৬৩. পদ্মবিল্যা কাইজ্যা : মধ্য কথা
পুরো গোপালগঞ্জ-পদ্মবিলায় সকলে থমকে গেল—মুসলমানরাও, নমশূদ্ররাও। খুনোখুনি হয় না, তা তো নয়। খুন করে ফেলাটা ফরাজিদের আর নমশূদ্রদের কাছে, এখানে, সব চেয়ে সহজ পথ হাঙ্গামা মেটানোর। এক কোপে মাথা নামাও, লগি ঠেলে পুঁতে দাও। বড় নদী হলে তারও দরকার নেই। নৌকো থেকে ফেলে দিলেই মিটে গেল—হাঙর খেয়ে নেয়। হঠাৎ রাগে খুন করে ফেললে যেমন, তেমনি হঠাৎ রাগারাগি তৈরিও করে খুনের অছিলা বানাতে। একেবারে ভাবনাচিন্তা যে থাকে না, খুনের পেছনে, তাও ঠিক নয়। মাপজোঁক থাকে। সঙ্গের লোকজনও বেছে নেয়া হয়। আবার কোনো দখল নিয়ে, সে-চরই হোক, মাছের বিলই হোক, পাটের কম দর দেয়াই হোক—দল দুটো থাকে, এক-এক দলে অনেকেই সশস্ত্র থাকে, বোঝাই যায়, দুই দলই খুনোখুনি করেই আপত্তি মেটাতে চায়। চরে ও হয়, ডাঙাতেও হয়, জলেও হয়, নৌকোতেও হয়।
তাতে যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকত না, তা হিন্দু-মুসলমান থাকতই। হিন্দু মানে নমশূদ্র নয়। বিশেষ করে যশোর-খুলনার জমিদারিবাবুদের মামলা মেটাতে যদি এইসব মারামারি ঘটানো হত, তাহলে তো হিন্দু-মুসলমান থাকতই। হিন্দুমানে নমশূদ্র নমশূদ্র ছাড়া হিন্দু জমিদারদের বা বাবুদের বাঁচাবে কে? জমিদার বাবুদের কত সব সর্দার লেঠেলের গল্প। তাদের কেরামতি, সাহস, সাধুতা প্রভুভক্তি। হয় মুসলমান, নয় নমশূদ্র। জমিদারির দাঙ্গাহাঙ্গামাতেও শেখ-শুদ্দুর ভাগাভাগি থাকত কিন্তু সেটা সবচেয়ে বড় ভাগাভাগি ছিল না। জমিদাররাই নিজেরাই বড় ভাগ হয়ে থাকত। তারা তো হিন্দু।
কাশিয়ানির খুনটা এসবের বাইরে। বিলের লোকরা এ খুন চেনে না। শুরু হয়েছে বাথাডাঙা হাট ভাঙা নিয়ে। চলছেই। খিলাফতি ইজারাদারকে তো কংগ্রেসি হিন্দুরা বোঝাতে পারত। নমশূদ্রদেরও তো বাবুরা ডেকে বলতে পারত। কেউই তা করেনি। ফলে, গরু-ডাকাতি ঘটাটাই যথেষ্ট খারাপ ঘটনা। তাতেও যেন শেখ-শূদ্রদের বীরত্বজ্ঞাপক হিংসাহিংসি ছিল।
কিন্তু রাতে, অন্ধকারে, লোকজন-কম জায়গায়, সবাই সবাইকে চিনে উঠতেই পারছে না এমন একটা ভিড়ে, কী নিয়ে ঝগড়া সেসব কেউ জানাবোঝার আগেই যেমন আচমকা দঙ্গলটা শুরু হয়েছিল, সেরকমই আচমকা দঙ্গলটা ভেঙে ছিটিয়ে গেল। অনেক পরে দেখা গেল, একজন মুসলমান খুন হয়ে পড়ে আছে।
এ ঘটনায় ভয় ছড়িয়ে পড়ল।
এরকম করে সুযোগ বানিয়ে যে-কোনো একজন মুসলমানকে মারা—এটা এখানকার মানুষদের জীবনে ঘটে না। ঐ লোকটাকে না মেরে খুনি আর-একটা লোককেও মারতে পারত—মুসলমান হলেই হল। হ্যাঁ, এই বিলে চরে জলে ধর্ম নিয়ে মানুষজন খুব একটা ব্যস্ত থাকতে পারে না। তার মানে যে হিন্দু-মুসলমান এক—মোটেই তা নয়। বরং তার উলটো। হিন্দুদের নিজেদের মধ্যে মারামারি ছিল। ফরাজিদের সঙ্গে অন্য মুসলমানদেরও মারামারি ছিল।
কিন্তু যেটা একেবারে ছিল না, সেটা হল কোনো ধর্মেরই পুজো-আর্চা বা বিধিবিধান নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তার প্রধান কারণ, সময়াভাব ও অর্থাভাব। প্রধান ভয়, একবার যদি বামুন-মোল্লা ঢোকে তাহলে তারা পরকালের ভয় দেখিয়ে ইহকালের সর্বনাশ করবে। তার মানে আবার এও নয় যে এই স্থলসীমানে, জলেবিলে, বেঁচে থাকার বাস্তব কষ্টে মানুষজনের ধর্মবিলাসের সময় ছিল না। আর তাদের জীবনযাপনের পক্ষে একটা ঐহিকতাই বেশি দরকারও ছিল। হিন্দু-মুসলমান কোনো দিন মিলিত সামাজিক জীবন তৈরি করেনি। হিন্দুদেরই সব জাতের মধ্যে জলচল ছিল না, তার আবার মুসলমান! হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক-সামাজিক ঐক্য হিন্দু উচ্চবর্ণের বানানো—মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে।
কাশিয়ানি খুন থেকে তৈরি হয়েছিল আত্মরক্ষার প্রস্তুতি। সেই ভয় আর প্রস্তুতি থেকেই সাপ ছোবল মারে।
১৯২৩-এর মাঝামাঝি থেকেই বাংলায় খিলাফৎ পার্টির আলাদা কোনো প্রাধান্য ছিল না। কিন্তু আন্দোলন তো সত্যি একটা চেতনা তৈরি করেছিল। আন্দোলন অবান্তর হয়ে যাওয়ার পর কিছু খিলাফতি নেতা খিলফতের নাম করে তার সুবিধে ভোগ করতে চাইছিলেন। তাঁদের প্রধান অস্ত্র ছিল—হিন্দুধর্ম বিরোধিতা ও ‘ইসলাম বিপন্ন’ আওয়াজ তোলা। এই খিলাফতি পির ও মোল্লারা বাংলার সমাজে একটা সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ এনে দিয়েছিল।
ফরিদপুরে দুটো সামান্য ঘটনা থেকে ব্যাপক এক দাঙ্গা আকার নিল। যে-পদ্মবিলায় নমশূদ্ররা বছর দুই আগে দশের হাট বসিয়েছিল, সেই হাট থেকে মাইল দুই দূরে শ্রীপুর গ্রামে, এক নমশূদ্র ছেলের সঙ্গে কয়েকটি মুসলমান ছেলের ঝগড়া বেঁধেছিল তার বেশি কিছু নয়। দুদিন পর ১০ মে শুদ্দুরদের কয়েকটি গরু শ্রীপুরের দুই মুসলমানের ধানজমিতে ঢুকে পড়ে। জমির মালিকরা গরুগুলিকে আটকে রাখে।
নমশূদ্ররা খবর পেয়েই ছুটতে ছুটতে হাজির। তারা শুধু এটুকুই শুনে দৌড়ে এসেছে যে তাদের গরু আটকেছে। এখন, সেটা ছিল বৈশাখের শেষ। কোনো মাঠেই ধান দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। তবু গরুর স্বভাবই অন্যের জমিতে নাক ঢোকানো। বৈশাখ-মাস অবিশ্যি গরু-আটকানোর মাস নয়।
ওরা ছুটতে-ছুটতে এসে দেখে—সত্যিই তাদের চার-পাঁচটা গরু, কটা ঠিক গোনাও যাচ্ছে না, শেখদের এক পেছনের জমিতে খুঁটোয় বাঁধা।
গরু আটকালে গরু খালাশ করাটা প্রথম কাজ। তারপর ঠিক হবে—দোষ গরুর না মানুষের। গরুচুরি এক জিনিশ কিন্তু গরু-আটকানো, তাও বৈশাখমাসের শূন্য মাঠে, একেবারে বুকঠোকা ডাকাতি, আটক্যালাম তো গরু—পারিস যদি খুইল্যা নে, বাপের বেটা।
নমশূদ্রদের ক-জন ছুটে এসেছে, কে কে ছুটে এসেছে সেটা আর কে দেখে। এইসব আওয়াজ কানে গেলেই আওয়াজের দিকে মুখ করে সোজা দৌড়—’গরু আটকাইছে’ ‘নাও ভাসা-য়,’ ‘আগুন’, ‘ডাকাইত—লো-লো-লো’। আওয়াজগুলোর দিনক্ষণ একটা থাকে বটে। সকালবেলা তো আর ডাকাত-পড়ার কথা না। কিন্তু নিষেধও তো নাই। তার ওপর যদি বৌ নিয়ে মামলা থাকে। আমার বৌকে আমার শালা-সম্বন্ধীরা হাটের পথে তুইল্যা আনছিল, আমরা প্রাতঃকালে তারে উঠ্যায়া নিয়া যাচ্ছি। তেমনি, অন্য কোথাও থেকে চুরি করে এনে এখানে, একটু আড়ালে বিলের কাদায় নৌকো যদি গুঁজে দিয়ে লুকিয়ে রাখে, তাহলে, খবর পাওয়ার পরও, নৌকার মালিক কি ঠাকুরমশায়ের কাছে একবেলা বসে থেকে যাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণ জেনে আসবে? আওয়াজমাত্র ছোটো—আগল্যাও, নিব্যাও, আটক্যাও, খুইল্যা দ্যাও।
যারা ছুটে এসেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল—বিজয় দাস। পুরো মাথা শাদা বাবরি। সে নাকী নৌকাযাত্রা পালায় সখীর গান গায়। তার মুণ্ডুটা যখন সে কোনো উঁচু আলের ওপর থেকে আকাশের দিকে তোলে বা আসরে মুণ্ডুটা হারমানিয়ামের ওপর গড়িয়ে নৌকো না-নাড়াতে মিনতি করে কেষ্টকে, তখন, মুখের পেশিগুলো কাদার তালের মত চাপড়া-চাপড়া হয়ে তাকে। সে বুড়ো হয়েছে বলে তার নামে ছেলেছোকরারা নানারকম গল্প বলে। ‘বিজ্যা জ্যাঠা হারমনিতে একডা সুরই বাজাইব্যার শিখছিল, ঐ সুরডাই বাজায়্যা নতুন সব গান গাইয়্যা যায়।’
দৌড়তে-দৌড়তে এক উঁচু আলে উঠে বিজ্যা ব্যাপার কী বুঝে ফেলে—গরু আটকেছে।
বিজ্যা এক লাফে উঁচু-আল থেকে নেমে উলটোদিকে একই বেগে ছুটতে থাকে। নমশূদ্ররা তখনো দুই-একজন করে ছুটছে ঘটনার দিকে। তারা বিজ্যাকে উলটো দিকে ছুটতে দেখে থমকে দাঁড়ায়, ‘হইলডা কী?’
বিজ্যা সেই দুই-একজনকেই আঙুল তুলে দিক দেখিয়ে বলে, ‘সিধা যাওনের কাম নাই—বাঁয়ে ঘোর। ঘুইরা গিয়া টিনু মিয়ার জমির মইধ্যে আমাগ গরুগে বাইন্ধ্যা থুইছে। তোরা ঘুইর্যা গিয়্যা খুইল্যা দে।’
এসব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা এমনই অভ্যাস্ত এরা যে বিজ্যাকে সব কথা শেষ করতেও দেয় না। সামনের দিকে মারামারি হইব, পিছন থিক্যা গরু ফাঁক। তাদের পেছনে বিজ্যা তার কাঁচিটা ছুঁড়ে দিয়ে বলে, ‘কাঁচিড়া নিয়্যা যা।’
বিজ্যার এই ফন্দিতেই সামনে দুই দলে যখন মারামারি কাটাকুটি চলছে, গরুগুলো তখন ‘হা-ম্বা হা-ম্বা’ আওয়াজে নিজেদের গোয়ালের দিকে ছুটছে। গরুগুলো ছাড়া-পাওয়ার পর মারামারিটা যে নিরর্থক সেটা বুঝতে একটু সময় লাগে।
কারো না কারো ফন্দিতে কেউ না কেউ জিতে যায়, মারামারি মিটে যায়, ছোটবড় যাই হোক।
কিন্তু এবার যেন তেমনটা হল না। এবার নমশূদ্রদের মনে রাগ থেকে গেল—শেখেরা জিতে গেছে। এমন ক্ষত বেরিয়ে পড়ার কারণ—সামনে থেকে যারা শেখদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই নমশূদ্ররা শেখদের হাতে খুব মার খেয়েছে। শেখরা তৈরি ছিল। নমশূদ্ররা আওয়াজ শুনেই ছুটেছে। কারো হাতে একটা ঢিল পর্যন্ত নেই। শেখেরা মনের সাধ মিটিয়ে পিটিয়েছে। কারো কারো বুকপিঠে পাকা লাঠির বাড়ি, লাঠির মার বরাবর রক্ত জমাট বেঁধে আছে। একজনের হাঁটুর চোট এমন যে কাঁধে করে ফেরত আনতে হল। একজনেরই মাথা ফেটেছে নাকী খুলি ছেঁচড়ে গেছে। গরু খালাশ করে তারা এনেছে ঠিকই, কিন্তু শুদ্দুরদেরদের পাড়ায়-পাড়ায়, জ্বর-জখম-জ্বালা। এ থেকে কি আর এতদূর ভাবা যায় যে শ্যাখের বেটাদের ঠিকঠিক শিক্ষা দেয়া হয়েছে? সেটা যে ভাবার চেষ্টা হয়নি, তা নয়। কিন্তু সত্যটা দিন দুইয়ের মধ্যেই স্পষ্ট। হয়ে ওঠে—শেখেরা কাশিয়ানি খুনের বদলা নিল। দু-বছর আগে সেই হাটভাঙা-হাটবসানো নিয়ে শুরু। এখন বয়কটই-বা কোথায়, খিলাফতিই-বা কোথায়? কিন্তু বদলাবদলি তো চলছেই। ফরাজি আর নমশূদ্রদের মধ্যে স্বভাবের এই এক মিল যে তারা হাতের কাজ ফেলে রাখতে পারে না। বদলাবদলি যখন হচ্ছেই তো হোক।
গরু-আটকানোর দিন দুই পর একদিন সাতসকালে পদ্মবিলা আর গোয়ালগ্রামের দুই পাড়ে সারি দিয়ে হাজার দুই লোক বর্শা, তীর-ধনুক, লাঠি নিয়ে খাড়া। পদ্মবিলা নমশূদ্ররা বেশি আর গোয়ালগ্রাম তো গায়ে গা লাগানো—শেখরাই মাথাগনতিতে বেশি। হাজার দুই মানুষ, শ্যাখ ও শুদ্দুর মিসিল বাইন্ধ্যা খাড়া, অস্ত্র নিয়্যা, কেউ-কেউ বলে গোপনে দুই পক্ষেই বন্দুকও ছিল। মত অফিশারদের মুখগুলি, তর কিন্তু দুই দলই খাড়া। কেউ কারো দিকে আগায় না। থানার ছোটবাবুর মালখানায় ছিল দুটো বন্দুক আর দুটো লাঠি-পুলিশ। তিনিও এই অস্ত্র নিয়ে এসে পড়েন ও ঢুকতে-ঢুকতেই প্রত্যেক বন্দুক থেকে একটা করে ফাঁকা আওয়াজ করেন। যাই হোক, দারোগাবাবুর কথায় দুই পক্ষই দাঙ্গা থেকে বিরত হয়। কিন্তু দারোগাবাবু যখনই শেখদের গ্রামে ফিরে যেতে বলে, তখনই শেখরা বলে, ‘ওরা আগে সরুক।’ দারোগাবাবু যখন শুদ্দুরদের কাছে এসে একই কথা বললেন তখন তারাও একই জবাব দেয়, ‘আগে শাখদের সইরব্যার কন।’ শেষে সূর্য পাটে পড়তেই মুসলমানরা মাঠ ছেড়ে তাদের গোয়ালগ্রামের দিকে রওনা দিল। তারা রোজায় ছিল, রোজা ভাঙতে হবে। নমশূদ্রদের সুযোগ ছিল, পেছন থেকে পালটা আক্রমণের। কিন্তু সে-ই তখন দাঙ্গাদাঙ্গির অবস্থা এত খারাপ হয়নি—রোজা রাখা মুসলমানকে পেছন থেকে মারাই হিন্দুধর্ম। মুসলমানরাও এটা জানল, বলেই সূর্যাস্তে পেছন ফিরেছিল। এতে অবিশ্যি একটা ধারণা চাউড় হল যে আসলে কোনোপক্ষই মারামারি লাগাতে চায় না।
পরের দিন সাতসকালে সেই একই জায়গায় আবার যুদ্ধ-সমাবেশ। নমশূদ্ররা সাড়ে তিন হাজার। মুসলমানরা আড়াই হাজার। দাঙ্গার হিশেব যে কী করে এত ঠিকঠাক হয় সে এক সাব-ইনস্পেক্টরই জানে, যাকে প্রাথমিক রিপোর্ট লিখতে হয়েছে। দুই দলের কোনো দলই এগচ্ছিল না আর তাদের মাঝখান দিয়ে সাব-ইনস্পেক্টার তার চার বন্দুক নিয়ে ফৌজি কায়দায় চলাফেরা করছিল। ভোর ছ-টা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত দশঘণ্টায় সাব-ইনস্পেক্টর তিনবার বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করেছে। তার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, সেই তিনটি আওয়াজেই দাঙ্গাটা ঠেকে আছে। সে তখন দুই দলের সামনেই চিৎকার করে হুকুম জানাল, যদি এই মুহূর্তে সবাই নিজের নিজের গ্রামে ফিরে না যায়, তাহলে, সে পরের গুলিটা আকাশে ছুড়বে না, তাদের বুকে মাথায় ছুড়বে।
এ-পর্যন্তও একরকম ছিল।
সে হঠাৎ এক নমশূদ্রের হাত থেকে বর্শাটা কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
তৎক্ষণাৎ তাকে সবাই ঘিরে ধরে চিৎকার করতে লাগল। হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়াটা একটা নতুন কাজ। সাব-ইনস্পেক্টর সেটা হিশেব কষেনি যে এর ফলে নিজেই প্রতিপক্ষ প্রতিপন্ন হয়ে যাবে।
‘যা করার করেন, হাতিয়ারে হাত ছোঁয়াবেন না, হাতিয়ার ফিরত দ্যান।’
‘শ্যাখগ বর্শা কি ভোঁতা? বেন্ধে না?’
‘হাতিয়ার ফিরত না দিলে পুলিশের ছাড় নাই।
‘হাতিয়ার ফিরত দ্যান।’
‘আপনার লগে তো কোনো বিবাদ নাই। বিবাদ বাঁধান ক্যা? হাতিয়ার ফিরত দ্যান।’
‘শ্যাখরা কিন্তু নিজেগ চক্ষুতে দেইখল—পুলিশ তাগ পক্ষে। এইবার অরা অস্ত্র চালাইব। হাতিয়ার ফিরত দ্যান।’
সাব-ইনস্পেক্টরটি তখন বুঝে গেছে, সে দাঙ্গায় পুলিশের সবচেয়ে ভুল কাজটি করে ফেলেছে। এক্ষুনি যদি এর উলটো কিছু না-করা যায় তাহলে এই নমশূদ্ররা খুব ঠান্ডা মাথায় তার গায়ের চামড়া খুলে নিয়ে, তার চামড়াখসা শরীটা পদ্মবিলায় ভাসিয়ে দিতে পারে। এখানে প্রতিপক্ষতা ঐ পর্যন্ত ও যেতে পারে স্বাভাবিক গতিতে। ইনস্পেক্টরটি ভয় পেয়ে যায়। তার বয়স এতই কম যে চার বন্দুক, চার সেপাই, তাকে কোনো ভরসা দিতে পারল না। বৃহত্তর কোনো রাষ্ট্রের সব চিহ্নগুলো, এসডিও বা জিলা-ম্যাজিস্ট্রেট বা এসপির মত অফিশারদের মুখগুলি তার তখন তার চোখে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। এদের কারো মুখই সে কখনো দেখেনি। সব মুখই তার ধারণায় আঁকা। সে বর্শাটা মাটি থেকে তুলে, যার বর্শা তাকে ফেরত দেয়। ফেরতের সময় তুচ্ছ একটা গোলমাল করে ফেলেছিল। কার হাত থেকে বর্শাটা সে কেড়েছিল সেটা আর তার মনে থাকবে কী করে? মাটি থেকে বর্শাটা তুলে, সে সবচেয়ে কাছে যাকে পেল, তার হাতে বর্শাটা তুলে দিল। সে-লোকটা কিন্তু সামান্য অপ্রস্তুতও হল না– তুলে দেয়া বর্শাটা আগের লাইনের কোনামারা ডানহাতি লোকটাকে এগিয়ে দিল। এতে কারো কিছুই মনে হবে কী করে দারোগারা তো সবসময়ই লোক দিয়েই কাজ করায়। এখানে বর্শা দিইয়েছে। সাব-ইনস্পেক্টার যে ভুললোকটির ভঙ্গি দেখে নিজের ভুল সংশোধনের জন্য হঠাৎ জাগ্রতের মত নিজে হাত বাড়িয়েই গুটিয়ে নিয়েছিল—সেটা চোখে পড়বার মত আকারের কিছু না হলেও তো চোখে পড়ে থাকতেও পারে কারো, কারো কারো, বা একজন কারো। যেসব ভঙ্গি থেকে সমাবেশ জেনে যায়, সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিল, সেসব ভঙ্গি অন্তত একজন কেউ ঠিকই দেখে ফেলে, পলকে, আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা ঢিল তুলে ছোঁড়ে প্রতিপক্ষের দিকে। ব্যস, দিনের শেষে শুরু হয়ে গেল—ঢেলাঢিলি। মাটির শক্ত টুকরো, বাঁশকাটা একহাতি সব লাঠি, বর্শা, গোটা খাটো বাঁশ বনবন করতে-করতে বাতাস কাটে। সন্ধ্যার পর যে যার গ্রামে ফিরে খোঁজখবর নিয়ে জানল—নমশূদ্রদের কেউ মারা যায়নি আর-একজনের জখম খারাপ। শেখদের একজন মারা গেছে আর কয়েকজনের জখম খারাপ। তাহলে তো জয়ই হল শূদ্রদের?
