১০
2 of 4

৮৯. শরৎ বোসের টি-পার্টির রাজনীতি

৮৯. শরৎ বোসের টি-পার্টির রাজনীতি

শরৎ বোস টি-পার্টি ডেকেছিলেন ১৬ মার্চ, শুধু শিডিউল এমএলএ আর নেতাদের কয়েকজনকে নিয়ে—গুরুচাঁদ স্মরণ সভার দু-দিন পর আর সুভাষ-যোগেনের আলাপের একদিন পর, যদিও তিনি সে-আলাপে ছিলেন না। সুভাষ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর শরৎ বোস চেষ্টা করছিলেন—ফজলুল হককে রেখে লিগ-মন্ত্রিসভা ফেলে দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা করতে। হকশাহেবকে প্রধানমন্ত্রী রাখলে হিন্দুদের ও কংগ্রেসের আপত্তি হবে না। হকশাহেবের নিজের কোনো পার্টিও নেই, নিজের কোনো বিশেষ সমর্থক গোষ্ঠীও নেই। বরং, বলা যায়, তাঁকে অবিশ্বাস করেন অবাঙালি মুসলমানরা ও ব্যবসায়ী শাহেবরা। হকশাহেবের সঙ্গে শরৎবোসের কথা হয়েছে—লিগ মন্ত্রিসভা যদি শরৎ বোস ফেলে দিতে পারেন, তাহলে তিনি নতুন মন্ত্রিসভা তৈরি করতে রাজি আছেন। মন্ত্রিসভা তৈরি হওয়ার পর থেকেই তার আয়ু নিয়ে এত গুজব রটেছে যে তেমন আরো গুজব তৈরি করে, শরৎ বোস তাঁর আর হকশাহেবের মধ্যে যে-কথাবার্তা হয়েছে সেটাকে আড়াল করতে চান। নইলে এমন আলো-টালো জ্বালিয়ে এমন করে কেউ নিজের বাড়িতে টি-পার্টি দেয়। শরৎ বোসের অবিশ্যি খাওয়ানো- দাওয়ানোর বাতিক ছিল।

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির তো নিষেধ ছিল যে কংগ্রেস কোনো কোয়ালিশনে যাবে না। ভোটে সাতটা প্রদেশে কংগ্রেস সরকার করল—একা-একা। মাস চার-পাঁচ যেতে-না-যেতেই কংগ্রেস ঠিক করল যে-চারটি প্রদেশে কংগ্রেস সরকার করতে পারেনি প্রধানত মুসলমান ভোট পায়নি বলে, সেই বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের যেখানে সম্ভব সরকারে গিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করা যায় এটা প্রমাণের জন্য যে মুসলমান ভোটের ওপর কংগ্রেসেরও দখল আছে।

কোয়ালিসন সরকারে কংগ্রেসের যোগ দেয়া নিয়ে নিষেধ উঠে গেলে বাংলাতেও সেই সম্ভাবনা দেখা দিল। বাঙালি হিন্দুরা কংগ্রেসের ওপর চটে গিয়েছিল হকশাহেবের সঙ্গে কংগ্রেস কোয়ালিসনে না যাওয়ায়। রাগটা তাদের গিয়ে পড়েছিল কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের ওপর। শরৎ বোসরা যে চেয়েছিলেন তা তিনি সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তবু মুসলমানি রাজত্বে বাস করার বাধ্যতায় কপাল চাপড়ানো হিন্দু ভদ্রলোকদের কমেনি। শরৎ বোস সেই জনমতটাকে নিজের পক্ষে আনতে চান বলেই এত আলোটালো জ্বেলে জানান দেয়া যে তিনি কয়েকজন তপশিল এমএলএ ও কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলছেন।

এরকমই তিনি চা খাওয়াবেন ইনডিপেনডেন্ট প্রজাপার্টির এমএল এদেরও যাঁরা হকশাহেব লিগের নজরবন্দি হয়ে গেছেন বলে কৃষক-প্রজা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ইনডিপেনডেন্ট মুসলিম এমএলএ-দের কারো কারো সঙ্গে বলবেন। এই ভাবে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে একটা পরিবেশ তৈরি করে তোলা হবে। কয়েকদিন ছুটি যাবে। পরশুদিন, ১৮ মার্চ থেকে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং হবে শরৎ বোসের বাড়িতেই। গান্ধী, জওহরলাল, প্যাটেল থাকবেনও এই বাড়িতেই।

শরৎ বোস সবার শোনার মতো করে জোরে-জোরে বললেন, ‘আমি আপনাদের কাছে কংগ্রেস অ্যাসেম্বলি পার্টির হয়ে একটা প্রস্তাব দিতে চাই। আপনারা একমত হলে ভাল। দ্বিমত হওয়াতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনারা জনা বিশেক এখানে এসেছেন। নস্কর মশায়কে তাঁর দেশে যেতে হয়েছে –আমাকে জানিয়েই গেছেন। আমার প্রস্তাব হল—আপনারা, শিডিউল এমএলএ তিরিশ জন প্লাস মিস্টার যোগেন মণ্ডল, এই একত্রিশ জন টুকরো-টুকরো আলাদা-আলাদা থাকায় প্রেসার গ্রুপ হিশেবে আপনারা দাঁড়াতে পারছেন না। আমি আপনাদের কাছে এই প্রস্তাব দিচ্ছি যে, এক, আপনারা সবাই মিলে আইনসভার জন্য একটা নতুন পার্টি তৈরি করুন—ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড কাস্ট অ্যাসেম্বলি পার্টি। দুই—এটাও আপনাদের প্রস্তাবে থাক যে আপনারা হক-মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও ইনডিপেনডেন্ট প্রজাপার্টির সঙ্গে একযোগে কাজ করবেন। তাহলে এই তিন পার্টি মিলে ১১৫-র মত এমএলএ বিরোধীপক্ষে থাকবেন ও বাংলার রাজনীতিতে একটা ইফেকটিভ বদল ঘটানো যাবে। আমি আরো একটা কথা বলছি যদিও সেটা আপনাদের ব্যাপার, আমার কিছু বলা উচিত নয়, কিন্তু এটা তো কোনো মিটিং নয়, এটা একেবারেই একটা টি-পার্টি যেখানে যার যা ইচ্ছে সে তাই বলতে পারে। যদি আপনারা এই নতুন অ্যাসেমব্লি পার্টি তৈরি করতে সম্মত হন, তাহলে মিস্টার যোগেন্দ্ৰনাথ মণ্ডলকে তার সেক্রেটারি নির্বাচিত করুন। কারণ…’

পেছন থেকে বেশ হেঁড়ে গলায় কেউ একজন বলল, ‘আমাগো অনুরোধ, আপনে যোগেন মণ্ডলের পক্ষের কারণগুল্যা অ্যাহনি ফাঁস কইরবেন না। আপনার জেবে রাইখ্যা দ্যান। পরে কামে লাগব। আমরা অকারণেই যোগেন মণ্ডলরে মাইনল্যাম’—ততক্ষণে সকলেই দেখে নিয়েছেন ঢাকার এমএলএ ধনঞ্জয় রায় বলছেন।

যোগেন ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। শরৎ বোসের কথা ও তাতে সকলের প্রতিক্রিয়াতে মনে হয়, যেন এ নিয়ে আগে একটা মিটিঙে কথাবার্তা হয়ে গেছে। যোগেনকে ছাড়া তেমন কোনো কথাবার্তা হওয়া সম্ভব নয়। নাকি, সকলেই যোগেনের মতই এই প্রথম শুনলেন। আইনসভার কাজকর্মে এই তিন পার্টির মধ্যে একটা বোঝাপড়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শরৎ বোসের জন্যই, আবার নৌসের আলি ও যোগেনের জন্যও। শরৎ বোসের প্রস্তাবটা সকলের একটা আনুমানিক জানাকে স্পষ্ট করল মাত্র। যোগেন আরো একটু ভাবে, গোপনে—টি-পার্টিতে তো এসেছে জনা বিশ, তাদের মধ্যে পি আর ঠাকুরের মতো বিলেতফেরত যেমন আছে, রসিককাকার মতো পুরনো লোক যেমন আছে, বেশিরভাগই তো যোগেনের মতো, মৈস্তারকান্দি থেকে কাপড় মাথায় বেঁধে গোটা বিশ খাল সাঁতরিয়ে উঠেছে শরৎ বোসের বাড়িতে। তাও তো যোগেনের ডিগ্রি আছে। এমএ পাশও কেউ-কেউ আছে। কিন্তু বাকি সব তো টিপসই-মারা। তাদের একটা স্বভাবই হল, যে-কথা যত কম বোঝে সে-কথায় তত বেশি মাথা ঝাঁকায়। প্রত্যেকেই ভাবছে—সে এই কথাটা জানে না, ধরা পড়লে তার আর মানসম্মান থাকবে না। এই ভিড়ে যদি জনা দুই বরিশাইল্যা ফরাজি থাকত, তাহলে সে অন্তত ধনঞ্জয়ের গলা দাবিয়ে দেয়ার জন্যই সঙ্গে-সঙ্গে একেবারে অবান্তর একটা কথা এমন তুলত যেন একটা হাতাহাতি ঘটতে যাচ্ছে মনে হত। যোগেন তার ‘দেশের’ মানুষের স্মৃতিতে আতুর হয়ে উঠল। কী মানুষ রে, কী সিধা, কী ধলা, যেন যমুনার পানি। বেশ একটু পরে বোঝা যায়, কেউ একজন খুব নিচু গলায় কী যেন বলার চেষ্টা করছেন—গুরুপ্রসাদ বিশ্বাস। উনি এমএলএ নন, কর্পোরেশনেও নেই কিন্তু নমশূদ্র সমাজের মান্যগণ্য মানুষ। আগে ‘সমাজ’ বলতে বোঝাত দেশের ও প্রবাসের সমাজভুক্ত মানুষজনদের। ব্যবহারটা ধীরে-ধীরে বদলাচ্ছে। এখন কলকাতার নমশূদ্র সমাজ কলকাতারই কেবল। নানা জীবিকায় ব্যস্ত। অনেকেই বাড়িঘর করেছেন। তাঁদের স্বার্থটাই দেশের নমশূদ্রদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সেটা সত্য বলেই তাঁরা সেটা মানতে চান না ও ‘সামাজিক’ কাজে সব সময়ই সাহায্য করেন—অফিসের জন্য ঘর দেয়া, থাকার জন্য ঘর দেয়া, নমশূদ্র-মেয়েদের জন্য নিজের বাড়ির কোনো তলায় হস্টেল করা ইত্যাদি। কলকাতায় এই যাঁরা প্রবাসী নমশূদ্র তাঁরা সবসময়ই প্রায় কাঁটা হয়ে থাকতেন, ‘দেশের লোকরা আমাকে ভুলে যায়নি তো।’ ফলে, একটা বিপদও ঘনিয়ে উঠছিল। সশস্ত্র বিপ্লবীরা কোনো-কোনো সময় আত্মগোপন করতে এঁদের বাড়ি ব্যবহার করতেন। গুরুপ্রসাদ বিশ্বাস তেমনই একজন।

‘আগুইয়া আইসেন না বিশ্বাস মশায়—’

‘উনি আর কত আগাইবেন, নিজেরা এড্‌ডু পাছান।’

গুরু প্রসাদ বিশ্বাসকে শেষ পর্যন্ত পেছন থেকে ঠেলে কেউ সামনে নিয়ে আসে। তিনি সেই অদৃশ্য চাপে এগনও। তাঁর মনে হয়, এই এগিয়ে যাওয়ার সময় নমস্কার করতে হয় সবাইকে। তাই তিনি নমস্কারের ভঙ্গিতে দুটো হাত জোড়া করেই থাকেন। সবাই সরে-সরে গিয়ে তাঁর পথ করে দেয় আর তিনি গন্তব্যে পৌঁছে গেলে সবাই গলায় কাঁড়া তোলে ও তারও পর হাততালি দেয়। টি-পার্টির পার্টি তখন মাথায়।

বিশ্বাসমশায় ঐ একই ভঙ্গিতে তখন বলে যাচ্ছেন, ‘নিজেগো মইধ্যে কাইজা কইরলে নিজেগো ক্ষয়, শত্রুগো জয়। আর নিজেগো জোট ঠিক থাইলে শত্রুর ক্ষয়, নিজেগো জয়। আর নিজেগো জোট থাইকলে শত্রুর জয় আর নিজেগো ক্ষয়। না। নিজেগো ক্ষয় আর শত্রুগো—। কী য্যান কইতেছিলাম? জয় আর ক্ষয়। আমাগো আর শত্রুগো।’ বিশ্বাস মশায়কে ঘিরে একটা ভিড় ক্রমেই জমতে থাকে। তাতে তাঁর কথা আরো জড়িয়ে যায়, ‘শত্রুগো ক্ষয় হইলে আমাগো ক্ষয়—

ভিড়ের ভিতর থেকে কেউ বলে ওঠে, ‘আমাগো জয়।’

বিশ্বাসমশায় সঙ্গে-সঙ্গে বলেন, ‘নিশ্চয়ই জয়। জয় নিশ্চয়। তাইলে নিজেগো নিশ্চয় জয়- এই এত বড়-বড় লোকজন, আলো, আলোচনায় বিশ্বাসমশায়ের খুব একটা উৎসাহ এসে গেছে। কিন্তু তিনি তো গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না, তাই গুলিয়ে ফেলছেন। বিশ্বাসমশায় তোতলাতে থাকেন। একটু আড়াল থেকে রসিকলাল বিশ্বাস এসে বিশ্বাসমশায়ের পাশে দাঁড়িয়ে জিগগেস করেন, ‘আমি কয়্যা দেই আপনার কথাডা?’

বিশ্বাসমশায় যেন বেঁচে যান, তিনি তাঁর হাতের জোড় না-ভেঙে বলে যান, ‘এইবার আর-এক বিশ্বাস আমার কথাডা কইয়্যা দিব। ইনিও বিশ্বাস, তবে রসিক। আমার মত বেরসিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ না। আমার মতো রসহীন, কষহীন, শুটকা আখের ভাণ্ডার থিক্যা প্রসাদ-করার জইন্য রস বার কইরতে আর সেই রসরে প্রসাদ বানাইতে প্রভু গৌরকে কতই-না চিব্যাবার হইছে—’। রসিকলাল বিশ্বাস, গৌরাঙ্গ বিশ্বাস মশায়কে থামিয়েই যেন বলে ওঠেন, ‘জোলার ছাওয়াল ফক্কর খান—তার সম্বন্ধী সৈয়দ জান। আপনাগোর যেমন কথার অর্থ জানার জন্য আকুলতা তাতে আমার মতন দাগি আসামিও ডরে আছে। গৌরাঙ্গপ্রসাদ বিশ্বাস মশায় আমাদের নমশূদ্র সমাজের গৌরব’, বিশ্বাসমশায় হেসে নমস্কার করেন, ‘হ্যার বাপও আছিলেন মহাপুরুষ। কইলকাতার সমাজেও বিশ্বাসমশায় অতিশয় শ্রদ্ধেয় মানুষ। তাঁর এগডাই দোষ তিনি নমশূদ্র হইয়্যাও বৈষ্ণবের নবগুণ, নয়টি গুণ, আয়ত্ত কইরছেন। আমি এমন মানুষ আর দেখি নাই যিনি বৈষ্ণবের মহান্ত মর্যাদা পাইয়াও নিজের পরিচয় দ্যান শূদ্র বইল্যা। তিনি কখনোই কোনো সভাসমিতিতে যান না। আজ যে তিনি এই স্থানে তাইছেন, তাতেই বুঝা যায়, নমশূদ্র ও পতিতদের সামনে আইজ যে সুবিধাডা উপস্থিত, তিনি চান আমরা য্যান তার সুযোগ নেই। বলছেন—আমরা যদি জোট বান্ধি আর জোটবদ্ধ থাকি, তাইলে আমাগো জয় হইবই। হইবই।’

টিপার্টি তো ভাঙেই সন্ধে একটু গড়াতেই।

যোগেন দেখে, সে, ধনঞ্জয় রায় আর ধনঞ্জয় দাস একসঙ্গে ট্রামরাস্তার দিকে এগচ্ছে। রায় বলল, ‘মণ্ডল, তোমার উপুর কিন্তু দায়িত্ব পইড়ল কঠিন। সামাল দিব্যার পারবা তো?’

‘বেশিডা কী হইল? আমার তো এহনো পাতলাই ঠেহে, গুরুভার তো ঠেহে না?’

‘দ্যাহ মণ্ডল, যদি তোমার দায়িত্ব হইত এডডা নতুন পার্টি খাড়া করো, তাইলে ব্যাপারডা সোজাই থাইকত। ক্যা? একডা মানুষ একাই তো একডা পার্টি হবার পারে। সে যদি চায় – পারে না?

‘পারবে না কেন? একা হকশাহেব তো প্রজাপার্টি, লিগ, প্রধান মন্ত্রী, সরকার? তাহলে একা একজন একটা পার্টি হতে পারবে না কেন,’ দাস, কংগ্রেসের ডেপুটি হুইপ, বলেন

‘আরে, আপনে তো আমার কথাডাই কইলেন। যদি একডা পার্টি খাড়া করার কাজ হইত, সেইডা গুরুভার হইত না। কিন্তু মণ্ডলরে তো আগে অ্যাহনকার পার্টিগুলাক ভাঙব্যার লাগব পরথম। ভাইংল ভাল। কিন্তু তারপর আবার ঐ ভাঙাগুলিরেই জড়ো কইরব্যার লাগব, নতুন পার্টিতে।’

যোগেন বলে, ‘স্যায়ও তো হকশাহেবের শিক্ষা আছে। যদি শক্ত হইয়্যা খাড়াইয়া থাহো, তাইলে পার্টি নিজের থিক্যাই ভাঙব—পদ্মা-মেঘনার পাড়ের নাগাল। নদী বইয়্যা যায় নদীর মতো। আর, পাড় ভাঙে পাড়ের মতন।’

ওরা তিনজন চৌরঙ্গি রোডের মহানাগরিক সন্ধ্যার পথের ওপর হো হো হেসে ফেলে। সে-হাসি আবার এক ধাক্কায় শেষ হয় না।

তিনজনই রাস্তা পেরিয়ে ট্রামস্টপে গিয়ে দাঁড়ায়। দাশ যাবে হাওড়ায়, রায় যাবে নিউ মার্কেটের পিছনে ওর হোটেলে আর যোগেন তো হেদো।

দাস বলেন, ‘কংগ্রেস অ্যাসেম্বলি পার্টি থেকে পাস করিয়ে এনেছেন শরৎবাবু। কারোই কোনো আপত্তি তো নেইই–কেএস রায় জিজ্ঞাসা করলেন, যা করবেন করুন, আগে এত মিটিংটিটিঙের দরকার কী? সাতকান করা। তাতে শরৎবাবু বলে উঠলেন, নেড়া বেলতলায় যায় যেন ক-বার। কেবিনেট ফর্মেশন নিয়ে যে-কানমলা খেয়েছি ওয়ার্কিং কমিটির কাছে, আমি কোনো ক্ল্যানডেস্টাইন ডিলে থাকতে পারব না। আপনারা যদি একমত হয়ে বলেন যে কংগ্রেস, সব পার্টিকে অপোজিশনে ডাকুক ও একটা নতুন অ্যাসেম্বলি পার্টি তৈরি করা হোক ও কংগ্রেস সেই নতুন পার্টির সঙ্গে একমত হয়ে কাজ করবে—একমাত্র তাহলেই আমি এগব, নইলে নয়। তখন কে যেন বললেন এটা এতটা প্রকাশ্য হয়ে গেলে, লিগও তো নেমে যাবে।’

একটা ট্রাম এসে গেলে রায় লাফিয়ে উঠতে যায়, পেছন থেকে তার কোমরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে মণ্ডল সরিয়ে আনে। ট্রামের ঘণ্টি, শিস, চাকার আওয়াজ, রায়ের ‘আরে, আরে, কাছা টানে কেডা’, ‘তোমার বোনাইয়ের সম্বন্ধী’–এই সব চেঁচামেচির পর যোগেন বলে, ‘এইহ্যান থিক্যা এই হ্যান, বিশ পাও, হাঁইট্যা গ্যালেও মনে লাগে আর এড্‌ডু দূর হইলে ভাল হইত, আর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা শেষ না কইর‍্যা, ফাল পাইড়্যা ট্রামে ওঠে।’

মণ্ডল দাসকে বলে, ‘হ্যাঁ। শরৎ বোস আপনাগ মিটিঙের সব কথা কইয়্যা আমারে কইলেন, আপনাগো মেম্বাররা একমত হইয়্যা আমারে মোড়ল চাইছে। আমি কইল্যাম, আমি তো কংগ্রেস না। উনি কইলেন—তার জইন্যেই তো আপনে, এডা তো নন-কংগ্রেস, নন-লিগ পার্টি। কংগ্রেস লেফ্ট থেকে যোগেনের নাম নিয়ে খুব চেপে ধরেছিল আর কংগ্রেস রাইট চট করে কোনো ক্যানডিডেট পায়নি আর বোঝেওনি তারা মিছিমিছি যোগেনের বিরোধিতা করবে কেন?’

কালীঘাট-বাগবাজার ঝোলানো একটা ট্রাম এসে দাঁড়ায়। ‘দাদা, আসেন না, হাওড়ার ট্রাম ধইর্যা নিবেন মেট্রোর উলটাদিক থিক্যা? যোগেনের আহ্বানে দুই ধনঞ্জয়ই ওঠে। একেবারে ফাঁকা। ওরা ডান হাতি লম্বা সিটে বসে—তিনজন একসঙ্গে বসবে বলে। যোগেন বলে, ‘দ্যাহেন। সব পার্টিরই দুশ্চিন্তা অন্য পার্টির দলাদলি নিয়্যা–।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *