২৮. একটা কোরাস তৈরি হওয়ার আগেই ভেঙে গেল
এটা সেই গোলটেবিল যে-আলোচনায় কংগ্রেস যাবে কী যাবে না ঠিক করতে ১৯৩১-এর ২৩ মার্চ করাচিতে কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হল আর ঐ দিনই রাতে ভগৎ সিং-রাজগুরু-সুখদেবের ফাঁসি হয়ে গেল।
গান্ধীকে নিয়ে ট্রেন করাচি স্টেশনে ঢুকতেই সমবেত মানুষের হাহাকার উঠল, ‘গান্ধী—দুর হঠো’, ‘গান্ধীবাদ বরবাদ’।
মাত্র আঠার দিন আগে গান্ধী-আরুইন চুক্তি একেবারে হঠাৎ সই হয়েছে। গান্ধীজিই ভাইসরয় আরুইনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, এক চিঠি লিখে, ১৭ ফেব্রুয়ারি। সে-চুক্তিতে আইন-অমান্য করে যাঁরা জেলে ছিলেন, তাঁদের কারো কারো মুক্তি জুটল, কিন্তু ভগৎ সিংদের ফাঁসি রদের তেমন কোনো চেষ্টাই হল না। সরকার পুলিশি অত্যাচারের কোনো তদন্ত করতে বা গুজরাটের রায়তদের বাজেয়াপ্ত জমি ফেরত দিতে রাজি হল না। করাচি কংগ্রেস তবু গান্ধীজিকে বলল–সেপ্টেম্বরের গোলটেবিলে যেতে ও কংগ্রেসের একক প্রতিনিধি হয়ে যেতে।
গান্ধী-আরুইন চুক্তির এই একটিই সুফল। ব্রিটিশ সম্রাটের প্রতিনিধি গান্ধীকে তাঁর সমমর্যাদার একমাত্র ভারতীয় নেতা বলে স্বীকৃতি দিলেন। বিলেত থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র গান্ধীকে এই স্বীকৃতি দেয়ায় আরুইনের ওপর চটে গেল।
এদিকে গান্ধীর অহিংসার বিরুদ্ধে বাংলার শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যুবকদের মধ্যে সশস্ত্র আক্রমণে ব্রিটিশ শাসনকে পঙ্গু করে দেয়ার এক বিপরীত উপায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ৯ জন শাহেব খুন হলেন—তাদের দু-জন জিলা ম্যাজিস্ট্রেট। ত্রিপুরার জিলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে খুন করল স্কুলের দুই ছাত্রী।
গান্ধীজি করাচিতে জামায়েৎ-উল-উলেমা-হিন্দ-এর মিটিঙে বললেন,
‘আমার একার কথা ধরলে মুসলমানরা যা চাইছেন তার সবই তাঁদের দিতে আমার কোনো বাধা নেই।’ করাচি থেকে গান্ধীজি দিল্লি এলে সেখানে তখন ‘নিখিল ভারত মুসলিম সম্মিলন’ চলছে—তাঁরা চান তাঁদের জন্য আলাদা ভোটারলিস্ট, মানে, মুসলমানরাই কেবল মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে। দিল্লি থেকে গান্ধীজি এক বিবৃতি দিয়ে জানালেন, ‘হিন্দু-মুসলমান সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে—মুসলিম ও শিখরা একমত হয়ে যা চাইবে, তাই তাদের দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা। হিন্দুরা কী চায়, তা আমি জানি না, আমি তাঁদের কাছে তাঁদের সূত্র কী জানতে চেয়েছি। ধর্মের ভিত্তিতে এমন প্রস্তাবিত কোনো সমাধানের সঙ্গে আমি নিজেকে জড়াতে চাই না।’ শাহেবদের বাণিজ্যিক সংগঠনের বার্ষিক অধিবেশন উদ্বোধন করে তিনি বললেন, ‘আপনারা যে এদেশে আমাদের সমান অধিকার চাইছেন, তাতে আমরা এমন চমকে-চমকে উঠি কেন। কেন আমাদের মনে হয়—ইয়োরোপীয়দের এই দাবিটা স্বাভাবিক তো নয়ই, আইনসঙ্গতও নয়। ইয়োরোপিয়ানদের জন্য নিশ্চয়ই ইয়োরোপীয় সভ্যতার দরকার আছে কিন্তু তা নকল করতে গেলে ভারতের সর্বনাশ। আপনারা ভারতে থাকুন, কিন্তু ভারতীয় হয়ে থাকুন। ৭ এপ্রিল এই কথা বলে গান্ধী পরদিনই শিখ-লিগ মিটিঙের জন্য দিল্লি থেকে অমৃতসর গেলেন। সেখানে মাস্টার তারা সিং জানালেন, কোনো একটি ধর্মের দাবি ঠেকানোর একমাত্র উপায় একই ওজনের পালটা দাবি জানানো। গান্ধীজি তাঁদের বললেন, ‘কোনো একটি ধর্মসম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে ভয়টা কী? যে-মুহূর্তে আমাদের দু-জনের মধ্যে বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষকে নাক ঢোকানোর চেষ্টা আটকাতে চাইব, সেই মুহূর্তে আত্মরক্ষার স্বার্থে দ্বিতীয় জনের সব দাবি মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। এটা নিশ্চয়ই চিরকালের জন্য সর্বোত্তম সমাধান নয়, কিন্তু নিশ্চয়ই এখনকার পক্ষে একমাত্র সময়োপযোগী সমাধান।’ অমৃতসর থেকে আমেদাবাদ গিয়ে গুজরাট বিদ্যাপীঠের সমাবর্তনে বললেন, ‘আশা তো করছি, এখনকার মত অস্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছুতে পারলে, তার ওপর ভর দিয়ে স্থায়ী কোনো সমাধানও পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তো আর যুদ্ধ করা যায় না, অন্তত আমি পারব না। আর দেখেশুনে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে প্রকৃতি আমাদের ওপর বিরূপ।’ আমেদাবাদ থেকে বোম্বাইয়ে এসেছিলেন তিনি বিদায়ী ভাইসরয় লর্ড আরুইনকে বিদায় জানাতে। সেই সম্ভাষণ থেকেই গুজরাটের বিপন্ন কৃষকদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায়ের জন্য সরকারি অত্যাচারের কথা এসে গেল। ৩০ এপ্রিল তাঁর কাগজে ‘গুজরাটের কৃষক’ নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধের শেষে বলে দিলেন, ‘গান্ধী-আরুইন চুক্তিরক্ষায় আমার যা করণীয় আমি করে যাচ্ছি বটে, তবে, আমি বেশ বুঝতে পারছি দিগন্তে দুর্যোগ জমছে আর আমি যে তা ঠেকিয়ে রাখতে পারব না তাও গোপন করে যাওয়া ঠিক নয়।’ এক ব্রিটিশ কাগজ কেব্ল্ পাঠিয়ে গান্ধীজির কাছে জানতে চাইল, ‘আপনি কি ইংল্যান্ড আসছেন।’ গান্ধীজি সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাঠালেন, ‘আমার যাওয়া কতকগুলি অবস্থার ওপর নির্ভর করছে। তার ভিতর দুটো হল—গান্ধী-আরুইন চুক্তি সরকার মানছে কী না ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কোনো মীমাংসা হল কী না।’ সিমলাতেই এক ছোট্ট জনসভায় ১৪ মে গান্ধীজি বললেন, ‘যুক্তি দিয়ে, বুঝিয়ে, দরকষাকষি করেও স্বরাজ যদি না-ই পাওয়া যায়, তাহলে আবার আমাদের দুঃখযন্ত্রণা আত্মত্যাগের পথে যেতে হবে।’ ব্রিটিশ সরকার ও লর্ড উইলিংডনকে খুব চাপা একটা হুমকি দেয়া হল এই কয়েকটি কথায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ও করাচি কংগ্রেসে, গোলটেবিল বৈঠকে গান্ধীজির প্রতিনিধিত্বে কংগ্রেসের যোগদান পাকা হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাঁদের মত করে তৈরি হচ্ছিলেন। কংগ্রেস ও গান্ধী বৈঠকে এলে, সে-বৈঠকের নৈতিকমূল্য বেড়ে যাবে। সেই মূল্যবৃদ্ধির সুদ যাতে কংগ্রেস ও গান্ধী আদায় করতে না পারে—সেই উদ্দেশ্যে ভবিষ্যৎ ভারতের ভাগীদার বলে ভাইসরয় সব গোষ্ঠী ও নেতাকেই দেদার নিমন্ত্রণ ছড়াচ্ছিলেন। লর্ড উইলিংডন-ও তাঁর ব্যবহারে বুঝিয়ে দিলেন, গান্ধীও অন্যান্য নেতার মতই একজন। তাই গান্ধী এইটুকুই শুধু জানালেন—গোলটেবিলে কংগ্রেস যাবে বললেও ও কংগ্রেসের হয়ে গান্ধীই যাবেন ঠিক হলেও—কোনো ঠিকই তো আর অপরিবর্তনীয় নয়। গোলটেবিলে কংগ্রেসের চেয়ার খালি থাকতেও পারে বা সে-চেয়ারে গান্ধীজি নাও থাকতে পারেন। এটা এখন ব্রিটিশ সরকার