৫৬. যোগেনের স্ত্রী-সম্ভাষণ
খাওয়ার পর খালে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে-না-আসতেই ফাঁকা
পাড়ার যারা, তারা তাদের বাড়ির দিকে চলে গেল। বাড়ির যারা তারাও কেমন আলগা হয়ে গেল। একটি মেয়ে এসে আলো দেখিয়ে যোগেনকে বাইরের দিকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে জিগগেস করে ‘কিছু আর লাগবে নি?’ যোগেন দেখে, কাঠের চৌকিতে পাতা বিছানা, বালিশসহ। সে তাড়াতাড়ি বলে, ‘কিছু লাইগব না। এডডু খাড়াও, এডডু—’
বলে সে পাঞ্জাবিটা খোলে, কোথায় ঝোলাবে খুঁজতেই মেয়েটি যোগেনের হাত থেকে নিয়ে দরজার পাশের একটা পেরেকে ঝুলিয়ে দিল। যোগেন ধুতির কষের বাঁধন একটু ঢিলে করে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে, ‘তুমি তো আলো নিয়্যা যাব্যা? যাও গা। আমার আর-কিছু লাইগব না?’
‘দরজায় খিল দিবেন না?’
‘ও তুমি বাইরে থিক্যা শিকল টাইন্যা দিয়ো।
চিৎ থেকে যোগেন কাত হয়। তার অভ্যেস অনুযায়ী এই কাত থেকেই কাল সকালে সে দাঁড়িয়ে পড়বে। সেই ঘুমটার ভিতর ঢুকে যেতে সে মাত্র এইটুকু ভাবতে পারে, ‘ম্যায়-না আইছে তার বৌরে দেইখতে, পোয়াতি বৌ বৌ তো দেইখল না এমন অবস্থায় কি রাত্রিবাস নিষিদ্ধ। বিহানে দেইখব—’
কিন্তু তাকে রাতেই দেখতে হল, কুম্ভকর্ণের মত অসময়ে হঠাৎ জেগে উঠে। তার কীর্তিত সব ইন্দ্রিয়শক্তির গভীরতম নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া তো এমন ঘুম আসতে পারে না। সেই ঘুমের ভিতর সে তাঁতির ঘরের নতুন শাড়ির গন্ধ পায়, আওয়াজও শোনে। তারপরই জেগে ওঠে। ঘরে খুব চাপা একটা আলো–হয়ত এমন আলো থাকেই এ ঘরে—লণ্ঠনের আলোতে তখন যোগেন বুঝতে পারেনি। যোগেন চমকায় না। শুধু ঘাড়টা ফিরিয়ে দেখে, ‘আরে? তুমি? অনেকক্ষণ আইছ? ডাকছ? বসো। আলোডা রাহো কোথাও—’
কমলা দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল, আলোটা তার মুখে পড়েছে। আলোর আভায় তার পেটটাকে দেখাচ্ছে ঢাউস। যোগেন বিছানা থেকে নেমে আলোটা ধরে। আর-এক হাতে কমলাকে ধরে, বাহুতে, বিছানায় এনে বসায়। পেটটা তাও একটু কম উঁচু লাগছে। যোগেন সারা ঘরে আলোটা রাখার কোনো জায়গা পায় না। শেষে, আলোর কেরসিন-ভরার জায়গাটাতে একটা ব্র্যাকেট পায়, পেরেকে ঝুলনোর মত। সে পেরেক থেকে তার পাঞ্জাবি খুলে ছুড়ে দেয় বিছানার ওপর, তারপর ডিমলাইটটা লাগিয়ে দেয়—লেগেও যায় লাইটটা, যেন প্রতিরাতেই এমন লেগে থাকে। যোগেন দুই হাত কচলে বলে, ‘বাঃ’। কমলার দিকে ফিরে বলে, ‘ঘুমাইতে আইসতে এত দেরি যে আর-একজনের এক ঘুম শ্যাষ? না, ঘুম তো ঘুমায় জাগার লগেই। তোমার শরীর খারাপ না তো? শুইয়া পড়লে আরাম হইব? তায় শোও না, শোও।’
‘না। আমি শুব না। মা কইছে এই সময় আপনার সঙ্গে শোয়া ভালো না।’
‘পাইল্যা কুথায় আমারে? দেখাশোনাই হয় না, তার আবার শোয়ার শুভক্ষণ আর কালবেলা!’
‘দেখাশুনা হবে ক্যামনে? আমার তো পাখা নাই। আপনি-যে সেই মাঘ মাসে চইল্যা গেলেন, তারপর ছয় মাস তো মানুষডার কুনো খবর নাই—’
‘এমন তো হয়ই কমলা, যারা কইলকাতা কি ঢাকায় কি অন্য কোথাও চাকরি করে তাগো খবর তো নয়মাসে ছয়মাসে একবারই মেলে। ছাড়ান দ্যাও ঐ কথা। তোমার শরীর ভালো আছে তো?’
‘অ্যাহন ভালো। প্রথম তিন-চাইর মাস খুব কষ্ট গিছে। বমি আর মাথাঘোরা। মায়ে আর কাহিমায় সারাইয়্যা তুইলল। আপনার শরীর গতি ভালো থাকে তো?’
‘দেইখ্যা কী ঠাহর হয়?’
‘খুব কি খাটনি?’
‘তোমারে যদি কেউ শুধায়, প্যাটে বাচ্চা-ধরা খুব কি খাটনি—তুমি কী কইব্যা?’ কমলা যোগেনের দিকে চোখ তুলে তাকায় ও হাসে। বলে, ‘আপনি বসেন’, কমলা তার পাশের জায়গাটায় হাত রাখে।
যোগেন বসতে-বসতে বলে, ‘আমি কই—বৌ দেইখতে আইল্যাম শ্বশুরবাড়ি, দেখি শুদু খুড়শাশুড়ি—’
কমলা হেসে হাত তুলে হাসি চাপা দেয়, ‘আইলেন তো বেলা গড়াইয়া! আপনি কি মুখে-মুখে ছড়া বানান?’
‘তুমি কি আমারে কবিগানের কবি ভাইবল্যা? ধু-র।’
‘খাওয়ার সময় যে বেবাকরে হাসাইয়্যা ডুবাইলেন?’
‘তুমি শুইনতাছিলা? হাসতেছিলা?’
‘সবাই-ই তো। আমিও তো। মা-কাহিমারা কইতেছিল আপনার নাগাল বড়মানুষ হয় না—’
‘বড় কী সে? খাওয়ায় না শরীরে?’
‘বড় কাহিমা কইছিল—দেহা সুখ, খাওয়াইয়া সুখ, শুইন্যা সুখ—’
‘তুমিও তাই ভাব? না, একটু বেশি ভাব?’
‘বেশি আর কী ভাবব?’
‘ধরো, ছুইয়্যা সুখ—
‘কমলা ফিক করে হেসে ফেলে বলে, ‘পা দুইডা তোলেন।’
‘ক্যা? পা ধইরা কি টাইনব্যা?’
‘নিচু হইয়া সেবা দিতে আমার কষ্ট হয় না?’
‘ও সেবা দিব্যা? দ্যাও’—যোগেন দুই পা তুলে জোড়াসনে বসে। দুই হাত দিয়ে তার দুই পা সাপটে কমলা প্রথমে কপালে, তারপর চুলে, তারপর সারা মুখে মাখে।
‘সেবা য্যান এডডু বেশি ঠেহে—’
‘মাইপলেন কী দিয়্যা? য্যান রোজই সেবা নিব্যার আয়েন—’
‘রোজ আইলেও সেবা অ্যাই থাইকত?’
‘থাইকত কি না-থাইকত সেডা মাইপবেন ক্যামনে আপনি? আপনার আগমন তো বছরে একবার সূর্যগ্রহণ। সেডার তাও এডডা তারিখ পাঁজি-পঞ্জিকার থাহে। ঠাকুরগ থিক্যা জানা যায়। আপনারডা তাও যায় না।’
‘যার যা কাম কমলা। ধরো আমাগো গাঁয়ের কী তোমাগো গাঁয়ের যে-সব মানুষ খালাশি-লশকর হইয়া জাহাজে পাড়ি দ্যায়—কুনো সংবাদ নাই, আছে কি নাই সেই সংবাদডাও নাই, বছর পুইয়্যা যায় ফিরা আইসতে। কী করব? কাম তো কইরব্যার লাগল। কামের ফূর্তি যদি চাও তো কামের ভারও তো বইব্যার লাগব। না?’
‘এইডা তো এডডা অবিচার।’
‘কোনডা?’
‘এই-যে আমি খেইলতেছিলাম বারদুয়ারে, ভাঙা খুপড়ির টুকরা লইয়্যা, ছয় কোটে ফাল পাড়া খেলা। বড়খড়ি আইস্যা ডানা ধইরা টাইন্যা নিয়্যা কয়, চল, বিয়া বসবি। তারপর থিক্যা আপনার দেখাসাক্ষাৎ পাই-বা-না-পাই, সংবাদ তো আমার এগডাই। আপনে। এইডা এড়া অবিচার না? সারাডা জীবন, সারাডা মরণ একজনের সংবাদই কেবল সংবাদ। সেই মানুষডার সাক্ষাৎ তো কোনো এক লাল পরশুদিন—
‘আমাগ অবস্থা তার চায়্যা সুবিধার হবার পারে। যদি আমি তোমারে চিঠি লিহি। বড়-বড় অক্ষরে লিখলে তুমি তো পার, পইড়তে? পার না?’
‘পারি-বা-না-পারি, অক্ষর বড় হউক আর ছোট হউক—ঐ কামও কইরবেন না। চিঠি লিখবেন না। বিয়াতী মাইয়ারা বারমাস বাপের বাড়ি থাইকলে আর নিন্দা কী? তার যদি চিঠি আসে, তাইলে বড় অপবাদ হয়।’
‘কইছে? অ্যাহন তোমার কাছে আমার বাদ-অপবাদের গল্প শুইনব্যার হবে? যত্ত কুলনী বামুনগো বাড়ির গল্প নিজের গল্প ভাবো?
‘কুলীন মাইয়্যার লগে আমার তফাতডা কী?
‘স্যায় কুলনী, তুমি কুলনী-না—এর বেশি তফাতের কাম আছে নাহি?’
‘তারও সাক্ষাৎ নাই, আমারও সাক্ষাৎ নাই—এর বেশি মিলের কাম কী?’
‘কমলা, গেলা তো হাইর্যা। কুলীনের মাইয়্যা তার স্বামীর লগে কোনো সংবাদ পায় না, কোনো সংবাদ নাই। শুদু সাক্ষাৎ আছে। সারা জীবনে একবার বা দুইবার। বা, তেমন ভাইগ্য থাইকলে বছরে-বছর পালখাওয়া একবার কইর্যা। আর জামাই যদি নিজের বদলে নাপিত পাঠায়—তাইলে সাক্ষাৎও তো বকলম। মিল পাওনি তোমার লগে?
সেই ডিমলাইটটার ছোট্ট এক টুকরো চিমনির মাথার একচিলতে ঘেরটায় কালি পড়ছিল। আলোও যে কমে আসছিল, তা এরা বুঝতে পারে না।
যোগেনের চোখে গৃহস্থ অশ্লীলতার ঘোর লাগে।
‘নাপিত ক্যান? নাপিতের কামডা কী?’ এমন একটা আয়াসে কমলা তার বাঁ বাহু ছড়িয়ে বাঁ হাতের ওপর মাথা রেখেছিল—যাতে বোঝা যায় না, নাপিতের গল্পটা সে জানে কী জানে না।
খুব করে হেসে যোগেন গিয়ে ডিমলাইটটা নিবিয়ে দিয়ে ফিরে আসে। কমলা বলে, ‘বড় খুড়িমা নিষেধ দিচ্ছে, সাতমাসে পইড়া গেলে স্বামী-স্ত্রী এক বিছানায় থাহে না—’
‘তুমি যে জিগাইল্যা—নাপিত ক্যান? নাপিত কুলীনের বংশবৃদ্ধি করে। কুলীন-বংশ ধ্বংস হইয়্যা গেলে নাপিতই-বা খাইবে কী, কুলনীই-বা খাইব কী।’
‘বড় খুড়িমা নিষেধ দিছিল।’
আলো শরীরে কতটা বোঝাবুঝি বইয়ে দেয়, অজানিতে, সেটা ঠিক ঠাহরে আসে না—শরীরের কোনো একটা ছোট শিরাও তো আলোতে পলকের জন্যও থেমে থাকে না, এখানে, খাগবাড়িই হোক, আর মৈস্তারকান্দিই হোক, আর পটুয়াখালিই হোক, আর বরিশালই হোক পয়লা পাখিটা ডাকে সকাল সাড়ে চারটেয়, এদিকে। গলাটা যেন পুরো বল পায় না। ছানাপাখি হয়ত। একবার ডাকল-কী-ডাকল না, চুপ করে গেল। আশুবাবুর ঘড়ি থাকলেও কতটা চুপ করে থাকল, মাপা যায় না—আলো নেই। বড়সড় শক্তপোক্ত একটা টর্চ কলকাতা থেকে কিনে আনায় আর আটক কোথায়? কোথাও আটক নেই। তবু যোগেন কখনো আনে না। এত বছর ধরেই আনে না যে না-আনার কারণটাই এখন অনেকগুলি আকার নিচ্ছে—তার নিজের কাছে ও আরো দশজনের কাছে। নিজের একটা আলাদা আলো কি জ্বালানো যায় এমন প্রাকৃতিক অন্ধকারে? তাহলে তো তার শরীর অন্ধকারে কর্মময় হয়ে উঠতে পারবে না—সেই অন্ধকার, হাই তোলার আওয়াজ বা নিজের শরীরে সশব্দ কোনো চাপড় বা কোনো উদ্গার বা কোনো নিদ্ৰাক্ত ‘বন্ধু জয় বন্ধু’ ডাক, সেই অন্ধকার। যোগেন প্রথম ট্রামের নামকীর্তনের মিলিয়ে যাওয়া শুনতে কান খাড়া করে না, শ্বাস গোনে—ক-শ্বাসের পর সেই পয়লা পাখি আবার ডাকবে। যোগেন ডান হাতটা বাড়িয়ে কমলাকে বেষ্টন করে নিজের দিকে ফেরায় আর তার শ্বাসের সঙ্গে কমলার শ্বাস মিশে গিয়ে পাখি কতক্ষণ পরে ডেকে উঠছে সেই হিশেব-রাখার উপায় বিপর্যস্ত করে দেয়। না, বরিশালেও পাখির ডাকে রাত ভাঙে না। খুলনা লাইনের প্রথম লঞ্চটা ছাড়ে অন্ধকার থাকতেই—রিক্সা আর ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ পাওয়া যায়। পাখিটার দ্বিতীয় ডাকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে কমলা কথা বলে ওঠে, ‘আইজ কি আগৈলঝরায় নতুন ইশকুল খুইললেন?’ পাখির শিসের হিসেব পরে দেখা যাবে ভেবে নিয়ে যোগেন গুনগুনিয়েই জবাব দেয়, ‘তুমি নি, সারা রাইতই জাগরণ?’
‘জাগার সময় তো হইলই। না? বড় খুড়িরে কী কইর্যা মুখ দেখাই? এত কইর্যা না কইরল! আমি বরং অ্যাহনই উইঠ্যা যাই—’
‘তাতে কি লজ্জা বাঁচব? কী য্যান কইল্যা ইশকুল নিয়্যা? নতুন ইশকুলের কথা উঠে ক্যামনে? পুরানাডাই তো ভাইঙ্গ্যা পইড়তেছে।’
‘আপনে কি ঘরামি? ভাঙ্গা ঘর তুইল্যা দিবেন।’
‘তালি তো মাইনতে হয়—ঘরডা সারাইবার ইচ্ছা কারো আছে। মাস্টারও নাই। ছাত্তরও নাই।’
‘বৌদিদি মিছা কথা কয়।’
‘কোন্ বৌদিদি?’
‘আপনে তো ঘরের কাউরেও চেনেন না। মিটিঙের মানুষ হইলে চেনেন। বৌদিদি মিটিঙে যায় নাই—সারা দিন মিটিঙের কথাই কইল। কান এক্কেরে ঝালাপালা। কয়—নিজের ছাওয়ালের লগে মণ্ডল ইশকুল খুইলবার লাগছে।’
‘কথাডা তো ভুল না কিছু।’
‘আমিও শুন্যাইয়া দিচ্ছি। পুত্রের জইন্য ভাবে না কেডা? মণ্ডলমশায়ের দোষড়া কী?’
‘কইল্যা? এই কথা?’
‘ক্যান কইব না? কথাবার্তার রীতনিত্ নাই। মণ্ডল-মণ্ডল যে কইতে নাই, এই শিক্ষাডা ও নাই। তবে, বৌদিদিও আমারে পালটা ঝামটা দিছে।’
‘বাবা, এ তো দেহি সতিন-ঝগড়া। কইল কী?’
‘কইব আবার কী! কইল—ছাওয়ালের সাধে ইশকুল করাইলি—বারাইলে দেখলি মাইয়্যা। তহন? আপনাগো ইশকুলে কি মাইয়্যারা পইড়বার পারব না?’
‘আরে, এমন যে এডডা কথা উইঠব্যার পারে, সেডাই তো শুইনল্যাম এই প্রথম। আইন তো দেহি নাই।’
‘আইন না-থাইকলে একখান আইন লিখ্যা বসাইয়া দিবেন।
মনে হয়, লোয়ার প্রাইমারিতে এমন নিষেধ নাই। আপার প্রাইমারিতে থাইকব্যারও পারে। কী কইরলে যে কার ভালো হয়—সেইডা দিনে দিনে গোল পাকাইয়া উঠছে।’
‘যার যার ভালো স্যায় স্যায় করুক। আপনার কী কাম?
‘ধরো, আইন হইল, বা ধরো আইন আছে, যে ছাওয়াল-মাইয়্যারা একই ক্লাশে পইড়বার পারব। যেই তুমি কইব্যা অমনি সব মুন্ডু নাড়াইয়্যা চিল্লান ধইরবে—মাইয়াগুলার পর্দা না দেয়া হারাম।’
‘মুসলমানগ বোধহয় এইসব বেশি।’
‘তুমি তো মুসলমান না। তালি তুমি ক্যান পড় নাই?’
‘আমরা তো বামুনও না। আমরা তো টুপশালি।’
‘এই নামডা কবে জানা হইল? টুপশালি হয় কারা?’
‘খ্যাড়ে কুটে আগুন জ্বালাইয়’।
‘পেত্নী বইসছেন আলগোছ হইয়্যা।’
‘আপনেই নাকী এইসব বানাইছেন। যারা হিন্দুও না, মুসলমানও না, তারা টুপশালি।’
‘তুমি হিন্দু না? তাইলে সিদূর দ্যাও ক্যা?’
‘যার সাইজবার সাইধ জাগে স্যায় দ্যায়। আমাগো জাইতে কি বামুন-কায়েতগ লাগান কপাল-সিঁথি টকটকাইয়া চলে? খুব হাউস হইলে বিবিগ নাগাল টিপ পরে।’
‘তাইলে দুর্গাপূজায় যাও ক্যান?’
‘যাইলেও য্যান যাইবার দিচ্ছে। বড় আইলের নীচে খাড়া হইয়া থাইকতে হয় ‘অ্যাহন তো গান্ধীজি কইয়্যা দিছে—সব পূজায় আর মন্দিরে, অচ্ছুৎগ, মানে মেথর-ডোমগো, কী য্যান তুমি নাম কইল্যা রূপশালি—’
‘রূপশালি তো ধান। টুপশালি হইল জাইত।’
‘গান্ধীও তো এডডা নতুন নাম দিছেন—হরিজন। মানে, বামুনরা তো কয় অচ্ছুৎ, তাই গান্ধী কইলেন—হরির মানুষ।’
‘টুইকব্যার দিলেই ঢুইকব্যার যাবে নে কেডা? অগো দ্যাবদেবতারে দ্যাহেন না—দুই হাতে-দশ হাতে মানুষ মারে-কালী, দুর্গা। আমাগ ঐ দ্যাবতাগুলার নিকট নিয়া গেলে কি ডর ভাঙব, আমাগ? তার থিক্যা ইদ ভালো।’
‘ইদ আবার ভালো কও ক্যান? হিন্দুগ নিয়্যা কথা উইঠলেই মুসলমান টানার কী আছে? মুসলমান ছাড়া হিন্দু হয় না? নাকি হিন্দু ছাড়া মুসলমান হয় না?’
‘আমি কইছি—আমরা যারা টুপশালি তাগো লাইগ্যা ইদ সুবিধা। বামুন-কায়েত নাই, ছোঁয়াছুঁয়ির বালাই নাই। শিরনির মিষ্টি সবার লগে এক। সবার লগেই কোলাকুলি। সব চ্যাংড়া-প্যাংড়ারই মাথায় রঙিন কাগজের টুপি। আপনার ভাল লাগে না, ইদ?’
‘কী যে কও! মানুষরে সমান কইয়্যা বুকে টাইনলে, সেই মেলা ভাল্ না-লাইগ্যা পারে? আমার ঐ ‘হরিজন’ শুইনতে তো ভাল লাগে না। বছর দুই আগে যাগ বামুন-কায়েতরা ডাকে নাই—তাগ অ্যাহন ‘হরিজন’ ছাড়া ডাহে না। আগে মানুষের জন, তার বাদে তো হরিজন। কী কইছে য্যান, তোমার খুড়িমা আর বৌদিদি—?’
‘কী কইছে? কীয়ের লাইগ্যা—’
‘কইল্যা-না কী কইসে ইশকুল নিয়্যা?’
‘ও স্যায় বাসি কথা! কইছিল, নিজের ছাওয়ালের জন্য ইশকুল বাইন্ধব্যার ধইরছে মণ্ডল মশায়।’
‘কমলা—কথাডা ভয়ংকর সইত্য আগে ভাবি নাই। যেন বটগাছের বিছন। এই কথাডা। দ্যাহো, কথাডা কিন্তু ঠিকই খাড়াইল—আগৈলঝরা ইস্কুলডায় পড়ার ছাত্র হইব কেডা? তোমার আমার পুত্রকইন্যা বাদে?’
‘এক-এক ছাত্রের লগে এক-একখান ইশকুল?’
‘উলট্যা কইর্যা ধরো ক্যান কথাডা? ধরো, লোয়ার প্রাইমারি ইশকুলে যা পড়ায়, একদুই গোনা আর অ-আ-ক-খ চেনা, সেগুলা তো বাউনবাড়ির ছাওয়ালরা প্যাট থিক্যা পইড়্যাই শেখে। আর, কী য্যান নাম কইল্যা হরিজনগ
‘টুপশালি?’
‘আর, টুপশালির মানুষরা কাঠের তলায় যাওয়ার পরেও ঐগুলা শেখে না। যদি কাঠ জোটে। মুসলমানগ অ-আ-ক-খ তো আলাদা। চিল্লায়-না মকতবে? তাইলে আগৈলঝরার জইন্য বাকি থাহে তো এক আমাগো ছাওয়ালপাওয়াল। আমরা যদি তাগ শিক্ষা দিব্যার চাই, তাইলে ইশকুল চইলবে, না-হয় তো চইলবে না।’
এই কথাডা শুনার আগে ‘এই হিশাবটা আপনার মাথায় ঢুকে নাই?’
‘সত্যি কথা কই? ঢোকে নাই। ইশকুল–কলেজ ভাইবলেই তো মনে আসে সবাই মিল্যা পইড়তেছে। আমার ভাইয়ের ব্যাটাটা আইজ লগি ঠেইলা আমাগো পৌঁছায়া দিল। ওর বয়সে আমিও লগি ঠেইলছি। সে তো ইশকুলে আসার লগে। দেহো, আমার উদাহরণও কোনো কামে আইল না, আমারই বাড়িতে?’
‘আর-একজনের আর-এক বাড়িতে আর-কারো কাজে লাগব।’
