১০
2 of 4

৫৪. আগৈলঝরায় যোগেনের মিটিং

৫৪. আগৈলঝরায় যোগেনের মিটিং

আগৈলঝরার মিটিঙে যে এত লোকের ভিড় হবে তা যোগেনের ধারণার মধ্যেই ছিল না। সে তো মৈস্তারকান্দি পৌঁছে গেছে বেলা দশটা নাগাদ— সঙ্গে প্রহ্লাদ, শিবু হালদার, পণ্ডিতমশায়, তার মামাতো ভাই—যে ছিল ভোটের নেতা। এদের নিয়ে বাড়িতে ভাত খেয়ে তারা এক ছোট নৌকায় রওনা দিল।

মৈস্তারকান্দি তো বড় গ্রাম—যোগেনদের বাড়ি সেই সুবাদেই মৈস্তারকান্দি। ডাঙা থেকে দুই দিকের ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে উত্তরে ও দক্ষিণে দুটো রাস্তা যায় পুবমুখে, মৈস্তারকান্দিকে ঘিরতে। উত্তর আর দক্ষিণের দুই রাস্তার মধ্যে একর বিশেক ক্ষেত। উত্তরের রাস্তা ধরে শ-খানেক পা হাঁটতেই একটা ছোট নালী দিয়ে দক্ষিণের ক্ষেত থেকে জল ঢুকছে উত্তরের জমিতে। কিন্তু উত্তরে কোনো খাল চোখে পড়ে না। যেটুকু জল ধানক্ষেতের গোড়ায় তাতে বাতাসের দাগ পড়ে বটে কিন্তু সেটা কোনো মতেই খাল নয়। ঐ ছোট নালাটাতে বোঝা যায় জলে জমির রং। খালের রং জলে নেই। সে-নালা তো চ্যাংড়ারা এক লাফেই পেরিয়ে যায়। জোয়ানরাও। ভারী বয়সের কেউ-কেউ জলের একেবারে কিনারায় গিয়ে জলের ভিতর দিয়ে পা বাড়িয়ে পেরতে পারে। কিন্তু বুড়োবুড়িদের জলে নেমে পেরতে হয়। হাত তিনেকের একটা বাঁশ ফেলা থাকলে সকলেই পারত তার ওপর আঙুলের ভর রেখে পেরিয়ে যেতে। বরিশালের এমন দেড়-দু হাতি নালার ওপর যদি বাঁশ ফেলতে হয়, তাহলে মরা-মানুষকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার বাঁশ পাওয়া যাবে না। আরো শ-খানেক পা হাঁটতেই যেটাকে রাস্তা মনে হয়েছিল সেটাই হয়ে যায় একটা বড় খালের বাঁক। ঐ বাঁক থেকে একটা সুতো ঢুকেছে উত্তরের ক্ষেতটাতে। যেটাকে মনে হয়েছিল ধানক্ষেতের জল, সেটা আসলে খাল।

এ-খালের কোনো ছবি বা ম্যাপ আঁকা যায় না। প্লেন থেকে তোলা ছবিতে হয়ত বোঝা যায়, অজস্র রঙের বিচ্ছিন্নতা। সে-বিচ্ছিন্নতাগুলিই জল, নাকী রংগুলোই জল, তার কোনো হদিশ মেলে না-হদিশ বানানো যায় এমন কোনো চিহ্ন নেই। আকাশ থেকে তোলা সেই ছবিতে কি এই আকারটা আসবে—প্রান্তর থেকে প্রান্তর যেখানে শুধুই সর্পিল। তাছাড়া, উচ্চাবচতার সূক্ষ্মতাগুলি মুছে যাবে। শুধু মেঘের যেমন কোনো ছবি হয় না, মেঘের আকারের তো কোনো গড়ন নেই, মহাকাশযানের যাত্রীদের যেমন গতিবোধ থাকে না, তেমনি বরিশালের জলের কোনো ছবি হয় না। বরিশালের ছোটখাল-বড়খালের জলে, ছোটখাল-বড়খাল ছোটনদীর জলে, ছোটখালের চাইতেও ছোট জোলায়, বড়খাল-ছোট নদীর জলে, নদী থেকে নদীর জলে অনেক অনেক তফাত কিন্তু সেই তফাত থেকে কোনো বাইরের জীবন তৈরি হয় না। হলে, হয়ত জলের এই তফাত হয়ে উঠতে পারত জলবৈচিত্র্য। বরিশালের জলই একটা জীবন। নেহাৎ দরকারি ফাঁকটুকুও নেই জলের সঙ্গে জীবনের। জলের বহতা, বীচিক্ষেপ, আকারহীনতা, অনচ্ছতাগুলি মানুষের শরীরের রেখা হয়ে উঠে, আবার জল হয়ে যায়। জলের তো কোনো আকার স্থায়ী নয়। বরিশালের মানুষের জীবন তেমনই জলেগড়া মুর্তি।

উত্তরের পথটা ধরে ডাঙায়-ডাঙায় কিছু দূর বেশ সোজাই চলে যাওয়া যায় জলহীন ক্ষেত্রহীন, বনবাদড় ও দুয়ার পেরিয়ে-পেরিয়ে। তারপরই শুরু হয়—প্রায় প্রতি পনের-বিশ পায়ে এক-একটা খাড়া খাত, সে খাতগুলির একটা পাড় ঘাসহীন, দৃশ্যত পাথুরে আর সে খাতগুলির অনেক নীচে, বহমান জল। খাল বললে তো একটা নিরীহ গার্হস্থ্যের ভাব আসে। কিন্তু এই খাতের খালগুলিতে কোনো গার্হস্থ্য নেই। আছে গৃহহীন বন্যতা আর নিষেধ। ইতিহাস বা সাহিত্যপুষ্ট মানুষ একটা ছকে আনতে চায়, যেন পৃথিবী সব জায়গাই ট্যুরিস্ট স্পট। গ্রান্ড ক্যানিয়ন বা নায়াগ্রা বা উত্তর-দক্ষিণ মেরুর মত অমানুষ শূন্যতাকেও কয়েক মিনিটের জন্য কনডাক্ট করা যায়। বরিশালের এই খালের মাটিকে কোনো ছকে ধরা যায় না, তেমন কোনো ছক হয় না। বরং, বাচ্চাদের ছোটাছুটি আর যুবকদের নানা রঙা বিদেশী গেঞ্জি বা জ্যাকেটে এক আশ্বাস জড়িয়ে থাকে। সেই খাড়া খাতগুলির ওপর কোথাও বাঁশের সাঁকোতে, কোথাও ফেরির নৌকোয় অপর পারের সংযোগ। এই রকমই এক দুর্ভেদ্য সংযোগের ওপারে যোগেন মণ্ডলের মৈস্তারকান্দি। এতক্ষণ অদৃশ্য আর-এক খালের পাকে-পাকে বাঁধা। যোগেনকে সেই সব পাক প্রতিদিন তো পেরতে হয়েছে। মৈস্তারকান্দি থেকে যোগেনকে প্রতিদিন যেতে হত আগৈলঝরার স্কুলে।

মৈস্তারকান্দি বলেই যোগেনের গ্রামটি মুখে-মুখে চেনা। মুখচেনার চাইতে বেশি চেনার জন্য যা দরকার, যোগেনের এই গ্রামে তার কিছুই ছিল না। না কোনো মান্যগণ্য মানুষ, না কোনো মান্যগণ্য সমাজ, না কোনো উচ্চবর্ণের হিন্দু, না কোনো সৈয়দ মুসলমান, না কোনো স্কুল বা মন্দির, না কোনো বিশাল নদী, কিছু না, কিছু না। জায়গাটা সেই আগৈলঝরা আর মাদারিপুরের খাল থেকে এতটা দিগন্তে উচুঁ, খাড়া, শক্ত ও খাদের নদীতে এমন পাকানো যে সেটাকে কোনো বসতি বলে কল্পনা করা একমাত্র তেমন কোনো উৎখাত, নিরুপায়, আতঙ্কিত মানুষের দলের পক্ষেই সম্ভব। আর, নদীর চর থেকে বন্যায় বা জমিদারের হুকুমে, বা হঠাৎ-কোনো হিশেব ছাড়া জোয়ারের বানে মুহূর্তে উৎখাত কোনো খালপাড় থেকে উচ্ছিন্ন মানুষ, দল বেঁধে এখানে পৌঁছুনো খুব কিছু নতুন ব্যাপার নয় বরিশালের গ্রামে। এখানেই কেন—এমন প্রত্নতাত্ত্বিক প্ৰশ্ন প্রাসঙ্গিকই নয়। আর, ওরা যে এখানে বসতি গাড়ল, তাই-বা কার জানা দরকার?

হয়ত সেটাই ছিল প্রধানতম কারণ। যে মানুষদের, শয়ে শয়ে হাজারে-হাজারে মানুষদের, একেবারে নিজস্ব স্বামী-স্ত্রী, বাপবেটা, বিধবা বোন, অধবা ভাগ্নি, মামার এক শ্যালক—ইত্যাদি অভঙ্গুর এইসব সম্বন্ধ নিয়ে বাসভূমি তৈরি করতে হয় সমুদ্রমোহনার খালি চরে, বা পাহাড়পর্বতের জঙ্গলে, বা নদী যেখানে ভাঙছে সেখানে, তারা গন্ধ পায় কোনো জমিটার মালিকানা তখনো তেমন জারি নেই। বেদে-যাযাবরের মত গৃহ-বা গ্রামহীনতা নয়। কিন্তু সদা উদ্বাস্তু গৃহবাসী গ্রামবাসী মানুষের নিবাসভূমিগুলি এইভাবেই বাছা

দুটো-তিনটে বাঁশ মাথায়-মাথায় বেঁধে ও খালের ওপর ফেলে যাতায়াতের একটা সহজ উপায় তৈরি থাকে বটে, একদিকে সে খাদটা বড় বেশি খাড়া বলে, তবে খাল আর নৌকাই সবদিকের বড় সড়ক। বসত জায়গাটা যেন এক ক্ষয়া পাড়ের অবশেষ, অজস্র অজস্র বাঁকে-বাঁকে ঘেরা। জলের এত বিস্তার ও বাঁক দেখে ভুলে যেতে হয় বসতটা কিন্তু তৈরি হয়েছিল, জলের সুবাদে নয়, মাটির সুবাদে। সেই বাঁধে-বাঁধে, চক্রাকারে, এক-একটা নিচু ঘর, সব মিলিয়ে বাড়িঘর। এমন বাঁকচুরের মধ্যেও আবার চড়াইউৎরাই আছে। যোগেনদের বাড়িটা একটা চড়াইয়ের মাথায়। তার আগের বাঁকটা থেকে কয়েক ধাপ উঠতে হয়। সেখানেই বসত শেষ নয়, যদিও এতক্ষণ ধরে শুধু ডাইনে পাক খেতে-খেতে মাথায় ঘূর্ণি লাগে, যোগেনদের উঠোন দিয়েও ডানপাক ঘুরতে গিয়ে তাদের রান্নাবান্নার জায়গার সামনে পড়ে গিয়ে। তবে, এটাও সহজ বুদ্ধিতেই এসে যায় যে ঐ জায়গাটুকু পথও বর্ষে। যোগেনদের উঠোন থেকে বাঁয়ে বাঁক শুরু হয় ও বাঁয়ে বাঁক চলতেই থাকে খালের জল পর্যন্ত। খালের পাড়ের জলটুকুও রাস্তার অংশস–সেটুকু জলের ভিতর দিয়ে হাঁটা। তারপর আবার একটা চড়াইয়ে উঠলে আবার সেই সাঁকো।

খালের ভিতরকার এই ডাঙার আরম্ভও নেই, শেষও নেই। আবার, সে-ডাঙা যে একটা বৃত্ত, তাও নয়। আবার সে-ডাঙা যে পাকদণ্ডি ঘেরা একটা টিলা, তাও নয়। খালের জল যেমন জলের সমোচ্চশীল ধর্মের বাধ্যতায় ছোটবড় সব অসমতলতাকে জলের নীচে ঢেকে ফেলে জলতল রচনা করে, এই ডাঙাটিও তার অসমতলতার ধর্ম অনুযায়ী সব উঁচুনিচু-গিঁঠগাঁঠ, ঢেউ-গর্তকে পাঁজা করে রেখেছে, পাঁজার কোনো আকার থাকে না।

.

দুপুরের খাওয়া সারা হলে যোগেন চেঁচায়—’আর বেলা কাটানোর বেলা নাই, খানবাহাদুর আগে আইস্যা বইস্যা থাইকলে মুখদেখান যাবে না। যোগামা –’

এ-বাড়িতে কোনো আড়াল তৈরি করা খুব কঠিন। যোগামা ঘোমটায় গলা ঢেকে বাইরে আসে। ‘তুই কি আগৈলঝরা থিক্যা আইজ খাগবাড়ি যাইবি, বাপ। তাইলে ঐখান থিক্যা খবর দিলে হয় যে তুই যাবিনি আইজ—’

যোগেনের বাবা রামদয়াল তখন আখার সামনে উঁচু হয়ে কাঠকয়লার একটা জ্বলন্ত টুকরো তোলার চেষ্টা করছিল ভাতের হাতা দিয়ে। তার বাঁ হাতে ছিল হুকোটা–কলকেসহ। যে-কারণেই হোক, আখার ভিতরের গরম ছাই উড়ে তার মুখে পড়ছিল। সে তাড়াতাড়ি মুখটা সরিয়ে নেয় আর ভাতের হাতটা পড়ে গেল আখার মধ্যে। সেটা এমন কিছু ঘটনা নয়, যে-কেউ দুই আঙুলে তুলে আনবে হাতা। কিন্তু রামদয়ালের তো আগুনটা তোলা হল না। এখন তামাক জ্বালাবে কী করে। লাভের মধ্যে আখার গরম ছাইয়ে মুখে লাগল ছেঁকা।

যোগামা-র কথা শুনে রামদয়াল তার রোগা শরীরে একটা এমন ঝাঁকি দিয়ে খাড়া হয়ে ওঠে যে হুঁকোর মাথা থেকে তার না-জ্বালানো কলকেটা ছিটকে মাটিতে পড়ে। ফাঁকা হুঁকোটাই শূন্যে তুলে রামদয়াল চিৎকার করে ওঠে, ‘যাইতত হোগায়ায়ানি কথা। কী, না, জামাই যাইব মিটিঙে আর শ্বশুরবাড়িতে খবর দিবে জিভ ভাড়া দিব। সব্যতা সমাজ কিছু তার থাইগ্‌ল সব হোগায়—’

এমন আচমকা চিৎকারে ঐ ভিড়ের কিছু এল গেল না। ভিড়টা তো ছোটও না। বরিশাল থেকে যোগেনের সঙ্গী সাত-আটজন, এখানকার সঙ্গীও দু-একজন, বাড়ির বৌরা, চ্যাংড়াপ্যাংড়ারা, খুড়ারা। তারমধ্যে যোগামা-যোগেনের কথা শুনে যোগেনের বাপ রামদয়াল এমন চুর রাগ রাগল কেন, সেটা কারো জিজ্ঞাস্যই না। জামাই নিজেই শ্বশুরবাড়িতে খবর পাঠাচ্ছে যে সে রাতে ওখানে থাকবে—এর মধ্যে সমাজ-সভ্যতা লংঘনের কিছু নেই। সেটাই যখন ঘটবে, তখন আগাম খবরটা দেয়াই তো ভাল–বামুনঠাকুররাও তো তাই দেয়। আর বৌ তো পোয়াতির সময় বাপের বাড়িতেই চিরকাল থাকে। যোগেনের বৌ কমলার তো এখন ভরা মাস। এতদিন পর এসে বৌয়ের সঙ্গে দেখা না করে চলে যাবে। এটা আগেই ঠিক করা আছে যে আগৈলঝরার মিটিং থেকে যোগেন যাবে খাগপুরে

যোগেন পকেট থেকে দশটাকার নোট কিছু বের করে যোগামাকে দিয়ে বলে, ‘এইহানে পাঁচকুড়ি থাইকল। বাড়িতে গুড়া-বুড়া-মাইয়াগ দুইবেলা ধানের বিচি জোটে তো যোগামা? তেমন দরকারে বরিশালে পেল্লাদদার খবর কইরো।’ তারপর যোগামার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলে, ‘বৌয়ের কিছু টাকাপয়সা দিব্যার লাগব না?’

‘লাগারই তো কথা। অ্যাহন তোমার পিরানে আর তার হাতে কী কথা হইব, বাপ, আমি জানি ক্যামনে? বৌরে খুশি দিয়ো। ভরপোয়তির বৌরা কীসে খুশি হয় তা তো তোমার এই মায় জানে না রে বাপ।’

যোগেন গিয়ে বাপের কলকেটা তোলে, তারপর তাকিয়ে দেখে তামাকটা পড়েনি। সে তামাকটা একটু টিপে দিয়ে আখার সামনে উবু হয়ে বসে। তারপর দেখে ভাতের হাতা আখার ভিতরে। সে আওয়াজ করে হাসতে হাসতে পাঞ্জাবির হাতাটা গুটিয়ে, আখার ভিতর থেকে ছোট্ট একটুকরো আগুন, দুই আঙুলে তুলে এনে কলকিতে ফেলে, কলকির মুখটা চেপে নাড়াতে-নাড়াতে এগিয়ে বাপের কাছে গিয়ে তার হুঁকোটা নিয়ে কলকেটা পরিয়ে দিয়ে বলে, ‘শ্বশুরমশায় তো মিটিঙে আইসবোই। তা নিমন্তন দিবে না? আমারে কইতে হবে ক্যা? যোগামা–বাবা ভাতের হাতা আখায় ফেইলছে। তুইল্যা রাখো।’

ওরা ডানহাতি ঘুরে নেমে যায়। সামনে যে-নৌকোটা পায়, তাতেই উঠে বসে। জলে নেমে কেউ নৌকোর কানা ধরেনি—তাই এক-একজন ওঠে আর নৌকা টলমল করে।’

নৌকোটা ছাড়ল কে সেটা দেখতে যোগেন একবার ঘাড় ঘোরায়—ষষ্ঠী, তার ছোট ভাগনে, লোকজন আছে বলে ইজের পরে আছে। ওদের আগৈলঝরার পথে চড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসবে। খালেজলে গেলে আর কয় লগিঠেলার ব্যাপার? ষষ্ঠী বলে একটু হয়ত বেশি—তাই-বা কটা

তাও কটা তো! পেটভরা। মাথার ওপরে শ্রাবণের মেঘের ঢাকনা নেমে আসছে। দশদিক এত খোলা থাকলে কোথাও-না-কোথাও থেকে হাওয়া তো একটু খেলেই। চোখ খোলা রাখে বঙ্গমাতার কোন কুসন্তান। যে-রাস্তায় নামার কথা, সেই জায়গা আসতেই ঘুমের জড়তা মাখানো গলায় যোগেন বলে, ‘ষষ্ঠীবাবা, আমাগো আগৈলঝরায় নামাইয়া দে, বাবা। দুঃখ হবে রে?’

‘না মামা, নৌকার মুখ ঘুরাই—’ আট-দশ বছরের ষষ্ঠী, উলটোদিকে লগি মেরে, নৌকার মুখটা ঘোরায় ষাট ডিগ্রির মত।

নৌকোভর্তি তার বাপ-জেঠা-খুড়া, মামা-মাইস্যা-পিইস্যা, আর সদর থিক্যা আসা বড় মানুষদের মাথাগুলো নিজের-নিজের ঘাড়ের ওপরে একলা এক-একডা কাঁঠালের মতন দোলে। গাছের গোড়ার কাঁঠাল না—সেগুলো আর দুলবে কী করে। গোড়া থেকে যে ডালপালার ফেবরি বেরয়, তাতে ঝুলে থাকা কাঁঠালের মত। সেগুলো বাতাসে দোলে। ষষ্ঠী হেসে ফেলে। এক নৌকো বুড়া মাইনষেড়ে ষষ্ঠী দোল দিয়্যা ঘুম পাড়ায়নি?

ষষ্ঠী হেসে ফেলে বয়সের দোষে-গণ্ডা দুই-তিন পাকা আর টাউক্যা মাথারে ঘুমের ঘোরে দুলব্যার দেইখলে হাসি আসবে না আট-দশ বছরের ষষ্ঠীর?

পরমুহূর্তেই সে হাসি মুছে ফেলে তার কর্তব্যের ভারে সামনে তাকায় ও মাথা নিচু করে।

যে-জল ঠেলে নৌকোটাকে মাইল পাঁচ দূরে আগৈলঝরাতে নিয়ে যেতে হবে সেটা ঠিক খাল নয়—ধানক্ষেত। আবার, সবটা ধানক্ষেতও নয়, খালও বটে। ধানক্ষেতই হোক আর খালই হোক, এখন জল দেখা যায় না, জলের ওপরে নৌকোয় দাঁড়িয়েও না। কচি সবুজ ধানের বিস্তার জল ঢেকে দিয়েছে। সেই ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে লগি ঠেলে ছাড়া এগবার আর কোনো উপায় নেই। এ জল কার্তিকেও শুকোয় না, যদিও তখন জলের মধ্যেই ধানকাটা শুরু হয়ে যায়। ষষ্ঠীর বয়স আট-দশ। গ্রামের নিয়মেও ওর এখন অন্তত ক্লাশ ওয়ান-টুতে পড়ার কথা। ষষ্ঠী লগি ঠেলছে যে-বয়সে, পঁচিশ বছর আগে সেই বয়সে যোগেনের পাঠশালায় পড়াও শেষ হয়নি। বছর আটেক বয়সে সে জলিল মাস্টারের পাঠশালায় বসেছিল বটে—তারপর কী সব কারণে সেই পাঠশালাটিই বন্ধ হয়ে যায়। যোগেনকে তখন যোগামা-র ইচ্ছা ও জেদে আগৈলঝরার প্রাইমারি স্কুলে দেয়া হয়—লোয়ার প্রাইমারি, ক্লাশ টু পর্যন্ত। যোগেনের বয়স তখন প্রায় নয়-দশ—এই এখনকার ষষ্ঠীর মত। তাকে রোজ স্কুলে যেতে হত ডিঙি করে লগি ঠেলে। তারপর তাকে দেয়া হল বড় স্কুলে—বার্থী হাই স্কুলে। সেখানেও তাকে যেতে হত লগি ঠেলে—মাইল-দুই-তিন। আজ যদি ষষ্ঠীকে, যোগেনের সেই বয়সের চব্বিশ-পঁচিশ বছর পরেও, ক্লাশ ওয়ানে পড়তে হয়, তাহলে রোজ পাঁচ মাইল লগি ঠেলে উত্তরে ঐ বার্থীতেই যেতে হবে। আট-দশ বছর বয়সে লগিঠেলা এমন কিছু কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।

এখন এই শ্রাবণে একটা অসুবিধে হচ্ছে ক্ষেত ও খাল তো জলে একেবারে টুপটুপ। বাতাসের জোরে একটা স্রোতও বয় পশ্চিম থেকে পুবে—ঐ, ধানক্ষেতে যেটুকু স্রোত বয় সেটুকুই। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু লগি তো ঠেলতে হয় স্রোতের আড়াআড়ি। পুরো না হলেও অনেকটা তাতে দুটো-একটা খালমত ঢালে একটু অসুবিধে হয়, ঘন-ঘন লগি মেরে নৌকো সিধে রাখতে। ওরকম অসুবিধে তো সবসময়ই কিছু-না-কিছু থাকে। এখন তো আবার জলের নীচের ডোবা-আলে নৌকা আটকে যায় না! ষষ্ঠীর না-হয় ইজের পরে থাকার বয়সও পুরো হয়নি। কিন্তু কখনোসখনো পরার বয়স তো হয়েছে। তাতেও যদি সে তাদের সেই গ্রাম মৈস্তারকান্দি থেকে আগৈলঝরা মাইল পাঁচ ধানক্ষেত বেয়ে নৌকো চালানোর সময়মাফিক-সমস্যা বোঝার মত অধিবিদ্যা আয়ত্ত করে না থাকে—তাহলে ওকে কোনোদিনই আর কোমরের নীচে কাপড়ঢাকার সাবালকতায় পৌঁছুতে হবে না—মুখ দিয়ে লালা পড়বে, কথা সব জড়িয়ে যাবে, বাঁদিক কেতরে হাঁটবে আর দৃষ্টি হয়ে যাবে ঘোলা। যাকে বলে, ‘আউলাইয়া গিছে’। বরিশালে কোলের শিশুকেও ‘মা’ ডাকার আগে জলস্থলের অধিবিদ্যা আয়ত্ত করে ফেলতে হয়, এখনো, যোগেন্দ্রনাথের বিদ্যাভ্যাসের পঁচিশ-পঁচিশ বছর পরও, সেই অপরিবর্তনীয়তাতেই ষষ্ঠী লগি ঠেলে আগৈলঝরা প্রায় পৌঁছে যায়।

লগি ঠেলতে ঠেলতেই ষষ্ঠী বেশ মজা পাচ্ছিল—ধানের শিষ কানের মধ্যে, ঘাড়ে, গালে লেগে যাওয়ায় কেমন সুড়সুড়িতে নৌকোর কানায় যারা বসেছে, তাদের কেউ-কেউ বিরক্ত হয়েও আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। আগৈলঝরার কাছাকাছি বোধহয় একটা বড় শিষই কারো নাকের ভিতর ঢুকে গিয়েছিল। সে এমন জোরে হেঁচে ওঠে যে নিজের হাঁচিতে নিজেই চমকে জেগে যায়, যে-দুচারটি ধানপাখি নৌকোর গলুইয়ে বসে কিচিরমিচির করছিল সেগুলো একঝাঁকে উড়ে যায় আর প্রায় সকলেই চটকা ভাঙে। যোগেন গলা না-তুলেই বলে, ‘কী রে? আয়্যা গেলি।’ বলে নৌকো থেকে নামতে দাঁড়িয়ে পড়ে।

ষষ্ঠী অনেক আগে থেকেই মনে-মনে হাসছিল—ঐ যখন কেউ ঘাড় বা কান চুলকোচ্ছিল। কেউ ভাবছে পোকা, কেউ ভাবছে মশা, কেউ ভাবছে খোঁচা। কেউই ভাবছে না—ধানের শিষ। ধানের শিষ এড়াতে তো গলুইয়ে বসে দু-হাতে ধানের গোছা সরিয়ে নৌকোর রাস্তা খুলে দিতে হয়—নইলে ধানের শিষের ধারে গাল কেটে, কান কেটে, চোখ কেটে যায়। এ ধানগাছের কতটুকু আর নৌকোর ওপরে ওঠে? যেগুলি ওঠে, সেগুলো হয়ত ধানগাছই নয়। শ্রাবণ-ভাদ্রের জলে শনশনিয়ে বেড়ে উঠলে ধানের শিষের, ধানের পাতার, ধার হবে শানানো। তখন আর মশার কামড় ভেবে দুই হাত চড়ানো যাবে না বা কড়ে আঙুলে কান চুলকোনো যাবে না।

হাসির ধাক্কায় ষষ্ঠীর লগি থেমে গিয়েছিল। যোগেন নৌকো থেকে নামার জন্য দাঁড়িয়ে ওঠায়, তার হাত থেকে লগি পড়ে যাওয়ার দাখিল—সে এমনই হাসতে থাকে। এইসব গোলমালে ঝিমুনো ভাব কেটে যাওয়ায় কেউ-কেউ হঠাৎ মনে করে বসে—সত্যি বুঝি কিছু গোলমাল ঘটেছে। তারা ‘হইলডা কী, হইলডা কী’ বলে চেঁচিয়ে ওঠায় ষষ্ঠী লগি ফেলে দুই হাতে পেট ধরে বসে পড়ে হাসতে-হাসতে।

খান বাহাদুর বললেন, তারপর প্রহ্লাদদা বললেন, তারপর কংগ্রেসের থানা কমিটির প্রেসিডেন্ট বললেন, সেই সুবাদে লিগের থানা কমিটির প্রেসিডেন্টও বলতে চাইলেন। কে কী বলতে চাইছেন, সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। এক খানবাহাদুর তাও কিছু রাস্তাঘাট, নদীনালার কথা বললেন। আর, সকলেই শুধু যোগেনের কথা বলে, ‘আমাগো গৌরব’, ‘এই পরথম আগৈলঝরার মানুষ এমন উঁচা জায়গায় উইঠিছে,’ ‘নতুন সূর্যোদয়।’ এইসব।

যোগেনের একটা উদ্দেশ্য ছিল এই মিটিং-ডাকার। তপশিলি জাতিগুলির শিক্ষাসংস্কৃতির জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। সমস্যার মাপে টাকার পরিমাণ মাছের মায়ের চোখের জলের মত। পিপাসা অগস্ত্য-র আর জল বদনার অর্ধেক। যাদের শিক্ষার জন্য বরাদ্দ তারা জানার আগেই এ টাকার কোনো অবশেষ থাকবে না। সরকারের সেক্রেটারিরা একটা শর্ত লাগিয়ে খানিকটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে। সরকারের টাকা হবে ম্যাচিং গ্র্যান্ট। জিলার স্কুল ইনস্পেকটরের তালিকা অনুযায়ী গ্রাপ্টের যোগ্য তালিকা তৈরি হবে। স্থানীয়ভাবে যে-টাকা সংগ্রহ হবে, সরকার তার অনুপাতে টাকা দেবে। যোগেন চায় আগৈলঝরা ইস্কুলের জন্য টাকা তুলতে যাতে আনুপাতিক সরকারি টাকা আদায় করে স্কুলটাকে হাইস্কুলে উন্নত করা যায়। সভা ভেঙে গেলে যে যার মত চলে যাবে—কাউকে ধরাছোঁয়া যাবে না। এদিকে কলকাতায় যোগেন, অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছে। উনি কথা দিয়েছেন—লোক্যাল কালেকশন ঠিকমত হলে, মানে, গবর্মেন্ট যদি বোঝে সব স্কুল ভূতের স্কুল না, তাহলেই উনি যথাসাধ্য সাহায্য করবেন।

যোগেন খানবাহাদুরকে বলে, ‘এবার আমি কই?’

‘তুমি কয়্যা ফেইললে তো মিটিং শ্যাষ। সবাই তো তার লগেই বইস্যা আছে। কও। কয়্যা ফেলাও। আমারও তো শুনাজানার ইচ্ছা।’

যোগেনের নাড়ীজ্ঞান নির্ভুল—বিশেষ করে মানুষজনের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে। আইনসভায় যে জননেতা হিশেবে তার এই শক্তির পরিচয় ততটা কেউ আন্দাজ করতে পারেনি, তার সবচেয়ে বড় কারণ সে তো কোনো পার্টির মূলধন খাটাচ্ছে না। মাত্র মাস চারেকেই সে তো নিজেকে আলাদা করে ফেলতে পেরেছে তার মতামতের সূক্ষ্মতা ও মৌলিকতা দিয়ে। সে এখনো কোনো পার্টি তৈরি করেনি, এ নিয়ে কোনো তাড়াহুড়োও তার নেই। তবু, সে তো এটুকু করতে পেরেছে যে মল্লিক ব্রাদার্সের মত কুলীন শিডিউল কাস্টরা ছাড়া অন্য সব সিডিউল কাস্ট এমএলএ তার ওপর অনেকটা পর্যন্ত ভরসা করে। জননেতার সম্মান সে কোনোদিনই কি পাবে? বংশ, শিক্ষা, জাত, পূর্ব পূরুষ, টাকাপয়সা, মেলামেশা—এইসব যা দিয়ে কিছু-হওয়ার জমি তৈরি থাকে তার একটিও তার নেই। তার আছে, যা থাকার কোনো দরকারই নেই। নিজের ওপর বিশ্বাস আর যে মানুষজনদের সঙ্গে তার সম্পর্ক সেই একটুকরো মানবসমাজেরও তার ওপর বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের বাজারদর উঠলেই তার মালিক হয়ে উঠবেন—শরৎ বোস বা সারওয়ারদি বা শ্যামাপ্রসাদ বা নাজিমুদ্দিন।

এ তো শুধু যোগেন নয়, জননেতা হিশেবেই যারা জিতে আইনসভায় এসেছে—তারা তো আইনসভার ভাষাই জানে না। তাহলে তারা আইনসভাকে নেতৃত্ব দেবে কী করে? আইনসভাও তো জনসভার ভাষা বোঝে না। তাহলে আইনসভাই-বা জনসভাকে নেতৃত্ব দেবে কীভাবে।

সেই নাড়ীজ্ঞন নিয়েই যোগেন যেন হাল কাধের গুঁড়িতে আগুন লাগাতে চায়। না-লাগলে, লাগবে না। কিন্তু লেগে গেলে নিববে না।

‘আমারে নিয়্যা আপনাগো যে গৌরব সেই কথা এতবার শুইনতে লজ্জা হয়। মায়ে কি তার ছাওয়ালের কোনো বড় কামের জইন্য গৌরব জানায়? যহন সীতারে বিয়া কইর‍্যা আইল রামচন্দ্র, তহন কি রানী কৌশল্যা, রামচন্দ্রের মা, আইস্যা কইছিল, বাপ রাম রে, অ্যামন অ্যাডডা বৌ আইন্যা বাপ, আমার মুখ উজ্জ্বল করলি।

কইব ক্যামন কইর‍্যা? সারাডা পৃথিবীর মানুষ জানে যে রামচন্দ্রের থিক্যা উজ্জ্বল কেউ নাই, কেউ হয় না।’

যোগেন দেখে তার একেবারে নাকের নীচে বসে এক বুড়ি চোখের জল মোছে। বুড়ির চোখে কি সত্যি জল না ময়লা, তা স্থির করতে যোগেন বলে, ‘জানে না শুধু তার গর্ভধারিণী মা? স্যায় তো রামচন্দ্ররে জানে—রামচন্দ্রের জন্মের আগে থিক্যা। তাই কৌশল্যা রানী কইলেন, বাবা রাম, মা সীতা, এতটা পথ আইস্যা তো তোমাগো দুঃখ লাগার কথা। যাও, হাত মুখ ধুইয়্যা এডডু জিরায়্যা ন্যাও। যা-ও।

‘আপনারা সকলে মিল্যা তো আমার কৌশল্যা মা। সে পুরুষই হন আর নারীই হন—আমার মা।’

যোগেন দেখে তার নাকের নীচের সেই বুড়ি নিজের কান্না গোপন করতে দুই হাতের তেলো দিয়ে মুখ ঢাকল। তার মাথাটুকু কেঁপে-কেঁপে উঠছিল। বক্তৃতা করতে-করতেই স্বভাববশে যোগেনের মনে পড়ে যায়—একজনই শুধু কাঁদিল না—সে গত বছর সাগরসংগমে সন্তান-বিসর্জন দিয়াছে।

‘মায়ের কাছে কুনো কথা গোপন করা যায় না। আমিও করব না। কইলকাতায় কী হইতেছে, তার কিছু খবর আপনাদের কানেও আইসছে। কিন্তু আসল খবরটা আরো বিপদের, আরো ভয়ের। কংগ্রেস হকশাহেবের সঙ্গে ভোটের আগের কথা ভাইঙ্গ্যা দিছে। তারা হকশাহেবর প্রধানমন্ত্রী কইরব্যার চায় নাই। তহন লিগ আইস্যা হকশাহেবের দখল নিয়্যা চাইর পাশ থিক্যা এক্কেরে বাইন্ধ্যা ফেইলছে। আর হকশাহেবের কৃষক-প্রজা ছালাফাটা বেগুনের নাগাল ছিটকাইয়্যা পইড়ছে। কিন্তু আমাগো বিশ্বাস আছে হকশাহেবরে এডডু সময় পরেই ঘুইরা খাড়াব বাংলার বাঘ।

‘অ্যাহন শুভ সংবাদ এইডা আমরা যারা শূদ্র, তাগো মইধ্যে এডডু মিলমিশ হইছে। আমরা শূদ্ররা তো নবাব-বাদশাগোরের কাছে অচ্ছুৎ। কিন্তু যারা সাধারণ মুসলমান মেম্বার, তাদের সঙ্গে আমাগো মিলমিশ হইছে। সেই বাদে আমরা আদায় করছি, সমস্ত চাকরিতে শুদ্দুরদের কোটা থাইকব্যার লাগব। আর শুদ্দুরপ্রধান অঞ্চলে সরকাররে হাই স্কুল কইর‍্যা দিব্যার লাগব। সরকার রাজি হইছে, কিন্তু এডডা শর্ত দিছে। এই ইশকুলের লগে বাড়ি জমি আর কিছু নগদ জমা দিব্যার লাইগব গ্রামবাসীদের। আমি রাজি হইছি আর এই ভেগাই হালদারের ইশকুলের নাম দিছি। ক্যা? না, ভেগাই হালদার আমাগো পিতামহ ভীষ্ম। যদ্দিন কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধ চইলল, তদ্দিন শরশয্যায় শুইয়া থাইকলেন। রাত্রিবেলা তো যুদ্ধ নিষেধ। তাই, সারাদিনের শেষে আঁধারে গা ঘইষ্যা যুধিষ্ঠির আর দুর্যোধন বেবাক কুরু-পাণ্ডব যাইয়া তার লগে দেখা কইয়্যা জাইনতে যায় পরের দিনের যুদ্ধের কৌশল। সকলেই তো মহাবীর, যুদ্ধে তো সবাইগোর হাতেই কোনো না-কোনো দেবদেবতার বর আর অস্তর। বিষ্ণুর বরের অস্ত্রকে কাইট্যা ফেলায় ব্রহ্মাস্ত্র। ব্রহ্মাস্ত্র কাইট্যা দ্যায় শিবাস্ত্র। শিবের একডা বরের অস্ত্র কাইট্যা দ্যায় আর-একডা বরের অস্ত্র। আর এ দিগে পিতামহ ভীষ্ম, আমাগো ভেগাই হালদার, হইতে পাইরত ভারতের সম্রাট, অ্যাহন শুইয়া আছে একা যুদ্ধের মাঠে। দ্যাবতাগো বরে তো ঘাড় নুইয়্যা যায়—কুনো বরই কাজে লাগায় না, এক ইচ্ছামৃত্যুর বর ছাড়া। আমাগো ভেগাইয়ের নিজের নাই এক ছটাক জমি, সেই জমি দান কইর‍্যা দিল এডডা ক্লাশ টু ইস্কুল কইরব্যার লগে। সেই ইস্কুলে আমি পড়ছি। আমি আগৈলঝরা স্কুলের ছাত্র। কর্তাগো কার সুমতিতে সেই ইশকুলের ক্লাশ ফোর গেল কাটা। আবার ক্লাশ টু। আইজ দ্যাহেন স্কুলের দশা। পাছা বাঁচাইতে গরুও ঢুইকব্যার চায় না। কিন্তু চাকরির কোটা আদায় কইর‍্যা লাভ হব কী, যদি আপনাগো ছাওয়াল-পাওয়ালগো লেখাপড়া না শিখান। ধরেন, আইজ যে-ছাওয়াল ক্লাশ ওয়ানে পড়ব—এইসরকার থাইকতে-থাইকতে তো স্যায়া ক্লাশ ফোরে উঠব। তালি তো এই স্কুলড্যাক অন্তত ক্লাশ ফোর বানাইব্যার লাগে। দুই বছরে ক্লাশ ফোর হইয়া গেলে ক্লাশ সিক্স, মডেল স্কুল খুইলবার লাগব। তার বাদে হাই স্কুল। বানাইব কেডা? শিখব যার বেটা। জমিদার বা সরকার তাগো বাপ ঠাকুরদার নামে স্কুল বানাইবে আর সেই স্কুলে পইড়ব আমাগো নাতিনাতনি—স্যা সব দিন শ্যাস। পইড়তে যদি চাও নিজেরা স্কুল বানাও। সেই স্কুলে যদি মাস্টার আসে, ছাত্র আসে, পড়া আসে, লেখা আসে—তহন সরকারও আইসব। ভবানন্দ মজুমদারের বাড়িতই লক্ষ্মী ঢোকেন। গায়ের গয়নাগুলার ওজন ভাইবছেন নি? ভরি-র মাপে কুলাইবে না, মণের মাপ লাগব। মা-লক্ষ্মী সোনার গন্ধ পান। আমাগ ভবানন্দ মজুমদার হব্যার লাগব। আমাগ নিজের পকেটের টাকা দিয়্যা এই স্কুল তৈরির শ্যাষে সরকারে খবর পাঠাইব্যার লাইগব—আমরা রেডি। এইবার লক্ষ্মীরে পাঠাইন—ডাকাইতের ভয়ডর নাই। তাই আইজ আমরা নিজেরা চান্দা দিব, চান্দা তুইলব, জেলখাটা আসামির তুল্য ছাত্রছাত্রী জুগাইব—যাইতে পুরা মেয়াদ খাটার আগে য্যান ছাড়া না পায়। আপনারা জিগ্যাইব্যার পারেন—এমন ইস্টিমার ফ্যালের ডরে নোরপাড়ার কাম কী? কামডা এই যে সত্যি-সত্যি ইস্টিমারডা আইসছে। সরকার এইবারের বাজেটে অনুন্নত সম্প্রদায়ের বসবাসের জায়গায় স্কুল তৈরির জইন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ করছেন। মাত্র পাঁচ লাখ টাকা দেখতে-না-দেখতে ফুড়ুত হইয়া যাবে। পরের বছর যে এই বরাদ্দ থাইকবেই তার তো কুনো ঠিক নাই। তো আমাগো হাতে তো টাইম নাই। ইস্টিমার তো ছাইড়ব্যার বাঁশি বাজাইল বইল্যা। আমাগো এড্‌ডা স্কুল তো আছে, ভাঙাচোরা যাই হোক। সেই স্কুলডার সঙ্গে মহাত্মা ভেগাই হালদারের নামডাও তো জড়ান আছে। আমরা যদি একডা তহবিল এখনই তৈর কইরব্যার পারি, তালি কইলকাতায় ফিরাই আমি শিক্ষামন্ত্রীরে কইব্যার পারব—আমাগ স্কুল তৈরি আছে, আমাগ তহবিল তৈরি হইছে, তাইলে আমাগ ক্লাশ ফোর পর্যন্ত খুইল্যা দেন আর আমাগো অর্থ সাহায্য করেন। একডা শর্তে আমরা কমতি আছি। সেইডার দায়িত্ব আপনাগো নিব্যার লাগব। স্কুলের ছাত্র বাড়াইয়্যা তিনগুণ করা লাগব। মিথ্যা কইরাও যদি কই অ্যাহন ছাত্র শখানেক তাইলি সামনের পূজার ছুটির মুখে সেডা সত্যিকারের তিনশ কইরব্যার লাইগবই। না হইলে দ্যাশের সম্মুখে আমার মুখ থাইকব না। আমি এই তহবিল গঠন বাবদ খান বাহাদুরের নিকট আমার বাপের নামে আর আমার শ্বশুর বাপের নামে মোট আড়াইশত টাকা জমা কইরল্যাম। টাকাডা আড়াইশ ক্যান হইল, তার জবাব সঙ্গে আমার আর টাকা নাই। কইলকাতায় ফিরার খরচাপাতি ধার কইরতে লাগব।’ পকেট থেকে টাকা বের করে খানবাহাদুরের সামনে রাখতেই যোগেনের শ্বশুর খাগবাড়ির প্রহ্লাদচন্দ্র বারুই দাঁড়িয়েই উঠে তার তপনের পকেট থেকে টাকা বের করে খানবাহাদুরের সামনে রেখে বলেন, ‘আমার জামাই শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বিএ, বিএল, এমএল-এর নামে তিনশত টাকা জমা দিলাম।’ এরপর একের-পর-এক মাতব্বর দাঁড়িয়ে তার চাঁদা ঘোষণা শুরু করল।

দেখতে-দেখতে এক-একজনের ওঠা, চাঁদা দেয়া এই সবের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা এসে পড়ল। সবাই সভার দিকে তাকিয়ে টাকা ঘোষণা করছেন, তারপর সেটা খানবাহাদুরের হাতে দিচ্ছেন আর প্রহ্লাদ একটা কাগজ ডামি কাগজের মত ভাঁজ করে দাতার নাম ও টাকার অঙ্ক লিখছেন। খানবাহাদুর আবার নেয়ার সময় টাকা গুনেও নিচ্ছেন। দু-একবার জিজ্ঞাসাও করলেন, ‘কত য্যান?’

চাঁদা আদায়ের শেষে যোগেন খানবাহাদুরকে বলে, ‘সবাই তো আইজ সঙ্গে টাকা নিয়্যা আসেন নাই। পরের একডা দিন ঠিক করেন—চান্দা আর ছাত্তর একসঙ্গে জমা হবে।’

খানবাহাদুর সে-কথা জানাতে দিন নিয়ে কথা শুরু হল। কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল—সেদিন যোগেন থাকবে কী না। যোগেন বলল, ‘শ্রাবণের মাঝামাঝি পর্যন্ত তো থাহারই কথা।’ সেই কথা খেয়াল রেখেই দিন একটা ঠিক হল। খান বাহাদুর গলা তুলে জানায় ‘আমাগো প্রহ্লাদবাবু হিশাব কইর‍্যা ফেলছেন, আইজকার মোট আদায় সাতাইশ শত টাকা—’

‘প্রহ্লাদবাবুরে আর-একবার গুইনতে কন। এতগুলা টাকায় কি সাতাইশ টাকা হবার পারে?’ খানবাহাদুর দুই হাত তুলে চেঁচিয়ে বলে, ‘সাতাইশ শ। সাতাইশ শ। দুই হাজার সাত শ! আমার মতন বয়স হোক, দাঁতগুলা পইড়লে বুইঝব্যা দুইডা শ’ একত্রে বলা কত কঠিন। যারা আইজ দিতে পারেন নাই, তাগো দিন ধার্য হইছে—শ্রাবণের এগার, এইখানে।

সভা তখন ভেঙে যাচ্ছে। পণ্ডিতমশায় পেছন থেকে বলে ওঠেন, ‘আমার এন্ড্রু নিবেদন আছে।’

খানবাহাদুর তাঁকে ডাকে, ‘আসেন, আগাইয়া আসেন।’

পণ্ডিতমশায় খানবাহাদুরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘খানবাহাদুরশাহেব, যোগেন আরো-আরো সবাই কইছেন, যারা আজ চান্দা দিছে আর যারা পরের দিন চান্দা দিব তাগ কথা। কিন্তু এই দুই দলকে ছাইড়া দিলেও তো একডা দল থাহে। সেই দলডা, পছন্দ হয়, এই দুই দল মিলাইলে যত জন হয়, তারও থিক্যা বেশি।’

পণ্ডিতমশায় থেমে যান আর লোকজন পণ্ডিতমশায়ের দিকে তাকিয়ে একেবারে চুপ করে থাকেন। বেশিরভাগই দাঁড়িয়ে, কেউ-কেউ বসে। নৈঃশব্দ্যটা তাঁর আকাঙ্ক্ষিত পরিমাণে পৌঁছুলে পণ্ডিতমশায় বলে ওঠেন, ‘সেই তৃতীয় দলটা হচ্ছে আমাগ নিয়্যা, যারা আইজও চাঁদা দ্যায় নাই, পরের দিনও চাঁদা দিবে না, ইহকালেও দিবে না, পরকালেও দিবে না। কারণ? কারণ, চান্দা দেয়ার পয়সা আমাগো কুনোদিনই নাই, কুনোদিনই হব না, পরজন্মেও হব না।’

মিটিঙের লোকজন ততক্ষণে মজা পেয়েছে।

‘কিন্তু আমরা যদি চান্দা না দেই তাইলে এই জাগরণ, এই উৎসব মিথ্যা হইয়্যা যাবে। বিশ্বের কাছে যিনি আমাগো মনের কথা কইয়্যা আমাগো সম্মান ফিরাইয়্যা দিছেন সেই কবি বইল্যা দিছেন—তবে মিছে সহকার শাখা, তবে মিছে মঙ্গলকলস। তাই আমরা এই গৌরন্দি-আগৈলঝরা-বাখরগঞ্জ-বরিশালের সর্বত্র আমাগ সব মাইনষের কাছ থিক্যা ভিক্ষা কইর‍্যা পয়সা আইন্যা দিব। একডা লাল পয়সা দিলেও আমরা সেব্যা দিয়্যা নিব। আর, আমরা বিশেষ কইর‍্যা গৌরনদী আর আগৈলঝরা থিক্যা ছাত্তর আইন্যা দিব আর নিজেরা পাহারা দিব সে ছাত্তর য্যান না পলায়। কুনো বামুনবৈদ্য জমিদারের বাপঠাকুরদার নামে না। আমাগো ভেগাই হালদারের নামে আমরা ইশকুল কইরব। সে-ইশকুল থিক্যা কোনো পলায়ন নাই। জয় ভেগাই হালদারের জয়। এই ইশকুলের লগে একডা কিছু আমাগো দিব্যার লাইগবো—

টাকা থাইকলে চান্দা দ্যাও,
না থাইকলে ভিক্ষা করো,
ছাওয়াল থাইকলে ছাওয়াল দ্যাও,
না থাইকলে পয়দা করো।’

মিটিঙের মানুষজন এতে খুশি জানাল হৈহৈ করে নানা আওয়াজ তুলে। একজায়গায় জড়ো হওয়া—সবসময়ই যেন উৎসব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *