৯২. বরিশালের তরল অন্ধকার
গান্ধীজির সঙ্গে আর তপশিলিদের কথা হল কতক্ষণ—বড়জোর আধঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট। কিন্তু সন্ধের মুখে ১৫ নম্বরে যত নেতা এসে জুটলেন, তাতে মনে হচ্ছিল—এঁরা সবাই গান্ধীজির প্রবীণ সহকর্মী, তাঁদের গান্ধী সম্পর্কিত সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলছেন। যেন এঁরা সবাইই গান্ধীর কণ্ঠস্বরের স্বরলিপি গুনগুনিয়ে পড়ে দিতে পারেন—যদিও এঁদের ভিতর ঘরানা নিয়ে ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে—কেউ সেনী, কেউ আগ্রা, কেউ গোয়ালিয়র, কেউ-বা দেওবন্ধ। তাহলে গান্ধীজি কি একই সঙ্গে এতগুলি ঘরানায় কথা বলছিলেন, নাকী, গান্ধীজির কোনো ঘরানাই নেই, যা আছে তা নানা ঘরানার জগাখিচুড়ি। যোগেন আর নস্করমশায় পাশাপাশি দুই চেয়ারে বসে পা নাড়াচ্ছিলেন, কোনো পা না তুলে। যোগেনের ঠোটে একটা হাসির রেখা লেগে ছিল।
যাঁরা এখানে এসেছিলেন, এখন, তাঁরা সবাই তপশিলি নন। শেয়ালদা-হ্যারিসন রোডের মত সহজগম্য জায়গাও তো আর হয় না—একপাক, কোনো বিশেষ খবর জানা না-থাকলেও, ঘুরে যাওয়ার মত। কোনো খবরটবর যদি পাওয়া যায়-
প্রথম আইন-অমান্যে ছ-বছরের ফাটকখাটা শেয়ালদা-র মকবুল হুসেন বলছিলেন, ‘দেখার একটা ইচ্ছা ছিল—আমরা তো দেখেছি ওঁকে আলিভাইদের সঙ্গে, রাজাবাজার ট্রামডিপোতে ট্রামকর্মীরা ডিপোর দরজা খুলে দিয়েছেন আর ডিপো ভরাট হাজার-হাজার লোক দেখছিল আট হাতি কাপড় পরা, এক লিকলিকে আধবুড়ো। অলিভাইদের মাঝখানে নেহাতই না-লায়েক। কিন্তু খিলাফতের সঙ্গে স্বদেশী হিন্দুদের ভাগ্যের মিল কোথায় আর খিলাফতিদের আইন-অমান্যের স্বার্থ কী—সেটা সেই নালায়েক নেতা সবচেয়ে স্পষ্ট বলেছিলেন। কথাটা এরপর থেকে সবার মুখে-মুখে ফিরত।
খিলাফত কী খিলাপ হুয়া ইস্তাম্বুলমে।
ইংরাজ-আইন খিলাপ হোগা হিন্দুস্তানমে। লেকিন, বিলকুল আইন নাহি।
এক ভি আইন নহি যো কো তোড় না যায়েংগে।’
মকবুলভাই এখন রাজনীতি করেন না। সকলেই কারণটা জানেন—তিনি মুসলিম লিগের মত মানেন না। এবার এটাও জানা গেল—প্রজাপার্টির মতও মানেন না। পাড়ার লোকেরা জবরদস্তি করে তাঁকে মুচিপাড়ার কাউন্সিলার করে দিয়েছেন।
হেমন্ত বোস তো কংগ্রেসের উত্তর কলকাতা জিলা কমিটির সম্পাদক, সুভাষবাবুর এক নম্বর চেলা, খুব ভাল দল করেন।
‘হেমন্তদা, আপনি খোদ হেড-অফিসের লোক হয়ে আমাদের ব্র্যাঞ্চ অফিসে এসেছেন কেন? আপনার কাছ থেকে তো আমরাই খবর চাই—’