সাব্যস্ত করুক—তারা কি গান্ধীর প্রতিনিধিত্বে কংগ্রেসকে চায়? ৯ জুন বোম্বাইয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি আবারও গান্ধীকে গোলটেবিলে পাঠাবার প্রস্তাব নিলে তিনি ১৮ জুন ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’য় এক প্রবন্ধ লিখে বিস্ফোরণ ঘটালেন। তাতে তিনি বলে দিলেন, গোলটেবিলে কংগ্রেসের যাওয়া তিনি সমর্থন করেন না, কিন্তু ওয়ার্কিং কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠদের তিনি নিজের মতে আনতে পারেননি তাই একজন গণতন্ত্রী হিশেবে তিনি সে-সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। কিন্তু গোলটেবিলে যাওয়া মানে স্বাধীনতা আন্দোলন থামিয়ে দেয়া নয়। কংগ্রেস চায় স্বাধীনতার নির্যাস, স্বাধীনতার ছলনা নয়। সেই ছলনার জন্য যদিবা অপেক্ষা করা যায়, স্বাধীনতার নির্যাসের জন্য তো আর অপেক্ষা করা যায় না। সেই নির্যাস মুঢ়-ম্লান কোটি-কোটি মানুষের জীবনের মৃতসঞ্জীবনী। গান্ধীজি জানিয়ে দিলেন, ‘প্রকৃত ক্ষমতা পেলে কি আমি তা ফিরিয়ে দেব? একেবারেই না। তেমন কিছুর জন্য তো আমি একেবারে প্রাণপণ চেষ্টা করব। কিন্তু যদি দরকার হয়, তার জন্য অপেক্ষাও আমি করতে পারি। সেটুকু আক্কেল ও ধৈর্য অন্তত আমার আছে।’
গান্ধীজি ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে এইরকম সব দরকষাকষি চলার মাঝখানে জুলাইয়ের শেষে সশস্ত্র বিপ্লবীরা বোম্বাইয়ের অস্থায়ী গভর্নর স্যার অর্নেস্ট হটসনকে খুনের চেষ্টা করে কিন্তু তিনি বেঁচে যান। পাঁচদিন পর আলিপুরের জেলাজজ বিপ্লবীদের গুলিতে খুন হন। যাবেন কি যাবেন না বলে যে জায়গা গান্ধীজি তৈরি করে তুলতে পেরেছিলেন তাতে গান্ধীজিকে পিছুতে হল। মাত্র সপ্তাহ দেড়েকের মধ্যেই তিনি তাঁর পুরনো জায়গায় ফিরে গিয়ে ১১ আগস্ট ভাইসরয়কে টেলিগ্রামে জানালেন, ‘উত্তরপ্রদেশ, সীমান্তপ্রদেশ ও অন্যান্য প্রদেশে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর যে-অত্যাচার করছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে [গান্ধী-আরুইন] চুক্তি সরকারের দিক থেকে আর কার্যকর নেই। এ থেকে এই কথাটিই বেরিয়ে আসছে—যে আমার কিছুতেই লন্ডনে যাওয়া উচিত নয়।’ ১৩ আগস্ট ভাইসরয় জানালেন, ‘এসব কারণ আমার কাছেও গ্রাহ্য নয়। সরকারের নীতি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার বিভ্রান্তি থেকেই আপনি এরকম ভাবছেন।’ গান্ধীজি সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘[ গান্ধী-আরুইন] চুক্তি সম্পর্কে আপনার ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এতটাই মৌলিক যে আমাদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কিন্তু আমাদের পক্ষে চূড়ান্ত নির্দেশ, এ-কথা আপনাকে একবার জানানো দরকার।’ আইন অমান্য যে-কোনো সময়ই শুরু হতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকে পৌঁছুতে ১৪ আগস্ট একদল জাহাজে উঠল, আর-এক দল কংগ্রেসি, টিকিট ফেরত দিলেন। গান্ধী ভাইসরয়কে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের পক্ষে কি [গান্ধী-আরুইন] চুক্তি মেনে চলা আর সম্ভব নয়? অথবা কংগ্রেস গোলটেবিলে না গেলেও এ-চুক্তি কার্যকর থাকবে?’ ভাইসরয়ের জবাব না পেয়ে ২০ আগস্ট গান্ধীজি ‘ইয়ং ইন্ডিয়ায়’ লিখলেন, ‘একটি ভাঙা চুক্তির গল্প’, আর একটা সম্পাদকীয়, ‘আসল কথা’। ভাইসরয় ছিলেন কলকাতায়। এই লেখাদুটি পড়ে তিনি সিমলার দিকে ছুটলেন। ১৪ আগস্টে পাঠানো গান্ধীজির যে-চিঠির উত্তরই দেননি ভাইসরয়, তারই উত্তরে গান্ধীজিকে জানালেন, ‘কংগ্রেস ও গান্ধীজি গোলটেবিলে না গেলে [গান্ধী-আরুইন] চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। সরকার বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে যে-স্পেশ্যাল মেজার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন সে-বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো সতর্ক হবেন।’ উইলিংডন এক পা পিছু হটলেন। গান্ধীজি টেলিগ্রামে জানালেন, দাঁড়ান আসছি, মুখোমুখি কথা হবে। হল, সিমলায়। ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় গান্ধীর সঙ্গে উইলিংডনের ‘দ্বিতীয়’ যৌথ বিবৃতি বেরল। তাতে কংগ্রেসও নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখল—’সরকারি ব্যবস্থায় কংগ্রেস যদি মনে করে, আইন-অমান্য আন্দোলন স্থগিত রাখা হলেও আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যক্ষ কোনো আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তাহলে কংগ্রেস সেই সর্বোচ্চ কর্তব্য পালন করতে দ্বিধা করবে না।’ ওয়েলিংডনের সঙ্গে সমঝোতায় এই কথাগুলি লেখা হল। ২৭ আগস্ট সন্ধে ৭-টায় এই সমঝোতায় সই পড়ল। এস. এস. রাজপুতানা জাহাজ বোম্বাই থেকে ছাড়বে ২৯ আগস্ট। জাহাজ ধরিয়ে দেয়ার জন্য সিমলা থেকে কালকা একটা স্পেশ্যাল ট্রেন গান্ধী ও অন্যান্যদের নিয়ে গেল। আর তারপর কালকা থেকে বোম্বাই পৌঁছুবার রেলপথে অন্যান্য সব গাড়ি থামিয়ে রেখে গান্ধীর গাড়ি ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা হল।
গোলটেবিলে ১৩ নভেম্বর ১৯৩১-এ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডোনাল্ড ‘সংখ্যালঘুদের চুক্তি ও অনুন্নত শ্রেণির দাবিপত্র’ সরকারিভাবে মেনে নেয়ার কথা বললে গান্ধীজি প্রশ্ন তুললেন, ‘…সংখ্যালঘু সমস্যা মেটানোর জন্যই কি ৬০০০ মাইল দূর থেকে আমাদের নিয়ে আসা হয়েছে?…আর, সমস্ত রকমের সাম্প্রদায়িক বা অন্য সব গোষ্ঠীকে ভারতের জাতীয়তার ধারণার ওপর তীব্রতম আক্রমণের সময় ও সুযোগ দেয়া হয়েছে? আমাদের কাজ তো ছিল সংবিধান তৈরি করা নিয়ে কথা বলা। স্যার হিউবার্ট কার [এক ব্রিটিশ শিল্পপতি] ও তাঁর বন্ধুদের সংখ্যালঘু পরিকল্পনা নিয়ে এত খুশি হওয়ার কারণ আমি বুঝি। আমার মতে, তাঁরা মড়ির পাশে অপেক্ষায় বসেছিলেন ও এখন সেই মড়িটাকে ছেঁড়াছেঁড়ি করার কাজে মেতেছেন। অন্যান্য সংখ্যালঘুরা যেসব দাবিদাওয়া তুলেছেন, সেগুলো অনেকটা বুঝতে পেরেছি কিন্তু সবচেয়ে নিষ্ঠুর আঘাত এসেছে ভারতের অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর নাম করে যে-দাবিগুলি তোলা হল, সেই দাবিগুলি থেকে।…ভারতের স্বাধীনতার জন্য অস্পৃশ্যদের জীবনমরণের প্রশ্ন আমি বেচে দিতে পারি না। আমি এই দাবি করি যে আমার এই শরীর দিয়ে আমি ভারতের অগণন অস্পৃশ্যের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমি দাবি করছি এই বিষয় নিয়ে কোনো গণভোটে যেতেও আমি তৈরি। কারণ তেমন ভোটে আমিই সবচেয়ে বেশি ভোট পাব। আমাদের আদমসুমারিতে ও দলিলপত্রে অস্পৃশ্যদের চিরকালের জন্য ‘অস্পৃশ্য’ বলে বর্ণনা করতে আমরা চাই না। এটা যদি আমাকে একা ঠেকাতে হয়, আমি একাই ঠেকাব। …৩৫ কোটি মানুষের এই জাতির হাতে আততায়ীর ছুরির কোনো দরকার নেই, বিষের বাটিরও কোনো দরকার নেই, তরবারির দরকার নেই, বর্শার দরকার নেই, বুলেটের দরকার নেই। সেই জাতির শুধু দরকার নিজের কণ্ঠস্বরে ‘না’ বলার আকাঙ্ক্ষা। সেই জাতি আজ সেই ‘না’ বলতে শিখেছে।’ গান্ধীজি কোনো সমাধান নিয়ে আসতে পারলেন না। কিন্তু তিনি তাঁর প্রত্যাখ্যানকে শক্তি হিশেবে দেখাতে পারলেন। ফেরার পথে ফ্রান্সে তিনি রোমাঁ রোলাঁর সঙ্গে দেখা করে রোলাঁর হাতে বিঠোভেন শুনতে চাইলেন। ১৯৩১-এর গোলটেবিলের শুরুতেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছিলেন, আপনারা যদি একমত হতে না পারেন, আমরা রোয়েদাদ করব। গোলটেবিল পারল না, ম্যাকডোনাল্ড ‘কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষণা করলেন ১৯৩২-এর আগস্টে—পাঁচটি প্রদেশ মুসলিম প্রধান, মুসলমান ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসন, সংরক্ষিত আসনে শুধু তারাই ভোট দেবে যারা সংরক্ষিত আসনের [ধর্মাবলম্বী পৃথক নির্বাচন]। গান্ধীজি গোলটেবিলের শেষ বৈঠকে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার প্রাণ দিয়েও আমি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য ‘পৃথক নির্বাচন’ রুখব।’ ইয়েরভাদা জেলখানা থেকে তিনি ভাইসরয়কে নোটিশ দিলেন, তিনি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০ সেপ্টেম্বর থেকে জেলখানাতে আমরণ অনশন শুরু করলেন।
আর, শুরু হল, তাঁর অনশনকে ঘিরে এক মড়ির অপেক্ষা, তাদের, যারা শুধু মৃত মাংস খায়। ভারতসচিব, ভাইসরয় ও তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ‘একান্ত গোপন’ বার্তা-বিনিময়ে গান্ধীজিকে ঠগ, মিথ্যুক ও প্রতারক বললেন, ‘ও নিশ্চয়ই গোপনে গ্লুকোজ খাচ্ছে।’ যে-করেই হোক সেটা ধরার জন্য গোয়েন্দা লাগানো হল। আর, এদিকে গান্ধীজির অনশন রাজনৈতিক বিষয় না থেকে হয়ে পড়ল সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় বিষয়। সঙ্গে-সঙ্গে ভারতীয় শিল্পপতিদেরও বিচার্য বিষয়।
মঙ্গলবার অনশন শুরু হওয়ার কথা। শনিবার শেঠ মথুরাদাস বাসনজি, স্যার চুনিলাল মেহতা, স্যার পুরুষোত্তম দাস ঠাকুরদাস, জি ডি বিড়লা গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করলেন— সমাধানসূত্রের খোঁজে।
১৯ তারিখ বোম্বাইতে ‘হিন্দু নেতৃ সম্মিলন’ শুরু হল মদনমোহন মালব্যের সভাপতিত্বে ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে। সপ্রু, জয়কার, রাজাগোপালাচারি, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, এম সি রাজা, ডক্টর আম্বেদকর, স্যার চিমনলাল শেতলবাদ, এম-সে আনে, ডক্টর মুনজে, পি বালু, কুঞ্জরু, এ ভি ঠক্ক—এঁরা সকলেই ছিলেন। গান্ধীজিকে অনশন থেকে নিবৃত্ত হতে বলে ও হিন্দু সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক আবেদনপত্রে এঁরা সকলেই সই করলেন। ডক্টর আম্বেদকর বললেন—নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা তিনি বলবেন না গান্ধীজির কথা না, জেনে। তারপর শুরু হল—পুনায় ও বোম্বাইতে এইসব নেতাদের দরকষাকষি, দিনরাত, রাতদিন। বর্ণহিন্দু নেতাদের সমবেত চেষ্টা ছিল অস্পৃশ্য হিন্দু নেতাদের যত কম আসন যত কম দিনের জন্য দেয়া যায়। ডক্টর আম্বেদকরের নেতৃত্বে অস্পৃশ্য হিন্দু নেতাদের সমবেত চেষ্টা যত বেশি আসন আদায় করা যায়। মাঝখানে অনশনক্লিষ্ট গান্ধীর জীবনশূন্য শবদেহ—সমস্ত ভারত অদৃশ্যে সেই দেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে। ভারতের রাজনীতিতে এর চাইতে হিংস্র দরকষাকষি আগে আর কখনো ঘটেনি।
পরে, অনেকই হয়েছে। তবে আন দারিদারদের মাঝখানে নিহত মাহবের পাহাড়। সমাধান একটা হল।
আম্বেদকর এক শেষরাত্রিতে গান্ধীজিকে তাঁর জেলখানার কুঠুরিতে বললেন, ‘আমাকে আমার ক্ষতিপূরণ দিন।’
মৃত্যুস্পৃষ্ট স্বরে গান্ধীজি বললেন, ‘তোমার কোনো যুক্তিরই কোনো কাটান নেই।…সংবিধানে ষোল আনা নিরাপত্তা চাইবার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে। কিন্তু আমার এই চিতাশয্যা থেকে আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি—তুমি এই অধিকার প্রয়োগ করো না। তোমরা জন্মসূত্রে অস্পৃশ্য, আর, আমি অস্পৃশ্যতাকেই গ্রহণ করেছি। আজ আমি বর্ণহিন্দুদের জন্য একটু সময় চাইছি। আমাকে বর্ণহিন্দুদের মধ্যে কাজ করার সুযোগ দাও।’
আম্বেদকর বললেন, ‘আপনি আমাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আপনি দুই স্তরের নির্বাচন ব্যবস্থায় আমাদের সুবিধে করে দিয়েছেন। আমরাও পৃথক ভোটের ব্যবস্থা থেকে সরে এসে যুক্তভোটের ব্যবস্থা মেনে নিয়েছি। শুধু এই একটি বিষয়ে আমরা ঠেকে আছি। অনুন্নত হিন্দুদের জন্য এই ব্যবস্থা অন্তত দশ বছর চলতে হবে।’
কথা শেষ করে দেয়ার স্বরে গান্ধীজি বললেন, ‘পাঁচ বছর অথবা আমার প্রাণ।
সমাধান হল। ব্রিটিশ সরকারও মেনে নিলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেল ৫টা ১৫-তে ইয়েরবাদা জেলপ্রাঙ্গণের এক গাছের তলায় রবীন্দ্রনাথ এক প্রার্থনাসভা পরিচালনা করলেন। গাইলেন, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।’ রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৭০। গান্ধীজি তাঁর অনশন ভাঙলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে কি কখনো এমন নিষ্ঠুর ও জিঘাংশু এক প্রহসনের সঙ্গে ট্র্যাজেডির করুণা ও অসহায়তা অবিমিশ্র থেকে পরিবেশকে সত্য করে তুলেছে? চল্লিশ কোটি এই মানুষের দেশের অস্তিত্বের বিগ্রহকে, চল্লিশ কোটি এই মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি যখন গানে-গানে এক করুণাধারার তীরে নিয়ে যান।
আর তাঁদের ঘিরে থাকে চতুর শেয়ালেরা, নেকড়েরা, রক্তচোষা বাদুড়েরা, ঘাসরঙের সর্পকুল, শকুনের পাল–লন্ডনে, দিল্লিতে, বোম্বাইয়ে, কলকাতায়, মাদ্রাজে
আইন-অমান্য, গোলটেবিল, সামরিক আইন, মুখোমুখি যুদ্ধ, বেআইনি ঘোষিত রাজনীতি, অনশন, দরকষাকষি—এতকিছুর পর ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও তার ভিত ‘কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষিত হল। ১৯৩৫-এর ফেব্রুয়ারির সেই দিনটিতে কেন্দ্রীয় আইসভায় একমাত্র জিন্না-র গলাতেই ছিল যুক্তি, আধুনিকতা, সম্প্রদায়-বিরোধিতা, সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা। জিন্নার সেই বক্তৃতা যেন যুক্ত হতে চাইছিল তিরিশ মাস আগে ইয়েরবাদা জেলপ্রাঙ্গণের বৃক্ষতলের প্রহসন আর ট্র্যাজেডির করুণাঘন সংগীতের সঙ্গে।
‘কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডে আমি খুশি নই। আমার আত্মসম্মানে লাগে যে আমরা আমাদের সমাধান বের করতে পারিনি। রাজনীতিতে ধর্মের কোনো জায়গা নেই। কথাটা সংখ্যালঘুদের নিয়ে ও এটা রাজনীতির বিষয়। সংখ্যালঘু কে বা কারা? হতে পারে, একটি দেশের অন্য নাগরিকদের থেকে একজন সংখ্যালঘুর ধর্ম আলাদা, তাঁদের ভাষা আলাদা হতে পারে, তাদের জাত্ আলাদা হতে পারে, তাঁদের সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে এবং এই সবকিছুর—এই ধৰ্ম, ভাষা, জাত, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সংগীত ইত্যাদি সবকিছু মিলে একই রাষ্ট্রের ভিতরে সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব স্বতন্ত্র হয়ে যায়। সেই স্বাতন্ত্র্যের কিছু রক্ষাকবচ দরকার হয়। সেই কারণেই এই প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক বিষয় হিশেবেই আমরা বিবেচনা করব। এটার সমাধান করতে হবে। এটা এড়িয়ে যাওয়া চলবে না।’
ভারতের মত বিবিধ ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বিশাল ভূখণ্ডে কোটি-কোটি মানুষের হাজার-হাজার বছরের জীবনে সংখ্যালঘুতার ধারণার এমন সঠিক, নিরপেক্ষ ও বাস্তব ব্যাখ্যা তার আগে বা তার পরে আর-কেউ করেননি।
গান্ধী ও কংগ্রেস, অনিংরেজ স্বাধীন ভারতের যে-ধারণার আভাসের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছিলেন, তাতে তাঁদের নিকটতম, ঘনিষ্ঠতম অথচ অদৃশ্য আত্মীয় ছিলেন, একমাত্ৰ জিন্না। গান্ধী ও কংগ্রেস, অনিংরেজ স্বাধীন ভারতের যে-ধারণার আভাসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিলেন, তাতে এঁদের দূরতম, বিদ্বিষ্টতম অথচ দৃশ্যতম অনাত্মীয় ছিলেন গান্ধী নিজে ও কংগ্রেস। গান্ধী, কংগ্রেস ও জিন্না এইসব বিষয়ে একমত ছিলেন—শক্ত প্রশাসনের একক কেন্দ্ৰ, সৈন্যবাহিনীর ওপর ভারতীয় [কেন্দ্রীয়] সম্পূর্ণ অধিকার, সর্বজনীন ভোটাধিকার, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুশাসিত [রেসিডুয়্যাল] ক্ষমতা নতুন কেন্দ্রে ন্যস্ত হবে, ভোটে কোনো সংরক্ষিত আসন থাকবে না। ১৯৩৭-এর ভোটের পরও জিন্না এই কর্মসূচিতে কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস প্রস্তুত ছিল না।
ততদিনে কংগ্রেসের হিন্দুলবি স্বাধীন ভারতের এই ধারণায় থিতু হয়ে গেছে যে সেখানে জিন্না ও মুসলিম লিগের কোনো জায়গা থাকবে না। গান্ধীজিও তাঁর অনশনের মধ্যে বলেছিলেন, ‘প্রাণ থাকতে হিন্দু সমাজকে ভাগ হতে দেব না।’ প্রাদেশিক ভোটে সারা ভারতে জিতে (বাদে বাংলা ও পাঞ্জাব) কট্টর হিন্দু কংগ্রেসিরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে একেবারে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে গেল। বাংলা ও পাঞ্জাবে দশ-দশ বছরের কায়েমি মন্ত্রিসভা চালিয়ে অন্তরিসলাম নানা রাজনৈতিক পার্থক্য ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে, নেতাদের নিজ-নিজ আঞ্চলিক বা আর্থিক দাবিপ্ৰাধান্য লোপাট করে, দেখতে না-দেখতে মুসলমানরা কট্টর হয়ে গেল। দুদিকের কট্টররা যেন হাওয়ায়-হাওয়ায় এক হয়ে গেল। দুদিকের আক্কেলি মানুষজন যেন হাওয়ায় হাওয়ায় কপূরের মত উপে গেল।
হয়ত-বা অসহযোগ, আইন অমান্য এইসব থেকে পুরো দেশটাই ভোটের দিকে মুখ ফেরাল। বা, হয়ত এ-কথা ঠিক নয়। বা, হয়ত ভোটেরই ফলে দূরদূর সব জায়গা থেকে ধুলো পায়ে নাম-না-জানা মানুষজন আইনসভায় ঢুকে, নেতা হিশেবে প্রতিষ্ঠা পেলেন। বা, হয়ত ভোটেরই ফলে, বাংলার জমিদাররা তাঁদের প্রথাগত সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব হারিয়ে কট্টর হয়ে গেলেন—মুসলমান বিদ্বেষী, শিডিউল্ড কাস্ট বা ছোটলোক বিরোধী ও প্রজাবিরোধী।
কৃষক কেন মুসলমান হয়ে গেল ও মুসলমান হিশেবেই রাজনীতিক ক্ষমতার ভাগ চাইল—এটাই এই সব সন্ধানের মূল কারণ। তাই ধর্মীয় দাঙ্গাকেও রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ করে নেওয়া হল। ১৯১১ ও ৩২-এর সেনসাসে হিন্দুদের অচ্ছুৎ অংশ নানা সময় নানা পরিচয় লিখিয়েছে। শাহেবদের লেখা কিছু সেট্লমেন্ট রিপোর্ট আছে। ঐ সময়কার দলিলপত্র একাইভাগে এসে গেছে, ফলে দারোগাদের রিপোর্ট কমিশনারদের রিপোর্ট, কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলির তর্কবিতর্ক আমাদের পেছনের ধাপগুলি তৈরি করে দিয়েছে।
পেছন ফিরে সিঁড়ি বেঁয়ে যে একটু ওপর থেকে দেখছি আমরা, তাতে যেন একটু বেশি জানা যাবে। এমন আন্দাজ থেকে কতকগুলি অনুমান প্রায়-প্রমাণের ইজ্জত পাচ্ছে। যেমন—অখণ্ড বাংলায় জমিদাররা ছিল হিন্দু, মুসলমানরা ছিল রায়তপ্রজা। যেমন, জমিদাররা মহাজনিও করছিল অমানুষিক সুদে। যেমন, জমিদারদের আবাওয়াব ও হাটঘাট। পাটের দর বেঁধে না দেয়া। এমন আরো সব কারণে মুসলমান কৃষকরা হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ও একটি পরাক্রান্ত কৃষক আন্দোলন ভেঙেচুরে হয়ে গেল দাঙ্গাবাজি।
এই প্রায়—প্রমাণগুলিতে কিন্তু জানার চেষ্টাই হল না—জমিদার থেকে দিনমজুর, একটা হালের জমিতেও কত স্তরান্তক ছিল? এক-এক জিলায় এক-এক রকম নয়। এক জিলাতেও কত রকম। খাজনা আদায়ী জমিদার খাজনা আদায়ের জন্য তৈরি করেছিলেন একদল কৃষক, যাঁরা জমিদারকে খাজনা দিত নির্দিষ্ট পরিমান, প্রজাদের কাছে জমিদারকে খাজনা দিত নির্দিষ্ট পরিমান, প্রজাদের কাছে আদায় করত ফসলে।
এই সমস্ত হিশেবনিকেশ আজকাল হচ্ছে পেছন ফিরে সিঁড়ি বেঙে। সামনে আছে এখনকার পশ্চিমবাংলা। এখনকার বাংলাদেশ বা তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সেই সম্মুখে ভূমিকে নেই। অর্থাৎ আমাদের লক্ষে নেই বাংলাদেশসহ অখণ্ড বাংলার জমিজমা। এই উইয়ে খাওয়া পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কৃষি সংস্কারের কতকগুলি বিষয়, ভারতীয় অর্থ-রাজনীতি বোঝার পক্ষে দরকারি হয়ে উঠেছে। ভূমির মালিকানার বদল, জমিদারি উচ্ছেদ, বেশি জমির মালিকের হাতে বেশির ভাগ জমি নেই, বামফ্রন্টের আমলে (১৯৭৭ থেকে ২০০৮) কৃষি উৎপাদনে দেশে উচ্চতম হার রক্ষা, কৃষি বিপণনে চাষির স্বার্থ। এরই সঙ্গে থাকছে—নিয়মিত ভোটে পঞ্চায়েতের কর্তৃত্বের প্রসার, স্থানীয় কৃষির দাবিদাওয়ায় সমাবেশ ও চাষিদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়া।
১৯২০ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত কৃষি নিয়ে তৈরি নানা আইনকানুনের দরকার ও তার ফলে বাংলার চাষিদের কী বদল ঘটেছিল—এই অনুসন্ধানের সঙ্গে একেবারে জড়িয়ে আছে কৃষিতে হিন্দু-মুসলমানের আনুপাতিক স্থান, কৃষি—জনসাধারণের হিন্দু ও মুসলমানে খাড়াখাড়ি ভাগ, দাঙ্গা–যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানী কলকাতা ও প্রান্তীয় নোয়াখালির গ্রাম। ফলে শহরের সাম্প্রদায়িকতা, গ্রামের সাম্প্রদায়িকতা, এলিটের সাম্প্রদায়িকতা ও পাবলিকের সাম্প্রদায়িকতা।
