১৫. যা জিগ্যাইবেন তা সত্যি তো?
ক্ষমতার ধারণা মণ্ডলের আলাদা কিছু তৈরি হয়নি। মণ্ডল ক্ষমতার যে-চিরন্তন ধারণার মধ্যে জন্মেছে, মণ্ডলের পাড়ায়-গ্রামে ধুলোবালি নিয়ে খেলার সময় যে-চিরন্তন ধারণা মণ্ডল গায়ে-মাথায় মেখেছে, স্কুল-কলেজে পড়তে-পড়তে যে-চিরন্তন ধারণা মণ্ডলের জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার রাস্তা বাঁধাই করে রেখেছে—মণ্ডল কখনোই তার বাইরে যায়নি। বাইরে যাওয়ার তেমন কোনো ঝোঁকও তার ছিল না।
ক্ষমতার সেই ধারণা হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী জন্মান্তর, বর্ণভেদ, চতুর্বর্ণ, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ, শূদ্র-অশূদ্র, স্পৃশ্যতা-অস্পৃশ্যতা—এই উপাদানগুলি দিয়ে নিশ্ছিদ্র। ব্রাহ্মণ সহপাঠী তাকে অপমান করলে স্কুলে মণ্ডল তাকে পালটা আক্রমণ করেছে, বা কলেজে নমশূদ্র ছাত্ররা মণ্ডপে উঠে সরস্বতীকে অঞ্জলি দিতে পারবে না—এই ব্যবস্থার পালটা পুজো মণ্ডপ সংগঠিত করেছে, বা বরিশালের কালীবাড়িতে এক কথকঠাকুর নমশূদ্রদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করলে যোগেন বিক্ষোভ করেছে—এসব সত্ত্বেও যোগেন জ্ঞানবিশ্বাসের ক্ষেত্রে হিন্দু সংস্কারে আষ্টেপৃষ্ঠে আপাদমস্তক বাঁধা ছিল। অজ্ঞান ও অনভিজ্ঞ মানুষজন যেমন বাঁধা থাকে। সেই ধারণা অনুযায়ী ক্ষমতা বলতে বোঝায়—নমশূদ্র বলে যা-কিছু অপমান তাকে সইতে হয়েছে, তার এক ও একমাত্র প্রতিকার নিজেকে ভদ্রলোক করে তোলা। বামুন-কায়েত-বদ্যির ছেলে জন্মের আগেই ভদ্রলোক। নমো-র ছেলে মরার পরও নমো। সেটা বদলে দেয়ার কথা কখনো যোগেনের মাথায় আসেনি। তার মাথায় ভদ্রলোকদের সমতুল্যতা অর্জনই ছিল ক্ষমতা-অর্জনের একমাত্র অবলম্বন। সমতুল্যতা এতটাই অর্জন, যেন যোগেন প্রকাশ্যে নিজেকে চাঁড়াল বা নমো বলে ঠাট্টাও করতে পারে। মিড্লস্কুল পাস, আইএ–বিএ পাস, বিএল পাস, ওকালতি পেশা, ইংরেজি ও বাংলায় অনর্গল বক্তৃতা দেয়া, আইনের পড়াশুনো—বার লাইব্রেরিতে বসেই কারণ তার নিজের বই ছিল না, খুবই কম সময়ে বরিশাল কোর্টের মত খানদানি কোর্টে নাম করে ফেলা, দুটি-একটি কঠিন সিভিল মামলায় জিতে যাওয়া—বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত তো তাকে নাক-ডোবানো জল ঠেলেই এগতে হয়েছে, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বার হওয়া পর্যন্ত। কাল ১৪ মাঘ তার জন্মদিন। আজ তাই বাড়ি যাচ্ছে।
ক্ষমতা মানে হিন্দু উচ্চবর্ণের, বিশেষত ব্রাহ্মণের, ক্ষমতা। তাই ক্ষমতাবান হওয়ার একটাই অর্থ—হিন্দু হওয়া, উচ্চবর্ণ হওয়া ও ব্রাহ্মণ হওয়া। নিজেদের ব্রাহ্মণত্ব প্রতিষ্ঠাই তো নমশূদ্রদের মননচর্চার প্রধান বিষয়। সেই বিষয় নিয়েই প্রমাণপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে। বল্লাল সেনের ব্রহ্মণ্যবাদ যে-ব্রাহ্মণরা মেনে নেননি, তারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিল—আমরা নমব্রাহ্মণ না, আমরা নমশূদ্র। তারপর তারা জলময় বাংলার জলে আত্মগোপন করলেন। ইতিহাসের এমন ব্যাখ্যার আরো কত সংস্করণ হয়েছে। সমস্ত সংস্করণের উদ্দেশ্য একটা কথাই প্রমাণ করা—নমশূদ্ররা শূদ্র নয়। নমশূদ্ররা বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ—বল্লাল সেন কনৌজি ব্রাহ্মণদের পরামর্শে তাদের পতিত্ বলে শূদ্র করে দেন। নমশূদ্ররা চণ্ডাল নয়—কারণ চণ্ডালদের মত তারা গ্রামের বাইরে বাস করে না, চণ্ডালদের মত তারা ভাঙা মালসায় ভাত খায় না, খাওয়ার সময় জলপান চণ্ডালদের পক্ষে নিষিদ্ধ, নমশূদ্রদের পক্ষে নয়, নমশূদ্ররা চণ্ডালদের মত কেবল মরা মানুষের কাপড়চোপড়ই পরে না। কালো লোহার বালাও পরে না, নমশূদ্ররা অবৈদিক ব্রাহ্মণ, তাই নমশূদ্রদের উপবীত ধারণ—এই আত্মপরিচয় তো উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে এই ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত চলে এসেছে। হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ, তারকচন্দ্র, গোপাল সাধু, হরিবর, মহানন্দ—এঁরা নমশূদ্রদের আধ্যাত্মিক আভিজাত্য রক্ষা করে এসেছেন, ‘মতুয়া ধর্ম’ প্রবর্তন করেছেন। আর, এঁদের দেখে ও এঁদের ক্ষমতা-সংজ্ঞার সীমার মধ্যে, কুমুদবিহারী মল্লিক, শশিভূষণ ঠাকুর, রাধামোহন মণ্ডল, ভগবতী ঠাকুর, প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, মহানন্দ হালদার, মুকুন্দ মল্লিক ও আরো অনেকে উচ্চশিক্ষার শেষে বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি এনে নিজেদের হিন্দুউচ্চবর্ণের সমতুল্য করে তোলেন। ক্ষমতার এই সংজ্ঞা ও এই প্রসারের বাইরে কোথাও মণ্ডল ক্ষমতার উৎস খোঁজেনি। জানেও না। ব্যক্তিগত উচ্চাশায় ও পরিশ্রমে ভদ্রলোক বাঙালির মান্যতা পাওয়ার চাইতে পৃথক কোনো ক্ষমতাবোধ মণ্ডলের ছিল না। আইন-অমান্য ও অসহযোগের সময় তার বয়স পনের-ষোল ও পঁচিশ-ছাব্বিশ। সেসব কোনো আন্দোলনে সে দর্শক হিশেবেও ছিল না। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তার ভিতরে কখনোই এমন তীব্র হয়নি যে সে ইংরেজদের বিরোধিতা করবে। এই জ্ঞানতত্ত্বই তার ক্ষমতাতত্ত্বও বটে—একমাত্র ইংরেজই পারে তাকে ক্ষমতাবান করতে। বর্ণহিন্দুর সমতুল্যতা অর্জনের জন্যই সে এই ভোটে দাঁড়িয়েছিল, খুবই ছোট একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটাতে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিজের সমর্থন জোগাড় করে ফেলে। মণ্ডলের ভরসাও ছিল এই হিশেবের ওপর যে দুই জমিদার ভোট কাটাকুটি করলে তিন নম্বর প্রার্থী গলে যেতে পারে। কিন্তু এক জমিদার তো বসে পড়লেন। তাতেই তো যোগেনের বাড়া ভাতে ছাই। ঐ ভোটে দাঁড়ানোর কথাটুকু তোলার পর যাঁরা যোগেনকে দাঁড়া করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল, তারা কিছুতেই যোগেনকে নাম প্রত্যাহার করতে দিলেন না। যোগেন শেষ পর্যন্তও রাজি হয়নি। বড়জোর নাম প্রত্যাহার থেকে বিরত থেকেছে। এত নিকটজন ও বন্ধুদের যেন তাতে অসম্মান করা হত।
যাঁরা যোগেনকে ভোটে দাঁড়াতে বাধ্য করলেন, তাঁদের আবার সেইসব ভাষা বা যুক্তি জানা ছিল না, যেসব যুক্তি ও ভাষায় বোঝানো যায়—এই ভোট যারা দেবে তাদের ভিতর এই নতুন অধিকার ব্যবহার করে একটা বদল ঘটানোর ইচ্ছে কেমন শক্ত হয়ে উঠেছে। তারা, সেই যাঁরা যোগেনের সবচেয়ে প্রধান নেতা ও কর্মী হয়ে উঠলেন, তারাও জানতেন না, মানুষজন এমনকী পুরনো ধরনের রাজনীতিটাই বদলে দিতে চাইছেন। বেশিরভাগই তারা ইংরেজবিরোধী নন। কিন্তু তাঁদের বেশিরভাগই বিদ্রোহ করতে চাইছিল—পাটের দর ধানের দর পড়ে যাওয়ায়, মহাজনরা এক পয়সা দাদন না দেয়ায়, প্রতিটি জিনিশের দর বেড়ে ওঠায় আর খাজনার জন্য জমিদারদের-তালুকদারদের নিষ্ঠুরতা। মানুষ তো তার রোজকার বেঁচে থাকা দিয়েই বেঁচে থাকা বদলাবার শেষ জোরটা পায়।
মণ্ডল নিজের ভিতরে-ভিতরে টের পায়—নিজেকে ভদ্রলোক করার জন্য জীবনের প্রথম বত্রিশটা বছর যেমন দমবন্ধ করে বেঁচেছে, অভদ্রলোক হওয়ার জন্য তাকে সেইরকম রুদ্ধশ্বাস বাঁচা বাঁচতে হবে। আগের বাঁচার একটা মডেল ছিল—মণ্ডলের কাজ ছিল হোঁচট না খেয়ে, দম শেষ না করে সেই মডেল পর্যন্ত দৌড়নো। এর পরে যে আসল দৌড়টা বাকি আছে, তাও তো মণ্ডল জানত না। সে-দৌড়ের কোনো মডেল নেই। মণ্ডল ক্ষমতা চায়। তার আগে তাকে নিজের কাছে স্পষ্ট হতে হবে—ক্ষমতা বলতে সে কী বোঝে। তার সঙ্গেই তাকে এই জল, এই জঙ্গল, এই নৌকো, এই রাত্রি, এই মাঝিদের যেমন প্রত্যক্ষ করছে, ঠিক তেমন করেই তাকে প্রত্যক্ষ করতে হবে—কাদের সে ক্ষমতাশালী করতে চায়।
বড়মাঝি জিজ্ঞাসা করে, ‘কত্তা, বাঁ দিকের এই খাল দিয়্যা ঢুইকব?’
‘নাও চালাও তুমি আর ঢোকার রাস্তা জিগাও আমাগ?’
‘ছোট খালের রাস্তা তো, গুণ টাইনব্যার লাইগব। তাই জিগ্যাই। টাইম লাইগব। কিন্তু রাস্তাও তো আড়াই পোয়া কম। তাহালি কাটাকুটি কইরা দুই পোয়া রাস্তা তো বাঁইচবই।’
‘এতই যদি পাকা হিশাব, তাহালি আবার এত কথা কেন? পছন্দ হয় এই খালটায় বড় বেশি যাতায়াত নাই?’
‘থাইকলে কি আর জিগ্যাই?’
‘ক্যান নাই। রাস্তাখান অর্ধেক হইয়া যাইব—তবু যাতায়াত নাই ক্যান?’
‘ছোট খাল তো! কে জানে কুথায় কোন্ বড়গাছ আড়ে পাইড়্যা পথ আটকাইয়া থুইছে!’
‘সেই বড়গাছের ফাঁকফোকর দ্যাখবার পাও?’
‘রাইতের বেলা তো! ডাকাইতিও হইবার পারে।’
‘বাঃ বাঃ এই না অইলে কী আর মহাজন তোমারে নৌকা দ্যায়? প্রথমে কইল্যা, বড় গাছ আড় মাইর্যা পইড়্যা থাইকবার পারে, তার পরে কইল্যা ডাকাইতিও হওয়ার পারে। এমন একখান বাদশাহি সড়ক বানাইয়্যা নৌকায় প্যাসিঞ্জার তুইলছ?’
‘সেই বাদেই তো জিগ্যাইল্যাম। আপনারা কইলে যাব। আপনারা না কইলে যাইব না।’
‘তুমার ডাকাইতের ডরও নাই, পথ আটকের ডরও নাই।’
‘আমার ক্যান ডর থাইকব? পথ আটকা দেইখলে নাওয়ের মাথা ঘুরাইয়া আবার এইহানে আইসব।’
‘ও। পথ দুই পোয়া কমাইতে গিয়্যা সাড়ে তিন পোয়া বাড়াইয়্যা দিব্যার চাও?’
‘সে তো কত্তা, রাস্তা কমাব্যার চাইলে টাইম বাইড়্যা যাবারই পারে।’
‘বাঃ বাঃ। তোমার লগে আইস্যা বড় খুশি হইল্যাম মাঝি। নাও তো কতই থাহে। কিন্তু এমন পীরের বাণী আর কুথায় পাব? আর ডাকাইতি? ডাকাইতিরেও ডরাও না।’
‘ডাকাইতদের ডরনের কী আছে? ওরা তো আর মাঝিগুল্যাক মাইরবার জইন্য ডাকাইতি করে না। মাঝিরে মাইর্যা আর পাবেডা কী? ওরা তো প্যাসিঞ্জাররে লুট কাইরব্যার চায়। মাঝিরে মাইর্যা দিলে আর পরের খ্যাপ পাবে ক্যামনে?’
‘বাঃ বাঃ। এমন শাদা কথা কদ্দিন শুনি নাই! মাঝি, তুমি নি মাদ্রাসায় গিছ?’
‘বরিশালের পানি-ডাকাইতরা খালের পথে গাছ ফেইল্যা ডাকাইতি করে এই শাদা কথাখানে রহস্যডা কী যে মৌলবিশাহেবরে জিগাইতে হইব?’
‘বাঃ বাঃ বাঃ। গোরে যাওয়ার এমন একখান দুই পোয়া পথ বানাইয়া রাইখছ! না গিয়া পারি?’
কথাবার্তা হচ্ছিল মাঝি আর যোগেনের সঙ্গীদের মধ্যে। এতক্ষণ চুপ করে থেকে যোগেন বলে, ‘ছোটখাল দিয়াই চলেন। ডাকাইতরা তো সব নাওয়েই আছে।’
আরও খানিকটা বেয়ে বাঁয়ে ছোটখালে নৌকো ঢোকে। মাঝি তার ছেলেকে বলে, ‘বা-জান, তিন নম্বর বাঁকে পাড়ে নামিস। গোল্লা নিছস?’
যতক্ষণ খোলা নদী ছিল, ততক্ষণ আবছা একটা আলো ছিল। খোলা নদীর ওপর কখনো পুরো অন্ধকার হয় না। তারার আলো জলে প্রতিফলিত হয়ে আকাশের দিকে যায়। কুয়াশার মত একটা আলো ছড়িয়ে থাকে। খালে ঢুকতে-না-ঢুকতেই মনে হয় যেন গুহাপথের অন্ধকার কেটে যাওয়া হচ্ছে। বৈঠার আওয়াজ নেই। লগি ঠেলা হচ্ছে। কোথায় জল, কোথায় জঙ্গল, কোথায় বাঁক—কিছুই বোঝা যায় না। সবটাই অন্ধকারে লেপাপোঁছা।
কখন যে সেই তিন নম্বর বাঁক এসেছে আর ছোটমাঝি গুণের গোল্লা নিয়ে পাড়ে নেমে গেছে কেউ টেরই পায় না। বুঝতে পারে যখন বড়মাঝি গলার স্বর খুব একটা না তুলেও বলে, ‘এড্ডু জল ধইরা টান্ বাজান।’
গুণ টেনে নৌকো নিয়ে চলেছে ছোটমাঝি জঙ্গল ভেঙে। এতটা অন্ধকারে নৌকোর ভিতর বসেই এ ওকে দেখতে পাচ্ছে না, শুধু শাদা কাপড়ের আভাস পাচ্ছে আর ছোটমাঝি কী করে তার নিজের পায়ের তলায় কী আছে, তা দেখতে পাবে। তাই হয়ত বেশি বাঁয়ে সরে গেছে আর নৌকোটা পাড়ে ঠেকে যাচ্ছে একটু-আধটু। ছোট খাল বলেই খালের মাঝখান দিয়ে বাইতে হয়। গুণটানার কথা তো বড়মাঝি বলেছিল—তাহলে যোগেনরা রাজি হল কেন? তাড়াতাড়ি মৈস্তারকান্দি পৌঁছুতে পারবে বলে? কী হত দেরি হলে? নাকী বড়মাঝির ডাকাতিটাকাতির গল্পে একটু ভুলেই গিয়েছিল তারা যে ছোটমাঝিকে কতটা অন্ধকারে কতটা অজানা জঙ্গল পেরতে হবে এই নৌকোটাকে গুণ টেনে নিয়ে যেতে।
ভুলে যাওয়ার কৈফিয়ত দেয়া যায় কিন্তু কৈফিয়ত চাইছে কে? বড়মাঝি বা ছোটমাঝি মাথায়ও আসেনি যে এটা কোনো একটা বিশেষ রকমের কাজ। গুণ টানতে হলে সেখানে কী করে বৈঠা বাইবে? একটা অনিশ্চিত গভীরতার খাল রাতে পেরতে হলে গুণ টানতেই হবে, দিনে না-হয় দেখে শুনে বুঝে কোথাও গুণ কোথাও লগি করে এগনো যায়। কোন্টাতে খাটনি বেশি সে-মাপের কোনো বোধই তো বড়মাঝি-ছোটমাঝির তৈরিই হয়নি। যে-কাজে যে-খাটনি সেটা তো লাগবেই। না হলে কাজটাই তো শেষ হবে না। পায়ে হেঁটে জঙ্গল ভেদ করে যাওয়ার ভিতরে বিশেষ কোনো বিপদের ধারণাও কি মাঝিদের আছে? বড়জোর তারা বুঝে নেয়, এই কাজটি করা যাবে না। পরিবারের খাওয়া-দাওয়া আর কামাইয়ের হিশেবে যোগেনের আর এই মাঝিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবু তো যোগেন পাঞ্জাবি-ধুতি পরে, ভদ্রলোকদের মত ওকালতি করে। তার সঙ্গীদের তো মাঝিদের থেকে কোনো বিচ্ছেদই ঘটেনি। তাই তাদেরও মনে আসে না—এই অন্ধকারে গুণ টেনে নৌকো নিয়ে যাওয়ার মধ্যে বিশেষ কী আছে? যোগেন পড়াশুনো করে, নানা কষ্টে দিন কাটিয়ে, চাঁদসি থেকে প্রুফ-দেখা যা পায় তাতেই পয়সা কামিয়ে ভদ্রলোক হতে পেরেছে। সেই হতে-পারায় শারীরিক কষ্টও কম না। কিন্তু সেই কষ্ট দিয়েও শ্রমের ও কর্মের এই অনিবার্যতা ঠাহর করাই যেত না। যোগেনের বাল্যে কৈশোরে এমন শ্রম তাকেও করতে হয়েছে, যে-শ্রম থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় ছিল না। তার বাপ-খুড়ো-দাদাদের, তার মা-খুড়িদের এমন শ্রম করতে হয় রোজ—একটুখানি জমিতে চাষ ফলাতে, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ছুতোরগিরি করতে। সেই শ্রম থেকে যোগেন বিযুক্ত বলেই সে বাইরে থেকে মাঝিদের শ্রমের ভিতর ঢুকতে পারে। এরপর এই শ্রমের মজুরি নিঃশেষে মহাজনকে কিস্তি দিতে হবে। কোনো হিশেবনিকেশ নেই। মহাজন যদি নিজে কোনো হিশেব দেয়, সেটা ঠিক কী বেঠিক তা বুঝবে কী করে মাঝিরা। নিষ্কাম ধর্ম অর্জুনের মাথায় ঢোকাতে কৃষ্ণকে পুরো একটা ‘গীতা’ বলতে হল। অর্জুনের মত বীর ও রাজপুত্রকে বীরত্বের ও রাজত্বের যুক্তি ছাড়া যুদ্ধে নামানো যাবে কী করে। কৃষ্ণ ক্ষমতাকেন্দ্র সম্পর্কে অর্জুনের ধারণাটুকুকে মাত্র সরিয়ে দিলেন। অর্জুন ভেবেছিল, ক্ষমতার কেন্দ্র তিনিই, তাই ইচ্ছে করলে যুদ্ধ করতেও পারেন, নাও পারেন। ক্ষমতা যাঁর তিনিই তো প্রয়োগকর্তা। কৃষ্ণ অর্জুনকে তত্ত্ব বোঝালেন—অকাম কর্মের তত্ত্ব। তুমি ক্ষমতার আধার কিন্তু প্রয়োগকর্তা তো আমি, ‘আত্মন্যেবাত্মনা’। কৃষ্ণের এই ‘আমি’র প্যাঁচ যে কী প্যাঁচ! মণ্ডলের সম্পূর্ণ ‘গীতা’ মুখস্থ—এক পুরুতের সঙ্গে ঝগড়ার ফল, ল-কলেজে। পুরোহিত বলেছিল, সরস্বতী পূজার গীতাপাঠ সে করবে না, কারণ, ছাত্রদের মধ্যে অনেক শূদ্র ও যবন ছাত্র আছে, ‘গীতা’-শোনার অধিকার যাদের নেই। যোগেন দু-দিন পুরো ‘গীতা’ মুখস্থ করে মণ্ডপের বাইরে বসে তার গুরুগম্ভীর স্বরে ‘গীতা’ বলতে লাগল। একটা ছোট কাগজে লাল কালিতে মোটা করে, ‘গীতা ফর আনটাচেব্ল হিন্দুস অ্যান্ড মুসলিমস অনলি।’ তার মুখস্থের বাহাদুরি দেখতে তাকে ঘিরে ভিড় জমে গিয়েছিল।
কৃষ্ণ অত তত্ত্ব না বলে অর্জুনকে এই অন্ধকারে এই জঙ্গলে গুণ টানতে পাঠালেই অর্জুন বুঝে যেতেন, তলোয়ার দিয়ে কী কাটা যায় না, আগুনে কী পোড়ানো যায় না, বাতাসে কী শোষা যায় না। শ্রম। ছোটমাঝির শ্রম।
যোগেন শুনতে পায়—জলে হুমড়ি খাওয়ার আওয়াজ। ছোটমাঝি কোনো জলের গর্তে পড়ে গেছে? নৌকো চলছে। যোগেন শুনতে পায়—খানিকটা মাটি ভেঙে জলে পড়ল। ছোটমাঝি কি সামলে নিয়েছে? যোগেন কিছু শুকনো ডাল ভাঙার আওয়াজ পায়। ছোটমাঝি কি শীতের শুকনো জঙ্গলে আটকে গেছে? নৌকো চলছে। যোগেন একটা হাসি শুনতে পায় কিশোর কণ্ঠে। ছোটমাঝি কি নিজের কোনো চমককে উড়িয়ে দিচ্ছে? নৌকো চলছে। যেন নিজের বেগে। কে দেখছে সেই কিশোর মুসলমানকে যে এই অন্ধকারের মজা খালে স্রোতের টান বইয়ে দিচ্ছে? বড়মাঝি বলে ওঠে, ‘কী জিগ্যাইবেন কইছিল য্যান মেম্বারমশায়? সইত্য কইতে লাগব। জিগ্যাইলেন না তো?’
‘তোমার জিগ্যানোর জব তো অ্যাহনো খুঁইজ্যা পাই নাই। যা জিগ্যাব সেইডা সত্যি না মিথ্যা?’
‘আমি কি আপনারে বেদনা দিলাম, মণ্ডলমশায়?’
‘কী যে কও। বেদনা ছাড়া কিছু জানা যায়?’ তারপর সেই অদৃশ্য অন্ধকারেই বলে উঠল, ‘বেদাম্যহম্ তং পুরুষং মহান্তম’। মিয়াশাহেব বলে ওঠে, ‘আরে, মণ্ডলমশায় তো দেহি বামুন ঠাউরের নাগাল মন্তর পাইড়ব্যার পারেন?
যোগেন তার বুকখোলা হাসিতে অন্ধকার ভরে দেয়, ‘এমনই বামুন যার মন্ত্র বুইঝতে পারে এক মোছলারা।’
একেবারে ছেলেবেলা থেকে যাত্রাগান ও পালাগান গাওয়ার ফলে যোগেনের ভিতরে-ভিতরে দৃশ্যভাগ-অঙ্কভাগের একটা ঝোঁক আছে। যোগেন যেন তেমন একটা ভাগাভাগির মধ্যে ঢুকছিল। কাল তার জন্মদিন। ছোটমাঝি এই অন্ধকারে তাকে জন্মদিনে পৌঁছে দিচ্ছে। সেই নতুন জন্মদিন থেকে যোগেন নতুন যাত্রায় বেরবে—ক্ষমতার ধারণা তৈরি করতে, ক্ষমতার প্রয়োগপদ্ধতি বুঝে নিতে। এই হাসিতে সে নিজেকে সেই গোপন নাটকীয়তা থেকে ছাড়িয়ে নিল।
মৈস্তারকান্দির খালের ঘাটে নৌকো ভেড়াতেই মিয়াশাহেব বলে ওঠে, ‘আমরা আর নাইমল্যাম না মণ্ডলমশায়। ফিইরতে হবে নে এতডা জল?’
যোগেন একেবারে রে-রে করে ওঠে, ‘আরে মিয়াশাহেব। আমারে কি আপনারা আউল-বাউল ঠ্যাহরাইলেন নাকী—ঘরবাড়ি নাই, বাপ-মা নাই, কুটুমকাটাম নাই! আপনারা আমার বাড়ি না গেলে তো বাপের, দুই খুড়ার, দুই খুড়ির, দুই দাদার, দুই বৌদিদির চ্যালাকাঠের মারন আমারে একা খাইতে হব। বাড়িতে আইস্য ভাইঙ্গ্যা তুমি মেম্বার হইছ হারামজাদা! চলেন, চলেন।’ দুই মাঝি ও সঙ্গীদের নিয়ে মণ্ডল বাড়ির পথ ধরল।
