১০
2 of 4

৯০. গান্ধী সকাশে

৯০. গান্ধী সকাশে

মাঝখানে মাত্র একটা দিন।

মার্চের ১৮ তারিখে সকাল ১০টায় গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা সুভাষই করে রেখেছিলেন। আইনসভার তপশিলি সদস্যদের সঙ্গে গান্ধীজি কথা বলবেন। যদিও বাংলার আইনসভায় পার্টিগত ভাগ তপশিলি সদস্যদের মধ্যে নেই বললেই চলে, এক কংগ্রেসের পাঁচজন, বাকি সব স্বতন্ত্র, আর যোগেন মণ্ডল—তবু সুভাষবাবু বলে দিয়েছিলেন কে কে আসবেন সেটা যেন দলটল দেখে না বাছা হয়।

একে-একে এসে ওঁদের শরৎ বোসের বাড়ির পাশে জমা হতে পৌনে দশটা হয়ে গেল কিন্তু তাঁরা বুঝতেই পারছিলেন না ঢুকবেন কী করে। বড় গেটটা আটকানো। তার সামনে বেশ একটা ভিড়। নানা বয়সের মানুষ— পাগড়ি-পরা বুড়োও আছেন, বাচ্চা কোলে মা-ও আছেন। দেখে মনে হয়, গ্রামের মানুষ দল পাকিয়ে তীর্থ করতে এসেছে। কাছে যাওয়ার পর বোঝা গেল—এরা কলকাতা শহরেরই নানা প্রদেশের মানুষ, কোনো এক ভাবে শুনেছেন, গান্ধীজি আজ সকালে এই বাড়িতে আছেন। শুনে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে করে ছেলেমেয়ে নিয়ে নিজেদের সবচেয়ে ভাল পোশাক পরে এখানে এসে বসে আছে, গান্ধীবাবার দর্শনের জন্য। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, ডাকাডাকি নেই, সারা দিনে কি আর দর্শন মিলবে না? গেট তো বন্ধ। এদের ঠেলে তো আর যাওয়া যায় না, গেটও তো খোলা নেই। শেষে হেম নস্কর মশাই তাদের গিয়ে বললেন, গান্ধীজি আমাদের দেখা করতে ডেকেছেন, সময় হয়ে গেছে, আমাদের একটু ভিতরে যেতে দিন। এঁদের দলটাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল—এরা মিটিং করার লোক। সঙ্গে-সঙ্গে দু-ভাগ হয়ে ওঁদের জন্য রাস্তা করে দিল। একটি বউ বলে উঠল, ‘আপনাদের সঙ্গে আমাদের নে যাবেন, আমরা এক পলক দেইখেই—’। একটা বেশ জবরদত্ত পুরুষ ধমকে ওঠে—’ এই, চুপ। এক্কেরে চুপ।

গেটটা খুলছে না, এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। দরজায় আওয়াজ করাটা ঠিক হবে কীনা সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। শেষে বরিশালের উপেন এদবার রেগে গিয়ে বলে ওঠে, ‘ইস্টিমার-না ফুঁ দিয়া দিছে’। এই পর্যন্ত বলতেই চাপা স্বরে এদবারকে থামাতে চাপা স্বরে বলে ওঠে, ‘হেই চুপ, চুপ’। এদবার তখন তো কথাটা বলার মধ্যে, মাঝখানে যেটুকু নামানো সম্ভব নামিয়ে সে বাকি কথাটুকুও বলে দেয়, ‘অ্যাহন না ঢুইগলে সিঁড়িও তুইল্যা নিবে।’ সে শুধু কথাটাই শেষ করে, তা নয়। পকেট থেকে একটা দুই আনি বের করে গেটের পাতের ওপর পর-পর দুটো ও তারপরে একটা আওয়াজ করে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই পাশের ছোট গেটটা খুলে যায়। এরা ঢুকতে শুরু করে। এবার তার বাহাদুরির স্বীকৃতির জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় একমুখ হাসি নিয়ে আর তার পাশ থেকে বিরাট মণ্ডল চাপা গলায় শাসিয়ে ওঠেন, ‘উহানে য্যান টু-আওয়াজখানও কইরো না।’

ওঁরা ভিতরে ঢোকার পর দু-জন লোক এসে ‘আসুন’ বলে একটা হলঘরের ভিতর দিয়ে তাঁদের সিঁড়ির গোড়ায় নিয়ে যান।

দোতলার সিঁড়ির দরজায় আর-এক জন গান্ধী টুপি, ও খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক তাদের নিয়ে একটা ঘরের মধ্য দিয়ে বাইরের পোর্টিকোতে নিয়ে গিয়ে, হাত দেখিয়ে সবাইকে বসতে বললেন। পোর্টিকোজোড়া শতরঞ্চির ওপর শাদা চাদর ও কিছু ছোট-ছোট তাকিয়া ছড়ানো দেখেই বোঝা যায়—এটাই মিটিঙের জায়গা। একটা মাথায় আসন পাতা আছে।

এরা বসার পর দেখেন দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন— দরজার পাশে শরৎ বোস, তাঁর পাশে লম্বা বয়স্ক একজন, যোগেন পরে শুনেছে উত্তর প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, তাঁর পাশে সুভাষ বোস, এঁদের থেকে একটু দূরে একজন কথা বলছিলেন বল্লভ ভাই প্যাটেলের সঙ্গে, যিনি কথা বলছিলেন তিনি কে সেটা যোগেন তার দলের কারো কাছ থেকে জানতে না পেরে দু-একদিন পর শরৎ বোসকে জিজ্ঞাসা করে জানে, রবিশঙ্কর শুক্লা, সেন্ট্রাল প্রভিন্সের প্রধান মন্ত্রী। জওহরলাল বসে ছিলেন এদের মুখোমুখি, সেই পাতা আসনের ডান দিকে।

এতগুলো নেতাকে একসঙ্গে দেখে চোখ তো ধাঁধিয়ে যায়ই, তার ওপর এখন তো এঁরা শুধু নেতা নন, কেউ-কেউ তো প্রধানমন্ত্রী কোনো-কোনো প্রদেশের। প্রধানমন্ত্রীদের একটা আলাদা জেল্লা কি থাকে? যোগেন নিজেকে বোঝায়—যে দেখে, জেল্লা তো থাকে তার চোখে। এতগুলো নেতা যারা যখনতখন জেল খাটে তাদের দিকে তাকালে ভক্তি আসে, বিশ্বাস আসে। ক্ষমতা তো টানে। আবার একটু ঈর্ষাও জাগায়। ঈর্ষার জন্য যেটুকু মিল থাকা থাকা দরকার, এদের কারো সঙ্গে যে তার তেমন কোনো মিল নেই, সেটা জেনেও, বা জানে বলেই যোগেন তার পাশে বসা ঢাকার ধনঞ্জয়কে কানে-কানে বলে, ‘এই রত্নসভায় আমাগো হকশাহেবরে কম মানাইত না।’ ধনঞ্জয় তার দিকে হাসি মুখ ফেরালে যোগেন একই স্বরে বলে, ‘দোহাই— জোরে হাসস না—দোহাই।’

এঁদের মুখোমুখি ভিতর দিকের একটা দরজা দিয়ে পাশের একজনের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে গান্ধীজি দরজার কাছে তাঁর চপ্পলটা খুলে পোর্টিকোর ভিতরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়াল। গান্ধীজি সেসব খেয়াল না করে তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে কথাটা শেষ করলেন। চোখ যে এমন ধাঁধিয়ে গেল, যোগেন সেটা ভেবে বের করতে চেয়েছে। পারেনি। কিন্তু সে চেহারার টান-ধারণার কাছাকাছি পর্যন্ত যেতে পেরেছে। ক্ষমতা, পদ, কীর্তিকথা—’টান’ আসতে পারে বটে, কিন্তু এই টানটা তা থেকে আলাদা। সুভাষবাবুর আছে, শরৎবাবুর নেই অথচ দুজনের চেহারায় এত মিল। তখনো গান্ধীজি ও সবাই দাঁড়িয়ে। গান্ধীজির খাড়া, কোনাচে ঘাড়, হাঁটুর মালাইচাকি, হাতের কনুইয়ের ফাঁক দিয়ে যোগেন একবার জওহরলালের দিকে তাকান। দাঁড়িয়ে আছেন, একটু আলগা—কিন্তু সে ‘টান’ নেই, সুভাষের মতো টানও নেই। গান্ধীজি যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানেই বসে পড়লেন, হাঁটুর ওপর হাঁটু তুলে। নেতাদের মধ্যে কেউ-কেউ আর দু-জন মহিলা এসে তাঁকে মিনতি করতে লাগলেন আসনে গিয়ে বসতে। তাঁদের কথা যেন তিনি শুনতেই পাচ্ছেন না, এমন ভঙ্গিতে, একটু চাপা স্বরে এঁদের বলছিলেন, হিন্দিতে, ‘আমরা তো অনেক হোঁচটটোচট খেয়ে শেষপর্যন্ত ভোট, মন্ত্রিসভা, মন্ত্রী, আইনসভায় ঢুকে পড়েছি। তাই সব জায়গায় গিয়ে নতুন মন্ত্রী আর মেম্বারদের কাছে জানতে চাই, কেমন লাগছে ভাই, মন্ত্রী হয়ে? মন্ত্রী হওয়ার অসুবিধেগুলো কী?’

সেই দুই মহিলা আর দুই নেতা এসে গান্ধীজিকে আবার অনুরোধ করতে শুরু করলেন আসনে বসতে। গান্ধীজি তখন এঁদের বলছেন, ‘আপনারা বলুন, আপনাদের কথা শুনি’। তারপর সেই মহিলা ও নেতাদের দিকে না তাকিয়ে হাতটা কাঁধের ওপর দিয়ে নাড়িয়ে বলে ওঠেন একই স্বরে, ‘এটা তো মিটিঙের জায়গা। ওখানে তো রাষ্ট্রপতি বসবেন। সভা চালাবেন। সুভাষ কোথায়?’ বলে তিনি দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে সুভাষকে খুঁজলেন। ফিরতি চোখে পেলেন, সুভাষ তখন একটু এগিয়ে এসেছেন। গান্ধীজি তাঁকে বললেন, ‘নিজের গদি ছেড়ে লুকিয়ে থেকে আমাকে ঝামেলায় ফেলছ কেন। যাও, তোমার সিটে যাও।’ সুভাষচন্দ্র একটাও কথা না বলে গুটিগুটি হেঁটে এসে গান্ধীজির বাঁ দিকে, একটু পেছনে বসে পড়লেন। আসনটা আড়াল হয়ে গেল। সুভাষ ঘাড় ঘুরিয়ে জওহরলালকে তাঁর পাশে আসতে ইশারা করলেন। জওহরলাল একটা হাঁটু তুলে, সেই হাঁটুতে বাঁহাতের কনুই রেখে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলেন। সুভাষের ইশারা পেয়ে তিনি উঠে এসে সুভাবের পাশে বসলেন। সুভাষের চাইতে জওহরলাল তো অনেক বছরের বড়, আট-দশ তো হবেই, শরৎ বোসের সমান অথচ জওহরলালকে সুভাষের চাইতে কমবয়েসি দেখায় কেন? যোগেন এই সমস্যার সমাধান করে টাক দিয়ে। সুভাষের টাক আর জওহরলালের টুপি। নইলে জওহরলালও তো ধুতিপরা।

গান্ধীজিকে তখন উপেন বর্মন বলছেন, ‘আমরা তো কেউ মন্ত্রী না। আমাদের থেকে মন্ত্রী হয়েছেন দু-জন মুকুন্দবিহারী মল্লিক, খুব বিদ্বান, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি পড়ান। আর, প্রসন্নদের রায়কত, ইনি জলপাইগুড়ির জমিদার।

গান্ধীজি বললেন, ‘জলপাইগুড়িতে কংগ্রেসের একটা বড় অধিবেশন হয়েছিল, ১৯২৫-এ। আমি গিয়েছিলাম।

‘জলপাইগুড়িতে একজন রায়কত আমাকে গান শুনিয়েছিলেন। তিনিও তো জমিদার, শুনেছিলাম। ইনি কি তিনি?’

‘প্রসন্নদেব বাবু, বলুন-না।’ তারপর গান্ধীজিকে উপেন বর্মন বললেন। ‘আপনাকে জলপাইগুড়িতে আমি দেখেছি।

‘ও, আপনিও জলপাইগুড়ির?’ গান্ধীজি হাসলেন। যোগেন দেখে ফেলল, গান্ধীজির হাসিতে কোনো বারণ নেই। আর উনি চোখেও হাসেন, যেন এতটা হাসি পুরোটা মুখে ধরে না।

প্রসন্নদেব বাধ্য হয়েই এসেছেন। পারলে ডুব দিতেন। কিন্তু সুভাষ বোস জানিয়েছেন, গান্ধীজি তপশিল মন্ত্রী ও এমএলএদের সঙ্গে কথা বলতে চান। প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, বুকে সাহস আছে তো গান্ধীর ডাক ফিরায়া দিবার। যাবেন না কেন। গভমেন্ট আনরিপ্রেজেন্টেড থাকবে ক্যান? প্রসন্নদেব সবাইয়ের সঙ্গে গা-ঢাকা দিয়ে কোনোরকমে ছিলেন। উপেন বৰ্মন দিলেন ফাঁসিয়ে।

প্রসন্নদেব জোড়হাত করে বললেন, ‘স্যার, আমি আপনাকে গান শোনাইনি।’ গান্ধীজিকে ‘স্যার’ বলে ফেলে প্রসন্নদেবও অপ্রস্তুত, চাপা একটা হাসিও উঠল। প্রসন্নদেবের আর-একটু বলার ছিল। সাহস পাচ্ছিলেন না, আবার বসে পড়তেও পারছিলেন না।

উপেন বর্মন তাঁকে রক্ষা করলেন, ‘সরোজদা গেয়েছিলেন না?’

‘হ্যাঁ।’ বলে প্রসন্নদেব বসে পড়লে উপেন বর্মন গান্ধীজিকে বলেন, ‘আপনি যথার্থই বলেছেন। ওঁর এক ভাই আপনাকে গান শুনিয়েছিলেন। তিনিও রায়কত।’

‘আপনার কেমন লাগছে, মন্ত্রীত্ব করতে?’

প্রসন্নদেব কোনোভাবেই দশজনের চোখে পড়তে চাইছিলেন না। কোনো রাজনীতির কারণে নয়, এমনি আলগা কোনো নৈতিক কারণেও নয়। বরং পাছে আবার ঐ সব কথা উঠে পড়ে যার কিছুই তিনি জানেন না। বা, অতি সামান্য যদি কিছু জানেনও তাহলে তিনি ভাবতে বা বলতে পারবেন না। কিছু ভাবা ও সেই কথা বলা—এটা তো একটা শারীরিক প্রক্রিয়া, সে-প্রক্রিয়াটা চালু করে না দিলে আগুনটা জ্বালবে কী করে, একটা ছোট সরু কাঠি দেশলাইয়ে না ঘষলে? প্রসন্নদেবের জীবনের অভ্যেসই হল, পুরনো আগুনে আঁচ নেয়া। মন্ত্রী-হওয়া যখন থেকে শুরু, উনি তখন থেকেই মন্ত্রী—কখনো দু-বছরের জন্য, একবার ছ-মাসের জন্য মন্ত্রী। কোন আইনে কখনো দু-বছর, কখন ছ-মাস এসব নিয়ে তাঁর কোনো কৌতূহলই ছিল না। তিনি এ-মিটিঙে এসেছেন, গান্ধীর মিটিঙের আমন্ত্রণ ফেরানো যায় না বলে। গান্ধীজির দর্শন পাওয়ার আগে থেকেই, তিনি কোনো অপরাধ করেছেন বলে তাঁর মনে হচ্ছিল। যেন, তাঁর মন্ত্রীত্ব ঝড়ে বক মরার মত। কিন্তু তাঁর কপালই এমন যে তাঁকেই কীনা গান্ধীজির প্রথম প্রশ্নের সামনে–তাও আবার এমনই উদ্ভট প্রশ্ন—কোনোদিন গান গেয়েছেন কী না। সেই প্রশ্নের জবাব গোলে হরিবোল হচ্ছে দেখেই তিনি বসে পড়ে আরো গভীরে চলে যান যেন মেঝেটা কোনো পুকুর, তার পাড়ে নানা ফোঁকর বা তার নানারকম ডুবজল।

গান্ধীজি তাঁকেই প্রশ্ন করলেন, ‘মন্ত্রীত্ব করতে কেমন লাগছে? একদিকে পার্টি আর-এক দিকে ডিপার্টমেন্টের দোটানায়?’ প্রসন্নদেব দাঁড়িয়ে জোড় হাতে, ‘ভাল কোনো অসুবিধা নাই। আগে যেমন ছিলাম—’

‘আপনি আগেও মন্ত্রী ছিলেন? ব্যোমবেশ বাবুদের সঙ্গে? কোন পার্টি আপনার?’

‘আমার কোনো পার্টি নাই। লাটশাহেব মন্ত্রী বানাইলেন, মন্ত্রী হছি। আর ডিপার্টের শাহেবদের সঙ্গে তো পূর্বচেনা। প্রসন্নদেব বসে পড়েন আর তাঁদের কৌলিক পূজায় নবমীর সকালে মোষবলিটা হয়ে যাওয়ার পর যেমন, তেমনি হাঁফ ছাড়েন।

প্রসন্নদেব ঠিকই বলছিলেন। কথা চলছিল, স্বাধীনভাবেই, হিন্দি-ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে ভাষা নিয়েও প্রসন্নদেবের কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তাছাড়া, এখানে এতজন আছেন তাঁর কথাটা গান্ধীজির কাছে আর-একবার বলে দিতে। অসুবিধে, প্রসন্নদেবের, ছিল কথা নিয়েই। উনি কোনো কথা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। এমনি গল্পগুজবে কারোই তো কথা গুছনো থাকে না-কথা নিজেই নিজেকে গুছিয়ে নেয়। প্রসন্নদেবের হয় এটা জানা ছিল না, নয় এটা তিনি বুঝতেন না। ফলে কোনো একটা কথাবলা তাঁর পক্ষে অনিবার্য হয়ে উঠতে থাকলে তিনি ঘামতে শুরু করতেন ও এতটা ঘামতেন যে ভিজে যেতেন। তাঁর কথাবলা, এখানে যাঁরা এসেছেন, সেই এমএলএদের এত চেনা যে একটু খোলা হাওয়া বয়েই যায়। হাওয়াটা বন্ধ হয়ে যায় উপেন বর্মনের একটা কথায় গান্ধীজির জবাবে।

উপেন বর্মন বলেছিলেন, ‘প্রথম অ্যাওয়ার্ডে তো আমাদের মাত্র ১০টি আসন ছিল। আপনি সেটাকে একেবারে তুলে দিলেন ৩০-এ। আপনি আমাদের উপদেশ দিন, কী ভাবে আমরা ভালভাবে দেশের সেবা করতে পারি।

গান্ধীজি জবাবে বলেন—’সংরক্ষণটা কেন? সংরক্ষণ দরকার হবে কেন? আমি শুনেছি— বাঙালি-ওড়িয়াদের মধ্যে নাকী একটা রীত্ আছে মেয়েদের, বাড়ির ভাত রাঁধতে চাউল বেড়ে দেয়ার সময় মাপমত চাল নিয়ে, সেই চাল থেকে একমুঠো আবার ভাঁড়ারে ফেরত রাখতে তাকে বলে লক্ষ্মীর ঝাঁপি। দু-মুঠো সঞ্চয় হলে চালের অভাবে পড়তে হবে না। তখন লক্ষ্মীর ঝাঁপি খোলা হবে।’

এখানে অনেকে আছেন যাঁরা জানেনই না চালের কোনো অভাব ঘটতে পারে। চাল তো সারা বছরই তৈরি হয়। আবার, অনেকে আছেন, যোগেনের মতো, যারা জন্মের পর থেকে শুধু ক্ষিধেতেই কষ্ট পেয়েছে। গান্ধীজির ঐটুকু কথায় সম্ভাব্য হাসি হেসে কেউ-কেউ সৌজন্য রাখলেন যদিও! তবে তার চাইতে বেশি শোনা গেল—তাদের নীরবতা, যারা বুঝতেই পারেনি— একমুঠ চাল যদি বেশিই পাওয়া গেল, সেটা আবার ফেরত কেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *