৯১. গান্ধীজির লুকনো দোস্ত
হতে পারে, গান্ধীজি নীরবতার বিস্তার আন্দাজ করতে পারলেন, উনি নাকী পারেন এমন বুঝতে, কিংবা পালটে দেয়া গল্পটা তাঁর কথাবলার রীত।
‘অবিশ্যি এর একটা উলটো কথাও আমি শুনেছি। হিশেব মত যা নেয়ার নেয়া হল, তারপরেও এক মুঠো চাল নিতে হয়, অতিথের জন্য, কোনো উপোসির জন্য।’ এবার সবাই মিলেই হাসলেন—এতে অভাবের কথা নেই। ‘সংরক্ষণটাকে দুটোই ভাবতে পারেন। দুঃখের দিনের কথা ভেবে, লক্ষ্মীর ভাঁড়ার ভাঙা হল। বা, একমুঠো চাল বেশি নেয়া হল। যার যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবে নিন।’
যোগেন ভিতরে-ভিতরে ফুঁসে উঠল। এই সব গল্পবানানো সে সহ্য করতে পারে না। তাদের সমাজে তো ঠাকুরগিরি করার হিড়িক আছে। তারাও এরকম আবোলতাবোল গল্প বানায় যার মাথামুণ্ডু নাই। আমি যদি বাড়ির লোকই হই, তাহলে আমার হিশাবের ভাতই আমি চাই। হয় লক্ষ্মীর ঝাঁপি, না-হয় তো অন্নপূর্ণার ঝাঁপি—এসব দিয়ে আমার কী হবে?
গান্ধীজি তখন বলছেন— ‘সারা দেশের মধ্যে একমাত্র কংগ্রেসেরই আছে দেশের সমস্ত মানুষের অভাব নিয়ে ভাবার ক্ষমতা ও সকলকে ক্ষমতাবান করার শক্তি। কংগ্রেসের সেই শক্তিটা নষ্ট করার জন্য একদিকে সরকার, আর-একদিকে নানা সাম্প্রদায়িক দল চেষ্টা করছে। কংগ্রেসের শক্তি নষ্ট করার অর্থ দেশের মানুষের শক্তি নষ্ট করা। সেটাকে রক্ষা করাটাই প্রধান কাজ। জাতপাত নিয়ে যে আসন ভাগাভাগির ফলে আপনারা ভোটে জিতে আইনসভায় এসেছেন, তাঁরা আইনসভার ভিতরে কংগ্রেসে যোগ দিন। তাহলে, যোগ্য জবাব দেয়া হবে। তোমরা আমাদের জাঁতপাঁতে ভাগ করছিলে। দেখো, সেই ভাগাভাগির সুযোগ নিয়ে আমরা আইনসভায় এসে আবার এক হয়ে গেছি।’
যোগেন ভাবেনি সে কিছু বলবে। কিছু সে নিজেই ঠিক বুঝতেই পারেনি, কখন এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান তার ভিতরে-ভিতরে ফুঁসছিল, সেই তের তারিখে অ্যালবার্ট হলে সুভাষ বোসের বক্তৃতা শোনার পর যেমন হয়েছিল। তাতে দুঃখ মাখা ছিল, এখন সমস্তটাই ক্রোধে লকলকে। যোগেন গান্ধীজির কথা বলার ধরণে একটা আড় ফাঁকতাল পাচ্ছিল। তেমন কয়েকটা আড় তাল পার হয়ে যাওয়ার পর যোগেন ফাঁকটা পায়, প্রবেশের।
‘কিন্তু কংগ্রেস তো উচ্চবর্ণ হিন্দুদের পার্টি। তাগ লাইগ্যাই তো আমাগর এই দুর্দশা। যে পার্টি আমাদের শূদ্র, চাঁড়াল বইল্যা অচ্ছুৎ কইর্যা রাখছে সেই পার্টিতে আমরা কেন যাব। আমরা শূদ্র ও অচ্ছুতই থাকতে চাই ও আমাদের নিজেদের পার্টি চাই। হিন্দুরও শিডিউল কাস্ট কংগ্রেসেরও শিডিউল কাস্ট?’
যোগেনের কথা মহাত্মাজি শুনলেন দুই হাতের মুঠোর ওপর খাড়া ভর দিয়ে বসে। ও নিজের কাঁধ দুটো চেতিয়ে। ঠোঁটদুটোর জোড় ভেঙে গেছে। ঘেঁটি আর মুন্ডুটা ঝুলে আছে মাটির দিকে। তেমন একটা অনড় মূর্তির চোখের চশমাটা থেকে কখনোসখনো ঝিলিক আসছিল। যোগেন বুঝে গিয়েছে, গান্ধীজি থামিয়ে দেবেন না ও যোগেনের কথার জবাব দেবেন।
যোগেন থামলে, গান্ধীজি তাঁর ভঙ্গি একটুও না-বদলে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আরো কথা যদি থাকে, তবে বলা হোক।’
কথাটা বলার পর গান্ধীজি মুখ তুললেন, যেন ভিড়ের পেছনটা দেখে নিতে। কেউই আর কিছু জিজ্ঞাসা না-করায় গান্ধীজি বলে উঠলেন, এমন একটা স্বরে, যেন অনেকক্ষণ কথা বলতে বলতে—নিজের কথার নিরর্থকতায় উনি নিজের গলা নিজেই ভাঙছেন। পুজোমণ্ডপ বা মহরমের মিছিলের বাজনদার ঢাকের টানটান চামড়া, বৃষ্টিতে রোদেঘামে যেমন আলগা ঢ্যাপঢ্যাপ হয়ে যায়। গান্ধীজির এই গলা শুনে প্যাটেলে একটু এগিয়ে এলেন। জওহরলালকে সুভাষ ইশারা করেন। উদ্বিগ্ন জওহরলাল একটু হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে এসে হাতের আঙুল নাড়িয়ে সুভাষকে আশ্বস্ত করেন।
‘আমি আপনাদের কাছে ও সকলের ‘কাছে একটা মাফি মাংছি। হাজার-হাজার বছর ধরে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর এত অত্যাচার, এত অন্যায়, এত ব্যভিচার করেছে যে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এখন যে-প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে চান, সেই প্রতিকারের ব্যবস্থাই নিতে পারেন। এ নিয়ে তাঁদের স্বাধীনতা মেনে নিতে আমার কোনো পিছুটান নেই। আমার পেছুটান এই জায়গায় যে আমি একজন হিন্দু, বর্ণভেদেও বিশ্বাস করি, কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ ও অস্পৃশ্যতাকে আমার অন্তরের সমস্ত ধর্মবোধ দিয়ে আমি বর্জন করি। মানুষের স্পর্শকে পাপ মনে করার মত অপরাধ আর কী হতে পারে? সেই কারণেই আমি ‘হরিজন সেবা সংঘ’ করেছি। এটাই এখন আমার জীবনের প্রধান কাজ। আর, মন্দিরে প্রবেশাধিকার দেয়ার জন্য বিভিন্ন প্রদেশের আইনসভাকে অনুরোধ করেছি।’
যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘মন্দিরে শূদ্রদের ঢুকতে দিলেই কি আমরা যারা পতিত, তাদের সমস্যা মিটবে?’
গান্ধীজি তাঁর দুই হাতের তেলো উলটে দিয়ে হেসে বললেন, ‘মন্দিরেও যদি হিন্দুরা এক হতে না পারে, তাহলে কোথায় পারবে? আমি আবার বলছি মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশাধিকারের আইন আমি চাইনি। আমি চেয়েছি, মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার অধিকার কারো থাকবে না—সেই আইন। আপনাদের কাছেও আমার অনুরোধ—আপনারা কংগ্রেসের বাইরে যাবেন না আর হিন্দুধর্মের বাইরে যাবেন না।
যোগেন বলে বসে, ‘এই দুই না-যাওয়ার অর্থ এক?’
গান্ধীজি সরাসরি যোগেনের চোখে চোখ রেখে হাসেন। যোগেন দেখে সে হাসিটা তাঁর চোখে দীপিত হয়ে আছে—অনেক অতীত ও অনেক ভবিষ্যৎ জুড়ে—পদ্মা-মেঘনার আকাশে পূর্ণিমায় দুটো-একটা তারার মত। যোগেনের হঠাৎই মনে পড়ে—এই মানুষটিকে দর্শন করতে গেটের বাইরের মানুষগুলির মুখ, বুড়োদের, শিশুদের। এত মানুষের ভরসা এই একটা মানুষকে বইতে হয়।
গান্ধীজির এই তাকিয়ে থাকাকে বৈঠক শেষ হওয়ার সংকেত বুঝে সবারই একটু চাঞ্চল্য ঘটে।
গান্ধীজি যোগেনের দিকে সেই দৃষ্টি নির্মিমেষ রেখে গলাটা একটু বাড়িয়ে বলেন, ‘আমার আর আপনাদের আর দেশের পক্ষে এক। এই তিনের সংযোগ না হলে, আলাদা।’
যোগেন বুঝে নিতে পারে, এই প্রথম সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাক্ষুষ করছে—বর্ণভেদবিশ্বাসী নির্লজ্জ এক হিন্দু, স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নির্ভয় এক ভারতীয়। যোগেন যে তার নিজের অহিন্দু ভারতীয়তার ভিৎ খুঁজতে ডুবে আছে মহাসাগরের জলে।
যোগেনের দম আটকে আসছিল। এমন মানুষকে ফেরানো যায়? সে কেমন অপ্রস্তুতের মত হঠাৎ বলে বসে, ‘আমাদের মধ্যে একজন আছেন যিনি পুনা প্যাকেট সই করেছিলেন, রসিকলাল বিশ্বাস।’
‘আরে তাই? সেই দোস্তকে লুকিয়ে রেখেছেন? কোথায় তিনি?’ গান্ধীজি খাড়া উঠে এঁদের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