হেমন্ত উত্তর দেন, ‘আমার কোনো ব্র্যাঞ্চ নাই’, সবার হাততালি থামলে হেমন্তবাবু যোগ করেন, ‘সব অফিসই হেড অফিস। বেছে-বেছে তপসিলিদেরই ডাকলেন কেন? গান্ধীজি বললেন? এদিকে এক নিউজ দিয়ে ‘আজাদ’ তো বাজার মাৎ করেছে। গান্ধীজি নাকী প্রদেশ কংগ্রেস আর লোক্যাল কংগ্রেসকে এড়াতেই সদর কলকাতায় মিটিং না-করে করেছেন সদরের বাইরে। শরৎ বোসের মঞ্জিলে। সে-মঞ্জিলের গেট মোটা লোহার। ঢুকতে না দিলে ঢোকা যায় না। এই রসিক, ছাড়ো না একটু।’
রসিকলাল সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘শালুক চিনছে গোপাল ঠাকুর। তুমি যা-যা কইতে শিখাইছিল্যা, বেবাক কইছেন—যে, যত আছো হরিজন/মন্দিরে কর গমন।’
‘এটা কি একটা নতুন কথা? সে তো মন্দিরে ঢোকা মানুষের চাপে মানুষজন গাদা-গাদা মাটিতে পিস্ট হচ্ছে।’
পি আর বললেন, ‘গান্ধীজি বললেন, কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলিতে তপশিলিদের উন্নয়নের কাজ ভাল হচ্ছে। আমি ভেবেছি উনি মন্দির আর মসজিদের জমি থেকে তপশিলিদের কিছু জমি পাওয়ার কথা বলবেন। ইউপিতে টেনান্সি অ্যাক্টে একটা ব্যবস্থার প্রস্তাব ছিল—কোথাও কোথাও কোনো-কোনো উঁচু জাতকে রাজস্ব ও খাজনায় কিছু ছাড় দেয়ার যে-রীতি চালু আছে, ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসারের কাছে সেই জমির বিবরণ নথিভুক্ত করতে হবে। উদ্দেশ্য বর্ণভেদপ্রথার সঙ্গে জমির মালিকানার সম্বন্ধটা আলগা করা। পুরো আইনসভার সবাই মিলে— রাজা-মহারাজা, নবাব-বেগম এমন কী তপশিলি মেম্বাররা এমন আপত্তি করল যে সরকার এই প্রস্তাব তুলে নিতে বাধ্য হলেন। আমি ভেবেছিলাম, গান্ধীজি বোধহয় সরকারের প্রস্তাব তুলে নেয়ার ঘটনাটাই ইঙ্গিতে করছেন এটা বোঝাতে যে-কংগ্রেসের সরকার তো এগিয়ে আছে কিন্তু অন্য দলের মেম্বাররা তো পিছনে টানছেন। কিন্তু গান্ধীজি কংগ্রেসের সুশাসন বলতে বোঝালেন—মন্দিরে ঢোকার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ না-করার আইন পাশের কথা।’
মকবুল হোসেন জিজ্ঞাসা করেন, ‘তাহলে বাজান, তোমরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট পাকিয়ে এই হকসরকারটাকে ফেলছ কেন?’ এই কথার মধ্যে যে একটু পেছু-লাগা ছিল সেটাতে সবাইই খুব মজা পায়, পি আরও। এই কথাতে যোগেনও বেশ বড় করে হাসে।
পি আর নিজে হেসেও একটু বাঁচাতে চাইলেন, ‘হচ্ছে গান্ধীজির কথা, এর মধ্যে আমাদের কথা আসে কোত্থেকে?’
‘একটু তো আসেই মণি। ধরো, বাংলার অ্যাসেম্বলিতে কাগো ভোটে ঠিক হব, সরকারডা কার। এক, বাংলার অ্যাসেম্বলি কাগো ভোটে ঠিক হবে, সরকারডা কার। এক ইয়োরোপিয়ান ব্লক—ভারতের আর কোনো প্রদেশে জনসংখ্যার উলটানীতিতে এতগুলা শাহেবের ব্লক নাই। একটা ঝোলা সরকারকে ফেলাইতে পঁচিশ-ছাব্বিশডা ভোট কি সামান্য ঘটনা? দুই শিডিউল্ড কাস্ট ব্লক—সে তো তিরিশজন, যোগেনরে ধইরলে একতিরিশ। তিন, ইনডিপেনডেন্ট মুসলিম ব্লক—এডার মেম্বার কয়জন তার হিশাব খুব দুরূহ। তাও ধরো জনাবিশ-পঁচিশ। তাইলে সরকাররে রাইখতে বা ফেলাইতে তরলতাধর্মী আমি জন মেম্বার মানে তো কংগ্রেস যে-কায়দায় সিন্ধে আল্লা বকসরে ঝুলাইয়্যা রাইখছে বা আসামে সাদুল্লারে কোতল কইরল, সেই কায়দাতেই এখানেই শিডিউলগ সঙ্গে দল পাকাইয়্যা হকশাহেবরে ফেলাইব। গান্ধীজি মহাত্মা, সে নিয়্যা তো কোনো সন্দ নাই। তিনি আসার দুইদিন আগে শরৎ বোস তোমাগো চা খাওয়াইয়া নতুন পার্টি খাড়া কইরল আর দুই দিন পর গান্ধীজি আইস্যা উপদেশ করেন—সবাই মিল্যা কংগ্রেস করো আর শিডিউলরা মন্দিরে ঢোকো। এমন উপদেশের ভিতরে একডা অনুপদেশ ও থাহে—নতুন পার্টি কইর্যা কাম কী, পুরান কংগ্রেস থাইকতে? শরৎ বোসের টি-পার্টিরে কইতে পারো ফার্স্ট প্রেমিস—আপনারা সবাই মিল্যা একডা পার্টি বানান, কংগ্রেসের বাইরে। যদি তাই হয়, তাইলে কংগ্রেস ক্যান তার পুরানা চেহারা বদল কইর্যা নতুন পার্টিটাতে আসব না? আর এডডা মহাবিপদ কংগ্রেস কাজেকথায় সত্য হওয়ার দিকে যাচ্ছে। যে-যে প্রধানমন্ত্রীরে ফেলাচ্ছে, সকলেই মুসলমান আর সকলেই গান্ধীবাদী। সিন্ধুর মুর্তজা। আসামের সাদুল্লা। এডারে, কেন হিন্দু কমিউনালিজম কওয়া যাবে না? তার জন্যে একডা আর্যসমাজ, হিন্দুমিশনে লাগে ক্যা এ নিয়্যা তো কোনো সাদ নাই যে কংগ্রেসই একমাত্র অল ইন্ডিয়া পার্টি আর কংগ্রেস মতাদর্শে সাম্প্রদায়িক না। তার ইতিহাসও খুব জটিল। কিন্তু আমাগ দেশের মত কলোনিতে ইডিয়েলজির থিক্যা স্ট্র্যাটেজিক মুভমেন্ট অনেক বেশি হয়। তাই যে-পার্টি যত ছোট সে-পার্টি কোনো-না-কোনো অর্থে তত কমিউন্যাল।’
কয়েকজন এসে দরজা থেকে কয়েক পা ভিতরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কথা বলছিলেন, কোণের জানলার নীচে এক খাড়া টিনের চেয়ারে বসে লম্বা মাপের এক জোয়ান মানুষ। ডক্টর মেঘনাদ সাহা। বৈতালিক এলাম বাদ থেকে যায়।
যারা ঘরে ছিল, তারা কথাগুলি শুনছিল, চোখের পাতাও না-ফেলে যেন। বাইরে থেকেও সবে এসে গেছেন কলকাতায় পালিত-প্রফেসর হয়ে। ১৫ নম্বরে তিনি নিয়মিত আসেন না, কখনো-কখনো আচমকা চলে আসেন, কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে চলে যান। শিডিউল-ক্লাস রাজনীতিতে তিনি থাকেন-যে, তা বলা যায় না, কিন্তু যেখান থেকে রাজনীতি উঠে আসে সেই নিম্নবর্ণের আত্মচেতনা তিনি স্বজাতের মানুষজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতেও চান, আবার, অন্যান্য সবার কাছ থেকে হয়ত নিজের আত্মচেতনার পুষ্টিও নিতে চান।
হেম নস্কর চেয়ার থেকে দু-হাত তুলে বলেন, ‘স্যার, আপনি মাঝেমধ্যে এসে তো আমাদের ক্লাশ নিতে পারেন। তাহলে আমাদের বোঝার ক্ষমতা কিছু বাড়ে।’
‘বলেন কী নস্করমশায়। রাজনীতি কি আর নাইটস্কুলে শিক্ষা দেয়া যায়। রাজনীতির পাঠশালা তো আমাদের মানুষের জীবন যদ্দুর ছড়াইছে, সেই খাল-বিল-জঙ্গল-নদী নালায়। এবারের ভোটে প্রজাপার্টি আর তপশিলরা তো রাজনীতির মোড়লগ ভাসাইয়্যা দিল। এগো থিক্যাই জাতির নেতা হওয়ার ভেলোসিটি তৈরি হয়। নাইট স্কুল খুইললে তো এগ চিন্তার থিক্যা নদীনালা খালবিল শুকাইয়্যা যাইব। গান্ধী তো মহাত্মা—সেডা ঐ একডা ক্ষমতায়। তারে দেইখলেই নদীনালা-খালবিল মনে পড়ে। না, উঠি, অ্যাখন,’ মেঘনাদ সাহা উঠে দাঁড়ালেন, অত বড় লম্বা মানুষটার মাথা সবার মাথা ছাড়িয়ে গেল। মেঘনাদ সাহা-র সঙ্গে প্রায় সকলেই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। মকবুল হোসেন একটু এগিয়ে এসে মেঘনাদকে বলেন, ‘প্রফেসরজি, নাইট স্কুল তো করবেন না। লাইট পোস্ট তো করবেন? কানা, ভাঙা রাস্তায় মানুষ যাতে পথ দেখতে পায়?’
মেঘনাদ, মকবুল হোসেনকে চেনেন না। বললেন, ‘আপনারা পথ দেখতে প্যালে শাহেবদের তো অসুবিধা। অ্যাহন তো কর্পোরেশনেরও অসুবিধা। দেশবন্ধু যে সুভাষরে কী গলার কাঁটা দিয়্যা গ্যালেন!’ মেঘনাদ সাহা, সুভাষের বন্ধু।
‘সে তো বটেই। আমি সে-লাইটের কথা বলিনি। আমি আপনাদের মত বড় মানুষের কথা বলছি যাঁরা আমাদের আলো দিয়ে পথ দেখান। চলুন, আপনাকে দু-পা এগিয়ে দিতে-দিতে সেই আলোটা মাথায় মাখি।’
দেখতে-দেখতে পুরো ঘরটাই খালি হয়ে গেল। যোগেন ছাড়া সকলেই নেমে গেল। যোগেন ইচ্ছে করেই নামল না—সেটা কাউকে বুঝতেও দিল না। গান্ধীজিকে নিয়ে সেই সকাল থেকেই সে. একটা রহস্যে আছে। সেই রহস্য একটু ছুঁয়ে গেল বলেই কি মেঘনাদ সাহার কথাতে নাড়া খেয়ে গেল—’গান্ধীরে দেখলেই সবার নদীনালা-খালবিলের কথা মনে পড়ে’। বরিশালের ছেলে যোগেন—খুব সরু খালপথে নিশুতে নৌকা চলা তার জানা। দু-পাড় থেকে লতা, জঙ্গল, শোয়া খেজুরগাছ জলের প্রায় ওপরে এসে পড়ে। দৃষ্টি ফেলা যায় না। এক-এক সময় ভুল আলো দপ করে জ্বলে নিভে যায়। এক-এক সময়, পাতাল থেকে গুরগুর আওয়াজ ওঠে—জোয়ারের আওয়াজই, সামনে না পেছনে? এইসব যাত্রা, এইসব গমনাগমন, এইসব ভ্রমবিভ্রম কি গান্ধীজিকে দেখে মনে পড়ে?
যোগেনের তো মনটা হু হু করে উঠল বরিশালের সেই তরল অন্ধকারের জন্য!
নীহারেন্দুবাবু তাকে মার্ক্স-এর যে বইদুটি দিয়েছিল সে দুটো অনেকবার পড়েছে যোগেন, এখনো বইদুটি বুঝে নিতে অন্য বইপত্রও পড়ছে। বই দুটো শুধু যে যোগেনকে চমকে দিয়েছে তা নয়। তার বোঝাবুঝিতে বহু গিঁঠ পাকিয়েছে। যোগেন তো মার্ক্সের ধারণাটাই বুঝতে পারছিল না—যাকে বলে মেরিট অব দি কেস। জন্ম থেকে উঁচু জাত আর শূদ্রের জীবনযাত্রার, সম্পর্ক ও সংঘাতের মধ্যে তাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। সেই সম্পর্ক ও সংঘাতের প্রসঙ্গ দিয়েই ধারণা তৈরি করা তার অভ্যেস। সেই উঁচুনিচু তো মার্ক্সের নয়। কী করে মেলাবে যোগেন তার জীবন আর মার্ক্সের ব্যাখ্যা? একটা ছোট জায়গাতে যোগেন সেই পদ্ধতিটার ইশারা পেয়েছিল। তার পর থেকে সেই ইশারাটাকেই বেহুলার ভেলা করেছে। বিপ্লব যোগেনের অপরিচিত ধারণা নয়। সমগ্র বিপ্লবীরা এখানেই সে-ধারণাটা তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু বিপ্লবী শ্রেণী সংগ্রামের ধারণার সঙ্গে সে মেলাতে পারছিল না—জাতপাতের ব্যাপারে ইংরেজরা যে এই ভারত শাসন আইন বানিয়েছে তারই সুযোগে তো শুদ্দর আর মুসলমান একটু ক্ষমতায় এসেছে! একটা অন্তত সামাজিক কথাবার্তা জায়গা পেয়েছে, যেখনে জাতপাতের কোনো স্বীকৃতি নেই। তাহলে তো শুদ্দুরদের পক্ষেই কাজ করল শাহেবরা। কিন্তু গান্ধী বা কংগ্রেস এই খোলাখুলি জায়গাটা নিয়ে কোনো সময়ই খুলি না। শিডিউল বা মুসলমানদের আলাদা করে কোনো অধিকার দিলেই গান্ধীর বা কংগ্রেসের রাগ হয়—যেন, তাদের ভাগ কমে গেল। ঐ ‘ক্লাস স্ট্রাগলস ইন ফ্রান্স’-এর একটি লেখায় মার্ক্স, বুর্জোয়া সমাজে বাইরের থেকে কেউ যদি ঢুকতে চায় তাহলে তার শাস্ত্রজ্ঞান ও আইনজ্ঞান তার ‘গেট্স—এন্ট্রিকে দুরূহ করে তোলে। বুর্জোয়া সমাজ কী করে তার বাইরের সবকিছুকে হজম করে নেয়। যা বুর্জোয়া সমাজের সম্পত্তি নয়, তেমন সবকিছুকেই বুর্জোয়া বানিয়ে নেয়। আমাদের বামুনদের মত। কিন্তু বামুনরা তো বুর্জোয়া নয়। তাহলে শুদ্দুররাই–বা প্রলেটারিয়েট হবে কী করে? যোগেন যদি বিএল পাশ না কর খুব কম সময়ের মধ্যে কোর্টে নিজেকে দাঁড় করাতে না পারত ও কথায়-কথায় সংস্কৃত আর ইংরেজি থেকে মুখস্ত বলতে না পারত, তাহলে ঐ সমাজের ‘গেটস অব এনট্রি’ পেরতে পারত? ঐ সমাজ-বলতে যোগেন যদিও বর্ণবিভক্ত হিন্দুসমাজ বুঝে নিয়েছে কিন্তু সেই বুঝেনেয়ার মধ্যে ইংরেজ-ভারতবাসী ও আছে। মার্ক্সের সূত্র দিয়েই যোগেন যেন গান্ধীকে একরকম করে বুঝে নিচ্ছিল। গান্ধীকে সামনা সামনি না দেখলে, না শুনলে তাঁকে বোঝা সম্ভবই নয়, গান্ধী এতই নিখাদ গান্ধী। তাত্ত্বিক কচকচিতে কান দেন না, মতান্তর গ্রাহ্য করেন না, কেতাকানুনের কেয়ার করেন না, আধ্যাত্মিকতার ধার ঘেঁষেন না, নিজেকে সত্যের প্রমাণপত্র হিশেবে অ্যাপিডিভেড করেন, কত কমে একটা লোকের চলে তা সবসময়ই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, জনসাধারণকে সর্বোচ্চ মনে করেন।
এতটাই গুছিয়ে ভাবতে পারল যোগেন ১৫ নম্বরের ফাঁকা ঘরে, একেবারে একা, জীবনে হয়ত এই প্রথম, তার আত্মপরীক্ষা প্রয়োজনে। এতদিন তো ছিল তার কেবলই শরীরে বেঁচে থাকা।
.
গান্ধীমুগ্ধতা কাটাতে যোগেনকে রীতিমত খাটতে হয়। ভিতরে-ভিতরে তার একটা জিদ ছিল যে সে গান্ধীজ্বরে কাত হবে না। তার কারণ, গান্ধীকে কেন্দ্র করে যে পরিধি প্রতিদিনই মাপে বড় হয়, সে কোনোদিনই তাঁর আশপাশ দিয়ে হাঁটেনি। তাদের সমাজে গান্ধীর আন্দোলনে যোগ দেয়ায় নিষেধ ছিল। গুরুচাঁদ ঠাকুরের নিষেধ ছাড়াও বা নিষেধের কারণেই, মনে হত, গান্ধী-আন্দোলন ভদ্রলোকদের বাড়ির ব্যাপারে। ওদের নেতারাও ভদ্রলোক। ‘বয়কট’, ‘পরোক্ষ প্রতিরোধ’, আইন অমান্য, অহিংসা, সত্যাগ্রহ, অনশন—এসব কোনো কথাই নমশূদ্র, অন্যান্য অন্ত্যজ বা মুসলিম সমাজের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। বরং গান্ধীজিকে যে অবতার ভাবতেন অনেক হিন্দু, সেটা অন্তত নমশূদ্রদের মুসলমানদের সঙ্গে মিলতে পারত। রাজবংশীদের সঙ্গে মিলত না। তাদের সৃষ্টিতত্ত্বে বা জীবনাচরণে অবতার নেই। অন্যান্য অন্ত্যজরা আরো অজ্ঞাত। মুসলমান ও নমশূদ্ররা হজরত মোহম্মদ ও গৌরাঙ্গ অবতার থাকতে নতুন অবতার ধরতে যারে কেন। গান্ধী-সংক্রমণে যোগেন ভুগবে না—যোগেন নিশ্চিতই ছিল।
কিন্তু যোগেনের তো কখনো চোখের সম্মুখে দেখা নেই যে একটি মানুষের শারীরিক উপস্থিতি, উপস্থিত অন্য সব মানুষের বিবেচনাকে কতটা নিঃসাড় করে দিতে পারে। মন্দির প্রবেশের অধিকার নিচু জাতের একমাত্র পরিত্রাণ—শিক্ষায় ও অর্থনীতিতে এর ফলেই তারা তাদের পেছিয়ে থাকা কাটাতে পারে—এ-কথাটা যদি সত্যও হয়, তাহলেও তো খুবই গাঁটও গেরো পেরনোর কথা এই সত্যে পৌঁছুতে। একজন ডোম, ডোম হয় কেন আর-একজন বামুন, বামুন হয় কেন—শাস্ত্র, বিধি, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ইত্যাদি থেকে যুক্তিটুক্তি না-এনে কী করে কোন্ আক্কেলে একজন বলতে পারে যে সে বর্ণভেদ মানে, অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ মানে না, অস্পৃশ্যতা কোনো ধর্ম নয়, উঁচুজাতের লোকদের অপরাধ ও পাপে নিচুজাতের লোকদের এই দশা, তারা উঁচুজাতের বিরুদ্ধে যে-নালিশ করছে, তার চাইতে হাজারগুণ বেশি রাগ দেখালেও নিচুজাতির লোকদের কোনো দোষ দেয়া যায় না, কিন্তু সেই কারণে হিন্দুধর্মকে ভাগ করা যায় না, সেটা নিজের ধর্মকে অস্বীকার করা হয়, মন্দির—প্রবেশের অধিকার বা মন্দির—প্রবেশের নিষেধ—অর্জন বা বর্জন-করার জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে থাকাই একমাত্র উপায়? কিন্তু যোগেন তো নিজের চোখে দেখল—গান্ধীজি কত সরলভাবে এই কথাটা বললেন, এত বিলেত-ফেরতের একজনও হেসে উঠতে পারল না, আর, যোগেনের মত শূদ্রস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসীও সন্দেহ করতে পারল না যে লোকটি বোকা বা কথাটা ধোঁকা। ততক্ষণে যোগেন তো সেই প্যাচে পড়ে গেছে—ডোমের কাজটাও কাজ, বামুনের কাজটাও কাজ, কাজের পার্থক্য অনুযায়ী যদি জাতের পার্থক্য না করা হয় আর দু-জনই যদি একইরকম সম্মান পায়—তাহলে বর্ণভেদটাই তো থাকে না, বা থাকে—একজনের সামাজিক কাজের নির্দেশক হয়ে, আর এটা দূর করতে হলে মন্দিরে ঢোকার সম-অধিকার পেতে হবে, আর পেতে হলে, আন্দোলন করতে হবে, আর, আন্দোলন করতে হলে দেশের সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে প্রসারিত পার্টিতে, কংগ্রেসে, থাকতে হবে। যুক্তির এই সারল্যই হচ্ছে এ-যুক্তির সবচেয়ে বড় প্যাঁচ। সুভাষ বোস ১৯২৯-এ রংপুরে প্রাদেশিক সম্মিলনে নাকী বলেছিলেন, ‘হয় সবাইকে বামুন বানিয়ে দাও, নয়তো সবাইকে শূদ্র বানিয়ে দাও।’ কথাটা খুব ধরেছিল ও ছড়িয়েছিল। যোগেনের তখন খুব দুঃখের দিন—আইনপড়া চালাতে পারবে কী পারবে না। যোগেন পর্যন্তও কথাটা পৌঁছেছিল আর যোগেনের চমকও লেগেছিল বেশ—বর্ণভেদের সবচেয়ে সহজসরল উপায় মনে হয়েছিল। তারপর ভুলেও যায়—কথাটার ভিতর একটা মরীয়া ভাব আছে, তাতেই কথাটা বেয়াক্কেলে হয়ে যায়। আর, যোগেন তখনই জানে—অন্তত ৫০ বছর ধরে নমশূদ্ররা বামুন হতে পৈতে পরেও বামুন হতে পারেনি।
গান্ধীজির কথাটা যুক্তি হিশেবে টেঁকসই যে না, যোগেন তার ওকালতি বুদ্ধিতে টের পেলেও, সেটা সে এখন ভাবে না, ভাবতে চায় না, বরং সে আরো একটু গান্ধীমুগ্ধ হয়ে পড়ে—সত্যি তো, এই একজন মানুষ কংগ্রেসশাসিত সমস্ত প্রদেশ সরকারকে ‘মন্দির প্রবেশ’ আইন পাশ করতে বাধ্য করছেন সবচেয়ে জরুরি কাজ হিশেবে। এ তো কৌশলের চাইতে কিছু অধিক
যোগেন বুঝে ফেলেছে—যতই সবাই মাথায় করে রাখুক, যতই সবাই দরজায় দর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে থাক, যতই সবাই ‘বাপু’, করুক, ‘বাপু’ যতই সবাই গান্ধীরাজের কথা বলুক, গান্ধীকে তাঁর নিজের অবাস্তবতাকে রাজনীতির বাস্তবতায় বদলে নিতে কী দাঁড় বাইতে হয়, কী গুণ টানতে হয়, কী হাল ধরতে হয়? বছর দুই আগে কংগ্রেসে যখন জওহরলালের সোস্যালিজমের বান ডেকেছে, এমন কথাও বলা হচ্ছে—’গান্ধীজি একাই তো আর কংগ্রেস নয়’, ‘গান্ধীবাদ আর জাতীয়তাবাদ তো আর এক নয়’, এমন সব কথা লেখা হচ্ছে—বাংলাতে তো রোজই লেখা হচ্ছিল–অহিংসা মানে তো ব্যবস্থাকে বিশৃঙ্খল না-করা, পরিবর্তন মানে বিপ্লব নাকী হৃদয়ে ঘটাতে হয় আগে—এইসব কথা কোনো কাজের কথা নয়, শুধুই ভাবের কথা।
আবার উলটোদিকে কংগ্রেস ছ-ছটি প্রদেশে যে মন্ত্রিসভা চালায় সেই মন্ত্রিসভার সব কাজকর্মের জন্যও গান্ধীই দায়ী—এমন কথা যে চাপা গলায় বলা হচ্ছে তাও নয়। এদিকে মুখে বলা হচ্ছে—পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। অন্যদিকে কাজে বোঝানো হচ্ছে, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনই-বা এমনকী অপূর্ণ। গান্ধীজি যেন বিদেশী শক্তির সরকারকে ভালভাবে চালিয়ে দেয়ার দাদন নিয়েছেন। কংগ্রেসের প্রদেশগুলি, গান্ধীবাদের আদর্শ অনুযায়ী, কৃষককে বা শ্রমিককে কোনো আন্দোলনের অধিকার দেয় না, উলটে, এইসব উদ্ভট কথাই রাজনীতির আসল উদ্দেশ্য বলে রটিয়ে বেড়ায় যে খদ্দর পরলে, চরকা কাটলে, অহিংস হলে, মদ্যপান নিষিদ্ধ করলে, মন্দিরে হরিজনরা ঢুকতে পারলেই পূর্ণ স্বাধীনতায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। স্বাধীনতা তো একটা রাজনৈতিক অধিকার আর হরিজনসেবা তো একটা সামাজিক কর্তব্য। দেশ কি অস্পৃশ্যতার দোষে পরাধীন হয়েছিল। ক্লাইভ, মিরজাফর, রানি ভবানী, এরা তো দিব্বি এক টেবিলে বসেই প্ল্যান কষেছিল—ছোঁয়াছুঁয়িতে তো আটকায়নি। এখন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে আর তিরুপতির মন্দিরে সকলে ঢুকতে পারলেই স্বাধীনতা পূর্ণ হবে? মানে, একটা সাইনবোর্ড টাঙালেই হল— ‘প্রবেশ অবাধ!’
একটা লেখা মনে করে যোগেন হেসে ফেলে। আর-কিছু মনে নেই, শুধু মনে আছে একটা জায়গা, বাংলা করলে দাঁড়ায়, গান্ধী চান যেন চটেমটে আমরাই কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসি। আমরাও শেয়ানা। কংগ্রেস তো কারো বাপের সম্পত্তি নয়, বা, কংগ্রেস তো কারো মালিকানায় তৈরি হয়নি যে মালিকের হুকুমে চলতে হবে!
এই জায়গাতেই যোগেন প্যাচে পড়ে গেছে। গান্ধীকে যদি সে না দেখত ও তার কথা বলা না শুনত, তাহলে, যোগেনও কিন্তু গান্ধীকে নিয়ে ঐসব কথাই ভাবত আর বলত। সেটাই তো যুক্তিযুক্ত—ওকালতিতে যুক্তিযুক্ততাকে এতদূর পর্যন্ত যুক্তিযুক্ত করা হয়েছে যে সন্দেহও যুক্তির বাইরে যেতে পারে না, অপরাধকে অপরাধ হতে হবে বেয়ন্ড রিজনেবল ডাউট। তা না হলে যেটুকু সন্দেহ দূর হল না, তার সুবিধে আসামি পাবে—’বেনিফিট অব দি ডাউট’। এমন যুক্তির গারদে ঠেসলে গান্ধীকে খালাশ দেবে কে? ছাগলের দুধ খেলে স্বরাজ আসবে। চরকা কাটলে স্বরাজ আসবে। প্রতিরোধ পরোক্ষ হলে স্বরাজ আসবে। এইসব কথা একটা লোক যদি আসমুদ্র হিমাচল রটিয়ে বেড়ায় তবে গুজব রটানোর দায়ে যে-কোনো তৃতীয় মুনশেফ ও তাকে হাজত খাটাবে!
এই মনে-মনে খেলাটাতে যোগেন মজা পাচ্ছিল।
গান্ধীকে দেখেশুনে সে নিজে জব্দ হয়েছে। তা থেকে সে ভাবতে চাইছে—কে হয় না, বা, হয়নি, বা, হত না? গান্ধী যুক্তির খেলাই খেলছেন কিন্তু সে-যুক্তি আমার যুক্তির পাল্টি নয়। সে-যুক্তি তাঁর নিজস্ব যুক্তি। সেসব জায়গায় গান্ধীজি বেশ চটেও যান, বেশ জোরে আঘাতও করেন, ‘আমি কোন যুক্তিতে খেলব, সেটা তো আমার বাছাইয়ের ব্যাপার, এমন তো নয় বক্সিং খেলতে হলে রিঙেই নামতে হবে।’
গান্ধীজিকে কতটাই কঠিন বাস্তবে তাঁর বরফজমাট যুক্তিগুলিকে জমাটই রাখতে হয়, নিজেকে অবাস্তব করে না তুললে কী করে এই বিশ্বাস রক্ষা করা যাবে যে তিনি পোয়াতির কম প্রসবব্যথা ও চড়িয়ে দিতে পারেন?
