১০
2 of 4

১০০. শিশির ভাদুড়ীর মেবার পতন

১০০. শিশির ভাদুড়ীর মেবার পতন

হঠাৎ ক্রি-ই-ং ক্রি-ই-ং করে একটা টানা বেল বাজতে লাগল। চারদিকে যেন হৈ-হৈ পড়ে গেল। বাইরে থেকে সবাই দৌড়ে, লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে হলে ঢুকে পড়ল। সেই ভিড় যে-রকম হৈ হৈ করে হলে ঢুকে বসে পড়ল, তাতে মনে হয় সিটগুলো তাদের চেনা। কিংবা এরা আগে থেকেই নিজের-নিজের আসন দেখে তার ওপর গামছা বা টুপি এই সব বা রুমাল এই সব দখলি চিহ্ন ছড়িয়ে রেখেছে। যোগেনরা বসেছিল হলের একেবারে মধ্যিখানে। তাদের বাঁদিকে অর্থাৎ যে-দিক দিয়ে তারা হলে ঢুকেছিল সেই দিকটা হিন্দু মেয়েদের জন্য আলাদা দুই সারির আসন। হিন্দু মেয়েরা বেশির ভাগই গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে ও মাথায় একটু ঘোমটা দিয়ে, সে-ঘোমটাটা মুখের দু-পাশেও ঝুলিয়ে বসেছে। এদের মধ্যে অনেকেই বিধবা—তাদের ছোঁয়াছুয়ি মেনে চলতে হয়। ঐ দুই সারির টিকিট কাটতে হলে বলতে হয়, ‘হিন্দু লেডিস’। যোগেন টেরই পায় না, অতটা হৈ-হল্লা কখন মিশে গেল ড্রপ সিন উঠে যাওয়ায় স্টেজ থেকে ছড়ানো আলোর সঙ্গে আর একদল মেয়ে তীব্র আলোতে স্টেজে পাক দিচ্ছিল একটা কোরাস গাইতে-গাইতে। এটা বুঝতেও কিছুটা সময় গেল। তারপর বোঝা গেল, গানটার সুর ও তাল-

মেবার পাহাড়—উড়িছে যাহার রক্তপতাকা
উচ্চশির—
তুচ্ছ করিয়া ম্লেচ্ছ দর্প দীর্ঘ সপ্ত শতাব্দীর।

গানের তাল ও সুরের ঘাট বোঝাতে স্টেজের মেয়েরা ফিরে-ফিরে গাইতে লাগল।

মেবার পাহাড় শিখরে তাহার রক্তপতাকা ওড়ে না আর,

গানের তাল রেখে একটি মেয়ে স্টেজের বাঁ-হাতি ফাঁকটা দিয়ে মাপা পায়ে ঢুকে পড়ে। তার হাতে ধরা খাড়া একটা কোষ মুক্ত তলোয়ার, ঝলকাচ্ছে। গানটা তখন হচ্ছে।

মেবারের এই তরবারি চায় মুসলমানের রক্তপান,
মেবারের মাঠে মরিতে আসিছে হাজার হাজার মুসলমান॥
যবনরক্তে ধারালো হইবে এই তরবারি দীপ্যমান।
হিন্দুর এই তরবারি চায় মুসলমানের রক্তপান।।

খুব উঁচু গলায় গান হচ্ছিল। তালটা বুঝতে পারার পরই তালে-তালে হাততালিও শুরু হল। যেন আগে থাকতেই ঠিক ছিল, হাততালির ফলে উজ্জীবিত গান আরো কতক্ষণ চলবে। এর মধ্যে একজন পিঠ নুইয়ে এসে হকশাহেবের হাতে একটা শালপাতার ঠোঙা ধরিয়ে একই ভঙ্গিতে ফিরে যায়। হকশাহেব ঠোঙাটার গন্ধ শুঁকে আন্দাজের চেষ্টা পান ভিতরে কী। টেরা না পেয়ে তিনি ঠোঙার ওপরটা ছিঁড়ে আবার গন্ধ শুঁকলেন। পান। তিনি একটা খিলি দু-আঙুলে তুলে মুখে পড়ে চিবুতে লাগলেন, ‘পান’ বলে ঠোঙাটা মণ্ডলের দিকে বাড়িয়ে দেন। হকশাহেব জিজ্ঞাসা করেন, ‘দ্যহ তো মণ্ডল, জর্দার গুলি পাও না কি দেহ তো’।

যোগেনের হাতে সেই পুরিয়াটা আগেই এসেছিল। সে সেটা হকশাহেবের হাতে দিয়ে, একটা ছোট পানের খিলি নিয়ে মুখে ঢোকান

