১০
2 of 4

৯৩. গান্ধী মুগ্ধতা থেকে পরিত্রাণ

৯৩. গান্ধী মুগ্ধতা থেকে পরিত্রাণ

পরদিন, ১৯ মার্চ, যোগেন শেয়ালদায় পৌঁছুল একেবারে শেষ মুহূর্তে, হাতে তার সেই পোর্ট ফোলিও ব্যাগ। তাতে ঠাসা কাগজ। একটা ধুতি বা গামছাও নেই। না-থাকায় অসুবিধা তো হবেই। জামাকাপড় বদলানোর কোনো অভ্যেস যোগেনের কোনো কালেই ছিল না। থাকার কথাই ওঠে না। জোগাবে কে? অত ইতিহাস-ভূগোল না ঘেঁটেও বলা যায়—ওকালতিতে রোজ বার লাইব্রেরির অতজন ভদ্রলোক আর মুসলমান উকিলের সঙ্গে বসতে গেলে ও কোর্টে দাঁড়াতে গেলে তো আর এমন পোশাকে যাওয়া যায় না যে অন্নপ্রাশনে পরা আর শ্রাদ্ধে খোলা। বাড়িতে বাড়তি কাপড় পাবে কোথায়।

যোগেন যে দোনোমনো মন নিয়ে শেষ পর্যন্ত খুলনা মেল ধরতে শেয়ালদায় এল, সেটা তার নিজের খুব চেনা নয়। যোগামার জন্য, বাড়ির জন্য, মৈস্তারকান্দির জন্য, বরিশালের জন্য কোনোকালে তার মন খারাপ করেনি। মন আর সময় পাবে কোথায় খারাপ হতে? বাড়ি ছেড়ে, মৈস্তারকান্দি ছেড়ে, বরিশাল ছেড়ে বাইরে, আরো বাইরে পৌঁছুনোর হাঙ্গামাহুজ্জুতে তো দম ফেলতে পারত না। সেই বাইরে গিয়ে তিষ্টনোও তো ছিল এক রোজকার ঝামেলা। সেখানে আবার শখ হল তো বরিশাল চল্—এমন হুজুগ কি সম্ভব ছিল? বা, এখনো কি সম্ভব? কাল ২০ মার্চ, অল বেঙ্গল শিডিউল্ড ক্লাশ ফেডারেশনের সপ্তম সম্মিলন। সেখানে যোগেনের হাজির না থাকায় তো বজ্রপাত ঘটবে। মিটিং অবিশ্যি ঠেকবে না—ফেডারেশনের পুরনো নেতারা আছেন। কিন্তু তিন দিন আগেই না, শরৎ বোসের বাড়ির রাত্রির মিটিঙে যোগেন নতুন ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড ক্লাশ পার্টির সেক্রেটারি হল। আর, ২০ তারিখের সম্মিলনে গরহাজির! ক্যালক্যাটা শিডিউল্ড ক্লাশ লিগের সম্পাদক যোগেন—তারা ২৬ মার্চ শ্রদ্ধানন্দ পার্কে সুভাষ বোসকে সংবর্ধনা দেবে। তাহলে?

এমন দাগকাটা সম্ভব-অসম্ভবের মধ্যে কোথাও কোনো ধোঁয়াটে জায়গা ছিল না। আজ সকালে যে সে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়ি থেকে ধোঁয়াটে মন নিয়েই বেরিয়েছে, সেটা বুঝতে-বুঝতেই তো ট্রেনের সময় এসে গেল। আর-একটু কাটিয়ে দিলেই ট্রেন ছাড়ার সময় পেরিয়ে যাবে—–১৫ নম্বরে বসে এমনও ভাবে। তারপরই এমন করে পাড় ভাঙার বেগে স্টেশনে পৌঁছনো।

যোগেন যে-কোনো কামরাতেই উঠে পড়বে ভেবেছিল। ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে দেখে তার মনে হল—সেটা তার ভাল লাগবে না, নিশ্চয়ই চেনাজানা মানুষজন বেরিয়ে পড়বে, খুলনা মেলে আবার কে কাকে চেনে না, তারপর যে-আলাপ শুরু হবে সেটা তার ভাল লাগবে না। ট্রেনের ভাড়া যদি পকেট থেকে দিতে হত, তাহলেও কি যোগেনের এমন সঙ্গী-এড়ানোর স্বাধীনতা থাকত, নিজেকে এইটুকু ঠাট্টা করেই যোগেন সুপারইনটেনডেন্টের কাটা দরজা ঠেলে ঢুকে নিজের পরিচয় দিয়ে বার্থের ব্যবস্থা চাইল। এ-শাহেব একটা ফিরিঙ্গি, সে একজনের সঙ্গে কথা বলছিল, আত্মপরিচয় দেয়ার পরও যোগেন দেখে সে কথা বলেই যাচ্ছে, যোগেনকে পাত্তা দিচ্ছে না। ট্রেন তো ছেড়ে যাবে। যোগেন শাহেবকে বলল, ‘আমার কথাটুকু তো একটু শুনতে হয়’। শাহেব যোগেনের দিকে না তাকিয়ে ডানহাত তুলে যোগেনকে বলল, ‘ওনলি হোয়েন আই হ্যাভ ফিনিশড উইথ হিম’। যোগেন একটু ঠান্ডা স্বরেই বলল, ‘আই হ্যাভ টু ক্যাচ দি ট্রেন’। শাহেবও না-তাকিয়ে বলে, ‘দেন, ক্যাচ ইট, ইটস অন দি লাইন্স রেডি টু লি-ই-ভ।’ যোগেনকে আবারও বলতে হয়, ‘কিন্তু আমার তো একটা বার্থ চাই’। লোকটির সঙ্গে কথা শেষ না করেই শাহেব যোগেনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘এটা শিয়ালদা স্টেশনের সুপারইনটেনডেন্টের অফিস, শিয়ালদা মার্কেটটা এর উলটোদিকে। সেখানে পয়সা দিলে বার্থও কিনতে পাবে।’

যোগেনের স্বভাব-অনুযায়ী জবাব ঠোঁটে এসে গিয়েছিল কিন্তু সে গিলে ফেলল, না, ঝগড়া করবে না, বলল, ‘তাহলে আমাকে একটা সার্টিফিকেট দিন যে আমি চাওয়া সত্ত্বেও আমাকে বার্থ দেয়া হয়নি। কথাটা তো যোগেন রাগ চেপে বলল, তাই আঁচও বেরল একটু।

‘কবে থেকে এমন নিয়ম চালু হল যে টিকিট না দিতে পারলে আমাদের এক্সপ্লানেশন দিতে হবে?’

‘যবে থেকে এমএলএদের ট্রেনে নির্ধারিত অ্যাকোমোডেশন দেয়াটা টপমোস্ট প্রায়োরিটির লিস্টে এসেছে—’

‘কে? এমএলএ? মানে অ্যাসেম্বলি তো? কে মেম্বার?’

‘আপনাকে প্রথম থেকেই বলছি, আমি। আপনি তো তাকাচ্ছেনই না।’

লোকটি খুব লজ্জা বুঝিয়ে হেসে দাঁড়াল, ‘এক্সট্রিমলি সরি। ইউ ডু নট লুক দ্যাট। প্লীইজ টেক ইয়োর সিট’।

তাকে দেখে এমএলএ মনে হয়নি—এতে অপমানিত বোধ করা ঠিক হবে কী না স্থির করার আগেই যোগেন চেয়ারে বসে পড়ল, তার পরে শাহেব বসল। আর, কাউকে ডাকল গলা তুলে। সঙ্গে-সঙ্গেই এসে দাঁড়ায় কুচকুচে কাল একজন বেঁটেখাটো লোক, নীল ইউনিফর্মে। শাহেব তাকে বলল, ‘ইনি একজন মেম্বার অব লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি। এই ট্রেনেই যাবেন। ওঁকে প্রথমে একটা বার্থে বসিয়ে, তারপর টিকিটপত্র ও আরো সব ব্যবস্থা করে দিয়ো।’

‘উনি স্যার বরং এখানে বসুন একটু। আমি বার্থ পজিশনটা দেখে একেবারে ওঁকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি’, লোকটা অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে ছুটে বেরিয়ে গেল।

এই উত্তেজনা ও ঝগড়াটুকু না হলে যোগেন যে সত্যিই বরিশালে যাচ্ছে—এটা তার নিজের কাছেই পরিষ্কার হত না। তার প্রতি সৌজন্য দেখাতে শাহেব কোনো কাজে হাত দেয়নি। সৌজন্য দেখিয়ে যোগেনের কিছু বলা উচিত। তেমন কোনো যোগ্য কথা যোগেনের মনে এল না। সে শাহেবের ঘরের কাটা দরজা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে ছুটন্ত নানা রকম পা দেখতে লাগল। তার দেখা শুরু করতেই প্ল্যাটফর্মের গোলমাল, আওয়াজ, ফেরিওয়ালাদের হাঁক, মেয়ে গলার চিৎকার, বাচ্চাদের কান্না—এই সমস্ত একসঙ্গে শুনতে পেল। এখান থেকে সেই সব আওয়াজ তো সুরেলাই ঠেকে তার কাছে। যে-কোনো একটা কামরায় উঠে গেলেই হত। কত জায়গার কত রকম মানুষের সঙ্গে যাওয়া যেত। এখন সেটা করা অসম্ভব। তাছাড়াও, এত দ্রুত বিকল্পগুলি মনে আসছে বলে যোগেন নিজের ওপর বিরক্তও হয়। এমন দ্বিচারিতা তার স্বভাবে ঢুকল কখন?

.

খুলনায় নামতে-নামতে শেষ রাত। ট্রেন থেকে নেমে স্টিমারঘাটার দিকে যাত্রীরা চলে যেন ট্রেনের ভাঙা ঘুমটুকু জোড়া লাগাতে-লাগাতে। আবার, উলটোদিক থেকে লালজামা পরা বিহারী কুলিরা ছুটতে ছুটতে ট্রেনের লেজের দিকে যায়। এক খুলনাতেই এমন কুলি আছে, এদিকে যোগেনের মনে একবার খেলে যায়—রেলকোম্পানি শুধু বিহার থেকেই কেন কুলি নেয়, এর ভিতর শিডিউলদের জন্য একটা সংরক্ষণ কেন থাকবে না? কী এমন চেহারা এই কুলিদের যে নমশূদ্ররা ওদের মত মাল বইতে পারবে না?

যোগেনের যেন মনে হয়, অ্যাসেম্বলির সব অভ্যাস তার মধ্যে এত চারিয়ে গেছে যে স্টেশনের কুলি দেখলেও মনে হয় রিজার্ভেশনের কথা। কিন্তু ব্যাপারটা যদি এতই সহজ হবে, তাহলে সারা ভারতে এই কাজের ওপর একটা দখল তো চাইত মুসলিম লিগ। কোনো দিন তা চেয়েছে কি? কেন চায়নি? বাংলায় না-হয় জমিদাররা হতে দেয়নি, জমি চষার কৃষক পাওয়া যাবে না তাহলে? বিহারের এই কুলিদের কি বাড়িঘর জমিজমা নেই? নিশ্চয়ই আছে—এ দেশে চাষা নয় কে? তাহলে, ওদের কি জমি ছেড়ে কুলি খাটতে আসার সুবিধে আছে— ফলন কম, খাজনা বেশি, না কী এক-একটা জায়গা থেকে কুলি-আমদানিটা দস্তুর হয়ে গেছে? কলকাতায় যেমন পাঞ্জাবি ট্যাক্সিওয়ালা আর বিহারী ঠেলাওয়ালা?

যোগেন নিজেকে একটু ঠাট্টা করে কথাটা থেকে সরে আসতে চায়—কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি যাচ্ছে, কাউকে কিছু না জানিয়ে আজই আজই মৈস্তারকান্দি পৌঁছুবে আর সে কী না রেলের কুলির চাকরিতে মুসলমান ও তপশিলিদের সংরক্ষণের কথা ভেবে চলেছে? তাহলে আর লঞ্চে চড়ে কী হবে? বরং এখানেই অপেক্ষা করুক। আপ ট্রেনে আবার কলকাতায় ফিরে যাক—কলকাতাই যখন তাকে টানে? নিজেকে যোগেন এমন ঠাট্টা করলেও ও নদী থেকে বয়ে আসা হাওয়ার ঠান্ডা তার গায়ে লাগা সত্ত্বেও যোগেন টের পায়—কথাটাকে আপাতত ঠেলে রাখলেও, কথাটা তার মনে থেকে যাবে আর সে-ও নানাভাবে কথাটা জানতে চাইবে ও শেষ পর্যন্ত ঠিক বেরও করবে।

ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠার সিঁড়ির কাছে লোকজন, মালপত্র, দোকানপাট, দৌড়োদৌড়ি, হোটেলের বাচ্চা ছেলেদের চিৎকার, দু-একটা হ্যাজাক, বেশির ভাগই কাল হয়ে যাওয়া চিমনির ভিতর লন্ঠনের লাল আলো—এইসব মিলে একটা চলন্ত ভিড় আর হৈহৈ লেগেই থাকে।

সিঁড়ি বেয়ে লঞ্চের ভিতর ঢোকার আগে যোগেন বুঝে ফেলে, সে গেট ভুল করেছে, ফার্স্ট-সেকেন্ড ক্লাশের গেট তো আলাদা। তখনো সে ঘুরে ফিরে যেতে পারত। ঐ গেট দিয়ে ঢোকার সুবিধেটা হচ্ছে—লঞ্চে পা দিতে-না-দিতে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই ফার্স্ট ক্লাশের ডেক আর ক্যাবিন। আর এই ডেকক্লাশের গেট দিয়ে ঢুকে এখন যোগেনকে পুরো লঞ্চটার ল্যাজা থেকে ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জারদের পা মাড়িয়ে, বাচ্চা বাচ্চা মাথা না মাড়িয়ে, চাদরপাতা বিছানাগুলির ফাঁক দিয়ে, মানুষের শোয়ার অজস্র ভঙ্গিগুলির মধ্য দিয়ে আর একটা জায়গায় গা-গুলানো মাছের গন্ধ পেরিয়ে, লঞ্চটার আগায় গিয়ে সেই সিঁড়িটা দিয়ে উঠতে হবে ও ফার্স্ট ক্লাশে পৌঁছুতে হবে। খুলনা-বরিশালের এই সার্ভিসটাতে এই মাছের গন্ধের নামডাক আছে। এই লঞ্চটাই তো বরিশাল থেকে গোয়ালন্দে পৌঁছে এই মাছগুলি আনলোড করবে, সেগুলো মাছ অনুযায়ী সাইজ অনুযায়ী পেটিতে বেঁধে ডাউন ট্রেনে কলকাতা পাঠাবে তাতে না কী সময় কম লাগে, মাছগুলোও না কী শেষ রাতের বাতাসে ভাল থাকে। দুর্গাপুজোর পর থেকে মাস চার বাদ দিলে বাকি সাত আট মাস ইলিশের সাপ্লাইয়ের কারণেই হয়ত এটা বিশেষ ব্যবস্থা।

দোতলার ডেকে পৌঁছে যোগেনের গায়ে শেষ রাতের ঝড়ো হাওয়া এত জোরে আছরে পড়ে, তার ধুতির কোঁচা পেছনে ওড়ে আর কাছার দিকটা শরীরে আটকে যায়। যোগেনকে রেলিঙ ধরে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াতে হয়। ঠোটের কোণে একটু হেসেও ফেলে যোগেন—বাতাসের এ ঝাপট যার চেনা নয়, সে ভয় পেয়ে যেতে পারে এই আওয়াজে ও ঝাপটে। বাড়ির লোক অনেকদিন পর অসময়ে বাড়ি ফিরলে গোয়ালের গাই যেমন ঐ অসময়েও ঠান্ডা লম্বা একটা ডাকে বাড়ির মানুষকে ঘুম থেকে জেগে উঠতে বলে, রূপসা-ভৈরবের এই হাওয়াও তেমনি।

ডেক একেবারে ভোঁ ভোঁ। সারি-সারি ডেকচেয়ারের শাদা ক্যানভ্যাসগুলো হাওয়ায় ফুলে উঠে গুটিয়ে যাচ্ছে। ডেকের আলোও জ্বলা নেই। শেষরাতে সুখঘুম ছেড়ে কার দায় পড়েছে ডেকে বসে থাকার। হাওয়ার একটা নতুন ঝাপটে একটা বা দুটো ডেক চেয়ার ঘুরে যায়। এদিকওদিক থেকে ছিটকে যে আলোর টুকরোটাকরা এসে ডেকের কোথাও-কোথাও ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলো নড়ছে। জলের আলো কখনো স্থির থাকে না। যোগেনের মনে হয় তাহলে এটা সত্যি হয়ে গেল, এই বাড়ি ফেরা।

সে ডেকটার পাশে পাড়ের দিকের রেলিঙের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনো দৃশ্যের আশায় নয়, কোনো চেনা দৃশ্যের পুণর্দর্শনের আশাতেও নয়। যোগেন তেমন মানুষই নয়। বা, শুদ্দুররা কেউই বুঝি তেমন হতে পারে না। জন্মের আগে থেকে উঁচুজাতের ‘দূর দূর’ শুনতে-শুনতে শুদ্দুররা সব সময়, সারা জীবন, পথ ভুলে বেপাড়ায় ঢুকে পড়া পথের কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে, কোমর ভেঙে থাকে আত্মরক্ষার ব্যাপারে, শুদ্দুর হলেই, একটা অসাহস আর তরাস এসে যায়। কোনো শুদ্দুর কখনো কোনো হারানো জিনিশ ফিরে পেতে পারে না। সে জিনিশটা হারানোর আগেও যে তারই ছিল, এটাই সে বিশ্বাস করে না বিচ্ছিন্নতাবোধের ইন্দ্রিয়ই যার নেই, সে কী করে বিচ্ছিন্নতা কাটাবার মূল্য জানবে? শেষ রাতের নদীর হাওয়া যোগেনের ভাল লাগার কথা নয়। শেষ রাতের অন্ধকার জল দেখার জন্য চোখ মেলে তাকানোর কথাও যোগেনের নয়। বরং তার তাড়াতাড়ি নিজের ক্যাবিন খুঁজে বের করে যত দ্রুত সম্ভব ঘুমিয়ে পড়ার কথা। যখন জাগা থাকে, তখন যেমন জাগী থাকে, যখন জাগা থাকে না তখন যেমন

জাগা থাকে না।

নিজের ব্যবহারের এই বদল-না-বুঝে পারে যোগেন? না-বুঝে কি নমশূদ্র যোগেনের এক মুহূর্তও বাঁচা চলে? শরৎ বোসের বাড়িতে গান্ধীজি কেমন কথা বলতে-বলতে তাদের কাছে এসে বসে পড়লেন। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। চাদরটা কাঁধের ওপরে। দেখেই বোঝা যায়, হাতে ধোয়া কাপড়। নিপুণ করে দাড়ি কামানো। হাসি কম। চোখটাও কোঁচকানো। কথার মধ্যে একটুও কিন্তু-কিন্তু নেই। সোজা বলে দিলেন, মন্দির খুলে দিলেই হরিজনদের সঙ্গে উঁচুজাতের সব বিপদ ঘুচে যাবে। এ-কথাটা যে বলে আর যে শোনে দুজনেরই হেসে ফেলার কথা কথাটা এত বানানো, ভুল ও শিশুবোধক যে সাবালক কানে কপটও ঠেকতে পারে। কিন্তু গান্ধীও কথাটা হেসে বলেননি। যোগেনরাও শুনে হাসেনি। গান্ধীজি না কী তাঁর প্রথম আন্দোলনের সময় বলেছিলেন, একবছরের মধ্যে স্বরাজ আসবে। সবাই সে-কথা মেনে নিয়ে স্কুলকলেজ ছেড়ে, অফিসকাছারি ছেড়ে, বাড়িঘর ছেড়ে পথে নেমে গেল। একবছর পরে যখন স্বরাজ এল না, লেখাপড়া জানা উঁচুজাতের লোক গান্ধীর কত নিন্দে করল। গান্ধী একবারের জন্যও বললেন না—তাঁর ভুল হয়েছিল। বরং, যেন তিনি এমনটাই চেয়েছিলেন। কী সৎ, কী সাহস আর কী খাঁটি। কোনো চাষা কি ফাল্গুন-চৈত্রে ক্ষেত তৈরি করতে-করতে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের জলের হিশেব কষে? যদি বৃষ্টি না-হয়, হল না। তার ক্ষেতটা তো তৈরি রাখতেই হবে বৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে নয়। বৃষ্টি না-হওয়াটা অস্বাভাবিক বলে নয়। বৃষ্টি হওয়াটাই নিয়ম বলে। তার শরীরের ভিতরে রক্ত স্রোতের মত, আকাশমাটি মিলিয়ে জলস্রোতটাই নিয়ম। যোগেন গান্ধীর আগে আর-কাউকে এমন দেখেনি যে চিরকালের শূদ্রের মত জন্মের আগে থেকে নিজের শরীরে স্বাধীনতার অভাব বুঝেছে। শুদ্দুরনির গর্ভের রসে দাসত্ব থাকে। বামুনদেরও কি ছুঁৎ-ছুঁৎ করতে-করতে ছুচিবাই হয়ে যায়। বিশেষ করে বামনিদের। ন-বছর বয়সে বিয়ে হল। ঋতু শুরু হওয়ার আগেই বিধবা হয়ে ফিরে এল। তাকে যদি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আরো পঞ্চাশ-ষাট বছর বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে তার নিজেকেই অশুচি মনে না হয়ে পারে? আর শুচি হতে সে কি সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রত্যেক প্রহরে স্নান না করে পারে? তাকে আগলি-পাগলি যে-বলে, তার জিভে সে-কথা থাকে, তার অশুচিবোধ তাতে কমে না, তার প্রায়শ্চিত্ত কিছু কমে না। শুদ্দুরের অশুচিবোধও কমে না, প্রায়শ্চিত্তও শেষ হয় না।

এতটা যোগেন বেশ গুছিয়েই ভেবে ফেলে ঐ শেষ রাত্রির শূন্য ডেকে, রাতের নদীর হাওয়ার মুখে খাড়া দাঁড়িয়ে, হাওয়ায় ডেকের চেয়ারের ক্যানভ্যাসগুলির ওঠাপড়ার ছায়াচ্ছন্ন বিবিধ আওয়াজে।

এমন গুছিয়ে ভাবতে পারে এতটাই যোগেন যে মাথায় বা মনে যেখানে ভাবনা আকার পায়, সেখানকার গড়নের আন্দাজও সে পেয়ে যায়। তাই—গান্ধী, হয় শুদ্দুর, না-হয় বালবিধবা বামনি—এমন একটা সিদ্ধান্তে যাতে পৌঁছে যেতে না হয়, যোগেন বাতাস ঠেলে বিপরীত দিকের রেলিঙে গিয়ে দাঁড়ায়।

একই রাতের যেন দৃশ্যান্তর ঘটে যায়—সিনেমার মত। এদিকটায় নদীর বিস্তার অথচ প্ৰথম নজরে জল চোখে পড়ে না। চোখটা সয়ে গেলে ঐ তরল অন্ধকার স্রোতের অসম কিছু বিন্দু অন্ধকারে মোষের চোখ, নাকের ফুটো আর মুখের ভেজা হাঁ-এর মত জ্বলে। অন্ধকার সেই তরল স্রোতের ওপর কুয়াশার জালি ছড়িয়ে আছে। দোতলার এই ডেকও যেন সেই কুয়াশাজালের ওপরে। যোগেনের মনে হয়, সে আড়াল থেকে দেখছে বলেই, কিছু লালবিন্দু, এক লাইনে জল বেয়ে তারই দিকে ছুটে আসে মনে হচ্ছে, কিন্তু সে ঘাড়টা উলটোদিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনতেই দেখে সেই এক-লাইন লাল বিন্দু আরো একটু বড় হয়ে, আরো একটু কাছে এসে গেছে। যোগেন তাকিয়ে থাকে ঐ লালবিন্দুগুলির গড়িয়ে আসা—যেন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে—দেখতে। ওগুলো ছোট-মেছো নৌকোর ছোট ছইয়ের ওপরকাঠিতে জ্বালানোঝুলনো লণ্ঠনগুলি—যোগেনের কাছে কি এই নিচু-বাংলা, জলবাংলা, বিলবাংলা, মোহানা বাংলা, সসাগরা বাংলার কোনো অন্ধকার অচেনা থাকতে পারে? ওগুলো খাবারের নৌকো। শেষ রাতের স্টিমারে খাবার বেচতে আসছে। ভাতমাছের নৌকোও আছে, নিরিমিষ্যা নৌকোও আছে—বিধবা মা-ঠ্যায়ানদের জন্য। লুচির নৌকো আছে। নৌকোর ওপর তোলা উনুনে গরম ভেজে দিচ্ছে। ভাজা লুচির ঝুড়ি আছে আড়ালে সেখান থেকেই খদ্দেরদের দেয়। আর আছে, পানবিড়ির আর মিষ্টির নৌকা। এসব কলকাতার দিকের নামকরা মিষ্টি নয়, এই মিষ্টিগুলো এখানেই চলে বেশি—বাংলাসোই, পাতক্ষীর, পাটিসাপটা, তক্তি, নারকেল-চিড়ে, ভাজা চিড়ে, চিড়ে ভেজানোর জন্য পাতলা টক দৈ, লবঙ্গলতিকা, বাখরখানি।

সেই লালবিন্দুগুলি বড় হতে-হতে মিলিয়ে যায় লণ্ঠনের কমলা শিখায়। তারপর শোনা যায় নানা মানুষের কলকণ্ঠ, হাটের গোলমালের মত, তার কোনো শব্দই বোঝা যায় না। যে যার মাল হাঁকে।

সব নৌকো স্টিমারের খোল ঘিরে সারি দিয়ে ভিড়বার আগেই বেচাকেনা শুরু হয়ে যায়। কারো কারো তো দরকার থাকেই। হঠাৎ-দরকার বা শখের ওপর তো এমন একটা ভাসাবাজার তৈরি হতে পারে না। বিশেষ করে রোজার মাস শুরু হলে তো কথাই নেই। ফজর নামাজের আগেই নাস্তা করে নেয়। খুলনা বা বরিশাল থেকে যত দূর পাড়ির স্টিমার বা লঞ্চ ছাড়ে—খুলনা-সাতক্ষীরা, খুলনা- বোয়ালমারি, খুলনা-মাগুরা, খুলনা-কুমার মধুখালি, বিল-মাদারিপুর, বরিশাল—তার পাশা, খুলনা-বরিশাল রুটে হুলার হাট, খুলনা-বরিশাল রুটে ঝালকাঠি, বরিশাল-পটুয়াখালি, বরিশাল-চাঁদপুর-ঢাকা, বরিশাল-পটুয়াখালি, বরিশাল-চট্টগ্রাম— এইসব রুটই গড়ে বার-চৌদ্দ ঘণ্টার রুট। এক মেল-স্টিমারই একটু তাড়াতাড়ি যেতে পারে। সব রুটে তো আর মেল যায় না। এমন বার-চোদ্দ ঘণ্টার রুটে অনেক স্টিমার-স্টেশন। এক-একটা বড় জায়গায় জাহাজ প্রায় খালি হয়ে যায়। দুই-তিন স্টেশন পর আবার এক বড় জায়গায় জাহাজ ভর্তি হয়ে যায়। লোকজন তো দিন বাঁচাতে রাতটা নদীতে কাটাতে চায়। তাই রাতের ফেরিই বেশি। এই বার চোদ্দ ঘণ্টার রুটে মানুষজনের তো একটা খাওয়া দরকারই হয়। কোনো-কোনো বড় জাহাজে নিজেদের খাওয়ার সার্ভিস আছে। তাদের বাটলার শেফ, বয়ও থাকে। সব স্টিমারে বা লঞ্চেও কিছু দোকান থাকে—পানবিড়ির, চা-সিঙাড়ার। দু-একটা লঞ্চে ভাতের হোটেলও সন্ধ্যা আটটা-নটা পর্যন্ত খোলা থাকে। লোকজনের টান কিন্তু এই এক-এক জায়গার ভাসাবা পরের দিকেই। জলের ওপর থেকে দড়িতে ঝোলানো ছালার ব্যাগে অর্ডার-মতো খাবার উঠে আসে, সেই ছালার ভিতরেই দাম দিয়ে দেয়া হয়।

তাকিয়ে থাকতে-থাকতে যোগেনের প্রথমে ইচ্ছে হল—কিছু একটা টাটকা খাদ্যের স্বাদ নেয়ার। যোগেন খেতে ভালবাসে। কিন্তু তার মত বাড়ির ছেলের কি আর খাওয়ার সঙ্গে ভালবাসাবাসির সম্পর্ক তৈরি হয়—যেখানে অন্তত দু-বেলা পেটভরাটাই প্রায় স্থায়ী সমস্যা ছিল। খাওয়া পেলে খাওয়া তাই যোগেনের স্বভাবে ঢুকে গেছে।

ডেক থেকে ঝুঁকে যোগেন কী খাবে বাছছিল। আর, এমন বাছাবাছির যখনই দরকার হয়, যোগেন তখনই আবিষ্কার করে–বাছতে পারার মত খাওয়া তার জানাই নেই। সেই সিলেট-যাওয়ার সময় ট্রেনে খুব ভাল খাইয়েছিল। কী, মনে নেই। স্বাদ ছিল আলাদা।

হঠাৎ ভাসা-বাজার থেকে একটা সরু আওয়াজ উঠল—’পাতক্ষীর’, ‘পাতক্ষীর’, ‘ক্ষীরসন্দেশ’ যোগেনের মনে এল—তাদের ওদিকে, মানে গৌরনদীতে, এসব মিষ্টির নামও শোনা যায় না। এমন ভাবনাটা সত্যিই কি মিথ্যে তা যোগেন যাচাইও করে না। এমনকী, নেহাত বাস্তব এই প্রশ্নটাও সে এড়িয়ে যেতে পারে যে গৌরনদীতে না-হয় নেই, কলকাতাতে ক-দিন যোগেন মিষ্টির দোকানে ঢুকেছে? যোগেন রেলিং থেকে মাথা গলিয়ে ডাকে, ‘এই পাতক্ষীর’, লোকটা ওপরে তাকাতেই যোগেন একটা আঙুল তোলে। মানে, একটা পাতক্ষীর। নীচের লোকটা দুটো আঙুল তোলে—মানে দুটো নেয়ার আবেদন। খুচরো দুটো-একটা করে না বেচলে, মিষ্টির খদ্দের জুটবে না। দুটো পাতক্ষীরের দাম দু-আনা। লোকটিকে সম্মতি জানাতে গিয়ে যোগেন দুই হাতের পাতা নাড়িয়ে-নাড়িয়ে যা বোঝায় তার মানে দাঁড়ায়—দুই হাঁড়ি, একেকটিতে কুড়িটি আর আলগা দুটি। এত বড় অর্ডার-লোকটি আবার নিজের দুই হাতের পাতা ও আঙুল দিয়ে যাচিয়ে নেয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুই হাঁড়ি পাতক্ষীর, একেকটাতে এক কুড়ি করে, আর দুই হাঁড়ির জন্য দুটো ফাও—আলগা।

এটা কী করে সম্ভব হল? যোগেন খাওয়ার ইচ্ছেয় পাতক্ষীরওয়ালাকে একটা আঙুল তুলে একটা পাতক্ষীর চেয়েছিল, এক আনা দাম। পাতক্ষীরওয়ালা জল থেকে হাত নেড়ে দুটো নেয়ার অনুরোধ করে। দুটো মানে দু-আনা। জবাবে যোগেন চল্লিশটা পাতক্ষীর দুই হাঁড়িতে দিতে বলে দিল। এটা ঠিক করল কখন যোগেন যে সে সোজা খাগবাড়ি গিয়ে সেখান থেকে বৌ-ছেলেকে তুলে নৌকো নিয়ে মৈস্তারকান্দি উঠবে। হঠাৎ করে দেশে একপাক ঘুরে আসার ইচ্ছেটা শেষ পর্যন্ত সক্রিয়ই থাকবে—এটাই সে আন্দাজ পায়নি।

খুলনা মেলে রাতভর ঘুমিয়ে সেসব আন্দাজি থেকে ছাড় নিয়েছে। কিন্তু জাহাজে উঠেও তো সে জানত না কোথায় যাবে। শুধু পাতক্ষীরে ঠিক হয়ে গেল—শ্বশুর বাড়ি হয়ে বাপের বাড়ি? দুই বাড়ির জন্য দুই হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে? শ্বশুরবাড়ির লোকও ভাবে—যোগেনের ঠিক শ্বশুরবাড়ি নেই। পাক খেতে-খেতে মাঝে মধ্যে এসে পড়ে। বাপের বাড়ির লোকজনও তাকে হিশেবে ধরে না। তাহলে, যোগেন থাকে কার হিশেবে পাকাপাকি? গাঁয়ের, থানার, সদরজিলার না কী বাংলার? গান্ধী যেমন গাঁয়ের, থানার, সদরজিলার, বাংলার, ভারতবর্ষের আর পৃথিবীর? সবাই গান্ধী হতে পারে না। চাইলেও পারে না। কারো বুকের পাটা আছে এমন টলটলে কথা বলার, যে-কথায় সবাই নিজের চোখের প্রতিফলন দেখতে পায় আর শুনতে পায় স্বপ্নাদেশ। মা-মনসা বা চণ্ডী বা শিব বা ধর্মঠাকুরের আদেশ স্বপ্নে পেয়ে স্বপ্নোত্থিত সে-মানুষ কোনো পুকুরের গভীর পাঁক থেকে, বা কোনো হিজলগাছের গুঁড়ির একটা কোণ থেকে, বা যে-কাদায় ঘোড়া বা গরুর পা ডুবে গিয়ে আর উঠছে না, সেটা আরো খুঁড়ে, আরো আরো খুঁজে তার তলা থেকে গোটা বা কোন ভাঙা বিগ্রহ বা গোটা একটা মন্দিরই, পেয়ে যায়। তার মত করে সব সমন্তবৈয় সীমা পেরিয়ে গিয়ে সে তো স্বপ্নের অসম্ভবে স্বাধীন হয়। গান্ধী যাকে বলেন রামরাজ্য, সারা দেশের মানুষ তাকেই বলে গান্ধীরাজ। যা অসম্ভব গান্ধী শুধু সেটাকেই সম্ভব বলে ভাবাতে পারেন।

বিশাল নদীর প্রায় নিস্তব্ধ স্রোত ক্ষুরধার বেগে পাড়ের তলায় সুড়ঙ্গ খুঁড়ে মাটির ভারসাম্য ধ্বংস করে পাড় ভাঙে যেমন, আর মাটির ওপরের মানুষজন নিজেদের আবিষ্কার করে সেই ক্ষুরধার স্রোতের ভিতর শ্বাসরুদ্ধ হঠাৎ যেমন, তেমনি ভাঙনে ও তেমনি বাঁচনে যোগেন বোধ করে ফেলেছে সে গান্ধীর মত স্পষ্ট তাতেই অসম্ভব কথা বলবে—উঁচুজাতের হিন্দু আর শূদ্ররা এক ধর্মের লোক নয়। জীবনযাপনের ইতিহাস ও অভ্যাস শূদ্রদের সঙ্গে মুসলমানদের একটা মিলন ঘটিয়ে দিয়েছে। উঁচুজাতের হিন্দুদের আক্রমণ ও অপমান সেই মিলনকে সত্য করে তুলেছে। সে-সত্যকে অস্বীকার করা যায় না।

.

যোগেন যেখানে বসে, সেখানে যেন গাছের মত বসে, আর নড়বেচড়বে না। মাত্র তো দিন-তিন হল মৈস্তারকান্দিতে এসেছে। এর মধ্যেই মাটির ওপর তার ছেলের সঙ্গে হামা টানছে, ছোটকাকার সঙ্গে কোন এক মহাজনের কাছে গিয়ে একটা ছিপনৌকার বায়না এনেছে। বায়নাটা ঠকবে কী না কে জানে। যোগেনের নাম শুনে ও যোগেনকে দেখেই সাততাড়াতাড়ি তাকে গদি থেকে সরানোর জন্য বায়না দিয়ে দিয়েছে। ভেবেছে—মহাজনি সুদ ধরবে যোগেন। নিরস্ত করতে যোগেন বলে, ‘আরে, আমারে বায়না দিচ্ছেন না, দিচ্ছেন আমার খুড়ারে।’ মহাজন উলটে বলে, ‘যার নৌকাই হোক, চড়বেন তো আপনি।’ প্রতিদিনই যোগেন ভাইপোভাইঝিদের নিয়ে খালের জল তোলপাড় করেছে। ছেলেটাকেও চেয়েছিল একদিন, জল ছোঁয়াবে বলে, যোগামা এসে পাড় থেকে ধমক দিলে, যোগেন জলের ভিতর থেকে বলে, ‘তালি ছাওয়ালের মা-রে পাঠাও।’

‘অ্যাহন তার জলকেলির টাইম নাই’—বলে ঝামটা দিয়ে যোগামা চলে গেলেও, বৌকে নিয়ে ছোটকাকিমা আসে, যেন কত গল্প আছে, পরে যোগেন শুনেছিল, ওটা ছিল ছল। সিঁড়ির শেষ ধাপের পরেও জলে এক না নেমে কী যেন ধুতে শুরু করে দু-জন আর ছোটকাকিমা হঠাৎ তার পেছনে একটা ধাক্কা দিয়ে বৌকে খালে ফেলে দেয়। কমলা আঁচল কোমরে গোঁজারও সময় পায়নি। দুই হাতে জল উথলিয়ে ডুবে গেল আর তার আঁচল উঠল ভেসে। কেউই ভাবেনি যে কমলা বিপদে পড়েছে। তবু, তার মাথা চাড়া দিয়ে ভেসে ওঠার সময়টা যেন একটু লম্বা হচ্ছে মনে হয়। ভাইপোভাইঝিদের কেউ-কেউ সেই ভাসা আঁচলের কাছে ডুব দেয়। আঁচলটা স্রোতে ভাসতে ভাসতে উলটো দিকে যায়। যোগেনও ভেসে কাছে এসেছিল-আঁচলটা ভেসে যেতে দেখে সে আর এগয় না–পালটাা ডর দিচ্ছে ডুবসাঁতারে। সাহস আছে তো। আচমকা ডুবজলে তো সাঁতারের বীরদেরও বুদ্ধিবিভ্রাট হয়, সাঁতার ভুলে যায় আর এ মেয়েটা জলে পড়ার চমক ভেঙে ডুবসাঁতার দেয়? যোগেন একবার ভাবে, আঁচলটা ধরে রাখে। কিন্তু তাতে যদি আবার পায়ে ফাঁস লেগে যায়? এখনো ভাসে না কেন? এতটা দম? ডুবজলে ভাসা শরীরের ভারসাম্য রাখতে রাখতে এতকিছু খুব পরপর গুছিয়ে ভাবা যায় না। যোগেন ডুব দিয়ে শাড়ির আঁচলটা যেদিকে কুঁচকে ভাসছিল, সেদিকে ভেসে যায়। কিন্তু কোনো রঙের আভাস পায় না। শাড়ির রঙের আভাস। আরে, হলটা কী? যোগেন ভুস করে জল ফুঁড়ে ওঠে। এদিকওদিক তাকিয়ে কমলাকে দেখে না। ভাইপোভাইঝিরা কী একটা চেঁচামেচি করে হাততালি দিচ্ছে। আরে? যোগেন কমলাকে খুঁজতে আবার ডোবে। ব্যস্ততায় সে দেখতে ভুলে যায়—শাড়ির আঁচলটা ভাসছিল কী না। যোগেন ডুব দিতেই কমলা ভেসে উঠে চিৎ হয়ে খানিক দম নেয়। জলের নীচে যোগেন এবার সত্যিই ভয় পায়—এতক্ষণ কি কেউ জলের ভিতরে থাকতে পারে? এরার খোঁজাখুঁজির টাইমও তো পার হয়ে যাবে। যোগেন জলের ওপর ভেসে উঠে তার বড় ভাইপোকে ডাকে, ‘এ বলাই—’।

কেউ একজন জবাব দেয়, ‘দাদা তো নামে নাই’–

‘তায় নামল কেডা—নিতাই—’

‘কও কী’–

‘আরে, তোর কাকি তো জলডোবা থিক্যা উইঠল না। তালাস কর, অনেকক্ষণ হইয়্যা গেল তো—’

‘তো ডোবো কাহা, আমিও ডুবি, যে বলল সে ডুবল কী না তা বোঝা কঠিন, সবাইই তো ডুবছে-ভাসছে যোগেন নির্দেশমত ডুব দিয়ে বাড়ির ঘাটের দিকে ডুবসাঁতার দিল।

তখনই কমলা ভেসে উঠে, জল কেটে, ঘাটের কাছে এসে, ধাপে উঠে বসে পড়ে হাঁফায়। ভাইপোভাইঝিরা চেঁচামেচি শুরু করে, ‘কাকি, লুকাও শিগগির জলে, কাহা ভাস্যা উইঠল বইল্যা-কাকি জলে লুকাও’।

কমলা আর জলে নামে না।

যোগেন ভু-উ-স করে জলের ওপর মাথা তুলে ডাকে, ‘নিতাই, পাইলি?’

‘পাব নে কোথায়? ঘাটের ধাপে বইস্যা হাইসবার লাগছে তো। খাড়াও, ঘর থিক্যা চশমা আইন্যা দেই। খালি চোখে কাকিরে খুঁইজব্যা ক্যামনে?’

যোগেন ততক্ষণে ঘাটের কাছে এসে দেখে, ধাপের ওপর কমলা বসে, তার চুলগুলো সারা মুখেগলায় লেপটে আছে, খালের জলে চোখদুটোও যেন ধোয়া। গলা বেয়ে জল গড়াচ্ছে বুকের আঁচল একটু শিথিল। কারণ, তার দুই হাতের দশটা আঙুল তখন ঘাটের শক্ত ভেজা মাটি খুঁটছিল। সে যোগেনকে দেখছিল কিছু কৌতুকে। যোগেন বলে ওঠে, ‘আরে আমি জলের তলে তোলপাড়, তুমি কোথিক্যা আইস্যা ঘাটে বইস্যা আছো

এ কথার উত্তর দিতে যেটুকু সময় লাগে, তার চাইতে একটু বেশি কাটিয়ে কমলা একঝটকায় উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে, ‘আকাশ থিক্যা’ বলে, পেছন ফিরে ধাপে ধাপে ঘাট ভাঙতে থাকে।

বুক পর্যন্ত জলের ভিতর দাঁড়িয়ে হাঁ করে যোগেন সেই ধাপ ভাঙা দেখে। দেখতে ভালও লাগে যোগেনের। সেটা তো বোঝা যায়—ভাল লাগা! বুঝে কিন্তু মজা পেয়ে হেসেই ফেলে যোগেন—হাঁ-করা মুগ্ধতায় নয়, মজা পেয়ে হাঁ—করায়। উলটো পাক নিয়ে সাঁতার কাটতে-কাটতে যোগেন মনে-মনে অট্টহাসি হাসে—খুলনা-বরিশালে ভেজা মেয়ের পেছন দেখে রেতঃবৃদ্ধি করতে চাইলে ধ্বজভঙ্গ হয়ে যাবে। ভদ্রলোকরা মাসিকপত্রে হেমেন মজুমদারের সিক্তবসনা আর সাধনা বোসের টকি দেখতে ভালবাসে। সেগুলো সব সিক্তবসনা মেমশাহেব বলে?

পড়বে টেন্যান্সি আর নো কনফিডেন্সের মুখোমুখি। টেন্যান্সির ঘোর প্যাঁচ যোগেনের সরাসরি কিছু জানা নেই—কার গোয়ালের মশা কে তাড়ায়। আর দুধ কে দোয়ায়। একটু জেনে না নিলে তার তপশিলি-মুসলিম ঐক্যের কথার তো কোনো জোর থাকবে না। শুধু একটা ঘুরান দিলেই বরিশাল থেকেই যোগেন বাংলায় চালু সবরকম রাজস্বের রহস্য জানতে পারবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *