৫৮. যোগেনের কীর্তিতে প্রহ্লাদ ও শিবুর গৌরব
যোগেনের কথার পর বেশ কিছুক্ষণ শুধু কেদো বন দিয়ে হাওয়া বইবার আওয়াজ আর নৌকোর সঙ্গে কেদো ঘাসের ঘর্ষধ্বনি। কেদো বনের সীমা বোধহয় শেষ হয়ে আসছে। এবার হয়ত নদীতে পড়বে, মধুমতীতে, দু-একবার বৈঠার ছপছপ ওঠে।
প্রহ্লাদ ধীর গলায় বলে, ‘তুমি যেডা কইল্যা সেডা তো ঠিক কথাই। ১৩ জন নমশূদ্রই তো এক-হাঁড়ি হইব না। তাইলে আর বাইরের কেডা পাত্তা দিব আমাগ?’ ‘এইডাই তো কথা প্রহ্লাদদা। তোমার পাত্তাড়া তোমারেই ঠিক কইরব্যার লাইগব। এই মাস ছয়ে আমার এইডাই শিক্ষা হইল—এ-জন্মের যত পাপ অ্যাদ্দিন ধইরা করছি আর যদিন বাঁচব তার প্রত্যেকডা দিন, সেই পাপগুল্যা আবার করব। সামনের জন্মেও কইরব। এই পাপের পাহাড়ড়া হইল আইনসভায় মেম্বারের জামানত। নেতাগ কথা কই। আমাগো মত যারা চ্যাংড়ার দল তাগো ট্রেনিং দেয়ার ইশকুল হইল আইনসভা। বেশি দিন না—পাঁচ-সাত বছরেই তোমাগ মালুম দিবে আমরা কেমন কোপান ছাড়া মাথা কাটা শিখছি। রক্তপাত নাই, থানাহাজত নাই, অস্ত্রশস্ত্র নাই কিন্তু বেবাক মানুষ সাফ। এইডাই কাম—লাটশাহেব থিক্যা চাপরাশি।’
‘লাটশাহেবও? তাইলে অ্যাপিল কার কাছে?’ শিবুর স্বরে একটু নিরাশ্রয়তা আসে। এটা হয়ত তার বিশ্বাসের অংশ।
‘শুনো। মন্ত্রী করার মিটিঙে আমারে ডাকছিল। মিটিং শ্যাষ হওয়ার পর দেহি, আমারে ডাকার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। কীরকম রাগ উইঠ্যা গেল। লাটশাহেবের পথ আটকাইয়্যা কইল্যাম, ‘স্যার, আমারে ক্যান ডাকা হইছিল সেডা তো বোঝা গেল না’।’
‘কইল্যা? যোগেন? লাটশাহেবরে?’ প্রহ্লাদ বিস্ময় লুকোতে পারে না, মধুমতীর নীল বিস্তারে সে-বিস্ময় যতই কেন না অবান্তর দেখাক।
শিবু হালদারের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসে যেন, ‘দিল্যান কইয়া? সিধা? বুক চিতাইয়া?’
‘কইত্যাম না। ঐ গোপন মিটিংডায় হকশাহেব, খাজা, সুরাবর্দি, আর দুই-একজন ছিল। অগ ঘরুয়া কোন্দলের উপর লাটশাহেব হুকুম জারি কইরবে বইল্যা। তার মইধ্যে আমারে ডাইকবে ক্যা? ভুলই কইরছে হয়ত। কিন্তু ঐহানে যেসব কথা নিয়্যা রাগারাগি ঘইটল, সেডা তো একডা ভুল-কইর্যা ডাকা মানুষের সামনে হওয়া ঠিক না।
‘সে মানুষড়া রক্তে তো চাঁড়াল। রাগ উইঠ্যা গেল রগে—চিরডা কাল বামুন-কায়েতরা এমন কইরা তাকায় য্যান ঐহানে কুনো মানুষ নাই। ক্যা? এই হানে তো আমি সরাসরি ভোটে জিত্যা আসছি। হকশাহেবও যা, আমিও তা। বরাং খাজা-র থিক্যা আমি বড়। পটুয়াখালিতে হকশাহেবের কাছে ঐ চুব্যান খাইয়্যা সেই হকশাহেবরে হাতপায় ধইরা মেম্বার হইয়্যা মন্ত্রী হবি। হঠাৎ মনে আইস্যা গেল—কেডা রে লাটশাহেব? আমারে যে মানুষগুল্যা ভোট দিচ্ছে—তাগো অপমান হইল না? সিধ্যা কয়্যা দিল্যাম লাটশাহেবরে, বুক চিতাইয়া, একবারও ভগবানের নাম না-নিয়া?’
‘লাটশাহেব আপনারে চিনছে?’ শিবু জিজ্ঞাসা করে।
‘আরে, এগ চেনা-অচেনা কে বুঝে? লাটশাহেব থমক্যাইয়া আমার ঘাড়ে হাত রাইখ্যা জাইনতে চালেন। জাইন্যা, পিছন চিফ সেক্রেটারিরে জিগাইলেন। চিফ সেক্রেটারি আমার আর-এক পাশে খাড়াইয়্যা কইল, মিস্টার মণ্ডল, আপনারে পরে ব্যাপারডা বুঝায়্যা দিব।’
‘সেই পর আর আসে নাই, এই তো? এ তো আমাগো ইজা হাটে রোজ একশ দিনের ঘটনা। আপনারে শ্যাষে এতগুলা মানুষ ভোট দিয়্যা ইজার হাটে পাঠাইলাম? ওকালতি ব্যাবসা গেল, জিলা বোর্ডের এড্ডু-আধডু কামকাজ হইবার যা আশা ছিল, গেল। ইজরার হাটেই যদি যাইব্যার লগে, তাইলে দ্যাশের ইজ়ার হাটে বসাই ভাল। মিছা কইরা কইলকাতার ইজার হাটে ঢুকার কাম কী? অগোডা অগৌহ থাউক। লোকসানের ব্যাবসায় হালখাতা বছরে সাবার কামডা কী?’ শিবু হালদারের মুখটা তেতো দেখায়—ঠোঁট বেঁকা, চোখ ট্যারা, কপালে ভাঁজ।
‘শিবু, তোমার এই দোষটা ছাড়ো। কথা শুইন্যাই কথাডারে একডা পাথর, ভাবার কাম কী? যোগেন কী অবস্থায় কী করে সেডা তো স্যায় আগৈলঝরার জনসভায় বা আড়কান্দির ঠাকুরবাড়িতে কীর্তন গাইয়্যা বইলব্যার পাইরব না। সেডা তো ওর লগে পরামর্শ কইর্যা জাইনব্যার লাইগব। যোগেনকেও তো জানাইব্যার লাগব। একটা কথার কতগুল্যা সুত্যা? শিবু—’
‘যতগুল্যাই হোক, শুইন্যা ফেলি। কয় কী লাটশাহেব—’
‘যোগেন, কও, আগে শুনি তো, কী করা তা পরে ভাবা—’
নৌকোটা মধুমতীর একটু ভিতর দিকে ঢুকছে। বৈঠার আওয়াজের সঙ্গে এবার জলের আওয়াজটাও উঠছে। উত্তর-পুব থেকে একটা বেশ জোর হাওয়া খেপে খেপে আসছে, তাই আসে, ওদিকে বিসাদির বিলের ওপরের ফাঁকটা, নদীতে তো হাওয়া থাকবেই। নদীর স্বাভাবিক হাওয়া বয় সমান গতিতে—সে প্রায় বাড়তেও পারে কিন্তু বোঝা যায়, সে-বাতাসের পেছনে ঝড় নেই। হাওয়া যদি খেপে-খেপে আসে, তাহলে মাঝিকে একবার আকাশ দেখতেই হয়। যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর-পুবের আকাশটা একপলক দেখে নিয়ে বলে, ‘আইস্যা পইড়ল্যাম তো!’
‘আইস্যা পড়লেন না, আইস্যা গেলেন। কিন্তু কথাডা—’
‘কথাডা যহন তুইল্যাই ফেলছি, পুরাটাই কওয়া দরকার। আমি সেই লাটশাহেবের আশপাশের ভিড়ে গেলাম আইটক্যা। বারানোর পথ পাই না। দেহি, আবার মাথার উপর দিয়্যা একডা টুকরা কাগজ কে বাড়াইয়্যা ধইরল লাটশাহেবের দিকে। লাটশাহেব তহন মন্ত্রীগ লিস্টি পইড়তেছিল। স্যায়, একবার ট্যারাইয়া হাতের সেই শিলিপড়া দেইখ্যা, হকশাহেবরে কী দেখাইল। হকশাহেব তহন হাততালি দিয়্যাই চলছে, একবার মুখটাই হাসি রাইখ্যা চক্ষুড়া ট্যরায়,’ যোগেন অভিনয় করে দেখায় আর তাতে এদের দু-জন হেসে ওঠে, ‘আরো, কী কইব, লাটশাহেব নাম কইল—মুশারফ হোসেন, জলপাইগুড়ির নবাবশাহেব। কী কইরব, এই নামখান একবারে জইন্যও সেই মিটিঙে উঠে নাই। কওয়া নাই, বার্তা নই, ফরিয়াদি নাই, সাক্ষী নাই, এক মন্ত্রীর নাম মুইছ্যা আর-এক মন্ত্রীর নাম আইস্যা গেল। লাটশাহেবের মুখ থিক্যা। বুইঝল্যা—কীসের মধ্যে আছি?’
‘আপনি কইলেন-না ক্যা? কই, এই নামডা তো মিটিংয়ে পাস হয় নাই?’
‘ক্যান কই নাই? সেডা কই। প্রথমত, আমার গলা বাড়াইব্যার কোনো ফাঁক ছিল না। আমি যদি চিল্লাবার ধরতাম, ঐহানে কেউ ট্যার পাইত না—কথাডা উঠে কোথ থিক্যা।’
‘আর যে-কইল আপনারে পরে বুঝাইয়্যা দিবে আপনারে ঐ মিটিঙে ডাকছিল ক্যা?’
‘সে তো কইল আমারে, ঐ ভিড় ভাঙতে-না-ভাঙতেই। কী য্যান কইল হাইস্যা-হাইস্যা। কিন্তু আমার ততক্ষণে হিশাব বুঝা সারা। আমারে বস্যাইয়্যা রাইখছিল সাক্ষী গোপাল কইর্যা। লাটশাহেব সেদিন মন্ত্রিসভা বানাইবই। আমি তো নতুন তৈরি শিডিউল কাস্ট অ্যাসেম্বলি পার্টির নেতা। আমার হাতে তো কম কইর্যাও তিরিশ মেম্বার, আরো কম কইরা ধইরলেও তেইশ মেম্বার। হকশাহেবই হোক আর খাজাশাহেবই হোক—বেশি ব্যাগরবাই কইরলে দুইডারেই বাদ দিয়্যা পছন্দের কাউরে প্রধানমন্ত্রী কইরত। তার লাইগ্যা আমারে একবার জিগাইত—তোমরা কি সাপোর্ট দিব্যা? এক লপ্তে তিরিশডা ভোট কি দুইডা কথা? জামিন রাখছিল, জামিন।
‘তাইলে জিগাইল না ক্যান তোমারে?’
‘জিগ্যাবার কাম নাই বইল্যা। হকশাহেব আর খাজাশাহেব আমারে ঘরে দেইখ্যাই বুইঝ্যা গিছে—তাগ বদ্লা রেডি আছে।’
‘মন্ত্রী যে বদলাইল’
‘আমি কই সে-কথা? মুখের উপর কইয়্যা দিবে লাটশাহেব মন্ত্রিনিয়োগ কইরতেছেন, তুমি কেডা কবার? যতবার ইচ্ছা ততবার বদলাইব।’
‘তাইলে শুইনল্যাম স্বাধীন হওয়ার আগে এইডাই শ্যাষ ধাপ। আইনসভা তৈরি হইয়্যা থাইকল—অ্যাহন বুইঝ্যা-শুইঝ্যা একদিন স্বরাজডা পাশ করায়্যা দিবে,’ শিবু বলে।
ভাবখান তাই। খানিকড়া হওয়ারও পাইরত কংগ্রেস যদি হকশাহেবের লগে এই মিরজাফারি না কইরত। হকশাহেব, শরৎ বোস, কিরণশঙ্কর, শামসুদ্দিন, নৌসের আলি, মুকুন্দমল্লিকরে নিয়্যা মন্ত্রিসভা হইলে সেডা স্বাধীনের থিক্যা কম হইত কী সে?’
‘যোগেন, কংগ্রেস এমনডা কইরল ক্যা, কিছু জানব্যার পার পরে?’
‘পরে ক্যা? তহনি তো হাঁড়ি ভাইঙ্গ্যা গেল। এ হানের কংগ্রেসের ইচ্ছাই ছিল। গান্ধীজি আর পণ্ডিতজির হুকুম—মন্ত্রিসভায় যাবা না। মুসলমানগ সাথে মন্ত্রিসভায় গ্যালে সারা ভারতের মুসলমানরা ঢি-ঢি কইরবে।
‘লিগের মুসলমান আর প্রজার মুসলমান যে এক না—এইডা বোঝার মতন একটা মানুষ ছিল না কংগ্রেসে?’ প্রহ্লাদ খুব দুঃখ পায়
‘কংগ্রেসের লিডার সারা ভারত নিয়্যা একডা হিশাব ছিল, ভয়ও ছিল এহানে সিটে মুসলমান বেশি। তাগ তো ভাবনা অন্য সব প্রভিন্স লইয়্যাও। সেখানকার মুসলমানরা লিগরে ভোট না দিয়্যা কংগ্রেসরে দিছে। তাগো জোটে রাখাডা তো কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ। বাংলায় মোট সিটে লিগ-প্রজা ছাড়াও আছে স্বতন্ত্র মুসলমান—তাগ লিগ বা প্রজায় টাইনতে আর কতক্ষণ। আর, আছে তেইশডা বা বতিরিশডা শিডিউল। টুপশালি। তারা কংগ্রেসরে সমর্থন দিলেও, দড়ির উপর দিয়্যা হাঁটা। মুসলমানরা বেবাক এক হইলে কংগ্রেস বেইজ্জত হইয়্যা পইড়বে। আসল কথা—বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসরেই তো নিখিল ভারত কংগ্রেস বিশ্বাসে নেয় না।’
পাড়ের কাছাকাছি আসতেই সেই অচেনা লোকটি প্রথম মুখ খুলল—’আপনারা তো নাইমবেন এইখানে? না আগুইয়্যা যাব?’
‘এইহানে কি ঘাট আছে’, একটু সোজা হয়ে শিবু ঘাট খোঁজে,’
‘কই মিয়া, ঘাট তো দেহি না।’
‘সব ঘাট কি সদরঘাট। এইহানেই তো নামাইব্যার কইছে—’ অচেনা লোকটি বলে।
‘তোমাক কইছে? কেডা’ শিবু প্রশ্ন করে।
‘যে-মাত্ত্বর আমারে ডাইক্যা নিল।’
‘আরে, আমরা তো খাগবাড়ি ছাড়ার পর কোনো ঘাটে থামি নাই, ঘাটও দেহি নাই, তোমারে কানে-কানে কইয়্যা গেল কোন্ ঘাটের মাতবর?’ শিবু জেরা করতে থাকে।’
‘আপনেই তো কইলেন, সেই যেহান থিক্যা ছাইড়লেন, যেহানে নাওয়ে উইঠলেন।’
‘খাগবাড়ি—?’
‘ইচ্ছা হইলে, কবার পারেন। তাই কন—খাগবাড়িই কন।
‘খাগবাড়ি হইলে তো খাগবাড়ি কব? তুমি খাগবাড়ি চিনে না?’
‘খাগবাড়ি আমার না-চিননের কী আছে? এত বড় নদী, এতগুল্যা খাল–তার মইধ্যে খাগবাড়ি কি একডা?’
নৌকো তখন পাড়ে ঠেকে গেছে। দাঁড়িয়ে, যতদূর চোখ যায় দেখে, বলে, ‘এইডা ঠিক পাড় তো? গোপালগঞ্জের? কিছুই তো দেহি না। ভুল জায়গায় নামাও না কী?’
‘আপনাগ জায়গার ভুল-ঠিক আমি বুইঝব ক্যামনে? আমারে যদি রওনার ঘাটে ফিরা যাইব্যার কন, চলেন গিয়া।
‘এই শিবু, খাড়াও। মানুষড়ার মাথা ঘুরায়্যা দিও না। এহানে নাইম্যা কোহানে যাব, তাও তো বুঝি না,’ প্রহ্লাদ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সে পায়ের আঙুলের ভর দিয়ে লম্বা হয়। সঙ্গে সঙ্গে হাতও উঁচু করে নিষেধ বা ডাকার ভঙ্গিতে।
যোগেন আন্দাজ করে, গোলমাল কিছু হয়েছে জিগাবই।
যোগেন খুব ঠান্ডা গলায় লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে, যেন শিবু আর প্রহ্লাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, যেন এটা নৌকো না, একটা লঞ্চ, নানা ঘাটের যাত্রী নানা ঘাটে নামে—’মিয়ার বাড়ি কনে? গোপালগঞ্জে?’
‘আমরা সাতপুরুষ্যা সাত্লাবিল্যা। গোপালগঞ্জ হব ক্যা?’
যেন ও বেশ দেখেশুনে বেছেবুছেই সাতলাবিলে থাকে, যেন গোপালগঞ্জ তার পক্ষে ঠিক জায়গা না। বিলের মানুষ বিলের কাছছাড়া হয় না, নদীর মানুষ নদীর কাছছাড়া হয় না, বনের মানুষ বনের কোল ছাড়ে না। এর কারণ খুব কিছু দুর্বোধ্য নয় তবু এই ঘটনাটাকে একটু রহস্যে ঘিরতে ভালবাসে।’
যোগেন আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘খ্যাপ মারেন কোন্ খালে-মাদারিপুর না বিষখান্দিতে?’
‘ক্যা? এই দুইখান ছাড়া খ্যাপ নাই নাকী? হে দেশে বেবাকই তো খ্যাপ–’
‘সে কথাডা তো ঠিকই। এইডা তো বড় খ্যাপ ছিল, রোজ তো আর এই খ্যাপ হয় না, চেনা খ্যাপে তো দুইডা চক্ষু বন্ধ কইর্যা, দুইডা না-হইলে একডা, অন্তত একডা চক্ষু বন্ধ কইর্যা, নাও চালান যায় জলের গন্ধ শুইক্যা। না? কিন্তু যে-একখ্যাপ রোজের না, তাতে তো জলের গন্ধও চিনা না, তাতে কিন্তু মিয়া, আধখানা মোদ্যা চোখের আধখান ঝিমানিতেই জলের দিশ্যা বদলাইয়্যা যাওয়ার পারে। পারে না?
যোগেন কথাগুলি বলছিল বেশ রসিয়ে রসিয়ে একটু-আধটু অভিনয় করেও—দু-চোখ বন্ধ মুখ নিয়ে নৌকো-চালানো কেমন, একচোখ বন্ধ ঘুম কেমন, আধচোখ বন্ধ ঘুম কেমন। যোগেনের কথা শুনে ও বলা দেখে বৈঠা আর লগির চার জোয়ান হেসে ফেলে। হেসে ফেলে, কেউ হাত দিয়ে, কেউ গামছা দিয়ে হাসির আওয়াজ আটকায়।
শিবু আর প্রহ্লাদ পাড়ে উঠে গেছে জায়গাটার হদিশ করতে। যোগেন টের পায়, লোকটি একটা কোনো ভুলের দায় থেকে পিছলতে চাইছে। আর, তাদের এদিককার রীতিনীতি পুরোপুরি মেনেই সে পিছলচ্ছে, যাতে তাকে দোষী ধরা না যায়। তার শ্বশুরবাড়ির ঘাটকে খাগবাড়ির ঘাটেই বলে কী না, তা তো যোগেনই জানে না। এইসব নাম বলে জায়গা বের করা—অসাধ্য ব্যাপার। হয়ত, পুবদিকের খাল দিয়ে ঘাটে নৌকা এলে বলে মাগবাড়ি দিয়া আল্যাম। হয়ত ঐ ঘাটে বাঁধা নৌকো পশ্চিম দিকে গলুই নিয়ে যখন ছাড়ল তখন বলল, খাগবাড়ি দিয়া যাই। আর, মাব্বরের নাম? মাতব্বর নিজে নি জানে? এই ভোটে নামপত্তরের দরকারডা বোঝা গেইছে মাত্তর। ওরা যে জলপথ দিয়ে এসেছে সেটা ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ ছাড়া অন্য কোনো জায়গা হতেই পারে না। খুলনা-যশোর-ফরিদপুর-বরিশাল-ঢাকাতে ছড়ানো এই তো যোগেনের শূদ্রভূমি। এর আর ঠিক-ভুল কী? কিন্তু গোপালগঞ্জর হওয়ার পক্ষে ঘাটটা একটু বেশি নিরালা ও নির্জন। হয়ত আর একটু তলা বা আর-একটু উঁচুর দিকে গেলেই গোপালগঞ্জের সেই ঘাটটা পাওয়া যাবে, যেটা মানানসই। তাদের নিয়ে যাওয়ার লোকজনও হয়ত সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। মাঝিরা যে জলপথে আরো ঘুর না দিয়ে একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে—সেটাই তো বাঁচোয়া। না-হলে তো তাদের জলে-জলে পাক খেয়ে যেতে হত। মাঝিটি এইটুকুমাত্র নিশ্চিন্ত হতে চাইছে যে সে তার প্যাসেঞ্জারদের গোপালগঞ্জেই নামিয়ে দিয়েছে। না-হলে মাঝির পুরো টাকাটাই তো মাতবর মেরে দেবে।
লগির একটি ছেলে যোগেনকে বলে, ‘আমরা তো ঐ ঘাট থিক্যাই ছাড়ছি, যে-ঘাটে ঠাকুরের পূজা তুল্যা দিলেন মা-ঠাইর্যানরা। ঐ বাড়ির মাতব্বরই তো ওকে ডাকাইছে আর কইছে গোপালগঞ্জে যাব্যার—’
যোগেন এতই প্রাণ খুলে হাসে যে চার তরুণ মাঝি তার সঙ্গে যোগ না দিয়ে পারে না। যে মিঞাকে নিয়ে এত কথা সে হাসল না বটে, তবে চোখ ঘুরিয়ে এদের দেখছিল। যোগেন তার সেই হাসির গলাতেই বলে ওঠে, ‘দেইখছ নি? কতখান বুদ্ধি আমার পোলার। পূজার ঘট নিয়্যা আইস্যা, পুজা ভুইল্যা, ঘট ভুইল্যা, মন্দির খুঁইজবার লাগছে? হ, হ, সোনাই, আমরা ওড়কান্দিই নামি? তাইলে কি এইহানে নামলে হব না, আর–আড্ডা য্যান ঘাট আছে না—নীচের দিকের কয়েক ধাপ বাঁধান? আছে-না? তোমারই ঠিক কইরা দ্যাও বাবা, আমাগ কোথায় নাইমলে সুবিদা। অগ ডাকো, প্রহ্লাদদা, অ প্রহ্লাদদা, শিবুবাবু, অ শিবুবাবু। বাবা, তোমরা একজন নোর পাইড়্যা অগ একজনকে ধইর্যা কও যে জায়গা পাওয়া গিছে, আমি ওদের ডাইকত্যাছি।
একটি বৈঠার ছেলে যেন উড়ে গেল—পাড়ে।
ওরাও গল্পে-গল্পে খেয়াল করেনি, আর মিয়ারও একটু ঝিম লেগে থাকতে পারে—যে-বাঁক নিয়ে ওরা মধুমতী থেকে বাঁয়ে ঘুরেছিল, ঘোরাটা উচিত ছিল তার আগের বাঁকে। তাহলে ঠিক জায়গায় পড়ত। সেই দিকেই এখন যাবে। একটা জায়গাকে যদি যখন যে-নামে ইচ্ছে সে-নামে ডাকা হয় তাহলে জায়গাটার একটা হদিশ হয়ত পাওয়া যায় আর ফৌজদারির আসামি ছাড়া বেশিরভাগ লোকজন তো হদিশ দিয়ে বা নিয়ে কাজ সারে। গোপালগঞ্জ কি একটুকরো জায়গা? বরিশাল থেকে যখন আসছ তখন গোপালগঞ্জ বললেই হদিশ। গোপালগঞ্জে এসে আবারই হদিশ—কোটালিপাড়া না কাশিয়নি, পুবপাড় না পশ্চিমপাড়। সেইটা হদিশের পরও তো হদিশ দরকার—ওড়কান্দি না পদ্মবিল্যা।
প্রহ্লাদ ও শিবুকে নিয়ে সেই ছেলেটি ফিরে আসে। সে পাড় থেকে এক লাফে নৌকোয় নামে, নৌকোটা দুলে ওঠে। প্রহ্লাদ পাড় থেকে চেঁচিয়ে বলে, ‘এইহানে নাইমলেও হাঁইট্যা যাওয়া যায়। তুমি ডাইকল্যা ক্যা?’
‘এর মইধ্যে নিজের পেশাডা ঝালাইয়্যা নিলাম। এই মিঞারেই শ্বশুরমশায় খাগবাড়ি থিক্যা ঠিক কইর্যা দিছেন। পছন্দ হয়, শ্বশুরমশায় কোথায় যাইতে হইব বইলতে গিয়্যা ফরিদপুরে, গোপালগঞ্জ, ওপার, ঠাকুরবাড়ি, পদ্মবিলা—সব নামই একবার-না-একবার কইছেন। অ্যাহন, এই আমার সোনার পোলাডা মনে করাইয়্যা দিল—পূজার ঘটের কথা। তোমরা তো নদী আর পৃথিবী খুঁইজ্যা অস্থির। পূজার ঘট দ্যাহ নাই। নাইম্যা আইসো। মিয়া আমাগো ওড়কান্দির ঘাটেই নামাইব। নাইম্যা আইসো।’
প্রহ্লাদ আর শিবু যে খুব সাবধানে পাড় ভাঙে, তা নয়, তবে এটুকু সময় তো তাদের লাগবেই। নৌকোয় উঠে বসতে-বসতে প্রহ্লাদ বলে, ‘নদী এইহানে এডডু আড়াল। এহান থিক্যা হাঁইট্যা যাওয়া যায়, আবার নদী দিয়্যা নাওয়েও যাওয়া যায়।’
‘এডা কী কইল্যা প্রহ্লাদদা? হাঁইট্যা আর নাওয়ে তো পৃথিবীর সব জায়গাতেই যাওয়া যায়। তিনভাগ জল, একভাগ স্থল। তাইলে হাঁইট্যা যাওয়ার অসুবিধাড়া কী? একডা দরকারি কথা শুরু হইছিল, হাঁটতে-হাঁটতে চইললে তো কথাড়া কওয়া যাইত। আর, নাওয়য়ে তো লগির একখান খোঁচা দিব আর ওড়কান্দির ঘাটে নামা লাগব। কথার কাম শ্যাষ। চলো, হাঁইট্যাই যাই। চ-লো।’
যোগেন দাঁড়িয়ে পড়ে। রোদের তাপ থেকে মাথা বাঁচাতে সে যে একটু কাপড় মাথায় দিয়েছিল, তাতে তার কোঁচার খানিকটা খুলে গিয়েছিল। আবার কোঁচাতে যেতেই ধুতিটা নদীর হাওয়ায় পালের মত ফুলে ওঠে। মাঝি-ছেলেরা মুখের হাসি হাত চাপা দেয়। ততক্ষণে ঘটটা মাথায় তুলে নিয়ে শিবু নেমে গেছে, পেছনে প্ৰহ্লাদ।
যোগেন যখন নামে এরা উঠে দাঁড়ায়।
‘চলি বাজানরা’, ‘সালাম মিয়াভাই’ বলে যোগেন এক লাফে পাড়ে নামে।