ইতিমধ্যে মঞ্চ থেকে নাচের মেয়েরা চলে গেছে ও প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শাদা দাড়ি নিয়ে এক বুড়ো, জ্বলজ্বলে পোশাকে রাজা-রাজড়াই মনে হয়, ঢুকে পেছনের দেয়ালে একটা চকচকে ঢালের ওপর কোণাকুনি করে রাখা এক তরবারি স্পর্শ করলেন। যোগেন তো আগে দেখেনি, দেয়ালে তরবারি—ঠিক যখন নীলচে ফোকাস ঐ তরবারি ও বৃদ্ধের শীর্ণ করতলের ওপর পড়ল, তখনই যেন দেখল যোগেন, দেয়ালে তরবারি। তা হলে দেয়ালে ঝোলালো কখন? এই দ্বন্দ্বেই যোগেন হাঁ হয়ে যায়, যেন এটাই প্রধানতম দৃশ্য—দেয়ালে তরবারি ঝোলানো।

যোগেনের বিস্ময় যে কাটল তা নয় কিন্তু নতুনতর দৃশ্যে সেই বিস্ময় একটু চাপা পড়ে গেল। বৃদ্ধ তখন সেই খোলা তরবারি নিজের দুই করতলে ধরে, ঘাড়টা একটু পেছনে হেলিয়ে, তরবারিটিকে একটা দীর্ঘ চুম্বন দিয়ে হঠাৎ সোজা দাঁড়িয়ে তরবারিটি নিয়ে একটা খেলা করেন। নীল ফোকাস তার অনুসরণ করে। একা যুদ্ধের ভঙ্গিরত সেই বৃদ্ধ নাচের ছন্দেই মঞ্চের সামনে চলে এসে দাঁড়াল। নীল আলোর ঘেরে তিনি এবার আর একটি চুম্বন করেন তরবারিটিকে, এবারও দুই হাতে ধরে কিন্তু হাঁটু গেড়ে ও হাঁটুর ওপর ডানহাতটা রেখে। যোগেন তখন তার গায়ের রঙচঙে চামড়া, লাল ঠোঁট, কাল দুই ভুরু, উড়ন্ত শাদা দাড়ি ও তাঁর দাঁতের সারি জিহ্বার লালসহ—একবারে দেখতে পায় ও তাঁর গলা শুনতে পায়,

‘প্রিয়তম আমার! তোমায় এতদিন ভুলে ছিলাম
বলে কি তুমি অভিমানে অনুজ্জ্বল? অভিমান ছেড়ে
একবার অভিসারে চলো, তরবারি। মেবার আক্রমণ
করেছে মোগল। তোমার রক্ততৃষ্ণা বাড়াও। সদ্যঃ
উষ্ণ মুসলমানি রক্তে তোমার সেই তৃষ্ণ মেটাব।’

এর পরই, এই কথাগুলি বলা শেষ হলে দূর থেকে একটি মেয়ে তীব্র কণ্ঠে ডেকে ওঠে, ‘বাবা’। সেই বৃদ্ধ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন। ততক্ষণে মেয়েটি তাঁর কাছে এসে গেছে। বলে,

‘ও তরবারি রেখে দাও বাবা, রেখে দাও। আমার

ভয় করে। রেখে দাও, বাবা।’

সেই বুড়ো সেনাপতি তাঁর বাঁ হাত মেয়েটির মাথায় আশীর্বাদের মুদ্রায় বুলিয়ে বলেন,

‘ভয় কেন রে কল্যানী, মা আমার। এ তো ভয়ঙ্কর
ও সুন্দর। এ কী চায় জানিস?’

‘কী’?

‘রক্ত।’

‘কার রক্ত?’ 

‘মুসলমানের।’ 

‘কেন বাবা, মুসলমানের প্রতি তোমার এ আক্রোশ’?

‘কেন? সে-কথা জিগগেস করো তোমার
জন্মভূমি এই মেবারকে। সপ্তদশ বর্ষ ধরে এই
স্বাধীন রাজ্যটুকু দখল করতে ঐ মুসলমানরা
ধেয়ে আসছে, আর বারবারই শৈলাপহত
সমুদ্রতরঙ্গের মত ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সে 
তো এই তরবারিরই শক্তিতে। এই তরবারির। এই।’ 

এরপর একটি মেয়ে এসে আরো সব মেয়েদের নিয়ে মেবার নিয়ে স্বাদেশী গান গাইতে লাগল। মেয়েটির নাম যে সত্যবতী সেটুকুই মাত্র জানা গেল। কিন্তু জানার দরকারটা বোঝা গেল পরের দৃশ্যে—মেবারের রাণার রাজসভায়। সেখানে রাণার প্রশ্নের জবাবে মেবারের প্রবীণ সব সেনাপতি ও অমাত্য নিজেদের মত করে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে বললেন কিন্তু রাণা রাজি হলেন না। রাজি না-হওয়ার যে-কারণ বললেন রাণা সেটা খুবই শাদাসিধে ও মোক্ষম মনে হল, ‘সামান্য একটা কর দিয়ে এই সুখশান্তিতে থাকা গেলে সেটাই তো ভাল। না কর না দিয়ে মরা ভাল?’ প্রথমে যে বুড়ো সেনাপতি তলোয়ার নিয়ে নেচেছিলেন তিনি বেশ খানিকটা লম্বা বক্তৃতা করলেন যুদ্ধের পক্ষে। তাঁর বক্তৃতার বেশির ভাগই ছিল এই বর্তমান রাণার বাবা প্রতাপসিংহের স্বাধীনতা-যুদ্ধের স্মৃতি। এই বৃদ্ধ তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন। 

এতটা স্মৃতিকথা বলতে সেই বৃদ্ধকে বেশ কিছুটা হাত-পা ছুড়তে হল, হাত দিয়ে চোখ ঢাকতে হল, কপালে চড়ও মারলেন কয়েকটা। 

এত কিছুর পরও রাণা অমর সিংহ ঘোষণা করে দিলেন, তিনি যুদ্ধটুদ্ধতে নেই, মোগল সেনাপতির সঙ্গে সন্ধি করবেন। রাণা দৌবারিককে বললেন, ‘মোগলদূতকে ডাকো।’ দৌবারিক যেই ডাকতে গেল, গোবিন্দ সিংহ দু-পা এগিয়ে এসে আকাশের দিকে দুই হাত ও মুখ তুলে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘রাণা প্রতাপ! রাণা প্রতাপ! তুমি স্বর্গ থেকে যেন এ-কথা শুনতে না পাও। বজ্র! তোমার ভৈরব স্বরে এ হীন উচ্চারণকে ঢেকে ফেল। মেবার! মোগলপ্রভুর দাসত্ব স্বীকার করার আগে একটা বিরাট ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাও।’ 

মোগলদূত আর সেই আগের সিনের সত্যবতী দু-দিক থেকে একসঙ্গে ঢুকে পড়ল—সত্যবতী একটা বড় জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে দিল, ‘আমি তোমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাব।’ সকলে সম্মতি দিয়ে হৈ হৈ করে উঠল আর গোবিন্দ সিংহ একটা লোহার বল কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারল এক আয়নায়। ঝনঝনিয়ে কাচ ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ থেকে যুদ্ধের বাজনা বেজে উঠল ও বেশ খানিকক্ষণ চলল। 

একটা বেশ চনমনে আবহাওয়ায় পরের ঠান্ডা সিনটাতে শুধু জানা গেল মহাবৎ খাঁ একজন মোগল সেনাপতি আবদুল্লা একজন মোগল সৈন্যাধ্যক্ষ। সম্রাটের ভাগ্নে হেদায়েত খাঁকে মেবার যুদ্ধে সেনাপতি করা হয়েছে। হেদায়েত যুদ্ধের কিছু জানেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীর ভাই এনায়েতকে সঙ্গে নিয়েছেন। সে যুদ্ধ জানে। আর, এই সিনের মহাবৎ খাঁর জন্মভূমি মেবার বলে তিনি মেবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান না। 

এর পরের সিনে নাটকটা দর্শকদের হাসিতে ও হাততালিতে দেখতে না-দেখতে জমে উঠল। সেই সেনাপতি হেদায়েত খাঁ একটা সিংহাসনের মত আসনে আধশোয়া হয়ে গুড়গুড়ি টানছিলেন আর সেই বড় কল্কে থেকে বেশ ঘন ধোঁয়া বেরচ্ছিল। যেন, সেই ধোঁয়া দেখানোর জন্যই হেদয়য়েত খাঁ আর তাঁর এক কর্মচারী কোনো কথা বলছিলেন না। 

হকশাহেব যোগেনের কানের পাশে মুখ নিয়ে বলেন, ‘বড়বাবু! হেদায়েতে নামছেন আজ?’

যোগেন ততক্ষণে মুগ্ধ হয়ে গেছে। স্টেজে কেউ নেই—ঐ হুঁকো-টানা হেদায়েত ও তাঁর মোশাহেব হুসেন ছাড়া। হেদায়েত যেন ঘুমিয়েই পড়েছেন। চোখ বন্ধ। আর, হুসেনকে ব্যস্তই দেখায়—এই ঢুকল একটা দড়ি নিয়ে, সেটা দিয়ে ঘরটার সিলিং থেকে মেঝেটা কতটা মাপতে গিয়ে আবিষ্কার করল—সিলিং পযর্ন্ত উঠবে কী করে? তখন, দড়িগাছা ফেলে রেখেই বাইরে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল উল্টো দিকে থেকে। তার অনুপস্থিতিটা শুধুই কলকের গভীর ধোঁয়া উঠল আর মঞ্চে ভেসে বেড়াল। মই নিয়ে ঢুকে হুসেন দেখে, মইটা দাঁড় করানোর একমাত্র জায়গা, হেদায়েতের ডিভানের বাঁকানো মাথাটা। হুসেন খুব মন দিয়ে মইটা ফিট করতে লাগল—যাতে পিছলে না যায়, যাতে উল্টে না যায়, যাতে ভেঙে না পড়ে। তখনো ধোঁয়া ঘুরে বেড়চ্ছে। হুসেন বেশ আয়োজন করে সাবধানে মইয়ের ধাপ বেয়ে উঠছে। আর দাঁড়াচ্ছে। জোড়পায়ে মই ভেঙে যখন সে হেদায়েতের শোয়া শরীরের ওপরে উঠে গেছে আর শুধুই তার কোমরের নীচটুকু দেখা যাচ্ছে। গড়গড়ার ধোঁয়াটা একটু পাতলা হতেই শোনা গেল বেশ ভারী একটা গলার ছোট্ট একটা হাসির সঙ্গে এই নিজেকে বলা কথাগুলো, ‘তুমি আমার বন্ধু বলেই তোমাকে বলছি, এই মেবার জয়টা-না একটা তুড়ির কাজ!’ কথাটা খুব ভেবে-ভেবে থেমে-থেমে বলা। হুসেন মই বেয়ে কয়েক ধাপ নেমে এসে বলল, ‘তা হলে তো একটা বড় তুড়ি দিতে হবে। সম্রাট আকবরের চাইতেও বড়। উনিও তো জিততে পারেননি মেবার। বলে হুসেন কয়েক ধাপ উঠে যায়। হেদায়েত গড় গড়ার নলটা ফেলে দিয়ে ত্বরিত গতিতে ডিভানের ওপর উঠে বসেন, ‘আকবরের কি আমার মত সেনাপতি ছিল?’ বলে বুক চিতিয়ে কয়েক পা এগিয়ে যান। হুসেন আবার নেমে এসে বলে, ‘কেন? মানসিংহ?’ 

হেদায়েত কথাটা গ্রাহ্য না-করার ভঙ্গিতে খুক করে একটু হাসেন? তারপর বেশ বড় গলায় বলে ওঠেন, ‘এই জন্যই-না তোর কথা শুনতে এত ভালবাসি।’ বলে সেই খুক হাসিটা আরো বড় করে হাসেন। ‘যে-কোনো কথাকেই তুই মজার কথা বানিয়ে দিতে পারিস।’ আবার হাসি। ‘মানসিংহও নাকী সেনাপতি!’ এবার হাসির বাকিটুকু হাসলেন ও বেরিয়ে যেতে যেতে হাঁকলেন, ‘খানশামা খানা লাগাও। হুসেন কী হাসাই না হাসাল। খিদে পেয়ে গেছে। 

হল ভেঙে পড়ে হাততালিতে। 

‘দেলা মণ্ডল! বড়বাবুর অ্যাকটিং। শুধু কল্ক্যার ধোঁয়া ছাইড়াই কেল্লা ফতে। তোমার ভাল্ লাগতেছে না?’ 

‘এই দৃশ্য কি কারো ভাল লাগা না লাগার উপর নির্ভরশীল। অথচ দ্যাহেন একডুও তো বানান নাই’। 

হকশাহেব আর যোগেন আবার থিয়েটারে ডুবে যান। থিয়েটারের গল্প আগে জানা না থাকলে অসুবিধা। যাত্রায় বেশির ভাগ গল্পই জানা—ডায়ালগ পর্যন্ত। কিন্তু আধুনিক এই শাহেবি নাটকে গল্পটা ধরতে ধরতে, কে কার কী হয় বুঝতে-বুঝতেই সময় চলে যায়। তার ওপর ঐতিহাসিক নাটকে লেখক আবার নিজের বানানো চরিত্রও ঢুকিয়ে দেন। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *