1 of 4

৭. সাইকেলে ইতিহাস : বীরনগর, কাশীপুর, লাখুটিয়া, শিকারপুর, মাধবপাশা, চাঁদপাশা, দেহের গতি…

৭. সাইকেলে ইতিহাস : বীরনগর, কাশীপুর, লাখুটিয়া, শিকারপুর, মাধবপাশা, চাঁদপাশা, দেহের গতি…

যোগেন সাইকেলে বেশ গতি পেয়ে গিয়েছিল। ভালই তো রাস্তা। দু-দিকে তাকাতে তাকাতে চালানো যায়—রাস্তায় কাকপক্ষীও নেই। কিন্তু যোগেন তো যেতে-যেতে বুঝতে চাইছিল—পুরনো এই রাস্তাটা এখন বাতিল করে দিয়ে নতুন বড় সড়কটা কেন বানানো হল।

বরিশালের জমিজমা বোঝা যার-তার কাজ না। বরিশালের পরগনা, পরগনা থেকে জমিদারি, জমিদারি থেকে খারিজা তালুক আর খারিজা তালুক থেকে হাজার-হাজার ছোট-ছোট হকিয়তের লিস্টি মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, শাহেবদের পক্ষেও নয়। ব্রহ্মোত্তর, মহাত্রাণ, দেবত্র, লাখেরাজ, সিকিমি তালুক, হুজুরি তালুক, নিমওসত তালুক, হাওলা, নিম হাওলা, ওসত নিম হাওলা, ইজারা, মিরাশ ইজারা, মিরাশ মালগুজার, কায়েম করজা, মেয়াদি করজা, রায়তি, জোত-এর কি শেষ আছে? খাজনা ফাঁকি দেওয়ার জন্য জমিদারদের ফন্দি। গত মাসেই যোগেন এক মামলা দায়ের করেছে। গৌরনদী থানার বীরমহল পরগনার সদর-জমা একশ বছর আগে ছিল দুইশ বায়াত্তর টাকা আট আনা নয় পাই। সেকালের হিশাবেও একটা পরগনার সদর-জমা মাত্র দুইশ বায়াত্তর টাকা হতে পারে? খোঁজ করতে-করতে দেখা গেল এটা ছিল একেবারে ঘন জঙ্গল—এমন জঙ্গল যার আশপাশেও কোনো মানুষের বসতি থাকা সম্ভব নয়। ওটাকে খাশ-জঙ্গলমহলই করে দেওয়া উচিত। কিন্তু বরিশালে কি আর ইচ্ছে করলেই খাশ করা যায়? শাহেবরাও পারবে না। আকবরের আইন-ই-আকবরিতে পরগনা বলে লিস্ট করা আছে। এখন শাহেবরা যখন সেটলমেন্ট শুরু করল, তখন সেটলমেন্ট অফিসারের হাত-পা বাঁধা। আরে, শাহেবেরও তো মালিক থাকে। তিন-চারশ বছর আগে যা পরগনা, সেটা এখন কী করে খাশ-জঙ্গলমহল হবে? বরং উল্টোটা হতে পারে। আগে জঙ্গল ছিল, এখন কায়েম হয়েছে।

অবিশ্যি, বরিশালে সবই হতে পারে—এখানকার কোনো এক রাজ্যের রাজাই আচমকা সামুদ্রিক বানে ভেসে গিয়েছিল—এই বাখরগঞ্জেই। তাহলে বীরনগরের আর জঙ্গলমহল হতে অসুবিধে কোথায়? অসুবিধে ছিল শাহেবের আইনে। তাকে তাহলে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। কিন্তু শাহেব মিছিমিছি তা করতে যাবে কেন? তার কী দায় পড়েছে? জমিদাররাও মানবে না—’এক পয়সা আদায় নেই, অথচ জমা আছে।’ তখন শাহেব তাদের বলল, ‘আচ্ছা তোমাদের জমা আমি বাড়াচ্ছি না, ঐ দুশ বাহাত্তরই থাকল।’ সেই বীরনগরের জমিদারির মালিক চৌধুরিরা আর নড়াইলের জমিদাররা। তাদের তো পোয়াবার, তারা মেয়াদি করজা দিয়ে প্রজাবসতি শুরু করল। মেয়াদি করজা মানে জমি ভাড়া দেওয়া। এখন নামমাত্র, খাজনা, পরে দেখা যাবে। আর, জমিদারের সুবিধে হল এই-যে, মেয়াদি করজার প্রজাকে জমি ছাড়তে বললেই ছাড়তে হবে—রাতে বললে সকালে, সকালে বললে সন্ধ্যায়। বার্ষিক জমা দুইশ বাহাত্তর টাকার জমিদারি দেখতে-না-দেখতে বছর দশেকে ডাগর হয়ে উঠতেই জমিদাররা ‘ খাজনা-বাড়ানো আর উচ্ছেদ শুরু করল—সেই ব্যবস্থাই চলছে এখন পর্যন্ত—জমিদারির বার্ষিক জমা দুইশ বাহাত্তর টাকাই অথচ প্রজাবৃদ্ধি, প্রজার খাজনা-বৃদ্ধি ও প্রজা-উচ্ছেদ চলছেই, দেড়শ বছর হতে চলল। যোগেনের এই মক্কেল এক বামুন। কাগজপত্র দেখতে-দেখতে দেখতে-দেখতে যোগেন বুঝতে পারল—মক্কেলের কথাটা সত্য হতে পারে যে তার পরবাবাকে (বাবার ঠাকুরদা) যখন ঐ গ্রামে বসানো হয় তখন তাকে কায়েমি কর্জাতেই বসানো হয়। অথচ এখন চার পুরুষ পরে এই বামুনকে মেয়াদি করজার দখলদার বলে জমি-ছাড়ার নোটিশ ধরিয়ে দিয়েছে।

উচ্ছেদ নোটিশ পেলে সকলেই তাই বলে। বামুন তার কথার কোনো প্রমাণ দিতে পারে না—কোনো প্রমাণই নয়, এমনকী তাঁদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কোনো বুড়োসড়ো কারো হদিশও দিতে পারে না, যাঁর মৌখিক সাক্ষ্যকে প্রমাণ বলে ধরা যায়। যোগেনের কিন্তু মনে হচ্ছিল—লোকটি বানিয়ে বলছে না কিন্তু কিছু কথা চেপে যাচ্ছে। বীরনগর বলেই যোগেনের মামলাটি নিয়ে এই ধারণাটি হল। অবশেষে, অনেকদিন ধরে জেরাজিজ্ঞাসার পর বামুন বলল—হ্যাঁ, তাদের আরো খানিকটা জমি ওখানেই আছে, সেটা ব্রহ্মত্র আর এটা কায়েমি করজা। যোগেন তাকে জিজ্ঞাসা করল—এই কথাটা লুকিয়ে রাখছিলেন কেন। বামুন বলে—ভয়ে বলিনি, যদি ব্রহ্মত্রটা চলে যায়। যোগেন বলেছিল ঐ বামুনকে—শোনেন, এক জমিরই কোনো বামুন-শুদ্দুর নাই, আপনার ঠাকুরদার বাপকে বামুন বলেই ঐ গ্রামে বসানো হয়েছিল যাতে গ্রামে বামুন আছে জেনে আরো লোকজন বসতি গাড়ার জোর পায়। তাই তো? এ প্রশ্নের জবাবে বামুন বলে, সেরকমই শুনে এসেছে। আপনাদের কি পুরোহিত বংশ? হ্যাঁ। আপনি কি পুরুতগিরি করেন, এখনো? কেউ ঠেকায় ডাকলে যাই। মানে, মরার সঙ্গে শ্মশানে? হ্যাঁ, তেমন হলে তো যেতেই হয়—তবে সবাই আমার কাছাকাছিই তো মরে না। তাহলে, যারা বেঁচে আছে তাদের পুজো-আচ্চা করে দেবেন। আপনার বড় ছেলের বয়েস কত? তা একুশ-বাইশ তো হল। সে কী করে? কিছু না। বিয়ে দিয়েছেন তো। হ্যাঁ, ছেলের বয়স হলে তো পুত্রবধূ ঘরে আনতেই হয়। ষাটের নাতিপুতিও হয়েছে? হ্যাঁ, দুই নাতি, সে তো সংসারের নিয়মে যা ঘটার ঘটছে। সে ঘটুক, আমি আপনার মামলা নিলাম, কিন্তু আপনি যদি পুরুতগিরি পুরোদমে না করে, গাঁয়ের লোকজন যদি আপনাদের ঠাকুরবাড়ি বা পুরুতবাড়ি বা বামুনবাড়ি বলে আলাদা করে না চেনে আর আপনার বড় ছেলেও যদি আপনার সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে পুজো না করে তাহলে মামলা ফেঁসে যাবে, ব্রাহ্মণের কাজ না করলে ব্রহ্মত্র ভোগ করবেন কী করে? বাড়িতে নারায়ণ আছেন? সে আছেন, কিন্তু, সেবা, মানে আমার স্ত্রী-ই, জলবাতাসা, আর কী! বুঝেছি, নারায়ণকে ভাল করে রাখুন, রোজ পুজো দিন শঙ্খঘণ্টা বাজিয়ে, আরতি দিন, লোকজনকে হালখাতা কী রোয়াগাড়া কী নতুন কেনাকাটায় নারায়ণকে সেবা দিতে বলুন, দশজন যদি বলে, আপনি বামুন, গ্রামে আপনার থাকা দরকার, তাহলেই তো হাকিম আপনাকে বামুন বলে মানবেন

মামলাটি যোগেন নিত না—ব্রহ্মত্র শুনলেই মাথায় রক্ত চড়ে যায়। গলায় একটা সুতো ঝোলালেই জমির খাজনা নাই। ঘি-আতপ চালটাও কিনতে হয় না, ধুতি-শাড়ি-গামছাও কিনতে হয় না। এমনকী বর্ষার ছাতিও কিনতে হয় না। সবই দানে কিংবা ভুজ্যিতে পাওয়া যায়।

পুরো পরগনার বছর-জমা দুইশ বাহাত্তর টাকা আট আনা নয় পাই, গত দেড়শ বছর ধরে, এই অবিশ্বাস্য কারণে যোগেন মামলাটি নিল। অথচ এটাই এখানকার ব্যবস্থা। যোগেন তার পিটিশনে বলেছে—কোর্টকে এ-বিষয়ে খুব পরিষ্কার মত দিতে হবে যে, যে-সামাজিক অবস্থায় ব্রাহ্মণকে এই মর্যাদা দেওয়া হয় সেটা কি বদলে গেছে? জমিদারির জমা-র যদি কোনো বৃদ্ধি না ঘটে থাকে, তাহলে সেই অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রজাস্বত্বের বদল কেন ঘটানো হবে—সে-প্রজা বামুনই হোক আর…।

যোগেন কাশীপুরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। কী নামডাক ছিল কাশীপুরের, যেন বরিশালের যাঁরা গৌরব হবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তাঁরা বরিশালে না থেকে এই মাইল কয়েক দূরে থাকবেন বলেই কাশীপুরের পত্তন হয়েছিল—মুখার্জি, চ্যাটার্জি, চক্রবর্তী, বসু, ঘোষদের জন্য। কলকাতা ইউনিভার্সিটি হতে-না-হতেই কাশীপুরে যেন এম এ-বি এ-র বান ডেকেছিল। কাশীপুর নিয়ে একটা মজার ছড়া আছে—’না-খাইয়্যা থাকা নাই কাশীপুরে/চাউল্যা সীতারাম বসু ঘুরে ফিরে।’ একজন নাকী ছিলেন ঐ নামে যিনি ঘুরে-ঘুরে নিরন্নদের চাল দিয়ে আসতেন। যারা ছিল, এখন বরিশালে সর্বস্ব, বরিশালই তাঁদের পক্ষে ছিল যথেষ্ট। তাঁদের যাঁরা ছেলেপুলে তারা বেশিরভাগই যেন বরিশাল ছেড়ে গেলই না, ঠিক ছেড়ে যাওয়া নয়। প্রত্যেকের সঙ্গেই বরিশালের যোগ আছে, তাদের বাড়িঘর আছে, তারা নিজেরাও অনেকে আছে। থাকবেই-বা না কেন। এত সব বড়-বড় জমিদারি দেখবে কারা? এক-একটা জমিদারির আয় কত! এই এক জমিদারির আয় থেকেই তো এক-একটি পরিবারের এমন সব উন্নতি। তার ভিতর আবার জমিদারের জমা-বন্দবস্তের কত হেরফের।

লাখুটিয়ার দিকে যাওয়ার রাস্তা বাঁদিকে বেরিয়ে গেছে। লাখুটিয়ার শিবমন্দিরের মাথাটা দেখা যাচ্ছে। এ-রাস্তা বানিয়েছিল লাখুটিয়ার জমিদার রাজচন্দ্র রায়—একটা খালও কাটিয়েছিল, এদিকে নাকী প্রথম ইটের বাড়ি তুলেছিল। যোগেনের মাথায় যে-কথাটি ঘুরছিল, তার মনে হল সে তার কিছু আন্দাজ পাচ্ছে। কাশীপুরের চ্যাটুজ্যেরা যদি কাশীপুর-বরিশাল রাস্তা তৈরি করায় বা খাল কাটায়, লাখুটিয়ার রায়চৌধুরিরা যদি লাখুটিয়া থেকে বরিশাল রাস্তা ও খাল কাটায়, শিকারপুরের রাস্তাটি বোধহয় সরকারি রাস্তা—সেটাও তো শুধুই শিকারপুরের রাস্তা, তাহলে যাকে হাইওয়ে বলে, যে-রাস্তায় রাস্তাটিই একটি নদীর মত বয়ে গেছে, সেই হাইওয়েটা তৈরি হবে কী করে? যোগেন যেন আর-একটা প্রশ্নের প্যাচের ভিতর ঢুকে পড়ছে, সে সেটা এড়িয়ে যেতে চায়। ভিতরে ঘেমে গেছে—মাঘের বাতাসেও। আজকে তার ভোট, আর আজ সকালেই তাকে বিশ মাইল সাইকেল দাবড়াতে হচ্ছে। তার ভাগ্য ঠিক হচ্ছে ৬৪টি পোলিং বুথে আর সে এক পরিত্যক্ত পুরনো রাস্তা বেয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে—দুই খেয়া পেরিয়ে বাটাজোড়ে পৌঁছুতে।

যোগেন যে একটু অভিমানী হয়ে ওঠে, এতেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়। এই পরিত্যক্ত পুরনো রাস্তাটি আর এই সাইকেল তো তাকে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতায়, বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায়। যদি তাকে সেখানে পৌঁছে দিতে না পারে, তাহলেও তো যাত্রাটা মিথ্যে হয়ে যাবে না। তার এই যাত্রার সঙ্গে বরিশালের কত দেশখ্যাত পরিবারের মানুষজনের ঐতিহাসিক সব যাত্রার কতটাই তফাত। লাখুটিয়ার রায়চৌধুরিরা তো বরিশালের গৌরব-রাখালচন্দ্ৰ, বিহারীলাল, গগনলাল, প্যারেলাল সকলেই যথাসময়ে ব্রাহ্ম হয়ে পৈতে ছেড়েছিল, বড় সরকারি চাকরি করেছে, বিলেত-ফেরত ডাক্তার-ব্যারিস্টার হয়েছে। তাদের ছেলেরাও বিলেতের জাহাজে উঠতে শুরু করেছে। এখন তাদের সকলের মিলিত আয় নিশ্চয়ই জমিদারির আয়ের চাইতে বেশি। কিন্তু সংসারটাও তো আর লাখুটিয়া-য় নেই, কত জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির কোনো সম্রাটের কর্মচারী ছিল নাকী লাখুটিয়া ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা রূপচন্দ্র। সেই কোনো সম্রাট নাকী রূপচন্দ্রের নাতিকে এই জমি, এমন বেশি কিছু নয়, লাখেরাজ দান করে। আইন-ই-আকবরির জোরে সেই খাজনাহীন জমিই লাখুটিয়া-বংশটাকে খাড়া করে দিল।

‘ওকালতি করলেই ভাল করত্যাম। আরগুমেন্টটা মাথায় খেলে ভাল’, ঘাম তেলতেলে মুখে একটু আত্মবিশ্বাসী হাসি হেসে নেয় যোগেন। হ্যাঁ। এতক্ষণে সে কথাটা গুছিয়ে নিতে পেরেছে যেন। তার কোনো বংশ নেই! তার কোনো লাখুটিয়া-বাটাজোড় নেই। তাকে কোনো বংশ খাড়া করতে হবে না। যদি সে জেতে ও এমএলএ হয় তাহলেও তাকে বরিশালেই ফিরতে হবে—আবার জেতার জন্য। যদি সে হারে—তাহলেও কিন্তু সে বরিশালের নেতা। সরল দত্ত যদি জেতে, তাহলেও সরল দত্ত বরিশালের নেতা না। এঁরা সবাই, অশ্বিনীকুমার থেকে সরল দত্ত, এই লাখুটিয়া-কাশীপুর-বাখরগঞ্জের—এই সব বামুন-কায়েত জমিদাররা তাদের বংশটিকে বরিশালে রেখে নিজেরা বেরিয়ে গিয়ে কেউ ফিরে এসেছে, কেউ মাঝেমধ্যে এসেছে, আর, ধরেই নেয়া যায় কেউই ভোলেনি। ভোলা বা না-ভোলা, ফেরা বা না-ফেরা, এ সব কিছুরই কর্তা সেই লোকটি একা। কিন্তু যদি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বিএ, বিএল জেতে তাহলে সেটা হবে বরিশালেরই জয়। বরিশাল তো আর বরিশাল ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। ব্যাটা নমো, ব্যাটা চণ্ডাল-এইডা তো আগে ভাবি নাই। আমার এই সাইকেলডা তো আমার রথ। সাইকেল তো আর গাড়োয়ান বা ড্রাইভার চালাব্যার পারে না। নিজেরে চালাইতে হয়। কয়ডা সাইকেল আছে এই পুরা তল্লাটে?

যোগেন পথ শেষ করে এনেছে প্রায়। তার ডাইনে-বাঁয়ে এখন মাধবপাশা-চাঁদপাশা-দেহের গতি—গল্পে ডুবসাঁতার দিতে পারে যোগেন, এত গল্প, আর তাদের কারো নামই যোগেন না, তাঁদের কারো বাহন সাইকেল না। চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণ মগদস্যুদের আক্রমণ হইতে তাঁহার প্রজাগণকে রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে মাধবপাশায় নতুন রাজধানী স্থাপন করে—কেমন চকিতে একটা গল্প হয়ে যায়। এর মধ্যে, এই গল্পে, যোগেন বলে কেউ তার সাইকেল নিয়ে ঢুকতে পারে? আবার, মণ্ডল পদবীতে?

গল্প রটনার একটা মস্ত সুবিধে আছে। যে-কাজ হারামজাগির কাজ, সে-কাজও কেমন বীরোচিত হয়ে যায়। ঐ মাধবপাশার জনৈক রাজপুত্র এক রামচন্দ্রের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিল যশোহরের রাজা প্রতাপ-আদিত্য। সে তো হয়ই—রাজপুত্রের সঙ্গে রাজকন্যা-ছাড়া আর-কার বিয়ে হবে? প্রতাপ-আদিত্য তার মেয়েকে শুধু সম্প্রদানই করল না, বিয়ের রাতেই মেয়েকে বিধবা করার যাবতীয় সুবন্দবস্ত সেরে রেখেছিল। উদ্দেশ্য চন্দ্রদ্বীপ দখল ও কায়স্থ সমাজের মাথা হওয়া। মেয়ে সেটা তার সদ্য স্বামীকে ফাঁস করে দিলে, একটা ঝুড়ির মধ্যে সেই রামচন্দ্রকে বসিয়ে, ঝুলিয়ে, নামিয়ে অন্ধকারে নদীর ওপর ভাসিয়ে রাখা এক ৬৪-দাঁড়ের কোষা নৌকোয় ভরে, বাঁচিয়ে দেয়া হয়। এমন-যে সদ্য-পরিণীতা প্রতাপ-আদিত্যের মেয়ে, বিন্দুমতী, সে কাশীযাত্রার ছলে মাধবপাশায় পালিয়ে এল। পালিয়ে এল তার বিয়ের বাকিটুকু সারব ও স্বামীর কাছে থাকব। অথচ তার স্বামীর আর দেখাই পেল না। বছরের পর বছর স্বামীর জন্য তার এই অপেক্ষায় গ্রামের লোকজন দু-দুটো হাট বসিয়ে নাম দিল, ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। সে কাছের এক গ্রাম, ‘সারসি’-তে গিয়েও ছিল। সেখানে তার স্বামীর জন্য অপেক্ষার সম্মানে গ্রামের লোকজন নিজেদের খন্তা-কোদাল দিয়ে কয়েক বছর ধরে একটা বিরাট দিঘি কেটে দিয়েছিল। সব কাজ সেরে রাতে দিঘি কাটত বলে সময়টা বেশি লাগে। দিঘি কাটার সময় ও কাটার পরে-পরে লোকের মুখে-মুখে প্রতাপ-আদিত্যের জামাই ও বৌঠাকরুনের স্বামীর কথা মনে রেখে ‘রামপগার’ নামটাই চলত। পরে, নাকী বৌঠাকরুনই বলে, সে কী করে স্বামীর নাম বলবে। তখন থেকে লোকে নাম নিতে হলে বলত ‘উয়ার পগার।’ বৌঠাকরুনের আর স্বামীর সঙ্গে দেখাই হয়নি—তবে সেও আর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যায়নি। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন দেহের গতি’-তে গিয়েও বসতি করল। বামুন-কায়েতদের গল্পের শেষ নেই। যে-রামচন্দ্রের সঙ্গে বৌঠাকরুনের দেখাই হল না সারাজীবন আর রামচন্দ্র-বৌঠাকরুনের বিয়েও সারা হল না—রামচন্দ্রকে তো বাসর থেকেই বৌঠাকরুন পালাবার পথ বলে ও ব্যবস্থা করে দিল, ফলে সম্প্রদান আর পাণিগ্রহণ হলেও বাসিবিয়ের সকালে সিঁদুরদান আর কনকাঞ্জলি হয়নি। বৌঠাকরুন সারাজীবন তাই সিঁথিতে সিঁদুর দেয়নি। ডানকানের পেছনে এক সিঁথি বের করে সিঁদুর ছোঁয়াত-সেই রামচন্দ্রের আর কোনো বৌয়ের ছেলে কীর্তিনারান নাকী ঢাকার নবাবের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে, নবাবের পাকশালার রান্নার গন্ধ টেনে ফেলে, আর সেই দোষে তাকে জাতিচ্যুত করা হয়—সম্পত্তি চলে যায় তার ভাগ্নেদের লাইনে।

মাধবপাশার ঐ রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপের পেছনে সাহাদের মন্দিরের চুড়ো দেখে যোগেনের মাথা একটু ঠান্ডা হয়—তাও এতক্ষণে একটা সাহা দেখা গেল। এরাও তো আবার সাহা বললে রেগে যায়। এরা তো পাঁচ-সাত পুরুষ আগেই রায়চৌধুরি হয়েছে। এখন কি আবার সাহা হওয়ার টাইম এসেছে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *