৯৫. মাহিলাড়ার কৃষক সম্মিলন
মাহিলাড়ার কৃষক সম্মিলনে এতটা জড়িয়ে পড়বে-যে, যোগেন সেটা মনে-মনেও ভাবেনি। ওঁরা কৃষকসমিতি করেছেন, আন্দামান-দেউলি-খাটা বিশ্বাসী নেতা আছেন, যোগেনকে প্রক্সি প্রেসিডেন্ট হয়ে একটা ভাষণ দিতে হবে—এইটুকু তো তার জন্য নির্ধারিত কাজ। যেটুকু কাজের জন্যই হোক, যোগেন তো নিজের সবকিছু সেই কাজে লেপটে না দিয়ে পারে না। এটা যোগেনের স্বভাব।
নিজের বাড়িতে বাপ, যোগামা, খুড়ারা, খুড়িমারা, ভাইবোনরা আর বৌ-ছেলেরা একসঙ্গে অজ্ঞাতবাস কাটাবে বলেই-না যোগেন মৈস্তারকান্দি এসেছে। অজ্ঞাতবাসের এমন টান উঠলে আর বসবাসে থাকা যায় না। অজ্ঞাতবাস থেকে মানুষটার বদলে আসারই কথা। তবে, সবসময় যে তেমন হয়, তা না।
অজ্ঞাতবাস, মানে কি টানা জীবন কাটাতে-কাটাতে হঠাৎ একটু জিরেন নেয়া? নইলে, গান্ধীজি ডাক দিতেই চাকরিবাকরি, অফিসকাছারি, স্কুলকলেজ ছেড়েছুড়ে দিয়ে সবাই আইন অমান্য করে জেলে যাওয়া শুরু করে? গান্ধীজির ডাকটা তাদের কাছে পৌঁছে ছিল সেই অজ্ঞাতবাসের ডাক হয়ে।
আবার গান্ধীজি মানুষটা যোগেনের কাছে পৌঁছেছিলেন, অজ্ঞাতবাস শেষ করার ডাক নিয়ে, মন্দিরে-মন্দিরে ঢোকার ডাক নিয়ে, হিন্দু হয়ে বসবাসের ডাক নিয়ে, অচ্ছুৎ-মন ঝেড়ে ফেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হিন্দু হওয়ার ডাক নিয়ে। সেটাও কারো কাছে অজ্ঞাতবাসের ডাক হতে পারে। যোগেন জানে—গান্ধীজির ডাকের মায়া আছে। সে তাই নিজের অজ্ঞাতবাসে চলে এসেছে মৈস্তারকান্দির বাড়িতে অথচ এই বাড়িটা থেকে বেরিয়ে যেতে তার চৌত্রিশ বছরের জীবন জুড়ে কত উলটো টানই-না উশকেছে যোগেন। সেটাও, সেই বাহিরটাও তো ছিল অজ্ঞাতবাস এখন যোগেনকে তার বসবাসে ফিরতে হবে—অজ্ঞাতবাসে আয়ত্তে আসা বর, শাপ, অস্ত্র ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। বাসভূমি তৈরির সেই প্রকাশ্যতায় এই বাড়িই তার অজ্ঞাতবাস গৃহ।
সম্মেলনের প্রথম দিন বিকেলনাগাদ মঞ্চে বসে যোগেন বুঝতে পারেনি, এই সমাবেশের চেহারাচরিত্র। কিছু লোক বসে আছে, কিছু লোক যাতায়াত করছে, কিছু লোক জটলা পাকাচ্ছে। গ্রামে তো মানুষজনের দেখাসাক্ষাতের জায়গাও কম, সুযোগও কম। চব্বিশটা ঘণ্টা এমন জমাট যে কারো কোনো খামতি হলে ধরা সে পড়বেই। চুরি করতে বেরনোরও বাঁধা টাইম আছে। আর, মঙ্গলবারের হাট সেরে, হাটবাবু সন্ধ্যা নামতেই আগৈলঝরার পশ্চিমের হাওর পার হয় এক ডিঙিতে। সেখান থেকে এক নৌকো নিয়ে তেতুলিয়া নদী দিয়ে এই পাড়েই তার দ্বিতীয় সংসার করতে যান। সেই স্কুলের দিন থেকে যোগেনরা দেখে আসছে, হাটবাবুর চেহারার কোনো বদল নেই, ছাপা শাটিঙের হাফ শার্টে কোনো বদল নেই, মঙ্গলবারের সন্ধ্যার কোনো বদল নেই, হাটবাবুর দ্বিতীয় সংসারের কোনো বদল নেই। এতখানি পথ, স্থলে জলে পেরিয়ে সৎ ব্রাহ্মণ হাটবাবু এক মুসলমানীর সঙ্গে ঘর করছেন যুগ-যুগ ধরে। তাদের সংসার হল মঙ্গলবার প্রথম রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর।
গ্রামের মানুষ এমনই নিয়মের কাজে বাঁধা, যে হাট, বাজার, মেলা, পরব ছাড়া দেখা হয় না তাদের। যেখানেই তাদের দেখা হোক, তারা ঠিক একটা মেলা বসিয়ে নেবে। মিটিঙের মত মিটিংও চলবে।
মাহিলাড়ার সম্মিলনটাকে এই চেনা ছকের বাইরে আর কী ভাবে দেখবে যোগেন, তার ওপর পশ্চিম থেকে সূর্যাস্তের আলো পড়ে আড়াল করে দিয়েছে মঞ্চ থেকে ডানদিকের অংশটা। ফলে, যোগেন কোনো আন্দাজই পায় না। পেল—অন্ধকার একটু ঘনিয়ে উঠলে। ঐ অন্ধকারের বিস্তারের ভিতরে দূরে-দূরে বুকের কাছে ধরে থাকা কিছু লালশিখার লণ্ঠন। কোথাও একটা কুপি জ্বলছে। আর অন্ধকার আলোর ধোঁয়া আর-একটা দিগন্ত হয়ে বয়ে যাচ্ছে। যোগেনকে মনে করিয়ে দেয়—খাল কেটে জমি বাঁচাতে চায় বিলের চাষিরা। সে তখন গলা সপ্তমে তুলে বলছে—’কেউ কি কোনোদিন শুইনছেন, কৃষক ছাড়া কৃষি হয়? তাইলে কৃষির জইন্য কৃষকের যা দরকার, যা কিছু কৃষকের মনে হবে তার দরকার, সেই সব কিছু করার পুরা অধিকার কৃষকের আছে।’
যোগেন একটু থামে। সে লক্ষ করে, তার মুখ থেকে স্বাভাবিক বেগে, ‘পুরা অধিকার কৃষককে দিতে হবে’, বেরল না। বেরল, ‘অধিকার কৃষকের আছে’। যোগেন নিজেই আঁচ পায়নি যে ভিতরে-ভিতরে ল্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্টের সংস্কার, কংগ্রেসি হিন্দু জমিদার আর মুসলিম জোতদার-তালুকদারের ভূমিসংস্কারে ঢোক চিপে কথা বলার ঐক্য, ভূমিসংস্কার আইন—এইসব মিলে তার ভিতরে জমি-জমির মালিক—জমির কৃষকের সম্পর্ক নিয়ে একটা বোধ তৈরি করে ফেলেছে। বলতে-বলতেই যোগেন নিজের কথাগুলো শুনে ভেবে ফেলে, সে তো বরং উলটোটাই ভাবছিল—জমিদার না-থাকলে গরিবের গরিব চাষিদের ভরসা কোথায়, ঋণ সালিশি বোর্ডের ধাক্কায় চাষে তো আর কেউ লাল পয়সাও ঠেকাবে না। যোগেন এখন কী ভাবছে সেটা তার নিজের গলাতেই সে শোনে ও বলার আগে বাক্যগুলি সাজানো থেকে বোঝে—’এক জমির কত মালিক গুনে শেষ করা যায় না। একজন মালিক হলেন জমিদার—সরকারি জামিন, তার জমিতে থাকার কোনো দায় নাই, শুধু সরকারের ঘরে কিস্তিবন্দী খাজনা দিলেই খালাশ। কিন্তু এত বড় জমিদারির ঘরে-ঘরে গিয়্যা খাজনা আদায় নেয়া যায়? যায় না। তাই আর-এক মালিক হইল তালুকদার। স্যায় তালুকের সাইজমত খাজনা জমিদারের কাছারিতে জমা দিলেই খালাশ। কিন্তু একবার তালুকদারি ধইরলে তো হাত সুড়সুড়ায়, পাও সুড়সুড়ায়। তহন আরো তালুক বায়না নেয়। এত ব্যস্ত-সমস্ত তালুকদারের পকেটে কি আর টাইম থাকে সব তালুকে টহল মারার? তাই আইল, নিম-তালুকদার। নিম-তালুকদার কি চিরজীবনই নিম থাইকব্যার চায়? স্যায়ও চায় কুলিন হবার। তাই স্যায়ও রাইয়তের হাতে জমি দেয়। আপাতত রাইয়তেই যদি থামি তাইলেও খাড়ায় এক জমিদারির চাইর-চাইরডা, এক গণ্ডা, মালিক। তারা সক্কলেই মালিক। কায়ও চাষা না। পাঁচ নম্বর মালিক হইলেন আধা-মালিক, আধা-চাষি। মুসলমান বা শুদ্দুর জাইতের রায়ত নিজেও চষে, ভাগে দিয়াও চষায়। ফসলের ভাগ নেয়। তাইলে, এই-যে পাঁচ-পাঁচ খান ধাপ, যেমন সুপুরিগাছের গোড়া কাইট্যা খালের ঘাট বানায়, তেমনি পাঁচ-পাঁচ খান ধাপের সঙ্গে জমির কোনো আবাদের সম্বন্ধন নাই, আছে শুধু খাজনার সম্বন্ধন। জমিদার, তালুকদার, নিম-তালুকদার, গেরস্ত রাইয়ত—এই পর্যন্ত কোনো ধানপাটের হিশাব নাই। আবাদ শুধু চাষি-রাইয়ত আর ভাগচাষির ব্যাপার। আর, এই-যে এত-ধাপের খাজনা এডা কেডা দ্যায়? সেই চাষি-রাইয়ত আর ভাগচাষি। স্যায় তো আর জমি থিক্যা পলাবার পারে না। তাইলে সরকারি খাজনারও একমাত্র ওয়ারিশ হইল চাষি। আর ফলনেরও একমাত্র দায়িক হইল চাষি। কিন্তু স্যায় চাষির জমির উপর দখল নাই কুনো। নিজের জমিতে সুপারিগাছ থিক্যা একডা সুপুরি খাওয়ারও আইন নাই চাষির। এই যে-সরকার এখন দেশ শাসন করে তারা চাষিগোর কথা এডডু আধডু ভাবে। ক্যা ভাবে, তা আমি জানি না। ভাইবলে পরের ভোটে জিতব, এমন আশা হয়ত আছে। মেম্বারগো ভিতরে দুই-তিন গণ্ডা রায়ত বা চাষি থাইকবার পারে। তালুকদার নিম-তালুকদার তো আছেই। আবার, উকিল-ব্যারিস্টারও আছে। তাই সভার একডা-দুইডা আইন হইছে। মানে, আইন নিয়্যা কিছু কথা হইছে, কর্জ-ধানের সুদ কমানোর সালিশ বসানো হইছে, বাজে-আদায় হাটবাজারে বেআইন হইছে। চাষি যদি এই আইনের বদল নিজের চক্ষুতে না দেখে, তাইলে এইসব আইনেও কাজ কিছু হইব না। চাষিরে তাই শুধু চাষ কইরলেই হব না। চাষের জইন্যে যা দরকার, চাষি তা-ই করব। এইডা চাষির দখল।’
যোগেন একটু থামে। কয়েক মাস ধরেই এই সমস্ত আইনকানুনের রহস্যের ভিতর ঘুরপাক খেতে-খেতে সে নিজেই একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে আছে। তার কোনো পুরুষে কোনো জমি নেই। সে কী করে আন্দাজ করতে পারবে, কোন আইনে কার উপকার, কার হাতে কে তামাক খায়। জমিজমা নিয়ে খুনোখুনি, দাঙ্গাহাঙ্গামা এইসবে তার আপত্তিই আছে—মনে-মনে। এমন একটা ধারণাতেও সে বাঁধা, যে, এসব বেনিয়মি, দখলি, দাঙ্গা বেশির ভাগই লাগায় রাইয়ত আর চাষিরা। তালুকদার, নিম-তালুকদার, গৃহস্থ রায়ত—দাঙ্গা হাঙ্গামায় এদের তো লাভ নেই! তাছাড়াও জমিদার-তালুকদাররা যদি হাঙ্গামা বাধাতে চায়, তাহলে তাদের তো লেঠেল-পাইকের বাহিনী বানাতে হয়। উলটোদিকে চাষিমাঝিরা তো নিজেরাই লেঠেল-পাইক। মানুষের মনের ভাব তো আর যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে তৈরি হয় না, তৈরি হয় নিজের স্বার্থ ও লাভক্ষতি থেকে। জমিজমার ব্যাপারে সেই মনোভাবটাই যোগেনের তৈরি হয়নি। তাদের বাড়িঘরের দুঃখদুর্দশা, অভাব-অকুলান এতই প্রাচীন ও বংশানুক্রমিক যে সেসব তার চিন্তাভাবনার মধ্যে ঢোকেইনি। অথচ, বামুন-কায়েতদের সঙ্গে বর্ণভেদের যন্ত্রণায় সারা গায়ে তার যেন রাতদিন ভিমরুল কামড়ায়। যোগেনের কি এমন কোনো অনুভবও তৈরি হয়ে গেছে যে জমি থাকলে মালিকও থাকবে, আর নিজের যার কাজের জোর থাকে সে ঠিক দাঁড়িয়ে যায়, মালিক তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না? এই এমন অনুভব, যদি থাকেই যোগেনের, তার শিকড় কি তার একার জীবনের এই সাফল্য বোধের মধ্যে গেড়ে যাচ্ছে।
এই প্রথম যোগেনকে প্রকাশ্যে বলতে হল— ফজলুল হক-সরকারের জমি ও চাষি নীতি কী? আইনসভাতেও বলেনি। সে তো বিরোধীপক্ষে। তার ওপর কংগ্রেস তাদের ডেকেছে। আজ বাদে কাল হকশাহেবের মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তোলা হবে। শরৎ বোস হিশেবনিকেশ করছে। আর, যোগেন কী না মাহিলাড়া-র বিল্যা লোকজনদের এই মিটিঙে এসে এত চাষিকে একসঙ্গে জোট পাকাতে দেখে ও তাদের জ্বলন্ত চোখ দেখে, তাদের সম্বোধন করে, নিজের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে?
হ্যাঁ। যোগেন নিজেই নিজের গলা শুনে জানতে পারে, যাচ্ছে। নিজেরই সঙ্গে কথা বলে, যাচ্ছে। যোগেন কি এক বারও আন্দাজ পায়নি যে কথাগুলি এমন বিস্ফোরক হয়ে আছে তার ভিতরে? বুকের ভিতরের আগুন কি আর বাইরে তাপ দেয়। বরং যোগেন আরো শুনতে চায় নিজের গলায় নিজের কথা।
যোগেন শোনে, সে বলছে, ‘বাউন ছাড়া যহন পুরুত হইব্যার কেউ পারে না, তাইলে কোন পূজার কী নৈবেদ্য সে-বিচারে তো বামুনঠাকুরের বিধানই বেবাকের উপরে। তেমনি শুদ্দুর আর শ্যাখরা ছাড়া যদি কেউ চাষি হইব্যার না পারে, তাইলে কোন জমির কী ব্যবস্থা সে-বিচারে তো শ্যাখ-শুদ্দুরের বিধানই বেবাকের উপরে। কোন বিলের বাড়তি জল বাইর করার খাল কাইটতে হব আর কোন জমির ফলন বাঁচাইতে বাড়তি জল ঢুকাইব্যার লাগে, সেডা তো চাষিগোর ঘরের ব্যাপার। আগামি কাল প্রাতঃকালে যহন আপনাগো রোজকার নিদ্রাভঙ্গ হয়, কাইলও তাই হইব। সকালে উইঠবার লগে পুরা রাইতডা জাইগ্যা থাইকেন না। যহন আপনাগো জাগরণ, তহনই এই মাহিলাড়ার খাল খননের আরম্ভন হইব। আরম্ভন হইয়া গ্যালে শ্যাষের আগে শ্যাষ নাই। কতক্ষণ লাইগব তারও হিশাব নাই। যদি আপনাগো কোদাল-কুড়াইলের খাওয়ার মুখডা হয় দশাননের সাইজে আর তার ধার থাকে কুমিরের দাঁতের লাগাল, তাইলে একশ মাথার দুইশ হাতে এই মাইলদুই মাটি উগরাইতে আর কয়দিন কয়ঘণ্টা লাগে? যদি দুইশ হাতের একশ মাথায় খালের জমির মাটি পাড়ে ফেইলবার ঝুড়িগুলা থাহে নিদ্রাভঙ্গের পর কুম্ভকর্ণের খিদ্যার লাগাল খিদ্যা, তাইলে এই মাইল দুই মাটি কুপাইয়া জল তুইলতে আর কয়দিন-কয়ঘণ্টা লাইগব? আপনারা অ্যাহন সন্ধ্যার পূর্বে বাড়ি ফেরেন, কোদাল-কুড়াইল-ঝুড়ি পরীক্ষা মেরামতি সাইর্যা নিজের-নিজের হাতের ভাঁজে মাথা দিয়্যা রাইতের ঘুম দ্যান। আইজ আর মাথা থোয়ার লগে বিবি বৌ-রে হাতড়াইবেন না। কালি প্রাতে আরম্ভিবে মহারণ, আজিকার রাইত অবশ্যই সংযমন’
অতবড় সমাবেশকে থতমত খাইয়ে ও নিজেও থতমত খেয়ে যোগেন বক্তৃতা শেষ করে দেয়। যারা শুনছিল, তারা তো আর রোজ বক্তৃতা শোনে না। তাই তারা বুঝতে পারে না—বক্তৃতা শেষ হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেই পুরো সমাবেশ দাঁড়িয়ে উঠে ধ্বনি তোলে—’জয়ো জয়ো যোগেনো মণ্ডলো জয়ো, জয়ো জয়ো।’
নলিনী ছুটে এসে যোগেনকে ধরে বলে, ‘আরে, তুমি তো বিরাট মাপের মাস-লিডার। বঙ্কিমবাবু নিশ্চয়ই তোমার চাইতে বড় লিডার, বড় স্পিকার। কিন্তু তুমি যেমন আন্দোলনটাকে কর্তব্য করে দিলে চাষিদের, এমনটা কি মাটির নেতা ছাড়া কেউ পারে?’
‘কন কী নলিনীদা, আমি তো আকাইম্যা মানুষ। আমার নি ক্ষমতা ছিল এমন একডা মিটিং ডাকার? বিপ্লবী ছাড়া সেই ধৈর্য থাহে? পনের বছর দেউলি, সারা জীবন আন্দামান না খাইটলে এই ধৈর্য জন্মায়? আপনাগো কী কামে লাইগল্যাম, জানি না। কিন্তু আপনাগো মিটিং আমারে বড় বাঁচান বাঁচাইল আজ।’
‘বাঁচামরার কথা আসে কোত্থেকে?’
‘আমি তো শুদ্দুর হিশাবেও থার্ড ক্লাশ, চাষি হিশাবে তো অষ্টরম্ভা। জমিজমা জমিদার-চাষি ঋণ-সালিশি নিয়্যা নিজের কুনো মতামত তৈরি হয় নাই। কোখন হব—আমাগো তো এক চিমটা জমিও নাই। বংশের পর বংশ না-থাইকতে-থাইকতে মগজে গজাল ঢুইক্যা গিছে যে আমাগো জমি থাইকব্যার কুনো কথাই নাই। তাইলে জমিদারি-জোতদারি মহাজনি এইসব হাঙ্গাম বাঁধাইব্যার হেতু নাই। যা আছে, থাউক। কোন ব্যবস্থায় দুষ্ট ব্যক্তি থাকে না? আপনার এই মিটিঙে আইস্যা আমার অঙ্কডার ভুল বুইঝল্যাম। আমি কইষতেছিল্যাম ভুল সমীকরণ। শুদ্দুর বা শ্যাখ হওয়ার সুবাদে তো চাষি হয় না। মাহিলাড়ার গোটা বিশ-পঞ্চাশ ভদ্দরলোকদের স্বার্থ আর এই শয়ে শয়ে বিল্যাচাষির স্বার্থ নিয়্যা যদি পক্ষ নিব্যার লাগে—আমি কী কইর্যা শুদ্দুর-শ্যাখগো পক্ষ ত্যাগ করি? আমার তো সেই চয়েসই নাই নলিনীদা। আমি কাইল উষাকালে আইয়্যা পড়ব নি।’
‘তুমি এলে তো নাচতে-নাচতে খাল কাটা হবে। তাহলে একজন কাউকে বলি নৌকো নিয়ে তোমাকে আনতে?’
‘নলিনীদা, কন কী? মৈস্তারকান্দি থিক্যা মাহিলাড়া—এইটুকু আমি একা নাও বাইব্যার পারি না? কন কী? তাইলে তো শাহেবগো জেলখানাই নিরাপদ। চরিত্র নষ্ট হওয়ার ভয় নাই।’ মাহিলাড়ার খাল কাটা হল শনিবার। বিঘে খানেক দূরত্ব বাকি ছিল, তার আগেই অন্ধকার হয়ে গেল। কথা উঠেছিল, মশাল জ্বেলে বাকিটা শেষ করে দেয়া। সেটা আর করা হল না—ঠিক হল রবিবারে ঐ টুকু খোঁড়া হবে আর বিল থেকে জলও ছাড়া হবে।
যোগেন অন্ধকার থাকতেই এক ছিপ নৌকো নিয়ে হাজির। যোগেনকে দেখে সত্যিই যেন কাজের গতি বেড়ে গেল। আলো ফুটতেই নিজের জামা খুলে রেখে, ধুতি মালকোঁচা মেরে এক কোদাল নিয়ে নেমে পড়ল খাল কাটতে। নইলে তো যোগেনকে মানতে হয়—সে এত বুড়ো যে কোদাল চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়, বা সে বামুন-কায়েত-বৈদ্যের মধ্যে বা মোল্লা-মৌলবীর মধ্যে পড়ে—এসব কাজ বেতরিবতের কাজ, বা সে উকিল-ব্যারিস্টার- জমিদারদের মত ঠিকা নেতা। খালকাটা বা ঝুড়িতে করে মাটি তুলে মাথায় নিয়ে পাড়ে ফেলা এইসব কাজ আর তার নিজের কাছে নিজের পরিচয় নিয়ে তেমন কিছু বিবাদ-বিসংবাদ ঘটেনি, যার সুরাহার জন্য যোগেন কোদাল নিল কাঁধে বা ঝুড়ি তুলল মাথায়। যেখানে গতর লাগে, সেখানে গতর না-খাটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার চোদ্দো পুরুষের পক্ষেও সম্ভব নয়। যা স্বাভাবিক ও তার বংশানুক্রমিক, যোগেন মাত্র সেইটুকুই করেছে। তা নিয়ে কোনো হৈহল্লাও তাই হয়নি। লোন অফিসারও এসেছিল। তার সঙ্গে কথা বলে যোগেন আন্দাজ পায়, অফিসারের সঙ্গে আলাদা করে সে কিছু আন্দাজ পেতে পারে। সে অফিসারকে, পরদিন, রবিবার একটু আসতে বলে, হ্যাঁ, ঐ খালপাড়েই।
রবিবারে যোগেন আর খালের কাজে হাত লাগায়নি। কিছু কাগজ ও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। একটা গাছতলায় অফিসারকে নিয়ে বসে, সে কথা বলছিল আর মাঝেমধ্যে কাগজে লিখছিল। খালকাটার ব্যস্ততায় তাদের কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। তারাও কোনো অসুবিধে তৈরি করছিল না। কিন্তু দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তারা বেশ নিবিড় আলাপে মগ্ন আর আলাপটা চলতেই থাকবে।
সকালটা চৈত্রের রোদে তেতে উঠছিল। তারা যে-জায়গায় বসে কথা বলছিল সেটা কোনো গৃহস্থ বাড়ির খিড়কি। এক মহিলা সেই খিড়কির টিনের দরজা খুলে হেঁটে যোগেনের দিকে আসেন। আধময়লা শাড়ি, মাথায় একটু ঘোমটা, চোখে চশমা। যোগেন বোঝেইনি মহিলা তাদের দিকেই আসছেন। যখন বোঝে, তখন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় ও মহিলা যোগেনকে নমস্কার করে ফেলেন, দুই হাত জড়ো করে। যোগেনকে একটা প্রতি-নমস্কার করে হাসতে হয়। ততক্ষণে মহিলা জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তো যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল?’
‘আজ্ঞে—’
‘আপনারা কিন্তু আমাদের বাড়িতে বসেও কথা বলতে পারেন—’
‘না, না, সে তো, এই এখানডায় তো বেবাক মানুষ আছে—’
‘হ্যাঁ, তাঁরা তো একটা কাজে ব্যস্ত আছেন—
‘আমরাও, আমরাও, ঐ কাজেই—’
‘মনে হল আপনারা খুব বিশেষ কোনো আলাপে মগ্ন। রোদও তো চড়েছে আমাদের ঘরটায় বসলে আপনাদের কথাবার্তার সুবিধেই হবে আ—সুন। এটা প্রোফেসর সেনের বাড়ি।’
ততক্ষণে যোগেন ভদ্রমহিলাকে ও অফিসার যোগেনকে অনুসরণ করছে। যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘প্রোফেসর সেন? মানে প্রোফেসর এস এন সেন? হিস্টরিয়ান?’
মহিলা ঘাড়টা ঘুরিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ’—
‘খাইছে। বরিশালের এই একডা বিপদ। মাহিলাড়া, গৈলা, বাটাজোড়, বাকলা— যেহানেই যান, য্যান, দেশগৌরবদের মেলা বইস্যা গিছে। চন্দ্রদ্বীপের পণ্ডিতগণ আছেন। বরিশালে সত্যি একডা রত্নসমুদ্র’
ওরা ঢুকেছে বাড়ির পাছদুয়ার দিয়ে। বাঁয়ে গোয়াল। ডাইনে সুপুরিগাছের সারি। তারই মধ্যে একটা লাউমাচা। লাউমাচার নীচে কিছু লঙ্কাগাছ। বাঁয়ে রান্নাঘর—চেগার দেয়া, ওপরে টিন। রবারান্দার কোণে আরো একটা ছোট রান্নাঘর। যোগেন অনুমান করে, হবিষ্যি ঘর। বেশ বড় ঠনঠনে দুয়ার পার হয়ে টিনের একটা চার চালা ঘর। বেড়া চেগারের। তার ওপর আলকাতরা—সেই ঘরটার ভিতরে ঢোকার আগে যোগেন একটু দ্বিধা নিয়েই বলে, ‘আমি তো নমশূদ্র, আর এও কিন্তু মুসলমান। আমাদের তো আপনাদের ঘরে ঢোকা নিষেধ।’
‘আপনারা তো ঢোকেননি আমি ডেকে এনেছি। সেটা তো বারণ নয়। আসুন। আপনারা এই ঘরে বসে কথা বলুন।’
ওরা বসার জায়গা খুঁজে বের করার আগেই মহিলা চলে গেলেন। বোঝা যাচ্ছিল—এটা সদর ঘর। এর সামনেই বড় রাস্তা। সেনবাড়িতে তো একটা বারবাড়ি থাকার কথা—যোগেন সদর দরজার কাছে গিয়ে বারবাড়ি খুঁজে আসে। লোন অফিসার ততক্ষণে একটা কাঠের চেয়ারে বসে বলতে শুরু করেছে, ‘স্যার, বসেন, নাইলে আমি কথার খেই হারায়্যা ফেইলব। সন্দ হয়, সালিশি বোর্ড অ্যাহন সাড়ে তিন হাজার, চাইর হাজার ছাইড়া গেল। সরকারের নীতিডা কী স্যার, সালিশি বোর্ড তৈরির? থানা পিছু একডা?’
‘সেইডা হয় নাকি। ঋণের সঙ্গে থানার সম্পর্ক কী?’
‘তাইলে স্যার—’
‘ইউনিয়ন পিছু ধইরব্যার পারেন। ঋণ সালিশি বোর্ড তো কাম কইরতে পারে শুধু ইউনিয়ন বোর্ডের আন্ডারে।’
‘সেইখানেই তো স্যার শোয়ার ঘরে সাপের গর্ত। কংগ্রেস-না অ্যান্টি ইউনিয়ন বোর্ড আন্দোলন লাগাইছিল—’
‘সম্ভবত তোমার জন্মের পূর্বে। অ্যাহন তো কংগ্রেস পাইরলে এক মেম্বারের জায়গায় পাঁচ মেম্বার চায়—’
‘এ তো স্যার মামার বাড়ির মোয়া না যে হাত ঘুরাইলেই মিলব।’
‘তাও যদি মামি মামার দ্বিতীয় পক্ষ না-হয়।’
‘প্রথমপক্ষেও হয় না স্যার। কংগ্রেস কইল ইউনিয়ন বোর্ডে যাওয়া নাই। নাই তো নাই। যাওয়ার লোকের তো অভাব নাই। মুসলমানরাই বেশির ভাগ ইউনিয়নের চেয়ার পাইল। আর, ঋণ সালিশির আইন তো স্যার দুই বছর আগে। তহন গবমেন্ট অর্ডার দিল, সালিশি বোর্ড চালাইব ইউনিয়ন বোর্ড। ব্যাস। লাইগ্যা গেল পার্মানেন্ট কাইজা হিন্দু-মুসলমানে। তহনো তো স্যার কংগ্রেস-লিগ-প্রজা পার্টি এইসব নাম হয় নাই।’
‘এতডা কথা তোমার সংগ্রহ কী কামে?’
‘কী যে কন স্যার। আমার নি সাইধ্য আছে?’
‘লোক লাগাইয়া আনছ?’
‘কী যে কন স্যার! আমার নি লোক লাগাইবার সাইধ্য আছে।’
‘আরে, এডডা কিছু তো কবা রে মিয়া? সবই তোমার সাইধ্যের বাইরে কও আর ধানক্ষেতে টিয়ার ঝাঁকের নাগাল দাঁতের আওয়াজ তুইল্যা তো শুন্যাবার ধইরছ ইউনিয়ন বোর্ডের জন্মকথা এইসব কানে শোনা কথা কইয়্যা ঘুইর্যা মরো, অফিসার, তোমার মরণ আসন্ন। যে-কথাই কও তার দায় তো নিবা লাগব? তহন কইবাডা কী?’
‘আন্না হো আকবর।’
যোগেন একটু হেসে বলে, ‘ভাল কইছ। কিন্তু যে-পুলিশ ধইরব স্যায় তোমার আল্লারে চিনব তো?’
‘সে কি কওয়া যায় কত্তা, বিশ্বাসের কথা কি কওয়া যায়। তবে আমারে আল্লাই কইছে—হেইডা তো মিছা কথা না। নাইলে আমি কি কোনো শাহেবের বুলি বুইঝব্যার পারি? ‘আল্লারে শাহেব ঠাউরাইছ? কুরান না আরবি লেখা? তুমি তো গ্র্যাজুয়েট আরবি জবান শিখল্যা কবে—’
‘শিখার কামডা কী? শাহেব কী কইলেন, সেইডা আমার বোঝনের কাজ। ভাষা শিক্ষাডার কথা আসে ক্যামনে?’
‘শাহেবরেই আল্লা ধইরল্যা?’
‘উপায় কী সেটা কন।’
‘তোমার উপায় করব আমি? আমি কি তোমার পির
‘কী যে কই! আল্লাও সেই কথাই কলেন—এই মৌলবি আর পিরগোর কথা বিশ্বাস নাই। তেমন কথা কানে আইলে আর-এক কানে দেয়ার আগে সদরের অ্যাডিশন্যাল এডিওরে সর্বাগ্রে তালাশ দিবা। ওনার কাছে তোমার নাম রাখা আছে।’
‘আল্লা তোমারে রিটার্ন পোস্টও দিছে? তাইলে কও।’
‘আমাগো নিয়োগপত্র দেয়ার পর চট্টগ্রাম ডিভিশনের কমিশনার শাহেব আমাদের এক ঘণ্টা ধইর্যা বুঝাইয়্যা, সেই বোঝানগুল্যা আবার চার পৃষ্ঠায় ছাপাইয়্যা আমাগো মইধ্যে বিলি কইরা কইলেন, যহনি কোনো কিছুতে সন্দ হব, তহনি এই চার পৃষ্ঠা গড়গড় কইর্যা পইড়া যাবে। দেখবা, উত্তর লিখা আছে।’
‘চার পৃষ্ঠায় দুনিয়ার সব প্রশ্নের জবাব। কেউ যদি জিগায় এবার ডার্বির মাঠে যে-ঘোড়াডা ফার্স্ট হইব, সেইডার টিকিট নম্বরডা কী?
‘ডার্বি কী?’
‘ছাড়ান দ্যাও। সে তো বুঝানের বাহিরের দ্রব্য—’
‘সে কী করে হয়? শাহেব তো কইছেন, আমাগো লোন অফিসারের চাকরির লগে।’
‘কও। তালি কও।’
‘শাহেব কইছেন—তিন হাজার লোন অফিসার নিয়োগ একডা অভূতপূর্ব ঘটনা, এতগুলা চাকরি, একবারে দেয়া আর সে-ই সব চাকরি শুধু শ্যাখগো দেয়াও একডা অভাবিতপূর্ব ঘটনা। কেন?’
‘এত পুরানকথার লগে শাহেব লাগে? সরকারি চাকরিতে কোনো শ্যাখও নাই, কোনো শুদ্দুরও নাই। শাহেব নি কইছে ঢাকা জিলার হিশাব?’
‘কইতেও পারে, নাও কইতে পারে, আপনার কাছে শুইনব্যার তো নিষেধ নাই—’
‘আমি-না তোমারে ডাইকল্যাম শুইনব বইল্যা। এক হিশাবে বার হইল, আমিই জিগাইছিলাম আইনসভায়, ভোটের আগে ঢাকায় ছিল স্থায়ী সরকারি চাকরি ৭. হিন্দুর পাছে ৩ শ্যাখ। আর অস্থায়ী চাকরি ১২ হিন্দুর পাছে ৭ শ্যাখ। ভোটের পরে মাত্র একজন হিন্দু স্থায়ী। অস্থায়ীপদে কেউও নাই, হিন্দুও না, শ্যাখও না। প্রয়োজন নাই, তবু জাইন্যা রাখা ভাল–হিন্দুর মইধ্যে তপশিলি ধরা আছে। তুমি ঋণ সালিশির কথা কও।’
‘শাহেব যা কইছে?’
‘তোমার তো কামই শুরু হয় নাই, শাহেবের কথাই কও।’
‘শাহেব কইল—তোমাগো আমি অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ কইরতে কই। এই কথাডা ভুইলব্যা না যে তোমাদের ঘিরা অগ্নিকুণ্ড।’
‘থোও তোমার থিয়েটারি। শাহেব কইছে অগ্নিকুণ্ড?’
‘ঠিক ঐ শব্দটাই যে কইছে তা না হইব্যারও পারে, তবে মানেটা তাই দাঁড়ায়। ধরেন, হিন্দুরা মানে কংগ্রেস তো ইউনিয়ন বোর্ডের নৌকায় ওঠে নাই। নৌকা তো ছাইড়্যা গিছে। মুসলমানরাই বেশি। সরকারের হাতে মোট মেম্বারের তিন ভাগের একভাগ নমিনেশন—বোর্ডগুল্যা ফেইলবার রাইটও সরকারের। ঋণ বোর্ড চালায় ইউনিয়ন বোর্ড। মহাজন তো বেবাকই হিন্দু। ইসলামে মহাজনি হারাম। তাইলে লোন বোর্ডে মহাজনরা দাবি দিল, শাহেব কাগজ দেইখ্যা কইছে, প্রায় চাইর কোটি। সালিশি বোর্ডে মারামারি কাটাকাটি কইরা হিন্দু মহাজনরা পাশ করাইয়্যা নিল, ধরেন, তিন কোটি—’
‘কইল্যা তো শাহেব কাগজ দেইখ্যা কইছে। তালি আবার ধরাধরি ক্যান?’
‘যে-হিশাব কইব্যার লগে শাহেবেরও কাগজ লাগে, সেইডা কি আমার মতন হাভাইত্যা না উজারত্যার মাথায় থাকতি পারে? কোটি টাকা কারে কয়, জানি না। আমারে শ-দিয়া বুইঝব্যার লাগে। ধরেন, সালিশি বোর্ড কয়েক শ টাকা মকুব দিল—তাই কইল্যাম তিনকোটি। মকুব দেয়ার পরও তো তিন কোটি, তিন কোটিই থাকে। সালিশি বোর্ডে হিন্দু মহাজনরা তো লোনটারে বাড়াইয়্যাই দেখাইছে। ইউনিয়ন বোর্ডে মুসলমান তালুকদার-জোতদার সেডা নামাইয়্যা আইনল প্রায় ১৮ লাখে। চার কোটি-তিন কোটি থিক্যা তো প্রায় ১৮ লক্ষ অনেকড়াই কম। আটটা সংখ্যায় কোটি আর সাতটা সংখ্যায় লক্ষ। তাইলে তিন-চার কোটি আর সতের-আঠার লক্ষের মইধ্যে কতগুলা একশ গড়ায়্যা যায়। শাহেব কইয়া দিছে—এইডাই অগ্নি কুণ্ড।’
‘অ্যাহনো তো ধোঁয়াও দেখাইলেন না, অগ্নিডা কোথায়?’
‘স্যালিশি বোর্ড আর ইউনিয়ন বোর্ডের কাইজ্যা রাতারাতি হইয়্যা গেল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। আইনশৃঙ্খলা। পুলিশ। পুলিশ শাহেব। ম্যাজিস্ট্রেট। পিটুনি কর। এত মিল্যাও কি আপনার আকাঙ্ক্ষামত আগুনের পরিমাণ খাড়াইল না? শাহেব কইছে, দাঙ্গা লাইগব্যার দিবা না। সালিশি বোর্ডের হিন্দু মহাজনগোর সাথে আলাদা-আলাদা কথা বলো। কয়ডা মহাজন কাগজে প্রমাণ দিব্যার পারব? কতডা বাড়াইছে নিজেই কহুক। এগো মইধ্যে ভেজাইল্যা লোক খুঁইজ্যা বার করো। তারে বেশি কথা কইতে দিবে না। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারগুলাকও বুঝাও—না-হয় হইল মহাজন, সুদ-খাওয়াডাই তো মানুষডার ব্যাবসা। তারে প্রাণে মারাডা, অধর্ম। লোকডার আসলডা অন্তত দ্যান। আর যদি দ্যাহেন, দুই বোর্ডের বজ্জাত গুইল্যার হাতেই হাল আর বৈঠার দখল, তহন আপনেও সরকার দেখাইবেন। শাসন দিয়্যা কইবেন, আমি সদরে রিপোর্ট দিবই, এই বোর্ড নিয়্যা কাম করা অসম্ভব। ইচ্ছা কইরলে সরকার দিবে বোর্ড ডিসমিশ কইর্যা। যশোরের মিউনিসিপ্যালিটির নাগাল। বোর্ড ডিসমিশের কথায় সব বোর্ডের সব মেম্বারই ডরায়—তাইলে বুঝি আমও গেল, ছালাও গেল। আর, যদি পরিস্থিতি অতডা খারাপই হয়, তালি হাটে বাজারে কথাডা পাবলিক কইর্যা দিবেন। কয়ডা লোক আর তালুকদার? কয়ডা লোক আর মহাজন। দাঙ্গা বাধাইতে কেউ চায়? লোন অফিসারের কাম—দাঙ্গা য্যান না বাঁধে।’
‘অফিসার, দাঙ্গা না-হয় ঠেকাইলেন, চাকরি নিলেন অফিসারি, কাম হইব সেপাইগিরি। কিন্তু চাষের টাকা তো যাবে নে শুখাইয়্যা, মহাজন তো হাত মুঠা কইর্যা ফেলছে।’
‘তহন তো আপনার মত লিডার আইস্যা নতুন খাল কাইট্যা নতুন জল বহাইয়্যা দিবেন। আমি স্বকর্ণে শুইনছি কাইল থিক্যা—সারদার বিলও ছিল বরাবর কাল, ফসল নষ্টও ছিল বরাবরকাল, অ্যাহন তো দেইখল্যাম বিলের ফসল বাঁচাইতে আর বাড়াইতে দুই সকালেই নতুন খাল কাটা যায়।’
‘কথাডা তো ঠিকই, অফিসার। বলদ, কুকুর, শুয়ার, মোরগা, এই পশুগুলার তো খ্যামতা নাই। গায়ের জোর আছে, দাঁতও আছে, থাবাও আছে কিন্তু খ্যামতা নাই। নিজের বাঁইচ্যা থাকার উপুর কোনো হাত নাই, খ্যামতা নাই। মানুষের তো আছে, হাতও আছে, খ্যামতাও আছে। দুই সকালে এক খাল। কিন্তু সারাডা কাল গেল ‘সর্ সর্’ ‘ছুঁইস ন্যা’, ‘বাড়িতে ঢুকিস ন্যা’, ‘দুয়ারে বইস্যা খা’, বামুন-কায়েত-বৈদ্যের তাড়া খাইয়্যা।’
.
যোগেন উডবার্ন পার্কের বাড়িতে সরাসরি গিয়ে বলল, ‘সুভাষবাবুর সঙ্গে দেখা করব।’ -বাড়ির দারোয়ানগোছের লোকজনের কাছে যোগেনের মুখটা চেনা হয়ে গেছে। আর, প্রবেশ-প্রস্থানের খুব একটা কড়াকড়িও এ-বাড়িতে নেই। কড়াকড়ির ব্যবস্থা আছে, দরকারমত সেটা কাজেও লাগানো হয়—তাও যোগেন দেখেছে। শরৎ বোসের চেম্বারের দিকটায় যোগেনের যাওয়া হয়নি—সেটা বাড়ির উত্তরাংশ, যে-লনে পার্টিটার্টি হয়, তারই পাশে, ওপরে। সেই তরফে ঢোকা বা বেরবার কড়াকড়ি আছে, গেটটাও আলাদা। সুভাষচন্দ্র যখন বিদেশে বা জেলে থাকেন, তখনও ব্যবস্থাটা কি এমনি থাকে—উত্তরের গেট ব্যারিস্টারির আর দক্ষিণের গেট পলিটিকসের। সেটা না-জানলেও যোগেন বোঝে, বাড়িটাতে খোলামেলা ভাব আছে।
সুভাষচন্দ্র পাঞ্জাবিধুতিতে নেমে এসেছিলেন। সেই যে-ঘরে যোগেন বসে সেই ঘরের দরজায় এসে দুই হাত বাতাসে তুলে হো-হো করে হেসে উঠলেন, তাঁর সবগুলি দাঁত, জিভ, মুখের ভিতর পর্যন্ত দেখিয়ে। যোগেন উঠে দাঁড়িয়েছিল, সুভাষচন্দ্রের এমন হাসি প্রথম দেখে প্রথমেই তার মনে হল, সুভাষবাবুকে হাসিতে খুব তাজা লাগে তো, যদিও একটু বয়স্কও লাগে। সাধারণত ওঁর মুখে একটা বিষাদ মাখানো থাকে।
‘আপনার জন্য তো মেজদা পুলিশের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে ডায়রি করছিলেন। বললেন, কোর্টেও নেই, অ্যাসেম্বলিতেও নেই, আপনার বাড়িতেও তো বোধহয় ফোন করিয়েছেন বা করাবেন বলছিলেন’, সুভাষচন্দ্র যোগেনের ডানদিকের কৌচটাতেই বসেন, ডানহাঁটুর ওপর বাঁ পা চড়িয়ে।
যোগেন বলে, ‘আমি তো আমার প্রফেশন্যাল ডিউটি করতে এসেছি। আপনি তো আমার পেশেন্ট। কেমন আছেন ঐ তেল মেখে?
যেন মনে পড়ল, সুভাষচন্দ্র এমন ভঙ্গিতে ঘাড় ঘোরালেন, ‘দেখে কী মনে হচ্ছে? বিধানবাবু নাকী একবার তাকিয়েই ডায়াগনসিস করেন?’
‘আমি তো হাতুড়ে রোগীর হাতুড়ে ডাক্তার—’
‘ডাক্তার না-হয় হাতুড়ে হতে পারে, রোগী কী করে হাতুড়ে হয়?’
‘সেটা তো আরো সোজা। যার রোগ হাতুড়ি পিটাইয়্যা বানানো হয়, মানে পুলিশ বানায়, জেলের ভিতরে ও বাইরে।’
‘আপনার ডায়াগনসিস বিধানবাবুর চাইতে অনেক ভাল, যেটুকু ডায়াগনসিস করা গেল না, সেটা এমন চমৎকার কথা দিয়ে ঢেকে দেন! বিধানবাবু তো কথা বলতে পারেন না।’
‘এর ওপর কথাও চান? বিধানবাবু তো আপনার থিক্যা বড়, না?
‘বলেন কী? মেজদা আমার চাইতে আট বছরের বড়, বিধানবাবু মেজদার চাইতেও নয় বছরের বড়। এক হকশাহেব আর নলিনীদাই বিধানবাবুকে নাম ধরে ডাকতে পারেন’
‘মানে, এখন তো ওনার বয়স তাইলে ষাইট ছুইছুই। দেখে বোঝার উপায় নাই।’
‘জেলে যাননি তো কখনো। একবছর জেলে থাকলে দশবছর বয়স বাড়ে। আমাদের মত যারা দশবছরের বেশি খেটেছি—তাদের বয়স গোনা হয় না। আর যাঁরা, আন্দামান খেটেছেন, তাঁরা জ্যান্ত প্রাণী হিশেবে কনডেমড—
‘ওরা আপনাকে আন্দামানে পাঠায় নাই কেন?’
‘মান্দালয় পর্যন্ত ঠেলেছে। আন্দামান বোধহয় আমার পক্ষে ওদের কাছে নিরাপদ ঠেকেছিল।’
‘বরিশালে নলিনীদারে দেইখল্যাম। মাস ছয়-সাত বোধহয় আন্দামান থিক্যা আইসছেন। আইস্যাই বরিশালে এক কৃষক সমিতি খাড়া কইর্যা মাহিলাড়ার বিল থিক্যা দেড় -দুই মাইলের খাল কাটান ধইরছেন। কী ধাতু দিয়্যা যে মানুষগুল্যা তৈরি?’
‘এইসব নিখাত সোনা যদি কংগ্রেসে জড়ো হন, তাহলে আর কিছুতেই ভারতের লেটার্ন ঠেকানো যাবে না। একেবারে সরাসরি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
‘আপনে রাষ্ট্রপতি হওয়ায় এই আশাডাই তো সগলের। দেখাও যায়। কংগ্রেস জনসংযোগ আন্দোলন তুইলল। বাপের জন্মে শুনি নাই কংগ্রেস আর হিন্দু আলাদা বা কংগ্রেস আর জমিদাররা আলাদা। চাষাফাসা নিয়্যা কংগ্রেসের কোনো কালেই দুর্ভাবনা ছিল না। গান্ধীজি তো কয়্যাই দিছেন জমিদাররা ট্রাস্টির কাজ কইরব। এই ভোটটা সেই উদ্গারডা কইরল। বাংলার মত মুসলমানপ্রধান প্রদেশে কংগ্রেসের পায়ের তলার মাটি গেল সইর্যা আর ‘সামাল সামাল’ চিক্কার উইঠল। আবার যুক্ত প্রদেশের মত হিন্দুপ্রধান প্রদেশে এমন জেতা জিত্যা কংগ্রেসের চিক্কার উইঠল, মুসলমানরা ক্যান বাইরে থাকব?’
‘হ্যাঁ-আ। ইউপিতে তো জওহরলাল নিজে লিড করছে, মাস-কনট্যাক্ট প্রোগ্রামে তাই কাজ দিচ্ছে। তবে ইউপির বিপদ আমাদের চাইতে অনেক বেশি। সেখানে হিন্দু কমিউন্যালিস্টরা কংগ্রেসের ভিতরেবাইরে এত বেশি অ্যাকটিভ লিডারশিপের সবগুলো টায়ারেই যে সেকিউলার পজিশন রাখাই মুশকিল। আমাদের এখানে অতটা সরাসরি কমিউন্যাল পজিশন, কংগ্রেসের ভিতর থেকে নেয়া অত সোজা নয়, বাইরে থেকেও নয়।। আসরাফউদ্দিনের লিডারশিপটার ধরনই আলাদা। কৃষক আন্দোলন তো ঠিক ভদ্রলোকদের আইনঅমান্য আন্দোলনের খাপে খাপে হতে পারে না।। আবার, আমাদের এখানে হিন্দুভদ্রলোকরা তো মুসলিমবিরোধী হয়ে যাচ্ছেন—তাঁরা অত উঁচু তারে বাঁধা কৃষক আন্দোলন মানবেন না। রয়েসয়ে এগুতে হবে। এগনো হচ্ছেও। বর্ধমানে দাশরথি তা তো চাকদিঘি জমিদারদের জোর করে খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে কৃষক সমিতি তৈরি করেছেন। বাঁকুড়াতেও হয়েছে কৃষক সমিতি। নদীয়াতেও হয়েছে। ঢাকার চল্লিশজন বড় চাষি তো বেশ আড়ম্বর করে কংগ্রেসে এসেছিলেন। বীরভূম, মেদিনীপুর, কন্টাইয়ে ঈশ্বর মালের কৃষক সমিতি তো ‘নো রেন্ট’ আন্দোলনের দিকে যাচ্ছেন বলে পুলিশও বলছে, কংগ্রেসের কোনো-কোনো নেতাও বলছেন।’
‘সে তো গিয়া আপনার মুসলমানগোর মধ্যে যারা বড় চাষি বা নবাব বা ছোট নবাব—তারাও তো কৃষকগো আন্দোলন চায় না। তারাও তো ডরে কাঁপে—শিয়ালরে ভাঙা বেড়া দেখাও কেন? কৃষকরে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করা যায় না—’
‘একজ্যাক্টলি। বাংলায় এটাই কংগ্রেসের প্রচার করা দরকার—’কৃষক নিয়ে দলাদলি চলবে না।’ কৃষককে দেখতে হবে নিরপেক্ষ উপাদান হিশেবে, কৃষক তো উৎপাদনের একটি শক্তি। তার আবার হিন্দু-মুসলমান কী?
‘ঠিক জানি না—কৃষক-আন্দোলন নিয়্যা বীরভূমে, বাঁকুড়ায়, পাত্রসায়রে, দিনাজপুরেও, চাঁদপুরে আপনাগো পার্টির মইধ্যে তো নানা গোলমাল, অভয় আশ্রমের লগে, বেতুর আশ্রমের লগে। আসরাফউদ্দিন নাকী মোল্লারা জমায়েৎ থিক্যা বাইর কইর্যা দিছে—কংগ্রেসে ঢুইকলে মুসলমানও কাফের হইয়া যায় বইল্যা, এম এন রায় প্রেসিডেন্ট হইব বইল্যা, সত্যাগ্রহের নিয়মকানুন মানা হয় নাই বইল্যা। কুমিল্ল্যায় আফসার উদ্দিনকে না কী সরকারের সাপোর্টাররা মিটিং কইরব্যার দেয় নাই— খাজনাবন্ধ আন্দোলন তো হকশাহেবের মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে, শাহেবগো তাতে কী আসে যায়?
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। কংগ্রেসের মধ্যে তো আন্দোলন বলতে বোঝায় অহিংস অসহযোগ, আইনঅমান্য, বা, কখনোসখনো ধর্মঘট। কৃষক অসহযোগ করবে কী করে—তাদের সহযোগ তো চাষ বাসের সঙ্গে। কৃষকরা কোন আইন, অমান্য করবে—তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তো লেগেই আছে। কৃষকরা তো আর ধর্মঘটও ডাকতে পারবে না। তাহলে তাদের হাতে থাকল দুটো অস্ত্র—খাজনা বন্ধ আর ভাগা বন্ধ। তার আগেই হয়েছে, হাট বন্ধ আর কর্জা ধানের সুদ বন্ধ। এর কোনোটাই তো সরকারের না। এইসব যদি কোথাও-কোথাও কার্যকর হয়, ক্ষতি তো এক হিন্দু ভদ্রলোকদের—যারা পুরুষানুক্রমে হাটের তোলা, কর্জার সুদ, খাজনার বাইরে আবোয়াব আর চক্রবৃদ্ধির হারে সুদ ভোগ করে আসছে।’
‘এতগুলা ভাগাভাগি কি ভাগাভাগির বেড়াটা ভেঙে দেয় না?’
‘দিলে তো ভালই হত’।
‘হইত নি? ভাল? কোন বেড়াডা ভাইঙ্গলে হইত ভাল?’
‘কৃষক কৃষক। যা কিছু তাকে আর কৃষক থাকতে দেয় না, সেগুলো ভেঙে দেয়াই তো ভাল?’
‘এক কৃষকদের নিয়্যাই সমিতি কত, দ্যাহেন। মুসলমান কৃষক সমিতি, হিন্দু কৃষক সমিতি, জাতীয় কংগ্রেসের কৃষক সমিতি, প্রত্যেক জিলার নামে একটা কৃষক সমিতি, বরিশাল কৃষক সমিতি, নোয়াখালি কৃষক সমিতি, ত্রিপুরা কৃষক সমিতি, ক্ষত্রিয় কৃষক সমিতি, আরো কত কোনোটাই তো কোনো ভাগাভাগি ভাঙে না। সবগুলাই তো বাড়ায়। নোয়াখালির গোলাম সারোয়ার। ভোটে জিতল। আজও মানুষ জানে না সে নিজের কোন পরিচয়ে জিতল—কৃষকপ্রজা, না লিগ, না কংগ্রেস। স্যায় তো খাজনা দিব্যারও না করে, হাটে যাইব্যারও না করে, লোন বোর্ডে মহাজনগো জায়গা দিতেও না করে।
‘লোক্যাল ফ্যাকটার তো থাকবেই এরকম-
‘আমার সন্দেহটাও তাই নিয়্যাই। আসলে লোক্যাল ফ্যাকটারগুল্যার জগাখিচুড়ি দিয়্যাই কি আপনাগ কৃষকনীতি সাব্যস্ত হইছে, না কী কেন্দ্রীয় নীতি ফলো করতে গিয়্যাই লোক্যালগুলার ফেবরি বাড়াইছে—’
‘ফেবরি মানে?’
‘ব্র্যাঞ্চ আউট কইরছে—’
‘এই প্রশ্নের উত্তর নেই। ভারতের ভূমিব্যবস্থা ও কৃষিব্যবস্থা এক না। ভারতের ভূস্বামী ও চাষিও এক না। এর কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। তাই ব্রিটিশ সরকারও সারা ভারতে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় নীতি দিয়ে ভূমি ও কৃষিকে বাঁধতে পারেনি। কংগ্রেসও তাই তেমন কোনো নীতি নেয় নি।’
যোগেন একটু হেসে ফেলে বলে, ‘কংগ্রেস তো ব্রিটিশ শাসন থিক্যা মুক্তি চায়। তাইলে, কৃষি আর ভূমিতে শাহেবগ অনুসরণের যুক্তি চায় ক্যা?’
‘এটা তো যুক্তি না। অবস্থাটাই এরকম। স্টেট অব অ্যাফেয়ার্স। শাহেবরা যদি পাহাড়কে পাহাড় বলে, আপনি শুধু সেই কারণে পাহাড়কে কি নদী বলবেন?’
‘অতটা তফাতে হয় তো বলি না। শাহেবগ সঙ্গে মিল্যায়্যা কওয়াড়া তো আমাগ জিভে মিশ্যা গিছে। যাগ মিশে নাই, তারা তো তাগ ভাষাতেই পাহাড়ের কথা কয়।’
‘সে ভেরিয়েশন তো জমি আর চাষের ব্যাপারে শাহেবরা মেনে নিয়েছে, জোর করে কোনো কিছু বদলায়নি।’
‘আমি কিন্তু কেন্দ্রীয় নীতি কইতে ‘অ্যাক্ট’ বা ‘আইন’ বুঝাই নাই। প্রিন্সিপ্ল কইব্যার পারেন। আইজকাইল পলিসিও শুনি। কংগ্রেসের কি তেমন কিছু কোনো দিন আছে যে বাংলার স্থায়ী বন্দোবস্ত বা মহারাষ্ট্রের রায়তওয়ারি ব্যবস্থা, জমির মালিক জমিদার আর চাষের দায় রায়তের—এমন ভাগাভাগি, পাঞ্জাবে তো চাষিই জমিদার মানে মালিক। শাহেবদের ঝোঁক কিন্তু সব জায়গাতেই ছিল জমিদার বানানোর দিকে। হয়ত শাহেবদের ভাবনায় ছিল ব্রিটিশ ফার্মার। কিন্তু এ-দেশে তা হয় নাই। জমিদার ফার্মার হইল না কিন্তু বেশি জমি আবাদে আনার সুবাদে, চাষিদের থিক্যা কেউ-কেউ হইল ফার্মার। যে-চাষির আবাদি জমি বেশি, খালের জলও জমির কাছে, শুধু খাদ্যফসল না, বিক্রির মত ফলনও ফলায়—তুলা, আখ, পাট, রেল স্টেশনও কাছাকাছি সে হয়্যা গেল ফার্মার। সুদেও টাকা খাটায়। গরুর গাড়ির চাকাও বদলায়—চওড়া আইলের চাকা আর ছোট আইলের চাকা। এডা যে প্রদেশ ধইরা-ধইরা হইছে, তা তো সম্ভব নয়। এক-এক প্রদেশে আবার কত রকম হইছে। আপনার কাছে থিক্যা যেইডা জাইনতে চাই সেডা হইল—এই যে চাষ আর জমির সঙ্গে জড়ানো মালিক আর চাষিগো এত-এত ভাগ এর মইধ্যে কোনো একডা ভাগের দিকে ঝোঁক দিয়া কি কোনো জায়গার কংগ্রেস কখনো তার নীতি মানে প্রিন্সিপ্ল্ ঠিক করছে?’ যোগেনের কথা শুনতে-শুনতে সুভাষচন্দ্রের চোখের নীচে ভাঁজ পড়তে থাকে। যোগেনের কথা শেষ হলেও, ভাঁজগুলো থাকে। সেসব মিলিয়ে যায়, সুভাষ যখন আওয়াজ না করে, শুধু ঠোঁট ছড়িয়ে নীরবে হাসেন ও হাসিমুখে থাকেন।
তারপর বলেন, ‘যিনি এতটা জানেন, তিনি বাকিটা জানেন না, এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন? আপনিই বলুন। আমাকে আর পড়া ধরবেন না।’
যোগেনও হেসে বলে, ‘আমারে নিয়্যা এই ভুলবোঝাড়া যে কী কইর্যা কাটাই? যেহানে আমারে অভিজ্ঞ নেতা বইল্যা ভাবে, সেহানে আমার লাভ থাইকলে তাগ ভাবনায় আপত্তি নাই। কিন্তু আপনার মত মানুষ তেমন ভাইবলে আমার যে কী ক্ষতি তা আন্দাজের উপায় আপনার কাছে নাই। আমি রাজনীতির কিছুই জানি না। ওকালতি পাশের আগে রাজনীতির ধারেকাছে ঘেঁষি নাই। উকিল হওয়ার পর তিরিশ বছর বয়সে সব উচ্চাশা দেখা দিল। তাও ইউনিয়ন বোর্ড আর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। এই ভোটে খাড়াইবার পরেও রাজনীতি জানি নাই। আইনসভা শুরু হওয়ার পর, ধরেন, আমার রাজনীতির অভিজ্ঞতা সঠিক ষোল-সতের মাসের বেশি না। আর, আমি তো রাজনীতি করি জ্ঞানবুদ্ধি থিক্যা না, শুদ্দুর বইল্যা।
‘আপনি যে একটুখানি বললেন সারা ভারতের ভূমি ও কৃষির পার্থক্য নিয়ে, ক-জন পারবে বা ক-জন জানে?’
‘খা—ইছে। এগুলা তো ওকালতির কারণে জানা। আমাগ বরিশালে বামুন থিক্যা মুসলমান বেবাকই মামলাবাজ। আর সব মামলাই জমি নিয়্যা—’
‘সব উকিল-মোক্তারই তো তাহলে এইসব জানত। আমি তো উকিল-ব্যারিস্টারের সংসারই করি।’
‘তারা কেউ তো আর বরিশালের জজ কোর্টে মামলা লড়েন না। বরিশাল তো মেইনল্যান্ডের পার্ট না। মেইনল্যান্ডের ছিটমহল। সেই কারণেই যাগ জলপথে গমনাগমন তারা বেবাকই বরিশালে আছে। নদীর বুক থিক্যা এমন মাটি আইস্যা পড়ে যে বাতাসে বিছন উইড়া অ্যালেই ধানে খ্যাত ভইর্যা ওঠে। সর্বত্র থিক্যা বামুন-কায়েত-বৈদ্য-মুসলমান-চাষি-শুদ্দুর আইস্যা রাজত্ব গাইড়া বইসছে। আরে, যে-নদী জল আর মাটি দেয়, সে-নদী তো খায়ও জল আর মাটি। রাজত্ব ভাঙতে-ভাইসতে সময় বেশি লাগে না। বার ভুইয়্যার ভুঁইয়্যারাও জলের তলে, ভুঁইয়্যাগ জামাইরাও জলের তলে। যদি নবাবগো আমল হইত তালি না-হয় তীরবিদ্ধ হইয়্যা মরণের আগে লম্বা একখান স্পিচ ঝাইরত। কিন্তু এ তো ইংরাজ রাজত্ব, আইনের রাজত্ব, মামলা ছাড়া স্পিচ নাই। তো আমারে যদি একডা নদীর চরের এক রায়তের মামলা কইরতে হয়, তালি তো যে-নদী অ্যাখন নাই কিন্তু দুই-তিন শ বছর আগে ছিল, সেই নদীডারে বহাইতে লাগে। আর, হাইকোর্টের মামলার নজির লাগে। আর, বরিশালের হিন্দু-ফৈরাজি মুসলমান-বৈষ্ণবগণ এইসব সম্প্রদায়ই মামলাবাজ ও প্রতিহিংসা পরায়ণ। মামলা জিত্যা না দিলে ওনারা উকিলের শ্বাসনালী কাইট্যা খালে ফেইল্যা দ্যায়। আর কাল কোট পরা উকিলবাবুর দেহখান বেশ কিছুদিন ভাঁটার টানে একবার নদীর দিকে খানিকটা যায় আবার জোয়ারের ঠেলায় ভিতরের দিকে পিছ্যায়া আসে। ফলে যে-দূরত্ব একটা জ্যান্ত মানুষ আধবেলারও আধবেলায় পাড়ি দেয়, সেইটুখানি দূরত্ব পাড়াইতে কালো কোট পরা মৃত উকিলবাবুর নেক্সট উইকলি হলিডে পর্যন্ত কাইট্যা যায়। সেই বেহুলাহীন লখাই-এর দশা থিক্যা বাঁচার জইন্যে অল-ইনডিয়া রিপোর্টার ঘাঁইট্যা এই খবরগুলি আমাকে জাইনতে হয়। জীবনধারণের অবলম্বনকে জ্ঞান বইল্যা ভাইব্যা আমারে আর পাপের ভাগী কইরবেন না। সত্যি আমি জানি না, কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ কি কোনোদিন জমিদারি উচ্ছেদের কথা বইলছে। বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট আইনসভায় আইস্যা গিছে। থার্ড বেল পইড়্যা গিছে। আমারে এখনই স্টেজে এন্ট্রান্স নিব্যার লাগব। আমারে এইটুকু প্রম্পট কইর্যা দেন—কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ কি কোনোদিন জমিদারি উচ্ছেদ দাবি করছে? কোনোদিন?’
সুভাষচন্দ্র মাঝে-মাঝেই হাসছিলেন, শব্দ না করে। যখন থেকে আওয়াজ বেরতে শুরু করল, যোগেন থেমে থেকে তাঁকে হাসি শেষ করার সুযোগ দিচ্ছিল। কিন্তু যখন থেকে সুভাষচন্দ্ৰ আর হাসি শেষ করার ফাঁকও পেলেন না, মাঝে-মাঝে চশমা খুলে চোখের জল মুছছেন, মাঝে-মাঝে দুই হাতে কোমর চেপে ধরে খাড়া হয়ে বসছেন, দু-একবার ‘ও মাগো’ বলে ডেকেও উঠেছেন, তখন থেকে যোগেন তার কথায় কোনো ছাড় দেয়নি। তার কথা শেষ হলে, সে চুপ করে তাকিয়েছিল হাসিতে কুঁকড়ে যাওয়া সুভাষচন্দ্রের হাত-পা ছোঁড়ার দিকে—যেন বলি-দেয়া পাঁঠা পা ছুঁড়ছে, পেট কাঁপাচ্ছে।
বেশ কয়েকবার হিক্কা তুলে সুভাষচন্দ্র ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হন।
‘আপনি তো মশায় গুপ্তঘাতকের চাইতেও মারাত্মক। শুধু হাসিয়ে হাসিয়ে একটা লোককে খুন করে দিতে পারেন। উঃ। না। কোনোদিন কংগ্রেস বা লিগ জমিদারি উচ্ছেদ দাবি করেনি।
‘এবার বলেন, ঐ তেল মেখে কেমন আছেন?’
‘সে তো সব গুলিয়ে গেল। এত ভাল আছি সেটা ঐ তেলের জন্য না এই হাসির জন্য, তা কী করে জানব।’
জুলাই মাসের শেষ থেকে হুড়মুড়িয়ে এমন সব ঘটনা ঘটতে লাগল যেন জ্যৈষ্ঠ মাসে কালবৈশাখীর ঝড়ে রাস্তায় যোগেন গাছ চাপা পড়েও বেঁচে আছে বটে কিন্তু ডালপালা পাতালতার নীচে এমনই চেপটিয়ে যে বেরিয়ে আসার পথ তো পাচ্ছেই না, এমন কী বাইরের কিছু দেখতেও পাচ্ছে না। বেঙ্গল টেন্যান্সি বিল, তার মাঝখানে যশোরের দাঙ্গা, সেখান থেকে ফিরতে-না-ফিরতে অনাস্থা প্রস্তাব। আন্দামান বন্দীরা অনশনের হুমকি দিয়েছেন। সরকার ফেলে দেয়া হচ্ছে শুনে সরকারের সমর্থকরা রাস্তায় নেমেছে। এত মিছিলের কোনটা কীসের বোঝা যাচ্ছে না। ছাত্ররা আসছে রাজবন্দীদের দাবিতে, চটকলের মজুররাও আসছে প্রায়ই একটা দাবিপত্র নিয়ে। যোগেন তো একদিন সরকার-সমর্থকদের একটা মিছিলকে ভুল করে বন্দীমুক্তির মিছিল ভেবে, নিশ্চিন্ত মনে হাঁটছিল। হঠাৎ করে বুঝতে পেরে যোগেন পালানোর পথ পায় না। সরকার সমর্থকরা এমএলএদের ধরে ধরে পেটাচ্ছে। যদি তাকে চিনে ফেলে!
আইনসভায় বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্টের ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে। যোগেন প্রত্যেকটি বক্তৃতা খুব মন দিয়ে শুনছিল, লাইব্রেরিতে গিয়ে কাউন্সিলে ২৮ সালের সংশোধনের বিতর্ক ও ভোটাভুটি, পড়ে নিয়েছে। তাতেই সে এমন চমকে যাওয়ার মত সব তথ্য পেয়ে যায় যে বিভিন্ন সংশোধনের প্রস্তাবের ওপর একেবারে লাইন বেঁধে ভোট হয়েছে। মুসলিম ও তাদের সমর্থিত ২১ জন লাইন বেঁধে ভোট দিয়েছে বর্গাদারের পক্ষে। ওঁদের আরো পাঁচজন সংশোধনের একটা অংশের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের মধ্যে খাজা নাজিমুদ্দিন, আবদুর রহিম আছেন। তিনজন হিন্দুও আছেন—দু-জন মনোনীত সভ্য আর বীরভূমের জিতেন ব্যানার্জি। আর, জমিদারদের পক্ষে স্বরাজিদের ৪২ জন ভোট দিয়েছে লাইন বেঁধে, তার ভিতর শরৎ বোস-সুভাষ বোস দুই ভাই আছেন। আর শশিকান্ত আচার্য চৌধুরী আধাআধি বিরোধিতা করেছেন। অফিসিয়াল ও ইয়োরোপিয়ান ব্লকের ৩৭ জনই মূল প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। মুসলিম মেম্বাররা সাধারণ ভাবে বর্গাদারের পক্ষে ও প্রজার পক্ষে আর হিন্দু মেম্বাররা সাধারণভাবে জমিদার-স্বার্থে, বর্গাদার ও ইতর-রায়তের বিরুদ্ধে। কী নিয়ে ভোটাভুটি? এক জমিতে একই চাষি ১২ বছর টানা চাষ করলে তাকে উচ্ছেদ করা যাবে কী না? প্রজা-রায়তের কোনো অধিকার থাকবে কী না জমি হস্তান্তরের? জমিদারের সেলামি থাকবে কী না? ১৯২৮-এর কৃষকনিধন এই ৩৮-এ, দশ বছরে, কোথায় এসে দাঁড়াল? কোনো দল বা কোনো নেতার সাহস বা মুখ আছে বা কোমরে জোর আছে যে বলবে—জমিদারই জমির মালিক? চাষি সে ইজারাদারই হোক আর ক্ষেতচাষিই হোক, প্রকাশ্যে বলার মত পরিস্থিতি এখন যে সেই চাষিই কেবল জমিদারের অনুমতিপ্রাপ্ত একজন যে জমিটাতে ফসল ফলায়। তার ফসলের ওপরও চাষির অধিকার প্রথমে স্বীকৃত হয়নি। মালিকের খোলানে সব ফসল তোলাঝাড়ার পর চাষিদের সঙ্গে দেনাপাওনার হিশেব হত, সামনের বছরের দাদনেরও হিশেব হত। আর, ১৯৩৮-এ? অনেক জায়গায় তেভাগা চলছে, অনেক জায়গায় শস্যখাজনা হয়ে যাচ্ছে নগদ-খাজনা—চাষির দাবিতে। মালিকের খোলান এখন চাষির ইচ্ছা নির্ভর। তুলসী গোঁসাই তাঁর বক্তৃতায় বললেন, ‘জমিদাররা যদি ভাবেন তাঁরা তাঁদের পূর্ব গৌরব ফিরে পাবেন, তাহলে আমি তাঁদের বলব—যা গেছে, তা গেছে। যা আছে— সেটুকু যাতে না যায়, তার ব্যবস্থা করুন। সময়ের ধর্ম-অনুযায়ী আমাদের মেনে নিতে হবে, যাদের নিজেদের একচিলতেও জমি নেই তেমন কৃষকও তার ফলনের মলিক, অন্তত নিছক মালিক। যদি কেউ মনে করেন, জমিদার শ্রেণীর প্রতিনিধি হিশেবে আইনসভায় অনন্তকাল ধরে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, তা হলে শুধু বলব, তাঁদের এই ধারণার বশে তাঁরা নিজেরও ক্ষতি করছেন, জমিদারশ্রেণিরও ক্ষতি করছেন, দেশেরও ক্ষতি করছেন।’
যোগেন বিস্মিত হয়—তুলসী গোঁসাইয়ের কথা যদি সত্য হয় তাহলে কংগ্রেসের সঙ্গে তো সরকারের এই বিলের কোনো মতপার্থক্য থাকতে পারে না। কৃষক-প্রজা পার্টি জমিদারি উচ্ছেদের দাবিতে ভোট করেছে। কংগ্রেস তা করেনি। কিন্তু ভোটের ষোল-সতের মাসের মধ্যেই যদি কংগ্রেস ভেবে থাকে জমিদারি উচ্ছেদের কথা, তাহলে এখন সেটা মন্ত্রিসভাকে বলছে না কেন?
রাজনীতির মারপ্যাচে যোগেন কংগ্রেসি বা লিগের লোকদের মত অভ্যস্ত নয়। নেতাদের মত তো নয়ই, এমন কী, মফস্বলের নেতাদের মতও নয়। কলকাতা বা মফস্বল যেখানেই হোক, কংগ্রেস বা লিগ কোনো পার্টিরই শরিকি হাঙ্গামা কিছু কম না। এমন কী বর্ধমানের মত জায়গাতে লিগের এক শরিকনেতা লিগের আর-এক শরিক নেতাকে মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস- চেয়ারম্যানশিপে ঠেকাতে গিয়ে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া ন্যাশনালিস্ট পার্টির একজন-যে কমিশনার তাকে গিয়ে ধরে। এসব প্যাঁচঘোঁচ আয়ত্ত করতে আর কদিন লাগে? যখন দরকার তখন মারপ্যাঁচ ঠিক জানা হয়ে যায়। কিন্তু এখন কংগ্রেস-নেতাদের বক্তৃতা শুনে যোগেন কংগ্রেস আর লিগের ভিতরে যে-মতৈক্যের প্রমাণ পায়, কংগ্রেস কেন তা প্রকাশ্যে বলে না এই প্রশ্নের মীমাংসা যখন যোগেন আর খুঁজে পায় না, তখন তার ওকালতি বুদ্ধিতে যেন ঝিলিক দেয়। তাহলে কি অনাস্থা প্রস্তাব তোলা হচ্ছে এই কথাটাই জানাতে যে লিগ আর কংগ্রেসে মতের অমিল নেই।
হকশাহেবের প্রজাপার্টি আসলে তো পার্টি নয়, বরং নানারকম স্বার্থের খিচুড়ি। প্রজা পার্টি ভোটে জিতল যেন বজ্রপাতের বেগে, আর জিততে না জিততেই বিদ্যুতের আলোর মত গেল নিবে। প্রজা তাই জিততে না-জিততেই প্রজা পার্টি ভাঙতে শুরু করে। একটা মজার কথাই চালু আছে যে হকশাহেব মন্ত্রিসভার প্রধান অথচ তাঁর পার্টির তিনি ছাড়া আর-কোনো মন্ত্ৰী নেই। আর-একটা এমন রটা কথা—আইনসভা বসার পর থেকেই বিরোধীপক্ষে প্রজাপার্টির অন্তত ১৫ থেকে ২০ জনকে পাওয়া যাবেই। সেই ভরসাতেই শরৎ বোস অনাস্থা প্রস্তাবের দিনক্ষণ ঠিক করছেন।
যোগেনের মনে এই সব সন্দেহ উঠছিল ভাঙছিল আর সে বারবারই গা-ঝাড়া দিয়ে সন্দেহগুলি থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছিল নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে। যোগেন নমশূদ্র হলেও জমিজমার সঙ্গে তাদের কোনো স্বার্থই তৈরি হয়নি। রসিক কাকা, বিরাট কাকা, ধনঞ্জয় রায়, পিআর ঠাকুর, মুকুন্দ মল্লিক—এরা সকলেই জমি জানে। এরা কেউ বিএ পাশ, কেউ বিএল, কেউ ব্যারিস্টার বটে ও জাতেও শূদ্র বটে, তবু জানে কত ধানে কত চাল। যোগেনের বংশানুক্রমিক পেশা নৌকা বানানো। কিন্তু নৌকা নিয়েও যদি বিল আসত, যোগেন কি কিছু বলতে পারত? সে হয়ত একটা নৌকো এক হাতে বানিয়ে জলে ভাসাতে পারবে কিন্তু সে কি নৌকো বানানোর অর্থনীতি, কাঠসংগ্রহ, আলকাতরার দর, গাবগাছ কমে যাওয়া—এই নিয়ে কোনো একটা কথা তৈরি করতে পারবে। যোগেনের সন্দেহ যোগেনেরই অজ্ঞানতার ফল।
বঙ্কিম মুখার্জি বিতর্কের দ্বিতীয় দিনে তাঁর বক্তৃতায় যোগেনের সন্দেহটাকে যুক্তির ওপর খাড়া করে দেয়ায় যোগেন আবার ডুবজলে পড়ে। বঙ্কিম মুখার্জির কথাগুলিই যোগেন নানারকম করে ভাবছিল কিন্তু আকার দিতে পারছিল না।
‘শরৎ বোস—তুলসী গোস্বামীর বক্তৃতা শুনে মনে হল—ওঁরা দশ বছর আগে এই নীতি ঘোষণা করলে তো চাষা ও চাষি নিয়ে এত উপদ্রব হত না।’
‘আপনিও তো সেই দলেই’, কিরণশঙ্কর ফুট কাটেন।
‘হ্যাঁ কিরণশঙ্কর বাবু, আমি সেটা মনে রাখি কিন্তু আপনারা ‘এটা মনে রাখেন না। মনে রাখেন না যে কংগ্রেসের লক্ষ লক্ষ সমর্থক ও কর্মীদের চিন্তা ও আবেগ কেমন অস্থির হয়ে থাকে। অস্থির হয়ে থাকে, শ্রমিক-কৃষক ও খেটেখাওয়া মানুষদের জীবনযাত্রার মান একটু উন্নত হোক, তাদের পেটে কিছু খাদ্য ও শরীরে কিছু রক্ত পড়ুক ও সঞ্চারিত হোক। সারা বাংলায় কংগ্রেস কর্মীরা দুর্গম গ্রামাঞ্চলে গিয়ে কৃষক সমিতি তৈরি করছেন, কোনো-কোনো জায়গায় কর দেয়ার বিরোধী আন্দোলন করছেন, জমিদারদের বাজে আদায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, হাটের অতিরিক্ত তোলার বিরুদ্ধে দশের হাট বসাচ্ছেন অথচ প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্ব জমিদারে ঠাসা। তারা সকলেই খুব সুনামের অধিকারী নন। কিরণশঙ্কর বাবু একজন জমিদার, তুলসী গোস্বামীর কথা কে না জানে, দেবেন্দ্রলাল খান, আর কত নাম বলব?’
কংগ্রেসের দিক থেকে কেউ বলে ওঠে, ‘সুভাষবাবুর জমিদারি নেই।
‘তাঁকে এত ঘন ঘন জেল খাটতে হয় যে জমিদারি করার টাইমই পেলেন না। কর্পোরেশন চালাবার অভিজ্ঞতা যাঁর আছে তিনি মনে-মনে জমিদারিবিরোধীও হতে পারেন। সুভাষবাবুর কথা তুলে ভাল করেছেন। সুভাষবাবু শেষবার ছাড়া পাওয়ার পর, তাঁকে ঘিরে বা তার ওপর ভরসা করে কংগ্রেসের ভিতরে নতুন-নতুন নেতা ও কর্মীর সমাবেশ হয়েছে। এম এন রায়ের মত নেতা কংগ্রেসে আছেন। আছেন অনুশীলন ও যুগান্তর দলের জেলখাটা বিপ্লবীরা। আছে সব যাঁরা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন সেই রাজবন্দীরা। যাঁরা এখনো মুক্তি পাননি, তাঁরাও আন্দামানে-হিজলিতে মুক্তির দিন গুনছেন যাতে সুভাষবাবুর কাজে হাত লাগাতে পারেন।’
‘আরে, কথা তো বন্দীমুক্তি নিয়ে নয়, জমিজমা নিয়ে’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি দাঁড়িয়ে উঠে বেশ জোর দিয়ে বলেন। স্পিকার বঙ্কিমবাবুকে বলেন, ‘বরং আলোচ্য বিল নিয়ে যা বলার বলুন।
লম্বা শরীরে বেশ একটা ভঙ্গি করে বঙ্কিমবাবু স্পিকারকে ‘ইয়েস স্যার’ বলে শ্যামাপ্রসাদের দিকে ফিরে বলেন, ‘আপনার উষ্মা ও আপত্তির কারণ আমি বুঝি ডক্টর মুখার্জি। কিন্তু আপনার কোনো বক্তব্যেরই যুক্তি কোনোদিন বুঝি না’। বঙ্কিমবাবু সহাস্য নীরবতায় সভ্যদের ওপর দিয়ে তাকান, তাঁদের হাততালির সুযোগ দিতে। সভ্যরা হাততালি দিলেন।
‘কারে কয় থিয়েটার’, যোগেন নড়েচড়ে বসে।
বঙ্কিমবাবুর গলাটা হঠাৎ নীচে নেমে যায়। খানিকটা স্বগতোক্তির ঢঙে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি বলেন, ‘একই ভাষা যদি পরস্পরের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে যায়, তাহলে এমন কী স্বামী স্ত্রীর মধ্যেও কোনো কথাবার্তা হতে পারে না। ডক্টর মুখার্জি ও আমি নিশ্চয়ই স্বামী-স্ত্রী হতে পারি না। তবু আমরা পরস্পরের ভাষা বুঝতে পারি। যেমন উনি বুঝে নিয়েছেন রাজবন্দীদের মুক্তির কথা ও সুভাষ বোসের নেতৃত্বের কথা যখন আমি বলছি, তখন আমি জমিদারিপ্রথা সম্পর্কেই বলছি। এটা উনি চান না—এই তিনটাকে মেলাতে। নাই চাইতে পারেন। কিন্তু অন্য কেউ এটা বলবেন, এটাও তিনি হতে দেবেন না। এটা বোধহয় ওঁর ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা অতিক্রম করা হল। ক্ষমতার এমন অপপ্রয়োগ তো আইনসভায় চলতে দেয়া যায় না।’
একেবারে নিশ্চুপ হলে বঙ্কিমবাবু শুধু তাঁর কথা বলার ঠাটে ও গলার খেলায় সবাইকে টেনে রেখেছেন তাঁর দিকে। যুক্তিটাকে কোনদিকে বেঁকাবেন এই নিয়ে একটা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লে বঙ্কিমবাবু স্বরটাকে আবার ঘোরান। একটু যেন বাঁকা স্বরেই বলেন, ‘জমিদারি শব্দটি ব্যবহারে-ব্যবহারে যে যোগরূঢ় শব্দ হয়ে গেছে, এখন আর ঐ শব্দ দিয়ে জমিজমার স্বত্বাধিকারীকে বোঝায় না। বোঝায় মালিকানা। যেমন, কেউ যদি বলেন—বিশ্ববিদ্যালয় তো মুখার্জিবাড়ির জমিদারি, তাহলে কোনো মহামহোপাধ্যায়ও এই বাক্যটির শুদ্ধতা সম্পর্কে আপত্তি করতে পারেন না।’ সতর্ক একটা সমবেত চাপা হাসি চাপা দিয়ে শ্যামাপ্রসাদের উঁচু গলা উঠল, ‘স্যার, এমন ব্যক্তিগত আক্রমণ কি পার্লিয়ামেন্টারি ব্যবহারে চলতে দেবেন? এই কথাটি সভার বিবরণ থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি, আইনসভার সদস্যের অধিকার এতে অস্বীকার করা হচ্ছে’।
স্পিকার আজিজুল হক তখন গালে হাত দিয়ে বঙ্কিমবাবুর বক্তৃতা শুনছেন। শ্যামাপ্রসাদের এমন বাধায় তিনি বিরক্ত হয়েও হাতের ইশারায় বঙ্কিমবাবুকে চালিয়ে যেতে বলেন। মানে, শ্যামাপ্রসাদের আপত্তি উনি মানলেন না।
‘স্যার, আমার কথাটা সম্পূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। জমিদার-ইজারাদার-রায়ত-চাষি-দখলি চাষি—এই সব শব্দ কৃষি ও ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে আজ আমরা যে-প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছি সেটা ১৮৪৩ সালেও উঠতে পারত। ঐ বছরের ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় একটি লেখা বেরিয়েছিল, প্রজাদের ওপর জমিদারের অত্যাচার ও অন্যায্য আদায়ের তালিকা দিয়ে। সেদিন প্রতিবাদ ঐ টুকুই হতে পারত কারণ তখন নির্বাচিত সভ্যদের নিয়ে কোনো আইনসভা ছিল না, কৃষক সমিতিগুলিতে মুক্ত রাজবন্দীরা যুক্ত ছিলেন না ও সুভাষচন্দ্রের মত নেতা ছিলেন না।
যাকে আমি বলছি আমাদের জাতীয় আন্দোলনের নতুন শক্তিসমাবেশ, সেটাকেই কেউ ও অনেকে মনে করেন, আমাদের জাতীয় আন্দোলনে স্থায়ী ধর্ম থেকে বিচ্যুতি। বিচ্যুতির উদাহরণ হিশেবে তাঁরা বলেন—বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি থেকে হিন্দুরা বিচ্ছিন্ন, একটা মুসলিম সরকার দেশ চালাচ্ছে, সে-ই ১৯২৬ সাল থেকে বাংলার যেখানে-সেখানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বাঁধছে, ঋণ-জমি-ফলন ভাগের আইনি বা প্রচলিত কোনো ব্যবস্থাই মানা হচ্ছে না, মুসলিমদের নানাভাবে উশকে দিচ্ছেন সরকার, গ্রামবাংলায় হিন্দু জমিদারদের নেতৃত্বের ভূমিকা অপসারিত হয়েছে, নিজের জমি বিক্রি হয়ে গেলেও তাঁকে জানানোর কোনো বাধ্যতা থাকছে না, বর্গাদার কাজ না করলেও তাকে উচ্ছেদ করা যায় না। সন্দেহ নেই, এই দুটো চূড়ান্ত অবস্থায় আমরা বিভক্ত। চোখের সামনে দেখছি, বাংলার মুসলিম সমাজের নবাব থেকে হাকিম, বেশিরভাগ মানুষ তথাকথিত মুসলমানী নবাবজাদা-শাহজাদাদের নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে এসে জনাব ফজলুল হকের নেতৃত্বে জমা হয়েছেন ফজলুল হক শাহেরের কাছে ঢাকার নবাববাড়ির খাজা নাজিমুদ্দিনের পরাজয়ের মূল শিক্ষা এটাই। মুসলমান সমাজের মধ্যে গণতান্ত্রিক ধারণার বিস্তার। ত
ঠিক এই জায়গায় যে-প্রশ্নটি অনেকের মনে এসেছিল, কেউ একজন নিজেকে লুকিয়ে রেখে সেটাই চিৎকার করে বলল ‘হকশাহেব যে খাল কাটছিলেন, নিজেই তা বুইজ্যায়া দিছেন, হক শাহেব লিগ হইয়্যা গিছেন।’
‘কিন্তু আপনি তার প্রতিবাদ করতে পারছেন। আবার একদিকে গোঁড়া, রক্ষণশীল, প্রধানত মুসলিম লিগের ও জমিদারদের এই সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তোলা হবে এই গুজব সারা শহরে রটে গেছে ও বিভিন্ন জায়গায় ছোট-ছোট মিছিল-মিটিং করে অনাস্থা প্রস্তাব আনার চেষ্টার বিরোধিতা করা হচ্ছে। এ-বিরোধিতার একটা জনভিত্তি নিশ্চয়ই আছে। সেই জনভিত্তির প্রধান উপাদান মুসলিম জনসাধারণ, যাঁরা মুসলমানদের মধ্যে দলাদলি পছন্দ করেন না। কিন্তু সেই মুসলিম জনসাধারণের একটা অংশ ডক ও বন্দরের মজুররা। একটা গোটা ভোট হয়ে গেল এই দাবিতে—’জমিদারি উচ্ছেদ করতে হবে’, ‘চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নিপাত যাক’, ‘বাজে আদায় বন্ধ করো’, ‘কর্জা ধানের সুদ নাই’, ‘হাট তোলা ও বাজে আদায় বন্ধ করো’, ‘লাঙল যার জমি তার’। একটা গোটা ভোটে সাধারণ মুসলমানরা আইনসভায় এসেছেন মফস্বল থেকে, আমাদের মত যাঁরা চটকলে কয়লাখনিতে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করছি, তাঁদেরও তিন-চারজন প্রতিনিধি আইন সভায় আসতে পেরেছেন। এর চাইতে সুবর্ণ লক্ষণ আর কী হতে পারে? এই সুবর্ণসুযোগে আমরা যদি পচা, গলা, দুর্গন্ধি, এই চিরস্থায়ী বন্দবস্ত বিসর্জন দিতে না পারি, কবে পারেন? এই বিলে বলা হয়েছে—যিনি দখলদার—চাষি তিনি জমি বিক্রি করতে পারবেন। জমিবিক্রির জন্য জমিদারবাবুর অনুমতি নিতে বাধ্য নন। জমি বিক্রি হবে যে দরে তার ২০ শতাংশ টাকা জমিদার সেলামি পেতেন। এখন থেকে আর পাবেন না। কোনো বর্গাদারকে তার জমি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না—যদি তিনি ১২ বছর একটানা ঐ জমি চাষ করে থাকেন। এগুলো নিয়ে তর্কবিতর্কের জন্য কোনো ফাঁক খোলা নেই। কোনো জমিদারবাবু হয়ত ৫-১০ শতাংশ সেলামি দিতে বলতে পারেন। বর্গাদার উচ্ছেদের শর্তগুলি আরো ভাসা-ভাসা রাখতে চাইতে পারেন। কোনো জমিদার হয়তো ‘কর দিব না’ আন্দোলনের উপর নিষেধ চাইতে পারেন। এসব নিয়ে কথা হবে, কথা হোক। কিন্তু এ কথা ভুলবেন না—এর বেশিরভাগ দাবিই আন্দোলনের জোরে চাষিরা আদায় করেছে। আইন করার সুযোগ যখন পেয়েছেন, হাতছাড়া করবেন না।’
‘সরকারি প্রস্তাবের বিরোধিতা আমি করছি না, আমার পার্টিও করছে না। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি আইনসভার সদস্যদের সাবধান করে দিতে চাই। তাতে আইনসভার ভিতরের পার্টিশৃঙ্খলা হয়ত ভাঙা হবে তবে আইনসভার বাইরের বাংলার যে বৃহত্তর শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের আন্দোলনের শৃঙ্খলা নিশ্চয়ই আইনসভার চাইতে উচ্চতর শক্তি। সেই শক্তির প্রতি আনুগত্যবশত আমি আপনাদের এই কথা জানিয়ে দিতে চাই যে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ ও কৃষকপ্রজা পার্টির ভিতরের মধ্যস্বত্বভোগীরা এই আইন পাশ করতে দেবে না। তারা বিচ্ছিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন যুক্তিতে এই আইন ঠেকিয়ে রাখবে। তার বিরুদ্ধে এই তিন পার্টির ও স্বতন্ত্রদের যাঁরা চান জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, জমিদারদের কোনো ক্ষতিপূরণ না দিতে ও লাঙল যার জমি তার কাছে ফিরিয়ে দিতে, তাঁদের নীতির ভিত্তিতে এক হতেই হবে।’
এমন একটা বক্তৃতার পর স্পিকারও যেন খুঁজে দেখেন পরের বক্তার নাম, কিন্তু সভ্যরা তা শুনতে পেলেন না। সকলেই প্রায় আসন থেকে উঠে লবির দিকে যাচ্ছেন।
বঙ্কিম মুখার্জি নিজের আসনে বসে পরের বক্তার ভাষণ শুনতে লাগলেন। রাজনীতির এই প্রক্রিয়াটাই নতুন ও অদৃশ্য। হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা যত বাড়ছে, কংগ্রেস-লিগ-হকশাহেবের ভিতরকার কর্মসূচি তত মিলে যাচ্ছে। শ্রেণী মৈত্রী একেই বলে। এই কথাটি কি পরিষ্কার করা গেল? যাদের জন্য পরিষ্কার করা, তাদের মুখচোখ দেখে বোঝার উপায় নেই—তাদের কিছু অপরিষ্কার ছিল।
বাথরুমের দরজায় প্রবেশোদ্যত জে সি গুপ্তের সঙ্গে যোগেনের প্রায় ধাক্কা লেগে যায়। জে সি গুপ্ত যোগেনকে বলেন, ‘কংগ্রেসের এই কমিউনিস্ট ছেলেদের আর্গুমেন্টটা এত অরিজিন্যাল আর কনভিনসিং যে কংগ্রেস এদের কতদূর পর্যন্ত অ্যাকোমোডেট করতে পারবে, আমার সন্দেহ হচ্ছে। দেখুন, এর চাইতে বেটার কম্বিনেশন তো আর হতে পারে না। পুরনো জেলখাটা বিপ্লবীরা জেল থেকে কমিউনিস্ট হয়ে বেরচ্ছে, কংগ্রেসের মত ছাতা বা পাটাতন পাচ্ছে আর জমিদারদের মত শত্রু পাচ্ছে’–
মুসলিম লিগের সেক্রেটারি আবুল হাশেম ঢুকে এদের এই অবস্থায় দেখে বলেন, ‘এত বড় আরামের হল, বারান্দা, লবি বানিয়ে দিয়েছে সরকার। কিন্তু কথা-বলতে আপনারা ঠেলাঠেলি করবেন পায়খানার দরজায়!’
যোগেন আর জে সি গুপ্ত বেরিয়ে এল। তারা বোধহয় আরো একটু থাকতে চায় লবিতে। হেমন্ত সরকার এসে জে সি গুপ্তকে বললেন, ‘টেনান্সি অ্যাক্টটা আমাদের একটা স্ক্যান্ডালই হয়ে গেল। স্ক্যান্ডালটা এতটা ওপন হওয়া কিন্তু ঠেকানো যেত। একটা ন্যাশন্যাল ক্যারেক্টার দেখেছেন মিস্টার গুপ্ত? আমাদের মনের সঙ্গে মতের কোনো মিল নেই অথচ সেই অমিলটাকে আমরা কনসিসটেন্সি বলে জাহির করি।’
‘আপনার এই আমরাটা কে, বলুন তো? ট্রেজারি বেঞ্চ না অপোজিশন?’ জে সি তাঁর সেই তোতলানো ভঙ্গিতে বলেন।
‘ট্রেজারি আর অপজিশন কি আলাদা আর থাকল? এখন তো জমিদার আর চাষি ভাগ হয়ে গেল। আর এ-ভাগ হলেই সেটা হিন্দু-মুসলিম ভাগাভাগিতে গিয়ে ঠেকবেই। সেই মনসুর আমেদ-এর কথাটা তো প্রবাদ হয়ে গেছে—’স্বত্বভোগী বললেই হিন্দুর তিলক আর চাষি বললেই মুসলমানের সুন্নত বেরিয়ে পড়ে।’
‘সেটা একবার হিশেব করে দেখলেই তো হয়,’ জেসি বলেন।
‘সেটাই তো স্যার বলেছিলাম তের বছর আগে। কমিটির নামও দিয়েছিলাম। তখন তো আমাকে বলশেভিক বলে গাল পেড়ে নাকঘষা দেয়া হল যে আমি নাকী চিরস্থায়ী বন্দবস্তের বৈধতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছি।’
‘আপনি কি স্পিকারস গ্যালারিতে বসেছেন?’
‘আর কোখায় থাকব। এই বিলটা শোনার জন্যই এলাম।’
‘আচ্ছা—আপনি যে কইলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বৈধতা সন্দেহ করায় আপনার সংশোধন প্রত্যাহার কইরবার লাগল—সেডা কী রকম। বৈধতা চ্যালেঞ্জ কইরলে বৈধতা প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু সেটাকেই অপরাধ ধইর্যা শাস্তি দেয়া যায়?’ যোগেন প্রশ্ন করে।
হেমন্ত সরকারের মুখ দেখে বোঝা যায় উনি যোগেনকে চেনেন না। জে সি পরিচয় করিয়ে দেন, ‘যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। বরিশাল থেকে জেনারেল সিটে জিতে এসেছেন। হেমন্ত সরকার—কাউন্সিলে কংগ্রেসের স্বরাজ্য দলের চিফ হুইপ ছিলেন।’
তাঁর নিকেলের চশমার ফ্রেমের ওপর দিয়ে হেমন্ত সরকারের চোখদুটো যেন বেরিয়ে আসে। তিনি যোগেনকে বুকে টেনে বলেন, ‘যোগেন মণ্ডল বরিশালের কেন হবে? ইন্ডিয়ার। ইন্ডিয়াতে এই একজন মাত্র মানুষ একই সঙ্গে দুটো কথা প্রমাণ করে দিলেন। এক নম্বর, রিজার্ভেশনটা সুযোগ নয়, সেটা প্রত্যাখ্যান করা যায়। দুই নম্বর, জেনারেল সিটটা সত্যিই জেনারেল।’ হেমন্ত সরকার যোগেনকে বললেন, ‘আপনি তো উকিল? কথাটা তাই আপনার মনে উঠেছে। কাউন্সিলেও তো বড়-বড় আইনজ্ঞ সব ছিলেন, তখন, নাইনটিন টুয়েন্টি ফাইভে। তাঁরাই ফ্যাকড়াটা ধরলেন—লেজেটিমেসি আর ইল্লেজেটিমেসির পার্থক্য ধরে। আসলে, ওসব কিছু নয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা তুলতে দেবে না বলে তুলতে দিল না। ঐ বললাম-না, যা আমরা ভাবি আর যা আমরা বলি তার গ্রামাটিক্যাল স্ট্রাকচার এক নয়। অবিশ্যি আমার ওয়ার্ডিঙের জন্যই ফাঁকটা ওরা পেয়েছিল। মনে মুখে এক থাকব বলে প্রস্তাবে কিছু আর গোপন করিনি। এ কমিটি বি ফর্মড উইথ গভর্নমেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভস অ্যান্ড মেম্বারস অব দি পাবলিক, টু ইনকোয়্যার ইনটু দি আইডিয়া অব ওনারশিপ অব ল্যান্ড, অ্যাজ ইন পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট অ্যান্ড ইটস কনসিসটেন্সি উইথ অ্যানসেন্ট ট্র্যাডিশন অব ইনডিয়া, টু ডেটারমিন হু মে বি দি রিয়্যাল অ্যান্ড ন্যাচারাল প্রোপ্রাইটার অব ল্যান্ড। এটাতে তো শিকড় ধরেই টেনেছিলাম।’
‘আপনি মিস্টার মণ্ডলের সঙ্গে শিকড় টানাটানি করুন, আমাকে তো ভিতরে যেতে হবে, জে সি চলে গেলেন।
অধ্যায় ৯৫ : মাহিলাড়ার কৃষক সম্মিলন / ৫৪৯
‘আপনিও তো ভিতরে যাবেন—’ হেমন্ত বলেন।
‘হ্যাঁ, যাব, নীহারবাবুর বক্তৃতাডা শুইনব ইচ্ছা। আপনার কেমন লাইগল বঙ্কিমবাবুর ভাষণ? ‘বঙ্কিমবাবু তো আমাদের শ্রেষ্ঠ বক্তাদের একজন। ওঁর বক্তৃতা আর খারাপ হবে কী করে? শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে ঐ কথার মারপ্যাচে সময় গেল, অবিশ্যি সেটাকে উনি ঘুরিয়ে আনলেন নিজের বক্তব্যে। এটাই মাস্টারি অব অরেশন। কিন্তু—
‘তাইলে আপনার একডা কিন্তু আছে? কন-না!’
‘আমি যেন অপেক্ষায় ছিলাম, উনি হয়ত আমার সেই তের বছর আগের প্রস্তাবটার বিষয়ে ঢুকে পড়বেন। জানি না তো ওঁরা ঐ ভাবে ভাবেন কী না—
‘ভাবনাডা কী? ঐ লেজিটিমেসি—?’
‘হ্যাঁ—আ, বলতে পারেন। পাবলিক ডিসকাশনের একটা অসুবিধা হচ্ছে টার্মগুলো কেমন যেন তার কোনা-কানছি, উঁচু-নিচু হারিয়ে ফেলে। ফলে ধারণাটা, কনসেপ্টটা ঠিক বোধহয় পৌঁছে দেয়া যায় না।’
যোগেন হেসে বলে, ‘খাইছে। আমাগ পেশা তো ওকালতি। যা কব, তার মাত্র একটাই মানে হওয়ার লাগব।’
হেমন্ত সরকার হো-হো হেসে ওঠেন, ‘একেবারে সত্য কথা এত সরাসরি বলবেন আর রাজনীতি করবেন—এটা কিন্তু মিলবে না যোগেন মণ্ডল। আপনাকে কষ্ট দেবে।’
‘কী রকমের কষ্ট?’
‘কথাবলার আর না-বলার কষ্ট—’
‘না। আপনে বোধহয় কইছিলেন কথা বানাইতে না-পারার কষ্ট আর কথা শুইন্যা বুইঝতে না-পারার কষ্ট?’
হেমন্ত সরকার ঘাড় হেলিয়ে, ভুরু কুঁচকে, দুই ঠোটের ওপর একটা আঙুল চাপা দিয়ে, আর-একটা হাতের পাতা দু-একবার বাতাসে খেলিয়ে, যোগেনের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না-বলে হেসে ফেলেন, ‘না, বুঝলাম না। লিঙ্ক হারিয়ে গেল। আবার, গোড়া থেকে শুরু করুন।’
যোগেন প্রাণ খুলে হাসে। ‘এইসব কথার কি আগা থাকে না গোড়া থাকে? আবার ফিইর্যা কইতে গিয়্যা তো আগাগোড়া উলট্যায়া যাবে নে। আপনি কইলেন—না, লেজিটিমেসির ছুত্যা তুইল্যা তের বছর আগে আপনারে ল্যান্ড টেনিওর নিয়্যা এনকোয়ারি কমিটি করার প্রস্তাব তুইলব্যার দেয় নাই। আর, আমি বোধহয় কইল্যাম, ওকালতিতে তো একডা কথার একডাই মানে। আপনি পাবলিক ডিসকোর্সের অসুবিধার কথা কইলেন—পাবলিক ডিসকোর্সে কনসেপ্ট নিয়্যা কথা কওয়া যায় না।’
হেমন্ত সরকার তাঁর এলোমেলো চুল নিয়ে একদিকে ঘাড় হেলিয়ে চোখ বুজে যোগেনের কথা শুনছিলেন। যোগেনের কথা শেষ হওয়ার পর চোখ খুলে বললেন, ‘আপনার রিক্যাপিচুলেশনে একটা ওভারস্টেপিং হল। বঙ্কিমবাবুর বক্তৃতার প্রসঙ্গে আমি পাবলিক ডিসকোর্স আর কনসেপ্টের আড়াআড়ির কথাটা তুলি। আপনি তখন ওকালতির যুক্তির একার্থকতা নিয়ে বললেন। আপনার এই স্টেপওভারটা রাজনীতিতে একটা কৌশল হিশেব ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, ধরুন আপনি বলতে চান মানে আপনার বক্তব্য হল, বা উদ্দেশ্য হল জমিদারি রাখার পক্ষে। কিন্তু আপনি বললেন, ‘আমি জমিদারি তোলার, বিপক্ষে নই কিন্তু আন্ডাররায়তের পক্ষে।’ দেখবেন, এই আন্ডাররায়ত নিয়ে বড়-বড় জমিদার তালুকদারদেরই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা, মজাটা হচ্ছে, ১৯২৮-এর অ্যামেন্ডমেন্টের আগে আপনি কোথাও, রেজিস্ট্রি অফিসে, গবমেন্ট অর্ডারে, সেটলমেন্ট রিপোর্টে এই ‘আন্ডাররায়ত’ খুঁজে পাবেন না। ‘আন্ডাররায়ত’ হল সেই দখলি চাষি, যে ফলনের ভাগ দেয় মালিককে এবং পরিমাণটা নির্দিষ্ট, ফলনের ভালমন্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। আন্ডাররায়ত বা কোর্ফা প্রজার ধারণাটাই এসেছে যাতে ভাগদেয়া প্রজা ভাগটাকেই খাজনা বলতে না পারে। আবার উলটে দেখুন—বর্গাদারদের কোনোরকম আইনি অধিকার দেয়া হচ্ছে এই ভয়ে তারা বহুসংখ্যক বর্গাচাষিকে উচ্ছেদ করল। এই উচ্ছেদকৃষকই হল আন্ডাররায়ত বা কোর্ফাপ্রজা। জমিদাররা যে কোফাপ্রজাদের জন্য এত চোখের জল ফেলল—ধরুন, শ্রীশ নন্দী, হবিবুল্লা, বিজয় প্রসাদ সিংগি রায়, বর্ধমানের মহারাজা—তার একটাই কারণ কোফা প্রজা জমিদারের অনুমতি ছাড়া ঐ জমিতে একটা চালাও তুলতে পারবে না আর তাকে জমিদারের কাছ থেকে বলদ-লাঙল-বিছন নিতে হবে। অর্থাৎ যে-বর্গায় চাষ করেও চাষি ছিল, সে বর্গা থেকে উচ্ছেদ হয়ে সার্ফ হয়ে গেল। দিনমজুর না—কারণ তাকে নগদে মজুরি দেয়া হয় না। আর দিনমজুরটা আলাদা একটা ভাগ। কোর্ফা প্রজার ছেড়ে দেয়া জমিকে জমিদার বলত নিজচাষের জমি। আইনত, মানে ফাঁকফোঁকর দিয়ে আইন যদি ঢুকে যায়, তাহলেও যেন প্রমাণ করা না যায়—ওটা দিনমজুরে চষা জমি। এখন দেশের হাওয়া বুঝে কোনো জমিদার যদি জমিদারিব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু না বলেও কৃষকপ্রজার কাছে প্রিয় থাকতে চায়, তাহলে কোর্ফা প্রজা বা আন্ডাররায়তের জন্য চোখের জল ফেলাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। এটা এখন রাজনীতির কৌশল হয়ে গেছে। নিজের প্রত্যক্ষ স্বার্থের উলটো কথা বলো। কারণ, আপনাকে তো আর ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে না, জমির মালিকানা নিয়ে আপনার ধারণা কী। ফলে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। ওটা দেশাচারের মর্যাদা পেয়ে গেছে।’
যোগেনের খুব ভাল লেগে যায়, হেমন্ত সরকারের ব্যাখ্যা। কৌশল নিয়ে তিনি যা বললেন, তাতে যোগেন যেন অনেক বিপরীতের ভিতরকার মিলের অদৃশ্য সেলাই দেখে ফেলতে পারবে যেন এই ধারণা দিয়ে। সুভাষ বোস কেন জমিদারির পক্ষে ছিলেন? কেন আবদুর রহিম কোফা প্রজাদের জন্য সংশোধন আনেন, কেন তপশিলি এমএলএরা একটা বক্তব্যে মিলতে পারলেন না, কেন মুসলিম মেম্বাররাও ভিন্নমত হলেন নিজেদের মধ্যেত্রিপুরার জনাব আলি মজুমদার আর নদীয়ার সিরাজুল ইসলামের মধ্যে বিপরীত স্বার্থটা কোথায়? হেমন্তবাবু যে পদ্ধতির কথা বলেছেন, সেটা দিয়ে কি এত রকমের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাবে?
যোগেন বলল, ‘এরকম বিতর্কে আপনার নাগাল যোগ্য ব্যক্তির থাকা উচিত ছিল।’
‘আমার উপস্থিতি তো আমার যোগ্যতা দিয়ে হবে না। আমি ত ৩৪ সালের সেন্ট্রাল কাউন্সিল ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু হেরে যাই। তবে, আমার কলম আছে। লিখলে যুক্তিগুলি স্পষ্ট হয়। বক্তৃতায় তো নানা কৌশলে যুক্তিগুলিকে ঢাকা যায়। আমাদের নেতারা তাঁদের বক্তব্য, লিখে প্রকাশ করেন না কেন? একটাই কারণ। তাঁদের যুক্তির ফাঁক ধরা পড়ে যাবে। তাঁরা যতটা মুখে বলতে পারেন, ততটা লেখার মত শিক্ষিত নন।’
বেল বেজে উঠল, অ্যাসেম্বলির দরজাগুলো খুলে গেল, মেম্বাররা বেরতে লাগল। টি ব্রেক। শাহেব মেম্বাররা দল বেঁধে কথা বলতে-বলতে অ্যাসেম্বলির রেস্তোরাঁর দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল আর তাদের উলটোদিক থেকে তমিজুদ্দিন আর সারওয়ারদি পাশাপাশি হেঁটে আসছেন। নলিনী সরকার বিরক্ত মুখে তাঁর ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ হেমন্ত সরকারকে দেখে থমকে গিয়ে বলেন, ‘এই ঝিল্লিমিল্লি, আমার ঘরে চলো।’
বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট সংশোধন নিয়ে আইনসভায় আলোচনা যখন চলছে, হঠাৎ যোগেনের কাছে রসিক কৃষ্ণ বিশ্বাসের টেলিগ্রাম— রায়ট সিচুয়েশন ভেরি ব্যাড মাস্ট কাম টু যশোর ইমেডিয়েটলি।
যশোরে একটা দাঙ্গা বেঁধেছে খবর পেয়ে রসিক বিশ্বাস চলে গিয়েছিলেন।
যশোর-খুলনা-বাখরগঞ্জ-ফরিদপুরের ঐ সীমাটায় বার মাসই দাঙ্গা বাধে আবার থেমেও যায়। নিজে-নিজেই বাধে, নিজে-নিজেই থামে। খবর আসতে-আসতে ও এখান থেকে নেতারা কেউ যেতে-যেতেই বেশিরভাগ সময় দাঙ্গা থেমে যায়। রসিককাকার মতো বড় নেতা যাওয়ার দুইদিন পরও এইরকম টেলিগ্রাম আসা তো খুব খারাপ খবর।
যোগেন, খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর আইনসভা অফিসে দেখা করে, টেলিগ্রামটা দেখান ও ব্যাপারটা জানতে চায়। নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘রসিকবাবু, আপনি, এঁরা থাকতে আমাকে কী জিজ্ঞাসা করেন? ও তো ট্র্যাডিশন্যাল ট্রাব্ স্পট। প্রথম খবরে ছিল, হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার নয়, দুই গ্রামের ব্যাপার। জমির আল নিয়ে। প্রথম দিন হাঙ্গামার পর দুই দিন শান্ত ছিল। লোক্যাল অথরিটি ভাবে, আর-কিছু হবে না। থার্ডডে-তে এক দল পুরো রিঅর্গানাইজ করে আর-এক গ্রামকে ঘিরে ধরে ও বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তাদের লোকজনকে মারপিট করে। মেয়েরা কেউ-কেউ হয়ত আঘাত পান কিন্তু তাঁদের আঘাত করা হয়েছে নাকী তাঁরা তাঁদের বাড়িঘরের পুরুষদের বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ায় আঘাত পান— সে-বিষয়ে কোনো রিপোর্ট নেই। এই ইস্যু থেকেই দাঙ্গা হিন্দু-মুসলমানে টার্ন করে। একটা হাঙ্গামা ঐ এলাকায় যদি শুরু হয়ে দু-দিন পর নতুন করে আরম্ভ হয়, তাহলে তো হিন্দু-মুসলমান হবেই। রসিকবাবু কবে গেছেন, জানেন?’
‘আজকার দিন বাদে দুই দিন আগে—’
‘ডিএম তো আমাকে জানায় নি রসিকবাবুর কথা।’
‘স্যায় নিজে জানে কী না সেইডা দ্যাহেন।’
‘না, এ তো খুব প্রম্পট অফিসার’।
‘অফিসার তো প্রম্পট কিন্তু আমাগো লিডার তো শ্লো। স্যায় হয়ত অফিসারগো জানায়ই নাই স্যায় আইসছে। ঐরকমই তো অব্যাস।’
নাজিমুদ্দিন একটু হাসে। যোগেনের মনে হয়, নাজিমুদ্দিন রসিক বিশ্বাসের রাজনীতি বা অভ্যাস নিয়ে একেবারেই কৌতূহলী নয়। রায়টটা নিয়েও নয়। তাহলে কি মুসলমানরা আপারহ্যান্ডে?
নাজিমুদ্দিন জিজ্ঞাসা করে, ‘রসিকবাবু তো কংগ্রেসের। তাহলে নিজের পার্টিকে না-জানিয়ে আপনাকে টেলিগ্রাম?’
যোগেন একটু তেতো মুখে বলে, ‘আপনে জাইনলেন কখন যে রসিককাকা তার পার্টিরে খবর দেয় নাই?’
‘এখন। আপনি তো তাহলে বলতেন।
‘এটা কি আমার কাজ বইল্যা আপনার সন্দেহ হয়—কোন্ পার্টির কে কাকে কী জানাইল, সেডা আপনারে জানাইয়্যা যাওয়াড়া পার্ট অব মাই ডিউটি? এই ডিউটি পালনের জইন্য তো আপনার পুলিশ বাহিনী, গুপ্তচর বাহিনী, স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ ইত্যাদি। আমি তো আপনরেই জিগ্যাইবার আসছি-রসিকলাল বিশ্বাসের মতো ইমপর্ট্যান্ট মেম্বারের খোঁজড়া পর্যন্ত হোম মিনিস্টার রাখার দরকার মনে করেন না কেন। ওয়েল, আই উইল র্যাদার আস্ক ইউ ইন দি অ্যাসেম্বলি টু লেট আদার মেম্বার্স নো।’ যোগেন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ওঠার ভঙ্গি করলে নাজিমুদ্দিন বলে ওঠে, ‘বসেন তো! আপনার সঙ্গে কি দুটো প্রাইভেট কথাও বলা যাবে না। দাঁড়ান, আমি কিরণশঙ্করকেও ডাকি, নৌসের আলি শাহেবকেও ডাকি।’
যোগেন গুম হয়ে বসে থাকে।
‘আপনি তো আজই যাবেন?’
‘দাঙ্গা লাইলগ সাত দিন আগে। দুইদিন গেল চুপচাপে। মানুষড়া গেল তিন সকাল আগে। আর এই টেলিগ্রাম পাইয়্যাও কি আমি কাল-পরশুদিনের জইন্য অপেক্ষা কইরব?’
‘তাহলে আমি সেক্রেটারিকে জানিয়ে দি। ওরাই সব ব্যবস্থা করুক। আপনি তো সিলেটের পর রায়ট স্পেশ্যলিস্ট হয়ে উঠেছেন হিজ এক্সেলেন্সির চোখে।’
কিরণশঙ্কর আর নৌসের আলি নাজিমুদ্দিনের ঘরে এসে বসার পর নৌসের আলি বলেন, ‘হোম মিনিস্টারের এত জলদি তলব কেন। চারদিকেই তো সরকারের পক্ষে সুবাতাস। এমন একটা বিল টেন্যান্সি অ্যাক্টের নামে বাজারে ছাড়লেন যে শরৎ বোসও বলল, ‘বর্গাদারদের স্বার্থ দেখছে যে বিল, তা কি আর শেষ পর্যন্ত অপোজ করা যায়, আবার বঙ্কিম মুখুয্যেকেও বলতে হয়, ‘এই আইনকে, পেছন থেকে ছুরি মারার লোকের অভাব নেই—সরকারেও না, বিরোধি পক্ষেও না’ হা হা করে হেসে নৌসের আলি বলে ওঠেন, ‘দেখেন, পার্লামেন্টারি হিস্টরিতে খুঁজে বের করেন তো দেখি আর-একটা এমন উদাহরণ যার বিরুদ্ধে অপজিশনের কথা শুনে মনে হয়, বিলটা যেন অপজিশনেরই। অপজিশন ইজ শেমলেসলি অ্যারোগ্যান্ট টু লিভ হার হাউস অ্যান্ড মিট হার লাভার কেষ্টা, হোয়াইল দি গভর্নমেন্ট ইমপোটেন্টলি রেডি টু সারেন্ডার হিজ রাইটস অ্যাজ হাজব্যান্ড।’
নাজিমুদ্দিন বলে ওঠে, ‘হিন্দুদের যেন কী একজন দেবতা আছেন স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ঘুরে শুধু একজনের সঙ্গে আর-একজনের ঝগড়া বাধিয়ে যায় –’
কিরণশঙ্কর বলে, ‘নারদের কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ। আলিভাই হলেন বেঙ্গল পলিটিক্সের মিস্টার নারদ। এদিকে ট্রেজারির লোক, ক্যাবিনেট-মেম্বার, ক্যাবিনেটে মোস্ট রিল্যায়েল অ্যাডভাইসার। অন্যদিকে ক্যাবিনেটের বেইজ্জতিতে প্রাণভরা খুশি। হি ইজ নেভার এ জেন্টলম্যান। সো হি ডাজ নট টেন্ডার হিজ রেজিগনেশন—’
‘টু ফেসিলিটেট দি ট্রেজারি?’ নৌসের আলি আবার একটা উঁচু হাসি মিশিয়ে বলেন, ‘প্লে দি গেম অ্যাজ পার রুল অব দি গেম। ক্যাবিনেটে মত পার্থক্য হলে মন্ত্রী পদত্যাগ করেন—এটা একটা পার্লামেন্টারি ট্র্যাডিশন অ্যান্ড এ গুড ওয়ান। বাট দিস ট্রাডিশন হ্যাজ ডেভেলাপড ইন এ সিঙ্গল পার্টি রুল। যখন ক্যাবিনেট ইটসেলফ ইজ এ কোয়ালিশন অ্যান্ড দি মেমবার্স হ্যাভ দি প্রিভিলেজ অব হোলডিং পোলিটিক্যাল অ্যালেজিয়ান্স টু দেয়ার পার্টিস, দেন দি লেজিসলেচার শুড বি আস্কড ফর ইটস কনফিডেন্স ইন দি পার্টিকুলার মিনিস্টার।
‘আপাতত বিপদ তার চাইতে বেশি। যশোরে একটা রায়টের খবর পেয়ে রসিকলাল বিশ্বাস দুদিন আগে যশোরে যান। আজ এই এখন সেখান থেকে মিস্টার মণ্ডলকে এই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন। আমাদের যে ইনফরমেশন এসেছে তাতে দুই গাঁয়ের গোলমাল। দু-দিন শান্তই ছিল। তারপর রি-গ্রুপিং করে এখন হয়ত ঘটনাটা কমিউন্যালই হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের ডেকেছি আমাদের কী করা দরকার।’ নাজিমুদ্দিন টেলিগ্রামটা নৌসের আলির দিকে এগিয়ে দেন। পড়ার জন্য নৌসের আলি পকেট থেকে চশমা বের করেন।
‘রসিকের এই-যে ডুব দিয়ে কাজ সারা—! এ তো বোঝাই যাচ্ছে পরিস্থিতি খারাপ। একটা তো খবর পাঠাবে গভর্নমেন্টকে বা ওর পার্টিকে। আপনাদের কি কিছু জানিয়েছে, রায়শাহেব।’
‘না। উনি তো এমন জানাবার মানুষও নন। ওখানকার কাজ যিনি গেলে সাহায্য হবে তাঁকে যেতে বলেছেন, যোগেনবাবু নিশ্চয়ই রওনা হচ্ছেন।
‘হ্যাঁ। উনি তো প্রপারলি গবর্মেন্টকে ইনফর্ম করেছেন। সুতরাং উনি গবর্মেন্টের হয়েই যাবেন। আমরা এখনই যশোরের ডি এম ও এস পিকে টেলিগ্রাম করছি। যোগেনবাবু, কোন ট্রেনে যাবেন?’
যোগেন তাকায় নৌসের আলি-র দিকে। নৌসের আলি একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘আমিও তো তাই ভাবছি—যাবেনটা কোথায়। যশোরে নেমে খবর নিয়ে অকুস্থলে যাওয়া মানে তো একটা দিন লস।’ নৌসের আলি ঘাড়টা নাজিমুদ্দিনের দিকে ঘুরিয়ে বলেন, ‘যশোর-খুলনা-ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ এই চার জেলার মিটিং পয়েন্টটাই এমন হঠাৎ রায়ট বাধার জায়গা। উত্তরে মাগুরা, পুবে মোল্লার হাট, নড়াইল থানা, লোহাগাড়া থানা, কুলিয়া-মাগুরা থানার, শালিখা—এই হচ্ছে এরিয়া। যাই হোক, যোগেনবাবুকে যশোর গিয়েই জানতে হবে। আপনাদের যদি ব্যবস্থা থাকে যে শেয়ালদা-যশোর লাইনে যশোরের আগের কোনো স্টেশনে যোগেনবাবুকে কেউ কনট্যাক্ট করতে পারে, তাহলে আরো ভাল হয় যদি ঝকরগাছাতেই কেউ মিট করে’
কিরণশঙ্কর বলেন, ‘আলিশাহেব, এতে গোলমাল বাড়তে পারে। ধরুন, ঝিকড়গাছায় হয়ত একজন এসডিও ও ডিএসপি আছেন। তিনি এই রায়টের খবর জানতেও পারেন, নাও পারেন। কিন্তু হোম ডিপার্টমেন্টের টেলিগ্রাম পেলে সে তো আর বলতে পারবে না—জানি না। সে কিছু খবর জোগাড় করে ঝিকরগাছায় কিছু হাফ-ইনফর্মেশন দিল। তার চাইতে যশোরের ডিএম আর এসপিকে বলুন যে যোগেন মণ্ডল পৌঁছচ্ছেন রানিং রায়টের জন্য ও তাঁকে স্টেশনে রিসিভ করতে।’
নাজিমুদ্দিন বলে, ‘হ্যাঁ, সেটাই ভাল, যশোরেই যান, তারপর বুঝেশুনে প্রোগ্রাম করবেন। ঝিকড়গাছা-টাছার দরকার নেই—পাড়া জাগিয়ে প্রসব বেদনা।’
‘সেটার আবার কী মানে?’ কিরণশঙ্কর বলেন।
‘এটা একটা বাংলা প্রোভাব, না?’ নাজিমুদ্দিন মুচকি হেসে বেল টিপে কাউকে ডাকেন।
‘কোথাও শুনেছেন? ঠিকঠাক মনে আছে?’
‘নার্ভাস করে দেবেন না।’ একজন বেয়ারা এলে নাজিমুদ্দিন, মোতাহারকে চায়, ‘ভুল হয়েছে কিছু?’
‘ভুল হয়নি, এটাই সন্দেহের। প্রসববেদনা উঠলে তো পাড়া জাগাতেই হয়। আপনি বোধহয় কে পোয়াতি আর কে পাড়া, এর মধ্যে গোলমাল করে ফেলেছেন। কথাটা বোধহয়—পোয়াতি না-জাগিয়ে পাড়াজাগানো। কিন্তু সেটাও এক্ষেত্রে কতটা খাটবে? হ্যাঁ, খানিকটা তো পারেই বটে।’ নৌসের আলি কথাটা শেষ করেন মোতাহার ঢোকার পর।
নাজিমুদ্দিন, মোতাহারকে বলে, ‘যোগেন মণ্ডল শাহেব আজই যশোর রওনা হচ্ছেন। সব ব্যবস্থা করবেন। আর একটা টেলিগ্রাম পাঠাতে হবে।’
মোতাহার বেরিয়ে গেলে নাজিমুদ্দিন যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আর কিছু দরকার মণ্ডল মশায়?’
‘তা দরকার নাই। আমার কাম তো রসিক কাকার সামনে হাজির হওয়া—’
যোগেন বলে। ‘সে কেন? দাঙ্গা থামাবে কে?’
.
খুলনা এক্সপ্রেস যশোরে পৌঁছয় একটু বেটাইমে, ভোর চারটেয়। ঘণ্টা খানেক-ঘণ্টা দেড়েক প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করে কাটিয়ে দেবে ভেবেছিল যেগেন। ট্রেন যশোরে থামতে-না-থামতে তাকে পুলিশরা এসে যেন পাঁজাকোলা করে কেরোসিনের পোস্ট-লাইটে কুয়াশা-মাখা স্টেশন দিয়ে বাইরে এক গাড়িতে নিয়ে ফেলল। কয়েকবার মিস্টার মণ্ডল, মিস্টার মণ্ডল শুনেও কোনো দিশা করতে পারে না যোগেন। বাইরের রাস্তায় দাঁড়করানো একটা উঁচু ও মোটা গাড়ির ভিতরে তাকে সেঁদিয়ে দেয়ার পর, যোগেন নিজের কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিচ্ছে যখন, গাড়ির ভিতরের অন্ধকারের ভিতর থেকে কেউ যেন ঘুমের ঘোরে জিজ্ঞাসা করে, ‘ক্যা রে, ঘুমাইয়া গেইছিলি নি, ট্রেন তো ছেইড়ে দিত।’
‘অ, খ্যাড়েকুটে আগুন জ্বালাইয়্যা/পেত্নি বইসছেন আলগোছ হইয়্যা।’
‘তোর লগেই তো ছ্যামড়া। এহানকার ডিএম আইস্যা কয়, খুইলনা এক্সপ্রেসে মিস্টার মণ্ডল আইসবেন, আমরা তো কেউ চিনি না তারে। আর এহন তো অন্ধকারও কাটব না। ক্যামনে খুঁজি। যত বলি—মিস্টার মণ্ডল তো আন্ধার মানিক। আন্ধারেই তারে চিনা সহজ। শ্যাষে, আমারে ধইরা নিয়া আইল।’
‘কাহা, রায়টটা কোথায়?’
‘ক্যা? তোর কি হাউশ হইছে এই শেষ রাত্তিরে রাস্তার উপর দুই দলে রায়টের নাইট শো দিব তোর লেইগ্যা।’
নাজিমুদ্দিন শাহেব আর নৌসের আলি শাহেব য্যান কী কইতেছিলেন, ঝিকরগাছিতে আমারে নামাইব।’
‘বাঁইচ্যা গেলি রে ধন। কেউ তো তোরে নামায় নাই। ঝিকর গাছাতেই যদি নামতি, তাইলে যশোরে নাইম্ত কোন যোগেন মণ্ডল? তা তুই নিজে ক্যান ঝিকরগাছাতে নাইম্যা জিজ্ঞাসা কইরলি না, আমারে নামাইব্যার লগে কে আসছেন?’
‘ঘুমায়্যা পড়ছিলাম। রাত্তিরের ট্রেন। একদিকে ঘুটঘুইটা আন্ধার। আর একদিকে বজরার দোলন। আর ঢাকের বাদ্যির নাগাল ছোটন। ঘুমডারে আটকাইয়্যা রাইখব ক্যামনে?
যোগেন গাড়িটার গড়ন খুব বুঝতে পারছিল না। তাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বাঁ দিক থেকে তাই, রসিককাকা পইড়্যা গ্যাল, যোগেনের বাঁয়ে। তাইলে রসিককাকার ডাইনে কে আছে? যোগেন রাতের শেষে একটা গাড়িতে উঠেছে, তাতে রসিককাকা আছে, তাতে অন্যমানুষ ও কিছু আছে—যাদের গায়েগতরে লোহার সম্পর্ক আছে—জুতোর তলায়, বা আঙুলে, বা বন্দুকে, বা কাঁধের ব্যাজে লোহার আন্দাজ কী করে পায় যোগেন—গন্ধে, লোহার গন্ধে? নাকী আওয়াজে, কোনো সংঘর্ষে ওঠা ধাতুধ্বনির মত? তাদের পেছনে গাড়ির দরজা আটকে যায়—তার আওয়াজের সঙ্গে মিশে এই কথাগুলিও আসে, ‘স্যার আমরা যাব তো?’
‘হ্যাঁ। আসামি-গ্রেপ্তারের পর বিলম্বের কোনো হেতু তো দেখি না।’ রসিক কাকার একথায় হ্যান্ডেল নিয়ে অন্ধকারে একজন গাড়ির সম্মুখে দাঁড়িয়ে কোমর ভেঙে নিচু হয় আর-একটা হাতির বিষমলাগার আওয়াজে গাড়িটা থরথরিয়ে ওঠে। আলো জ্বলে। তাতেই যোগেন দেখে—ড্রাইভার তার সামনের সারির কোণে। রসিককাকার ডাইনে কেউ বসে নেই। তাতে যোগেনের কাছে গাড়ির ভিতরটা খুব স্পষ্ট হল না, ক-জন বসেছে, কে কোথায় বসেছে। এটা খুব বিশদে জানাবোঝা যে যোগেনের অভ্যাস—তা নয়। কিন্তু একটা ঘরে ঢুকলাম, সে-ঘরের কিছুই দেখা গেল না, মানুষজন কোন্-কোন্ জায়গায় বসে বা বসে-বসে দেখা গেল তা গেল না, একটা গাড়ির ভিতরে তার কোনো সহযাত্রীর মুখই সে দেখেনি—এতে যোগেন বিরক্ত হয়ে জেগে যায়, ঘুমের অবশেষ ঝেরে ফেলে। দুটো হাতের তেলোয় মুখটা একটু ঘষে নেয়, তার জাগরণ সম্পূর্ণ করতে।
‘এখন যাওয়া কোথায়?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে।
‘আমি ক্যামনে কই, তোরে থানা-কাস্টডি দিবে নাকী কোর্ট-কাস্টডি দিবে?’
‘আরে, তহন থিক্যা সিধ্যা কথার ট্যারা জব দ্যান ক্যা? আমি তো আইছি, আপনার টেলিগ্রাম পাইয়া—’
‘কিন্তু যোগেন্দ্র, সরকার তো টেলিগ্রামে অর্ডার কইরছে যে জিলার কর্তারাই তোমাকে রিসিভ করবে। সেই কামেই তো আমারে আনল—যোগেন মণ্ডল কে, এইটা আইডেনটিটির লগে।’
এইসব টুকটাক কথাবার্তার মধ্যে একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল গাড়িটা। অফিসার তার পেছনের আসন থেকে নেমে যোগেনের দরজাটা টান মেরে খুলে বলে, ‘স্যার, আপনার জায়গা তো এসে গেল।’
অফিসার কাকে বললেন, বোঝা না গেলেও রসিকলাল জবাব দিয়ে জানালেন তাকে, ‘এডা তো ডাকবাংলা। যোগেনরে কোথায় তুইলবেন?’
‘সার্কিট হাউসে, স্যার। আপনি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান বলে এরা খুলে দিয়েছে। এখানে দুটোর বেশি ভাল ঘর নেই, স্যার।’
‘বাংলো হইল আমার আর আপনার কাছে আমার শুইনবার লাগব ঘরবিত্তান্ত? দুইডা ঘরের একডায় তো আমি আছি, আর-একটা তো খালি আছে। সেইড্যা যোগেনরে দ্যান।’
‘দুটো ঘরই নিয়ে নেব, স্যার? শেষে যদি ইমারজেন্সি অ্যাকোমোডেশন দরকার হয় হঠাৎ?’ রসিকলাল একটু চুপ থেকে আরো নিচু গলায় যোগেনকে ঠেলা দেয়, ‘এই ছ্যামড়া, নাম।’ যোগেন একটু এলোমেলো পা ফেলে বাইরে গলে যায়। পেছন-পেছন রসিকলাল।’
‘এটা তো স্যার পুরনো কাঠের বাংলো। সার্কিট হাউসটা স্যার, নতুন, মিস্টার মণ্ডলের কোনো অসুবিধা হবে না।’
রসিকলাল যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোর লাগেজ ছিল?’
যোগেন বলে, ‘একটা ব্যাগ তো ছিল।’
রসিকলাল অফিসারকে বলেন, ‘শুনেন স্যার, ডাকবাংলোর মালিক তো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। আমি তো তার ভাইস-চেয়ারম্যান। প্রথমত, আমি পুরো বাংলোটা নিলেও কারো কিছু কওয়ার থাকে না। দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে একমাত্র ইমারজেন্সি অ্যাকোমেডেশন চাইবার পারেন নৌসের আলি শাহেব। তিনিই যোগেনরে যশোরে পাঠাইবার ব্যাপারে খুব ব্যস্ত হইয়া পড়েন। তৃতীয়ত ও এইডাই আসল—রায়টের ব্যাপার নিয়্যা তো কথাবার্তা কইব্যার লাগব। কাইল তো সাতসকালে মাগুড়া যাইব্যার লাগব। আপনে আর এসপি শাহেবও এইহানে থাইক্যা গেলে পরামর্শের ও কার্যারম্ভের সুবিদা হইত।’
সবাই মিলে একটু হাসাহাসি হল, তাতেই জটটা খুলে গেল। হয়ত জট তেমন কিছু ছিলই না, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ভয় ছিল রায়টের পরিস্থিতিতে কমিশনার যদি ডিআইজিকে নিয়ে এসে পড়েন। তবে, এলেও ওঁরা তো লঞ্চ নিয়েই আসবেন।
‘স্যার, আমরা তাহলে চলি, কিছু দরকার হলে আমাদের নাজিরবাবুকে ঘুম থেকে তুলে দিতে বলবেন। উনি কিন্তু ডিউটিতে স্যার, এখানে। দারোয়ানকে বললেই ডেকে দেবে—’
‘আপনে দুশ্চিন্তা কইরবেন না। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সব টপশাহেবরা হাজির হইলেও নাজিরের ঘুম ভাঙে না, শাহেবরাও নাজিরের ঘুম ভাঙান না। আর আমরা দুইজন এমএলএ বইল্যা কি এতই বোকা যে এই শ্যাষ রাইতে নাজিররে ডাইকব? নাজিরবাবু হয়ত অ্যাহনো জানেন না যে লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি বস্তুডা কী?’
‘না স্যার, না। নাজিরবাবুই তো পুরো জিলার ইলেকশন-প্রোগ্রামিং করলেন, বলতে-বলতে ডিএম গাড়ির প্রথম দরজাটায় হাত দেন। আর, সেই লোকটা এসে গাড়ির মৌমাছির চাকের সামনে হ্যান্ডেল নিয়ে দাঁড়ায়, হাতির গলায় বিষম লাগলে হাতি যে আওয়াজ করে, সেই আওয়াজে গাড়িটা কেঁপে ওঠে ও হেডলাইটটা জ্বলে। সেই হেডলাইটের আলোয় ছায়াটায়া নিয়ে রসিকলাল ও যোগেন্দ্রনাথ ডাক বাংলোর দেয়ালে বিশাল ছায়া ফেলে আলোকিত হয়ে থাকে। শেয়ালদা ছাড়ার পর আর এত আলো দেখতে পায়নি যোগেন। তাদের ওপর থেকে আলো সরিয়ে গাড়িটা পেছিয়ে সামনের রাস্তার ওপর উঠে, গাড়িটা আবার একটা আওয়াজ করে। ততক্ষণে হেডলাইটের আলো দুই এমএলএর বিশাল ছায়দুটিকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।
রসিকলাল আর যোগেন্দ্র লম্বা কাঠের বারান্দায় ওঠে।
বারান্দায় উঠে রসিকলাল জিজ্ঞাসা করে, ‘ক্যা রে, তোর কি খুব ঘুম পাইছে?’
‘আমার ঘুম তো আমি ট্রেনে ঘুমায়্যা নিছি। কিন্তু আপনের তো দুই চোখের পাতা নামছে কী না সন্দ।’
‘সন্দ ক্যা? সত্য। আমি তো মাগুড়ায় ছিলাম। সন্ধ্যার পর তোর সংবাদ দিয়্যা গাড়ি পাঠাইয়্যা আমারে আনছে। একবার ভাইবল্যাম, গাড়ি ফেরত পাঠাইয়্যা কইয়্যা দেই তোরে লইয়্যা য্যান মাগুড়া আসা হয়। পরে ভাইবল্যাম মাগুরায় বইসা কথা বুঝান যাইত ভাল, কিন্তু আরো অনেক বুঝানদার আয়্যা পইড়ব। তার থিক্যা যশোরেই সুবিদা–তোরে সব জানাইব্যার। এইহানে বসবি? ডেক চেয়ারে? সামনে অন্ধকার নিয়্যা? বড় মশা। তার উপর ঘুমাইয়া পড়ার ভয় আছে। ঘরেই চল। আলোতে মুখ দেইখ্যা কথা কওয়া যাবে।’
যেটাকে বলা যায়, রসিকলালের ঘর সেটা বিলিতি কেতায় সাজানো। কোট ঝুলনোর স্ট্যান্ড, একডা ড্রয়ার দিয়ে তৈরি আলমারি, তার ওপর একটা বাহারে বাতি, কেরোসিনের, শেড দেয়া। একটা একটু বেশি সরু খাট, ঘরের মাঝামাঝি। খাটের পাশে একটা ছোট টেবিল। তার ওপরও একটা বাতি, ছোট। বেশ রঙচঙে লাগে। একটা ছোট টেবিলের পাশে একটা বেতের চেয়ার-চেয়ারটা গভীর সবুজ রং করা। সেই চেয়ারটিকেই একটু এগিয়ে আনতে টানে যোগেন, কার্পেটে ঠেকে যায়, উঁচু করে চেয়ারটাকে টেবিলের সামনে নিয়ে আসে যোগেন। কাছাকাছি বসে কথা না বললে ঘটনা বোঝা যাবে না।
‘কন্ কাহা, বরিশালের দাঙ্গার ইতিকথা—’
‘আরে, ইতিহাস যদি হইত তো কহাই য্যাত। অ্যাহন তো ইতিহাসের মধ্যম অঙ্কে।— ঘটনা উলটাইয়্যা গিছে গা। শেষাঙ্ক আঁইচবার পারি না। তাই তোরে ডাইকল্যাম। পরামর্শ দরকার—’
‘কাহা, এই পরামর্শের জন্য কত যে সময় ব্যয় করেন তা হিশাব নিলে দেইখবেন পরামর্শের আগে যেহানে ছিলেন, পরেও সেহানেই।
‘যোগা শোন। এডডা জট পাকাইন্যা পাটের বাণ্ডিল সোজা কইরব্যার ধরছি। সগলেই তাই চায়। জটটা ছাড়াইব্যার চায়। কিন্তু সুতার আগা নিয়্যা তো মত মিলে না। আমি কই এইডা আগা। ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিশ কয় ঐডা আগা। মানুষজন কয়—সেইডা আগা। জিগাইলে মুসলমানরা আগা দেহায় দশরকম, হিন্দুরা দশ-আনা তিন-গণ্ডা চাইর-ক্রান্তি রকম।’
‘তয় না শুইনল্যাম এই দাঙ্গাডা দাঙ্গা হইলেও হিন্দু শ্যাখ হয় নাই—’
‘তাও কওয়া যায়—’
‘লোক মইরছে কড়া?’
‘দুইডা। দুইডাই শ্যাখ। হিন্দুরা রটাইছে তাগ তিনজন মারা গিছে। কিন্তু কেউ দ্যাহে নাই, কেউ একডা শাকিনও কয় নাই—’
‘তাইলে তো মৃত্যু নিশ্চিত। বেশাকিন যহন কুনো সন্দ নাই। ক-ন।’
আইনসভা তৈরি হওয়ায় তোগ চেঁচামেচি দৌড়াদৌড়িতে সরকার তো শিডিউলগো শিক্ষার ব্যাপারে টাকা বরাদ্দ করছে—’ চাকরিবাকরিরও শতাংশ পাওয়ার কথা।’
‘আমরা ক্যান? আপনে চিল্লান নাই?’
‘দ্যাখ যোগেন! তোগ চিল্লান ছাড়া এতডা হইত না। আর শুধু চিল্লানিতেই হইত না। শিডিউলগো ভোটাধিকারও একডা বড় ব্যাপার। নাইলে বিদেশ যাওয়ার বৃত্তি, ১৯জন শিডিউলরে প্রতি বছর ডাক্তারি পড়ার বৃত্তি, আরো সব বৃত্তির লগে প্রতি বছর ৩০ হাজার টাকা, আরো ৫ লাখের বিশেষ ফাণ্ড, একজন স্পেশ্যাল অফিসার—’
‘আর-বাড়াইবেন না। সব হয় নাই। কিছু মুখে হইছে। কিছু মাথায় আছে। কিছু কাগজে নামছে। কাজের ঘরে ঢ্যাঁড়া।’
‘সে এখন তোমার জাতভাইরা পরীক্ষায় না পাইলে কী হব? গেল বছরের স্পেশ্যাল ক্লার্কশিপে কয়জন শিডিউল পাশ কইরল?’
‘দুই জন।’
‘বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে?’
‘দুইজন।’
‘হায়ার মেডিক্যাল সার্ভিসে?’
‘আমারে কি চাকরি দিবেন? নাইলে ইন্টারভিউ ন্যান কেন?’
‘আচ্ছা, ছাইড়া দে। তোর নি মনে আছে ৩০ সালের হিশাবড়া নমশূদ্রদের চাকরির?’
‘সে তো চাইরড্যা জিলায়—ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, যশোর আর খুলনা। জনসংখ্যার সিকিভাগ শুদ্দুর আর সরকারি চাকরি দুই শতাংশ তাগ। ষোল আনার ডবল পয়সা।’
‘তোর তো স্মরণশক্তি গণেশের নাগাল। একবার দেইখলে বা শুইনলে আর ভুলা নাই।’
‘কোন গণেশ?’
‘গণেশ তো ত্রিভুবনে একডাই। মা দুর্গার পোলা। তুই যে হিশাবডা কইলি, তারই উপর ভর দিয়্যা সরকার একডা অর্ডার ঝাইড়ল-না তিরিশ সালে, ‘কমিউন্যাল প্রোপরশন রেসিও হইব তিনডা অমুসলমান চাকরি পিছে একডা নমশূদ্রের চাকরি, ঐ চার জিলায়।’
‘অর্ডার তো অর্ডারেই শ্যাষ। ঐ অর্ডারে চাকরি পাইছিল কেউ এমন নিজের চক্ষে কুনোদিন দেইখচেন?’
‘না, দেখি নাই। কিন্তু অর্ডারডা তো জারি আছে। সেডাতো আর ক্যানসেল হয় নাই।’
‘কাহা, ঐ ক্যানসেল হওয়া না-হওয়ার দাম কী? চাকরি দিব তো বামুন-কায়েত-বৈদ্য। সরকারি গাড়ির ঘোড়া যদি মারা যায় আর সেইখানে যদি মানুষ অ্যাপয়েনটেড হয় তাইলে, ঘোড়ার ভ্যাকন্সিতে শুদুরগো চাকরি হইলেও হব্যার পারে। একডাই কারণ—ভ্যাকন্সিডা মুসলমানগ রিজার্ভেশনের বাইরে। বামুন-বৈদ্য তো আর ঘোড়া হইতে পাবর না। এক শুদ্দুররাই পাইরতে পারে। ওরা একডা শুদ্দুররে চাকরি দিব্যার লাইগলে বরং তারে হত্যা করব। মানুষমারার আর বাধা কী?’
‘বাধা ঐ মানুষড়াই। স্যায় যদি মইরবার রাজি না হয়।’
যোগেন এই কথার জেরে কিছু বলে না। তার কারণ হতে পারে, হঠাৎ ঐ অন্ধকারে এক ঝাঁক কাকের পাখশাট আর কর্কশ এমন এস্ত ডাক। যে নৈশ নীরবতায় এই কথাবার্তা ঢিমে গতিতে ও চাপা স্বরে রাত্রির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল, সেটা ছিঁড়ে যায়। আবার, কারণটা অন্যরকমও হতে পারে। রসিকলাল সত্যিই রসিক। শস্তা নাটুকেপনা তাকে বিরক্ত করে। হাসতে ও হাসাতে পছন্দ করে। যোগেনের নাটুকে কিন্তু বাস্তব মন্তব্যের সুতো ধরে রসিক যখন শুদ্দুরদের মরণের একটা কারণ তাদের মরণবাসনা, তখন যোগেনকে সামলাতে হয়ই নিজের কথার ঝোঁক।
যোগেন আবার কথা তোলে—’তা কী হইল চাকরির বাদে’।
‘এক নমশূদ্র মাগুরা থানায় যায় কনস্টেবলের চাকরির সুবাদে। সে-চাকরির নিয়ম হইল তিন মাস ট্রেনিঙের পর ঠিক হইব কনস্টেবল হওয়ার যোগ্যতা তোমার আছে কী না। তারে ট্রেনিঙের লগে বাছা হইল।’
‘ক্যা? বাছাবাছিতে বাদ দেওয়াডাই তো সুবিধা—’
‘ঐ। বোধহয় কাগজেকলমে কমিউন্যাল প্রপোরশনডা দেহানোর লগে। তিনডা খোলা, মানে, নন-মুসলিম অ্যাপয়েন্টমেন্টে একজন শিডিউল কাস্ট। এরে বাছছিল আরো তিন কায়েতরে নেয়ার পথ খুইলবার লগে। তাছাড়া পশ্চিমা বামুনরাও তো আছে—বংশের একজন পুলিশে ঢুইকলে তো পরের চতুর্দশ পুরুষ নিশ্চিন্ত
‘ট্রেনিং হইল?’
‘অগ, পুলিশের, নিয়ম, থানা থিক্যা চালডাল দিব, নিজের রান্না নিজে কইর্যা ন্যাও। তার লগে খুপড়ি-খুপড়ি রান্নাঘর বরাত হয়। এই ছ্যামরারও হইছে। থাহার জায়গা আর রান্নার জায়গা। প্রথম দিন সকালে বোধহয় রাঁধছিল-বিকালেই বড়বাবু ডাইক্যা কয়—তোমারে নেয়া যাবে না, তুমি রান্না কইরলে পাশের উঁচুজাতের পুলিশগ অশৌচ লাইগব। তোমার জইন্য তো আর বেবাক সেপাইরে খারিজ করা যায় না। ছাওয়ালডা নাকী কইছিল আমি রান্নাঘরে রাঁইধব না, বাইরের মাঠে রাঁইধব। সেডা তো আইনে নাই। সুতরাং সেই একদিনকা পুলিশ ছ্যামরা বাড়ি বইল্যা রওনা দিল।’
‘কতদিন আগে কাহা?’
‘মনে হয় আর বছর—। ছ্যামরা তো মাগুরা থিক্যা ফিরত আসে কুল্লিয়া দিয়্যা। দারোগাবাবু যহন তাড়াইয়্যা দিল, স্যায় তহন আন্ধারের আগেই বাড়ি পৌঁছিবার চায়। কুল্লিয়া আইস্যা দ্যাহে দল বাইন্ধ্যা শ্যাখেরা লাঠিশোটা ধইর্যা ছুইট্যা চলে। কী ব্যাপার? না, এক আইল নিয়্যা ক্যাচাল হইছে এক শ্যাখের লগে এক ঘোষের। সেই ঘোষের বৌরে কয় শ্যাখ নাকী জবর-দস্তি কইরছে। এই ক্ষুদ্র খবর কী কইরা থানায় পৌঁছায় সেই দিনই, সেডা রহস্য। দুই সেপাই আইস্যা তিন শাখরে বাইন্ধ্যা নিয়্যা গিছে। আর ঐ গ্রামের শ্যাখরা জোট হইয়্যা ছুইটতেছে—কাইজ্যা করার লগে। শুইন্যা, এই একবেলাকা পুলিশ ছ্যামরা শ্যাখগ লগে-লগে ছোটে তার গ্রামের দিকে। ওরে দেইখ্যা তো চিনছে শ্যাখেরা—পুলিশের চাকরি পাইছে। তাইলে এই ব্যাটাই খবর দিচ্ছে। শ্যাখেরা চাকরি বুইঝব কী? ছ্যামরার চাকরি পাওয়া, শুদ্দুরপোলার চাকরি পাওয়া তাগ কাছে তো গল্পকথা। তাই কথাডা রটছেও বেশি। শ্যাখেরা তারে পিটাইব্যার ধরে। কাইজ্যার পিটানি একবার শুরু হইলে কে কার কথা শুনে। আর সে-ছ্যামরা তো মাটিতে পইড়্যা গিছে অসাড়। জখমও হইছে কম না। শ্যাখেরা ঠিক কইরল, আর কাইজ্যায় কাম নাই, এই ছ্যামড়ারে আটক কইরা রাখব। ও যহন তিনজনেরে ধরায়্যা দিচ্ছে, ও-ই তাইলে তাগ খালাস কইর্যা আনুক।’
‘এমন কপাল আর শুদ্দুর ছাড়া কারো হব্যার পারে? বামুনরা ঠিকই কয় কাহা, চাঁড়ালরা পা রাইখলে মাটি পুইড়া যায়। চাঁড়াল বইল্যা চাকরি পাইল, চাঁড়াল বইল্যা চাকরি গেল, চাঁড়াল বইল্যা শ্যাখগো জাঙ্গালে পইড়ল, চাঁড়াল বইল্যা শ্যাখগ হাতে গুম হইল—’
‘পরের ঘটনা থিক্যা মনে হয়, শ্যাখগ মাতব্বরদের সন্দ হইছিল–ছ্যামরা মইরা যাইবার পারে। তালি তো গাঁ শুইদ্ধ্যা ফাটক, তাই আর না—আগাইয়্যা তারে তুল্য নিয়্যা গ্রামে ফিরা যায়। যদি মরে, তাইলে পাচার কইর্যা দিবে কাছে খালের জলে। ছ্যামরাডারে লুকাইয়্যা না ফেইললে তো কিছুই করা যাবে না আর, পুলিশের হাতে ধরা না পাইড়্যা! তার উপর, এডা তো হইব পুলিশ-হত্যা, সরকারের লোক হত্যা।
‘ঘইটল কবে এতখান কাণ্ড?’
‘অত ঠিক কইর্যা তো কওয়া যায় না। সব শুইন্যা মনে লাগে বৈশাখের মাঝামাঝি হইব। কথা তো আর চাপা থাহে না। সেদিন আবার ছিল কুল্লিয়ার উত্তরে ছিরিপুরের হাট। সেই হাটে গিয়্যা খরব পৌঁছায় যে কুল্লিয়ায় শ্যাখ-শুদ্দুরের দাঙ্গা বাইনধছে। এই সব খবর তো যত ছোটে তত বাড়ে। আগুন, খুন, এই সব একসঙ্গে বাড়ে। শুইন্যাই ছিরিপুরের হাট খালি। নমশূদ্ররা ছোটে দক্ষিণে আর মুসলমানরা ছোটে উত্তরে। এই ছিরিপুর হাটফেরত নমশূদ্রগ সঙ্গে কুইল্লার আগেই শ্যাখদের দঙ্গলের সাক্ষাৎ। এইডা বোধহয় শ্যাখদের হিশাবে ছিল না যে উলটা দিক থিক্যাও আক্রমণ ঘটাইব্যার পারে। তাদের আচমকা ভাব কাটার আগেই দ্যাহে—নমশূদ্ররা ঘিরা ফেইলছে। শ্যাখেরা পিছাইয়্যা গেল, ছ্যামরাডারে মাটির উপর রাইখ্যা। তারে দেইখ্যাই তো চেনা গেল। স্যায় না পুলিশ হইছে! হাটফেরত নমশূদ্ররা জানেই না বিষয় কী। তারা ছ্যামরাডারে কান্ধে ফেইল্যা ‘জয় জয়’ দিয়্যা গ্রামের দিকে ছুটে। কার জয়, কীসের জয়, তা কেউ জাইন ও না।
দুইদিন গেল ঠান্ডা। তিন দিনের দিন—এক্কেরে নড়াইল, শালিখা, লোহারডাঙা থানার শ্যাখরা নিজের-নিজের এলাকার হিন্দু গ্রামের উপর ঝাঁপাইয়্যা পড়ে আর হিন্দুরা তাগ জ্ঞাতিসম্বন্ধী নিয়্যা পালটা ঝাঁপান দিল। পুলিশের হিশাবে সাত-আটশ মুসলমান এক-জমাট হইছিল। পুলিশ নাকী এক্কেবরে রাইট টাইমে আইস্যা পড়ছিল তাই কারো মৃত্যু হয় নাই, কোনোপক্ষেরই গ্রামঘর পুড়ে নাই, তেমন বড় হাঙ্গামও হয় নাই। কিন্তু ঘটনাডা পাক খাইল তার পরে।’
‘কইতেছিলেন তো নমশূদ্রগ কথা, এহন আবার কন হিন্দু-হিন্দু–’
‘হইল তো তাই, নাইলে তোরে ডাকি? হিন্দুগ ন্যাতারা আইস্যা ভাষণ দিব্যার ধইরছে মুসলমানগ বিরুদ্ধে। হিন্দু মিশন এক্কেরে মাথায় গামছা বাইন্ধ্যা নাইম্যা গিছে। মিছামিছি রটান ধইরছে—কোন্-কোন্ মন্দির ভাঙা হইছে, কোন্ কোন্ দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হইছে। শুদ্ধিযজ্ঞের ডাক দিব্যার ধইরছে। অ্যাহন আর কেউ জানে না, ক্যাচালটা কী, কাগ মইধ্যে, আইলের মামলা না মেয়েমানুষের ঝামেলা, আমি তোরে জোড় দিয়া-দিয়্যা ঘটনা কইল্যাম। এতডা গোটা কইর্যা আর কেউ জানেও নাই, ভাবেও নাই।’
‘আর সেই একবেলার পুলিশ? উচ্চবর্ণের হিন্দু পুলিশ এক ব্যারাকে তার সঙ্গে রান্না কইরব না বইল্যা কমিউন্যাল রেশিওরে যে শকুন ঠুকরায়?’
‘তার কথা কেউ কয় না—’
‘তো কাহা, আপনে তো নেতা এহানে, বেবাকরে নাম ধইরা ডাকেন। আপনে তো এহানের বাতাস শুইক্যা কবার পারেন কোথায় কী পচে, আপনি নি আন্দাজ পান এই আইলের কাইজ্যা তো রায়তগ লগে হইব্যার পারে যাগ জমি নিজের, চাষি নিজের। সে চাষি হিন্দুও হব্যার পারে, মুসলমানও হব্যার পারে। আইলের কাইজ্যা কবে থিক্যা হইল শুদ্দুর-শ্যাখের কাইজ্যা, আর শুদ্দুর-শ্যাখের কাইজ্যা কবে থিক্যা হইল হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা?’
‘সেইডাই কথা বাপ। হিন্দু মিশন, কংগ্রেস, আর আমাগ নেতারা তো আমাগ হিন্দুগ জ্যেষ্ঠপুত্র বানাইয়্যা তুইলছে, আমরা, শূদ্ররা যদি না থাকি তাইলে হিন্দুধর্ম যে আর থাহে না।’
‘যারে কয় কমিউন্যাল রায়ট, জাতিদাঙ্গা, তা তো এহানে কিছুই হয় নাই। কিন্তু এমন কইর্যা কমিউন্যালাইজেশন অব রায়টসও তো আগে কহনো হয় নাই।’
‘ঠিক কইছিস বাপ, ঠিক সত্যডা কইছিস। অ্যাহন তো কোনো হাঙ্গাম নাই। আইজ তোরে ঘুরাই, দেখবি হাঙ্গামার টাইমের থিক্যাও সন্দেহ, দুশ্চিন্তা, হিংসা কত বেশি। হাটগুল্যা ভাগাভাগি হওয়ার মুখাখুখি। যা হইল একদিনে হয়্যা গেল। কিন্তু অষ্টপ্রহর হাঙ্গামের ভয় য্যান ভূতের ভয়। ভিতর থিক্যা কুইড়্যা খায়। হাঙ্গাম হওয়া ভাল। হাঙ্গাম যে কোনো সময় ঘইটতে পারে এই ভয়ডায় সর্বনাশ রে যোগা।
‘আসল-হিন্দুরা কী কইরল—কাইজ্যার টাইমে আর ভয়ের টাইমে?’
‘খাড়ায় তো এক আমার জাতভাইরা। বাবুরা তো আর লাঠি-রামদা নিয়্যা খাড়ায় না।’
‘হিন্দুগ বাঁচাইতে শূদ্ররা ক্যান প্রাণ দিবে? ভয় পাবে? আমাগ সঙ্গে তো মুসলমানগ কোনো বিবাদ নাই। নমশূদ্ররা আর ভদ্রলোকগ লাঠিয়্যালি কইরব না। আমরা শূদ্র হইয়া আছি বইল্যাই তো কুলীন হিন্দুরা কুলীন থাইকবার পারে। কাহা—’
‘ক বাবা?’
‘যার কুল সে রাখুক। যার শুদ্দুর সে রাখুক।’
‘তাই তো রাহে রে যোগা, হিন্দুর শুদ্দুর হিন্দুরে রাখে। নাইলে হিন্দু বইল্যা তো এত সমাদর কহনো পাই নাই।’
‘কাহা, আপনার কথা ঘুরান। হিন্দুর শুদ্দুর কয় তাগো যারা পোয়াখান হিন্দু আর তিন পোয়া বর্বর—
‘ঠিকই কইছিস। কিন্তু শুদ্দুররা যদি হিন্দু না হয় তাইলে তো হিন্দুধর্মডাও একপোয়া কমই থাইক্যা যাবে নি।’
‘সেই একপোয়ার লগে কি দুঃখ?’
ডাকবাংলোটা যে একটু উঁচু ডাঙায়, সেটা ধীরে ধীরে আবছায়ায় স্পষ্ট হতে থাকে—এদের অবয়ব দেখা গেলেও সামনে একটু তলার মাটি আঁধারে ঢাকা। ‘সকাল হওয়া’ কথাটির তো কোনো মানে নেই, ‘সকাল হওয়া’ মানে তো টাইম। জমিতে যাকে হাল দিতে হয় আর বাড়ির দুয়ারে যাকে ছিটে দিতে হয় তাদের সকাল আর মহাজনের সকালের টাইম আলাদা। জেলের সকালের টাইম আরো আলাদা। রসিকলাল আর যোগেন একই সঙ্গে বাংলোর সেই উঁচু ডাঙা থেকে সকাল হওয়ার এই পার্থক্য দেখছিল। তাদের কাছে এটা কোনো দৃশ্য ছিল না—প্রকৃতি থেকে যেটুকু সরে দাঁড়ালে প্রকৃতিকে দৃশ্যরূপ দেখা যায় তাদের মনে সেই দূরত্ববোধ ছিল না। ‘কাহা, যদি এমন একটা ফেবড়িতে পড়েন যে হয় হিন্দু না-হয় শূদ্র হইব্যার লাগব, এক সঙ্গে দুইডা থাকা যাবে না, তাইলে আপনে কী থাইকবেন?’
‘যোগা, আমি কী থাইকব সেডা তো আমার বিবেচনা, ছাইড়া দে। কিন্তু নমশূদ্ররা কি এই মীমাংসা সত্য মাইনবে, সেইডা ভাইব্যা দ্যাখ। বংশধারা বইল্যা কথাডা তো ফেলনা না বাপ। বাপঠাকুরের জিভ্যা থিকা যে মানুষড়া শুইন্যা আইল, তারা বামুন না বটে, কিন্তু তারা হিন্দু, এক-এক কালে পৈতাও পইড়ছে, বামুনগর নাগাল তাগও মা-বাপের মৃত্যুতে দশদিনের অশৌচ, এইসব মিলদেখাড়া তো তার হিন্দু পরিচয়ডারেই আকার দ্যায়, রাধাকেষ্ট, রামসীতারে দেবতা মানে, তারে যদি গিয়্যা কও—তুমি শুদু শুদদ্দুর হইয়্যাও থাকবা, হিন্দু হইয়ো না, তাইলে স্যায় তোর কাথাডা বিশ্বাস কইরবে? বিশ্বাস তো দূরের কথা—তোর কথাডা বুইঝতে পারব? হিন্দুর উলটা তো তার কাছে মুসলমান—তার বুদ্ধিবিবেচনায় তো কথাডা খাড়াইব–হিন্দুর শুদ্দুর না হইয়্যা তাক্ তুমি মুসলমানের শুদ্দুর হইবার কথা বুঝাও।’
‘তাইলে থাকো গা। বামুন-কয়েতরে বাঁচাইতে মুসলমানের বলি হও গা। তোমার মরণ আর কে ঠেকায়, তুমি তো নিজেই নিজের মরণ। একডা তো যুক্তি কইব্যার লাগব, কাহা। সরকারের আর কংগ্রেসের সুবিদা মতন কাইজ্যারে কবে—শ্যাখ-শুদ্দুরগ দাঙ্গা, ঐডা তো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না। আবার উলডাডাও কবে—আসলে তো হিন্দু-মুসলমানেরই দাঙ্গা আমাগর তো সেই সুবিদা নাই।’
‘সুবিদা নাই? নাকী সাহস নাই?’
‘এডা সুবিদা-সাহসের কথাই না। কথাডা বিশ্বাসের। নমশূদ্রগ এই বিশ্বাস নাই যে তারা হিন্দু না। মুসলমানগ সঙ্গে দাঙ্গায়ই কোনো নমো বুইঝব্যার পারে, স্যাও একডা হিন্দু। সেই বোঝা তো বিশ্বাস। গান্ধীজি এইডা জানেন বইল্যাই অস্পৃশ্যগ মন্দিরে ঢোকার নিষেধ তোলার কথা কইছেন। শুদ্দুরগ আরো এডডু হিন্দু মনে হইব নিজেগ।’
‘আরো এডডু হিন্দু হইলে কি দাঙ্গাদাঙ্গি থাইমব?’
‘তাও তো মনে হয় না রে বাপ’, রসিকলালের নীরবতা জুড়ে আলো উঁচু ডাঙা থেকে গড়িয়ে নীচের ক্ষেতে পড়ে ছড়িয়ে যায়। ‘যোগা মারামারি যা হইছে, হইব স্যায় কথা বাদ থো। কিন্তু মানুষজন তো ডর খাইয়্যা গিছে, কী শেখ, কী বামুন, কী শূদ্র। বাঁশপাতার মতন কাঁপে রে বাপ—ডরে। কী হইব জানে না—কিন্তু ডরায়। এই যে এতডা বিলের পর বিল, জমির উপর জমি, খালের ভিতর খাল–কুথাও তুই দেখবি না, হেই মাগুরা, নরাইল, সালিখা, লোহারডাঙ্গা চার-চারড্যা থানার কুথাও দেখবি না যোগা, মানুষ একলা হাঁটে, একলা ভাসে। কাইজ্যা তো চিরকালই হয়—চাষির সঙ্গে চাষির, আল নিয়্যা, কী ভাগ নিয়া, কী গাই নিয়্যা। সে-কাইজ্যাও তো ধর্ম আছিল নারে বাপ। অ্যাহন তো হিন্দু-মুসলমান ছাড়া দাঙ্গা নাই। আমাগো এই বিল্যা দ্যাশে উথালপাতাল জমির কোথায় ধান, কোথায় পাট, কোথায় ডাইল, কোথায় সর্য্যার খ্যাত বাইছতেই দিন যায়, দিন আর কতটুক সকাল থিক্যা সন্ধ্যা, সেই টুক দিনের বেবাক সময় কি নিজেরে হিন্দু-হিন্দু বইল্যা ভাবা যায় নাকি শ্যাখ-শ্যাখ বইল্যা মনে রাখা যায়?’
রসিকলাল আগেই ঠিক করে রেখেছিল, যোগেনকে নিয়ে একটা ঘুরান দেবে। ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে না, দারোগা-পুলিশের কথামত না, হেঁটে, বা নৌকায়। যতটা পারে ঘুরবে ও হাটেমাঠে তাদের কথা বলবে। ঐ চার থানার কোথায় আজ হাট বসে—সেটা জেনে নিয়ে সোজা সেই হাটেও যেতে পারত, সেখানে একটা মিটিংও ডাকাতে পারত। কিন্তু কী ভেবে রসিকলাল তাও বাদ দেয়, ‘বাদ দে, ঘুরান দিব তাতে আর জিগানোর কী আছে? পথে হাট পইড়লে, পইড়ল। না-পাইড়ল তো না-পাইড়ল। নিজের ঘরের রাস্তা জাইনব্যার কি কোর্ট ইনিসপেক্টরের কাছে জিগ্যাবার লাগব। চল্।’
যশোর তো রসিকলালের হাতের পানজা। নিশ্চয়ই আগে ভেবে রেখেছে—যোগেনকে নিয়ে কোথায় ঘুরবে। যোগেন যশোরে পৌঁছনোর পর তাদের সারারাতের কথাবার্তার ফলে রসিকলাল যা ভেবে রেখেছিল, তার অদলবদলও কিছু হয়ে থাকতে পারে। রসিকলাল মুখ খোলেনি। এক জায়গায় খান তিন বাস দাঁড়িয়েছিল। একটা বাসের কাছে গিয়ে রসিকলাল বেশ উঁচু গলায় ডাকে, ‘এই কাততিক, কাত—তিক্’। বাসটা ছিল রাস্তার দিকে পেছন ফেরা। ভিতরে কেউ ছিল না। সেই পেছনের রাস্তার দিক থেকে দাড়ি না-কাটা এক গুঁফো জোয়ান এসে হাজির-’আরে, চেয়ারম্যান সাহেব? কনে যাবেন?’
‘কার্তিক, এডডু ঝিকড়গাছা যাওয়া লাগে-যে। ঠিক ঝিকড়গাছা না, যাব লাউজানি। ‘আমার তো এড্ডা কাক প্যাসেনজারও নাই। আপনে এহানে খাড়াইয়্যা একখান হাঁক পাইড়ে কন, চলো সবাই কাত্তিকের বাসে, আমি বাস ছাইড়ে দেই।’
‘এই বুদ্ধি না হইলে তুই আর কাত্তিক কেন রে? বেবাক মানুষরে বাসে তুইল্যা আমি কইরবনে কী?’
‘আপনে ঝিকড়গাছা নাইমে যাবেন, আমি আবার অগ ফিরত নিয়্যা আইসব,’–কার্তিকের কথা শুনে যোগেন হেসে ওঠে, যোগেনের হাসি দেখে কার্তিকও হাসে।
‘আপনে এইডডু ঐ দোকানে বইসেন, আমি দেহি, বিশ্বাসরে যদি পাই। এ নগা, নগা’, কার্তিকের ডাক শুনে এক কমবয়েসি ছেলে এসে দাঁড়াতেই কার্তিক তাকে বলে, ‘যা দৌউড়িয়া, বিশ্বাসের বাস ধইরে কবি, চেয়ারম্যান শাহেব খাইড়ে আছেন, ঝিকড়গাছা যাইবেন। ও য্যান অ্যাহনি বাসডা নিয়্যা আসে।’ ছেলেটি সঙ্গে-সঙ্গেই দৌড়েছে, কার্তিক তাকে ধমকে ওঠে, ‘এই শালো কুইত্তা চোদা, এই দিক দিয়্যা যা, যদি ছাইড়্যা দিয়্যা থাকে, রাস্তায় মুখামুখি হওয়ার পাইরবি। থামাইয়্যা কবি।’
কার্তিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই নগা রাস্তার ওপর একটা পাক খেয়ে দৌড়তে শুরু করেছে। কার্তিক তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে থাকে, হাসতেই। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘আপনারা মালেক, এই দোকানডায় এইটটু পাছা ঠেকান।’
‘ঠেকাচ্ছি। কিন্তু বাবা, চা খাইবার কইবা না—’
কার্তিক হো হো হেসে ডান দিকে ছোটে, চায়ের দোকানটা ঐ দিকেই আর রসিকলাল যোগেনকে নিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে প্রথম দোকানটার সম্মুখে দাঁড়ায়। যোগেন বলে, ‘বসবার লাগে তো আপনে বসেন, কাহা, আমি বইসলেই ঘুমায়্যা পড়ব।’
গোল একটা টিনের চেয়ারে রসিক বসে পড়ে বলে, ‘তুই না কইলি ট্রেনে পুরা ঘুমাইছিস। তাইলে তুই শুলি না ক্যা?’
যোগেন তার স্বাস্থ্যল হাসিমুখে বলে, ‘সাধে কয়—যোশুরা মহাজন! মাইগগে দ্যায় আগুন আর মুখে দ্যায় নেমন্তন। সারাডা রাইত কইরলেন বকবক আর অ্যাহন কন—ঘুমাইলি না ক্যান।’
দোকানটা কীসের বোঝা যাচ্ছিল না। এই কথাতে দোকানের মালিক খুব এক চোট হেসে বলে, ‘এইডা তো আগে শুনি নাই। কী কইলেন? যশুরা মহাজন? মহাজন মানেডা কী?’
‘বরিশাইল্যা বচন। মহাজনের কাছে টাকা ধাইরলেই মরণ, কিন্তু যশুরা মহাজন হইলে নিজের শ্রাদ্ধের নেমন্তনও নিব্যার লাগে।’
‘সইত্য হোক, মিইথ্যা হোক, কথাডা কিন্তু ভালো। না, চেয়ারম্যান শাহেব?’
‘যশোরের মানুষরে জিগ্যান—ঐ কথাই বলবেনে, নামডা শুধু বদলাইয়া কবে বরিশাল বা মানিকগঞ্জ।’
‘তাইতেও তো, কথাডা তো সুন্দরই থাকে, বিশেষ কইরে পূর্ব চরণের লাইগ্যা, কী য্যান, কোথায় আগুন দ্যায় আর কোথায় নেমন্তন্ন দেয়।’
কার্তিক দুই হাতে দুই কাপ নিয়ে কোনোরকমে যেন ভয়ে ভয়ে পা ফেলে আসছে। তার চোখ চায়ের কাপের ওপর। টিপ টিপিয়ে হাঁটার কারণে হাঁটুদুটো ভাঁজ হয়ে গেছে। ও যে এই দোকান পর্যন্ত কাপদুটো নিয়ে আসতে পারবে, নিজেই তা বিশ্বাস করতে পারছে না। যোগেন দেখে দু-পা এগিয়ে একটা কাপ নেয়——আরে, তোমার চক্ষু তো দুইডা, তা এক-এক কাপের উপর এক-এক চোখে নজর রাইখবার পারো না? এবার দুই হাতে এক কাপ ধইর্যা তোমার চেয়ারম্যান পর্যন্ত যাও।’ কার্তিক সেই দাঁত বের করা হাসিটা হাসে। ‘এর সঙ্গে যদি তোমার হাসিডাও দ্যাও, তাইলে কার্তিক, তোমারে রক্ষা করার সাইধ্য আমার নাই।’ কার্তিক দুই হাতে কাপটা ধরে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে, ‘আপনি মালেক যদি আমার চুপ-থাকা হাসিডারে স্টার্ট দিয়্যা দ্যান এমন কইর্যা, তা ইলে আর কাপখান বাঁচাই ক্যামনে?’ কার্তিক কোনোরকমে রসিকলালের হাতে কাপটা ধরিয়ে দিয়ে তার নীরব হাসির সঙ্গতিপূর্ণ হা হা আওয়াজে ফেটে পড়ে
সেই হাসির সঙ্গে মিল রেখেই যেন লোকভর্তি বাসের টিন বাজাতে-বাজাতে আর তার সঙ্গে মিলিয়ে ড্রাইভারের হর্ন প্যাকপেকিয়ে নগা এসে হাজির।
কার্তিক আরো এক চোট হাসে, ‘মালেক, মালেক, লাইন থিক্যা বাস তুইলে আনছি। উঠেন, উঠেন।’ তারপর নগাকে বলে, ‘দেখলিরে ভোদাই, যদি তোর রাস্তায় যাইতি, বিশ্বাসরে তো ধইরব্যার পাইরতি নে। পিছন দিয়া গেইলি বইলে না বাসডা ধরবার পেইলি। এড্ডু পিছন মারা শেখ রে ভোদাই। এই বিশ্বাস, চেয়ারম্যানশাহেব যাবে ঝিকরগাছা –’
ড্রাইভার তার সিটের পাশের সিটে যারা ছিল তাদের বলে, ‘এই নাম্, নাম্’। তারা ধুপধাপ লাফিয়ে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় যোগেনকে কার্তিক বলে, ‘মালেক, উইঠে পড়েন, এই এইখেনে একডা পাও দ্যান।’
যোগেন এক ঝোঁকে উঠে ড্রাইভারের কেবিনে বাঁ পা ঢোকাতেই রসিকলাল চায়ের শেষ চুমুক গিলতে গিলতে চিৎকার করে ওঠে, ‘উঁ উঁ উঁ, না না না, আরে নামাও তো যোগেনরে ড্রাইভারের নিকটে বসাইও না সারা রাত্তির ঘুম নাই। ঝিমাইয়া পড়ব ড্রাইভারের গায়। অ্যাকসিডেন্ট হবই। নামাও, নামাও।’
কার্তিক যোগেনের কোমরের নীচে হাত দিয়েই ছিল, তাকে ড্রাইভারের কেবিনে ঢুকিয়ে ফেলার শেষ ধাক্কা দিতে। হাত না সরিয়ে সে এবার ঠেলাটাকে টানে বদলায়, ‘মালেক, আগে ভিতরের পা ডা বাইরে করেন।’ সেটা করতে গিয়ে যোগেন বোঝে, তার পুরো ওজনটা পড়ছে কার্তিকের ওপর, তার মানে তার ও কার্তিকের একসঙ্গে পতন। যোগেন তার ভিতরে ঢোকানো পায়ের ওপর জোর দিয়ে এক ঝাঁকিতে কার্তিকের হাত ছাড়িয়ে ভিতরে পড়ে।
‘কর্তা, বইসবেন না নাইমবেন?’ ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করে। রসিকলাল রাস্তা থেকে হাঁকে, ‘যোগা, নাইম্যা আয়, নাইম্যা আয়।’
ড্রাইভারকে যোগেন বলে, ‘ডাকে যে।’
‘হ্যাঁ কর্তা, পিছনে ঘুমাইব্যার সিট আছে, সেইডাই ভালো। আপনার ঘুমও হইব, অ্যাকসিডেন্টও হইব না।’
কার্তিক ও নগা তখন বাসের ভিতর প্যাসেনজারদের সরিয়ে জায়গা খালি করছে। গেট দিয়ে ঢুকেই ডানহাতের সিটটা খালি করে কার্তিক ডাকে, ‘চেয়ারম্যান শাহেব, এই হানে, এই সিটটা ঘুমাইবার সিট, সাইডের জানলায় মাথা হেলাইবেন। আর, দুইজনের মইধ্যে যে মাথা না-হেলাইয়্যা ঘুমাইবার পারে স্যায় পাশে বইসবে। ঘাড় যদি হেলাবারই লাগে তয় পাশে জনের কান্ধে হেলাইবার পারব। বসেন, মালেক, বসেন।’
রসিকলাল আর যোগেন পাশাপাশি বসে, কার্তিক মুখে আঙুল পুরে একটা সিটি দেয়, ‘আরে, দ্যাহো, কেমন সাত জন্মের যোটক, কী ফিট কইরছে গ—এই বিশ্বাস, গাড়ি ছাড়, গাড়ি ছাড়।’
ড্রাইভার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে নি, হ্যান্ডেলমারার পরিশ্রম বাঁচাতে। এবার সে গাড়িটাকে পেছন-ফেরানো বাসদুটোর পাশ দিয়ে নামিয়ে ঘোরাতে থাকে।
বাসটা যাচ্ছিল ঝিকরগাছা হয়ে পানিসারা হাটে। আবার, কাল যাবে ঝিকরগাছা হয়ে শিমুল্যা হাটে। আবার, তার পরদিন হয়ত আরাবপুর হাটে। যশোরের মাইল দশ পরিধির মধ্যে এই হাটবাসগুলো চলে। যশোর থেকে চাষিরা ও দোকানদাররা মালপত্র নিয়ে হাটে যায় আবার এই বাসেই ফিরে আসে। এই বাসগুলিই একদিককার খবর আর-একদিকে ছড়িয়ে দেয় সবচেয়ে আগে। বাসের প্যাসেঞ্জার তো থাকে যশোরের উত্তরের নানা জায়গার লোক—ইছালি, বুনোদ বিল, চোরামন কাঠি, নোহাপাড়া, লেবুতলা হইবটপুর। এরাই আবার কাল যাবে যশোরের পুব-দক্ষিণের কোনো হাটে। কোথাও যদি তেমন কোনো ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে দুই-এক বেলায় সে-ঘটনা চারদিকে রটে যেতে পারে।
রসিকলাল ঝিকরগাছাতে নামবে কেন, তা যোগেন জানেও না, জিজ্ঞাসাও করেনি। সে যশোর ততটুকুই মাত্র চেনে, যাতে আন্দাজ করা যায় ঝিকরগাছার কাছাকাছি মাগুরা শিমুলিয়া—এই জায়গাগুলিকেই রসিকলাল বলছিল—বর্ডার এলাকা। বর্ডার এলাকা মানে যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জের বর্ডার যেখানে মিলেছে। পদ্মার দক্ষিণে, চাঁদপুরের পশ্চিমে, নদীয়ার পুবে আর সমুদ্রের উত্তরে এটা তো একটাই সমতলখণ্ড।
রাস্তাটায় কোনো রাস্তা নেই। খ্যাপা মেঘনার মত অসমতল। তফাত এই যে, নৌকো থেকে পড়ে গেলে মেঘনার জল গিলে খাবে, আর, বাস যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে মাটির ওপর কাত হয়েই থাকবে।
রসিকলালকে দেখে অনেকে পেন্নাম দিয়ে যাচ্ছে। অনেকেরই নাম জানে রসিকলাল, অনেকের নাম জানে না। এমন চেনা-অচেনা মানুষজনের সঙ্গে রসিকলাল যখন নানা বিনিময়ে ব্যস্ত, তখন যোগেন সিটের বাঁয়ে গেটের জানলায় ঘাড় হেলিয়ে গভীর ঘুমের ভিতর ঢলে গেছে। তার ঠোঁট একটু ফাঁক।
রসিকলাল একজনকে ডেকে বলে, ‘এই, শুডা, এই শুড়া।’
ডাক শুনে বাসের পাটাতনে যারা বসেছিল তাদের ভিতর থেকে একজন দাঁড়িয়ে উঠে দুই পা ফেলে রসিকলালের সামনে এসে দাঁড়ায়।
‘তুমি শুড্যা তো?’
‘হেঁ কত্তা—’
‘গড়াইখোলার?’
‘হ্যাঁ কত্তা—’
‘তোমরা আবার এদিকের হাটে আসা শুরু কইরল্যা কবে?’
‘না কত্তা–’
‘কী? তুমি হাটে নাইমব্যা না?’
‘নাইমব কত্তা।’
‘তাইলে যে কইল্যা তোমরা এদিকের হাট করো না—’
‘করি তো না কত্তা।’
‘তাইলে, আইজ কি বেয়ানবাড়ি নেমন্তন্ন?’
‘না কত্তা। আমার বেয়ান তো কেষ্টবলরামে যাহে।’
‘আমি কী জিগ্যাই তুমি বোঝ নি?’
‘হ্যাঁ কত্তা, বুঝি, এইডা আমার হাট কী না-হাট?’
‘বাঃ। বুইঝল্যাই যদি জব নাই ক্যান?’
‘জব তো দেইছি কত্তা। এডা আমার হাট না, আইজ যাই।’
‘ক্যা? হাট বইদলিলেন ক্যান? সেইডা কন না ক্যা?’
‘সেইডা তো কত্তা জিগ্যান নাই। অ্যাহন জিগাইছেন অ্যাহন কই। আমাগ তো হাটে আয় না কইরলে সনসার চলে না ওদিকের হাটের উপায় যদি বন্ধ হয়, তাইলে এদিককার হাট তো লাগে।’
‘গড়াইখোলা-র দিকের হাটের উপায় বন্ধ হইল ক্যা?’
‘বন্ধ হয় কি হয় নাই, জানা নাই কত্তা। অনিশ্চিত হয়। নমরা নাকী শ্যাখগো দোকান তুইল্যা দিব শুনি।’
‘ও। তাইলি কথাডা গড়াইখালি তক গড়াইছে?’
‘আরো গড়াইছে, কত্তা। নমরা নাকী শ্যাখগো ফিইর্যা শুদ্ধ কইর্যা হিন্দু বানাইব।’
‘তুমি তো শ্যাখ না?’
‘না কত্তা—’
‘হিন্দু?’
‘জানি না কত্তা। বাবুরা তো কুনোদিন হিন্দু বইল্যা ডাকে নাই। তেনারা মানে কী না মানে।’
‘তুমি তো শুইড্যা?’
‘তাই তো শুনি, কত্তা’
‘তাইলে আবার বাবুগ মানা-না-মানার কী? তুমি যা তুমি তাই।’
‘শুইড্যা কি হিন্দু কত্তা?’
‘হ্যাঁ। হিন্দু। তুমি তো জানো তুমি শ্যাখ না!
‘তা তো জানি কত্তা। শ্যাখ হইলে তো ছুন্নত হইত। আমাগ বাপদাদার বাপদাদারও ছুন্নত হওয়ার কথা শুনি নাই। আমারো তো ছুন্নত হয় নাই। শুড্যাগ ছুন্নত হয় না। তাইলে আমরা শ্যাখ হব ক্যামনে?
‘তাইলে ভয়ডা কীসের?’
‘যদি বাবুরা হিন্দু না-মাইন্যা শুদ্ধি কইর্যা আবার ফিরা হিন্দু বানাইব্যার চায়! দুইবার কেমন কইরা হিন্দু হইব? তার থিক্যা হাট বদলান ভাল যতদিন কাইজ্যা থাহে।’
‘তোমারগ ট্যারে তো কাইজ্যা হয় নাই?’
‘কাইজ্যা তো কুথাও দেহি হবার না কত্তা। শুনি সর্বত্তর। কুথায় নাকী দুই হাজার শ্যাখ এক হইয়্যা নমগ বাড়িঘর পুড়াইয়া দিছে। কুথায় নাকী নমরা দুই হাজার হইয়্যা কুন মশজিদ ভাইঙ্গ্যা দিছে। কিন্তু কুথাও তো দেহি না কত্তা। গাঁওই পুড়াক আর মশজিদই পুড়াক, পুড়ানের তো চিহ্ন থাইকব কত্তা, ছাই উড়ব, বাঁশ আধপোড়া হইয়্যা থাকব, থাকব না? সে তো কুথাও দেহি না।’
‘কেউই দ্যাহো নাই?’
লোকটি বাসের ভিতরের টলমল ভিড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমরা নি কেউ দেখছ? নমগ গাঁ পুড়ান? মশজিদ পুড়ান? ঘরের মাইয়া লুট? তোমরা নি কেউ দেখছ?’ কত্তায় জিগ্যায়।’
কয়েকজনের গলা শোনা যায়, ‘দেহি নাই, শুনি।’
একটা গলা শোনা যায়, ‘খাড়া রে ভাই। সামনের হাট ফিরৎ টাউন থিক্যা একজোড়া চশমা নিয়্যা খুইজব্যার বারাব। চশমা ছাড়া কি পুড়ান—ভাঙান—লুটপাট দেখন যায়?’
আর-একটা গলা চিৎকার করে, ‘এত ঠাট্টাতামাশার কী আছে। না হইলে মিছামিছি রইছে না কী? সেই ভয়ে তো হাট ছাইড়িছ। তাইলে আর অবিশ্বাসের হেতু কী?’
এই বাসটার ঝিকরগাছা যাওয়ার দরকার ছিল না, তার আগেই বাঁয়ে একটা কাঁচা রাস্তায় বাঁয়ে ঘুরে পানিসারা হাটে যাওয়াটাই এর রুট। যারা এই রুটের নিয়মিত প্যাসেঞ্জার তারা তেলিয়াগাছিরমোড় আসতে না আসতেই নামার জন্য তৈরি হয়, এখনো দেরি আছে তেলিয়াগাছির মোড় আসতে। আর, তারও পরে তো পানিসারা। মানুষের ব্যস্ততার অভ্যাস হিশেব করে না। যারা এখন তেলিয়াগাছির মোড় এসে গেছে বলে দাঁড়িয়েছে, তারাই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরে কাঁচা রাস্তায় পড়লে টলতে-টলতে বসে পড়বে।
কিন্তু বাসটা তেলিয়াগাছির মোড়টায় বাঁয়ে ঘুরল না। যারা দাঁড়িয়েছিল তারা অনেকে মিলে একসঙ্গে রে রে করে উঠল। বাস থামল না। একটা গলা উঠল, ‘বিশ্বেসদাদা ঘুমাইয়ে পইড়িছে। আরো একটা গলা উঠল, ‘বেরেক ধরে নাই, বেরেক ধরে নাই, গেট খুইলে লাইফ্যে পড়ে।’ যে বলল তাকেও কিন্তু গেটের দিকে যেতে দেখা গেল না।। আরো একটা বেশ ভারী গলা উঁচু স্বরে ধমকে ওঠে, ‘কী কাউতাল লাইগ্যাছেন গ! দ্যাহেন না কত্তা বইসে আছে, ঝিগরগাছা নাইমবে। কত্তাক কি তেলিয়াগাছির মোড় থিক্যা পানিসারা হাট পর্যন্ত কিল্যাইয়া কিল্যাইয়া নেইই যাবি? মাথায় কি এক ছটাক বুদ্ধি নাই—বুইঝে নিবার যে বাসডা ঝিকরগাছা হইয়্যা পানিসারা যাবে? এই বুদ্ধি নিইয়ে যে কী কইরে পোলাপানের বাপ হয়?’
এতটা তিরস্কারের পর একটু নীরবতা তো ঘটেই। তারই ফাঁকে নিম্নস্বরে কেউ ফোড়ন দেয়, ‘পোলাপানের বাপ হওয়ার কামে কি বুদ্ধি লাগে খুব?’
বাসের মধ্যে এমন হাসি ফেটে পড়ে—রাস্তার উঁচুনিচুতে গাড়ির আওয়াজের সঙ্গে মিশে তাতে একটা কোলাহলই তৈরি হয়। সেই কোলাহলে যোগেনের খোলা হাসিও মেশে।
‘যাউক! তোর নিদ্রা তালি ভাঙ্গিল –
‘নিদ্রাখান আইতে দিলেন কহন, কাহা। বাস ছাড়ার পরই কারে ডাইক্যা কাঠগড়ায় তুইললেন, স্যায় নিজেই জানে না সে হিন্দু কী না। জানে শুধু বংশে যহন ছুন্নত নাই, তাইল তারা শ্যাখ না। তারপর এহনকার বিষয় হইল–পোলাপানের বাপ হইতে বুদ্ধি লাগে কী লাগে না। কাহা, এমন কোশ্চেন কইরলে তো আমাগ মন্ত্ৰীগ দম আটকাইয়া মরণ হইব।’
.
ঝিকরগাছি থেকে লাউজানি আর কতটুকু? তাও তো বাসটা পানিসারার রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়েই দিল। এখান থেকে হাঁটা পায়ে যাওয়াটা দরকারও। কাল রাতে কথাটা সম্পূর্ণ হয়নি, এটুকু রাস্তাতেও সম্পূর্ণ হবে না। কিন্তু লাউজানি কেন, সে-কথাটা তো যোগেনের জানা দরকার। হাঁটতে-হাঁটতে রসিকলাল জিজ্ঞাসা করে, ‘তুই লাউজানিতে আসছিস না আগে?’
‘এমন কইরে জিগান যেন লাউজানি কোন গয়া-কাশী-বৃন্দাবন। আইস্যা যদি থাকিয়ো তা মনে কইর্যা রাখার কী? আর যদি নাও আইস্যা থাকি তাও-বা মনে কইরব্যার কী? লাউজানিতে নি তাজমহল আছে—কাহা?’
‘ঠিকঠাক কইর্যার গেলে, তাজমহল নাই। তাজমহল তো শুধু আগ্রায় হয় নাই, আরো তো কিছু শর্তমর্ত ছিল—মোগল সম্রাট, সাম্রাজ্য, সে-সব তো আর লাউজানির নাই। তবে ছোড একডা রাজা, তার রাজধানী, বাঁয়ে নদ কপোতাক্ষ, ডাইনে নদ হরিহর। দ্বিতীয়ডা মইজ্যা গিছে।’
‘বরিশালে য্যামন ঢেলা মাইরলে জমিদারের গায় লাগে, যশোরে তেমনি প্রতাপাদিত্যের গায়ে লাগে। একডা রাজা—’
‘একডা কী রে? বার ভূঁইয়্যার দ্যাশ—’
‘এমনই তিন গণ্ডা ভূঁইয়্যা যে তাগ নামধামও ঠিক কইরব্যার পারেন নাই। আমাগ কৃষক-প্রজা পার্টির মতন। হকশাহেব একাই পার্টি হইয়া বইস্যা আছে আর বেবাকরে এক্সপেল করে।’
‘নতুন-নতুন পার্টিতে অ্যামন হয়। লিডার লাগে রে, লিডার লাগে। হকশাহেবের নাগাল লিডার আর হয়? মন্ত্রিসভায় যহন সবাই মুসলিম লিগ হইয়া গেল, হকশাহেবও লিগ হইয়া গ্যালেন। খাজাগজারা তো পাইরলে গত কালই হকশাহেবরে ফেলাইয়া খাজারে প্রধান করে। লাটশাহেবেরও তাই ইচ্ছা। তোর শাহেব মেম্বারগও তাই ইচ্ছা। তর অফিসারফফিসারগও তাই ইচ্ছা। এতগুলা পক্ষের ক্ষমতা হয় হকশাহেবের সরানোর? কত বড় লিডার তাইলে ভাব। আরে, বাঘের তো আর সদর থাহে না যে খুইলনার বাঘ, বরিশালের বাঘ, বাখরগঞ্জের বাঘ। বাঘ, মানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, বুইঝলি, এক-এক থাবায় যে বর্ডার ভাঙে। হকশাহেব।
‘কইতেছিলেন তো লাউজানি সাম্রাজ্যের কথা, সইরা গিয়্যা হক সাম্রাজ্যে পৌঁছাইলেন যে!’
‘না। শ্যাষ কথাডা আগে কইয়্যা নেই। নাইলে ভুইল্যা যাইব। আর তুই ছ্যামড়া কথায়-কথায় এত কথা কাটিস যে কথার রাস্তা ঠিক রাখা মুশকিল। অ্যাহন আর আমার কথা কাটিস না বাপ। শ্যাষ কইরবার দে। তারপর যা বলার বলিস।’
রসিকলাল বলে যে এই দাঙ্গাগুলো রটানো দাঙ্গা। রটায় কলকাতার হিন্দু কাগজগুলিই বেশি, দেখাদেখি মুসলমান কাগজও পালটা রটায়। কিন্তু মুসলমানরা বাংলা-দৈনিকে দুর্বল, তাদের জোর ইংরাজি দৈনিকে। আর হিন্দুরা বাংলা-দৈনিকে সবল। ফলে রায়ট রটানোর সুযোগ হিন্দুদেরই বেশি। কিন্তু রটিয়ে লাভটা কী? লাভ হল—হিন্দুদের দলপাকানো ও হিন্দু মিশনের কাজ বাড়ানো। হিন্দু মিশন ছাড়াও আছে প্রণবানন্দের ভারত সেবাশ্রম সংঘ। ওরা ফরিদপুরে বেশি। মিশন আর সংঘ দুইই এখন ‘শুদ্ধি আন্দোলন’ করছে। তাদের বক্তব্য—এদেশে ইসলাম ধর্ম ছিল না। নবাব সুলতানদের সময় নমশূদ্রদের জোর করে মুসলমান বানানো হয়েছে। তখন যারা পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছে, তারাই এখনো নমশূদ্র। তাহলে হিন্দুশাস্ত্র মতে প্রায়শ্চিত্ত করলে মুসলমানরাও হিন্দু, মানে নমশূদ্র হয়ে যেতে পারে। ‘হিন্দু মিশন’ আর ‘সংঘ’ এই শুদ্ধিকরণ শুরু করেছে। এদিকে লাউজানি তার প্রধান ঘাঁটি।
এই পর্যন্ত বলে রসিকলাল প্রশ্ন করে, ‘কিছু খটকা লাগে?’
‘খটকা আর রাইখলেন কোথায়। এমন মুসলমান পাবে কুথায় যে হিন্দু হব্যার চায়।’
‘পাব না ক্যান? গরিব মানুষের প্রাণে বাঁচার কোনো উপায় আছে আর? চাইরদিকে হিন্দু গ্রামে ঘেরা একডা মুসলমান পাড়া। সে পাড়াডারে ঘিরা ধইর্যা ভয় দেখায়, প্রাচিত্তির কর, প্রাচিত্তির কর, সে মানুষগুলা না-কইরা কতদিন বাঁচব রে?’
‘যারা এডা কয়, করে, তাগ কি হিশাব নাই কাহা, পূর্ব বঙ্গে মুসলমানগ ঘেরে হিন্দু পাড়াই বেশি। এমন হইলে তো তারাও বামুনগ ঘিরা কইব, মুসলমান হও, সুন্নত করো, গরুর মাংস খাও, নামাজ পড়ো।’
‘আমার আন্দাজ যদি ঠিক হয় যোগা, সেইডা শুরু হইল বইল্যা। শুরু হইলেই কুরুক্ষেত্র। শ্যাখরা যাতে এইডা শুরু করে, ঐ মিশন আর সংঘের মতলব তাই। শুদ্ধিকরণে তো উঁচা হিন্দুগ মত নাই। কয়-না- আর-সব ধর্ম গ্রহণ করা যায়, এক হিন্দুধর্মেই জন্ম নিতে হয়। তাই মিশন আর সংঘ নতুন তত্ত্ব রটাইছে—এহানকার বেবাক মুসলমান হইল কনভার্টেড নমশূদ্র তাগ যদি শুদ্ধ কইর্যা আবার নমশূদ্র করা যায়, তাইলে উচ্চ হিন্দুগ তো ক্ষতি নাই। ক্ষতি তো নাইই বরং লাভ আছে। দাঙ্গার সময় বামুনগ তো বাঁচায় শুদ্দুররা। সুতরাং শূদ্রের সংখ্যাবৃদ্ধিতে বামুন-কায়েত-বৈদ্যের মঙ্গল। সব হিন্দুরই মঙ্গল।’
‘কাইল রাইতে এই কথাডা তুলছিল্যাম বইল্যা-না আমার গলায় পাঁড়া দিয়া খাড়াইলেন, কাহা? কইলেন, কস কী, শিডিউলরা মাইনবে এই কথা যে তারা হিন্দু না?’
‘যোগা, খেয়াল রাখিস, তহন কথা হইছিল হিন্দু-মুসলমান-শিডিউল তিন জাতরে নিয়্যা। অ্যাহন কথা হইতেছে হিন্দু-মুসলমান নিয়্যা। কথা দুইডা আলাদা।’
‘আপনে যত আলাদা ভাবেন, তত আলাদা না। তবে মুসলমানগ প্রাচিত্তির কইর্যা হিন্দু বানাইলে আদমশুমারিতে হিন্দুর সংখ্যা বাইড়ব। সেডা হিন্দুগ স্বার্থ। শুদ্দুরের সংখ্যা বাইড়ব। সেডা ধরেন মাঝারি হিন্দুর পর্যন্ত কাজে লাইগব—রায়টের সময়। অন্য সময় থাইকল শুদ্দুরের মতন। আর, প্রাচিত্তিরের বদলা যে সুন্নত সে তো ধনে চাকু না পইড়লে বামুনগ মাথায় ঢুকব না। কইলেন না—লাউজানি ক্যা?’
রসিকলাল লাউজানির ইতিহাস বলে। সে ইতিহাস যে বানানো, গল্প থেকেই তা স্পষ্ট হয়।
লাউজানির নাম আগে নাকী ছিল ব্রাহ্মণ নগর। রাজা মুকুট রায়ের রাজধানী। সিকান্দর শাহ ছিল বিরাটনগরের রাজা। সেই সিকান্দর শাহের ছেলে গাজি। গাজির চোখে পড়ে, মুকুট রায়ের মেয়ে চম্পাবতী। সে সুন্দরবনের বাঘদের নিয়ে একটা কাহিনি তৈরি করে লাউজানি আক্রমণ করে। মুকুট রায়ের সেনাপতি ছিল দক্ষিণ রায়। গাজির সঙ্গে তার প্রবল যুদ্ধে দক্ষিণ রায় হেরে যায় ও সুন্দরবনে পালিয়ে যায়। চম্পাবতীর সঙ্গে বিয়ের পর গাজি আর দক্ষিণ রায়ের মধ্যে সন্ধি হয়। দক্ষিণ রায় সুন্দরবনের এক অংশের রাজা ও রাজা থেকে দেবতা হয়ে যায়। সুন্দরবনের আর-এক অংশের রাজা ও দেবতা হয়ে যায় গাজি। পরাজিত রাজা মুকুট রায় সবংশে ও প্রজাদের নিয়ে মুসলমান হয়। তার এক ছেলে পালিয়ে গিয়ে গোবরডাঙার কাছে চারঘাটে আশ্রয় নেয়। পরে সে-ও মুসলমান হয় ও ‘পীর ঠাকুরবর’ নামে বিখ্যাত হয়। গাজি ও দক্ষিণ রায়কে হিন্দু-মুসলমান নিরপেক্ষে সকলেই সুন্দরবনে ও সমুদ্রে রক্ষাকর্তা দেবতা মনে করে ও যে-কোনো বিপদের আশঙ্কায় এদের নামে সিন্নি চড়ায়।
‘এরপর আর কী প্রমাণ কবুলিয়ৎ দরকার হয় যে বাংলার মুসলমান মানেই কনভার্ট শূদ্র? সুতরাং হিন্দু মিশনের বা সংঘের তো অধিকারই আছে তাগ হিন্দুধর্মে রিকনভার্ট করার।। এই ইতিহাস কও ইতিহাস, রূপকথা কও রূপকথা, দেবদেবতাদের জন্মকথা কও জন্মকথা, পীর-গাজি পূজার কারণ কও কারণ, লাউজানির মত হাতে গরম কি আর পাওয়া যায়? হাতে গরম মানে, লাউজানির কোনো পোয়াতির প্যাটের বাচ্চাডাও তো এই গল্প বিশ্বাস করে। এও বিশ্বাস করে যে এই কাহিনীতে অবিশ্বাসের মূল্য অবধারিত মৃত্যু। মরণ থিক্যা ধর্মান্তরণের কাজ কারো কাছে সহজও ঠেইকবার পারে। মরণের কারণের তো অভাব নাই।। মোহনা গাঙ আর সমুদ্দুরে যাইব্যার লাগে মাছের লাইগ্যা। বনের ভিতর ঢুইকতে হয় মধুর লাইগ্যা, কাঠের লাইগ্যা। সাপ আছে, বাঘ আছে, কুমির আছে, হাঙর আছে মরণের দূত। এগ কাছে এড্ডা মাইনষের প্রাণ আর কতটুকাইন্যা? এমন মরণ-তাড়নার মানুষের কাছে হিন্দুই-বা কী, মুসলমানই-বা কী যাতে প্রাণ বাঁচে তাই ধর্ম। যোগা, মিশন আর সংঘ তাই লাউজানিরে হেড-অফিস বানাইছে। এই রায়টগুলা রটান-রায়ট। এই প্রাচিত্তিরের পক্ষে। কলকাতার কাগজে খবর তুলার পক্ষে।’
‘এহানে লিগ হয় নাই?’
‘হয় কি আর নাই? এদিনে?’
‘তারা আপত্ত করে নাই?’
‘এহানে যদি লিগ বানায় স্যায়ও তো দক্ষিণ রায় ও গাজির বিশ্বাসী ভক্ত। তারে দিয়্যা হিন্দু মারাইতে পার, কিন্তু গাজি-দক্ষিণ রায় থিক্যা সরাবার পাইরব্যা না।’
রাজা মুকুট রায়ের রাজবাড়ি বলে যে-একটা ধ্বংসস্তূপ ছিল সেটাকে একটা অংশে গেরুয়া নিশানে সাজিয়ে হিন্দু মিশনের কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। গেটে দু-জন দারোয়ান ছিল কিন্তু কোনো গেট বা দরজা ছিল না, থাকার কথাও নয়। রসিকলাল ও যোগেন মাঠ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতেই রাজবাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। কাল্পনিক গেটের দুই দারোয়ান তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করায় রসিকলাল বলে ওঠে, ‘আপনাগ পরিচয় জাইনব্যার লগে তো সরকার আমাগ পাঠাইছে।’ যোগেন হেসে ওঠে। দারোয়ানরা এই উত্তর ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রসিকলাল ও যোগেনের চেহারা-পোশাক মিলিয়ে তারা যা বুঝে নিয়েছিল, তাতে ওদের দু-জনকে বাধা দেয়ার সাহস হয়নি। যোগেনই দেখায়, ‘রাজবাড়িতে কি সাপখোপের সংসার নাই—নাকী তারাও হিন্দু হইয়্যা গিছে? দ্যাহেন কাহা, একটু-আধটু তো সারাইয়্যা নিছে।
গেরুয়্যাপরা একজনকে দেখা যাচ্ছিল। সেই এগিয়ে আসবে নাকী এরাই এগিয়ে যাবে এই নিয়ে কিছুটা দ্বিধা ছিল। গেরুয়াই এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনারা কি মিশনে এসেছেন? না, নিজেদের কাজে কোথাও যাচ্ছেন?’ লোকটি বেশ শক্তসমর্থ, লম্বাও বটে। কথা বলার মধ্যেও ভদ্রতা আছে।
যোগেন বলে, ‘আপনারা কি হিন্দু মিশনের এমন অফিস আরো খুইলছেন, অন্য জিলাতেও?’
‘হ্যাঁ, ঠিক জিলাভিত্তিতে নয়। আপনারা নিশ্চয়ই মিশনের ইতিহাস জানেন। এটা তো এখনকার কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এই শতাব্দীর প্রায় গোড়া থেকেই তো মিশন হিন্দুদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের নীতি প্রথম থেকেই স্বামীজির দ্বারা নির্ধারিত। তিনি যে-হিন্দু জাগরণের কথা বলেছিলেন, আমরা সেই কর্মসূচিই পালন করছি।’
‘স্বামীজি? কোন স্বামীজি?’ যোগেন ভেবেছিল স্থানীয় কোনো গুরুদেবগোছের নাম শুনবে। সন্দেহও ছিল কারণ এই লোকটি কথা বলছিল খুব স্পষ্টস্বরে, সম্ভবত দৃঢ়তা দেখাতে।
‘স্বামী বিবেকানন্দ।’
‘স্বামী বিবেকানন্দের তো রামকৃষ্ণ মিশন, না কাহা?’
‘জানি তো তাই। কিন্তু তাগ তো সিলমোহর একডা হাঁসেরে ঘিরা একডা চক্কর। এহানে তো তা দেহি না। আপনারা কি রামকৃষ্ণ মিশনের?’
‘আমরা সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রচারে হিন্দুরা যাতে ধর্মান্তর গ্রহণ না করেন ও ধর্মান্তরিত হিন্দুরা যাতে পুনরায় হিন্দুধর্মে আসেন, সেই প্রচারই আমাদের প্রধান কাজ ফলে, হিন্দুদের আচারসংস্কারের পরিবর্তন করাও, যেমন অস্পৃশ্যতা, জলাশৌচ, আমাদের কাজ।’
‘গান্ধীজি যেমন কন?’ যোগেন বলে।
‘হ্যাঁ, হয়ত গান্ধীজির এখনকার কথার সঙ্গে আমাদের বক্তব্যের মিল আছে, কিন্তু ১৯১০-১১ সালে কলকাতা হাইকোর্টের জজ, সারদাচরণ মিত্র যখন এ আন্দোলন শুরু করেন, তখন গান্ধীজি এসব নিয়ে কিছু ভাবেননি। ১৯২৩ সালে সিরাজগঞ্জে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু সম্মিলনে যখন হিন্দুসভা গঠিত হয় ও অস্পৃশ্যতাবিরোধী কর্মসূচি নেয়া হয়, তখন গান্ধীজি প্রধাণত খিলাফৎ—আন্দোলনের নেতা। ১৯২৪-এ স্বামী অভেদানন্দ আমাদের সংগঠনকে নেতৃত্ব দেন। পরের বছর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ফরিদপুর সম্মিলনে শপথবাক্য, পাঠ করান—সেই মুহূর্ত থেকে কেউ অস্পৃশ্যতাদোষে দোষী হবেন না।’
রসিকলাল বলে ওঠে, ‘ফরিদপুর? ১৯২৫? গান্ধীজি ছিলেন তো? না?’
গেরুয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘হতে পারে। আমি জানি না। কিন্তু হিন্দু মিশনের আন্দোলন, বড় আকার নেয় ১৯২৯-এ স্বামী সত্যানন্দের নেতৃত্বে।’
‘আপনারা এইখানে একডা কেন্দ্র তৈরি করবেন ক্যা?’ যোগেন সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, ‘এত জায়গা থাইকতে এইখানে লাউজানিতে ক্যা? এহানে তো হিন্দুর সংখ্যাও খুব বেশি না।’
‘সবরকম সংবাদপত্রে তো প্রতিদিনই খবর বেরচ্ছে যে এদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে হিন্দুরা বিপন্ন।
‘হিন্দুগ শক্তিবৃদ্ধির লগে?’
‘আমরা আমাদের সমধর্মীদের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। এটা তো সব ধর্মের লোকই করে। হিন্দুরা করলে দোষ?’
‘দোষগুণের কথা না। এখানকার হিন্দুগ বিপন্নতার কথা আপনারা কেমনে জাইনলেন এইডা এডডু জাইনবার চাই।’ যোগেন বলে।
‘সে তো কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। সব তো আর মনে থাকে না।। তবে এটা খুবই বিপজ্জনক জায়গা। মানে, লাউজানি নয়। যশোর-খুলনা-ফরিদপুরের সন্নিহিত এলাকা। সব চেয়ে বড় বিপদ একটা দূর গ্রামেও মুসলমানরা অন্য জিলা থেকে লোক এনে হিন্দুদের ঘিরে রাখে।’
‘জায়গাগুলার নাম একটু কন না। কাগজ দেইখ্যাই কন। কাগজ আছে তো এইখানে’—রসিকলালের কথায় লোকটি ‘দাঁড়ান, দেখছি’ বলে ভিতরে চলে যায় ও একটু পরেই মেনিফোল্ড পেপারে টাইপ করা একটা কাগজ নিয়ে আসে, ‘এখানেও সব নেই।’ বলে পড়তে থাকে। গোপালগঞ্জে তো লেগেই আছে, নড়াইল, ওদিকে টাঙ্গাইল, খুলনা, মাটি ডাঙা, বাগের হাট, মেল্লা হাট–কোথাকার নাম বলব আর কোন নাম বলব না। বলতে পারেন, সর্বত্রই পাটকাঠি শুকনো করে রাখা। একটা ফুলকি পড়লেই হল।’
যোগেন হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল, তারপর খুব মন দিয়ে দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে জিগগেস করে, ‘এ লিস্টি কি কাগজ দেইখ্যা বানানো, থানার সঙ্গে মিলান হইছে, মানে ভেরিফায়েড?’
‘সেটা তো আমরা বলতে পারব না।। এটা আমাদের কলকাতা হেডঅফিস দিয়েছে। এর পরেও দিয়েছে। ভেরিফাই না করে কি দেবে?’
‘এটা তো একটা ছোট লিস্ট। তাতেও কেমন গোলমাল দেখেন। বাগেরহাট আছে আবার মোল্লাহাটও আছে। দুইডাই এক। ধরেন, খুলনাও আছে, ডুমরাও আছে। এই সব লিস্টিতে অকুস্থল ও তার জিলা বা মহকুমার উল্লেখ একসঙ্গে থাকা দরকার? নইলে মনে হওয়ার পারে যে সারা জিলায় য্যান সর্বত্রই একই সঙ্গে দাঙ্গা চইলতেছে। ধরেন কথায় কথায় বিখ্যাত ঢাকা রায়ট তো আসলে ঢাকা সিটি রায়ট। এই খবরের ভিত্তিতে আপনাগ কাজ তো উলট্যা ফল দিবে। যেহানে রায়ট হয় নাই সেহানেও আপনারা গিয়্যা হিন্দুগ মনোবল এমন বাড়ান বাড়াইলেন যে সেইডা বাহুবলে বদল হইয়া গেল। হাউসের লগে বাধায়্যা দিল রায়ট।’
‘এটা আপনি কী বলছেন? আমরা দাঙ্গা ঠেকাতে এসে দাঙ্গা বাধিয়ে দেব?’
‘সেডা তো আপনাগ দাঙ্গা ঠেকানোর পদ্ধতির কারণে। আপনে তো বারেবারেই কন—হিন্দুগ মনের জোর বাড়ানডাই আপনাগ কাজ। দাঙ্গার অপরপক্ষের সঙ্গে আপনাগ কোনো সম্বন্ধ নাই।’
‘সেটা কী করে থাকবে। আমাদের লক্ষ তো হিন্দুধর্মীয়দের শক্তি জোগানো ও প্রয়োজনীয় সাহায্যদান। মুসলমানদের এমন অনেক জাতিসংগঠন আছে। হিন্দুদের মধ্যে আমরা আছি আর প্রণবানন্দজি আছেন।’
‘আপনারা বড়, তাই ছোটগ ধরেন না। আমিই কই, আপনে শোনেন, বন্ধু জগদ্বন্ধু সমাজ, সত্যসাধন সভা, গোরক্ষা সমিতি, হিন্দুরক্ষা সমিতি। এগুলা সবএই সব জিলায় আছে। বড়বাজারে গিয়্যা আরো অনেক সমিতি পাইবেন। মুসলমানগ সব সমিতিই বড় কোনো সমিতি অনুমোদিত, আঞ্জুমান, জামাত যাই হোক। আপনাগ উদ্দেশ্য যতই ভাল হোক, আপনাগ কাজকাম বিপজ্জনক। আপনারা দাঙ্গা থামাইব্যার মানুষ না, দাঙ্গা বাধাইব্যার মানুষ। আমাদের এই জায়গার বেবাক মানুষ ডর খাইছে—হিন্দুই বলেন, মুসলমানই বলেন। আপনারা এই জায়গা ছাইড়া চইল্যা যান।’
‘চলে আমি যাব না। আপনাদের পরিচয়ও তো জানি না।’
‘উনি যশোরের মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস-চেয়ারম্যান ও এম-এল-এ। আমি বরিশাল থিক্যা। ঐ একই পরিচয়, আমার পরিচয় থিক্যা চেয়ারম্যানডা বাদ। অ্যাহন অ্যাসেম্বলি খোলা। সেহান থিক্যা আমরা গোলমালের খবর পাইয়্যা আসছি।’
‘আপনারা কেন এসছেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি কেন আছি সেটা আমার ব্যাপার।’ রসিকলাল বলে ওঠে, ‘একডাই বেমিল। আপনার ব্যাপারটাই আমাগ ব্যাপারটা বানাইছে। আপনারে আমাগ ব্যাপারে নাক গলাইতে নিষেধ করার জইন্যেই আমরা আসছি। আমাগ তো জানাইতে হইব পরিস্থিতিডা। জানানোর লগে আইনসভায় ভাষণ দিব্যার পারি। অথবা, হোম মিনিস্টার নাজিমুদ্দিনরে রিপোর্ট কইরব্যার পারি। অথবা, জিলা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে জানাইবার পারি। আপনার পক্ষে তিনডাই সমপরিমাণ বিপজ্জনক। আইনসভায় হিন্দু মিশন লইয়্যা কথা বলার লোক কম। আমাগ কথার উপরই সরকাররে কাম কইরতে হব। মানে, নাজিমুদ্দিনশাহেবই যা করার কইরবেন। তিনি তার জাত ভাইগ কথাই আগে ভাববেন। আর লোক্যাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে জানাইলে তারা কুনো রিস্ক নিবে না। আপনাগ জিলা থিক্যা চইলে যাওয়ার অর্ডার দিবে। সবগুলাতেই বাঘের থাবা এবং আঠার ঘা। এক আমাগ কথা যদি মাইন্য করেন, তাইলেই আপনার কোনো ক্ষতি নাই। আমরাও কাউরে কিছু কব না। আপনেও কবেন না। কেউ জিগ্যালে কব, থাইম্যা গিছে।’
লোকটি গম্ভীর হয়ে কিছু ভাবে, ঠোঁট কুচকে ও ডানহাতের আঙুল ঠোটে বুলায়। ‘আপনাদের আমি অনুরোধ করছি—আমার কথাটা ভাবুন। এই কাজটা মিশন আমাকে দিয়েছে। আমি যদি ফেইল করি, তাহলে তো আমার কাজটা যাবে। এখনকার দিনে কাজ কি ছাড়া যায়?’
যোগেন চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘এটা আপনার চাকরি? মানে, জীবিকা?’
‘নইলে এই কাজে কেউ আসে? যশোরে এসে ‘আনন্দমঠ’-এর ‘ভবানী মন্দির’ বানাতে’, লোকটা তেতো হাসে।
‘এসব কাজ তো বিশ্বাস থিকে হয়। মাইনায় কি একাজ হয়?’
‘বিশ্বাস যে আমার একেবারেই নেই, তা নয়। তার সঙ্গে লোভও আছে। এতগুলো টাকা। আরো চাইলে আরো। কাউকে হিশেব দিতে হবে না। আর যদি একটা বড় ঝামেলা পাকাতে পারি, তাহলে তো কথাই নেই।’
‘আপনার কথাবার্তা শুইন্যা তো মনে হয়, বড় কলেজে পড়াশোনা—’
‘হ্যাঁ। নামটা বলব না। আমি ভাবিই নি আপনাদের লেভেল থেকে এমন রেজিস্টান্স ফেস করতে হবে।’ একটু বিষণ্ণ হেসে যোগ করে, ‘এটাই বোধহয় প্যাসিভ রেজিস্টান্স।’
ফেরার পথে যোগেন হেসে বলে, ‘এইডা দ্যাহনের লাইগ্যাই টেলিগ্রাম?’
‘কইব্যার পারিস। আমি তোর কাহা হইব্যার পারি, বয়স তো খুব বেশি না। তবে, ক্যান জানি দ্যাশের কথা ভাবা ধরছি কম বয়স থিক্যা। তোগ বেলায় তেমন হয় নাই। দ্যাশে কী হইতেছে, তার থিক্যা বেশি দরকার নিজেরে খাড়া করা। খাড়া হওয়ার পর দ্যাশট্যাশ বুইঝলেই চলব। ঐ ঊনতিরিশ সালের স্বামী সত্যানন্দের হিন্দু মিশনের কথা তোরও জানার কথা তহন কি তোর ওকালতি হইয়া গিছে?’
‘না। আরো দুই-এক বছর পর।’
‘তহন এই শুদ্ধি শুরু হইছিল। আরে, আমরা যদি হিন্দুই, তাইলে আবার সাবান ঘইষ্যা হিন্দু বানানের কামডা কী। স্যায় সব তারপর বন্ধ হইল। না, আমাগর কারণে না, শ্যাখগ কারণে। তাগও শুদ্ধ কইর্যা হিন্দু বানাইতে গিয়া দুই-একডার মাথা গিছে, দুই-একডার পাও গিছে। এইবার দাঙ্গার খবর পাইয়্যা আইস্যা দেখি, আবার সেই শুদ্ধি, আবার সেই মিশন। খবরের কাগজে রক্তগঙ্গার খবর পইড়্যা সেইখানে যাইয়্যা জিগ্যালে দেহি তারাই উলট্যা পৌঁছে—কোথায় কী হইছে। তহনই মাথায় আইল—রটাইয়্যা দাঙ্গা বাধাইব্যার চায় কেডা? এহানকার মানুষ হবারই পারে না। কেউ তো আর নিজের গাঁয়ে কাইজ্যা বান্ধাইতে চায় না। তারপর কাগজের আরো খবরের তল্লাশে আরো ঘুরান দিয়্যা বুইঝল্যাম—অ্যাহন দাঙ্গা ছাড়া কাইজ্যা নাই। কাগজে। সে জমির আইল বা বাড়ির সীমানা বা রাস্তার গাছের ফলের ভাগ নিয়্যা নিত্তি চব্বিশঘণ্টার ঝগড়াও হয়, তালিও সেটা দাঙ্গাই হইব। তহন একদিন যাই এসপির লগে। তারে জিগাই, এই যে কাগজে ছাপায়, মোট হাজার মুসলমান জমা হইছিল, আবার ছাপায়, চার-পাঁচ গ্রামের নমশূদ্ররা মিল্যা হাজার মানুষ মিলছিল—আর সব জায়গাতেই পুলিশ যথাকালে পৌঁছায় বইল্যা মারামারিডা শুরু হইবার পারে নাই, তাই জখমও নাই, খুনও নাই—এতডা বিত্তান্ত কোথ্ থিক্যা পান? শাহেব চইট্যা গিয়্যা কয়—’এগুলা তো লোক্যাল থানার ঘটনা, আমারে জিগানোর মানে কী, আমি কি থানার দারোগা।’ শাহেবের রাগ দেইখ্যা শান্তি পাইল্যাম। কইল্যাম—এই-যে লিখছে লোহারডাঙ্গায় পাঁচ শ সেপাই রুট মার্চ করায় হিন্দু-মুসলমান সবাই ভয় পাইয়্যা পল্যায়্যা যায় আপনাগ লোহারডাঙ্গা থানায় সব মিলাইয়্যা পাঁচ শ সেপাই হব তো? আপনারা তো আবার বামুন ছাড়া সেপাইয়ের চাকরি দেন না। এক লোহারডাঙ্গায় পাঁচশ বামুন সেপাই পাইলেন কই? এই প্রশ্নডার জব তো আপনারাই দিতে হয়। আর যদি অপারগ হন তালি থাক, অ্যাসেম্বলিতে হোম মিনিস্টাররে জিগাই। উনি আপনারই জিগ্যাইয়া আমারে জব দিবেন। কথা শুইন্যা শাদা চামড়ার কানে জল। কয়, ‘এসব খবর তো কাগজের রিপোর্টাররা জোগাড় করে পাঠাতে পারে। সে-দায়িত্ব আমরা কেন নেব?’ আমি নমস্কার দিয়্যা উইঠ্যা কইল্যাম—আমিই তাইলে খবর নিয়্যা আপনারে জানাইয়্যা যাব। আপনে আপাতত মাগুরা থানায় সেপাইয়ের পোস্টে এক নমশূদ্র প্রার্থীরে কেন যোগ দিতে দেয়া হয় নাই, সেইডা জাইন্যা রাইখবেন। যেদিন আইব সেদিন আমাগ সংবাদ দেয়াথোয়া হবে।’
‘কাহা, এই কামে আইনসভা থিক্যা ছুটি?’
‘আরে, ঘটনা না জাইনলে কোন্ আইন বানাবি রে বাপ। কতডা মাথা লাগে বাপ, লোহার ডাঙ্গায় পাঁচশ সেপাই জড়ো কইরতে, আর হাজার মুসলমানের জমাৎ বানাইতে। খাজারে জিগ্যা, কবে জিলার ঘটনা। জিল্যারে জিগ্যা, কবে লোক্যাল। লোক্যালরে জিগ্যা কইব গ্রামের ঘটনা—এফআই আর নাই। তালাশ কইরতে কইরতে মিশনেরে পাইল্যাম মরিচা নদীর ঘাটের হাটে।’
‘সেডা কুথায়? শুইনছি বইল্যা তো মনে নেয় না।’
‘শুইনলেও নিত না। ঐ হাটের মানুষগরই মনে নেয় ন্যায় না মইরচ্যা ঘাটের হাট। এডডা দেড় হাত-দুই হাত চর। শক্ত দড়ি দিয়া বাইন্ধ্যা বঁড়শিতে টান দিলে উইঠা আইসব। জনা বিশ মানুষ—পুরা হাটে। মাথা গুইনলে আরো কমব্যার পারে। তো জিগাইল্যাম—এই কয়ডা মানুষের একডা হাট কীসের লাইগ্যা। মাতবর জব দিল—আমাগ থিক্যা একজনরে প্রতি সাতদিনে কায়েম খাশে পাঠাই ধানচাল আইনব্যার লাইগ্যা। খাওয়ার জইন্য না। আকারগুলা মনে রাখার লাইগ্যা। না-হয় তো বাড়ি ফিরা মরিচের রং ভুইল্যা বেগুনরে মরিচ ভাইব্যা বসব। তহন আমি জিগাই—এমন একডা পাণ্ডববর্জিত হাটে ঐ গেরুয়া ক্যা? মাতবর কয়-রিলিফ দিব্যার আইছে। কীসের রিলিফ। কাইজ্যায় যারা জখম হইছে তাগ লাইগ্যা। আপনাগ এই চরেও নি কাইজ্যা হইছে, হিন্দু-মুসলমানে? না, হয় নাই, কয় যে হব্যার পারে তো আগাম রিলিফ, শুধু হিন্দুগ লগে। উনারে কওয়া হইছে, তাইলে রিলিফ ফেরত নিয়্যা যান। আমাগ এই চরখান তো পৃথিবীর বাইরে। হিন্দু-মুসলমান তো হয় পৃথিবীতে। আমাগ মরিচের রং মনে রাইখতে সাতদিন পরপর একজনরে খাশে পাঠাইব্যার লাগে। রিলিফডা আপনে ফেরত নিয়্যা যান। আমরা যহন ফিরব তহন আবার না-হয় শ্যাখ-শুদ্দুর হইব। তহন নিব রিলিফ।’
যোগেন হো হো হেসে উঠে বলে, ‘আপনে খুঁইজ্যা খুঁইজ্যা এই রবিনসন ক্রুশোর দ্বীপ পাইলেন ক্যামনে?
জবাবে রসিকলালের গলার স্বর বদলে গেল, ‘জিদে আর অপমানে। আমি যশোরের মানুষ অ্যাহন যদি কেউ কোপ দ্যায়, তাইলেও গা থিক্যা যশোরের রক্তই পড়ব। আর আমার যশোররে আমারই অজানা কইরব্যার ধইরছে কারা। যদি জাইনব্যার পারি তালেই হইল। না-জানা নিয়্যা আমি বাঁইচি ক্যামনে রে। খবরের কাগজে পড়ি আর নাম ধইরা-ধইরা যাই। সেহানেই মইরচ্যা নদীর ঘাটের হাট দেহা খোঁজা শুরু করি। আর আইছিল্যাম বইল্যাই হিন্দু মিশনরে চিন্যা ফেলি। যোগেন, একবার ভাইব্যা দ্যাখ—কতডা নকশা, বুদ্ধি, মানুষ চিন্যা এতটা দূরের চর খুঁইজ্যা বাইর করা যায়। ভাইবল্যাম, তোগ এইডা দেখান্ দরকার, না-হয় তোরা বিশ্বাস যাবি না। তোর কথাই মনে আইল। টেলিগ্রাম ছাইড়ল্যাম। ততদিনে লাউজানির এ মিশনের খবর কানে আইছে।’
লাউজানি থেকে ঝিকরগাছা হয়ে, ওরা একটা মাল বওয়ার ছোট ট্রাকে মাগুরার দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। যোগেনকে নিয়ে রসিকলাল কোথায় কোথায় যাবে কী কী দেখাতে, তা নিয়ে যোগেনও কিছু জিজ্ঞাসা করেনি, রসিকলালও কিছু বলেনি।
যোগেন কিছু জিজ্ঞাসা করেনি, কারণ সে জানে রসিকলাল কিছু বলবে না। রসিকলাল কিছু নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছে। সেইসব বিষয়ের মধ্যে ফেলে রসিকলাল যোগেন কী ভাবে সেটা বুঝতে চায়। সেই ভাবনা, রসিকলালের সঙ্গে না মিললেও এখনই বোঝা যাবে না। রসিকলাল কোনো ইশারাও দেয় না, কোনো মতও দেয় না।
‘কাহা, লোকে নিন্দা দিবে না? ভরা আইনসভায় বিরাট-বিরাট বিলের তর্ক চইলতেছে আর কাহা-ভাইপো ইশকুল পালাইয়া চিত্রা নদী-ভৈরব নদের ফাঁকফোকর দিয়্যা মাষকলাই আর বড়ই তুইল্যা খ্যাবার ধইরছে।’
‘তুই শ্রাবণ মাসে মাষকলাই দেখিস! তোর মাথার অবস্থা তো খুব সুবিধার লাইগে না রে।’
‘শ্রাবণ মাসে যা পাওয়া যায় স্যায় কি আপনে পাইতে দিবেন? বরিশালে তো বারমাইস্যা জল। এই যশোরের মত তো দুরবস্থা না যে বর্ষার উপর ভর কইর্যা ধানপুঁটির ঝাঁক আইব?’
ওরা একটা বড় আলে পাশাপাশি হাঁটতে পারছিল। এত নানা রঙের হলুদ ও সবুজ ধানে তারা এমনই ডুবে ছিল যেন সে-রংগুলি তাদের গায়েমুখেও লাগছিল। আকাশ যেহেতু বেশি দূর গোল থাকতে পারে না বা মানুষের চোখ যেহেতু কোনো একটা দিক ছাড়া চোখ মেলে রাখতে পারে না—তাই ওদের মাথার ওপর শ্রাবণের একটু জলছুট আকাশের সামান্য পাতলা কিছু ছাইরঙা মেঘ পাড়ের দিকে কাল হয়ে একটু পরে আবার বেরিয়ে আসছে। পৃথিবীজোড়া সেই সবুজ আর হলুদের নানারকম ধানের ক্ষেতের ওপর রোদ তাই এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ছিল, মুছে যাচ্ছিল আবার মেঘের ছায়াগুলোও খুব বড় নদীর দূর স্রোতের মত বইছিল। ধান্যপ্রান্তরের ভিতর থেকে যেমন অদৃশ্য ও বিবিধ শ্রুতির ধ্বনি ওঠে, কখনো পুনরাবৃত্তিমান, কখনো মাত্র একবার, কখনো ক্রমনিকট, কখনো রণনহীন কেঠো, কখনোই প্রতিধ্বনি তৈরি হয় না, দুইদিকের ক্ষেতের জল কোথাও কুলকুল করে আর কোথাও চকিত রোদে ঝিলকায়।
ধানপুঁটির কথায় রসিকলাল একটু তিরস্কারের সুরে বলে, ‘দেখ যোগা, অসইত্যা কথা কইস না। বারানোর টাইমে নিজেও ছাতা নিল্যাম না, তরেও দিল্যাম না। ভরা শ্রাবণ। এখন যদি বৃষ্টি নামে—তালগাছের নাগাল খাড়াইয়া-খাড়াইয়া ছাতাইর্যা পাখির লাগান ভিজব্যার লাগব। আর তুই কস ধানপুঁটির কথা। ধর্, ক্ষ্যাতে নাইমা এক আজল তুইল্যাই আইনল্যাম, এই দূরাদরশ্চক্রে কুথাও কি আগুন দেইখব্যার পাস? ভাজবি কীসে? পোড়াইবিই-বা ক্যামনে?
‘ক্যা? বাজ পড়ে না? কাঠি ধইরলে জ্বইলব না?’
‘তা অয়তো জ্বইলব্যারও পারে কিন্তু শ্রাবইন্যা ক্ষ্যাতে কি শুকনা কাঠি পাবি রে বাপ! সব তো জলে ম্যাদামাইরা গিছে।’
কোনো এক সময় কোনো একটা দিগন্তের টুকরো ছিঁড়ে ওরা একটা খালে পৌঁছায়। ওদের ওপারে নিয়ে যেতেই একটা ছই ঢাকা ছোট নৌকো ছিল জলে, তাতে, একজন লোক গামছায় মাথা ঢেকে কাত হয়ে, দুটো হাঁটু গুটিয়ে শুয়েছিল। রসিকলাল বা যোগেন এমন পারাপারে এতই অভ্যস্ত যে এটাকে তাদের বানানো লাগল না। এমনকী—এই খাল, জল, খেয়া ও মাঝির দিকে তারা হয়ত চাইলই না। মাষকলাই আর ধানপুঁটির আজাইড়্যা কথার মতই আজাইড়্যা দেখা হল।
পৌঁছনোর পর বোঝা যায়—রসিকলাল শিমুইল্যা গ্রামেই আসছিল। এক মাত্বরের বাড়িতে বসে লোকজন ডাকা হল। রসিকলাল সেই লোকজনদের ও মাতবরকে বলে, ‘শোনো, আমাগ দুপুরের খাওয়ার কুনো চেষ্টা দিয়ো না। যে-কথা জিগাইব, তার জব জানা থাইকলে বইল। না-জানা থাইকলে বইল না।’
‘যা জিগ্যাব্যার জিগ্যান। এর মইদ্যে দুপরের খাওয়া-না-খাওয়ার কথা আসে কোথিক্যা? আপনে বিস্মরণ গেলেন কত্তা, আমাগ দুই বিহানে খাওয়া?’
‘আচ্ছা, তাইলে জিগানোর কথাডা জিগ্যায়ই ফেলি। এরে যে সঙ্গে আনছি, আমার লগে আইসছে বইল্যা স্যাক অগ্রদানী বামুন ভাইব না। তোমরা কি চেন কেউ?’
‘চিনি বইল্যাই তো মন করছিল, আপনার কথায় তো সন্দ হইল, সত্যি চিনি তো?’ একজন বলে।
এসব কথা ঠারেঠোরে চলে। যা বলা হয়, তার উলটো বোঝানো হয়। যশোরের এত ভিতরের দিকের গ্রামে যোগেনকে না চিনতেই পারে। উলটোদিকে আবার ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ এমন এক নদীর খেপ যে ওপারটাকেই নিকটতর মনে হতে পারে।
রসিকলাল একটু রাগের ভাব দেখিয়ে বলে, ‘চেনো তো চেনো, তা নিয়্যা এত কওয়ার কী আছে? কথাডা হইল, তোমাগ এহানে কি কাইজ্যা হইছে?’
মাতবর বলে, ‘এডা কি কইলেন কত্তা। অষ্টপ্রহর তো এক কাইজ্যাই হয়। কোন কাইজ্যার কথা কন? স্বামীস্তিরির? না ভাইভায়ের? না দুই ভাইয়ের দুই বৌয়ের? না জমির আইলের? বা আইলের গাছের?
রসিকলাল এবার সত্যি একটু রেগে বলে, ‘দ্যাহো মাত্বর, নড়াইলের ফাজিল সাইজো না—’
নড়াইল কাছেই, সেখানকার জমিদারকে রাজা ডাকে। কলেজ আছে। টাউনে আরো যা থাকে, আছে। চুলকাটার সেলুন হচ্ছে সবচেয়ে বড় আধুনিকতা। সেইসব মিলিয়ে ‘নড়াইলের ফাজিল’ বলে একটা কথা চালু আছে। অনেকে নাকী বরযাত্রী হিশেবেও সঙ্গে নিয়ে যায়।
রসিকলালের রাগ দেখে মাত্বর হেসে বলে, ‘আচ্ছা, মণ্ডলমশায় কন তো! আমরা তো দুনিয়া দেখি নাই কিন্তু আমাগ এই চারপাঁচড়া জিলা মিল্যাইয়া যে বিল্যাখাইল্যা জায়গা, এইহানে সব মানুষ তো সব সময়ই রাইগ্যা থাহে। বিশ্বাসমশাইয়ের মত ঠান্ডা মানুষ ক্যামনে বুঝেন যে এত রাইগ্যা এতগুলা মানুষ থাহেই-বা ক্যামনে, কামকাজই-বা করে ক্যামনে, সনসারই-বা করে ক্যামনে?’
‘কাহা এডডু বিরক্ত আছে। আমারে কইলকাতা থিক্যা তার কইর্যা আনাইছে। নিজেও আইনসভা থিক্যা ডুব দিছে। ক্যা? না, উনার মনে হইছে—কাগজে ছাপাইয়্যা রট্যাইয়া যশোরে দাঙ্গা বান্ধানো ধরছে।’
‘রায়টের কথা কন না কী?’
‘হ্যাঁ। আপনাগ নাম বারাইছে কাগজে। আপনাগ এইহানে কি কোনো গোলমাল হইছে?’
‘রায়ট? হিন্দু-মুসলমানে? এইডা তো আমরাও নতুন শিখব্যার ধইরছি। যারা শিখাবার আসছিল, তাগ কইল্যাম-কাইজ্যা তো হিন্দু-হিন্দুতেও, আমাগ মতন চাঁড়াল হিন্দুর সঙ্গে চাঁড়াল হিন্দুরও হয়, বাবুহিন্দুগ বাবুহিন্দুর লগে হয়—কইর্যা দিব্যার লাগে হয় আমাগ না-হয় শ্যাখগ, শ্যাখ-শুদ্দুরেও হয়। কিন্তু সেডা যে হিন্দু-মুসলমানের তা তো জানিনা। যারা আইছিলেন স্যায়রা শিখাইলেন সেইডা হইল রায়ট। বিশ্বাস-কত্তারে শুনাইতে চাইল্যাম, নতুন শিক্ষা, কত্তা গেলেন চইট্যা’।
রসিকলাল বলে, ‘এন্ড্রু বিতং দিয়্যা কও। কারা আসছিল?’
‘কইল তো হিন্দু মিশন। রায়টে যাগ ক্ষতি হইছে, জখম হইছে, বাড়ি পুড়ছে তাগ সহায় দিব্যার লগে। নগদ টাকায়, জিনিশপত্রে। আমরা যহন কইল্যাম—আমাগ তো রায়ট হয় নাই, তাইলে ক্ষতিও হয় নাই। যে-ক্ষতি হয় নাই, সেডা পূরণ নিব ক্যামনে। শুইন্যা তো মিশনের বাবুরা বেবাক কাগজ বাইর কইর্যা এপিঠ দেখে, ওপিঠ দেখে আর জিগ্যায় আপনাগ গ্রামের নাম কী? আমরা কই যে শিমুইল্যা। জিগ্যায় শিমুইল্যা না কী ঘ্যান কইল রে, আলিজান, আমার তো মুখে আসে না-
‘শিমুলিয়া’।
‘তো আমরা কইল্যাম, বাপের জম্মে শুনি নাই। তহন জিগ্যায়, পোস্টোফিস কি? কইল্যাম—জানি না, বাপও জাইনত না। জিগায়-থানা কী? কইলাম— দ্যাহেন, আপনারা ভুল জায়গায় আইছেন। আমাগ নিয়্যা আর থানাপুলিশ কইরবেন না। তহন কইল—’আপনাগ এইগুল্যা পাঠাইছে। আপনাগ না দিলে হিশাব মিলব না। আপনারা ভবিষ্যতের কথা ভাইব্যা রাইখ্যা দেন।’ শুইন্যা কইল্যাম ‘এডার মানে তো খাড়ায় আপনারা জানেন আমগা এইহানে রায়ট বাধবই, তাই তার ব্যবস্থা মজুত দিচ্ছেন।’ তারও পর যহন কয়—শুধু হিন্দুগ লাইগ্যা সাহায্য, তহন তো বেবাক মানুষ হাইস্যা খুন। আপনারাই তাইলে রায়ট বাধাইবার মানুষ। আপনারা এ্যাহন বিদায় হন। আমরা আমাগ মইধ্যে কথাবার্তা কইয়া ঠিক করি—আমরা কে কে হিন্দু আর কে কে মুসলমান, তার বাদে আপনাগ খবর দিব।’
রসিকলাল জিজ্ঞাসা করে যোগেনকে, ‘এইগুলা এডডু সনতারিখ বসাইয়্যা এজাহারের নাগাল লিখ্যা নিলে ভাল হইত না যোগেন?
‘খুবই ভাল হইত। আমি জায়গার নাম লিখছি। কিন্তু স্যায় তো হব সব আমাগ কথা। ইগো এজাহার হইলে এভিডেন্সের দর কত উঠত—’
সে-কথাডা কবি তো?’
‘কেমন কইরা কব কাকা? আপনি কহন আমারে কইছেন যে আপনে আমারে নিয়্যা কোথায় যাবেন না, আর কোথায় যাবেন।
‘অ্যাহন কী করা যায়?’
‘কিছুই না। দরকার তো শাদা কাগজ। সেডা তো শ্রাবণ মাসের মাষকলাই থিক্যাও দুর্ভিক্ষ।’
‘কয়্যা দেহি না!’
‘তার থিক্যা আমার কথাডা শুনেন। আমি এগ নাম আর হালসাকিনডা নিয়্যা রাখি। আর আপনে এগ কইয়্যা দ্যান এজাহারের বিষয়ডা কী।’
‘ঠিক কইছস, সেইডাই করি। আরে সাধে কি আর প্র্যাকটিস করি নাই। এত সব নিয়ম মনে রাখা যায়?’ রসিকলাল বিএ বিএল হওয়ার পরও কোর্টে মাত্রই দুই-একদিন গিয়েছিলেন, তারপর সিআর দাশকে ধরে কর্পোরেশন স্কুলের মাস্টারি নেন। রসিকলাল বলে ওঠেন, ‘শুনো আমাগ খালি হাতের অতিথ্ পাইয়্যা তোমরা সবাই মিল্যা যে এই গল্পডা বানাইল্যা, সেইটা মণ্ডলমশায় লিখ্যা রাইখছে। অ্যাহন তোমাগ নামগুল্যা কও। এদিনে তো গনা হইছে নিশ্চয় যে তোমাগ কারা এক পোয়া হিন্দু আর কারা এক পোয়া মুসলমান। বাছাধনগণ, এইবার স্যায় নামগুল্যা কও দিনি।
‘এজাহারডা শুনান। মণ্ডলমশায় কী লিখছেন?’ কেউ বলে; ‘তারপর তো নাম।’
‘মণ্ডলমশায় তো ইংরাজিতে লিখছেন। সেইডা পইড়লে কি তোমার বুঝনের সুবিধা হব নে?’
‘চারি পাকে শুইন্যা-শুইন্যা ইংরাজি আওয়াজ তো চিন্যা ফেলছি কত্তা। ইংরাজিতেই কন।’
‘আরে লিখছেন তো মনে-মনে। বড়-বড় উকিল যারা, তারা বাংলা-আওয়াজ শুইনতে শুইনতে ইংরাজি কইর্যা নেয়। না অইলে তাগ কানেও ঢুকে না, মাথায়ও ঢুকে না। উকিলবাবুর কান আর মাথাডা তো তোমার ঘাড়ে ফিট করা যাব না। গেলে, দেইখতে পারতা, স্বচক্ষে, বাঁ কান দিয়া বাংলা কথাগুলা হুহু কইরা ঢুকতাছে আর ডাইন কান দিয়্যা ইংরাজি হইয়া উইঠতেছে। সে-যা দৃশ্য। অ্যাহন বাবা ত্যা তোমাগ নামগুলা বলো। আমরা লিখ্যা লই।’
ভিড়ের পেছনে একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে হঠাৎ হাত তুলে বলে ওঠে, ‘খাড়ান দি, খাড়ান দি। আমার কাছে নামগুলা আছে।’ বলেই সে ভিতরদিকে ছুটল আর-একটা তক্তা কাগজ ফড়ফড়িয়ে ফিরে আসে। গত ভোটের একটা ভোটার লিস্টের একটা পাতা, কার্বন কপি করা। এ দিকের গ্রামের জন্য মেয়েটিকে দিয়ে করানো হয়েছিল, এই অনিবার্য কারণে যে এই এলাকায় সেই একমাত্র মেয়ে যে ক্লাশ ফাইভে পড়তে কাছাকাছি কোন-একটা জুনিয়ার হাইয়ে যায়।
রসিকলাল জ্বলজ্বলে মুখে কাগজটি হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর যোগেনের দিকে বাড়িয়ে ধরে। যোগেন দেখেই বলে ওঠে, ‘কা হা, এডা তো আরো ভাল হইল। লিখ্যা দিব—ভোটার লিস্টের এত নম্বর হইতে এত নম্বর ভোটার। এজাহারের মেরিট বাড়ব। নাম দিল্যামই না ধরেন।
রসিকলাল হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘নামগুল্যা যহন পাওয়াই গিছে তহন আর দেরি কইর্যা কাম নাই। আরে, আমাগ ভাত দিব্যার কও। যে শাকখান আখায় তুইলছে, সেডা না হইলেও হইব। আমাগ তাড়া আছে গ।’
‘শাক তো দূরস্থান, খাড়ান, বিছন ছিটাই’, বলে মাতবর বাড়ির ভিতর দিকেই ছুটল।
‘ভুল হইয়্যা গেল নি?’ রসিকলাল নিজের মনে বলে ওঠে অথচ কেউ যদি জবাব দেয় তেমন একটা আশাও আছে, ‘চোরামনকাঠি হইয়্যা এইহানে আইলেই হইত। অ্যাহন কি দিয়ারা দিয়্যা যাওয়া চলে।’
‘অ্যাহনও যদি দিয়ারা হাঁইট্যা যান, তাইলে দিয়ারায় পানি থাইকব কহন?’
রসিকলাল তখন যোগেনকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমি তো তরে আমার সন্দেহডা প্রকাশ করি নাই। তর মনে কি সন্দেহ কিছু উইঠছে?’
‘উইঠব্যার পারে। কিন্তু রুমালডা অ্যাহনো দেহি নাই। সেইডা দেহান।’
‘আমারে ইয়াগো বানাবার চাস, বানা, কিন্তু রুমালডা পাইলে তো শেষ পর্যন্ত যাবি?’
‘কাহা, শ্যাষ পর্যন্তডা কদ্দূর। আমার আঙুলের জোরই বা কত—এইসব তো মাপা হয় নাই। জানাডাও তো একডা কাম।’
‘তাইলে চলেন, সেই আসা আসেন কিন্তু খবরডা ক্যান যে দ্যান না!’ বলতে-বলতে মাতবর এসে দাঁড়ায়।
ভিতরে, ওরা বসেছিল ও কথা বলছিল একটা ঘরের পেছনে বসে, তার পাশ দিয়ে ঢুকলে দুয়ারটাকেই ভিতর বলা যায় যদি, ‘একটা পিঁড়ি আর একটা ভাঙা মোড়া পাতা। পাশে একটা বড় ঘটিতে জল। যোগেন বসতে যাচ্ছিল মোড়াটায়, রসিকলাল বলে ওঠে, ‘যোগা, তোর সাইজ আইটব না রে মোড়ায়, প্র্যাকটিশ লাগে, দেহিস না কোমরকাইত্যা।’
মাতবর দুটো মাটির সানকি এনে এদের সামনে দেয় আর-এক বৌ মাটির একটা বড় হাঁড়ি নিয়ে এসে এদের সামনে বসে উটকো হয়ে, হাঁড়ির ভিতর হাত ঢুকিয়ে মুঠো করে ভাত তোলে।
ভাতের সঙ্গেই কয়েকটা কাঁচালঙ্কা আর ছোট পেঁয়াজ পড়ে সানকিতে। এক মুঠো ভাত মুখে দিয়ে পেঁয়াজে কামড় দিয়ে রসিকলাল বলে, ‘নুন দে রে।’ মাতবর নিজেই দৌড়ে নুন নিয়ে আসে। যে ভাত দিয়েছিল সেই-ই একটা পাতিল নিয়ে এসে সেটা কাত করে দুজনের পাতে ডাল ঢেলে দেয়।
‘মাতবর রে, তোগো কৃষক পার্টি তো জমিদারি তুইল্যা দিল। আইন আইনছে।’
‘উইঠা গিছে? নাকী উইঠব-উইঠব করে? হাটে শুনছিলাম।’
‘এইডা তো ভাল কইছেন মাতবর। উঠানের আগে তো জানা চাই আছেড়া কনে? মইর্যা গিছে? তালি তো কাঁধে তুইলবারই লাগব—গোরেই দ্যাও আর চিতায় দ্যাও। আর যদি গর্তে কাদায় হাঁটু ভাইঙ্গ্যা পইড়্যা থাকে, তালি তো হিশাব কইরব্যার লাগব—উঠানের খরচা আর দফনের খরচা কোনটা কম?’ যোগেন বলে।
‘আছিল্যাম যে-আন্দাজে সেইডা যহন মিল্যাই গেল তহন কয়্যা যাই, চোখকান খোলা রাখিস, হিন্দু-মুসলমানের কাইজ্যা….
বাধা দিয়ে মাতবর বলে, ‘রায়ট।’
রসিকলাল হাসিমুখেই সংশোধন মেনে নেয়, ‘হ্যাঁ, রায়ট বান্ধাইব্যার ষড়যন্ত্র চারি পাকে। বাইরের লোকগ ঢুকব্যার দিস না। তগ নামডা উইঠল ক্যা?’
‘কথাডা তো ভাবছিল্যাম হাসিঠাট্টার কথা। ভিতরে যে এতখান তা তো বুঝি নাই,’ মাতবর বলে।
‘বুইঝছিল্যা ঠিকই। নাইলে দানসামগগিরি ফিরত দ্যাও? আরে ভৈরব পারায়্যা নোয়াপাড়া যাই?’
‘তাছাড়া যাবেন কোথ দিয়্যা। দিয়ারায় তো অ্যাহন সরোবর, মাস তো শ্রাবণ’
‘নাও নাই?’
মাতবর একটু ভেবে বলে, ‘কাম কী? আমাগ তো ঐ দিকে চলন নাই। দিয়ারাও নাও আইটক্যালে। তার থিক্যা ঘুরাই যান।’
শিমুইল্যা থেকে উত্তরপুব ধরে হাঁটতে-হাঁটতে ভৈরব পার হতে হল দুই জায়গায়, আরাবপুর হয়ে ওরা নোয়াপাড়ায় পৌঁছায়। যোগেন তার ঘড়ি দেখে বলে, ‘তিন ঘণ্টার উপর। মাইল দশবার, না কী? এইডাই তো যাতায়াত?’
‘এই পথে তো দশ মাইলের উপর, পনের মাইলের নীচে। বর্ষা ছাড়া তো দিয়ারা শুখা। দিয়ারা দিয়্যা আর কয় মাইল—ধরো মাইল পাঁচ।’
‘রায়টটা হইল কবে লিখছে?’
‘তারিখ মনে নাই—জ্যৈষ্ঠের শ্যাষ বা আষাঢ়ের শুরু। তহন কি দিয়ারা দিয়া যাতায়াত চলে?’
‘তা কওয়া যায় না। একটুআধটু বৃষ্টিতে, বা, পুরা বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরও কয়েক দিন না গেলে দিয়ারা দিয়া যাতায়াত বন্ধ হয় না।’
‘মাত্বর তো কইল—এদিকে অগ আসাযাওয়া কম। তাইলে তো নোয়াপাড়ার মানুষেরও আসাযাওয়া বাড়ার কুনো কারণ নাই। সদর যশোর তো বরাবর দক্ষিণে। তাইলে, কাহা, যদি রায়ট বাঁইন্ধ্যাই থাহে, তাইলে কি রায়ট করার লগে মানুষজন মাইল পনের দৌড়াইয়্যা শিমুইল্যা যাইব? ক্যা? লোক কয়ডা শিমুইল্যার—হাতগনতি তো। শিমুইল্যায় তো হিন্দুমিশন গিছিল রিলিফ নিয়্যা। অবিশ্যি অগরো ইনফরমেশন গ্যাপ ঘইটতে পারে।’
‘এডা কিন্তু আলাদা আসন, রিজার্ভ না, কাস্ট হিন্দুগ, মানে খোলা। অ্যাহন তো গ্রামের দিকে যাওন যাইবে না। টাউনে আমাগ পার্টি অফিসে চল্।’
‘আপনাগ পার্টি অফিস?’
‘ক্যা? এ বোকা, আমি না এই ভোটে চাঁড়াল হইল্যাম শুদ্ধি কইর্যা। তার আগের থিক্যা আমি বরাবরের কংগ্রেস। তুই ক্যামনে ভুলিস।’
‘ভুলি নাই, কাহা। মুহূর্তের বিভ্রম। চলেন আপনাগ অফিসেই। অগ খোলা মনে কথা কইব্যার দিবেন। ধমকাইয়া উইঠবেন না। আমার পরিচয়ও আড়াই হাতি কইরবেন না। আমি ঝগড়াঝাঁটি কইরলে উইঠ্যা পড়বেন।
‘থো তুই। উইঠব ক্যা? আমি তো জিলা কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট। অবিশ্যি সন্ধ্যা ঘন হইলে যশোর ফেরার ব্যবস্থা করা কঠিন হইব।’
নোয়াপাড়া বড় জায়গা, ঝিকরগাছার মত বড় না হলেও। আবার, লাউজানির মত রাজবাড়ির ভগ্নস্তূপও নেই। নতুন জায়গা, গঞ্জ টাউন। শেড দেয়া গুদামঘর আছে, আগে ছিল নীলের, এখন পাটের। ‘কংগ্রেস ভবন’ সেই পাটগোলার কোণে, কাঠের দোতলা, বাইরে দিয়ে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে দোতলার কাঠের বারান্দা। সেখানে যে দু-তিনটে ঘর, সেটাই নিশ্চয় অফিস। অবিশ্যি নীচেও হতে পারে অফিস। কংগ্রেসের তো আবার নানা শাখা আছে—খদ্দর, হরিজন সেবা, বন্দীমুক্তি, কৃষক সমিতি।
রসিকলাল যে-ঘরে ঢুকলেন সেখানে একটা ফরাশ পাতা। বেশ কয়েকজন ভদ্রলোক বসে আছেন। একজন বসেছিলেন এঁদের মুখোমুখি, একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে। রসিকলালকে দেখেই তিনি ‘আসুন রসিকদাদা, বসুন।’ আরো দু-এক জন উঠে দাঁড়ালেন। একজন কাছে এসে বললেন, ‘এইটা কী হইল দাদা। আমি তো সেই কবে থেইকে শুইনছি রসিকদা না কী যশোরে। আবারও শুইনছি রসিকদা নাকী যশোরে। ভেইবেছি এখন তো আইনসভা খোলা। কাজেকর্মে আসাযাওয়া।’
রসিকলাল লাজুক হাসিতে সেই ছেড়েদেয়া তাকিয়ার সামনে আধাআধি যায় ও বসে পড়ে। তারপর হেসে বলল, ‘তাইলে তো আমারে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে শাস্তি দিব্যার লাগে। শাস্তিডা তো আমিই ঘোষণা কইরব—অ্যাহুনি মুড়ি তেল ও কাঁচালঙ্কা সহযোগে আনা হৌক ও তার পরে চা আনা হৌক।’ পকেট থেকে একটা দুই টাকার নোট বের করে একজনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
যোগেন পেছনে বসে পড়েছিল।
রসিকলাল প্রথমেই কথাটা তুলে ফেলে, যেন এই অফিসটা, এই লোকজন—এটা তার নিজের জায়গা, নিজের বন্ধুবান্ধব। যোগেনের এটা মনে হয় ও সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে শুধরয়। যেখানে কাকা যায়, কোনোখানেই কি বাইরের লোক থাকে?
‘রসিকলাল প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা, নোয়াপাড়ায় তো পেপার আসে?’
‘এইডা একডা কথা হইল, দাদা?’
‘না। পেপারে একের পর এক খবর পেত্তেক দিন, যে যশোরে নাকী দাঙ্গায় নরমুণ্ড গড়াগড়ি যাইচ্ছে। তোমাগ চোখে এই খবর আসে নাই।’
‘হ্যাঁ। কেন আইসব না? ঠিক কথাই তো লিখছে।’
‘মুকুন্দ, আমি ঠিক ভাইব্যাই তো নামের লিস্টি বানাইয়া ঘুইরতেছি। কুথাও তো দাঙ্গা দেইখল্যাম না। দাঙ্গা মানে কাইজ্যা নয়। দাঙ্গা মানে রায়ট। হিন্দু-মুসলমানগ।’
‘সে যে-নামেই ডাকেন গোবর তো গোবরই।’
‘আমি তো কই নাই মুকুন্দ, গোবর আসলে গোবর না। কেউ-কেউ অবশ্যই কয় গোবর মানে অ্যান্টিসেপটিক। এইডা বোধয় হিন্দুগ গো-ব্রাহ্মণ্য হিতায়।’
‘আপনে কন নাই হয়ত। কিন্তু এমন লোকোই তো বেশি যে হইল একডা হিন্দু-মুসলমান কাইজ্যা, কইল আরে এডা প্রাইভেট।’
‘এডা তুমি ঠিকোই কইছ। আমি ডর খাইছি—বেবাক প্রাইভেট কি পাবলিক হইয়া গেল? সাম্প্রদায়িক ছাড়া কাইজ্যা নাই?’
‘সেইডাই তো রসিকদা হিন্দু মিশন ধরাইয়্যা দিল।’
‘কও তো, ভাই। ধরাইলডা কী? আমাগ পুরুষক্রমে বসবাস। আমরা জাইনল্যাম না, আর তারা জাইন্যা গেল? কও তো মুকুন্দ, কী জানাইল?’
‘দাদা, আমি তো ঠোঁটকাটা, মুখের কথা বার হবই। সেডা সবাইগ শুইনতে ভাল লাগবে না। ছড়ামারা আর কুইল্ল্যায় কী হয় নাই। হিন্দু মেয়েগো গায়ে হাত তুইলছে শ্যাখরা—’
‘হয়। তোমার কথাডা কী মুকুন্দ? মাইয়াগ, মানে, অনাত্মীয় মাইয়াগ গায়ে হাত দিয়া খারাপ–সে হিন্দুই হোক আর শ্যাখই হোক। না কী হিন্দু ছাড়া আর-কেউ হিন্দু মাইয়াগ গায়ে হাত দেয়াড়া খারাপ।’
সবাই এমন একসঙ্গে হেসে ওঠে যে কথাটার কোনো ওজন থাকে না।
হাসিটা শেষ হলে, আর-একটা গলায় শোনা যায়, ‘মুকুন্দ্যা, গায়ে হাত দেয়ার আগে জাইত জিগায়্যা নিয়ো।’
ফলে আর-একটা হুল্লোড়। ইতিমধ্যে মুড়ি এসে গেছে। মনে হল, আড্ডার বিষয় বদলে যেতে পারে। কিন্তু মুড়ি খাওয়ার মধ্যেই রসিকলাল বলে, ‘দ্যাহো, আমার মুখে তো ওকালতি শোভা পায় না। পাশ কইর্যা তিনদিন কোর্টে গেছি। কিন্তু যোগেন তো আছে, চেনো তো তোমরা, নাম কইরছে ওকালতিতে। ওরা ভাল কইব্যার পারব। ফৌজদারিতে একটা ঘটনার কনটিনিউইটিই কিন্তু আসল। ধরো, একজন কইল, তার নিজের চক্ষুতে দেখা কুইল্ল্যায় শ্যাখরা এক শুদ্দুরের ছাওয়ালরে পিট্যায়া অজ্ঞান কইর্যা ফেলছে, তারপর লাস গুম কইর্যা ফেলাইছে। সে দৌড় পাইড়া শুদ্দুর পাড়ায় গিয়্যা খবর দ্যায়। শুইন্যা কী হইব? তারাও ছুইট্যা আইসব। ধরো, এইডা তিনডা-চাইরডা আলাদা-আলাদা ঘটনাও হব্যার পারে। বিষয়ডা হইল—এই কনটিনুইটি প্রতিষ্ঠা করা। এই যোগা, হেল্প কর্, না কী শুইন্যা হাসতছস?’
‘ভাইবতেছি, আমি আপনের উলটা পক্ষের উকিল হইলে আমার নির্ঘাত পরাজয়,’ যোগেন বলে। একটু চুপচাপের পর একজন বয়স্ক গলায় বলে, ‘হিন্দু মিশন কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যেকটা লোককে জিজ্ঞাসা করে, তার কথা লিখে, তারপর সত্যমিথ্যা যাচাই করেছে। এখন কাগজে দেখে আমরা বলছি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেটা কিন্তু যাচাই না করে বলছি। কেউই ঘটনাস্থলে যাই নি। একটা কথা বোধ হয় স্বীকার করতেই হবে, হিন্দু মিশন এই এলাকায় আসার পর হিন্দুদের মনে জোর এসেছে। ভারত সেবাশ্রমও আছে।’
‘এর সঙ্গে কি শুদ্ধিও করছে?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে।
‘ঠিক জানি না। আমি কাউকে দেখিনি যাকে শুদ্ধি করা হয়েছে। তবে শুদ্ধি তো শুনেছি অপশন্যাল। কেউ যদি ইচ্ছা করে, করতে পারে।’ একটা খাঁকারি তুলে বয়স্ক গলাটি থামে।
তরুণ আর-একটা গলায় শোনা যায়, ‘এ তো প্রত্যেকের নিজস্ব মত। তেমনি অন্য মতও তো আছে। হিন্দু মিশন একটা হিন্দু চেতনা তৈরি করছে। সেটা বোধহয় সাম্প্রদায়িকতাকেই সংগঠিত করবে।’
মুখটা বাড়িয়ে রসিকলাল বলে, ‘কেডা কও ভাই, মুখখান দেখাও।’
লম্বা একটি ছেলে দাঁড়ায়, ‘তোমারে তো ঠিক—’ এই পর্যন্ত রসিকলাল বলতেই একজন বলে দেয়, ‘গৌর। অবনী ডাক্তারের ভাইয়ের ব্যাটা। কলকাতায় এমএ পড়ে না ল? কী পড় গৌর? এমএন রায়ের চেলা।’
গৌর বলে, ‘এমএ। কিন্তু পূর্ণ জ্যাঠা, আমার পরিচয়টা তো ঠিক হল না। এখন তো আমরা কথা বলছি সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক নিয়ে। এটাই আমাদের দেশের প্রধান বাধা করে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। সেই সঙ্কট মেটাতে সকলেই নিজের-নিজের মত চেষ্টা করছেন। গান্ধীজি অস্পৃশ্যতা দূর করে সব মন্দিরে হরিজনের প্রবেশাধিকার চেয়েছেন। মুনজে-সাভারকর এঁরা স্বীকারই করছেন না, হিন্দু ছাড়া কোনো জাত আছে ভারতে। মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা মনে করেন, মুসলমানদের উচিত নয়—ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয় পরিচয় করে তোলা। আবার অনেকে বলছেন—ভারতীয় জাতি বলে কিছু নেই, আমাদের দেশে দুটো মাত্র জাত আছে, হিন্দু আর মুসলমান। এমএন রায়ও একজন নেতা। তাঁর একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংগঠন আছে। তিনিও এই জাতিপরিচয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, এ সব বেদ-পুরাণ-মনুসংহিতায় লেখা নেই, কুরআন শরিফ বা শরিয়তেও লেখা নেই, এসবই সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র। পূর্ণ জ্যাঠার কথায় মনে হল উনি আমাকে একটু ঠেস দিয়ে এমএন রায়ের চেলা বলে পরিচয় দিলেন।’
রসিকলাল ব্যগ্র হয়ে বলেন, ‘তোমার কথাডা কও বাবা। কথাডা দরকারি। ঠেসঠুস খুব দরকারি নয়। আমাদের সমাজে আদর জানাইতেও ঠেস দেয়। পূর্ণ দা কি তোমারে ঠেস দিব্যার পারেন? কত গৌরব কইর্যা কইলেন—এমএ পড়ে, এমএন রায়ের চেলা। তুমি কথাডা কও, গৌর। মনে হইল, তুমি য্যান হিন্দু মিশন নিয়্যা একডা অন্য কথা ভাইবছ। সেইডা কও। ভুল আমাগও হব্যার পারে, তোমারও হব্যার পারে। কিন্তু কথাডা তো জানা দরকার। কও।’
গৌর তার হাঁটুদুটোতে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে বলে, ‘আমিও তো কলকাতার কাগজে প্রত্যেক দিন এই রায়টের খবর পড়তে-পড়তে গোলমালে পড়ে গেলাম। তাই এই কদিন আগে এসে দেখি—এখানে রায়ট বা দাঙ্গার কোনো চিহ্নও নেই। লোক্যাল ঘটনা তো কিছু ঘটতেই পারে—পুব পাড়া আর পশ্চিম পাড়ায়, দক্ষিণ পাড়া আর বটতলায়। যেহেতু আমাদের জনসাধারণ চব্বিশ ঘণ্টা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও পেট ভরে খেতে পায় না তাই নিজের ছোট-ছোট অধিকার সে আঁকড়ে ধরে ও একইরকম আরো কিছু মানুষ পেটে একইরকম খিদে নিয়ে সেই অধিকার বোধটাকেই ধরে নেয় তার অধিকারহীনতা। আল নিয়ে, গাছের ডাল নিয়ে, পুকুরের মাছের ভাগ নিয়ে আর এর গরু ওর খেতের ফসল নষ্ট করা নিয়ে সবচেয়ে বেশি হাঙ্গামা হয়। যদি আপনি চান, তাহলে এইসব হাঙ্গামাকেই রায়ট বলতে পারেন, কারণ, আমাদের জিলায় মানুষ বলতে এই দুই জাতের মানুষকেই বোঝায়। মুসলমানরা বেশি। হিন্দুরা কম। হিন্দু মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ এই বিভেদের সুযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাঁরা একটা খুব প্রতিশোধকামী ও শক্তিমান হিন্দুর ধারণা গ্রামে-গ্রামে প্রচার করছেন। হিন্দুরা এতে স্বস্তি পেতে পারেন। আমার ‘রায়ট’টা যদি আর-এক জন করে দেয়, তাহলে স্বস্তি তো হবেই। ‘হিন্দু মিশন’ও ‘সেবাশ্রম’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তাঁদের যদি একবার মেনে নেয়া হয়, তাহলে তাঁদের এই কথাও মানতে হবে যে আমাদের দেশটা হিন্দুদেশ। বংশানুক্রমে যে-মুসলমান প্রতিবেশীর সঙ্গে আমি পাশাপাশি আছি সে হয়ে যাবে বিধর্মী। আর, মিশন বা সংঘের গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে যে অজানা অচেনা একটা লোক আসবে সে হয়ে যাবে আমার স্বধর্মী? মিশন বা সংঘ বেছে-বেছে এইসব জিলাতেই আসছে কেন—যেখানে হিন্দু বসতির চাইতে মুসলিম বসতি অনেকগুণ বেশি। তাঁরা মধ্য ও উত্তর বঙ্গের হিন্দু প্রধান জিলাগুলিতে যাচ্ছে না কেন? মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, বীরভূম—এইসব জিলায় তো সিকিভাগও মুসলমান নেই। তাই সেখানে মিশনও নেই। এমন কী যেখানে আট আনি মুসলমান, সেখানেও নেই, মুর্শিদাবাদ-দিনাজপুরে। হিন্দু সাম্প্রদায়িক এই সংগঠনগুলি যে মুসলমান প্রধান পূর্ববঙ্গের জিলাগুলিতেই তাদের এই সব হিন্দু জাগরণ ও শুদ্ধির আন্দোলন করছে তার একমাত্র উদ্দেশ্য হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা।’
গৌরকে থামিয়ে দিয়েই প্রায়, বৈকুণ্ঠ বসুরায় বর্মণ চিৎকার করে ওঠে, ‘এইসব কথাই কি এহন কংগ্রেসের কথা হবে রসিকলালবাবু। যে-হিন্দুরা কংগ্রেসরে তৈরি করছে, বঙ্গভঙ্গ উলটাইছে, আইনঅমান্য কইরে জেলখানা ভইরছে, সেই হিন্দুগ মুসলমানগর আক্রমণের মুখে ছাইড়ে দিতে হব। কংগ্রেসের কয়ডা মুসলমান নেতা বা কর্মী আছে? হিন্দু মিশন তো কংগ্রেসের সংগঠন না। তাইলে হিন্দু মিশনের কাজকর্মে কংগ্রেসের নাক গলানোর কী হইছে?’
রসিকলাল বারবারই হাত তুলে বৈকুণ্ঠবাবুকে থামানোর চেষ্টা করে। শেষে সে-চেষ্টা ছেড়ে দেয়। বৈকুণ্ঠবাবু থেমে গেলে রসিকলাল একটু সময় যেতে দেয়। তারপর স্বাভাবিক নিচু স্বরে বলে, ‘বৈকুণ্ঠবাবু, কংগ্রেসের নীতি তো আমরা ঠিক করনের অধিকারী না। আমরা তো সৈনিক আর নীতিনির্ণয় তো ওয়ার্কিং কমিটির বিষয়, প্রেসিডেন্টের বিষয় আর সবাইয়ের উপুরে মহাত্মাজি। স্থানীয় ঘটনা নিয়্যা একডা কথা বিনিময়ে গৌর তার কথা কইলে এত রাগ কইরলে কী কইরে চলে। হ্যাঁ, এডা তো ঠিক কথা, হিন্দু মিশন বা সেবাশ্রম কংগ্রেসের সংগঠন না। তাগ ব্যাপার ঠিক করার অধিকার আমাগ নাই। কিন্তু তাদের কাজকামের ফল নিয়্যা তো কথা না কইলে চলে না—’
একজন রসিকলালের কথার মধ্যেই পেছন থেকে হাত তুললে রসিকলাল থেমে গিয়ে, ‘ভোলাদা, কিছু কবেন বোধহয়।’ ভোলাদা নামে চেনা এই মানুষটি আন্দামান খেটে সবে ছাড়া পেয়ে যশোরে এসে আছেন। কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করেন। সকলেই তাঁকে মেনে চলে যদিও তিনি কাউকেই কিছু উপদেশ বা আদেশ দেন না। রাজনীতির কথাও কম বলেন। চেনাজানা মানুষজনের বাড়ির লোকজনের খবর রাখেন ও খবর নেন।
‘হ্যাঁ। গৌর আর বৈকুণ্ঠবাবুর মতপার্থক্য শুনে কথাটা মনে এল। বলে ফেললে হয়ত সোয়াস্তি পাব। না-হলে মনের মধ্যে ঘুরবে। গৌর আর বৈকুণ্ঠবাবুর দুইজনের কথাই সত্য। এটা বোধহয় আমাদের জাতীয় অবস্থারই সত্য। গান্ধীজির আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অবদান- মুসলমানদের খিলাফৎ আন্দোলনের সঙ্গে অসহযোগকে মেলানো। তার পরিণতি ভাল হয়নি ও মাত্র দশ বছর পরে গত আইন-অমান্যে মুসলমানরা যোগ দেননি। সেই ব্যর্থতাগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে অতীত আন্দোলনের গৌরব কমানো ঠিক নয়। বৈকুণ্ঠবাবু সেই ভুলটাই করছেন। কংগ্রেস আমাদের একমাত্র জাতীয়তাবাদী পার্টি। সেই পার্টির পক্ষে সরাসরি বা আড়াআড়ি হিন্দু বা মুসলমানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখালে আমাদের সর্বনাশ। তেমনি গৌর যে-কথা বলেছে, সেটা বইয়ে ছাপা সত্য। কোনো লোকের ভূতের ভয় তো যুক্তি দিয়ে তাড়ানো যায় না। হিন্দু বা মুসলমান যে-সমাজই হোক, পুরো সমাজটা যদি হিন্দু বা মুসলিম ভূতের ভয়ে নিশিদিন আতঙ্কে কাটায় তাহলে তাদের সঙ্গ দিতে হবে-ভয়টা তাড়ানোর জন্য। সেই সঙ্গ যদি কংগ্রেস দিতে না পারে, তাহলে হিন্দু মিশন বা সেবাশ্রম বা জামাত বা আনসার বাহিনী সেই সঙ্গটা দেবে। একমাত্র কংগ্রেসই সেটা পারে—ধর্মের আশ্রয় থেকে দুই সম্প্রদায়কে রাজনীতির আশ্রয়ে আনতে।’
রসিকলাল বলে ওঠে, ‘ভোলাদা, আপনি আপনার যোগ্য কথাই কইলেন—কাজডা কী? আর করবে কেডা?’
কেউ একজন বলে, ‘এখানে না-হয় হিন্দু-মুসলমান, লখনৌতে তো শিয়া-সুন্নি দাঙ্গা গবমেন্ট, গভর্নর, ভাইসরয়, ইউপি কংগ্রেস, মন্ত্রিসভা সব কিছুকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মুসলিম লিগের মুখে তালা। মানে বলছি, একই ধর্মের দুই অংশের মধ্যে দাঙ্গা তো রাজনীতি দিয়ে মিটছে না। পাঞ্জাবে খালশা-আকালি ঝামেলা। সেখানে যেহেতু মুসলিম সরকার, তাই সরকারের মুখে তালা। ভোলাদার কথাটা বুঝতে চাই–বললেন-না ধর্মের আশ্রয় থেকে রাজনীতির আশ্রয়। সমাজটা যদি ধর্মটাকে রাজনীতির প্রধান বিষয় করে নেয়, এমন কী একই ধর্মের শাখাপ্রশাখা যদি উলটো রাজনীতিতে চলে যায়, তাহলে কী হবে ভোলাদা।’
‘ভোলাদা বলেন, ‘লখনৌয়ের শিয়া-সুন্নি কিন্তু রাজনীতি দিয়েই মিটল। এটা ওয়ার্কিং কমিটির বাহাদুরি।’
কেউ জিজ্ঞাসা করে, ‘এখানে শিডিউল্ড কাস্টরা যদি কাস্ট হিন্দু থিকে বাইরে চইল্যা যায়, তাইলে বাংলায় কংগ্রেসের নীতি কী হইব?’
রসিকলাল একটু হেসে বলে, ‘সেডা তো গান্ধীজি কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের সময় দিয়্যা থুছেন—হিন্দুদের মধ্যে বর্ণ-অবর্ণভেদ সৃষ্টি হলে আমি প্রাণ দিব। তার উপরই তো পুনা প্যাক্ট বর্ণ-অবর্ণভেদ স্বীকার ও হিন্দুগ মধ্যে উভয়ের স্থান নির্ধারণ।’
যোগেন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, ‘কাহা, অ্যাহন না-বারালে যশোর পৌঁছবার দেরি হব না?’
রসিকলালও দাঁড়িয়ে পড়ে।
সবাই মিলে নীচে নামার পর কী করে যশোর ফেরা হবে তা নিয়ে নিয়ে কথা উঠতেই ভোলাদা বলেন, ‘বাস আছে এখনো, চলেন-না।’
ওরা ভোলাদার সঙ্গে এগয়।
পেছন থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, ‘ভোলাদা অ্যাহন যশোরের টাইম টেবিল, বাসের, ট্রেনের, নৌকার। চক্কর মারেন তো মারেনই।’
ভোলাদা ডান হাত তুলে পেছনের রসিকতাটাকে অনুমোদন করেন। যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘কী খোঁজেন ভোলাদা।’
ভোলাদা একটু হেসে বলেন, ‘খোঁজাখুঁজি আবার কী? বসে থাকলে তো হাতেপায়ে খিল ধরে যাবে।’
রসিকলাল বলে, ‘কালাপানির জেলখানায় খিল খুইলতেন ক্যামনে?’
‘সেখানে খিলধরার টাইম কোথায়। সারা দিনই তো ব্যস্ত। ব্যায়াম, পড়াশুনো, এ ওর পড়া নেয়া, ফুটবল খেলা—’
যোগেন বলে, ‘ফুটবল?’
‘হ্যাঁ। শিল্ড-লিগ দুটোই। কতগুলো টিম।’
ওরা বাসস্ট্যান্ডে এসে গিয়েছিল।
বাসটা স্টার্ট দিতেই ভোলাদা ‘চলি’ বলে নেমে গেলেন। ওদের দু-জনকে নিয়েই বাসটা সগর্জন চলতে শুরু করে। এটা বাসগুলোর জিরব্যার জায়গা, টাউনে একটা পাক দিয়ে প্যাসেঞ্জার তুলবে। তবে, বিকেলের ট্রিপে আপের প্যাসেঞ্জার কম। এখন সব ডাউনের প্যাসেঞ্জার। কতক্ষণই-বা লাগবে যশোর পৌঁছুতে।
সগর্জন বাসে পাশাপাশি বসে রাস্তার ধাক্কায় সারা শরীর দোলাতে দোলাতে ওরা যাচ্ছিল। যোগেন বলল, ‘আপনের কাম তো হইল, যার লগে আমারে ডাকছিলেন?
‘হ্যাঁ। তা হইল। আরো একটু ঘুরান দিলে কাজডা আরো ভাল হয় কী না ভাবছি। তুই কী বলস?’
‘আমার আর লাগব না। এইহানে পৌঁছায়াও বুঝি নাই—কোন্ কামে আমারে ডাইকছেন। বুঝি প্রথম লাউজানিতে।’
যোগেনের কাঁধ বেড় দিয়ে হাতটা ছড়িয়ে রসিকলাল বলে, ‘তুই বুঝবি না? তোর তো কুকুরের মত ঘ্রাণশক্তি, শিয়ালের মত প্রবেশশক্তি আর শুশুকের নাগাল শ্বাসধারণ শক্তি।’
‘কাহা, আমি আইজ বরিশাল এক্সপ্রেস ধইরা কইলকাতা ফিরি। আপনে কি পারবেন, আইজ?’
‘পাইরলেও তোর সঙ্গে যাব না। দুইজনে একসঙ্গে থাকলি সারা দিনের কথা উঠবই। তোরে ক্যা ডাইকল্যাম বইল্যা তুই বুঝলি—সেই কথাডা আমি শুইনতে চাই না। সেইড্যা বুইঝ্যা সারাদিন ধইর্যা তুই কী দেখলি সেডাও শুইনতে চাই না, আমি কী দেইখল্যাম সেডাও কইতে চাই না, প্রথম আইস্যা যে-ঘুরান দিচ্ছিলাম তখন কী দেইখল্যাম তাও কব্যার চাই না। শুইনবারও চাই না। তোরে একডা জাতকের গল্প কই। এক বোধিসত্ত্বরে এক কাউঠা, না রে, ভুল কইল্যাম, এক কাউঠারে এক বোধিসত্ত্ব জিগাইলেন, কূর্মাবতারে, কচ্ছপ তো খুব দীর্ঘজীবী আর উজাইয়্যা গিয়া ডিম পাইড়্যা ভাটি সমুদ্রে ফিরা আসে। জানিস তো?’
‘গল্প জানে না কি কেউ?’ প্রত্যেকবারের শোনা তো আলাদা।’
‘বোধিসত্ত্ব জিগাইলেন, এত যে হাজার-হাজার বছর বাঁইচ্যা শয়ে শয়ে সন্তান দিলা, একডারেও তো ফুটব্যার দেখো নাই। সন্তানের কথা কহন মনে পড়ে? কুর্ম উত্তর দিল, কর্মের শেষে যহন আমার ডুবার জল, আমার ভাসার জল থিক্যা গভীর ঠেকে।’
.
যোগেন একা, জেগে। তার এই কূপেটাতে আলো জ্বালানো। দু-একবার কন্ডাকটর-গার্ড এসে দরজায় টোকা দিয়ে গেছে, যোগেন কোনো সাড়াশব্দ করেনি। নিজের এই বিনিদ্রতা, বা আরো ঠিক বললে অতন্দ্রতাকে কোনো কারণের সঙ্গে যুক্ত করতে কোনো বই বা কাগজ চোখের সম্মুখে মেলে রাখেনি যোগেন। যেন তার নিজের কাছেও প্রমাণের দরকার আছে—রাত দুটোর পর যশোর থেকে শিয়ালদা গামী বরিশাল এক্সপ্রেসে সে পাড়ি দিচ্ছে, দুই চোখ খোলা রেখেই। যেমন গল্প শুনেছে, ইঞ্জিনঘরে ড্রাইভার বা স্টোকারদের জন্য বসার জায়গা পর্যন্ত থাকে না, খাড়া দাঁড়িয়ে থেকে ট্রেন থেকে বিচ্ছুরিত তীক্ষ্ণ আলো অস্ত্রের মত ঢুকে যাচ্ছে কী করে এই প্রাকার তুল্য অন্ধকারে, তাদের দেখে যেতে হয়। বড় স্টিমারেও তাই। সবার ওপরে ক্যাপ্টেনের ঘর। সামনে মোটা লোহার চেন দিয়ে ঘেরা জনহীনতা, বাধাহীনতা। ক্যাপ্টেনের ঘরটা গোল কাচে ঘেরা। সব দিক খোলা থাকা চাই, ক্যাপ্টেনের চোখের সামনে যতগুলো দিক, যতটা অন্ধকার ও যতটা আকাশ—তার সবটা সম্পূর্ণ খোলা থাকা চাই। যোগে না ঘুমিয়ে তার জেগে থাকাটাকে উদযাপন করতে চায় না।
যোগেন যে কিছু ভাবছিল, তাও নয়। সেদিক দিয়ে যোগেন খুব নির্ঝঞ্ঝাট লোক। গুরুভার কাজের মধ্যেও খিদে পেলে সে তার অভ্যাসমত পরিতৃপ্তি পেতেই খায়। গুরুভার চিন্তা, তার ওকালতির জন্য অভ্যাসমত পান চিবুতে চিবুতে ভাবতে পারে বেশ এক, দুই করে। তাকে যদি একা-একা মাইল পনের-বিশ হাঁটতে হয় ও সেই হাঁটাপথে চর ডিঙতে হয় বা ছোট খাট খাল সাঁতরাতে হয়, সে এক ছন্দে হেঁটে চলে যায়। আজকাল অবিশ্যি সঙ্গী থাকে, তাও কোনো ব্যবস্থার ফলে না, ঐ চলল সঙ্গে অনেকটা, আবার চলল যোগেন একা, আবার দু-চারজন তার সঙ্গেই হাঁটতে লাগল। যোগেন যদি আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়, তাহলে আক্রমণের লক্ষের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সে শার্দুলের মত, তার লেজটা খুব ধীর লয়ে ধুলো ওড়াতে থাকে। যোগেন, শাদুলের মতই, চায় না কোনো এমন ঝাঁপ দিতে, যাতে তার লক্ষ পর্যন্ত সরলরেখার চাইতে তার লম্ফনের ব্যাস কম পড়ে যাবে।
যোগেনের ‘গীতা’ মুখস্ত, যেমন সমতূল্য আরো কিছু হিন্দুশাস্ত্রীয় বইপত্র। ‘এক সময় সেটাই ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষেধ প্রমাণ্য করার দুঃসাহস। সে-স্মৃতি যখনতখন কাজ দেয় এখনো। কিন্তু যোগেন সেসব উক্তি ব্যবহার করে সচেতন অস্ত্র হিশেবে। ব্যবহারের পুরো ফলটা সে কাজে লাগাতেই চায়। অথচ সেই সচেতন চাওয়া ও পাওয়া তো ঘটতে পারে অভ্যাস ও স্মৃতির জোরেই। অভ্যাস ও স্মৃতি তো সচেতনতার বাধ্য নয়। সেই অবাধ্যতায় যখন ঐ সব শাস্ত্রবচন তার ব্যক্তিগত দরকারেও মনে এসে যায়, তখন যোগেন নিজের ওপর রেগে ওঠে। এখনো উঠল। যোগেন বিরক্ত হল। যোগেন লোহার ক্রেংকারের সঙ্গে আত্মীয়তা পায়, নিশীথের লৌহক্রেংকারের অনিশ্চয়তা সে এখন গ্রহণ করতে চায়। যেন, এই ক্রেংকার ছুটে চলেছে এক অবাস্তব সর্বনাশের দিকে, প্রাকৃতিক ধ্বস-সাইক্লোনের মত। যেন এই ক্রেংকার দুটো শক্ত সমান্তরাল লোহার রেল থেকে উঠছে না। যেন, যোগেন জানে এইসব নৈসর্গিক কমলেকামিনী দৃশ্য কোন নৈর্ব্যক্তিকে দেখতে হয় ও নিজেকে সেই দৃশ্য থেকে মুক্ত করতে হয়। যেন, যোগেন জানে, আমার দেখার ওপর প্রলয় নির্ভর করে না, ন প্রমাণে সিদ্ধ, আমার না-দেখার ওপরেও না, ন অপ্রমাণে, প্রলয় শুধু তার কাছেই সত্য, প্রলয় : তু সত্য, প্রলয়ের বিপরীতে দাঁড়ালে, বিরুদ্ধস্থাপনে। ন প্রমাণে সিদ্ধ ন অপ্রমাণে/প্রলয় : তু সত্য বিরুদ্ধস্থাপনে। যোগেন সেই বিরুদ্ধস্থাপনের দিকেই ছুটছে, অন্ধকারে জেগে, ক্রেংকার তুলে।
.
ট্রেন থেকে নেমে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে প্যারী সরকারের বাড়িতে যখন ঢুকছে, তখনো যোগেনের চোখ জ্বলছে, জাগরণে, মুখটা থমথমে।
শুধু প্রত্যাশাপূরণের জন্য সে ডেকে সব, ‘উদ্দুর, খুদ্দুর, উদ্দুর, খুদ্দুর, খুদ্দুর। সিঁড়ির দিকে ছুটে আসে, উদ্দুরকে ছাড়িয়ে। কিন্তু উদ্দুর তাকে ডিঙবার জন্য আর দৌড়য় না। ছেলেটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে।
উদ্দুর মামার পাটিটা বিছিয়ে দেয়। যোগেন তার ওপর গিয়ে ধপ করে বসে। খুদদুর এক পাঁজা খবরের কাগজ এনে দেয় ও লাল রঙের একটা মোটা পেনসিল।
প্রথম কাগজটার ভাঁজ খুলে হেডিং দেখে যোগেন অবাক, ‘হক-মন্ত্রিসভার পতন আসন্ন? ‘ যোগেন আর-একটা কাগজ খোলে, তার হেডিং, ‘তপশিলি মন্ত্রিবদল কি মৃতসঞ্জীবনী?’ এটা পড়ে ফেলে যোগেন। শুধু গুজব। শুধু গুজব। আবার গুজবের যে কারণ নেই, তাও নয়। গভর্নর সম্পর্কে গুজব। কে কাকে কত টাকা দিয়েছে সে-সম্পর্কে প্রমাণহীন খবর তো বেরয়ই।
‘ভাই, ঘুইর্যা আইস্যা মনডা দুঃখী ক্যা?’
‘আচ্ছা বুন, তোমারে একডা কথা জিগ্যাই। বড় হিন্দুই কও আর শুদ্দুরগ কথাই কও, মাইয়া তো বড় জোর বার বছর বাপের বাড়ি রাখে। তার পর বিয়া দিবই। সেই নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ, স্বামী বইল্যা একডা নতুন জীব, বৌ হইয়্যা কী করার লাগে আর কী করার লাগে না তার কিছুই না-জানা বিয়া যখন বইসতে হয় তহন, তহন তোমাগ ডর লাগে না?’
একটু চুপ থেকে বোন হেসে ফেলে। সে-হাসিটুকু হাসতে যে-সামান্য দেরি হয় তাতে মনে হতে পারত, বোন বোধ হয়, কোনো কথা চাপা দিল। কিন্তু বোনের চোখের সরলতা তেমন মনে হওয়াটাকে অসম্ভব করে দেয়।
‘ভাই। জন্মের পর থিক্যাই তো বিয়্যা-বিয়্যা শুনি। বিয়্যা হওয়াডাই এক কাম। ডর আইব কোথ্ থিক্যা?’
‘বিয়্যা হইলেও তো ঐটুক মাইয়ার মনে কিছু বদল হয় না—তাই? না বোন?’
‘ও কি ভাগ-ভাগ কইর্যা ভাবনা আসে? বাপজ্যাঠা যেমন, ভাইদাদা যেমন, স্বামীও তেমন একটা কিছু। বামুন-কায়েত, মাইয়ারা আলাদা কইর্যা ভাবব্যারও পারে। অগ তো এড্ডু বড় হইয়্যা বিয়্যা হয়, স্বামীর সঙ্গে বয়সের তফাৎও কম হয়। ভাবনা ঢোকার ফাঁক আছে। এই কথাডা কি তোমার আইনসভায় উঠব?’
‘আইনসভায় কত মাথামুণ্ডু ওঠে। এডা কইলে তো একডা কাজের কথা হইত। এডডু চা হয় না বুন? ডাক্তার কই?’
‘ডাক্তারের এক রোগীর নাকী অ্যাহন-তহন, দেইখব্যার গিছে,’ বলে বোন ওঠে।
স্বভাববশত যোগেন বলে বসে পেছন থেকে, ‘ডাক্তারের কাম যে অঙ্গ লইয়্যা, সেইড্যা একবার বারাইলে তো ফিরানো কঠিন বুন।’
বোন একটু এগিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, ‘চাঁদসীর ডাক্তারগ তো এইডাই বাঁচান ভাই। কুনো এমন রোগী নাই যার আরো কয়ডা ব্যাধি না-আছে।’ যোগেন হেসে ওঠে।
নিজেকে একটু স্বাভাবিকও লাগে, যেন কাল সারা রাত জ্বরে ভুগেছে, এখন জ্বরটা নেমে যাচ্ছে। যোগেন ডেকে ওঠে, ‘খুদ্দুর কই রে?’
খুদ্দুর নতুন হাফশার্ট’, ইংলিশ হাফপ্যান্টের ভিতর শার্ট গুঁজে পরেছে, জামার গলায় একটা টাই—একেবারে ছুপানো নীলে, পায়ে চকচক করছে জুতো—ফিতে বাঁধা।
‘সে কী রে! তোরে এমন সাজান কে সাজাইল রে খুদ্দুর। ডাইকল্যাম খুদ্দুররে, কোলে বসায়্যা চুমু দিব বইল্যা আর প্রবেশ করিল এক পুলিশ-সার্জেন। চুমাডা অ্যাহন দেই কারে’,
‘এখন তোমার কোলে বসলে আমার চুল নষ্ট হয়ে যাবে।’
‘আমার চুমাডার একডা ব্যবস্থা কর্। ঝুলানা চুমা নিয়্যা কতক্ষণ খাড়ায়া থাইকব? আমি তো ভুইল্যাই যাই যে তোর অ্যাহন মর্নিং স্কুল।’
‘দাদাকে দাও তোমার চুমা।’
‘একের চুমা কি আর-কারে দেয়া যায়? চুমা আইঠ্যা হইয়্যা যায় না?’
চায়ের কাপ নিয়ে এসে বোন জিজ্ঞাসা করে, ‘বারান্ কহন?’
‘সেইডাই তো ভাবন। একবার ভাবি চিৎ হইয়্যা ঘুমাই। আর-একবার ভাবি, অ্যাহনই বারাই উদ্দুর রে—’
উদ্দুর একটা কোঁড়া ধুতি কোমরে বেঁধে আসে। তার মুখে একটা সামান্য আভাস-দাড়ির ‘ক্যা রে, তুই টাই পরিস নাই?’
‘পরব। আমাদের তো ডে-ইসকুল। ফুলপ্যান্ট।’
‘দেখো উদ্দুর, তোমরা দুই ভাই মিল্যা ফন্দি কইর্যা আমারে বাড়ির বাইরে ফেল্যাব্যার চাও? একঘরে থাকি, এক থালে খাই আর আমি তোমার ফুলপ্যান্ট আর খুদ্দুরের টাই দেখি নাই?’
‘কেমন করে দেখবে? তুমি যখন রাতে ফেরো তখন কি আমি টাই পরে আর দাদা ফুলপ্যান্ট পরে ঘুমুব?’
‘আর যে-রাইতে ফিরি না?’
‘না-ফিরলে তো দেখবেই না। ফিরলেও দেখবে না।’
‘ক্যা বাবা! ঘুমে স্বপনে?’
‘ঘুমের সময় তো তুমি চশমা পরো না। স্বপ্ন দেখবে কী করে?’ বলে খুদ্দুর মার ডাকে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। যোগেন উদ্দুরকে বলে, ‘বাবা, দ্যাখ তো, গত মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবারে স্টেটসম্যানে ভিতরের দিকে একটা খবর বারাইছিল—‘বলশেভিজম অ্যামং পেজাস’, পাইস না কী?’
‘দাগ দাওনি? কাটা হয়নি?’
‘সেডা স্মরণ নাই। খবরডা যে মনে আছে, সেইডাই কি তোমার কাছে যথেষ্ট না?’
‘যদি তারিখটা বলতে তো যথেষ্ট হত; দেখছি—’
একটু পরেই খাতার বান্ডিলটা এনে বলে, ‘দাগও দিয়েছ, খুদ্দুর কেটেওছে, সেঁটেওছে।’
‘কস কী? অর মনে থাহে?’
খাতাটা নিয়ে সাঁটা খবরটা পড়ল যোগেন। তার মনে হচ্ছিল, খবরটা ফরিদপুর নিয়ে। এখন দেখছে দিনাজপুর নিয়ে। ঠিক খবরও না, তেমন কিছু তথ্য নেই, বরং একটা মন্তব্য বলাই ভাল। দিনাজপুরের কৃষক সমিতি এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ছে ও জমিদার-চাষির ভিতরকার এত কিছু ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে যে কারো সন্দেহ হতে পারে—এগুলোর পেছনে বলশেভিক সংগঠন আছে কী না। শহর থেকে মাইল পনের দূরের একটা গ্রামে গিয়ে শুনলাম, ওখানকার কৃষক আন্দোলনের নেতা, শহরের একজন বড়লোক মোক্তারের ছোট ভাই। এখানেই থাকেন। মাঝে-মাঝে টাউনে যান। এখানে এমন নেতা না কী দূরে-দূরে আরো আছেন। তাঁদের কেউ-কেউ কখনো-কখনো এখানে আসেন। পার্টির কথা জানতে চাইলে বোঝা গেল ওঁরা সেসব জানেন না। কেউ বললেন কংগ্রেস, কেউ বললেন লিগ, কেউ বললেন হিন্দু। ওঁদের পক্ষে এর বেশি জানা সম্ভব নয়—রয়িস্ট কী না, পেজ্যান্টস পার্টি কী না, এক্স-টেররিস্ট কী না, ওয়াহাবি বা ফৈরাজি কী না। হিন্দু কথাটা বলতে বোধহয় ‘ভদ্রলোক’ বুঝিয়েছিলেন। যা হোক, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনে কৃষকদের দাম রাতারাতি বেড়ে গেছে। সব পার্টিরই কৃষক সমিতি আছে। এই ফাঁকে বলশেভিকদের অনুপ্রবেশ খুবই একটা সম্ভবপর ঘটনা। আরো কোনো-কোনো জায়গাতেও কৃষকদের সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে, যে-খবরগুলি প্রচলিত দখলদারি দাঙ্গা বা হিন্দু-মুসলমান বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ-বিষয়ে সরকারের আলাদারকমের চিন্তাভাবনা দরকার। যেসব পার্টি বলশেভিজমের বিরোধী, তাঁদেরও এ-বিষয়ে সরকারকে সাহায্য করা কর্তব্য। কারণ, বলশেভিজম সকলের শত্রু। বলশেভিজম নির্মূল করা দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক কর্তব্য’।
যোগেন উঠে ফোনের কাছে গিয়ে রিসিভার তোলে। এক্সচেঞ্জের মেমশাহেবের ‘নাম্বার প্লিজ’ শুনে শরৎ বোসের নম্বরটা বলে। রিংগুলো শুনতে-শুনতে ভাবে এই শুনবে ‘নো রিপ্লাই।’ না কী কোর্টে বেরিয়ে গেলেন? ঠিক তখনই সাড়া এল, অন্য কেউ কথা বলছেন। যোগেন নিজের নাম করে বলল, শরৎবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। ফোন যিনি ধরেছিলেন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি মিস্টার মণ্ডল এমএলএ তো?’ যোগেন ‘হ্যাঁ’ বলায় উনি একটু চেনার হাসি দিয়ে বললেন, ‘উনি তো কোর্টে বেরবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। আমি কি ওঁকে জানাব বেরবার আগে আপনাকে ফোন করতে একবার?’ যোগেনও একটু হাসি মিশিয়ে বলে, ‘কোর্টে যদি ফার্স্ট আওয়ারে ওঁর কোনো আরজেন্ট কাজ থাকে, তাইলে প্লিইজ বোলেন না। দেখা তো হবই অ্যাসেম্বলিতে’। ‘তাহলে আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই ভাল।’
যোগেন আজকের ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’র ভিতরের পাতা থেকে জানল, মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ক-দিন ধরেই মিছিলমিটিং চলছে—আগামীকাল অ্যাসেম্বলির কাছে কেন্দ্রীয় সমাবেশ ডেকেছে, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল চেম্বার অব লেবার। মানে, সারওয়ার্দি শাহেবের ইউনিয়নের শ্রমিকরা। এআইটিইউসি কিছু বলেছে কী না খুঁজল যোগেন, পেল না। কংগ্রেস হয়ত লিগের সঙ্গে কে কত লোক আনতে পারে—এমন ঝামেলায় যেতে চায় না। তা থেকে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধতে পারে, সে-ভয় তো সরকারেরও থাকতে পারে, আরো বেশি পারে। স্বীকার না-করে উপায় নেই যে প্রধানত এআইটিইউসি গতবছর কয়েক-সপ্তাহের চটকল ধর্মঘট চালিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করেছে, কিন্তু মাত্র বছর দেড়েকে সারওয়ারদি যতগুলো লেবার হাঙ্গামা ট্রাইবুন্যাল করে মিটিয়েছে, এমন আর-কেউ পারেনি। এ নিয়ে উলটো কথাও চালু আছে। সারবওয়ারদি শাহেবের আসল বন্ধু অবাঙালি ব্যবসায়ী ও মালিকরা। সারওয়ারদি শাহেবের ইউনিয়নের সঙ্গে ঝামেলা তারা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নেয় যাতে লাল-ইউনিয়নগুলোকে একঘরে করা যায়।
ফোন বেজে ওঠে।
‘হ্যাঁ। এনি বিগ টক? একটা কাজ করলে হয় না? আপনি কোর্টে চলে আসুন-না। আমি বোধহয় বাই লাঞ্চ ফ্রি হয়ে যাব। নইলে আপনাকে না-হয় একটা মামলার নথি ধরিয়ে দেব’।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি কোর্টে কিন্তু ব্ল্যাক কোটে না।’
‘আরে যোগেনবাবু, ব্ল্যাক কোটই আমাদের লক্ষ্মী। আর ধুতি পাঞ্জাবি তো দাতা হরিশ্চন্দ্র।’ হাসাহাসির মধ্যে ফোনাফুনি শেষ হয়।
শরৎ বোসের এই নজররাখাটা অবাক করে দেয়—নানা পার্টির এমএলএদের মধ্যে প্রফেশন্যাল যাঁরা, তাঁরা যাতে কলকাতার কোর্টগুলোতে কিছু আয় করতে পারেন, নইলে তাঁরা কী করে চালাবেন? শেয়ালদা কোর্টে তো শুধু এফিডেবিট করিয়ে শ-শ উকিল হাজার-হাজার টাকা রোজগার করে। কিন্তু ওঁর চোখকান খোলা। সাহায্য যেন কারো মর্যাদা হানি না করে। যোগেনকে সিভিল কোর্টের পিটিশনের কাজেই বেশি লাগান।
যোগেন সামান্য একটু দেরি করেই কোর্টে পৌঁছয়।
শরৎ বোস তাকে দেখে নিজেই উঠে বাইরে আসেন। ব্যারিস্টারদের লাইব্রেরিতে ভিতরে বসে তারা কথা বলতে পারতেন, সেজায়গা আছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে শরৎ বোস শাহেবেরও শাহেব। বার লাইব্রেরিকে তিনি কখনো তাঁর রাজনীতির কাজে ব্যবহার করেন না।
যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী? আমার অফিসে গিয়ে বসব?’
‘না। আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে আসছি। যশোরের রায়ট নিয়ে রসিক কাকা তো বেশ কয়েকদিন আগেই যশোরে যাইয়্যা সেখানেই আছেন। পরশুদিন হোম মিনিস্টারকে টেলিগ্রাম পাঠাইয়্যা আমারে পাঠাইব্যার কন।’
‘হ্যাঁ। কিরণশঙ্কর তো বলেছে আমাকে, নাজিমুদ্দিনের বাংলা প্রবাদ সহ।’
‘কাইল সারাদিন রায়ট-এরিয়ায় একসঙ্গে ঘুইর্যা রাইতে ট্রেন ধইরা আইজ আসছি। আমি কি দেইখল্যাম তা আমি রসিককাকাকেও বলি নাই। উনিও শুইনব্যার চান নাই। আমি অ্যাসেম্বলিতে এই ব্যাপারে অ্যাডজোর্নমেন্ট মোশন মুভ করতে চাই। কংগ্রেস কি আমাকে সাপোর্ট দিবে?’
‘আপনি যদি মনে করেন ব্যাপারটা এত ইমেডিয়েট—মানে একসঙ্গেই তো বেঙ্গল টেন্যান্সি, মানি-লেন্ডার্স বিল, রিলিজ রাজবন্দীদের এবং এনি ডে আমরা নো কনফিডেন্স মুভ করব। এর মধ্যে ইস্যুটা চাপা পড়ে যাবে না তো, যদি আপনি সেটাকে এতই ইমেডিয়েট অ্যান্ড আরজেন্ট মনে করেন। আমাদের সাপোর্ট আপনি নিশ্চয়ই পাবেন। নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে কথা বললে, ও-ও রাজি হবে, ও-ই তো আপনাকে পাঠিয়েছে। তমিজউদ্দিন-সামসুদ্দিন আপনার বিরোধিতা করবে না, যদি আনয়্যাভয়ডেবল পলিটিক্যাল কারণ না থাকে। ওদের সাপোর্টের ওপরই তো নো-কনফিডেন্সের ভরসা। সেটা আপনার ভাবনার বিষয় নয়। আমি ভাবছি আপনার পারপাজটা কীসে সবচেয়ে ভাল সার্ভড হবে। আপনি তো আর হঠাৎ-উত্তেজনায় কিছু ভাবার লোক নয়।’
যোগেন বলে, ‘আমি ভাইবছিলাম—আজই ফিরা আইজই অ্যাডজর্নমেন্ট চাওয়ার যে-সুবিধা সেটা মিস করব না কী। অ্যাহন এই বিষয়ে আমার যা ক্রেডিবিলিটি তা তো দুদিন পর নাও থাইকতে পারে। রসিককাকার উপস্থিতিডা দরকার, বিরাট মণ্ডলের উপস্থিতিডাও দরকার। পিআরও তো বাইরে।’
যোগেন এ নিয়ে আর-কারো সঙ্গে কোনো কথা বলে না। ইতিমধ্যে রসিকলাল বিশ্বাস তপশিলি এমএলএ-দের, সমস্ত দলের তপশিলি এমএলএদের কাছে একটা বিবৃতি বিলি করেছে। এ-নিয়ে যোগেনের সঙ্গে তাঁর আগে কথা হয়নি। তাছাড়া প্রধানত গান্ধীজির ইচ্ছেতেই কংগ্রেসের ধনঞ্জয় দাশ, তপশিলি কংগ্রেস ও সেই সুবাদেই কংগ্রেসের ডেপুটি হুইপ ও পিআরঠাকুর—নমশূদ্রদের স্বীকৃত নেতা, যোগেনের মতই, কিন্তু নেতৃত্বে যোগেনের বংশগত অধিকার নেই, পিআর-এর তুলনীয়, ও যোগেন বিলেতফেরৎ নয় পিআরএর মত; কংগ্রেস যেসব প্রদেশে সরকার চালাচ্ছে সেসব জায়গায় তপশিলিদের সম্পর্কে কেমন ব্যবস্থা নিয়েছে তা দেখে আসতে বেশ বিজ্ঞাপিত একটা ট্যুরে বেরিয়েছে, তারা যদিও ফেরেনি, তবু, কংগ্রেসি প্রদেশগুলি সম্পর্কে তাঁদের ভাল ধারণার কথা কাগজে বেরিয়ে গেছে। আইনসভার ভিতরে মুসলিম লিগের নেতারা কথা বলছেন কম। আবার, কেপিপি-র যাঁরা কেপিপি ছেড়ে আলাদা ব্লক করেছেন তাঁরা হক-মন্ত্রিসভা যে যে-কোনো দিন পড়ে যাবে, এই আশায় বেশ বাচাল হয়ে উঠেছে। এমন একটা অদলবদলের সময় রসিকলাল জানাল,
‘রাজনীতি যারা করেন তাঁরা প্রায় সকলেই জানেন, তপশিলি এমএলএ-দের সামনে একটা বিরল সুযোগ এসেছে। তাঁরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে ও ঘটনার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে তাঁরাই হবেন শক্তিসাম্যের নিয়ামক ও বাংলার ভাগ্যনির্ণায়ক।…সিন্ধু প্রদেশে যেমন মুসলমান ও তপশিলিদের একটি মন্ত্রিসভাকে কংগ্রেস সক্রিয় রেখেছে, এখানেও সেইরকম একটি মন্ত্রিসভা গঠন করতে কংগ্রেস আগ্রহ দেখিয়েছে। … মাত্র ২৫ জন তপশিলি এমএলএ যদি বিরোধী পক্ষে যোগ দেন তাহলেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে ও নতুন সরকারে তপশিলিরা অন্তত পাঁচজন মন্ত্রী পাবেন।
শরৎ বোসই ঠিক করেছিলেন, সরাসরি পুরো মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব না এনে, আলাদা-আলাদা মন্ত্রীদের বাজেটবরাদ্দ কমানোর জন্য কাট মোশন আনা হবে। সেই প্রস্তাব জিতলে সেই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। শরৎ বোস এটাও ঠিক করেছিলেন, সাম্প্রদায়িক গোলমাল যাতে না বাঁধে তাই তপশিলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কোনো তপশিলি এমএলএ ও মুসলিম মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কোনো মুসলিম এমএলএ প্রস্তাব তুলবেন। প্রায় পরপর দশটি কাট মোশন বা অনাস্থা প্রস্তাব যেন পুরো সরকারকে তছনছ করে দিচ্ছিল। ৮ আগস্ট প্রথম কাট মোশনটি তুললেন ঢাকার তপশিলি এমএলএ ধনঞ্জয় রায়, মহারাজা শ্রীশকুমার নন্দীর বিরুদ্ধে। মহারাজা ছিলেন তিলি জাতের—পেছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী।
ইতিমধ্যে মন্ত্রী, মুসলিম লিগের সম্পাদক ও খিলাফৎ কমিটির সম্পাদক সারওয়ারদি, শ্রমিক নেতা হিশেবে, মন্ত্রিসভার পক্ষে হরতাল ঘোষণা করিয়ে দিলেন ও অ্যাসেম্বলি ঘিরে ফেলে এমন বিশাল শ্রমিক সমাবেশ ঘটালেন যেমনটি এর আগে কখনো ঘটেনি। সেই শ্রমিক সমাবেশ ছিল সরকারের পক্ষে ও অনাস্থা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। মুসলিম লিগের সরকারকে যারা ফেলতে চাইছে তারা ইসলামের দুশমন। সমাবেশের ভিতরে আটকে গিয়ে লিগবিরোধী মুসলমান নেতারা মুসলমান শ্রমিকদের হাতে মার খান ও পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এই আক্রান্ত নেতাদের মধ্যে ছিলেন, হুমায়ুন কবির, আবুল মনসুর আহমদ ও আরো কয়েকজন। তাঁদের উদ্ধার করতে স্বয়ং ফজলুল হক, নবাব হবিবুল্লাহ ও নাজিমুদ্দিনকে আসতে হয়।
এ-সমাবেশ নিশ্চিতভাবেই ছিল শ্রমিক সমাবেশ, বেশির ভাগই গঙ্গার পুব পারের চটকলের। এ-সমাবেশ নিশ্চিতভাবেই সাম্প্রদায়িক। ইসলাম ও মুসলমান ছিল তাদের প্রধান বিষয় এ-সমাবেশ অংশত হলেও নিশ্চিত ছিল প্রাদেশিক। অবাঙালি শ্রমিকরাই ছিল সংখ্যায় বেশি। আর এ-সমাবেশ ছিল হাসান সারওয়ার্দির গুপ্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার ও কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের প্রথম প্রকাশ।
আবার একই সঙ্গে এ-সমাবেশ ছিল প্রায় সব ধরণের মুসলমানের—শিক্ষক-অধ্যাপক, ছোট মালিক, বড় মালিক, ঠিকাদার, খুচরো দোকানদার, রেস্টুরেন্টের ও হোটেলের বাবুর্চি, বেয়ারা, পাইকার, পাটের দালাল, কসাই, ডাক্তার, স্বদেশীকরা নারী, সকলের, সকলের, শুভেচ্ছা ও সমর্থনে লালিত ও পুষ্ট। সেই লালন ও পুষ্টি সেদিন সাম্প্রদায়িকতা, প্রাদেশিকতা, গুপ্ত দলীয়তা, রাজনৈতিক হিংস্রতা ও সংগঠনকে আড়াল দিয়েছিল। সে-আড়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মত বোধ—কোনো রাজনৈতিক দলেরই ছিল না। একমাত্র তাদেরই খানিকটা ছিল, সেদিনও ছিল, যারা কংগ্রেসের বহিরাবরণে কৃষক সমিতি গড়ছিল সারা বাংলায় সেই কিছু কমিউনিস্টের, শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ছিল বাংলার বড়-বড় শিল্পকারখানায় সেই কিছু কংগ্রেসি সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্টদের। তারা সারওয়ার্দির নেতৃত্বের রাজনীতিবিরহিত হিংস্রতার নজির তাদের নিজের-নিজের জায়গায় ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছিল—কৃষককে মুসলমান করা হচ্ছে, শ্রমিককে মুসলমান করা হচ্ছে।
বোধহয় তারা টের পেয়েছিল যে সারওয়ার্দি তার ক্ষমতা দেখাবে, তাই আরো-কিছু মিছিল সেদিন অ্যাসেম্বলিতে এসেছিল তাদের আলাদা-আলাদা দাবি নিয়ে। সেই দাবিগুলির মধ্যে প্রধানতম ছিল—’রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’
‘আন্দামান বন্দীদের ফিরিয়ে আনো,’
‘পাটের দর, বেঁধে দাও,’
‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করো’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
এই স্লোগানগুলি সেদিন এমন প্রধান হয়ে ওঠেনি যাতে শোনা যায়। কিন্তু খবরের কাগজের ওপর আলতা দিয়ে মোটা হরফে লেখা ও চাটাইয়ের ওপর সাঁটা সেই পোস্টারগুলি নতুন একটা দৃশ্য তৈরি করেছিল রাজনৈতিক সমাবেশের। সারওয়ার্দির সমাবেশের সঙ্গে এই সমাবেশগুলির কোনো সংঘাত হয়নি। তেমন কোনো অবস্থাই তৈরি হয়নি। কিন্তু কোনো সংহতির আভাসও ছড়ায়নি। সারওয়ার্দির সমাবেশ ধরেই নিয়েছিল ঐ সমাবেশগুলিও সরকারের পক্ষে। ঐ সমাবেশগুলিতে যারা এসেছিল তারা এটাই জানাতে চেয়েছিল, সরকার নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
১০ আগস্ট, ১৯৩৮-এ অবরুদ্ধ আইনসভায় দ্বিতীয়-অনাস্থা প্রস্তাব জানালেন পি.আর.ঠাকুর তপশিলি ও নমশূদ্র মন্ত্রী অধ্যাপক মুকুন্দবিহারী মল্লিকের বিরুদ্ধে।
মুকুন্দবিহারীর পরিবার ছিল নমশূদ্রদের একটা গর্বের বিষয়। তাঁরা সব ভাইই ছিলেন কৃতী। তাঁদের ডাকা হত মল্লিক ব্রাদার্স বলে। মুকুন্দবিহারীর বিরুদ্ধে অনাস্থা জানানোয় বিস্ময় ছিল—এটা কি ঘটতে পারে। পিআর এমন তথ্যপ্রমাণ হাজির করলেন যাতে মুকুন্দবিহারীর ব্যক্তিগত দোষ—আত্মীয়তোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সমবায় আন্দোলনকে নিজের স্বার্থে অকেজো রাখা—পুরো মন্ত্রিসভার দায় হয়ে উঠল।
পিআর-কে সমর্থন করে বলল, যোগেন মণ্ডল। পিআর সাধারণত স্বাভাবিক স্বরেই বক্তৃতা দেন। বাইরে থেকে সমাবেশের গোলমাল ঢুকে পড়ছিল আইনসভায়। কিন্তু আইনসভার ভিতরে একটুও আওয়াজ ছিল না, এক পিআর-এর গলা ছাড়া।
যোগেন বরাবরই একটু নাটুকে, তার শ্রোতাদের সঙ্গে খেলতে ভালবাসে। গলা যথেষ্ট তোলে। কিন্তু সেদিন ঘটল একেবারে উলটো। হতে পারে, যশোরের অনুভব তার বুকে চেপে বসে আছে। হতে পারে, সে এই আইনসভার কাছে তার বেদনা ও আশঙ্কাটুকু জানাতে চায়। এমনও হতে পারে, সে যেন সর্বনাশের আঁচ পাচ্ছে। যোগেনের বিদ্রূপ সকলে পছন্দ করে, অথচ, যোগেন কোনো বিদ্রূপ করছিলই না। যে, যোগেন তার গলা নীচে বেঁধে রেখেছিল। যেন বাইরের সমাবেশগুলির আওয়াজ ও গোলমাল সভাগৃহে বেশি করে ঢোকাতে চাইছিল।
যোগেন যেন ছেড়ে-ছেড়ে বলছে, যা বলছে তার অতিরিক্ত কোনো তাৎপর্যের ইশারা দিতে। ‘মানুষের সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস অবিরত শ্রেণীযুদ্ধের ইতিহাস। এই মন্ত্রিসভায় ছ-জন মন্ত্রী আছেন যাঁরা বাংলার শীর্ষ স্থানীয় নবাব ও রাজা। কারো কারো নামের আগে সত্যি-সত্যি স্যার, নবাব, মহারাজ এসব পদবী আছে। আমি তো শূদ্র। আমার কী অধিকার আছে বামুনের পৈতে মাপার—কোন বামুনেরটা হাঁটু পর্যন্ত, কোন্ বামুনেরটায় বেশি গ্রন্থি। তেমনি আমার মত শূদ্রের জানার অধিকারই নাই ঐ স্যার, নবাব, মহারাজা, পণ্ডিত, মৌলবি—এই সব পদবীর কোনটা বাপঠাকুরদার কাছ থেকে পাওয়া, কোটা কোকালে কোন্ সুলতানের কাছে পাওয়া, কোটা কোন্ পরীক্ষায় পাশ করে পাওয়া, আর কোন্টা নিজেকে নিজেরই দেয়া। নিজেকে তো দেয়াই যায়—নামের আগে একটা নাম। তেমন স্বকৃত নামের ভারে এই রাজা-গজা-খাজা মন্ত্রিসভা এত ভারাক্রান্ত যে তাঁদের কেউ, এই বারজনের মন্ত্রিসভার একজনও বাইরের ঐ সর্বহারা শ্রেণীর মানুষের সমাবেশের সামনে গিয়ে, যদিও এই সমাবেশের একটা বড় অংশই জনাব হাসান সারওয়ার্দিকে বাঁচাতে এসেছে, যারা এসেছে তারা শ্রমিক, এই মন্ত্রিসভা মালিকদের, তাই কেউ তাদের সামনে, নিজেদের সমর্থকদের সামনে দাঁড়াতে পারবেন না। মুকুন্দবিহারী মল্লিকও জাত্যা শূদ্র, বৃত্ত্যা ব্রাহ্মণ, লোভেন বৈশ্য, আত্মীয়তোষনেন ক্ষত্রিয়।
‘এই সরকার যেন গরিবের সরকার, হকশাহেব তাই ফকিরির জোব্বা? পরেছেন। প্রধানমন্ত্ৰী ফজলুল হক শাহেব ফকিরের ভেক ধরেছেন—যাতে তাঁকে ন্যায় ও সাধুতার অবতার ভাবা হয়। তাঁর ন্যায় ও সাধুতা শুধু কথায়, কাজে নয়। একটি ঘটনা বলি। একটা সরকারি নির্দেশ প্রচারিত হয়েছে প্রতি চারজন হিন্দু সরকারি কর্মচারির পিছনে একজন তপশিলি জাতির কর্মচারী নিযুক্ত হবেন। এই করে সাম্প্রদায়িক অনুপাত রক্ষা করা হবে। সেই সুবাদে যশোর জিলার মগুরা থানার কুইল্ল্যা গ্রামের এক শুদ্দুরের পোলা কনস্টেবলের শিক্ষানবিশির চাকরি পায়। পুলিশের নিয়ম রান্নার জন্য রেশন দেয়া হবে, রান্নার ঘরও দেয়া হবে কিন্তু রান্না করতে হবে স্বহস্তে। এই নমোর ছেলে তো দুপুরে ভাত রাঁধে ও খায়। বিকালবেলায় শোনে উচ্চবর্ণের হিন্দু পুলিশরা আপত্তি করে যে একই ছাদের নীচে রান্নার ফলে তাদের স্পর্শদোষ ঘটছে। এইটুকু কথা যখন আমি হোম মিনিস্টারকে জানাই—উনি এর শাস্ত্রীয়বিধান জানার জন্য সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের মত জানতে চান। জানা যায়, এক ছাদের নীচে বিভিন্ন জাতের রান্নায় কোনো স্পৰ্শদোষ ঘটে না। যদি রান্নার জায়গাগুলিকে দেয়াল দিয়ে পার্টিশন করা থাকে, তাহলে স্পর্শদোষের প্রশ্নই ওঠে না। আর, যদি রান্নাঘরগুলিতে একটা ফুটো করে দেয়া হয়, তাহলে স্পর্শদোষ বরং স্পর্শগুণ হয়ে যায়। এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়েছেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই পরামর্শ আমাকে দেখিয়েছেন। কিন্তু যে-নমশূদ্র ছেলেটিকে একবেলার জন্য পুলিশের চাকরি দেয়া হয়েছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তাকে আর খুঁজে বের করতে পারলেন না। গান্ধীজি যখন কংগ্রেসশাসিত প্রদেশ গুলিতে অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইন বানাতে বলছেন, তখন আমাদের বাংলায় এসে তিনি দেখে যেতে পারেন, হিন্দুদের অস্পৃশ্যতার শিকড় কত গভীরে। তার শেষ চৌকিদার এক ছোট থানার অশিক্ষিত হিন্দু কনস্টেবল। সে-ও পারে মহামান্য ব্রিটিশ সম্রাটের আদেশে নির্মিত প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের সরকারের আইনসভায় পাশ করা আইন উপেক্ষা করতে।
‘যশোরের রায়ট নিয়ে আপনারা প্রতিদিন কলকাতার কাগজে নতুন-নতুন খবর পাচ্ছেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় মেম্বার রসিকলাল বিশ্বাস প্রায় সপ্তাখানেক যশোরে ঘোরেন, দুদিন আগে আমাকেও ডেকে পাঠান। আমরা দু-জন মিলে খুঁজলাম কিন্তু যশোরে কোনো রায়ট পেলাম না। কলকাতার কাগজদের হিশেব অনুযায়ী ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের এই বছরের ফেব্রুয়ারি দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা মুসলমান ৫, হিন্দু ৯। মার্চের টাঙ্গাইল দাঙ্গায় কাগজের হিশেবে নিহতের সংখ্যা হিন্দু ৫। যশোরের এই এখনকার দাঙ্গায় এখন পর্যন্ত ৮ জন হিন্দুর মৃত্যুসংবাদ বেরিয়েছে। এই হিশাবপত্র বলা বাহুল্য হিন্দু কাগজগুলিতে বেরিয়েছে। আমরা এই প্রত্যেকটি জায়গায় গিয়েছি, কোনো একটি জায়গাতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। গত বছরে তুলনীয় সময়ে জমির আইল, পুকুরের ঘাট, আমগাছের শিকড়, গরুর অনুপ্রবেশ—এইসব ঘটনা যত ঘটেছিল ও ঘটে থাকে, আশ্চর্যের ব্যাপার, এবার তার একটিও ঘটেনি। অথচ যে-দাঙ্গার নামগন্ধও গতবার ছিল না, এবার পুলিশের খাতায় সেই দাঙ্গার ফলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে এই চারটি জিলায়—যশোর-খুলনা-ঢাকা-ফরিদপুরে ৩৭।
‘হিন্দু কাগজগুলি হিন্দুহত্যা বাড়িয়ে দেখানোর কারণ হিন্দুদের মুসলমানবিরোধী দাঙ্গায় জড়ো করা। পুলিশের খাতায় যাবতীয় অপরাধ মুসলমান ও শূদ্রদের নামে এজাহার করা। পুরো পুলিশ সার্ভিসে একজনও মুসলমান আইপিএস নেই, বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে আছেন দু-জন, জুডিসিয়াল সার্ভিসে ছিলেন একজন, তিনিও রিট্যায়ার করেছেন। আর, তপশিলি? আমার মনে হয় এ প্রশ্ন মনে-মনে তোলাও ঠিক নয়। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। এমন স্বর্গরাজ্য আর কোথায় মিলবে? যে-চৌকিদার গিয়ে চোর ধরছে, সে হিন্দু, জেনারেল। যে পুলিশচৌকিতে গিয়ে সে সোপর্দ করছে সেই সাব-ইনস্পেক্টার, গোঁড়া হিন্দু, সম্ভবত ইউপির। যে-ইনস্পেক্টর কোর্টে পাঠাবেন তিনিও হিন্দু-জেনারেল। যে-মুন্সেফের কাছে প্রথম মামলা উঠবে, সে-ও হিন্দু-জেনারেল, নবশাখও হতে পারে। তাহলে তো বাকি থাকল চোরটা আর জাতদুটো। একটা লোকের কি দুটো জাত হতে পারে? না, একেবারে, তা না। তবে ভদ্রলোকদের মধ্যে কম। চোরটাকে হয় শূদ্র না-হয় মুসলমান হতেই হয়।
‘আমাদের এই অনাস্থা প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ঠিক হয়ে গেছে প্রথম প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে। ১৩৫ জন ভোট দেবেন এই সরকারের পক্ষে। তার মধ্যে ২৩ জন ইয়োরোপিয়ান ব্লকের। বাংলায় ইয়োরোপিয়ান জনসংখ্যা ০-১ শতাংশ। আর তাঁদের এমএলএসিট মোট সিটের এক দশমাংশ, ২৫ জন। তাঁদের রাখাই হয়েছে গভর্নর শাহেবের রিজার্ভ ফোর্স হিশেবে। সেই ২৩টি ইয়োরোপিয়ান ভোট ও ২টি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভোট বাদ দিলে দাঁড়ায় সরকারের পক্ষে আছেন ১০৫ জন নির্বাচিত সদস্য। আর সরকারের বিপক্ষে আমরা ১১১জন। ইয়োরোপিয়ান ব্লকের আশ্রয়ধন্য এই সরকার কতটা আত্মসম্মানজ্ঞানহীন যে ইয়োরোপিয়ান ব্লকের আশ্রিত পোষ্য হয়ে মন্ত্রী থাকতেও তাঁদের আপত্তি নেই।
‘থাকবেই-বা কেন? প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য বাঁটা হয়েছে শাহেবদের কথা ভেবে। বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট-এর সংশোধন হয়েই চলেছে শাহেবদের স্বার্থে। মহাজনি বন্ধের আইন বেরিয়ে গেছে শাহেবদের স্বার্থে। আর শাহেবদের স্বার্থ যাতে রক্ষিত হয় তার জন্য হক-মন্ত্রিসভা হুজুরে হাজির ও হিন্দুমিশন, হিন্দুসভা এইসব সাম্প্রদায়িক সংগঠন দূরদূরান্তে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করছে। একটা স্থায়ী দাঙ্গার পরিবেশে, শাহেবদের স্বার্থ সবচেয়ে নিরাপদ থাকে।
‘কিন্তু আমরা দায়িত্ব সহ আইনসভায় আজ ঘোষণা করতে চাই—কোনো নমশূদ্র বা রাজবংশী, বা তপশিলি জনগোষ্ঠীর একজনও আর উঁচুজাতের হিন্দুদের জীবনমান রক্ষা করতে মুসলমানদের সঙ্গে দাঙ্গা করবে না। হিন্দু-ঐক্য একমাত্র তখন সরব হয় যখন বর্ণহিন্দুরা আক্রান্ত হন। আমরা হিন্দু না।’
