাদারা-খুড়িমারা-বৌদিদিরা—সবাইকেই কাজ করতে হয়, ক্ষেতে, লাঙল দেয়া থেকে কাটা-ধানের ক্ষেত থেকে ঝরা ধান তুলে আনা পর্যন্ত। তাদের নিজেদের একটু-আধটু জমি আছে—আধা হলের চাইতেও কম। সেই নিজেদের জমি আর বর্গাদারির, এমনকী মজুরির, অন্য জমির মধ্যে কোনো তফাত বাড়ির কেউও করতে পারে না, করে না। নিজের জমিও তো তাদের চাষ করতে হয় অন্যের কাছ থেকে বলদ-লাঙল ধার করে। ঐসব মিলিয়েও বছরের ধান দূরের কথা, মাস চারেকের ধান বড়জোর ওঠে। বাড়ির সবাইকে সবরকম কাজই করতে হয়। বামুন-কায়েত বাড়ি বাচ্চা ধরা, বাচ্চাকে মাই দেয়া, গরু-ছাগল দেখা, বরকন্দাজের কাজ, ব্যাপারবাড়ি, মাঝিগিরি, ছুতোরগিরি—কোনো কাজেই নারী-পুরুষের ভেদ নেই, এক মাই দেয়া আর দাইগিরি আর বরকন্দাজি ছাড়া। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কাঠের মিস্তিরির কাজ করত যোগার বড় আর ছোট খুড়ো। বড় খুড়োই বোধহয় নৌকোর কাজ প্রথম ধরে। গৌরনদীর উত্তরদিকের গ্রামগুলির নৌকো তৈরির খুব নামডাক। অন্য জায়গা থেকেও এদিকে আসে নৌকো তৈরি করিয়ে নিতে। বরিশালে তো নৌকো ছাড়া এক-পাও এগনো যায় না। আর, নৌকো বানানোর কাজের তিনটি সুবিধে। নৌকো লোকে কেনে স্থায়ী সম্পত্তির মত। ফুটোফাটা পচাঘচা হলে সে-মিস্তিরিকে আর দ্বিতীয় নৌকোর বরাত কেউ দেবে না। তেমনি একটু ভাল নাম ছড়ালে কাজ দিতে লোক ছুটে আসে। দুই নম্বর সুবিধে-বাড়িতে কাজ আনলে বাড়ির সবাইই কাজ করতে পারে। চেরাইয়ের কাজ, জোড়ার কাজ ছেলেরা করে আর গাবমাখানো, তলাচাছার কাজ মেয়েরা করে, ছেলেপিলেরাও করতে পারে। আর তিন নম্বর সুবিধে—নৌকো তৈরির মজুরি ভাল, মজুরি একসঙ্গে আসে, তেমন কেউ-কেউ ধানে ও টাকায় মজুরি দেয়। তাতে বাড়ির খাওয়া অনেকটা সামলানো যায়। যোগার বড়খুড়ো নৌকো তৈরির কাজ ধরেছিল বলেই যোগেন ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়তে পেরেছে। তবে, মূলধনের অভাবে গয়না বা পাট বা গোলা নৌকো পর্যন্ত তারা যেতে পারেনি। খোলা, ডিঙা কী এইরকম ছোট ছিপ পর্যন্ত চলে। বড়খুড়ো একবার ভেবেছিল—মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বড়নৌকোয় ঢুকবে। যোগার মা তখন বেঁচে। বড়বৌই নাকী বড় দেওরকে বলে, ‘ভাইব্যা দ্যাখো ঠাকুরব্যাটা। ছোড ডোঙার জল হাত দিয়্যা সাঁইচ্যা ফেলান্ যায়। গয়নার নাও, পাটের নাওয়ের খোলে যে-জল ঢুকে তাতে মানুষ ডুইব্যা যাবার লাগে। শ্যাষে কী হইতে কী হইব! ডর লাগে। আমাগো যে কিছু নাই, তবু মহাজনের কাছে আমাগো কুল্যা ঝাইড়্যা আইতে হয় না। বাড়ির হগ্গলে মিল্যা যে গতর খাটায়, তারই ভাত প্যাটা-আধাপ্যাটা খায়। আমাগো ওপর কুনো মহাজনের দৃষ্টি নাই—তার হুবাদেই আমাগো সংসারের দুঃখ। সেই দয়াতেই আবার আমাগো সুখ। ‘ বড়বৌদিদি—যোগার মা, সন্ধ্যার, এই কথায়, বড়খুড়ো আর এগয়নি।
শার্টটা গলাতে-গলাতেই যোগেন নৌকোর দিকে দৌড়য়। নৌকোর তলাটা এদিকে কাত, খোলটা ওদিকে। সেই খোলের দিকেই ছোট খুড়ো কাঠ কাটছে। যোগেন এক লাফে সেখানে পৌঁছুতেই খোলের ভিতর থেকে একটা রঙিন শাড়ি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর যোগেনের বৌ কমলা ছুটে পালায়—তার ছোটার পথ ধরে শাড়ির রংটা তরল হয়ে বয়ে যায়। যোগেন থতমত খেয়ে যায়। সে জানত না কমলা নৌকোর খোলের মধ্যে বসে-বসে পুট্টি দেয়া, গাবের রস ঠেসা, টুকরা কাঠ গোঁজা এইসব কাজ করছে। ছোটখুড়ো করাত-চালানো বন্ধ করে যোগেনের দিকে মুখ তুলে আছে—হাতটা করাতের হ্যান্ডেলে। যোগেন বলে উঠতে পারে, ‘ছাড়ো তো, দ্যাও তো করাতখান, হেই-রাত না পুহাতে এমন ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ করাত চালাইব্যার ধরইছ, ঘুমায় কোন সম্বন্ধীর ব্যাটা? ছাড়ো, উঠো। দ্যাহো, কখন্ লাগে?’
ছোটখুড়ো করাত ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আইছিলি তো সম্বন্ধীর বুনের গন্ধ পাইয়্যা। বুঝিস নাই—আমি এইখানে খাড়া আছি করাত লইয়্যা।’
নৌকোর আড়ালে দুয়ার থেকে ছোটখুড়ির গলা খনখনিয়ে ওঠে, ‘হইছে ছোটমণ্ডল, তোমারে ঐহানে করাত-হাতে ভৃঙ্গীর নাগাল বেটার বৌ পাহারা দিব্যার কাজ দিল কেডা? যত বুড়া হচ্ছে, বুদ্ধি য্যান অ্যাক্কেরে তমালবৃক্ষের নাগাল ঝাঁক্যায়া উইডত্যাছে। দ্যাহো, গাছের ডালে আবার কাগ-শগুন বাসা না বাধে।’
ছোটখুড়ো ততক্ষণে তো দুয়ারে, ‘যোগা গিয়্যা মিছা কথা কইল ক্যান, ছোটখুড়া করাতে দ্যাও, কাঠ কাড়ি।’
ছোটখুড়ি বলে উঠল, ‘আ হা হা, কে আমার দৌপদীর ভাসুর আইলেন লো। সত্যি ছাড়া কথা শুনেন না? ন্যাও, এডডু তুলসীজলে কান ধুইয়্যা লও, ছাওয়াল তোমারে গিয়্যা কয় নাই যে ছোটখুড়া তুমি এইহান থিক্যা য্যাও, আমার কিছু বৌয়ের লগে কথা আছে।’ যোগেন শুনে হেসে ফেলে, দুয়ারেও হাসি উঠেছে। ছোটখুড়ি নিশ্চয়ই দুই হাতের তালু নাচাচ্ছে। ঝগড়া যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে হাঁটু ভেঙে আবার সোজা হয়ে নাচও হবে। এ-ঝগড়ার তো আর কোনো সালিশি নেই। বাড়ির কেউও কিছু বলে না, পাড়ার লোকরাও কিছু বলে না। তারা জোরে-জোরে হেসে উঠে শুধু এক-এক পক্ষকে তারিফ দেয়।
যোগেন এই ঝগড়া শুনতে-শুনতে করাতটা জোরে-জোরে চালাচ্ছিল বলে আন্দাজ পায়নি—কতটা জোর লাগছে। মনে হচ্ছে, ছোটখুড়ো কোনো কথা বলেনি। আর, তার অপরাধের যথেষ্ট গঞ্জনা দেয়ার সন্তুষ্টিতে ছোটখুড়িও গলা বন্ধ করেছে। গলা একবার খুললে তিন-সপ্তক না ঘুরে নমশুদ্দুরের মাইয়্যার গলা বন্ধ হয় না। ছোটখুড়ি যেন আচমকা ছেড়ে দিল। নমশুদ্দুর মেয়েদের কথার কী তোড় আর গলার কী জোর। এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে কত গল্প আছে। মেয়ে দেখতে গিয়ে ছেলের বাপ জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনাগোর এহানের শিয়ালের ব্যাভার-আচার ক্যামন?’ মেয়ের বাপ যদি শেয়ানা হয় তাহলে জবাব দেয়, ‘শিয়ালের? হে কই ক্যামন কইর্যা? ছোডবেলার স্মরণ কি অ্যাদ্দিন থাগে?’ ছেলের বাপ যদি শেয়ানা হয়, তাহলে সে বুঝে নেবে সম্ভাব্য পুত্রবধূর গলার জোরে শিয়ালের ডাক চাপা পড়ে যায়। ব্যস, বিয়ে পাকা। আর, মেয়ের বাপ যদি শেয়ানা না-হয় আর বরের বাপের প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে, তাহলে জবাব দেয়, ‘শিয়ালের বজ্জাতির কথা আর কী কন? কাইল রাইতেও তো একখান হাঁস নিয়্যা গেল’, ‘ক্যা? একডা হাঁস তো নিছে, বাকিগুল্যা চিকুর পাড়ে নাই?’ পাইড়ছে। নিচ্চয় পাইড়ছে।’ ‘আপনাগো কানে যায় নাই? আপনার কইন্যার কানে?’ ‘হ্যাঁ, গিছে। না-যাইব ক্যা? গিছে। তবে সজাগ হইব্যার টাইম পাই নাই।’ ‘কেডা পায় নাই।’ ‘হগগলের কথাই কই, রাত্তিরের নিদ্রা তো, সজাগ হইতেও তো টাইম লাগে।’ ‘কার লাগে, আপনার মাইয়ারও?’ ‘তা তো লাগেই। লাগবই। মেয়েরে তো শিয়াল পাহারার বিদ্যা দেই নাই।’
তার মানে, এ-মেয়ের শুধু পেট আছে, আর ঘুম আছে। ব্যস, বিয়ে খারিজ।
কেউ-কেউ বলে, বিয়ে নাকী মেয়ের বাপই ঐকথা বলে খারিজ করল আগে। তার বাড়িতে এসেছে, সে তো আর মেয়েদেখার দলবলকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতে পারে না। তাই সে জানিয়ে দিল—অত খাটুনির ঘরে মেয়ে দেবে না।
যোগেন ছোটখুড়োর হাত থেকে করাত নিয়েই পুরোদমে চালাতে শুরু করেছে। করাতটাকে কাঠে বসার সময় দেয়নি। তাই এতক্ষণে যত-না কেটেছে, তার চাইতে হাঁফাচ্ছে বেশি।
করাতড়াও তো লম্বা। এমন লম্বা, হিলহিলে, ছোট দাঁতের বড় করাত সিধে রাখতে হলে, আর-একজন উলটোদিকে থাকা দরকার। দরকার আর কে না বোঝে? তাহলে খুড়ারা বা ভাইরা সরুর দিকে একটা হ্যানডেল বানিয়ে আর-একজনকে বসিয়ে দিল না কেন। করাতের আওয়াজ কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কানের ভিতর দবদবাতে শুরু করে। কপালের পাশে দুই শিরাও। বাইরের আওয়াজ কানে আসে তবে ঢোকে না। মাথা ঘেমে ওঠে। গায়ের তপনটা খুলে ফেলতে মন করে। করাত-চালানোর ছন্দটা আর হাতেই আটকে না থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে চায় কিন্তু ছড়িয়ে পড়তে পারে না। যে-কাঠের টুকরোটা খাড়া টুকরো করছে—সেটা এমনকিছু বড় না যে দুই হাঁটুর মাঝখানে আঁটবে না। যোগা সেইরকমই আটকে নিয়েছে। কিন্তু আধাআধি নামার পর, বাইচনৌকার মাঝি যেমন চিত হয়ে যায় বৈঠার টানে, অতটা চিত হতে পারে না যোগা। তা করতে হলে—দাঁড়িয়ে করাত চালাতে হয়, কাঠটা আটকে রাখতে দুটো মোটা বাঁশের টুকরোকে মাথার একটু নিচে বেঁধে দিয়ে খাড়া একটা x বানিয়ে। নৌকো বানাতে নানা সাইজের নানা কাঠ লাগে—তাই x-এর জায়গাটা ওঠানো ও নামানোর ব্যবস্থা দরকার। আর, একটু বড়, দু-মুখে ধার করাত দরকার। একই সঙ্গে দুই দিক থেকে না-কাটলে আর কাজ এগুবে কী করে?
এই চিন্তাগুলি যোগেনের মাথায় ঢোকে করাত আরো জোরে চালাতে চালাতে, আরো ঘামতে-ঘামতে। কানের ভিতরের শিরার দবদব ও কপালের দু-দিকের শিরার ঝিনঝিন ক্রমেই বাড়তে থাকে। কাল অন্ধকার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে নৌকোটার গুণ ধরে সেই এক কিশোরের নিজেরই শ্রমের কাছে নিজের বাধ্যতা যেমন অদৃশ্য হতে-হতেই হয়ে উঠেছিল একটা ক্ষমতা, যোগেনের এখন তেমনই ঘটছে—যেন, তার শরীরের ভিতরের ক্ষমতাই চিরে দিচ্ছে এই কাঠের টুকরো, যেমন রামচন্দ্রের হাতে হরধনু ভেঙে গিয়েছিল। শরীরের ভিতরের এই ক্ষমতাটা কাঠ-চিরবার সময় যে কিছু ছিটকে যাচ্ছিল, ছিটকে নষ্ট হচ্ছিল, কাজের বেগে যোগেনের মনে হয়, এটুকুই-বা নষ্ট হচ্ছে কেন, এটুকুকেও চিরবার ক্ষমতায় লাগালে কাঠটা তো আর-একটু বেশি চেরা হত, শুধু বাঁশের একটা x বানিয়ে নিলেই আর করাতের সরু-দিকে একটা হ্যানডেল লোহা-ঝালাইয়ে লাগিয়ে দিলেই…। ঝালাই মৈস্তারকান্দিতে হয় না। গৌরনদীতে? ঝালকাঠিতে? যোগেন করাত-চালানোর গতি বাড়াতে-বাড়াতেই মনে আনার চেষ্টা করতে থাকে—লোহার ঝালাই আর-কোথায় হতে পারে? যোগেনের মনে আসে না। যোর্গেনের মনে আসে না—এই তার চলাফেরার একটা কোনো জায়গা—যেখানে লোহার ঝালাই-কাজ হয়। তাই? এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল ছোটখুড়োরাই কিছু ভাবতে চায় না। শরীরের ক্ষমতাই করাতে যাচ্ছে—এটা ছোটখুড়োরা ভাবে না। শরীরের অর্ধেক ক্ষমতা করাতে ঢুকিয়ে অর্ধেক টাইমে কাজ সেরে ফেলার উপায়টা ছোটখুড়োদের খেয়ালই হয় না। না-হলে, কাজের ভিতরে ঢুকে যাকে কাজ খুঁড়ে বের করতে চায়, তার মাথায় কি কাজ ছোট করে নেয়ার উপায় না-এসে পারে? যোগেন যদি লাফ দিয়ে এসে করাত না ধরত, তাহলে কি বার লাইব্রেরিতে বসে-বসে সে এই x ও হ্যানডেলের কথা ভাবতে পারত? ছোটখুড়োরাও কাঠ চিরতে-চিরতে নিশ্চয়ই ভেবেছে—সে-ও মনে করতে পারেনি, ঝালাই, লোহার ঝালাই হবে কোথায়। তাহলে দুই পুরুষের বাপবেটা ধরে ঝালাইয়ের জায়গা খুঁজে পায় না বটে, তবু যোগা—যোগেন, যোগেন মণ্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, জে এন মণ্ডল—বিএ, বিএল, মেম্বার-ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, এমএলএ হতে পারে।
এই চিন্তাটার মানে কী হল, ঝালাইয়ের সঙ্গে মেম্বারির বিবাদ কোথায়—এসব যোগেনের মাথায় আসে না। যেমন তার মাথায় এটাও আসেনি যে অর্ধেক-টাইমে আর অর্ধেক-খাটনিতে কাঠ চেরা হলে বাঁচানো টাইম আর খাটনি নিয়ে করবেটা কী ছোটখুড়ো? টাইম আর খাটনি—দুটোই যদি ফালতু হয়ে যায়, তাহলে হাতপায়ে বাত ধরবে, গিঁঠে-গিঁঠে।
যোগেন করাত চালাচ্ছিল দ্রুত, কাঠটাকে দুই পায়ের মাঝখানে জুতমত বাগাতে পেরেছে, যোগেন করাতের তালে-তালে নুয়ে পড়ছিল, সোজা হচ্ছিল, নুয়ে পড়ছিল, সোজা হচ্ছিল। তার কপালের ঘাম নাকের পাশ দিয়ে তার ওপরের ঠোঁট বেয়ে মুখের ভিতর ঢুকছে। তার শরীরের দোলায় যোগেনের ঘাম ছিটকেও পড়ছিল এদিকওদিক। যোগেনের মনে এখন কোনো আওয়াজের অর্থ তৈরি হচ্ছিল না, যদিও আওয়াজগুলি তার কান পর্যন্ত আসছিল। যোগেনের কানে বা মনে এসে যায়—’উজিরপুর’, ‘বানারীপাড়া’। ওখানে লোহার কামাররা আছে না? ঝালাইয়ের কামার? কোদাল, কুড়াল, দাও, কাঁচি দাও, কাঁচি, বঁটি—এর কোনোটাতেই তো ঝালাই নেই, কাঁচি-সাঁড়াশি-জাঁতিতে তো নাটবল্টু। বালতি ফুটা হয় না বানারীপাড়া-উজিরপুরে? মেরামতির ঝালাইয়ে কি করাতের হ্যানডেল জোড়া যায়? যোগেন আরো একবার তার খোঁজা সারা করে—নাঃ, বরিশালে লোহার ঝালাই নেই। কিন্তু ঝালাই থাকলে কী হত, ঝালাই না-থাকায় কী লোকসান, সেসব নিয়ে যোগেনের মনে কোনো প্রশ্নই নেই। যেদিকে ঢল সেদিকে জল— -এটা যেমন একটা প্রাকৃতিক নিয়ম, যার লঙ্ঘন নেই—তেমনি খাটার মানুষও কম খাটনি চায় আর খাটনির টাইম কমাতে চায় এমন একটা প্রাকৃতিক সত্যেরও যেন কোনো লঙ্ঘন নেই।
খাটনির পরিমাণ ও সময় নিয়ে একটা এই প্রাকৃতিক সত্যে যোগেন নিশ্চিত পৌঁছে গেল কোন্ দিক দিয়ে? কেউ তাকে বা সে-ও নিজেকে জিজ্ঞাসা করেনি—যে-টাইমডা বাঁইচবেনে, সেই টাইমডায় কাম দিব কেডা।
ল-পড়ার সময় কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে খাওয়া-থাকার বিনিময়ে চাঁদসির ডাক্তারের দুই ছেলেকে যোগেন পড়াত, তার ওপর টিউশনি করত ও প্রুফ দেখত। হ্যারিসন রোডের মোড়ে গুপ্তপ্রেশ পঞ্জিকার প্রেশে প্রুফ দেখে হেঁটে ফেরার সময় দেখত—ট্রামরাস্তা জুড়ে ঝালাইয়ের নীল বিদ্যুৎ—আকাশে-মাটিতে ট্রামের তার-লাইন ঝালাই হচ্ছে।
